আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে ডার্ক ওয়ার্থ লুইস নিয়মে তিন উইকেটে গত দু’‌বারের চ্যাম্পিয়ন এবং টুর্নামেন্টের ফেবারিট ভারতকে হারাল পদ্মাপাড়ের দেশ। হ্যাঁ, অবাক হওয়ার কিছু নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার পোচেস্ট্রমে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে দুরন্ত খেলে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতল বাংলাদেশ। হোক না ছোটদের, তাতেও বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের এই লড়াইকে কখনই খাটো করা যায় না। 
বাংলাদেশ। বিশ্ব ক্রিকেটে যাঁদের অন্তত শক্তিশালী বলা যায় না। কিন্তু সেই মিথই এদিন ভেঙে দিল বাংলাদেশের ছোটরা। খেতাবি লড়াইয়ের যেমন টানটান উত্তেজনা থাকার কথা, পোচেস্ট্রমে তার কোনও খামতি ছিল না। কাপ দখলের লড়াইয়ে গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে শুরু থেকেই চেপে ধরেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বিরাট কোহলিদের উত্তরসূরিরা যে সহজ হাল ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নন। পরবর্তী তিন ঘণ্টার লড়াইয়ে সেটা বারবার বুঝিয়ে দিলেন প্রিয়ম গর্গরা। বৃষ্টিতে যখন খেলা বন্ধ হল, তখনও পাল্লা ভারী ছিল বাংলাদেশের দিকেই। পরে যখন খেলা শুরু হল, ডাকওয়ার্থ–লুইজ নিয়মে বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়াল ৪৬ ওভারে ১৭০ রান। হেলায় লক্ষ্যপূরণ।
লাগাতার বৃষ্টিতে স্যাঁতস্যাতে উইকেট। ফলে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং নিয়েছিল বাংলাদেশের অধিনায়ক। সতর্কভাবে শুরু করলেও ম্যাচের সপ্তম ওভারে ওপেনার দিব্যাংশ সাক্সেনাকে ফিরিয়ে ভারতীয় শিবিরে ধাক্কা প্রথম ধাক্কা দেয় বাংলাদেশের বোলাররা। স্কোরবোর্ডে তখন মাত্র ন’‌রান। এরপর সেখান থেকে তিলক ভার্মাকে সঙ্গে নিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন যশস্বী জয়সওয়ালের। ধীর গতিতে রান এগোলেও একসময় সেটাই বড় রানের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। ২০ ওভার খেলা হয়ে গিয়েছে। ভারতের স্কোর তখন ৬৫/‌১। ধারাভাষ্য দিতে এসে উন্মুক্ত চাঁদ বলছিলেন, ‘‌হাতে উইকেট থাকলে পরের দিকে রান তোলার গতি বাড়ানো যাবে। যশস্বীরা একদম ঠিকঠাক খেলছে।’‌ ২০১২ সালে ভারতকে যুব বিশ্বকাপ দেওয়া অধিনায়ক যে খুব ভুল বলেননি, ম্যাচ যত এগোচ্ছিল, প্রমাণ মিলছিল। 
তাল কাটল ২৯তম ওভারে। কিছুক্ষণ আগেই চলতি বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ হাফ সেঞ্চুরি পূরণ করে ফেলেছেন এই তারকা ওপেনার। হাসান সাকিবকে ওভারের দ্বিতীয় বলে ছয় মারলেন যশস্বী। ভারতীয় ইনিংসের প্রথম ওভার বাউন্ডারি। সেই ওভারের শেষ বলে আউট তিলক। বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে ছয় মারতে গিয়ে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে বসলেন তিলক। ৯৪ রানের পার্টনারশিপে ইতি। সেখান থেকেই যেন ছন্দপতন। পরবর্তী ৭৪ রানের মধ্যেই ভারতীয় ইনিংসের নটেগাছ মুড়িয়ে সাফ। সেমিফাইনালে পাকিস্তান বধের প্রথম একাদশ খেতাবি লড়াইয়ের ম্যাচেও ধরে রেখেছিল ভারত। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা বৈতরণী পার করে দেওয়ায় মিডল অর্ডারকে সেভাবে পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। সেটাই যেন কাল হয়ে গিয়েছিল। অধিনায়ক প্রিয়ম গর্গ (‌৭)‌ বড় রান পেলেন না। যশস্বীর ইনিংস থামল ব্যক্তিগত ৮৮ রানের মাথায়। ভারতের স্কোর তখন ১৫৬/‌৪। পরের ছয় উইকেট পড়ল মাত্র ২১ রানে। পুরো ৫০ ওভারও ব্যাট করতে পারেনি ভারত। ৪৭.‌২ ওভারে ১৭৭ রানে অলআউট।
প্রথমবার বিশ্বকাপ হাতে তোলার জন্য ১৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা। শুরুটা মন্দ করেনি দুই বাংলাদেশী ওপেনার। পেসাররা সাফল্য না পাওয়ায় নবম ওভারে লেগ স্পিনার রবি বিশনোইয়ের হাতে বল তুলে দেন প্রিয়ম। নিজের প্রথম স্পেলে শুধু দলকে সাফল্যে এনে দেওয়া নয়, চার উইকেট তুলে ভারতকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনলেন রবি। ৫০/‌০ থেকে আচমকা বাংলাদেশের স্কোর ৬৫/‌৪। এর মধ্যে কুঁচকির চোটে উঠে গিয়েছেন ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন। সেখান থেকে পরের দুটো উইকেট তুলে বাংলাদেশকে আরও কোনঠাসা করে দেন সুশান্ত মিশ্র। তখন ১০২/‌৬ বাংলাদেশ। বেকায়দায় দল। শুশ্রুষা নিয়ে আবার ব্যাট হাতে নামলেন ইমন। অধিনায়ক আকবর আলির সঙ্গে মহাগুরুত্বপূর্ণ ৪১ রানের পার্টনারশিপ। খোড়াচ্ছিলেন, তবুও সিঙ্গলস চালু রেখে ভারতীয় বোলারদের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। পার্টনারশিপ ভাঙলেন বিশ্বকাপে স্বপ্নের ফর্মে থাকা যশস্বী। ৪৭ রানে ব্যাট করা ইমনকে তুলে নিয়ে ভারতকে আবার লড়াইয়ে ভাসিয়ে দিলেন। কিন্তু রাকিবুল হাসানকে নিয়ে লক্ষ্যপূরণে অবিচল ছিলেন অধিনায়ক আকবর আলি (‌অপরাজিত ৪২)‌। দিনের শেষে ইতিহাসে নাম তুলেই মাঠ ছাড়লেন। 
১৯৮৩ সালে ভারত যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল, সেটিও ছিল একটি লো–স্কোরিং ম্যাচ। কপিলদেবরা মহাপরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর তারপরই নয়া সূর্যোদয় হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটে। আর বাংলাদেশের এদিনের জয়ের পর আশা করা যায়, নতুন উচ্চতায় উঠবে সেদেশের ক্রিকেটও। 

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top