তাঁর প্রকাণ্ড ব্যক্তিত্বের চোখধাঁধানো আলোর নিচে চাপা ছিল উদ্দাম প্রেমিকসত্তা। সোনার খাঁচার দরজা খুলে দিলেন 
অরূপ মুখোপাধ্যায়

উৎপল দত্তের বর্ণময় প্রতিভার বহুকৌণিক আলোকবিচ্ছুরণ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা, তাত্ত্বিক ‌আচার্য— এই চতুর্মুখ ব্রহ্মার মতো উৎপল তাঁর সৃজনে বারবার সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছেন। বিশ্ববিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব রিচার্ড শেখ্‌নার সম্পাদিত পত্রিকা ‘‌দ্য ড্রামা রিভিউ’‌ (‌‌টিডিআর)‌ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিনজন নাট্যপরিচালকের মধ্যে উৎপলকে অন্যতম বলে মান্যতা দিয়েছিল। যদিও রিচার্ড শেখ্‌নারের বিতর্কিত মার্কিন ‘‌লিভিং থিয়েটার’‌কে উৎপল ‘‌অপসংস্কৃতির কবরখানা’‌ বলে তুলোধনা করেছেন। বাংলা য়েটারের ইতিহাস বিচার করলে উৎপলের নাট্যসৃষ্টির ব্যাপ্তি ও ঐশ্বর্য বিস্ময়কর। উৎপল দত্ত রচিত মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ও একাঙ্ক নাটক, অনুবাদনাট্য, যাত্রাপালা ও পথনাটকের সংখ্যা ১০০–‌র বেশি। এর মধ্যে ৯০টি নাটক প্রকাশিত ও গ্রন্থিত। উৎপল দিকপাল পণ্ডিত ও বিদগ্ধ সমাজবিজ্ঞানী। বহু মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি কবি ও ছোটগল্প লেখক। তিনি মূল স্রোতের বাণিজ্যিক ছবির শীর্ষ অভিনেতা এবং কয়েকটা কলোত্তীর্ণ সিনেমার অমর চরিত্রস্রষ্টা। উৎপল ক্রান্তিদর্শী রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সম্মোহনী বাগ্মী। তিনি অগ্নিগর্ভ রাজনীতির নায়ক। 
কিন্তু প্রেমিক উৎপল?‌ 
এই বিষয়ে এ–যাবৎকাল বাংলা থিয়েটারের এক আশ্চর্যময়ী চরিত্র, কিংবদন্তি অভিনেত্রী শোভা সেনের সঙ্গে উৎপলের প্রেম, পরিণয় এবং সুদীর্ঘ যাত্রাপথে টালমাটাল দুর্যোগ ও অস্থির সময়ের চালচিত্র অক্ষয় হয়ে আছে। আমরা জানি, ব্যক্তিজীবনের এক চরম সঙ্কটের মধ্যে শোভা সেন ১৯৬১ সালে যাবতীয় মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তাঁর পূর্বতন স্বামী দেবপ্রসাদ সেনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। তারপর গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি লিটল থিয়েটার গ্রুপে যোগ দিয়ে গুরুরূপে যাঁকে স্বীকার করেছিলেন, নিজের চেয়ে ৬ বছরের ছোট সেই প্রতিভাশালী নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তকে স্বামীরূপে গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালের ২৯ মার্চ উৎপলের ৩২তম জন্মদিনে শোভা সেনের সঙ্গে বিয়ে হয়।  
তারপরই ‘‌অঙ্গার’‌ নাটকের তিনশো রজনী অতিক্রান্ত হলে উৎপলদের দল বোম্বেতে আমন্ত্রিত হয়েছিল। বোম্বেতে পণ্ডিত রবিশংকরের ফ্ল্যাটে একদিন বহু বিশিষ্ট অতিথির সামনে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বিশ্ববরেণ্য সেতারশিল্পী উৎপল–‌শোভার রেজিস্ট্রি বিয়ের কথা ঘোষণা করেন। এই প্রসঙ্গে পরে শোভা সেন লিখেছিলেন, ‌‘‌আমার মানসিক শান্তি তখন অনেকটা ফিরে এসেছে। উৎপলের মতো স্বামী পেয়ে আমি সব হারানোর দুঃখ ভুলে গেলাম। অমন প্রশস্ত হৃদয়, উদারচেতা পুরুষ এদেশে সত্যিই বিরল।’‌ একথা ভুললে চলবে না যে, স্বামী উৎপলের উপর্যুপরি গ্রেপ্তার ও কারাবাস, বিশেষত ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৭ মাস জেলে থাকার সময় সমস্ত প্রতিকূলতা ও সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হয় এই তেজস্বী বীরাঙ্গনাকে।
তবে উৎপল কিন্তু শোভা সেনের শুধুমাত্র প্রেমিক নন। তিনি শোভা সেনের স্বামী, গুরু এবং পথপ্রদর্শক। তিনি শোভা সেনের জীবনে আলোকবর্তিকা। উৎপল প্রয়াত হওয়ার পর শোভা সেনের জীবনের ভরকেন্দ্রে ছিল স্বামী ও স্রষ্টার মহান, সমৃদ্ধশালী উত্তরাধিকার বহন ও সংরক্ষণ।
অন্যদিকে উৎপলের কাছেও শোভা সেন কি শুধুমাত্র প্রেমিকা?‌ বোধহয় তা নন। স্ত্রী শোভা তাঁর মন্ত্রে দীক্ষিত দায়বদ্ধ শিল্পী এবং সহযোদ্ধা। এক লড়াকু অভিনেত্রী। তাই শোভা সেনের আত্মজীবনীর মুখবন্ধে উৎপল লিখেছেন যে, অভিনেত্রী শোভা সেনের ভূমিকার তলায় চাপা পড়ে যায় তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক শক্তির কথা। তাঁর বক্তব্য ছিল যে, প্রথম এলটিজি এবং অবশেষে পিএলটি–‌র স্থিতি, সমৃদ্ধি ও বিকাশের নেপথ্যে সংগঠকরূপে শ্রীমতী সেনের অসামান্য অবদান স্বীকার করতে হবে। উৎপলের ভাষায়, ‌‘‌মঞ্চের ওপর তাঁর যে খ্যাতি গড়ে উঠেছে, তার চেয়ে নাট্য আন্দোলনের সফল সম্পাদক হিসেবে তাঁর যশের দাবি কম নয়।’‌
১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিন ‘‌ভারতরক্ষা’‌ আইনে গ্রেপ্তার হন উৎপল দত্ত। এরপর দীর্ঘ সাত মাস কারাগারের অন্তরালে দিন কাটে উৎপলের। কিন্তু কারাগারের দিনগুলিতেও দিনবদলের স্বপ্ন তাঁকে ছেড়ে যায়নি। জেলখানার বন্দিজীবনের দুঃসহ নরকযন্ত্রণার মধ্যেও উৎপল ইংরেজি ভাষাতে চারটি অসামান্য কবিতা লিখেছিলেন। এর মধ্যে দুটি কবিতা ১৯৯৪ সালে সিগাল কোয়াটার্লির প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। একটি কবিতার কথায় পরে আসছি। প্রেসিডেন্সি জেলের নোটবইটিতে আবিষ্কৃত সেই কাব্যসম্ভারই কবি উৎপলের সবচেয়ে পুরোনো সৃষ্টিসম্পদ।
১৯৬৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উৎপল জেলখানার ডায়েরিতে লিখেছিলেন ইংরেজি কবিতা ‘‌মাই ওয়াইফ’‌।  সেই কবিতার ছত্রে ছত্রে জীবনের প্রতি প্রচণ্ড আবেগ এবং স্ত্রীর জন্য ভালবাসার আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। কিন্তু অন্যত্র উৎপল–রচিত ‘‌শোভাকে’‌ কবিতায় দেখা যায় স্ত্রী তাঁর কাছে শুধুমাত্র প্রেমিকা নন, তিনি এক নিরন্তর, নিরবচ্ছিন্ন প্রেরণা। তাই উৎপল এই কবিতায় স্ত্রী সম্পর্কে লিখেছিলেন—
‘‌‌তোমার কাছে পাইনি ক্লীব বিশ্রাম/‌ পাইনি নির্বোধ রাত্রির শান্তি,/‌ তুমি এক অবিরাম তাড়না,/‌ অশান্ত পথের হাতছানি,
.‌.‌. ‌..‌.‌ .‌.‌.‌‌
‌এ সমাজে তুমি বাঁধা পড়ো না/‌ তাই তুমি বিপ্লবের পথচারী।‌’‌/‌ 
‘‌শোভাকে’‌ কবিতায় কবি উৎপল আবেগশূন্যভাবে লেখেন—
‘‌আমি জানি যদি আমি জেলে চলে যাই/‌ তুমি পোড়–‌খাওয়া যোদ্ধার মতন/‌ হঠাৎ হেসে বলবে, একজন গেল খরচের খাতায়,/‌ রইল বাকি নয়।’‌
শোভা সেন কখনই উৎপলের কাছে শুধু স্বপ্নে ভাসা প্রেমিকা ছিলেন না। তাই এই কবিতার উপসংহারে তিনি লিখেছেন—
‘‌তাই অনাগতের কুয়াশাঢাকা ভোরে/‌ আমি চোখ মেলে দিয়ে দেখি/‌ ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে তুমি আর আমি/‌ লড়ে যাচ্ছি দুই কমরেড।‌’‌
প্রথম যৌবনের প্রেমিক উৎপলের খোঁজে এবার আমাদের ফিরে যেতে হবে দেশের স্বাধীনতা–পরবর্তী ৪০–‌এর দশকের শেষে। ১৯৪৭ সালে ভারত ইতিহাসের এক মহাসন্ধিক্ষণে উৎপলের জীবনে তাঁর গুরু জেফ্রি কেন্ডালের আবির্ভাব। গত শতকের চল্লিশের দশকে ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক জেফ্রি কেন্ডাল একটি ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দল নিয়ে প্রধানত শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ করতে ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশ ঘুরে ভারতে এসে পৌঁছোন। কেন্ডালের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দলে তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রী লরা, দুই কন্যা জেনিফার ও ফেলিসিটি এবং কয়েকজন ক্ষমতাবান কুশলী শিল্পী ছিলেন। এঁরা সবাই ছিলেন পেশাদার অভিনেতা–অভিনেত্রী— ‌থিয়েটারই যাঁদের ধ্যানজ্ঞান এবং জীবিকানির্বাহের মাধ্যম। থিয়েটারের যাবতীয় কাজ— ‌অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, আলোকসম্পাত, নেপথ্যসঙ্গীত—‌ তাঁদের রপ্ত করতে হত। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে শিলং থেকে কেন্ডালের নট্ট কোম্পানি কলকাতায় আসে। 
১৯৪৭ সালে মাত্র ১৮ বছরের প্রতিভাশালী যুবক উৎপল দত্ত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সহপাঠীদের নিয়ে ‘‌দি অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ানস’‌ নাট্যদল গঠন করেছিলেন। তখন তিনি বিশ্বসাহিত্যের ক্ষুধার্ত ও অক্লান্ত পাঠক। ছাত্র অবস্থাতেই ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, থিয়েটার, চলচ্চিত্র এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে একজন নিরলস অভিযাত্রী। সেই বয়সেই উৎপলের অসামান্য মস্তিষ্ক ঋদ্ধ হয়েছিল কান্ট, হেগেল, ফয়েরবাখ, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন পাঠে। তাঁর সহপাঠী উত্তরকালের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক পুরুষোত্তম লাল পরে লিখেছিলেন, ‌‘‌Utpal was born brilliant’‌‌। 
১৯৪৭ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র উৎপলের একটি শেক্সপিয়ার প্রযোজনা দেখে জেফ্রি কেন্ডাল তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। উৎপলের ভাষায়, ‘‌কলেজ, লেকচার, পরীক্ষা, পাঠ্যপুস্তক প্রভৃতির বিরক্তিকর মায়া’‌ কাটিয়ে তিনি কেন্ডালের ‘‌শেক্সপিয়ারিয়ানা’‌ নাট্যদলে যোগ দিয়েছিলেন। কেন্ডালের তীক্ষ্ণ জহুরির চোখ আসল সোনা চিনতে ভুল করেনি। কেন্ডালের শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণে উৎপল কালক্রমে একজন প্রকৃত আন্তর্জাতিকমানের পেশাদার অভিনেতা ও পরিচালক হয়ে ওঠেন। তাই উৎপল ১৯৭২ সালে রচিত মৌলিক ও মননশীল গবেষণাগ্রন্থ ‘‌শেক্সপিয়ারের সমাজচেতনা’‌‌র‌ উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘‌আমার শেক্সপিয়ার পাঠের গুরু, শেক্সপিয়ার অভিনয়ের শিক্ষক জেফ্রি কেন্ডালকে।‌’‌
১৯৪৭ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, এই পর্বে কেন্ডালের ‘‌শেক্সপিয়ারিয়ানা’‌ নাট্যদল বিপুল সাফল্য ও কৃতিত্বের সঙ্গে কলকাতার শিক্ষিত দর্শকদের অভিভূত করেছিল। ১৯৪৭–‌৪৮ সালে সবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য ভারতে অস্ত গেলেও কলকাতায় তখনও পুরোমাত্রায় সাহেবিয়ানার প্রভাব। তাই কলকাতার অভিজাত ও কুলিন ‘দ্য স্টেটসম্যান’‌ পত্রিকায় কেন্ডালের যাবতীয় নাট্যপ্রযোজনার বিস্তারিত সমালোচনা হয়েছিল। এই পর্যায়ে কেন্ডালের ‘‌শেক্সপিয়ারিয়ানা’‌ নাট্যপ্রযোজনায় ‘‌ম্যাকবেথ’‌, ‘‌হ্যামলেট’‌ ও ‘‌জুলিয়াস সিজার’‌ নাটকে উৎপলের অভিনয় ‘দ্য স্টেটসম্যান‌’‌–‌এর নাট্যসমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। 
১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে কেন্ডালরা দেশে ফিরে গেলেন। জেফ্রি কেন্ডালকে গুরুরূপে বরণ করে তাঁর ‘‌শেক্সপিয়ারিয়ানা’‌  থিয়েটার দলের সুশৃঙ্খল সৈনিকের জীবন বেছে নিলেও উৎপল তাঁর নিজস্ব নাট্যদল ‘‌দি অ্যামেচার শেক্সপিয়ারিয়ানা’‌ বন্ধ করে দেননি। এই দলের ‘‌ওথেলো’‌ নাট্যাভিনয় দেখে ১৯৪৮ সালের ৫ জুলাই ‌‘দ্য স্টেটসম্যান‌’‌–এর  নাট্যসমালোচক লেখেন '‌‌It was Utpal Dutta'‌s 'Othello'‌ who dominated the play. Had Mr. Geoffrey Kendal of the 'Shekespeareana' ‌been there last night he would have warmed his acting.'‌ 
কেন্ডা‌লরা ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে উৎপলের নেতৃত্বে ‘‌লিটল থিয়েটার গ্রুপ’‌ বা এলটিজি–‌র জন্ম হয়। ১৯৫১ সালে উৎপল ‘‌ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে’‌ যোগ দেন। কিন্তু দশ মাস উৎপলের ভাষায় ‘‌জনতার মুখরিত সখ্যে’‌ থাকার পর  প্রবল রাজনৈতিক বিতর্কে জর্জরিত হয়ে সঙ্ঘ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। 
১৯৫৩–‌৫৪ সালে জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর থিয়েটার দল নিয়ে আবার ভারত সফরে এলেন। উৎপল গুরুর ডাকে সাড়া দিয়ে ভ্রাম্যমাণ শিল্পীদলের শরিক হন। নিজের নাট্যদল লিটল থিয়েটার গ্রুপ থেকে ছুটি নিয়ে উৎপল কেন্ডালের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। জেফ্রি কেন্ডালের দলে থাকার সময় তাঁর বড় মেয়ে জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর প্রিয়তম ছাত্র উৎপল দত্তকে নিজের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী বলে মনে করতেন। উৎপলের প্রতি কেন্ডালের এই দুর্বলতা ও অনুরাগ আমৃত্যু অটুট ছিল। তাই কেন্ডাল দম্পতি উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের এই প্রণয় নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। 
উৎপলের মেজদা ব্রিগেডিয়ার মিহিররঞ্জন দত্ত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসার। তিনি কর্মসূত্রে স্বাধীন ভারতের বিভিন্ন শৈলশহরে বসবাস করেন। তিনি যখন দেরাদুনে ছিলেন, তখন জেফ্রি কেন্ডাল সপরিবার তাঁর থিয়েটার দল নিয়ে সেখানে এলে খুবই হইচই হয়েছিল। অগ্রজ মিহিররঞ্জনের আন্তরিক আতিথ্যে কেন্ডাল–সহ দলের অন্য কলাকুশলীরা প্রায়শই পানভোজনে মিলিত হয়ে মেতে উঠতেন। এরপর মিহিররঞ্জন সিমলায় বদলি হন। কেন্ডাল তাঁর নাট্যদল নিয়ে সিমলায় অভিনয় করতে এলে আবার মিহিররঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়। সেই সময় একদিন মিহিররঞ্জন ছোট ভাই উৎপলকে সিমলার একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁতে আমন্ত্রণ জানান।  উৎপল তাঁর প্রেমিকা কেন্ডালকন্যা জেনিফারকে নিয়ে সেখানে হাজির হন। মিহিররঞ্জন প্রেমিকা–সহ ছোট ভাইকে সাদরে আপ্যায়ন করেছিলেন। অর্থাৎ দুই পরিবারের মধ্যে এই প্রেমের সম্পর্ক স্বীকৃত ছিল। সে বড় রমণীয় স্বপ্নের সন্ধ্যা। 
১৯৯৩ সালে উৎপল প্রয়াত হওয়ার পর দিল্লিতে তাঁর মেজদা অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার ব্রিগেডিয়ার মিহিররঞ্জনের সঙ্গে দেখা করতে যান শোভা সেন। সেই সময় মিহিররঞ্জন শোভা সেনকে সিমলার সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেন, ‌‘‌ওদের তখন প্রেম চলছিল। উৎপল জেনিফারকে ভালবাসত।’‌ এমন–কি বলেন, ‘‌জেনিফারের অনেক চিঠিই মার কাছে ছিল।’‌ তখন শ্রীমতী সেনের উত্তর ছিল, ‘‌সে সব কথা আমি সবই জানি।‌ সেই সমস্ত চিঠিও আমি দেখেছি।’‌ অবশ্যই জেনিফারের সেই সব যৌবনের প্রেমপত্র তাঁর প্রেমিক উৎপলকে লেখা।
কিন্তু জেনিফার বা উৎপলের লেখা সেই সব মহামূল্যবান প্রেমপত্র এখনও অনাবিষ্কৃত থাকায় তা সাধারণ পাঠক, নাট্যগবেষক এবং ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। উৎপলের মতো একজন ভারতবিখ্যাত সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ/‌অনুভূতির রোমান্টিক জগতের দরজা কেন ভাবীকালের গবেষকদের কাছে বন্ধ হয়ে থাকবে?‌ কেনই বা তাঁর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিজীবনের বহু জটিল, রহস্যময় ও একক মুহূর্তের ছবি এখনও ধূসর অন্ধকারে আবৃত?‌
একই ঘটনা ঘটেছে বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায়ের জীবনেও। শান্তিনিকেতনের ছাত্র অবস্থায় সত্যজিতের লেখা অগণিত প্রেমপত্র বিজয়াকে বাড়ির ভয়ে নষ্ট করে ফেলতে হয়েছিল। কেউ যদি দেখে ফেলে এই আশঙ্কায় সত্যজিতের চিঠি পড়ে তিনি ছিঁড়ে ফেলতেন। এর ফলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।
সত্যজিৎ–‌গবেষক এবং দেশের শিল্পের ইতিহাস রচয়িতাদের হাত থেকে একটি হীরকখনি ফসকে গেল। কারণ এরমধ্যে সাত রাজার ধন অন্য এক মানিক আবিষ্কৃত হতেন। বিজয়া রায় নিজেও পরবর্তী সময়ে এর জন্য বেদনাহত হয়েছিলেন।
আমরা জানি, গুরুকন্যা জেনিফার কেন্ডালের সঙ্গে উৎপলের প্রথম যৌবনের সেই উদ্দাম, ভরাপ্রেম স্থায়ী হয়নি। এই বন্ধন ছিন্ন হওয়ার সঠিক কারণ জানি না। কিন্তু উৎপলের মনে এই প্রণয়বিচ্ছেদের তীব্র যন্ত্রণা ও দহনের জ্বালা গভীর ছাপ রেখে যায়। এমন–কি জেনিফারের সঙ্গে উৎপলের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার এক দশক পরেও সেই প্রবল ক্ষত শুকিয়ে যায়নি। মোটামুটি ১৯৫৫ সালের পর উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ১৯৬৫–‌৬৬ সালে সাত মাস প্রেসিডেন্সি জেলের বন্দিজীবনে উৎপল চারটি অনবদ্য ইংরেজি কবিতা লিখেছিলেন— সেটা আগেই বলেছি। এরমধ্যে একটি অপ্রকাশিত কবিতায় ফুটে উঠেছে মুছে যাওয়া পুরোনো প্রেমের স্মৃতিতে তিক্ত, ক্রুদ্ধ, যন্ত্রণাময় ছবি। কিন্তু কেন উৎপলের হৃদয়বিদারক রক্তাক্ত সেই কালজয়ী কবিতাটি এখনও অপ্রকাশিত?‌ কেনই বা কবিতাপ্রেমী, নাট্যমোদী উৎপলচর্চার তন্নিষ্ঠ পাঠককুল এই সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত?‌ এলটিপি পর্বের প্রথম যুগে উৎপলের নাট্যসহযোগী অভিনেতা সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণেও এই প্রসঙ্গ এসেছে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি এক রাতের বর্ণনায় এই সহ–অভিনেতা লিখেছেন, ‘‌এক রাতে তিনি হাপুস নয়নে কেঁদেছেন। নিজ গুরুকন্যার প্রতি প্রণয়ের ব্যর্থতা তাঁকে তীব্র জ্বালায় জ্বালিয়ে দিয়েছে। অশ্রুপাতে উচ্চকণ্ঠে নাম উচ্চারণ করে জ্বালা জুড়োতে চেয়েছেন।’‌ এই‌ মর্মবিদারী বিষণ্ণ বিবরণে এক সংবেদনশীল, ক্ষতবিক্ষত প্রেমিক উৎপলকে খুঁজে পাওয়া যায়।
উৎপলের সঙ্গে জেনিফারের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরেও গত শতকের ষাটের দশকের গোড়ায় দু‌জনে একসঙ্গে উত্তম–‌সুচিত্রা জুটির চিরন্তন প্রেমের ছবি ‘‌সপ্তপদী’‌তে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রে ওথেলো ও ডেসডিমোনার চরিত্রে নেপথ্যশিল্পীরূপে উৎপল ও জেনিফারের অমরসৃষ্টি আমাদের মনে চিরভাস্বর। তার পরেও মার্চেন্ট আইভরি সংস্থার প্রযোজনায় ১৯৭০ সালে ‘‌বোম্বে টকিজ’‌ ছবিতে উৎপলের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন জেনিফার কেন্ডাল (‌কাপুর)‌, অপর্ণা সেন ও শশী কাপুর। ইতিমধ্যে ১৯৫৮ সালে জেনিফার বিয়ে করেছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের অভিনেতা শশী কাপুরকে।
উৎপলের প্রথম যৌবনের প্রেমিকা, দুর্দান্ত অভিনেত্রী গুরুকন্যা জেনিফারকে নিয়ে পরিণত বয়সেও কি তাঁর মনে আপশোসের কালো মেঘ জমেছিল?‌ কারণ শশী কাপুরের ঘরনি হওয়ার পর জেনিফার মঞ্চের অভিনয় ছেড়ে দেন। এই ক্ষমতাশালী অভিনেত্রী জেনিফারের শিল্পীসত্তা অকালে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯৭৭ সালের ‘‌লিটল থিয়েটার ও আমি’‌ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধেও উৎপলের বিষণ্ণতা ও হতাশার কথা শোনা গেছে। জেনিফারের প্রতিভার বিকাশ না হতে পারায় উৎপলের চরম আশাভঙ্গের যন্ত্রণা খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তারপর বহমান জীবনের প্রবল স্রোতের মধ্যে তাঁর চেতন ও অবচেতনে মণিমুক্তোর মতো অন্য কিছু কবিতায় উঠে এসেছে সেই ব্যর্থ প্রেমের তীব্র দহন ও বেদনার স্মৃতি। বাংলায় লেখা উৎপলের সেই কবিতা তাঁর কাব্যসঙ্কলনে স্থান পেয়েছে।
উৎপল রচিত ‘‌একটি ইংরেজি গান’‌ কবিতায়  আবেগে কম্পমান, অনুভূতিপ্রবণ, স্বপ্নদ্রষ্টা প্রেমিক উৎপলকে আবিষ্কার করা যায়। পুরোনো প্রেমের স্মৃতিতে গভীর বিষাদের সুর বাজে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত কবিমনে। তিনি লেখেন—
‘‌একদিন শেক্সপিয়ারের নাটকে/‌ অভিনয়কালে তুমি তাকিয়েছিলে আমার দিকে,/‌ চারটে চোখ চুম্বনে রুদ্ধ,/‌ পেটের মধ্যে প্রজাপতির পাখার ঝাপট (‌তোমার ভাষায়)/‌ আর দু‌জনে পার্ট বলে গেলাম
স্রেফ অভ্যাসের বশে/‌ সেইসব চাওয়ারা আবার প্রাণ পায়,/‌ আবার প্রজাপতির পাখা ঝাপটায়/‌ যখন শুনি অজ্ঞাত ইংরেজ কবির গান—/‌ ‘‌সবুজ আস্তিন’‌।’‌
তখন কবিমনের অবচেতন থেকে উঠে আসে প্রজাপতির মায়াবী রঙের এক রোমান্টিক স্বপ্নের জগৎ, চুরমার হয়ে গিয়েও যা স্মৃতির কুয়াশার চাদরে বিবর্ণ হয়ে যায়নি।
এই কবিতায় প্রাচীন ইংরেজি গানের রূপকথার গল্প ব্যাখ্যা করেন কবি উৎপল। সেখানে আছে ‘‌সবুজ হাতা’‌ পোশাকে সজ্জিত এক ‘‌নাম না জানা প্রিয়া’‌, তার প্রেমিককে অস্বীকার করে দ্বার রুদ্ধ করেছিল। সেই প্রত্যাখ্যানের বেদনায় গানটি হয়ে ওঠে মর্মভেদী। এই অজ্ঞাত ইংরেজি কবিতার বিরহের সঙ্গীত যেন এক সর্বকালীন রিক্ত ও ক্ষতবিক্ষত প্রেমের শাশ্বত উপকথা। কবি উৎপল লিখেছেন—
‘‌আর যত কলহ তোমাতে আমাতে/‌ অভিমান আর হিংস্র অপমান,/‌ নখরে দন্তে আরণ্যক যুদ্ধ,/‌ সব এসে ভিড় করে স্মৃতির টিকিটঘরে,/‌ কেননা তুমিও তো দ্বার রুদ্ধ করেছিলে/‌ আমার মুখের ওপরে।’‌
কবিতাটি পড়ে কি মনে হয় না যে, দিনের আলোর দাবদাহের মধ্যে রাতের তারারা এখনও ঝলমল করে?‌ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,‌ ‘‌প্রেমের দুঃখ থাকে সমস্ত জীবন’‌। পুরোনো ব্যর্থ প্রেম কি গুনিনের হাত ফসকানো গোখরো সাপের মতো ফিরে ফিরে দংশন করছে কবিকে?‌ জানি না। তবে এই কবিতার মানসপ্রতিমা যে কবির প্রথম যৌবনের প্রেমিকা বিদেশিনী অভিনেত্রী জেনিফার কেন্ডাল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তাই এই কবিতায় উৎপল লিখেছেন—
‘‌আমার কাছে সে–‌গান মানে তুমি/ আর তোমার সুদূর মাতৃভূমি।/‌ ধূসর সে গানে কুয়াশা আর বরিষন/‌ যেন তোমায় জড়িয়ে ধরে/‌ গভীর আদরে,/‌ ঈর্ষায় আমি মরি জ্বলে।’‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top