(ব্র‌্যাডম্যান থেকেরিচার্ডস, জর্জ হেডলি থেকে গাভাসকার— সবাইকে পেছনে ফেলে দিচ্ছেন। প্রতিদিন ভাঙছেন রেকর্ড। দেবাশিস দত্ত)

তুমি কেমন করে ব্যাট করো যে গুণী
আমরা অবাক হয়ে দেখি
কেবল দেখি, কেবল দেখি
তুমি কেমন করে ব্যাট করো যে গুণী‌.‌.‌.‌‌

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকলে হয়তো, বিরাট কোহলি সম্পর্কে নিজের লেখা কবিতার কয়েকটি শব্দ এদিক–‌ওদিক করে, এমনভাবেই লিখতেন। চলতি কথায়, আমরা ভাল কোনও কাজ হলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলতে শুরু করি, ‘‌জাস্ট ফাটিয়ে দিচ্ছে’‌। বিরাট কোহলি সেভাবেই, ক্রিকেট মাঠে আগুন জ্বালাচ্ছেন নিজের ব্যাট দিয়ে। বিপক্ষ বোলাররা যাচ্ছেন উড়ে। প্রতিদিনই ভাঙছেন রেকর্ড, একের পর এক। ডন ব্র‌্যাডম্যান থেকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, জর্জ হেডলি থেকে সুনীল গাভাসকার— সবাইকে পেছনে ফেলে দিচ্ছেন একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিমায়। হ্যঁা, রক্তমাংসের মানুষ বলেই নিজেকে চিহ্নিত করছেন। জেমস বন্ড যেমন বলতেন— মাই নেম ইজ বন্ড। আমাদের বিরাটও সেভাবেই কলকাতায় বলে গিয়েছেন, ‘মাই নেম ইজ বিরাট কোহলি। অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ রোবট।’‌ একই সঙ্গে বলেছিলেন, তঁার শরীরের চামড়া কাটলে রক্ত বেরোবে। কিন্তু যেভাবে তিনি একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছেন, তাতে তঁাকে, ইতিমধ্যেই অতিমানব মনে হচ্ছে। বিরামহীন গতিতে এগোচ্ছেন তিনি। সবাই যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখন তিনি ছুটে চলেছেন প্রতিদিন। এহেন বিরাট বলছেন, ‘‌আমাকেও ছুটি নিতে হবে। আমি তো আর রোবট নই। আমারও বিশ্রামের দরকার।’‌ সত্যিই দরকার। ক্লান্ত হয়েও আমরা দেখছি, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ইডেন ও নাগপুরে দুটো সেঞ্চুরি তুলে নিলেন। যা দেখে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেই ফেললেন, ‘‌প্রতিদিন সকালে উঠে যে ছবিগুলি বিরাট নিজের টুইটারে পোস্ট করে, সেখানে রয়েছে হয় ও ওজন তুলছে, নয়তো বুক ডন দিচ্ছে। নয়তো ট্রেডমিলে দৌড়চ্ছে। অ্যামেজিং। অফুরন্ত প্রাণশক্তি না থাকলে, বড় হওয়ার, আরও বড় হওয়ার আগুন না থাকলে এভাবে নিজেকে প্রতিদিন নিংড়ে নেওয়া যায় না। এভাবেই ও নিজেকে দুনিয়ার অন্যতম ফিট ক্রীড়াবিদ হিসেবে তুলে ধরছে। আই লাইক হিম। আই লাইক হিম ভেরি মাচ। একই সঙ্গে আমি ওর সততার কথা বলব। যা করছে, যেভাবে করছে, সেখানে কোনও রাখঢাকের ব্যাপার নেই। ইন্ডিয়া টিমের দায়িত্বে আছে যখন ও, তখন আমরা সবাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। এতটাই ভরসা করি বিরাটের ওপর। এতটাই ভালবাসি আমি ওকে।’‌
হ্যঁা, ভালবাসছে এখন বিরাটকে আসমুদ্র হিমাচল। প্রতিদান হিসেবে বিরাট কিন্তু ফিরিয়ে দিচ্ছেন শুধু যে রান, রেকর্ড, জয়, তা নয়। প্রতিদিন নিজেকে মানবিক হিসেবেও মেলে ধরছেন। তা না হলে কেউ কি এভাবে বলতে পারেন যে, তঁার স্মরণীয় মুহূর্ত এখনও আসেনি। কিন্তু যদি জোর করা হয়, স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি, তাহলে, বিরাট যা বলছেন, তা–‌ও এক স্মরণীয় উক্তি। ‘‌প্রতিদিন লাক্সারি বাসে চেপে মাঠে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে অপেক্ষমাণ জনতা যেভাবে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান, যে মানুষগুলি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করেন আমার সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য, শুভেচ্ছা জানানোর জন্য, সেগুলিই আপাতত আমার জীবনের আ হা মোমেন্টস। এ পৃথিবী সবাইকে সম্মান দেয় না। এ পৃথিবীর কিছু মানুষ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমাকে ভালবাসছেন, আমাকে শুভেচ্ছার ডালিতে ভরিয়ে দিচ্ছেন, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওনা।’‌ এভাবে কতজন সেলিব্রিটি বলতে পেরেছেন?‌‌
অবশেষে বিরাট ছুটি নিলেন। সামান্য ক’‌দিনের জন্য। কানাঘুষোয় শোনা গিয়েছিল, তিনি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তৃতীয় টেস্ট খেলবেন না। এবং নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন ৩টি একদিনের ম্যাচ থেকেও। ইডেন ও নাগপুরে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করার পর, তঁার হয়তো মনে হচ্ছে, ফিরোজ শা কোটলায় নিজের পরিচিত দর্শকদের সামনে আরও একটি সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারবেন। নিজের মুখে বলতে পারছেন না, শচীন তেন্ডুলকারের ১০০ সেঞ্চুরির দিকে তিনি এগোচ্ছেন। যতবার প্রচারমাধ্যম ওই প্রসঙ্গে ঢুকেছে, প্রত্যেকবার বিরাট বলে যাচ্ছেন, ‘‌আমি এখনও ওই রেকর্ড তাড়া করার কথা ভাবছি না।’‌ বলছেন না। কারণ, নিজের ওপর তিনি আর বাড়তি চাপ নিতে চাইছেন না। কিন্তু মনে মনে জানেন, এ ব্যাপারে মুখ খোলা মানে বিতর্ককে আহ্বান করা। কী প্রয়োজন?‌ তাই হাজার ব্যস্ততা সত্ত্বেও অগ্রাধিকার দিচ্ছেন শুধুই সেঞ্চুরি করাকে। বিশিষ্ট ইংরেজ লেখক জেফ্রি আর্চার সম্প্রতি নিজের একটি লেখায় বলেছেন, ‘‌বিরাটকে এখনও অনেক পথ যেতে হবে। বিরাটকে বিদেশের মাঠে রান করতে হবে। (‌পড়ুন ইংল্যান্ডের সিমিং উইকেট, মেঘলা আকাশ, ভেজা স্যঁাতসেঁতে উইকেটে শীর্ষস্থানীয় সিমবোলারদের সামলে বড় রান)‌। ওসব ১০০ সেঞ্চুরি–‌টেঞ্চুরির কথা আমি তো মাথায় আনছি না। এবং শচীন তেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা করতেও আমি নারাজ।’‌ ব্যক্তিগত মতামত। আমরাও বলছি না, বিরাট মুখে কিছু না বললেও, ১০০ সেঞ্চুরির দিকে টুকটুক করে এগোচ্ছেন। সৌরভ গাঙ্গুলি তো ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, শচীনের ৪৯ একদিনের সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে দেবে বিরাট। কিন্তু বলেননি, ১০০ সেঞ্চুরির দিকে তাক করেছেন ভারত–‌অধিনায়ক।
বুঝতে পারছি না, কেন বিরাটকেই মুখে বলতে হবে অমুক পাহাড়ের তমুক শৃঙ্গে উঠবেন?‌ সব কথা কি আগাম বলে দিতে হয়?‌ শচীন তঁার কাছে গুরুর সমান। গুরুর দেখানো পথেই শিষ্য এগোচ্ছেন। এভাবেই কি দেখা ঠিক নয়?‌ সুনীল গাভাসকার যখন টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন, তখন তঁার মোট রানসংখ্যা ১০,১২২। সেঞ্চুরির সংখ্যা ৩৪। গাভাসকার ছিলেন শচীনের দুই আদর্শের একজন (‌অন্যজন ভিভিয়ান রিচার্ডস)‌। শচীনও তো কখনও বলেননি যে, তিনি গাভাসকারের সব রেকর্ড ভেঙে দেবেন। কিন্তু দিয়েছেন। বলতে হয়নি। সুনীল গাভাসকারের যখন ৬০ বছর হল, সেই জন্মদিনে তঁাকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আলতো করে শচীন ভাসিয়ে দিয়েছিলেন একটি কথা— ছোট থেকেই সুনীল গাভাসকারকে অনুসরণ করে আসছি। শুধু জানতে চাইতাম, কোন কোন পরিস্থিতিতে তিনি কোন কোন শৃঙ্গে আরোহণ করেছেন। এবং নিঃশব্দে সেই শৃঙ্গে উঠে পড়ার চেষ্টা করতাম। নিরুচ্চারিত ছিল সেই সঙ্কল্প।
কিন্তু আমরা, প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এখন অনবরত বিরাটকে খুঁচিয়ে চলেছি। একটা সেঞ্চুরি হওয়া মানে অনিবার্য একটি প্রশ্ন— বিরাট কি শচীনের ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারবেন?‌ কিন্তু, শচীনের মতোই বিরাট এই ডেলিভারিটা ছেড়ে দিচ্ছেন, কোনও স্ট্রোক নেওয়ার চেষ্টাই করছেন না। তিনি জানেন ভালমতো, যদি নিজেকে ধরে রাখতে পারেন, নিজেকে সুস্থ রাখতে পারেন, তাহলে ১০০ সেঞ্চুরির এভারেস্টে পৌঁছনো সম্ভব। আলবৎ সম্ভব। চুপি চুপি বলে রাখি, প্লিজ পঁাচকান করবেন না, আমি জ্যোতিষী নই, টিয়াপাখি নিয়ে হাওড়া ব্রিজে বসিও না। তবে যেভাবে বিরাট এগোচ্ছেন, কাছ থেকে দেখার সুবাদে যে সঙ্কল্প, যে প্রতিজ্ঞা, যে দৃঢ়তা দেখেছি বিরাটের মধ্যে, তাতে তিনি বড়সড় চোট–‌আঘাত না পেলে ১০০ সেঞ্চুরি করবেনই। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে শচীনকে এ ব্যাপারে স্পর্শ করা, টপকে যাওয়ার।
এমন অনেক মানুষ আছেন, যঁারা আবেগতাড়িত হয়ে দুমদাম মন্তব্য করে ফেলেন, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই। বিরাট ১০০ সেঞ্চুরি করবেনই, এই কথা জোর দিয়ে বলতে পারার পেছনে যে কয়েকটি কারণ আছে, সেগুলি নিয়ে যদি আমরা নাড়াচাড়া করি, তাহলে বোঝা সম্ভব, কেন এমন নিশ্চিতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারা যাচ্ছে।
এক, রানের জন্য অসম্ভব খিদে। দুই, দুর্দান্ত ফিটনেস। তিন, বিপক্ষ বোলিংয়ের অবস্থা খুব ভাল নয়, এখন দরকার শুধু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মন ও লক্ষ্য স্থির রাখা। এই তিনটি ব্যাপারেই বিরাটকে ১০০–‌য় ১০০ নম্বর দিতে হবে। হাজার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। কিন্তু ২২ গজে পৌঁছনোমাত্রই গোটা দুনিয়াটা অন্ধকার করে দিয়ে শুধুই দেখছেন দু’‌প্রান্তের দুই বোলারকে। এবং তখন টার্গেট, লক্ষ্য থাকছে একটাই— পরিস্থিতি অনুযায়ী রান করে যাও। গাভাসকার মাইলফলক দিয়েছিলেন শচীনকে ৩৪টি টেস্ট শতরানের। শচীন সেটা টপকে ৫১ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ৪৯টি একদিনের সেঞ্চুরি ধরে তঁার মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা ১০০।
ওটাকেই আপাতত আমরা। আমরা, মানে ক্রিকেট দুনিয়া তাড়া করছি। দৌড়.‌.‌.‌দৌড়.‌.‌.‌দৌড়। পরিস্থিতি এখন এমন যে, ভারতের হার–‌জিতের চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে বিরাট সেঞ্চুরি করতে পারছেন কি না, তা নিয়ে। হ্যঁা, এটা ভারতবর্ষ। এবং আমাদের দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের এক বড়সড় অংশ শুধুমাত্র প্রিয় ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত সাফল্য হল কি না, তা নিয়ে মশগুল থাকেন। দেশের জেতা বা হারাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুনীল গাভাসকারের ক্ষেত্রে এমন জিনিস ঘটেছে। শচীনের ক্ষেত্রেও তা–‌ই। বিরাট জমানায় একই আলোচনা শোনা যাচ্ছে সর্বত্র। এ সবে অবশ্য কোনওরকমে মন এবং কান না দিয়ে বিরাটকুমার টুকটুক করে এগিয়ে যাচ্ছেন নিঃশব্দে। এই তো সেদিন খেলতে এলেন। এরই মধ্যে টেস্ট ও একদিনের ক্রিকেট মিলিয়ে ৫২টি তিন অঙ্কের নিজের রান–‌ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। ঈর্ষা করে লাভ নেই। অদ্ভুত এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে, সততা নিয়ে ক্রিকেটগ্রহে ঢুকে পড়েছেন দিল্লির এই ডাকাবুকো ক্রিকেটার। ছোটবেলা থেকে যিনি বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলতে পছন্দ করতেন, তঁার সঙ্গে এখন টক্কর চলছে দুনিয়ার সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে। ম্যাথিউ হেডেন তঁাকে একটু পিছিয়ে রাখছেন। স্টিভ স্মিথ, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনের পরে তিনি রাখতে চান বিরাটকে। শুধু একা হেডেন নন, বিরাটকে ততটা নম্বর দিতে চান না অনেকে। টেকনিকের কারণের জন্যই খানিকটা। বছর চারেক আগে ইংল্যান্ডে অ্যান্ডারসন, ব্রড–‌রা তঁাকে যেভাবে নাকানিচোবানি খাইয়েছিলেন, সেটা মাথায় রেখে অনেকেই বিরাটের ব্যাটিং–‌যোগ্যতা সম্পর্কে নম্বর দিতে গিয়ে হেঁাচট খাচ্ছেন।
তা খান। তবে, বিরাট নিজেও কিন্তু এ ব্যাপারটা জানেন খুব ভাল যে, ২০১৯ সালে ভারত যখন ইংল্যান্ড সফর করবে, তখন তঁাকে অগ্নিপরীক্ষায় বসতে হবে। ৪ বছর আগের বিরাটের সঙ্গে এখনকার বিরাটের যে তফাত, সেটা মাথায় রাখলে ভাল হয়। এই গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী। সিমিং উইকেটে অফস্টাম্পের বাইরে পড়া বল, আরও খানিকটা বাউন্স করে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে ব্যাট বাড়িয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল বিলেতের উইকেটে, সেখান থেকে নিজেকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য শচীন তেন্ডুলকারের কাছে গিয়েছিলেন। খানিকটা লাভ হয়েছিল বইকি। কিন্তু এটা এমন একটা ত্রুটি, যা কাটতে সময় লাগে। দেশ এবং উপমহাদেশের পাটা উইকেটে ক্রমাগত খেলতে হলে এই টেকনিক্যাল সমস্যা থেকে নিজেকে মুক্ত করা কঠিন। বিরাট নিজে নাগপুর টেস্টে ১৯ নম্বর শতরান করার পর পরিষ্কার করে বলে দিলেন, ‘‌আমাকে আরও ভাল ব্যাট করতে হবে। নিজের মাইনাস পয়েন্ট সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। ৪ বছর আগে ইংল্যান্ড সফরে আমি তো এতটা পরিণত ছিলাম না। ওখানকার পরিবেশ সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। বুঝতে বুঝতেই ৪টি টেস্ট কেটে গিয়েছিল। আমি নিজেকে তৈরি করছি আগামী বছর বিলেত সফরের জন্য।’‌ এটাই বিরাটইজম।
নিজেই নিজেকে বিশ্লেষণ করে চলেছেন অহরহ। সমস্যা হলেই আয়নার সামনে দঁাড়াচ্ছেন। নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। খুব ভাল করে জানেন, নিজেকে ভাল খেলতে হবে। দলকে ভাল খেলতে হবে। দুনিয়ার একনম্বর দল হতে হবে। তবেই বুক ফুলিয়ে গোটা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবেন তিনি এবং তঁার সতীর্থরা।
মূল মন্ত্রটা খুব সহজ। ক্রমাগত ভাল খেলে যাওয়া। এবং তা করতে করতে নিয়ম করেই এক–‌একটি রেকর্ড এসে ধরা দেবে নিজের তো বটেই, তঁার শিবিরের অন্য ক্রিকেটারদের হাতেও। এই যেমন নাগপুর টেস্ট। তিনি তুলে ফেললেন তঁার পঞ্চম ডবল সেঞ্চুরি। ধরে ফেললেন ব্রায়ান লারাকে। অধিনায়ক হিসেবে ব্রায়ান লারা পেয়েছিলেন পঁাচটি ডবল সেঞ্চুরি। ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যানের পাশে নিঃশব্দে বসে পড়ার সময়ও আমাদের মনে হল, এই তো সেদিন শুরু করলেন। এর মাঝে গঙ্গা ও টেমসের মাঝখান থেকে নিঃশব্দে যেরকম জল বয়ে গিয়েছে, তেমনি তিনিও ক্রমাগত রান করে থেকেছেন রানের সাগরে। নাগপুর টেস্টের কথা বলছিলাম। ওই টেস্টেই রবিচন্দ্রন অশ্বিন ভেঙে দিলেন ডেনিস লিলির রেকর্ড। ৫৪ টেস্টে ৩০০ উইকেট ক্লাবের সদস্যপদ পেলেন অশ্বিন। আর এই ক্লাবের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ডেনিস লিলির লেগেছিল ৫৬ টেস্ট।
কী সব হচ্ছে চারদিকে!‌ শুধুই ধামাকা। ব্যাটে বিরাট, বল হাতে অশ্বিন। বিরাট বললেন, আমায় দেখ। অশ্বিন যেন বলছেন, আমিও ভাই পিছনেই আছি। চেতেশ্বর পুজারা বিস্মিত কণ্ঠে দিলেন স্বীকারোক্তি:‌ বিরাটের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। কঠিন শুধু নয়, অসম্ভবই বটে। কোনও সন্দেহ নেই, বিরাট কোহলিই এখন ধারাবাহিকতার শেষ কথা। শুধুমাত্র টেস্টে নয়, একদিনের ক্রিকেট, টি–‌২০ ক্রিকেট— সর্বত্র ছুটে চলেছেন অশ্বমেধ ঘোড়ার গতিতে। অবিশ্বাস্য গতিতে ২ উইকেটের মাঝে দৌড়চ্ছেন। সারাক্ষণ নন–‌স্ট্রাইকারকে নিয়ে স্কোরবোর্ডকে রাখছেন সচল। সঙ্গে থাকছে অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেট। জোরে বোলিং, স্পিন বোলিং— সব ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধেই তিনি সাবলীল। বলেও দিচ্ছেন সে কথা, ‘‌যদি আমাদের দলকে একনম্বর হতে হয়, এবং ওই শৃঙ্গে থাকতে হয়, তাহলে কিন্তু সবাইকেই ভাল খেলতে হবে।’‌ টিম ইন্ডিয়া কিন্তু তেমন ভঙ্গিমায় খেলছেও বটে। আমরা যদিও বলি, ক্রিকেট দলগত খেলা, কিন্তু এখনও গোটা দলটা বিরাটের দিকে তাকিয়ে আছে। এটা একটা টিম ইন্ডিয়ার নেতিবাচক দিক। অধিনায়ক হিসেবে মাইক ব্রিয়ারলি সফল। কিন্তু ব্যাটে ততটা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেননি। আমাদের বিরাট কিন্তু অধিনায়ক হিসেবেও লেটার মার্কস পাবেন।
এবার তাহলে বুঝুন বিরাটের ওপর কতটা চাপ রয়েছে। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, রান করতে হবে, দলকে জেতাতে হবে, বোর্ডের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। প্রচারমাধ্যমকে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে। নির্বাচকদের সঙ্গে নিতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনেও সফল হতে হবে। ভাল থাকতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে। দেশের কাছে আবেদন জানাতে হবে, সবাই যেন সুস্থ থাকার দিকে নজর দেন। ইতিমধ্যেই বুঝে ফেলেছেন, দেশ এবং চারপাশ যদি অসুস্থ থাকে, তাহলে তঁাদের দলের মধ্যেও সেই অশুভ, অসুস্থ ঢেউয়ের ধাক্কা এসে পড়বে। তার চেয়ে বরং সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলার দিকে মন দেওয়া ভাল। কথার কথা নয়, বিরাট এটা করে দেখাচ্ছেন। এটাই বিরাটইজম।‌‌
যে কথা বলছিলাম, বিরাট মনে করেন শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চারপাশের অন্ধকার, শেষ পর্যন্ত তঁাকেও গ্রাস করে ফেলবে। এবং তিনি যে উদাত্ত কণ্ঠে গোটা পৃথিবীকে বলতে চাইছেন, দেখ আমাকে, দেখ আমাদের, দেখ আমরাই পৃথিবীর সেরা। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে যদি না পারেন, তাহলে বিরাটের অনুগামী হওয়ার কথা ভাববেন না। এই বিরাট মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার আগে ঠিক করে নিন শুধুই নিজে হাসবেন, শুধুই নিজের পরিবারের কথা ভাববেন, শুধুই নিজেকে ভালবাসবেন?‌ তাহলে এই মুহূর্তে টিম ইন্ডিয়ার ধারেকাছে থাকতে পারবেন না। দেখছেন না, পছন্দ না হলেই, বিরাটের সুরে গান গাইতে না পারলেই আপনাকে সরে যেতে হবে। এবং এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলছেন, তিনি আসলে, এ ব্যাপারে নির্মম। অনেক দূরের ছবি দেখছেন বলেই রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজাকে আপাতত একদিনের দল থেকে, টি–‌২০ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। অজিঙ্ক রাহানে, রোহিত শর্মারা ঘনিষ্ঠ। খুব ঘনিষ্ঠ। কিন্তু প্রয়োজনে সব ম্যাচ খেলাচ্ছেন না এই দুজনকে। যেই দেখলেন ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় ৬ জন ব্যাটসম্যানে খেলতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে নাগপুর টেস্টে রোহিতকে নিয়ে এলেন। সেঞ্চুরি পেলেন রোহিত। দক্ষিণ আফ্রিকাগামী বিমানে ওঠার আগে ব্যাটিং বিভাগের শক্তি সম্পর্কে যেন আরও খানিকটা অক্সিজেন পেয়ে গেলেন। যুবরাজ সিংয়ের মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে কসুর করেননি। দুজনেই কিন্তু খুব ঘনিষ্ঠ। ইও ইও টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার কারণে, গোটা দুনিয়া জেনে গিয়েছে, যুবরাজ সম্পূর্ণ সুস্থ নন। তাই অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে আপাতত থাকতে হচ্ছে বেশ দূরেই।
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে খেলতে গিয়ে দেখেছেন, যজুবেন্দ্র চাহাল দুর্দান্ত খেলছেন। যেমন লড়াকু মানসিকতা, তেমনি বল ঘোরানোর দক্ষতা। নিন্দুকরা বলছেন, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে খেলেন বলেই চাহালকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আদতে আমরা কী দেখলাম বা কী দেখছি?‌ চাহাল কিন্তু বল করতে এলেই গোটা দল সচকিত হয়ে উঠছে। নিখুঁত লেংথে বল রাখা, ঝঁাপাঝঁাপি করা, বল ঘোরানোর ব্যাপারে দিব্যি সাবলীল। বিরাট যেরকম মাঠে চলাফেরা করেন এক অদ্ভুত আগ্রাসী মানসিকতার রাংতায় নিজেকে মুড়ে, চাহালও যেন টগবগ করে ফোটেন। দেশের হয়ে খেলতে নামা মানে, সীমান্তে যুদ্ধ করতে যাওয়া। এটা আমরা বলি বটে, কিন্তু খেলাধুলোর ক্ষেত্রে, খুব কম ক্রীড়াবিদ এমন মানসিকতা নিয়ে ঝঁাপাতে চান। বিরাট, চাহালরা, এ ব্যাপারে মূর্তিমান ব্যতিক্রম।
তাই তিনি বলতে পারেন, সব খেলায় যে জিতবেন, এই গ্যারান্টি কোনও দল দিতে পারে না। টিম ইন্ডিয়াও পারবে না। হারাটা তঁার কাছে বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হল, জেতার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। ঠিকঠাক প্ল্যানিং করা এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য নানা আঙ্গিকে বিষয়টাকে ধরার চেষ্টা। লম্বা সময়ের ঘোড়া হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেছেন। এবার চাইছেন তঁার দল সম্পর্কেও যেন একই কথা বলেন, বলতে বাধ্য হন তঁার সমালোচকরাও।
এটাই বিরাটইজম।
হারতে জানেন?‌ হাসতে জানেন?‌ কঁাদতে জানেন?‌ সুখে থাকতে চান?‌ আনন্দে থাকতে চান?‌ তাহলে, বিরাটের দিকে এগিয়ে যান। বিরাট চান, আনন্দ করে বঁাচতে। কার্পেটের তলায় সমস্যা পাঠাতে চান না। বান্ধবী অনুষ্কার সঙ্গে যখন সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। অনুষ্কার উপস্থিতিকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন তঁার জঘন্য ফর্মের সঙ্গে। বিরাট কিন্তু পিছিয়ে যাননি। পালিয়ে যাননি। বুদ্ধি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এখন তো দিব্যি সর্বত্র অনুষ্কাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুনলে খুশি হতে পারেন, অবাক হতে পারেন, নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে, অনুষ্কার উপস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া সফরে ৪টি টেস্টেই সেঞ্চুরি করেছিলেন বিরাট। এটা বোঝানোর জন্য যে, অনুষ্কার উপস্থিতি অশুভ নয়। বিয়ে হবে দুজনের। আজ অথবা কাল। কিন্তু ওই ফিসফিসানিটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিরাট–‌অনুষ্কা জুটি নিয়ে এখন আর কেউ খারাপ কথা বলছে না। বান্ধবীদের নিয়ে সফরে যাওয়া নিয়েও ধীরে ধীরে যে শৃঙ্খলার বেড়াজাল রয়েছে, তা ক্রমশ ভেঙে যাবে বিরাটের ওই উদাত্ত মানসিকতার জন্য। বিরাট যেন বলছেন, কাজে মন দাও। দায়বদ্ধতা মেনে চল। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাও, অশক্ত মানুষদের দিকে। যা করতে চাইছ, তা সবাইকে জানিয়ে দাও। স্ট্র‌্যাটেজি নয়, নিজেদের লক্ষ্যের কথা, নিজেদের ফোকাসের কথা যদি জানাতে পার, তাহলে দেখবে দায়বদ্ধতা তাড়া করবে সবাইকে নিজের সেরা দেওয়ার জন্য। এভাবেই তো তৈরি হয় সাফল্যের রাজপথ। আবার বলছি, এটাই বিরাটইজম।‌‌‌‌ ■

তুমি কেমন করে ব্যাট করো যে গুণী
আমরা অবাক হয়ে দেখি
কেবল দেখি, কেবল দেখি
তুমি কেমন করে ব্যাট করো যে গুণী‌.‌.‌.‌‌

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকলে হয়তো, বিরাট কোহলি সম্পর্কে নিজের লেখা কবিতার কয়েকটি শব্দ এদিক–‌ওদিক করে, এমনভাবেই লিখতেন। চলতি কথায়, আমরা ভাল কোনও কাজ হলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বলতে শুরু করি, ‘‌জাস্ট ফাটিয়ে দিচ্ছে’‌। বিরাট কোহলি সেভাবেই, ক্রিকেট মাঠে আগুন জ্বালাচ্ছেন নিজের ব্যাট দিয়ে। বিপক্ষ বোলাররা যাচ্ছেন উড়ে। প্রতিদিনই ভাঙছেন রেকর্ড, একের পর এক। ডন ব্র‌্যাডম্যান থেকে ভিভিয়ান রিচার্ডস, জর্জ হেডলি থেকে সুনীল গাভাসকার— সবাইকে পেছনে ফেলে দিচ্ছেন একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিমায়। হ্যঁা, রক্তমাংসের মানুষ বলেই নিজেকে চিহ্নিত করছেন। জেমস বন্ড যেমন বলতেন— মাই নেম ইজ বন্ড। আমাদের বিরাটও সেভাবেই কলকাতায় বলে গিয়েছেন, ‘মাই নেম ইজ বিরাট কোহলি। অ্যান্ড আই অ্যাম নট আ রোবট।’‌ একই সঙ্গে বলেছিলেন, তঁার শরীরের চামড়া কাটলে রক্ত বেরোবে। কিন্তু যেভাবে তিনি একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছেন, তাতে তঁাকে, ইতিমধ্যেই অতিমানব মনে হচ্ছে। বিরামহীন গতিতে এগোচ্ছেন তিনি। সবাই যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন, তখন তিনি ছুটে চলেছেন প্রতিদিন। এহেন বিরাট বলছেন, ‘‌আমাকেও ছুটি নিতে হবে। আমি তো আর রোবট নই। আমারও বিশ্রামের দরকার।’‌ সত্যিই দরকার। ক্লান্ত হয়েও আমরা দেখছি, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ইডেন ও নাগপুরে দুটো সেঞ্চুরি তুলে নিলেন। যা দেখে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেই ফেললেন, ‘‌প্রতিদিন সকালে উঠে যে ছবিগুলি বিরাট নিজের টুইটারে পোস্ট করে, সেখানে রয়েছে হয় ও ওজন তুলছে, নয়তো বুক ডন দিচ্ছে। নয়তো ট্রেডমিলে দৌড়চ্ছে। অ্যামেজিং। অফুরন্ত প্রাণশক্তি না থাকলে, বড় হওয়ার, আরও বড় হওয়ার আগুন না থাকলে এভাবে নিজেকে প্রতিদিন নিংড়ে নেওয়া যায় না। এভাবেই ও নিজেকে দুনিয়ার অন্যতম ফিট ক্রীড়াবিদ হিসেবে তুলে ধরছে। আই লাইক হিম। আই লাইক হিম ভেরি মাচ। একই সঙ্গে আমি ওর সততার কথা বলব। যা করছে, যেভাবে করছে, সেখানে কোনও রাখঢাকের ব্যাপার নেই। ইন্ডিয়া টিমের দায়িত্বে আছে যখন ও, তখন আমরা সবাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। এতটাই ভরসা করি বিরাটের ওপর। এতটাই ভালবাসি আমি ওকে।’‌
হ্যঁা, ভালবাসছে এখন বিরাটকে আসমুদ্র হিমাচল। প্রতিদান হিসেবে বিরাট কিন্তু ফিরিয়ে দিচ্ছেন শুধু যে রান, রেকর্ড, জয়, তা নয়। প্রতিদিন নিজেকে মানবিক হিসেবেও মেলে ধরছেন। তা না হলে কেউ কি এভাবে বলতে পারেন যে, তঁার স্মরণীয় মুহূর্ত এখনও আসেনি। কিন্তু যদি জোর করা হয়, স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি, তাহলে, বিরাট যা বলছেন, তা–‌ও এক স্মরণীয় উক্তি। ‘‌প্রতিদিন লাক্সারি বাসে চেপে মাঠে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে অপেক্ষমাণ জনতা যেভাবে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান, যে মানুষগুলি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করেন আমার সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য, শুভেচ্ছা জানানোর জন্য, সেগুলিই আপাতত আমার জীবনের আ হা মোমেন্টস। এ পৃথিবী সবাইকে সম্মান দেয় না। এ পৃথিবীর কিছু মানুষ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, আমাকে ভালবাসছেন, আমাকে শুভেচ্ছার ডালিতে ভরিয়ে দিচ্ছেন, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওনা।’‌ এভাবে কতজন সেলিব্রিটি বলতে পেরেছেন?‌‌
অবশেষে বিরাট ছুটি নিলেন। সামান্য ক’‌দিনের জন্য। কানাঘুষোয় শোনা গিয়েছিল, তিনি শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তৃতীয় টেস্ট খেলবেন না। এবং নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন ৩টি একদিনের ম্যাচ থেকেও। ইডেন ও নাগপুরে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করার পর, তঁার হয়তো মনে হচ্ছে, ফিরোজ শা কোটলায় নিজের পরিচিত দর্শকদের সামনে আরও একটি সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারবেন। নিজের মুখে বলতে পারছেন না, শচীন তেন্ডুলকারের ১০০ সেঞ্চুরির দিকে তিনি এগোচ্ছেন। যতবার প্রচারমাধ্যম ওই প্রসঙ্গে ঢুকেছে, প্রত্যেকবার বিরাট বলে যাচ্ছেন, ‘‌আমি এখনও ওই রেকর্ড তাড়া করার কথা ভাবছি না।’‌ বলছেন না। কারণ, নিজের ওপর তিনি আর বাড়তি চাপ নিতে চাইছেন না। কিন্তু মনে মনে জানেন, এ ব্যাপারে মুখ খোলা মানে বিতর্ককে আহ্বান করা। কী প্রয়োজন?‌ তাই হাজার ব্যস্ততা সত্ত্বেও অগ্রাধিকার দিচ্ছেন শুধুই সেঞ্চুরি করাকে। বিশিষ্ট ইংরেজ লেখক জেফ্রি আর্চার সম্প্রতি নিজের একটি লেখায় বলেছেন, ‘‌বিরাটকে এখনও অনেক পথ যেতে হবে। বিরাটকে বিদেশের মাঠে রান করতে হবে। (‌পড়ুন ইংল্যান্ডের সিমিং উইকেট, মেঘলা আকাশ, ভেজা স্যঁাতসেঁতে উইকেটে শীর্ষস্থানীয় সিমবোলারদের সামলে বড় রান)‌। ওসব ১০০ সেঞ্চুরি–‌টেঞ্চুরির কথা আমি তো মাথায় আনছি না। এবং শচীন তেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা করতেও আমি নারাজ।’‌ ব্যক্তিগত মতামত। আমরাও বলছি না, বিরাট মুখে কিছু না বললেও, ১০০ সেঞ্চুরির দিকে টুকটুক করে এগোচ্ছেন। সৌরভ গাঙ্গুলি তো ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, শচীনের ৪৯ একদিনের সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে দেবে বিরাট। কিন্তু বলেননি, ১০০ সেঞ্চুরির দিকে তাক করেছেন ভারত–‌অধিনায়ক।
বুঝতে পারছি না, কেন বিরাটকেই মুখে বলতে হবে অমুক পাহাড়ের তমুক শৃঙ্গে উঠবেন?‌ সব কথা কি আগাম বলে দিতে হয়?‌ শচীন তঁার কাছে গুরুর সমান। গুরুর দেখানো পথেই শিষ্য এগোচ্ছেন। এভাবেই কি দেখা ঠিক নয়?‌ সুনীল গাভাসকার যখন টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন, তখন তঁার মোট রানসংখ্যা ১০,১২২। সেঞ্চুরির সংখ্যা ৩৪। গাভাসকার ছিলেন শচীনের দুই আদর্শের একজন (‌অন্যজন ভিভিয়ান রিচার্ডস)‌। শচীনও তো কখনও বলেননি যে, তিনি গাভাসকারের সব রেকর্ড ভেঙে দেবেন। কিন্তু দিয়েছেন। বলতে হয়নি। সুনীল গাভাসকারের যখন ৬০ বছর হল, সেই জন্মদিনে তঁাকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আলতো করে শচীন ভাসিয়ে দিয়েছিলেন একটি কথা— ছোট থেকেই সুনীল গাভাসকারকে অনুসরণ করে আসছি। শুধু জানতে চাইতাম, কোন কোন পরিস্থিতিতে তিনি কোন কোন শৃঙ্গে আরোহণ করেছেন। এবং নিঃশব্দে সেই শৃঙ্গে উঠে পড়ার চেষ্টা করতাম। নিরুচ্চারিত ছিল সেই সঙ্কল্প।
কিন্তু আমরা, প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এখন অনবরত বিরাটকে খুঁচিয়ে চলেছি। একটা সেঞ্চুরি হওয়া মানে অনিবার্য একটি প্রশ্ন— বিরাট কি শচীনের ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারবেন?‌ কিন্তু, শচীনের মতোই বিরাট এই ডেলিভারিটা ছেড়ে দিচ্ছেন, কোনও স্ট্রোক নেওয়ার চেষ্টাই করছেন না। তিনি জানেন ভালমতো, যদি নিজেকে ধরে রাখতে পারেন, নিজেকে সুস্থ রাখতে পারেন, তাহলে ১০০ সেঞ্চুরির এভারেস্টে পৌঁছনো সম্ভব। আলবৎ সম্ভব। চুপি চুপি বলে রাখি, প্লিজ পঁাচকান করবেন না, আমি জ্যোতিষী নই, টিয়াপাখি নিয়ে হাওড়া ব্রিজে বসিও না। তবে যেভাবে বিরাট এগোচ্ছেন, কাছ থেকে দেখার সুবাদে যে সঙ্কল্প, যে প্রতিজ্ঞা, যে দৃঢ়তা দেখেছি বিরাটের মধ্যে, তাতে তিনি বড়সড় চোট–‌আঘাত না পেলে ১০০ সেঞ্চুরি করবেনই। প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে শচীনকে এ ব্যাপারে স্পর্শ করা, টপকে যাওয়ার।
এমন অনেক মানুষ আছেন, যঁারা আবেগতাড়িত হয়ে দুমদাম মন্তব্য করে ফেলেন, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই। বিরাট ১০০ সেঞ্চুরি করবেনই, এই কথা জোর দিয়ে বলতে পারার পেছনে যে কয়েকটি কারণ আছে, সেগুলি নিয়ে যদি আমরা নাড়াচাড়া করি, তাহলে বোঝা সম্ভব, কেন এমন নিশ্চিতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারা যাচ্ছে।
এক, রানের জন্য অসম্ভব খিদে। দুই, দুর্দান্ত ফিটনেস। তিন, বিপক্ষ বোলিংয়ের অবস্থা খুব ভাল নয়, এখন দরকার শুধু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মন ও লক্ষ্য স্থির রাখা। এই তিনটি ব্যাপারেই বিরাটকে ১০০–‌য় ১০০ নম্বর দিতে হবে। হাজার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। কিন্তু ২২ গজে পৌঁছনোমাত্রই গোটা দুনিয়াটা অন্ধকার করে দিয়ে শুধুই দেখছেন দু’‌প্রান্তের দুই বোলারকে। এবং তখন টার্গেট, লক্ষ্য থাকছে একটাই— পরিস্থিতি অনুযায়ী রান করে যাও। গাভাসকার মাইলফলক দিয়েছিলেন শচীনকে ৩৪টি টেস্ট শতরানের। শচীন সেটা টপকে ৫১ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ৪৯টি একদিনের সেঞ্চুরি ধরে তঁার মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা ১০০।
ওটাকেই আপাতত আমরা। আমরা, মানে ক্রিকেট দুনিয়া তাড়া করছি। দৌড়.‌.‌.‌দৌড়.‌.‌.‌দৌড়। পরিস্থিতি এখন এমন যে, ভারতের হার–‌জিতের চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে বিরাট সেঞ্চুরি করতে পারছেন কি না, তা নিয়ে। হ্যঁা, এটা ভারতবর্ষ। এবং আমাদের দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের এক বড়সড় অংশ শুধুমাত্র প্রিয় ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত সাফল্য হল কি না, তা নিয়ে মশগুল থাকেন। দেশের জেতা বা হারাটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুনীল গাভাসকারের ক্ষেত্রে এমন জিনিস ঘটেছে। শচীনের ক্ষেত্রেও তা–‌ই। বিরাট জমানায় একই আলোচনা শোনা যাচ্ছে সর্বত্র। এ সবে অবশ্য কোনওরকমে মন এবং কান না দিয়ে বিরাটকুমার টুকটুক করে এগিয়ে যাচ্ছেন নিঃশব্দে। এই তো সেদিন খেলতে এলেন। এরই মধ্যে টেস্ট ও একদিনের ক্রিকেট মিলিয়ে ৫২টি তিন অঙ্কের নিজের রান–‌ব্যাঙ্কে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। ঈর্ষা করে লাভ নেই। অদ্ভুত এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে, সততা নিয়ে ক্রিকেটগ্রহে ঢুকে পড়েছেন দিল্লির এই ডাকাবুকো ক্রিকেটার। ছোটবেলা থেকে যিনি বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলতে পছন্দ করতেন, তঁার সঙ্গে এখন টক্কর চলছে দুনিয়ার সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে। ম্যাথিউ হেডেন তঁাকে একটু পিছিয়ে রাখছেন। স্টিভ স্মিথ, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনের পরে তিনি রাখতে চান বিরাটকে। শুধু একা হেডেন নন, বিরাটকে ততটা নম্বর দিতে চান না অনেকে। টেকনিকের কারণের জন্যই খানিকটা। বছর চারেক আগে ইংল্যান্ডে অ্যান্ডারসন, ব্রড–‌রা তঁাকে যেভাবে নাকানিচোবানি খাইয়েছিলেন, সেটা মাথায় রেখে অনেকেই বিরাটের ব্যাটিং–‌যোগ্যতা সম্পর্কে নম্বর দিতে গিয়ে হেঁাচট খাচ্ছেন।
তা খান। তবে, বিরাট নিজেও কিন্তু এ ব্যাপারটা জানেন খুব ভাল যে, ২০১৯ সালে ভারত যখন ইংল্যান্ড সফর করবে, তখন তঁাকে অগ্নিপরীক্ষায় বসতে হবে। ৪ বছর আগের বিরাটের সঙ্গে এখনকার বিরাটের যে তফাত, সেটা মাথায় রাখলে ভাল হয়। এই গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী। সিমিং উইকেটে অফস্টাম্পের বাইরে পড়া বল, আরও খানিকটা বাউন্স করে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে ব্যাট বাড়িয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল বিলেতের উইকেটে, সেখান থেকে নিজেকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য শচীন তেন্ডুলকারের কাছে গিয়েছিলেন। খানিকটা লাভ হয়েছিল বইকি। কিন্তু এটা এমন একটা ত্রুটি, যা কাটতে সময় লাগে। দেশ এবং উপমহাদেশের পাটা উইকেটে ক্রমাগত খেলতে হলে এই টেকনিক্যাল সমস্যা থেকে নিজেকে মুক্ত করা কঠিন। বিরাট নিজে নাগপুর টেস্টে ১৯ নম্বর শতরান করার পর পরিষ্কার করে বলে দিলেন, ‘‌আমাকে আরও ভাল ব্যাট করতে হবে। নিজের মাইনাস পয়েন্ট সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। ৪ বছর আগে ইংল্যান্ড সফরে আমি তো এতটা পরিণত ছিলাম না। ওখানকার পরিবেশ সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। বুঝতে বুঝতেই ৪টি টেস্ট কেটে গিয়েছিল। আমি নিজেকে তৈরি করছি আগামী বছর বিলেত সফরের জন্য।’‌ এটাই বিরাটইজম।
নিজেই নিজেকে বিশ্লেষণ করে চলেছেন অহরহ। সমস্যা হলেই আয়নার সামনে দঁাড়াচ্ছেন। নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। খুব ভাল করে জানেন, নিজেকে ভাল খেলতে হবে। দলকে ভাল খেলতে হবে। দুনিয়ার একনম্বর দল হতে হবে। তবেই বুক ফুলিয়ে গোটা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবেন তিনি এবং তঁার সতীর্থরা।
মূল মন্ত্রটা খুব সহজ। ক্রমাগত ভাল খেলে যাওয়া। এবং তা করতে করতে নিয়ম করেই এক–‌একটি রেকর্ড এসে ধরা দেবে নিজের তো বটেই, তঁার শিবিরের অন্য ক্রিকেটারদের হাতেও। এই যেমন নাগপুর টেস্ট। তিনি তুলে ফেললেন তঁার পঞ্চম ডবল সেঞ্চুরি। ধরে ফেললেন ব্রায়ান লারাকে। অধিনায়ক হিসেবে ব্রায়ান লারা পেয়েছিলেন পঁাচটি ডবল সেঞ্চুরি। ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যানের পাশে নিঃশব্দে বসে পড়ার সময়ও আমাদের মনে হল, এই তো সেদিন শুরু করলেন। এর মাঝে গঙ্গা ও টেমসের মাঝখান থেকে নিঃশব্দে যেরকম জল বয়ে গিয়েছে, তেমনি তিনিও ক্রমাগত রান করে থেকেছেন রানের সাগরে। নাগপুর টেস্টের কথা বলছিলাম। ওই টেস্টেই রবিচন্দ্রন অশ্বিন ভেঙে দিলেন ডেনিস লিলির রেকর্ড। ৫৪ টেস্টে ৩০০ উইকেট ক্লাবের সদস্যপদ পেলেন অশ্বিন। আর এই ক্লাবের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ডেনিস লিলির লেগেছিল ৫৬ টেস্ট।
কী সব হচ্ছে চারদিকে!‌ শুধুই ধামাকা। ব্যাটে বিরাট, বল হাতে অশ্বিন। বিরাট বললেন, আমায় দেখ। অশ্বিন যেন বলছেন, আমিও ভাই পিছনেই আছি। চেতেশ্বর পুজারা বিস্মিত কণ্ঠে দিলেন স্বীকারোক্তি:‌ বিরাটের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। কঠিন শুধু নয়, অসম্ভবই বটে। কোনও সন্দেহ নেই, বিরাট কোহলিই এখন ধারাবাহিকতার শেষ কথা। শুধুমাত্র টেস্টে নয়, একদিনের ক্রিকেট, টি–‌২০ ক্রিকেট— সর্বত্র ছুটে চলেছেন অশ্বমেধ ঘোড়ার গতিতে। অবিশ্বাস্য গতিতে ২ উইকেটের মাঝে দৌড়চ্ছেন। সারাক্ষণ নন–‌স্ট্রাইকারকে নিয়ে স্কোরবোর্ডকে রাখছেন সচল। সঙ্গে থাকছে অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক রেট। জোরে বোলিং, স্পিন বোলিং— সব ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধেই তিনি সাবলীল। বলেও দিচ্ছেন সে কথা, ‘‌যদি আমাদের দলকে একনম্বর হতে হয়, এবং ওই শৃঙ্গে থাকতে হয়, তাহলে কিন্তু সবাইকেই ভাল খেলতে হবে।’‌ টিম ইন্ডিয়া কিন্তু তেমন ভঙ্গিমায় খেলছেও বটে। আমরা যদিও বলি, ক্রিকেট দলগত খেলা, কিন্তু এখনও গোটা দলটা বিরাটের দিকে তাকিয়ে আছে। এটা একটা টিম ইন্ডিয়ার নেতিবাচক দিক। অধিনায়ক হিসেবে মাইক ব্রিয়ারলি সফল। কিন্তু ব্যাটে ততটা কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেননি। আমাদের বিরাট কিন্তু অধিনায়ক হিসেবেও লেটার মার্কস পাবেন।
এবার তাহলে বুঝুন বিরাটের ওপর কতটা চাপ রয়েছে। নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, রান করতে হবে, দলকে জেতাতে হবে, বোর্ডের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। প্রচারমাধ্যমকে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে। নির্বাচকদের সঙ্গে নিতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনেও সফল হতে হবে। ভাল থাকতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখতে হবে। দেশের কাছে আবেদন জানাতে হবে, সবাই যেন সুস্থ থাকার দিকে নজর দেন। ইতিমধ্যেই বুঝে ফেলেছেন, দেশ এবং চারপাশ যদি অসুস্থ থাকে, তাহলে তঁাদের দলের মধ্যেও সেই অশুভ, অসুস্থ ঢেউয়ের ধাক্কা এসে পড়বে। তার চেয়ে বরং সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলার দিকে মন দেওয়া ভাল। কথার কথা নয়, বিরাট এটা করে দেখাচ্ছেন। এটাই বিরাটইজম।‌‌
যে কথা বলছিলাম, বিরাট মনে করেন শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চারপাশের অন্ধকার, শেষ পর্যন্ত তঁাকেও গ্রাস করে ফেলবে। এবং তিনি যে উদাত্ত কণ্ঠে গোটা পৃথিবীকে বলতে চাইছেন, দেখ আমাকে, দেখ আমাদের, দেখ আমরাই পৃথিবীর সেরা। এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে যদি না পারেন, তাহলে বিরাটের অনুগামী হওয়ার কথা ভাববেন না। এই বিরাট মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার আগে ঠিক করে নিন শুধুই নিজে হাসবেন, শুধুই নিজের পরিবারের কথা ভাববেন, শুধুই নিজেকে ভালবাসবেন?‌ তাহলে এই মুহূর্তে টিম ইন্ডিয়ার ধারেকাছে থাকতে পারবেন না। দেখছেন না, পছন্দ না হলেই, বিরাটের সুরে গান গাইতে না পারলেই আপনাকে সরে যেতে হবে। এবং এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলছেন, তিনি আসলে, এ ব্যাপারে নির্মম। অনেক দূরের ছবি দেখছেন বলেই রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজাকে আপাতত একদিনের দল থেকে, টি–‌২০ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। অজিঙ্ক রাহানে, রোহিত শর্মারা ঘনিষ্ঠ। খুব ঘনিষ্ঠ। কিন্তু প্রয়োজনে সব ম্যাচ খেলাচ্ছেন না এই দুজনকে। যেই দেখলেন ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোর জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় ৬ জন ব্যাটসম্যানে খেলতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে নাগপুর টেস্টে রোহিতকে নিয়ে এলেন। সেঞ্চুরি পেলেন রোহিত। দক্ষিণ আফ্রিকাগামী বিমানে ওঠার আগে ব্যাটিং বিভাগের শক্তি সম্পর্কে যেন আরও খানিকটা অক্সিজেন পেয়ে গেলেন। যুবরাজ সিংয়ের মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে কসুর করেননি। দুজনেই কিন্তু খুব ঘনিষ্ঠ। ইও ইও টেস্টে ব্যর্থ হওয়ার কারণে, গোটা দুনিয়া জেনে গিয়েছে, যুবরাজ সম্পূর্ণ সুস্থ নন। তাই অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে আপাতত থাকতে হচ্ছে বেশ দূরেই।
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে খেলতে গিয়ে দেখেছেন, যজুবেন্দ্র চাহাল দুর্দান্ত খেলছেন। যেমন লড়াকু মানসিকতা, তেমনি বল ঘোরানোর দক্ষতা। নিন্দুকরা বলছেন, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে খেলেন বলেই চাহালকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আদতে আমরা কী দেখলাম বা কী দেখছি?‌ চাহাল কিন্তু বল করতে এলেই গোটা দল সচকিত হয়ে উঠছে। নিখুঁত লেংথে বল রাখা, ঝঁাপাঝঁাপি করা, বল ঘোরানোর ব্যাপারে দিব্যি সাবলীল। বিরাট যেরকম মাঠে চলাফেরা করেন এক অদ্ভুত আগ্রাসী মানসিকতার রাংতায় নিজেকে মুড়ে, চাহালও যেন টগবগ করে ফোটেন। দেশের হয়ে খেলতে নামা মানে, সীমান্তে যুদ্ধ করতে যাওয়া। এটা আমরা বলি বটে, কিন্তু খেলাধুলোর ক্ষেত্রে, খুব কম ক্রীড়াবিদ এমন মানসিকতা নিয়ে ঝঁাপাতে চান। বিরাট, চাহালরা, এ ব্যাপারে মূর্তিমান ব্যতিক্রম।
তাই তিনি বলতে পারেন, সব খেলায় যে জিতবেন, এই গ্যারান্টি কোনও দল দিতে পারে না। টিম ইন্ডিয়াও পারবে না। হারাটা তঁার কাছে বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হল, জেতার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। ঠিকঠাক প্ল্যানিং করা এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য নানা আঙ্গিকে বিষয়টাকে ধরার চেষ্টা। লম্বা সময়ের ঘোড়া হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেছেন। এবার চাইছেন তঁার দল সম্পর্কেও যেন একই কথা বলেন, বলতে বাধ্য হন তঁার সমালোচকরাও।
এটাই বিরাটইজম।
হারতে জানেন?‌ হাসতে জানেন?‌ কঁাদতে জানেন?‌ সুখে থাকতে চান?‌ আনন্দে থাকতে চান?‌ তাহলে, বিরাটের দিকে এগিয়ে যান। বিরাট চান, আনন্দ করে বঁাচতে। কার্পেটের তলায় সমস্যা পাঠাতে চান না। বান্ধবী অনুষ্কার সঙ্গে যখন সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, তখন অনেকেই তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। অনুষ্কার উপস্থিতিকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন তঁার জঘন্য ফর্মের সঙ্গে। বিরাট কিন্তু পিছিয়ে যাননি। পালিয়ে যাননি। বুদ্ধি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এখন তো দিব্যি সর্বত্র অনুষ্কাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুনলে খুশি হতে পারেন, অবাক হতে পারেন, নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে, অনুষ্কার উপস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়া সফরে ৪টি টেস্টেই সেঞ্চুরি করেছিলেন বিরাট। এটা বোঝানোর জন্য যে, অনুষ্কার উপস্থিতি অশুভ নয়। বিয়ে হবে দুজনের। আজ অথবা কাল। কিন্তু ওই ফিসফিসানিটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিরাট–‌অনুষ্কা জুটি নিয়ে এখন আর কেউ খারাপ কথা বলছে না। বান্ধবীদের নিয়ে সফরে যাওয়া নিয়েও ধীরে ধীরে যে শৃঙ্খলার বেড়াজাল রয়েছে, তা ক্রমশ ভেঙে যাবে বিরাটের ওই উদাত্ত মানসিকতার জন্য। বিরাট যেন বলছেন, কাজে মন দাও। দায়বদ্ধতা মেনে চল। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাও, অশক্ত মানুষদের দিকে। যা করতে চাইছ, তা সবাইকে জানিয়ে দাও। স্ট্র‌্যাটেজি নয়, নিজেদের লক্ষ্যের কথা, নিজেদের ফোকাসের কথা যদি জানাতে পার, তাহলে দেখবে দায়বদ্ধতা তাড়া করবে সবাইকে নিজের সেরা দেওয়ার জন্য। এভাবেই তো তৈরি হয় সাফল্যের রাজপথ। আবার বলছি, এটাই বিরাটইজম।‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top