ডাঃ ইন্দ্রজিৎ রায়- বিশ্বব্যাপী ভারতীয় চিকিৎসক অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে খ্যাত। সম্প্রতি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি স্টাডি জানাচ্ছে, আমেরিকায় ভারতীয় ডাক্তারদের হাতে সবচেয়ে কম মানুষ মারা যান। এটা একদিনে হয়নি, এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগেছে। এতদিন দেশের সেরা ছাত্ররা এই শিক্ষা নিতেন। বেসরকারি কর্পোরেটদের হাতে চিকিৎসক তৈরির ক্ষমতা দিয়ে কম মেধার ছাত্রদের পড়ার সুযোগ করার পর এই পেশা গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে। সর্বনাশ রুখতে সুপ্রিম কোর্ট সর্বভারতীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তির আদেশ দিয়েছে। আর তার পরেই ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিল বিলের খেলা শুরু হয়েছে। এ আসলে মেধা বনাম টাকার লড়াই। বেসরকারি কলেজের ওপরে মেডিক্যাল কাউন্সিলের যে নিয়ন্ত্রণ ছিল, এই বিলে তা তুলে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে এই কলেজগুলি এর পর নিজেদের মতো করে সব কিছু করে নিতে পারবে। আরও মারাত্মক হল, এদেশে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ না পেয়ে শুধু অর্থ থাকার কারণে যে সব নিম্নমেধার ছাত্রছাত্রী ভিন দেশ থেকে ডাক্তারি পড়ে আসবে, তারা নাকি এদেশে চিকিৎসা করতে পারবে। অথচ দেশের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ডাক্তারি পাস করবে যারা, তাদের এক্সিট পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তারি করতে হবে। সর্বনাশের এখানেই শেষ নয়, আয়ুষ (আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিওপ্যাথি, সিদ্ধা ইত্যাদি) পর্যায়ভুক্ত পাঠ্যক্রমে যাঁরা ডাক্তার হয়েছেন, তাঁরা নাকি ছোট ব্রিজ কোর্স করে এম বি বি এস-‌দের সমতুল্য ডাক্তারি করবেন। ভেবে দেখুন এর পর থেকে ব্রেন টিউমারের অপারেশন করতে পারবেন একজন ইউনানি ডাক্তার!‌ আমরা কি তবে পিছিয়ে যাব? সরকারি হাসপাতালে কি এরপর গোমূত্র সেবন করতে দেওয়া হবে? গ্রামে গ্রামে হাতুড়েদের ছড়িয়ে দিয়ে বলা হবে, কতই না ডাক্তার দেওয়া হল! রাজনীতির লোকেরা তো আর তাঁদের কাছে যাবেন না, তাঁদের বিদেশ আছে। তাঁরা জার্মানি, ভিয়েনা, ইউ এস এ নয়তো সিঙ্গাপুর যাবেন। সমস্যা হবে সাধারণ মানুষের। আসলে এ সব স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের ব্যর্থতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। স্বাধীনতার পর থেকে চরম উপেক্ষার কারণে স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি হয়েছে সবচেয়ে কম, স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ হয়েছে ন্যূনতম। সংসদে বসে আইন তৈরি করতে কোনও যোগ্যতা লাগে না। অভিযুক্ত ডাক্তারদের লাইসেন্স বাতিল হয়, অথচ হাজার অপরাধ করেও সাংসদ, বিধায়কেরা দিব্যি দেশ চালান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেডিক্যাল কাউন্সিল আছে, যা ডাক্তাররা পরিচালনা করেন। যে বিল আসতে চলেছে, তাতে মেডিক্যাল কাউন্সিলের সিংহভাগজুড়ে থাকবেন সরকার মনোনীত আমলা ও রাজনীতিবিদ। চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, আইন-কানুন, চিকিৎসা পাঠ্যক্রম ঠিক করবেন এঁরাই। হতে পারেন তাঁরা দক্ষ ও সৎ, কিন্তু চিকিৎসা বিষয়ে তো তাঁদের জ্ঞান নেই। বর্তমান মেডিক্যাল কাউন্সিলকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হচ্ছে। তা এ দেশে কোনটা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়? প্রতিরক্ষা নিয়ে হামেশা দুর্নীতির কথা শোনা যায়, তা হলে কি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সেনাপ্রধানদের জায়গায় রাজনীতিক ও আমলাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হবে? পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের দুর্নীতি রোধে ইঞ্জিনিয়ারদের পরিবর্তে আমলারা ব্রিজ তৈরি করবেন? একটি জানালায় ঘুণ ধরলে গোটা ইমারতটিকে ভেঙে না দিয়ে জানালাটিকে বদলালেই যে চলে সে বুদ্ধিটুকুও কি এঁদের নেই? একটা পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, ক্ষমতার সঙ্গে অজ্ঞতা মিশলে বিচারের সর্বনাশ হয়। আর ভারতে এর চেয়ে বড় সর্বনাশ আগে হয়নি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top