দেবাশিস পাঠক: উনিশ শতকের গোড়ার দিক। শহর কলকাতা তখন বিদেশি শাসন-বাণিজ্যের সৌজন্যে ডাগর-ডোগর সদ্যযুবতীটি। বাংলার নব্যবাবুদের মনমজানো রাতপসারিণীদের মধুমাখা রূপেও তখন কলকাতার মিষ্টির উপচে পড়া যৌবনের হুল্লোড়। সেই ঠমক আজ, ১৮০ বছর পর,  ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শরীর আর চালসে ধরা চোখ নিয়ে টের পাওয়া মুশকিল। অগত্যা উপায় সেকালের নাগরিক কবির দৃষ্টি এবং সৃষ্টি। ‘বোধেন্দু বিকাশ নাটক’, তাতে একটি গান। তাল একতালা। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বর্ণনা দিলেন পুঁজিপীঠ কলকাতার রঙিন আসর জমানো নারীর। আর তাতেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রইল কলকাত্তাইয়া মিষ্টির বৃত্তান্ত। সেকেলে রসের ভিয়েন।
এমন ভিয়েনে ‘বিম্বাধর’ হয়ে যায় ‘পান্তুয়া’।  সেই পান্তুয়াসম অধর ‘ভাসিছে হাসির রসে’। আর সেই অধর নিঃসৃত কথা শুনলে মনে হয় সদ্য ভাজা ‘ছানাবড়া’ থেকে টুপটুপিয়ে রস ঝরছে— ‘পাক রেখে কড়া কড়া, /ভাজিতেছে ছানাবড়া,/ পড়ে রস, টপ টপ, মুখের বচন’। সেই কথা উপমিত হয়েছে জনাই-এর  ‘মনোহরা’-র সঙ্গেও— ‘মনোহর, মনোহরা, লোভিজে শ্রবণ’। যুবতীর চিবুক যেন ‘বর্ধমেনে-খাজা’। আর নাক?  ‘মরি মরি, কিবে নাসা,/নিখুতি সন্দেশ খাসা’। সামগ্রিকভাবে সেই রূপ-লাবণ্য ক্ষীর-মাখন-সর-ননী ছাড়া অন্যকিছুর কথা মনে করায়—‘দেহেতে লাবণ্য-নীর,/যেন পাতা সাজোক্ষীর,/ঢলঢল এই সর তায়, সুখের যৌবন’। এমন রূপের পসরা ভেতরকার পুরুষটাকে হাতছানি দেয়। তবে ইতস্তত ভাবটা কাটিয়ে ওঠা দায় হয়। আর সেই দ্বিধাগ্রস্ত মানসিকতাতেও স্বচ্ছন্দে লেপ্টে থাকে মিষ্টি-কথা— ‘না গেলে তো নয় নয়,/ যেতে এই করি ভয়,/ বোধ হয়, জিলিপি,/ জিলিপি, যেন মন’। 
তখনও কিন্তু নববর্ষের আগমনে লাইন পড়া শুরু হয়নি নকুড় নন্দী, কে সি দাশ, সেন মহাশয়দের দোকানের সামনে। তখনও ভীম নাগ মিষ্টির পসরা মাথায় করে শহরের উপকণ্ঠ জনাই গ্রাম থেকে আসতেন, মিষ্টি সাজিয়ে বসতেন কলকাতার বহুবাজারে একটা নির্দিষ্ট ছাউনির নীচে। তাতে সাজানো থাকত মনোহরাও। দক্ষিণেশ্বরে মন্দিরে নববর্ষের দিন তো বটেই, অন্যান্য পালাপার্বণেও জানবাজারের রানি রাসমণি মিষ্টি নিয়ে যেতেন সেখান থেকেই। তবে সে মিষ্টি মূলত মণ্ডা। রকমারি সন্দেশের নরম শরীরে তখনও কামড় বসানোর অভ্যেস রপ্ত হয়নি কলকাতার।
কেমন করে তৈরি হত সেই মণ্ডা ?
সে বৃত্তান্ত পাওয়া যাবে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের লেখা “মিষ্টান্ন-পাক”-এ। সেই বইয়ে দেওয়া রেসিপি অনুযায়ী মণ্ডার উপকরণ চারটে। ছানা, চিনির রস, ক্ষীর আর পেস্তার কুচি। ৩ সের (মানে ৩ কেজির কাছাকাছি) ছানা, আধ পোয়া (অর্থাৎ প্রায় ১২৫ গ্রাম) ক্ষীর, পেস্তার কুচি আর চিনির ঘন রস ৫ পোয়া ( মানে প্রায় ১ কেজি ২৫০ গ্রাম)। প্রথমে ছানার জল ঝরিয়ে সেটাকে বেটে নিতে হবে। তারপর চিনির ফুটন্ত রসে ছানা ফেলে সেটাকে নাড়তে হবে। ‘নাড়া কামাই দিলে আঁচ উঠিবে’ বিপ্রদাসের সতর্ক বাণী। অর্থাৎ বাটা ছানা চিনির রসে ফেলার পর নাড়ানোর ব্যাপারে ঢিলে দিলে চলবে না। ‘জ্বালে রস মরিয়া ঘন অথচ চিট-ধরা গোছের বোধ হইলে’ তবেই নাড়ানোতে রেহাই। এরপর জিনিসটা একটু ঠাণ্ডা হলে সেটাকে কাঠের বারকোশে রাখা। তাতেও কাজ ফুরল কই? ওটার সঙ্গে পেস্তার কুচি মিশিয়ে ভালো করে বাটতে হবে। পুরো মিশ্রণটাকে মিহি করতে হবে। তবে তা হবে মণ্ডা, যা বিক্রি হত সের দরে। মণ্ডা তৈরির সুলুকসন্ধান জানিয়েও বিপ্রদাসের সাফ কথা, “গীত-বাদ্যে সুর বোধ না হইলে যেমন তাহাতে ব্যুৎপত্তি হয় না, সেইরূপ সন্দেশাদি পাকে অভিজ্ঞতা না জন্মিলে কেবলমাত্র পুস্তক পড়িয়া কৃতকার্যতা লাভ করা যায় না।”
“ঠিকই তো”, নির্দ্বিধভাবে কথাটা সমর্থন করলেন তপনকুমার নাগ। ভীমচন্দ্র নাগের পঞ্চম পুরুষ। ওঁর ঠাকুরদার ঠাকুরদা ছিলেন ভীমচন্দ্র। বহুবাজারে যেখানটাতে তিনি জনাই থেকে এসে বসতেন পরবর্তীকালে সেখানটাতেই পাকা দোকানঘর তৈরি করেন ছেলে পরাণচন্দ্র। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভবানীপুরে বাড়ি যাওয়ার পথে রোজ সেই দোকান ঘুরে যেতেন। কিনতেন দুই সের মণ্ডা। দুটো চাঙাড়িতে। এক কেজি নিজেই গাড়িতে খেয়ে ফেলতেন। বাকিটা বাড়িতে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য। আর ভীম নাগের দোকানের যাত্রা শুরু ১৮২৬-এ।
ওই মণ্ডারই পরিবর্তিত রূপ একালের পারিজাত সন্দেশ। নকুড়ের নিজস্ব ব্র্যান্ড, জানাচ্ছেন প্রতীপ নন্দী। নকুড় নন্দী গিরিশচন্দ্র দে-র দোকানের বর্তমান কর্ণধার। তাঁর মা ভীম নাগের পরিবারেরই মেয়ে।
পারিজাত সন্দেশের সঙ্গে সেকালের মণ্ডার মূল ফারাক দুটো বিষয়ে। এক, পেস্তার কুচি শেষে নয়, প্রথমেই বেটে নেওয়া হয় ছানার সঙ্গে। দুই, কেওড়ার জল মেশানো হয় এতে। পারিজাতে গোলাপ জলের ব্যবহার নিষিদ্ধ।’ ফি বছর নববর্ষে নকুড়ের খাস ক্রেতাদের একটা বড় অংশ পারিজাত সন্দেশেরই ফ্যান।
শহর কলকাতার সাধারণ নাগরিক জীবনে যখন নববর্ষের সকালগুলোতে জারি থাকত মণ্ডা-রাজ, তখনও শোভাবাজার রাজবাড়ির ভিয়েনে তৈরি হত দেবভোগ্য গজা আর মোতিচুর। ছানা নয়, ময়দাতেই এদের তাবৎ মস্তানি। ভাল করে ঘিয়ের ময়েন দিয়ে ময়দা মাখা হয়। তারপর তা পুরু করে বেলা হয় বারকোশে। তারও পর তা ছুরি দিয়ে চৌকো চৌকো করে কেটে কড়াই ভর্তি ঘিয়ে ভাজা। রংটা খয়েরি হলে তবেই সেগুলো কড়াই থেকে তুলে চিনির ঘন রসে নাড়াচাড়া। এই হল গজার রাজকীয় রেসিপি।
আর মোতিচুর? সুকুমার সেনের অনুমান, এটাই ভারতের প্রাচীনতম মিষ্টান্ন। নামটা এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘মৌক্তিক’ থেকে। শব্দটার অর্থ ‘মুক্তার চুটকি’। সুকুমার সেন আরও জানাচ্ছেন, “বোঁদেরই শুকনো রূপ চিনি সংযোগে শক্তপাকে নাড়ু করলে হয় মোতিচুর।”
নববর্ষ-সহ নানা পুজো-পার্বণে রাজবাড়ির স্পেশাল ও ট্রাডিশনাল মেনুতে গজা-মোতিচুর-এর সঙ্গে থাকে আর একটা পদ। সেটা অবশ্য মিষ্টি নয়, তবে তাতেও ময়দার মস্তানি। চেনা নাম ‘ডালপুরি’। ‘পুরি’ কথাটি এসেছে ‘পুরীত’ থেকে। লুচির মধ্যে ডালের পুর। তার পর ঘিয়ে ভাজা। সেই ডালপুরি নিবেদন করা হত শোভাবাজার রাজবাড়ির গৃহদেবতা রাধাবল্লভজীকে। তাই অমন দেবভোগ্য পদের রাজকীয় নাম রাধাবল্লভী। রবীন্দ্রনাথ বাংলার বুকে সেন বংশের অক্ষয় শাসন লক্ষ্য করেছিলেন বল্লালসেন-লক্ষ্মণসেনের কারণে নয়, সেন মহাশয়ের সৌজন্যে। এহেন সেন মহাশয়ের যে কোনও কাউন্টারে আজও নববর্ষের দিনে আনচ্যালেঞ্জড্ হিরো ‘দরবেশ’। মোতিচুরের দানা সাদাটে। দরবেশ কিন্তু বহুবর্ণরঞ্জিত। দানাগুলো হলুদ, লাল, সবুজ রঙের নরম বোঁদে। ফকির-দরবেশের আলখাল্লা নানা রঙের কাপড়ের টুকরো সেলাই করে তৈরি হয়। 
আর কে সি দাস? রসগোল্লার কলম্বাস ? শুধু নববর্ষ নয়, বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বণে তাঁদের দোকানে সবচেয়ে চাহিদা সম্ভবত দুটো জিনিসের— রসগোল্লা আর রসমালাইয়ের। বাগবাজারের নবীন ময়রার আবিষ্কৃত রসগোল্লার অন্যতম সমঝদার ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কবি একবার ডাক্তার পশুপতি ভট্টাচার্যের কাছে নবীন ময়রার দোকানের স্পঞ্জ রসগোল্লা খাওয়ার ইচ্ছের কথা জানান। পশুপতি তাড়াহুড়োয় অন্য দোকানের রসগোল্লা কিনে কবির কাছে হাজির করেন। মুখে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে দেন, ও রসগোল্লা তাঁর কাঙ্ক্ষিত নবীনের দোকানের নয়। লজ্জিত পশুপতি পরে রবি ঠাকুরকে নবীন ময়রার তৈরি রসগোল্লা খাইয়ে তৃপ্ত করেন। 
রসগোল্লা ঘন দুধের মধ্যে রাখলে তা হয় রসমালাই। নবীন ময়রার উত্তরপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র ওরফে কে সি দাশের আবিষ্কার এটা।
ভীম নাগ থেকে নকুড়, সেন মহাশয় থেকে কে সি দাশ, সবার কাছেই সার সত্য একটাই। বদলায় সময়, সেইসঙ্গে রুচি আর চাহিদাও। আগে নবীন দাশের স্পঞ্জ রসগোল্লার সমান্তরালে পরাণ নাগের কড়াপাকের  রসগোল্লার চাহিদা ছিল। এর রঙ ঈষৎ লালচে, মিষ্টতা বেশি, রসটাও ঘন। এখন এমন মিষ্টির চাহিদা কমেছে। কে সি দাসের স্পঞ্জ রসগোল্লার সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু করেছে চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লা। মণ্ডা আর দানা পাকের কাঁচাগোল্লা খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত কাশিমবাজারের রানি স্বর্ণময়ী দেবী নতুন ধরনের মিষ্টি খেতে চেয়েছিলেন। সেই রাজকীয় চাহিদা মেটাতে বাজারে এসেছিল মিহি করে বাটা ছানার মধ্যে ক্ষীরের পুর ভরা ‘আবার খাবো’। কালান্তরে সেই ‘আবার খাবো’র জায়গা নেয় কেশর সংযোজিত দিলখুশ। সন্দেশে লাগে মোগলাই স্বাদ। চাহিদা আর স্বাদবদলের পরম্পরা মেনে এখনও বাংলার মিষ্টান্ন-সম্পদের কারখানায় পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে নিরন্তর। অ্যালমন্ডের ছোঁয়ায় নকুড় যদি আনে বাদামি সন্দেশ, তবে ভীম নাগের সন্দেশে লাগছে কমলালেবু থেকে ব্ল্যাকবেরি হরেক কিছুর ছোঁয়া। নতুন বাজারের নলিনচন্দ্র দাস যখন চকোলেটে সন্দেশে একাকার করে দিচ্ছেন তখন সেন মহাশয়ের সন্দেশ মেখে নিচ্ছে কাঁঠালের স্বাদ ও গন্ধ। ■

জনপ্রিয়

Back To Top