ডাঃ গৌতম খাস্তগীর—  লিভিং উইল বা প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া আমার সুপার–‌স্পেশালিটির সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। পেশাগত ভাবে আমি চিকিৎসার যে শাখায় আছি তাতে জড়িয়ে আছে নতুন প্রাণের আবাহন বা শিশুর জন্ম। সেখানে জীবনের অন্য দিক নয়, সরাসরি ‘জীবন’‌‌ই যুক্ত। তবু চিকিৎসা জগতে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত মতামত হল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় বা মানুষের জীবন এমন পর্যায়ে চলে যেতে পারে যখন জীবনকে অযথা টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ হয় না। তাতে আক্রান্ত মানুষটি যেমন কষ্ট পান, তেমনি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও জেরবার হয়ে পড়েন। অথচ সেই আক্রান্ত মানুষ কথা বলার অবস্থায় থাকেন না। কথা বলতে না পারলেও তাঁর চোখের দৃষ্টি বা অন্য কিছু দিয়ে কিন্তু বোঝা যায় যে তিনি সত্যিই আর বাঁচতে চাইছেন না। কারণ, তাঁর কাছে বেঁচে থাকাটা তখন এক বিড়ম্বনা এবং সার্বিক অত্যাচার। আমি আমার এক কাকার কথা বলতে পারি, জীবনের শেষ ১৮ মাস উনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কথাবার্তা বলতে পারতেন না, ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকতেন। ক্যাথেটার পরিয়ে তাঁকে শুইয়ে রাখা হত। শরীর শুকিয়ে একেবারে বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত কাকা মারা যান, কিন্তু এই শেষ কয়েক মাস তাঁর বেঁচে থাকাটা ছিল অর্থহীন। কাউকে মেরে ফেলার অধিকার আমাদের নেই। ঈশ্বর বা প্রকৃতি যেমন জীবন দিয়েছেন, মৃত্যুও তাঁরই দেওয়া। তবু এইরকম বিশেষ পরিস্থিতির বিচারে বাড়ির লোক, ডাক্তার এবং কোনও নিরপেক্ষ সংস্থা যদি ঠিক করে এই মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার নেই, তা হলে সেটা এক অর্থে ভাল উদ্যোগ। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এটাই বলা হয়েছে। মৃত্যুর প্রহর গুনছেন এমন রোগীর ক্ষেত্রে আগে পরিবারের অনুরোধে অনেক সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার সাহায্য নিতেন না এমন নয়। সেটাই এবার আইনি স্বীকৃতি পেল। অন্যদিকে, জীবনের গুণগত মান সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে কেউ যদি আর বাঁচতে না চান, তবে তাঁর মৃত্যুর ইচ্ছাকেও সম্মান জানানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে এতে। আমার মতে উচ্চ ন্যায়ালয়ের এই রায় খুবই ভাল। যদিও অত্যন্ত বিবেচনা করে এর প্রয়োগ করা দরকার। শুধু রোগী, বাড়ির লোক বা ডাক্তার নন— কোনও নিরপেক্ষ সংস্থাকে এর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। তারাই বিবেচনা করবে এটা করা উচিত, কী উচিত নয়। এই সংস্থায় আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় গুরু, নিরপেক্ষ চিকিৎসক কিংবা সমাজকর্মী থাকতে পারেন। আদতে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল এবং এর সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে। তাই এক কথায় এর উত্তর নেই। শেষে শুধু একটা কথা জানাই, এই বিষয় নিয়ে হইচই হচ্ছে ঠিকই তবে, এই জাতীয় রোগীর সংখ্যা কিন্তু খুব বেশি নয় কারণ, এটা এক অতি–বিরল পরিস্থিতি। যেমন হয়েছিল মুম্বইয়ের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালের নার্স অরুণা শানবাগের ক্ষেত্রে। ৪২ বছর ‘‌ভেজিটেটিভ’‌ বা নির্জীব অবস্থায় তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। হাসপাতালের এক কর্মী গলায় কুকুরের চেন বেঁধে তাঁর ওপর অমানবিক শরীরী অত্যাচার চালান। মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় অরুণার।‌‌ সে বাঁচা কি অনাবশ্যক, প্রলম্বিত অত্যাচার নয়?‌ এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি সুস্থ মানসিকতার কোনও মানুষই চাইবেন না।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top