উদ্দালক ভট্টাচার্য
গল্পটা প্রথম থেকে ভাবা যাক।
আট বছর প্রেম ছিল ওদের। তারপর কোনও একটা কারণে সেটা ভেঙে যায়। অনন্ত বলেছে, হঠাৎ করে তাঁর সঙ্গে কথা বলছে না লিপিকা। 
সোশ্যাল মিডিয়ায় সোমবার সকাল থেকে বিকেল, যখন রমরম করে ছড়িয়ে পড়েছে অনন্ত–র ধর্ণার ভিডিও। তখন সবাই আকুল হয়ে ভাবছে, কেন যে এই সেলুলয়েড সুলভ গল্পে নায়িকার মানভঞ্জন হচ্ছে না। দেদার আকুতি, সমর্থন, সব আছড়ে লুটিয়ে পড়ছে অনন্তর পায়ের কাছে। আর ওই মেয়েটি?‌ কী ভাবছে লিপিকা?‌
না, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সে কথা জিজ্ঞাসা করার মতো সময়টুকুও নষ্ট করতে চায়নি। মন্তব্য ফাজলামি মেরে দেওয়া যায়, কিন্তু যখন তা ব্যাধি, যখন তা এমন সামাজিক অসুস্থতা যা মুহূর্তে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে অনেক অঙ্ক পাল্টে দিতে পারে, তখন তা নিয়ে ফাজলামি চলে না। তাই আমি সিরিয়াস, রাগ হচ্ছে আমার। 
লিপিকার বয়স কত?‌ কেন একজন পুরুষকে যে কোনও কারণেই হোক প্রত্যাখ্যান করার পরেও তাঁকে বিবাহের মতো এক সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে মেনে নিতে হবে?‌ শুধু মাত্র পুরুষ ইগোকে প্রাধান্য দেওয়ার তাগিদে?‌ 
আসলে এমনটাই হয়, এমনটাই হয়ে এসেছে। শেষ পর্যন্ত অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় নারীকেই, আর পুরুষ অপরহণ করে বিবাহ করে, তাতে নারী আনন্দে থাকতে বাধ্য। না হলে শেষ পর্যন্ত ‘‌জওহর’। কে সে?‌ 
বামপন্থীদের পলিটব্যুরোয় একমাত্র বৃন্দা কারাত, ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জি। দেশের একমাত্র মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিল। পুরুষ, পুরুষ, সর্বত্র, একা, একাধিপত্ব। তারিয়ে তারিয়ে চিকেন সালামির মতো উপভোগ করে আসমুদ্র হিমাচল ভারত। 
তাই ফিরিয়ে দেওয়ার পরেও, কেবল মাত্র পুরুষ ইগোয় ধাক্কা খেয়ে মুখ নীচু করে সিঁদুর পড়তে হয় লিপিকাকে। কাঁধের উপর হাত রাখে নব বিবাহিত স্বামী, ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় সে। তবু সমাজ উলু দেয়, শঙ্খ বাজায়। 
এটাই বিভৎস উদযাপন প্রণয়ের?‌ তাই মনে হচ্ছে উদগ্র, শিক্ষিত, আধুনিক বাঙালির?‌ নাকি এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পৈশাচিক ‘‌ইগো স্যাটিসফ্যাকশান’‌ এর উল্লাস। 
পাঁঠা বলির সময় কেন জোরে জোরে ঢাক বাজে জানেন?‌ জানেন কেন সতীদাহ প্রথার সময় হাজার ঢাক ঢোল নিয়ে বামুন মোড়লের দল এসে হাজির হত?‌ যাতে আর্তনাদ শোনা না যায়। আমি জানি না, লিপিকা কী ভাবছে। সম্পর্কের প্রতি ওঁর সামান্যতম অনিচ্ছাও যদি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ‘‌ভিকট্রি ল্যাপে’‌ চাপা পড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তা গনপিটুনির থেকেও ভয়ঙ্কর এক পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করছে। 
রবিবার রাতে প্রেমিকার বাড়ির সামনেই রাস্তায় মশারি টাঙিয়ে রাত কাটিয়েছে অনন্ত। সোমবার সকাল থেকেই প্রেমিক অনন্তকে দেখার জন্য দূর–‌দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমায় সেখানে। প্রেমিক অনন্তর এই নাছোড় মনোভাব দেখে সোমবার সন্ধেয় এগিয়ে আসেন ধূপগুড়ি পুরসভার স্থানীয় কাউন্সিলর। সমস্যা সমাধানে আসরে নামেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। শুরু হয় দু–‌‌পক্ষকে নিয়ে আলোচনা। শেষে সোমবার রাতের দিকে অনন্ত ও লিপিকার বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। খুশি প্রেমিক–‌প্রেমিকা দুজনেই?‌ জানি না।
তাই রাগ হচ্ছে আমার।    ‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top