দেবাশিস দত্ত: তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার, ওদেশে থাকেন না। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়ার কারণে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে থাকছিলেন। ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের অদূরে ৮৫ প্যাভেন হ্যাম ড্রাইভের দোতলা বাড়িতে গত ৫ বছরে বার পাঁচেক গিয়ে দেখা পাইনি। কোথায় গেলেন?‌ ক্লাইভ লয়েড, মাইকেল হোল্ডিং, গর্ডন গ্রিনিজরা কোনও ঠিকঠাক ঠিকানা দিতে পারেননি। তা হলে কোথায় পাব তাঁকে?‌ হন্যে হয়ে খুঁজেছি। আগামী ২১ মার্চ, তাঁর ৭০তম জন্মদিন। হঠাৎ খবর পেলাম, চেন্নাইয়ের এক পাঁচতারা হোটেলে এসে উঠেছেন। কতদিন থাকবেন?‌ জানি না। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ার পর থেকেই কোনও পাঁচতারা হোটেলে অতিথিদের সম্পর্কে খোঁজখবর দেওয়া হয় না। অনেক কাকুতি মিনতি করার পর হোটেলের টেলিফোন অপারেটর সংযোগ দিলেন। এবং এ প্রান্ত থেকে গলা শুনে বললেন, ‘‌কেমন আছেন?‌ ভুলে গেলেন আমায়?‌’‌ দু তরফেই অসুবিধের কথা আদান–‌প্রদান হল। অবশেষে জানালেন, এখন নিউ ইয়র্কের কাছে পাকাপাকিভাবে আছেন। ওখানে ক্রিকেট কোচিং করাচ্ছেন। কিন্তু কতদিন এই ঠিকানায় থাকবেন, তা নিজেও জানেন না। আলভিন কালীচরণ তো বরাবর এমনই। ভবঘুরে। কিন্তু আপাদমস্তক সৎ।
তো এত শহর থাকতে চেন্নাইয়ে কেন?‌ উত্তর পাওয়া গেল, ‘‌আমার মা পদ্মা মারা গিয়েছেন। কিন্তু জন্ম হয়েছিল, এই চেন্নাইয়ে। ৭০তম জন্মদিনে চেন্নাইয়ে এসে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই। মনে মনে নিজেকে বলছি, এই শহরেই তো মায়ের জন্ম হয়েছিল। সেখানেই যদি ৭০তম জন্মদিনটা কাটাতে পারি, তা হলে মাকে স্মরণ করা হবে।’‌ দ্বিতীয় কারণ হল, নিজের আত্মজীবনী প্রকাশ। নাম দিয়েছেন, কালার ব্লাইন্ড। যেন নিজের জীবনের সার কথা দুটো শব্দের মধ্যে বুঝিয়ে দিতে চাইছেন। জন্মদিনেই তাঁর আত্মজীবনী উদ্বোধন করতে চান, ‘‌জীবনে কখনও শরীরের রং নিয়ে রাজনীতি করিনি। কাউকে অশ্রদ্ধা করিনি। মানুষকে ভালবেসেছি। নিজের জীবনের যাবতীয় ক্রিকেটীয় কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বর্ণবৈষম্য নিয়েও থাকবে আলোচনা।’‌
পরবর্তী প্রশ্ন, বিশ্বকাপ দেখার জন্য কি ইংল্যান্ডে আসবেন?‌ উত্তর দিলেন, ‘‌যেতেই পারি। ২টো বিশ্বকাপ খেলেছি। চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্য। তবু আমায় কেউ ডাকে না। না, আমার দেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, না আইসিসি। মানুষ আমায় ভুলেই গেছে।’‌ তা–‌ও কি হয় নাকি?‌ সঙ্গে সঙ্গে মনে করিয়ে দিলাম যে, ’‌৭৫ বিশ্বকাপে তাঁর ১০ বলে ৩৫ রান তোলার কথা। সবাই ভুলে যাননি, এটা বোঝানোর জন্য। মাথায় হেলমেট ছিল না। এবং তরতাজা ডেনিস লিলিকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছিলেন। ‘‌মনে আছে?‌ আসলে, সেদিন ডেনিস মাত্রাতিরিক্তভাবে ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছিল। পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য নিজের ব্যাটকেই বেছে নিয়েছিলাম। এখনও মনে আছে, পরপর নেওয়া ওই শটগুলো। ৪, ৪, ৪, ৪, ৪, ১, ৪, ৬, ০, ৪। ওকে সেটল করতেই দিইনি। জোরে বোলিংকে ভয় পায় না ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা।

তাই তৃপ্তি পেয়েছিলাম ওই ভাবে সেইদিন ডেনিসকে পিটিয়ে।’‌ এ ব্যাপারেও তিনি উপেক্ষিত। ডেনিস লিলির মতো বোলারকে পেটানোর জন্য সাধারণত গ্যারি সোবার্স, ভিভিয়ান রিচার্ডসদের কথা বলা হয়। সেভাবে কি কালীচরণের দক্ষতায় আলো ফেলা হয়?‌
তবু, তাঁকে ক্রিকেট দুনিয়া, বলতে গেলে কোনও কারণ ছাড়াই দূরে সরিয়ে রেখেছেন, ‘‌কেন?‌ আই ডোন্ট নো। হয়তো আমি সাদাকে সাদা বলেছি তাই। কালোকে কালো। ৭০টা বছর তো কাটিয়ে দিলাম। এখনও যদি জো হুজুর হয়ে থাকতে হয়, ইজ দ্যাট পসিবল?‌ তার চেয়ে বরং সমাজসেবা, ধর্মে মন দেওয়া অনেক বেটার। এতে আপনার ক্ষতি হবে না।’‌ একমাত্র অন্যায় হিসেবে যদি কেউ তাঁর ক্রিকেট জীবনে কালো আলো ফেলতে চান, তা হলে, তা হল, ’‌৮৩–তে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাওয়া, ‘‌ইয়েস আই নো দ্যাট। আমরা ওইভাবে পরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে রেবেল ট্যুর করতে গিয়েছি বলেই, ওদেশকে অবশেষে ক্রিকেটের মূলস্রোতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পজিটিভ দিকটা কিন্তু সমালোচকরা উল্লেখ করেন না।’‌
তিনি মনে করেন, ভিভিয়ান রিচার্ডস হল, এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান, ‘‌আমি যাদের সঙ্গে খেলেছি, যাদের খেলা দেখেছি, তাদের মধ্যে ভিভ–‌ই হল সর্বোত্তম। আমি কাউকে ভিভের কাছাকাছি রাখতে পারব না। আই অ্যাম সরি। আর বোলারদের মধ্যে সেরা হল, আমার দেশের দুজন বোলার। মাইকেল হোল্ডিং এবং অ্যান্ডি রবার্টস। অ্যান্ডি হল, জোরে বোলারদের বাবার বাবা। ঠান্ডা মাথায় হিমস্রোত পাঠাত ও ব্যাটসম্যানদের উদ্দেশে।’‌ আর অধিনায়ক হিসেবে‌ উত্তর এল, ‘‌আপনাদের মনসুর আলি খান পতৌদি এবং ইয়ান চ্যাপেল। টেরিফিক ক্রিকেট ব্রেন। এবং ইয়ানের ভাই গ্রেগের ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করতে হবে। এত চমৎকার ও বডি ব্যালান্স মেইনটেইন করত, তা সেই আমলের সতীর্থদের কাছে জানতে চাইতে পারেন। এবং গ্রেগের ছিল, অস্বাভাবিক সহজ ভঙ্গিমা। সঙ্গে শৌর্য। ওর মতো অন ড্রাইভ মারতে কাউকে আমি দেখিনি কখনও।’‌
নিজের কথা বলতে চাইলেন না ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই ক্রিকেটার। বাঁ হাতের ব্যাটকে কখনও ব্যবহার করতেন তুলি হিসেবে, কখনও বা একে ৪৭। সঙ্গে ছিল, নিখুঁত টাইমিং। ক্রিকেটের মূলস্রোত থেকে দূরে থাকলেও খোঁজখবর রাখেন, ‘‌গোটা পৃথিবী থেকেই এখন উন্নত মানের বোলাররা হারিয়ে গেছে। তাই, কাউকে সেরা বোলার বা সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে চিহ্নিত করার আগে আমার ভিভ রিচার্ডস, অ্যান্ডি রবার্টস, বিষাণ বেদি, এরাপল্লী প্রসন্নদের কথা মনে পড়ে। আমার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সম্প্রতি ভাল খেলছে। ক্রিস গেইল থাকায় বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের চেহারাটা পাল্টে যাবে। তবে ’‌৮৩–তে ভারত যেভাবে ডার্ক হর্স হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছিল, তেমন কোনও অখ্যাত দল যে এবার ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ জিতবে না, সেটা বোধহয় সবাই বুঝতে পারছেন। এখন ক্রিকেট খেলা এতটাই প্রেডিক্টেবল হয়ে গেছে।’‌ শুক্রবার শেষ বিকেলে টেলিফোনে কালীচরণের সঙ্গে কথা বলার মাঝে অন্তত বার দশেক যে ছন্দোবদ্ধ অট্টহাসি শুনলাম, তাতে মনে হল, মানুষটা একইরকম আছেন।‌‌

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top