সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: ‘‌আরও ‌অগ্রসর হওয়া উচিত কি না ভাবছি— ইতিমধ্যে আলোটা যেন হঠাৎ নিভে গেল, কিন্তু পর মুহূর্তেই আবার দপ ক’‌রে জ্বলে উঠল। ‌‌.‌.‌.‌ভয়ে আমার গা ছম্‌ছম্‌ করছিল বটে, কিন্তু তবুও যেন কেন মনে হচ্ছিল— ওটা ভৌতিক ব্যাপার নয়, অন্য কিছু একটা হবে। ‌.‌.‌.‌ স্নিগ্ধ নীলাভ আলোতে আশেপাশের ঘাস–‌পাতাগুলি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কর্তিত একটা গাছের গুঁড়ি থেকে আলো নির্গত হচ্ছিল। সমস্ত গুঁড়িটাই জ্বলে জ্বলে যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। .‌.‌.‌.‌গুঁড়িটার অনেকটাই পচে গেছে। .‌.‌.‌.‌গুঁড়িটার গা থেকে আলো বিকিরণকারী কতকগুলো কাঠের কুচি সংগ্রহ করে অক্ষত দেহে পাঁচীর মা–‌র ভিটে থেকে ফিরে এলাম।’‌ 
১৩২৬–‌এর পৌষ মাসের ‘‌প্রবাসী’ পত্রিকায় (‌ডিসেম্বর, ১৯১৯)‌ প্রকাশিত ‘পচা গাছপালার আশ্চর্য আলো বিকিরণ করবার ক্ষমতা’‌ নামে এই লেখাটার চোখ পড়ে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর। জগদীশচন্দ্রের জহুরি–‌চোখ চিনতে ভুল করেনি ‘‌না–‌কাচ কাটার হীরে’‌—সত্যানুসন্ধানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে। তাই বসু বিজ্ঞান মন্দির–‌এর গবেষণার কাজে তিনি গোপালচন্দ্রকে ডেকে নিলেন স্নেহভরে— ‘‌যদি আমার এখানে আসতে চাও তবে অনেক কিছু শিখতে পারবে।’‌
এভাবেই গবেষণায় সুযোগ এল (‌১৯২১)‌  অনুসন্ধিৎসু, নিষ্ঠাবান অথচ অর্থ ও উচ্চ শিক্ষায় অভাবী প্রকৃতিগবেষকের। হ্যাঁ, গোপালচন্দ্র এই নিযুক্তির মর্যাদা রেখেছিলেন তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। ১৯৩০–‌এর দশক থেকে গোপালচন্দ্র ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেন প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে। বস্তুত ভারতে প্রাণী মনস্তত্ত্ব বা ‘‌ইথোলজি’‌–‌র অগ্রপথিক তিনিই।
গোপালচন্দ্রের জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার লোনসিংহ গ্রামে, ১৮৯৫ সালের ১ আগস্ট। আজ তাঁর ১২৫তম জন্মদিবস। গোপালচন্দ্রের বয়স যখন পাঁচ, তখন তাঁর বাবা মারা গেলে, চরম আর্থিক অনটনে পড়ে পরিবার। ১৯১৩ সালে গ্রামের লোনসিংহ স্কুল থেকে মেধাবী গোপালচন্দ্র জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯১৩–‌১৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে আইএ পড়েন। আর্থিক কারণে পড়া অসমাপ্ত রেখেই তাঁকে পণ্ডিতসার স্কুলে সহকারী শিক্ষকের কাজ নিতে হয়। পণ্ডিতসার ও লোনসিংহ স্কুলে শিক্ষকতা (‌১৯১৫–‌১৯)‌ করার সময় তিনি ছাত্রদের নিয়ে গাছপালা সম্বন্ধে সাধ্যমতো পরীক্ষা–‌নিরীক্ষায় মেতে থাকতেন। কৃত্রিম উপায়ে ফুলের পরাগসঙ্গম ঘটিয়ে সংকর উদ্ভিদ তৈরির চেষ্টা, কলমের সাহায্যে একই গাছে দুই–‌তিন রকমের ফুল উৎপাদন করা ইত্যাদি ছিল পরীক্ষার বিষয়। এরকম একটা সময়ে, এক বর্ষার সন্ধ্যায় স্কুল বোর্ডিংয়ের আড্ডায় ভূতের গল্প নিয়ে তর্কের প্রসঙ্গে ‘‌পাঁচির মা’‌–‌র ভিটেয় গিয়ে সংগ্রহ করে এনেছিলেন তথাকথিত ভৌতিক আলোর উপকরণ সূত্র। ‌
ছেলেবেলা থেকেই পিঁপড়ে, মাকড়সা, প্রজাপতি প্রভৃতি কীটপতঙ্গের স্বভাব, জীবনযাত্রা প্রণালী, বসতি ইত্যাদি বিষয়ে জানবার ব্যাপারে গোপালচন্দ্রের কৌতূহল‌ ছিল অপরিসীম। আর হয়তো তাই তাঁর মৌলিক গবেষণা ছিল প্রধানত মাকড়সা, পিঁপড়ে, প্রজাপতি, শুঁয়োপোকা, মাছ ও ব্যাঙাচি নিয়ে। পথেঘাটে যেখানে তিনি যেতেন, সব জায়গায় তাঁর তীক্ষ্ণ কৌতূহলী দৃষ্টি পড়ত। পোকামাকড়েরা কোথায়–‌কী করছে, কী খাচ্ছে প্রভৃতি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষণাগারে স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি ক‌রে তার মধ্যে তিনি মাকড়সা, পিঁপড়ে, প্রজাপতি প্রভৃতি প্রতিপালন করে এদের ওপর পরীক্ষা–‌নিরীক্ষা চালাতেন। 
জীববিজ্ঞানী হিসাবে তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বিস্তীর্ণ। জৈবদ্যুতি (‌বায়োলুমিনিসেন্‌স)‌ দিয়ে যার শুরু। অবশ্য তাঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ জলের মাকড়সা নিয়ে (‌১৯৩১)‌। সে সময় ‌আমেরিকান মিউজিয়ম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি সারা পৃথিবীর মাকড়সা সম্বন্ধে বিবরণ সংগ্রহ করছিল। গোপালচন্দ্র মেছো–‌মাকড়সার ওপর সুদীর্ঘ পর্যবেক্ষণ করে দেশি ও বিদেশি ‌(‌আমেরিকান মিউজিয়ম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির‌ জার্নাল– ‌ন্যাচারাল হিস্ট্রি, ১৯৩৬)‌ পত্রিকায় প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। 
গোপালচন্দ্রের তিনটি গবেষণার কাজ আন্তর্জাতিক স্তরের প্রথম সারির। একটি হল— নালসো পিঁপড়ের (‌একপ্রকার গেছো পিঁপড়ে)‌ প্রজাতি নির্ণয় সংক্রান্ত, অপরটি— কুমোরে পোকা ও কানকোটারি পোকার সহজাত অপত্যস্নেহ বিষয়ক এবং আর একটি— ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙের রূপান্তরে পেনিসিলিনের ভূমিকা নিয়ে। গোপালচন্দ্রের অন্যান্য গবেষণা কাজের মধ্যে পিঁপড়ের রণকৌশল, মাকড়সার লড়াই, শুঁয়োপোকার মৃত্যু অভিযান, পিঁপড়ের প্রণয়লীলা, ভীমরুলের রাহাজানি, কীটপতঙ্গের বাজনা, নেউলে পোকার জন্মরহস্য, কীটপতঙ্গের শিল্পনৈপুন্য উল্লেখযোগ্য। 
বোম্বে ন্যাচালার হিস্ট্রি সোসাইটি, আমেরিকার সোয়ান্টিফিক মান্থলি ও ন্যাচালার হিস্ট্রি ম্যাগাজিন, কলকাতার সায়েন্স অ্যান্ড কালচার ও বোস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ট্র‌্যানজাকশন–‌এ তাঁর ২২টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় (‌১৯৩১–‌৫৮)‌।
‌প্রাণীর আচরণ–‌স্বভাব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জীববিজ্ঞানের ‘‌ইথোলজি’‌ শাখায় গোপালচন্দ্র একজন পথিকৃত বিজ্ঞানী হিসেবে সমাদৃত হওয়ার দাবিদার। 
গোপালচন্দ্রের কাজের আর একটি দিক বাংলায় বিজ্ঞান–‌সাহিত্যচর্চা। ভাবলে অবাক হতে হয়, গোপালচন্দ্র তাঁর কর্মজীবনে আটশোর মতো বিজ্ঞান প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এগুলো প্রকাশিত হয়েছে— প্রবাসী, কাজের লোক, বঙ্গশ্রী, উদয়ন, মন্দিরা, পথ, নবারুণ, প্রকৃতি, জ্ঞান ও বিজ্ঞান, দেশ, সন্দেশ, নূতনপত্র, শিশুসাথী, অণ্বেষা, যুগান্তর, আনন্দবাজার পত্রিকা, অলোকার মতো পত্র–‌পত্রিকাতে। কীটপতঙ্গ, পশুপাখি ছাড়াও আবিষ্কারমূলক, উদ্ভিদ বিষয়ক ও বিজ্ঞানের সংবাদমূলক ছোটবড় ২২টি বই তিনি লিখে গেছেন। আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রতিষ্ঠিত (‌১৯৪৮)‌ বিজ্ঞান পরিষদের সঙ্গে শুরু থেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত গোপালচন্দ্র আজীবন জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার সম্পাদক, প্রধান সম্পাদক ও প্রধান উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করেছেন। সুদীর্ঘকাল তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কার্য–‌নির্বাহক সমিতির সহ–‌সভাপতি ও বিশিষ্ট সভ্য থেকেছেন।
গোপালচন্দ্র ১৯৫১–‌তে ফ্র‌্যান্সের প্যারিস শহরে অনুষ্ঠিত সামাজিক পতঙ্গ বিষয়ক আলোচনাসভায় ভারতীয় শাখা পরিচালনার জন্য আমন্ত্রিত হন;‌ ১৯৬৮–‌তে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার;‌ ১৯৭৪–‌এ আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু স্মৃতিফলক;‌ ১৯৭৫–‌এ ‘‌বাংলার কীটপতঙ্গ’‌ গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার;‌ জীবনের প্রান্তে (‌জানুয়ারি, ১৯৮১)‌ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি (‌সম্মানিক‌) ডিগ্রি প্রদান করে। 
১৯৮১ সালের ৮ এপ্রিল ৮৬ বছর বয়সে গোপালচন্দ্রের জীবনাবসান হয়। ‌
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে দুটি কারণে বিজ্ঞানচর্চার পরিসরে আলোচিত হবেন— প্রথমত‌ প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর গবেষণা–‌কাজ আন্তর্জাতিক মানের;‌ দ্বিতীয়ত:‌ বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যে মননশীল অবদান তথা যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারে তাঁর জীবনব্যাপী নিরলস প্রয়াস।
(‌অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, বেলগাছিয়া)‌

জনপ্রিয়

Back To Top