স্বপ্নময় চক্রবর্তী: খরচাপাতি কীরকম লাগবে?‌ কথাটা এমন করে বললেন যেন কোনও কচ্ছপ খোলার ভিতর থেকে মাথাটা বের করল সন্তপর্ণে।
দেখুন বাচস্পতি মশাই, বলে থামলেন লালমোহন। আচ্ছা আপনাকে কী নামে ডাকা যায়?‌
অনঙ্গমোহন বললেন— আমি বাচস্পতি না। যজমানিও করি না। আমি টোলের পণ্ডিত ছিলাম। সে জীবন বিগত। আমি কাব্যপাঠ করেছি, ব্যাকরণ.‌.‌.‌। আমাকে যা অভিরুচি ডাকতে পারেন।
— তবে শুধু পণ্ডিত মশাইটাই ভাল, কী বলেন?‌ কইতেছিলাম কী পণ্ডিত মশয়, বহুত লড়াই, কাইজ্যা, ল্যাখালেখি কইরা কোনও মতে আছি। অনেক ঝামেলা আমরা সহ্য করছি অলরেডি। আপনে পাইতাছেন রেডিম্যাড জমি। কিন্তু কাগজপত্র পাইবেন না। কাগজপত্র সবাই যখন পাইবে, আপনেও পাইবেন। কয়েকজনের দখলে বেশি জমি আছে। সাড়ে চার কাঠা করে প্রতি পরিবার দখলে রাখতে পারবে। অতিরিক্ত জমি ছেড়ে দিতে হবে। এই জমি অন্য উদ্বাস্তু পরিবারকে দেয়া হবে। যে পাবে, সে কমিটিকে কিছু টাকা দেবে। আর যার থেকে জমি নেয়া হচ্ছে, তাকেও কিছু দিতে হবে। এতদিন ধরে তো সেই আগলে রেখেছে জমিটুকু, গাছপালা লাগিয়েছে। তবে দিলেই আমাদের কমিটি ঠিক করেছে বেশি টাকা দিলেই যাকে তাকে জমি দেয়া হবে না। লোক বুঝে দেব। আমাদের দরকার এখন দু’‌ঘর চক্কোত্তি কিংবা ভট্টার্জ বাঁওন, আমরা বাইরের বাঁওন আনব না। আর দরকার ভাল ইংলিশ জানা লোক। অনেক রকম দরখাস্ত লিখতে হয় আমাদের। দু’‌একটা গানের মাস্টার পেলে ভাল হয়। উকিল যদি পাই.‌.‌.‌। উকিল কেন এমন কলুনিতে আইবে, মুহুরি পাইলেও চলে। আর দরকার ডাক্তার। পাস করা ডাক্তার কই পামু?‌ ক্যান আইবো কলুনিতে, হোমিও হইলেও চলে। দ্যাবনাথবাবু টুকটাক হোমিওপ্যাথি জানে। তবে আরও দরকার। আমরা চাই কলুনিডা যেন এক্কারে.‌.‌.‌ কী করা য্যান.‌.‌.‌ স্বয়ংসম্পূর্ণ হইয়া উঠে। আপনে আয়েন। অনঙ্গমোহন বলেন— কিন্তু কত টাকা ব্যয় করতে হইবে, সেই আভাস তো পাইলাম না তেমন.‌.‌.‌।
‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌—না–‌না, তেমন কিছু না। কমিটিকে আঠারোশো টাকা। আর যাদের দখলে ছিল জমি, যারা জমি পালছে এতদিন, গাছটাছ লাগাইয়াছে, তাদের তিনশো তিনশো ছয়শো, ব্যাস। অনঙ্গমোহন হিসেব কষেন। আঠারো–‌ছয়ে চব্বিশ। দালাল দুইশোর কমে কি ছাড়বে?‌ আড়াইশো। দর্মার বেড়া টালির চালের ঘর করলেও আরও দুই। চারি সহস্র অষ্টশত। উঃ। অসম্ভব।
কোথায় পামু এত টাকা?‌ হতাশ গলায় বললেন অনঙ্গমোহন।
কমিটি মিটিংয়ে রেজুলিশন নিছে আঠারোশো ডোনেশন নিবে, কলুনির উন্নতির জন্য কাজে লাগাবে। সুতরাং কম করার কেপাসিটি আমার নাই পণ্ডিতমশয়। টাকা জোগাড় করেন। দু–‌একশো কম পড়লে আমি দিয়া দিমু। আসলে লোকের তো অভাব নাই, বর্ডার পার হওয়ন চলতাছেই। কিন্তু কইছি না, যারে–তারে বসামু না।  এমন লোক বসামু, যারে দিয়া কলুনির উন্নতি হয়। 
একটু মাথা ঘুরে ওঠে। ঘর দুলছে, গৌর নিতাই ঘুরে যাচ্ছে, হরেন ভৌমিক ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে ফেলেন অনঙ্গমোহন। চার সহস্র অষ্টশত মুদ্রা?‌ এক মন চাউল এখন ছত্রিশ টাকা। বত্রিশেও পাওয়া যায়।  তেরো আনা–চৌদ্দ আনা সের। 
এক সের সরিষার তৈল তিন টাকা সাড়ে ছয় আনা অর্থাৎ দু’‌টাকা চল্লিশ পয়সা কেজি। পোনা মৎস্য পাঁচ টাকা কেজি। চাউল ছাড়া সারা মাসে বাজার খরচ আশি টাকা। মোটা ধুতি নয় টাকা জোড়া। বাড়ি ভাড়া–সহ দেড়শত টাকায় সারা মাস চলে। চতুষ্পাঠীর সরকারি অনুদান ছাত্রহীনতার কারণে বন্ধ। নিজের রোজগার বলতে ছিল চা–দোকান। নিজস্ব তহবিলে পাঁচশতর বেশি টাকা নাই। আমি কি মহাপাতক?‌ ‘‌নির্ধনতা প্রকামমপরং ষষ্ঠং মহাপাতকম।’‌ ব্রহ্মহত্যা, বিমাতাগমন, চৌর্যবৃত্তি এমন পাঁচটি কারণে মহাপাতক হবার কথা বলেছিলেন মনু। নির্ধনতা ষষ্ঠ কারণ। আমি মহাপাতক। আশ্রয়টুকুও ছাড়তে হবে। কোথায় যাব হে মাধব!‌ বরং বনং। তৃণানিশয্যা, বসনঞ্চ বল্কলং। তবে আমার বধূমাতা?‌ নাতনি স্বপ্না?‌ চতুর্দিকে নর–‌কুক্কুর। হা যৌবন!‌ ধিক যৌবন। আমি কী করব। হে বিধাতা অবিবেকী। আমায় উপায় বল। কিতা কর্তাম, কিতা কর্তাম রে!‌.‌.‌.‌
আপনার শরীর খারাপ লাগছে পণ্ডিতমশাই?‌ কী হয়েছে?‌ এলিয়ে পড়েছেন কেন?‌
চোখ খোলেন অনঙ্গমোহন। কেউ পাখার বাতাস করছে।
অনঙ্গমোহন বলেন— না, ও কিছু না। আবার চোখ বুজলেন। 
আসলে তিনি ভেবেছিলেন সব নিয়ে হাজারখানেক টাকা খরচ করলেই জমিটুকু হয়ে যাবে। ৫২/‌৫৩ সালে শ’‌তিনেক খরচ করতে পারলেই জমির দখল পাওয়া যেত। আর যারা নিজেরাই একজোট হয়ে কষ্ট এবং হাঙ্গামা সহ্য করে দখল করেছিল, ওদের এই খরচটুকুও করতে হয়নি। তখন কেন দখল করা জমির কথা ভাবেননি?‌
মোহ?‌
কীসের মোহ?‌
কলের জলের মোহ, বিদ্যুতের আলো, পাকা রাস্তা, শহুরে জীবন.‌.‌.‌।
যেটা সহজেই পাওয়া গিয়েছিল, সেটা আঁকড়ে বসে থাকা ভুল হয়েছিল?‌
তখন কেন ধুবুলিয়া অশোকনগরে গিয়ে নাম লেখাননি, কেন করজোড়ে অকল্যান্ডের রিফিউজি ত্রাণদপ্তরে গিয়ে প্রার্থনা করেননি— হে, রাজ–‌আমাত্য, কৃপা কর। এখন কোন হট্টমন্দিরে যাবেন অনঙ্গ?‌
নিজেকে প্রবোধ দেন অনঙ্গ। কল্পনায় ওঁর পিতার স্বপ্নেই হস্তসঞ্চালন দেখতে পান। বৃথা বিলাপে কিবা ফল অনঙ্গ?‌
নির্বাণদীপে কিমু তৈলদানং?‌ পয়োগতে কিং সেতুবন্ধঃ?‌‌ নির্বাপিত দীপে তেল দিয়া কাম কী!‌ জল শুকাইয়া গেছে গিয়া, আর সেতু দিয়া কী হইব?‌ অল্পে কাতর হওয়া বিদ্বানের শোভা পায় না। গতস্য শোচনং নাস্তি। দুশ্চিন্তা করিও না অনঙ্গ, চিতা দহতি নির্জীবং, চিন্তা দহতি জীবনম্‌। চিতা নিষ্প্রাণকে দহন করে, চিন্তা জ্যান্ত পোড়ায়। পথ ঠিকই নিষ্কান্ত হবে। দেখ, স্রোত কোথায় নিয়া যায়— তুমি নিজেকে জলের কচুরিপানা জ্ঞান কর। স্রোত তোমারে ঠিকই ঠেকাইব কোথাও।
—কী কও পিতা?‌ তবে কি পুরস্কার বৃথা?‌ আমার নিজের কিছুই করণীয় নাই?‌
—কী কও অনঙ্গ?‌ পুরস্কার?‌
তরঙ্গগতি ঠেকাইবা কেমনে? গান্ধীজি দ্যাশ ভাগ ঠেকাইতে পারছিলেন নি?‌ পারেন নাই। কালস্রোতে নিজেরে ভাসাইয়া দাও। পারবানা? তোমার হাল নাই, দাঁড় নাই, তুমি কচুরিপানা। না, তোমার মস্তিষ্কটুকুও নাই। কর্পূরের মতো বাতাসে বিলীন.‌.‌.। 

 

এবার একটু সুস্থ বোধ করছেন পণ্ডিতমশাই?‌ সকালবেলা খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়েছিলেন তো?‌ হরেন ভৌমিক বেশ উদ্বিগ্ন। 
অনঙ্গমোহন চোখ খুলে বললেন— তেমন কিছু না, হঠাৎ যেন পিতার সাক্ষাৎলাভ হ‌ল। থাক। এবার চলেন যাই। আপনার অনর্থক কষ্ট হ‌ল। আমার কাছে খুব কম টাকাই আছে। এখানে আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
লালমোহন সাহা বললেন— চা কি খাবেন একটু?‌
অনঙ্গ ঘাড় কাত করলেন। চা পান করতেন না। দেশে থাকতে কদাচ নয়। চা কী পদার্থ ধরণাই ছিল না। পরে ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে হয়েছে। এটা তো ভেষজ। পত্র। খারাপ কিছু নয়।
লালমোহন সাহা বললেন— ‘মাসখানেক সময় নেন, একটু চেষ্টা দিয়া দেখেন, কিছু কম পড়লে নয় আমরা দুই তিনজনে কিছু হাওলাত দিতে পারি, এখানেই থাকবেন যখন শোধ দিয়া দিবেন।  আপনার পুত্রবধূ তো চাকরি করে। 
বাড়িতে একটা আলোচনাসভা বসল। বিলু বলল, ঘর ছাড়তে বললেই ছাড়তে হবে নাকি। অনঙ্গমোহন বললেন, কথা দেয়া হয়েছে ছেড়ে দেব। দুই মাস সময় চাইতে পারি, কিন্তু ছাড়তেই হইব। স্বপ্নার কোনও মতামত নেই। ওর স্বামীর অকালমৃত্যুর পর ও বড় চুপচাপ থাকে। স্বপ্না একবার বলল, ওর দেয়া হারটা আছে, লাগলে বোলো। অঞ্জলি বলল, আমারও সামান্য আছে, দু–‌আড়াই ভরি হবে।
অনঙ্গমোহন একা একা বস্তি অঞ্চলে ঘোরেন, বাড়ির কাছেই জেলেপাড়ার বস্তি। এখানে বেশ কিছু ঘর বিহারের লোক। উৎকল দেশীয় কয়েকটি ঘর আছে। জেলে সম্প্রদায়ের লোক আর বেশি নেই। বাইরে দু–চারটি জলের কল। একজন পৃথুলা রমণী মগে জল নিয়ে জল ঢালছে গায়ে। সিক্তবসন। কন্যা ও পুত্রবধূকে কি এইভাবে স্নান করতে হবে?‌
একটি বটগাছের তলায় তাস খেলা চলছে। কিছু খুচরো পয়সা সবার সামনেই। বোঝাই যায় দ্যূতক্রীড়া। একটা দড়িতে সায়া শাড়ি শুকোনো নিয়ে কলহ চলছে। রোদ তুই একাই লিবি?‌ কাপড় না সরালে আমি টেনে ফেলে দেব। এর উত্তরে অন্য রমণী চিৎকার করে— টেনে ফেলে দিব, দেখি তোর কত মুরোদ শ্বশুরভাতারি। এরকম কুবাক্যবর্ষণের ভিতর দিয়ে হাঁটেন অনঙ্গমোহন। একটা ঘরের সামনের খাটিয়ায় এক কুষ্ঠরোগী। মাথার ওপরে ত্রিপলের আচ্ছাদন। অনঙ্গমোহনকে সে জিজ্ঞাসা করে, কাউকে খুঁজছেন?‌ অনঙ্গমোহন বলতে পারলেন না একটা ঘর খুঁজছি।
অঞ্জলি পরদিন বলল, চলুন, দেখে আসি, দমদম তো বেশি দূর নয়, আসছে রোববার যাওয়া যায়?‌ পছন্দ হলে ধারদেনা করে হয়েও যেতে পারে।
কত ধার নেওয়া সম্ভব, আবার পরিশোধও তো করতে হবে। অঞ্জলি ঠিক কত বেতন পায় অনঙ্গমোহনের জানা নেই। যদি মাসে পঞ্চাশ টাকা করেও পরিশোধ করে তিন হাজার টাকার দেনা শোধ করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কীভাবে শোধ করবে বৌমা?‌ এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ভয় হয়। বলে দেবে সে আমি বুঝব। কিংবা বলে দেবে রাস্তায় দাঁড়াব। অনঙ্গমোহন তো কম কথা শোনেননি। ঘরের মধ্যে অং বং না করে বাইরে করলেও তো কিছু আসে— ইত্যাদি কথা। গা কয়লা করে গেলাচ্ছি জাতীয় বাক্য অনেক শুনেছেন অনঙ্গমোহন। কতবার ভেবেওছিলেন, গঙ্গার ধারে গিয়ে দাঁড়াবেন। পথবেশ্যারা যেমন নিজের যৌবনলক্ষণ প্রদর্শন করে, তেমন নগ্নগাত্রে দেহের উপবীত শোভা প্রদর্শন করবে। শিখাসূত্র এবং নামাবলী প্রদর্শন করবে। নাপিতের কাছে গিয়ে ঘুরঘুর করবে। নাপিতরা জানে কোন বাড়িতে কার দেহান্তর ঘটেছে, ওরা ব্রাহ্মণের খোঁজ করে। আত্মাকে তুষ্ট করাবেন। যে আত্মা ক্ষুধা–তৃষ্ণার ঊর্ধ্বে, যাকে ছেঁড়া যায় না, পোড়ানো যায় না— নৈনন ছিন্দতি নৈনং দহতি, সেই আত্মাকে পিণ্ডি গেলাবেন। যারা গঙ্গায় স্নান করতে আসে, ওদের গঙ্গার স্নানমন্ত্র পড়াবেন, গঙ্গাস্তোত্র পড়াবেনো.‌.‌.‌ আত্মা ও ঈশ্বর নিয়ে খেলা এবং খেলার শেষে দক্ষিণা। বিষ্ণুদৈবতং ব্রাহ্মণায় ‌দক্ষিণামহং দদে.‌.‌.‌।

কিন্তু শেষ অব্দি পারেননি। মনে হয়েছে এসব প্রতারণা। যেটা নিজে বিশ্বাস করেন না, সেটা কী করে অন্যের জন্য করবেন?‌
পিতৃশ্রাদ্ধ কি করেননি অনঙ্গমোহন?‌ করেছেন তো। পুত্রশ্রাদ্ধও করেছেন। এটা প্রথা। সামাজিক রীতি। রীতির বিরুদ্ধে যাওয়া সামান্য অনঙ্গমোহনের অসাধ্য। বিশ্বাস থেকে করেননি। ভক্তিতে নয়। ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী নন অনঙ্গমোহন। উনি নাস্তিক নন। কিন্তু ঈশ্বর স্তবে তুষ্ট হন না। ঘৃত মধু ফল ফলাদি পরমান্ন এসব নিবেদন করে যারা সুখ পায় পাক, কিন্তু মাঝখানে ব্রাহ্মণ কেন?‌ সংস্কৃত মন্ত্র কেন?‌ ঈশ্বর কি সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষা বোঝেন না?‌ আল্লাহ যেমন আরবি ছাড়া বোঝেন না। তবে ঈশ্বর কী করে সর্বজ্ঞ?‌ এটাই তো কূট প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়ান অনঙ্গমোহন। কিন্তু এই জিজ্ঞাসা অন্নসম্পর্কহীন। কিন্তু অন্য আনন্দস্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু অর্ধাগ্রে অন্ন। অন্নচিন্তা চমৎকারা। সে কারণেই চায়ের দোকান করেছিলেন অনঙ্গমোহন। এখানে আত্মপ্রতারণা নেই। ■
ছবি: দেবব্রত ঘোষ

জনপ্রিয়

Back To Top