শ্রোতাদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। অজস্র শ্রোতা সামনের বেঞ্চিগুলো টপকে পাগলের মতো ছুটল স্রেফ স্বামীজিকে ছোঁয়ার জন্য। তাঁর কাছে
পৌঁছোনোর জন্য। স্বামী বিবেকানন্দের সেই শিকাগো–ভাষণের ১২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর। গৌরবময় দিনগুলি ফিরে দেখলেন দেবাশিস পাঠক

৯ নভেম্বর, ১৮৯৩, বৃহস্পতিবার 
সাতসকালে রামতনু বসুর গলিতে হাজির মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। হাতে একটা স্টেটসম্যান কাগজ। মহেন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের স্কুলে প্রধান শিক্ষক। তাই সবাই তাঁকে ‘মাস্টারমশাই’ বলে ডাকে। আরও প্রায় এক দশক পর, বাঙালি তাঁকে আর-একটা নামে চিনবে। শিক্ষা-শিক্ষকতা, এ সবের বাইরে, অন্য এক পরিচয়ে। তিনি হবেন শ্রীরামকৃষ্ণের ‘কথামৃত’ সঙ্কলক, শ্রীম। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। 
আজ তিনি হন্তদন্ত হয়ে এসেছেন রামতনু বসুর বাড়িতে। উত্তর কলকাতার এই সিমলা অঞ্চলে তাঁরও বাড়ি। মেছুয়াবাজার এলাকায়। সেখান থেকে হনহনিয়ে এখানে আসতে সময় লাগে বড়জোর ১২-১৫ মিনিট। 
রামতনু বসুর ভাইপো নন্দলাল। তাঁর একটি কন্যার বিয়ে হয়েছিল গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বিশ্বনাথ দত্তের সঙ্গে। বিশ্বনাথ গত হয়েছেন। বড় ছেলেটি তার ঠাকুরদার মতো ঘর ছেড়ে বিবাগী। আর যে দুটি ছেলে, মহেন্দ্রনাথ আর ভূপেন্দ্রনাথ, তাদের নিয়ে নন্দলাল বসুর কন্যা ভুবনেশ্বরী দেবী এখন বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মাস্টারমশাই ওঁদের কাছেই এসেছেন কার্তিকের এই সকালে।
আসলে, স্টেটসম্যান পত্রিকায় আজ একটা খবর বেরিয়েছে। আমেরিকার শিকাগোতে ধর্মমহাসম্মেলন বসেছিল। তারই সমাচার। 
প্রতিবেদনটা আদতে স্টেটসম্যানের নিজেদের খবর নয়। বোস্টন ইভিনিং ট্রান্সক্রিপ্ট থেকে নেওয়া। তাতে ফ্রান্সিস অ্যালবার্ট ডাউটি ধর্মসভায় উপস্থিত ভারতীয়দের একটা বিবরণ দিয়েছেন। সেখানেই বর্ণিত হয়েছে এক উজ্জ্বল হিন্দু সন্ন্যাসীর কথা। নাম স্বামী বিবেকানন্দ। ধর্মমহাসভায় তিনিই নাকি সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। যেমন নজরকাড়া চেহারা, তেমন মনে নাড়া দেওয়া কথাবার্তা। অপূর্ব ব্যক্তিত্ব, অসামান্য বাণী। চেহারা আর বাচনভঙ্গি লক্ষ্য করে বোস্টন ইভিনিং ট্রান্সক্রিপ্ট ছেপে দিল, স্বামী বিবেকানন্দ একজন ব্রাহ্মণ সাধু। আর সেই সংবাদের সুতো ধরে স্টেটসম্যান জানিয়েছে, বছর তিরিশ বয়সি এই যুবক কলকাতার ছেলে। 
এ সব পড়েই মাস্টারমশাই যারপরনাই উত্তেজিত। একবার তাঁর মনে হচ্ছে, এই স্বামী বিবেকানন্দ তাঁদের চেনা নরেন। সিমলা পাড়ার নরেন্দ্রনাথ দত্ত। মহেন্দ্রনাথ ও ভূপেন্দ্রনাথের বড় দাদা। কিন্তু পরক্ষণেই প্রশ্ন জাগছে তাই-ই কি? না এ কোনও কলকাতাবাসী মাদ্রাজি? বউবাজার অঞ্চলে বেশ কয়েকজন মাদ্রাজি অর্শ সারানোর চেম্বার খুলে বসেছে। তাদের নামে ‘স্বামী’ শব্দটা হামেশাই দেখা যায়। স্বামী বিবেকানন্দ বুঝি তাদেরই কেউ হবে। 
এমন সংশয় স্বাভাবিক। একাধিক কারণে স্বাভাবিক। কারণগুলো পরবর্তীকালে মহেন্দ্রনাথ দত্তই তাঁর স্মৃতিচারণায় খোলসা করেছেন। 
এক, মাস্টারমশাইদের চেনা নরেন্দ্রনাথের ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করার অভ্যাস আছে বলে কারও জানা ছিল না। আমেরিকায় গিয়ে তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটিয়েছেন, এটা প্রথম ধাক্কাতেই হজম করা কঠিন ছিল।  
দুই, হিন্দুর পক্ষে সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ। বিশেষ করে হিন্দু সন্ন্যাসীর পক্ষে। আর যায়ও যদি, তবে সে সেদেশে খাবেই বা কী, আর পরবেই বা কী? আমেরিকায় তো সাত্ত্বিক হিন্দুর খাবার পাওয়া যায় না। আর পোশাক-পরিচ্ছদ? সে নিয়ে সংশয়দীর্ণ প্রশ্নটা মহেন্দ্রনাথের ভাষায় এরকম: ‘‌আমেরিকা ঠান্ডা দেশ, সাহেবের দেশ, সেখানে ইজের পরিতে হয়, স্বামীজি গেরুয়া পরেন, তিনি কি করিয়া গেরুয়া ত্যাগ করিয়া ইজের এবং অন্য রঙের কাপড় পরিবেন?’‌ 
চার, নরেন্দ্রনাথের সন্ন্যাসজীবনের নাম। আলমবাজার বরানগর মঠে নরেন্দ্রর সতীর্থরা-ও ঠিকঠাক জানতেন না, তিনি কী নাম নিয়েছেন। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসেবে কখনও শোনা গিয়েছে তিনি বিবিদিষানন্দ, কখনও-বা সচ্চিদানন্দ। ফলে নাম নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ছিলই। 
সবচেয়ে বড় কথা হল বিবেকানন্দের আমেরিকা-যাত্রা নিয়ে চরম গোপনীয়তা। মহেন্দ্রনাথই পরবর্তীকালে জানিয়েছেন সেকথা। ‘‌স্বামীজি কথাটি অতি গোপন রাখিতে বলিয়াছিলেন।’‌ শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত অনুরাগীদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র সেখবর জানতেন। এঁরা হলেন ‘শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরাণী’ অর্থাৎ সারদা মা, ‘সান্যাল মহাশয়’ অর্থাৎ বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল (ইনি ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত’র লেখক), শরৎ মহারাজ অর্থাৎ স্বামী সারদানন্দ (ইনি রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম সম্পাদক, আমৃত্যু সেই পদে আসীন ছিলেন এবং ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ’-এর লেখক), যোগেন মহারাজ অর্থাৎ স্বামী যোগানন্দ এবং বিবেকানন্দের মেজভাই মহেন্দ্রনাথ নিজে। তবে কবে, কোথায়, কখন, কীভাবে স্বামীজি আমেরিকায় যাচ্ছেন, সেখবরটা ঠিকমতো মহেন্দ্রনাথেরও জানা ছিল না। তাই ৩১ মে ‘‌বোম্বাই’‌ থেকে বিবেকানন্দ জাহাজে উঠে পশ্চিমের দিকে রওনা দিয়েছেন, আর তার ৪৮ ঘণ্টা বাদে, ২ জুন মহেন্দ্রনাথ খেতরির রাজাকে চিঠিতে লিখছেন, তাঁর মা আর দিদিমা দুজনেই স্বামীজি বিশ্বভ্রমণে যেতে চাইছেন জেনে দারুণ উদ্বিগ্ন। 
মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত মহেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে কথা বলে নিঃসংশয় হলেন। এ তাঁদেরই নরেন। খুশিতে ডগমগ হয়ে মাস্টারমশাই বাড়ি ফিরলেন। আস্তে আস্তে সেই আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল বাংলার আনাচ-কানাচে। দিন কয়েকের মধ্যে। 
ফ্ল্যাশব্যাক
১৮ জুলাই, ১৮৯৩, শুক্রবার
‘এমপ্রেস অফ ইন্ডিয়া’ ইয়োকোহামা ছাড়ল। কানাডিয়ান প্যাসিফিক লাইনে নতুন তিনটে ‘এমপ্রেস’ জাহাজ সাগরে ভাসতে শুরু করেছে। প্রতিটি প্রায় ছ-হাজার টন ভার বইতে পারে। ‘এমপ্রেস অফ ইন্ডিয়া’ সেগুলিরই একটা। আর ইয়োকোহামা? টোকিওর সমুদ্র উপকূলে একটা বন্দর শহর। জাপানি ভাষায় ‘ইয়োকোহামা’ শব্দটার মানে ‘অনুভূমিক সৈকত’। ‘এমপ্রেস অফ ইন্ডিয়া’র যাত্রীদের একজন সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। গত ২১ এপ্রিল থেকে এই নামটাই ব্যবহার করছেন তিনি। এর আগে ‘সচ্চিদানন্দ’ নামটা ব্যবহার করছিলেন তিনি। তিন বছর পর রাজস্থানের খেতরিতে গিয়েছিলেন। সেখানকার শেখওয়াত বংশের রাজা অজিত সিংয়ের সঙ্গে স্বামীজির দারুণ সখ্য। দু-দুটো মেয়ের পর এবার মহারাজের ছেলে হয়েছে। শেখওয়াত রাজবংশের উত্তরসূরি এসে গেছে। সেই উপলক্ষে উৎসব। সেখানেই নিমন্ত্রিত ছিলেন স্বামীজি। আর নিমন্ত্রণকারীর পীড়াপীড়িতেই তাঁর নাম বদল। স্বামী সচ্চিদানন্দ থেকে স্বামী বিবেকানন্দ।   
নামে কী-ই বা আসে যায়? সন্ন্যাস নেওয়ার পর ভেবেছিলেন নাম নেবেন রামকৃষ্ণানন্দ। কিন্তু শশী মহারাজের ওই নামটা নেওয়ার বড্ড ইচ্ছে। তাই তখন নাম নিয়েছিলেন বিবিদিষানন্দ। তারপর ওই সচ্চিদানন্দ। ওটাই ব্যবহার করছিলেন। শেষমেশ মহারাজের পছন্দের নামগ্রহণ। বিবেকানন্দ নাম নিয়েই আমেরিকা যাবেন বলে জাহাজে চড়েছেন।  ৩১ মে ‘‌বোম্বাই’‌ বন্দর থেকে পেনিনসুলার জাহাজে চড়েছিলেন। স্রেফ জাপান দেশটা ঘুরে দেখবেন বলে কোবি বন্দরে নেমে পড়েছিলেন। সেখান থেকে সড়কপথে ওসাকা, কিয়োটো, টোকিও। আজ ফের জাহাজযাত্রী। গন্তব্য ভ্যাঙ্কুবার। 
জাপানে দেশলাই কারখানা দেখতে গিয়েছিলেন বিবেকানন্দ। সেখানেই প্রথম দেখা সেই লোকটির সঙ্গে। ইয়োকোহামায় ছিলেন ওরিয়েন্টাল হোটেল রেস্টুরেন্ট–এ। সেই লোকটিও ওই হোটেলে উঠেছিল। আবার এখন এমপ্রেস অফ ইন্ডিয়াতেও তাঁর সহযাত্রী। লোকটা লাখপতি। বোম্বাইয়ের নামজাদা ব্যবসায়ী। নাম জামশেদজি টাটা। জাপান থেকে ভারতে দেশলাই রপ্তানি করেন। একচেটিয়া কারবার। প্রচুর রোজগার। 
এমপ্রেস-এর ডেকে দাঁড়িয়ে দুজন। একজন অপরিচিত সন্ন্যাসী। প্রায় কপর্দকশূন্য। বয়স তিরিশের কোঠায়। অন্যজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। ধনী। বয়সও প্রায় ৫৪ বছর। প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে বললেন, জাপান থেকে দেশলাই নিয়ে গিয়ে দেশে বিক্রি করে জাপানকে টাকা দিচ্ছেন কেন? আপনি তো সামান্য কিছু দস্তুরি পান মাত্র। তারচেয়ে দেশেই দেশলাইয়ের কারখানা বসান না কেন? আপনারও লাভ, দেশের দশটা লোকের ভাতকাপড়ও জুটবে, আবার দেশের টাকা দেশেই থাকবে। 
সেবার টাটা নানা ওজর-আপত্তি দেখিয়ে কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তরুণ সন্ন্যাসীর কথাটা যে তাঁকে নাড়া দিয়েছিল, তা বোঝা গিয়েছিল বছর পাঁচেক পর। তখন বিবেকানন্দও রীতিমতো বিখ্যাত। ২৩ নভেম্বর, ১৮৯৮-এ লেখা একটা চিঠি। তাতে জামশেদজি টাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন পুরনো কথা। লিখেছিলেন, ‘‌আমার বিশ্বাস আপনি জাপান থেকে শিকাগোর পথে জাহাজে সহযাত্রীরূপে আমাকে মনে রেখেছেন।’‌ সেই সঙ্গে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর সদ্যপ্রতিষ্ঠিত টাটা রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর কর্মযজ্ঞকে সমর্থন করে স্বামীজি একটা প্রচার পুস্তিকা প্রকাশ করুন। তা হলে শিল্প-বাণিজ্যের উপযোগী গবেষণার ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়বে। স্বামীজির পরামর্শই তো তাঁকে ওই গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করেছে। 
শিকাগোতে পৌঁছনোর আগেই যজ্ঞের আগুন থেকে মশালগুলোর জ্বলে ওঠা শুরু হয়ে গিয়েছিল। অগ্নিহোত্রী যাজ্ঞিকটির নাম যে বিবেকানন্দ!
২৫ আগস্ট, ১৮৯৩, শুক্রবার
‘‌মিস কেটি স্যানবোর্ন সম্প্রতি পশ্চিম থেকে ফিরেছেন। গত সপ্তাহে তিনি ভারতীয় রাজা বিবেকানন্দকে আদর-আপ্যায়ন করেছেন। ঘোড়া পালন করে যে সংস্থাটি সেখানকার কর্মী এফ ডব্লিউ ফিলিপস-এর দেওয়া জোড়া ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চেপে তাঁরা দুজন গত শুক্রবার (১৮ আগস্ট) শহরের মধ্যে দিয়ে হুন্নেওয়েলের পথে যান।’‌ 
এদিন খবরটা বেরিয়েছিল ফ্রামিংহ্যাম ট্রিবিউন পত্রিকায়। সাপ্তাহিক পত্রিকা। প্রতি শুক্রবার বের হয়। ফ্রামিংহ্যাম ম্যাসাচুসেটস-এর মিডলসেক্স কাউন্টির একটা শহর। বোস্টন থেকে প্রায় বিশ মাইল পশ্চিমে এর অবস্থান। এখানকার অন্যতম দর্শনীয় জায়গা হুন্নেওয়েল। দুদিকে ঘাসে ঢাকা জমি। সেখানে পড়েছে উঁচু উঁচু এলম গাছের ছায়া। তার মাঝখান দিয়ে ছুটে চলেছে একজোড়া ঘোড়ায় টানা গাড়ি। ঘাসের জমিতে পুরনো বাড়ি, প্রাচীন গির্জা, পাথর দিয়ে বাঁধানো ঘোড়ার খাওয়ার জায়গা। সেসব দেখতে দেখতে চলেছেন ৫৪ বছর বয়সি প্রাণশক্তিতে ভরপুর একজন মার্কিন মহিলা আর ৩০ বছর বয়সি একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর মাথায় পাগড়ি বাঁধা। সেই জন্যই তাঁকে ‘ভারতীয় রাজা’ ভেবেছেন মার্কিন মুলুকের সাংবাদিক। 
মিস স্যানবোর্ন গোটা মহল্লাকে দেখাতে চান। উজ্জ্বল গেরুয়া রঙের আজব পোশাক পরা এই ভারতীয়কে দেখলে চারপাশের লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এই দুর্লভ মানুষটিকে যদি জাহির করে দেখানোই না গেল, তবে আর মজা কীসের! সেজন্যই ঘোড়ার গাড়িতে চেপে এমন ভ্রমণের আয়োজন। 
এক মাস আগে ছবিটা ছিল অন্যরকম। ২৫ জুলাই, মঙ্গলবার, সন্ধে সাতটা নাগাদ ভ্যাঙ্কুবারের বন্দরে ভিড়েছিল ‘এমপ্রেস’। কয়েক ঘণ্টা আগে কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়েজের দৈনিক অ্যাটলান্টিক এক্সপ্রেস ভ্যাঙ্কুবার ছেড়ে চলে গেছে। ফলে, সে রাতটা সেখানেই কাটাতে হয়েছিল বিবেকানন্দকে। বুধবার সকালে ট্রেনে চড়েছিলেন। তিন–তিনবার ট্রেন বদলে শিকাগোতে আসা। ক্যালেন্ডারে দিনটা ছিল ৩০ জুলাই, রবিবার। ঘড়িতে সময় তখন প্রায় রাত ১১টা। স্বামীজির সঙ্গে তখন ‘এমপ্রেস’–এর সহযাত্রী সি. লালুভাই।       
শিকাগোতে সেসময় বেজায় হইচই। তিন মাস ধরে চলছে ধর্মমহাসম্মেলনের প্রস্তুতি। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও ভেতর ভেতর শহরটা কেমন যেন মনমরা। অর্থনৈতিক মন্দার আতঙ্ক। ব্যবসা–বাণিজ্য লাটে উঠেছে। অনেক ব্যাঙ্ক বন্ধ। ব্যাপক বেকারত্ব। সব মিলিয়ে সাধারণ ভাবে আমেরিকানদের যেটা প্রধান চরিত্র বৈশিষ্ট্য, দিলদরিয়া মেজাজ, তাতে বেশ ভাটা পড়েছে। 
এরই মধ্যে বিবেকানন্দ এসে পড়েছেন। উঠেছেন একটা প্রথম শ্রেণির হোটেলে। ‘উঠেছেন’ না বলে বলা ভাল, উঠতে বাধ্য হয়েছেন। সাধারণ কম দামি হোটেলগুলোতে থাকতে পারেননি। হোটেল মালিকরা বাদামি চামড়ার লোককে থাকার অনুমতিই দেয়নি। ‘দূর দূর’ করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। কোথাও কোথাও তাঁকে ঢুকতে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে বর্ণবিদ্বেষের শিকার। তাই–ই, নিতান্ত বাধ্য হয়ে দামি হোটেলে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করা। সেখানে চামড়ার রং দেখা হয় না, পকেটে রেস্ত আছে কিনা, সেটাই দেখা হয়।
আর সেই প্রথম শ্রেণির হোটেলে থাকাটাই বিবেকানন্দের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াল। 
যেজন্য শিকাগোতে আসা সে কাজটা হওয়ার আশু সম্ভাবনা নেই। সঙ্গে কোনও শংসাপত্র নেই। শংসাপত্র ছাড়া ধর্মমহাসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ মিলবে না। তা ছাড়া নাম নথিভুক্ত করার শেষ তারিখও পেরিয়ে গিয়েছে। সুতরাং, শিকাগো ধর্মমহাসম্মেলনে নিজের দেশের কথা, নিজের ধর্মের কথা, নিজের মতো করে বলার সুযোগ আর নেই। ধর্মমহাসম্মেলনের বাইরেও সে সুযোগ তক্ষুনি–তক্ষুনি হবে, এমন সম্ভাবনাও নেই। বক্তৃতার মরশুম শুরু হবে হেমন্তে। সেজন্য আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। ওদিকে হোটেলভাড়া পড়ে যাচ্ছিল রোজ প্রায় ৩ ডলার। থাকা–খাওয়া মিলিয়ে প্রতিদিনের খরচ ৫ ডলার। রোজ এত খরচ হয়ে গেলে হেমন্ত অবধি টাকায় কুলোবে না। তা ছাড়া শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য যেরকম জামাকাপড় দরকার, সেসবও নেই। শিকাগোয় শীতের কামড় মারাত্মক। 
লালুভাই জাহাজ থেকে নামা ইস্তক সঙ্গে আছেন। মাদ্রাজ থেকে বরদা রাও একটা পরিচয়পত্র লিখে দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে এক দম্পতির সঙ্গে পরিচয়। ধর্মমহাসম্মেলন উপলক্ষে মেলা আর প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছে। ওয়ার্ল্ড কলম্বিয়ান এক্সপোজিশন। ভদ্রলোক সেখানকার ডিরেক্টর। তাঁর স্ত্রীও বেশ মিশুকে। লালুভাই থেকে শুরু করে এই মার্কিন দম্পতি, সবাই বিবেকানন্দের সঙ্গে পরিচয়ের পর একটাই কথা বলেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের উচিত ধর্মমহাসম্মেলনে যোগ দেওয়া। অবশ্যই। কিন্তু কেউই অতিথি হিসেবে তাঁকে রাখার জন্য কোনও বাড়ির দরজা খুলে দেননি। সম্মেলন শুরু হতে প্রায় পাঁচ সপ্তাহ বাকি। এই সময়টা যাতে বিবেকানন্দ শিকাগোতে থাকতে পারেন, সেজন্য তাঁর দিকে কোনও আর্থিক সাহায্যের হাতও ওঁরা কেউ বাড়িয়ে দেননি। হতাশ স্বামীজি ২০ আগস্ট একটা চিঠিতে লিখেছেন, ‘‌এঁরা বিদেশিদের নিয়ে বেশ কিছু মজা করতে চান, বেশ খানিকটা তামাশা— এই পর্যন্ত। কিন্তু যখনই এঁদের পকেটে হাত পড়ে তখনই পিছিয়ে যান।’‌
এই মজা করার বাড়াবাড়িটাই জীবন দুর্বিষহ করে ছেড়েছিল। রাস্তায় বের হলেই লোকজন ঝামেলা পাকাত। ঠেলা মেরে, গা টিপে দেখত এই কিম্ভূত–কিমাকার বেশ পরা ‘‌সন্দেহজনক’‌ আদৌ মানুষ কি?‌ কেউ কেউ আবার পাগড়ি ধরে টানাটানি করে বেজায় আমোদ পেত। 
দামি হোটেলের ভেতর এসব উপদ্রব নেই। কিন্তু সেখানে পাঁচ সপ্তাহ থাকার আর্থিক সামর্থ্য নেই। এরই মধ্যে শুনলেন বোস্টনে থাকা–খাওয়ার খরচ অনেকটা কম। সেজন্যই শিকাগো ত্যাগ। বোস্টনের ট্রেনে চড়ে বসেছিলেন। লালুভাইও বোস্টনে তাঁকে ছাড়তে এলেন। 
আর সেই ট্রেনেই আলাপ মিস কেটি স্যানবোর্নের সঙ্গে। 
বোস্টনের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। অজ্ঞাত জায়গা। অপরিচিত ব্যক্তি। শহরের ব্যস্ততম রাস্তাতেও ছেলেবুড়োর দল ধাওয়া করে। ‘‌আজব চিজ’‌ দেখার মজা নেয়। জিনিসপত্র ছুঁড়ে আমোদ পায়। পকেটে কয়েকটা মাত্র ডলার পড়ে আছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে মিস স্যানবোর্ন বললেন, আপনি ব্রিজি মেডোজ–এ আমার ফার্ম হাউসে থাকুন। 
পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলার বিবেকানন্দকে নিয়ে আগ্রহের কারণটা অবশ্য কদিন বাদেই বোঝা গেল। ভারত থেকে আসা এমন একজনকে তিনি ‘‌দুর্লভ সংগ্রহ’‌ হিসেবেই নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। রাস্তায় তাঁকে নিয়ে বের হলে, লোকজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এতেই তিনি বেশ আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন। তিনি ভীষণ খুশি। বাড়িতে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের নেমন্তন্ন করে ডেকে আনেন ‘ভারত থেকে আসা এক অদ্ভুত মানুষ’কে দেখাবেন বলে। বিবেকানন্দ দিন পাঁচেক আগে ব্রিজি মেডোজ থেকে মাদ্রাজের আলসিঙ্গাকে একটা চিঠি লিখেছেন। সব বুঝেশুনে সেখানে তাঁর সখেদ অনুভব, ‘‌এসব যন্ত্রণা সহ্য করে যেতেই হবে।’‌
তবুও মিস স্যানবোর্নের সঙ্গে আলাপটাই হয়ে দাঁড়াল ‘রহস্যময় ঈশ্বরের লীলা’। এই মহিলাই অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের সঙ্গে বিবেকানন্দের পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাইট দুর্দান্ত পণ্ডিত। ‘ডিকশনারি অফ আমেরিকান বায়োগ্রাফি’–তে তাঁর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘এনসাইক্লোপেডিক’ বলে। তিনি তাঁর অ্যান্নিসকোয়ামের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন বিবেকানন্দকে। বোস্টন থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে সমুদ্রের উপকূলে ছবির মতো সুন্দর গ্রাম অ্যান্নিসকোয়াম। সেখানে বিবেকানন্দের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পর ২৯ আগস্ট জন রাইটের স্ত্রী মেরি টাপ্পন রাইট তাঁর মাকে লিখলেন, ‘‌সময়ের বিচারে তাঁর (বিবেকানন্দের) বয়স হবে বছর তিরিশ, সভ্যতার বিচারে কয়েক শতাব্দী। ...এ পর্যন্ত যত মানুষ দেখেছি তার মধ্যে ইনিই সবচেয়ে কৌতূহল-উদ্দীপক।...আশ্চর্যরকম বুদ্ধিমান। যুক্তিকে নিজস্ব চিন্তাধারায় সাজিয়ে সিদ্ধান্তে আসার ব্যাপারে ভীষণ স্পষ্ট। তুমি কক্ষণও তাঁকে হোঁচট খাওয়াতে বা ছাড়িয়ে যেতে পারবে না।’‌
আর জন রাইট চিঠি লিখলেন ধর্মসম্মেলনের কর্তৃপক্ষকে। নির্দ্বিধায় জানালেন, ‘‌আমাদের সকল পণ্ডিত অধ্যাপকদের পাণ্ডিত্যের সমষ্টির চেয়ে ইনি (বিবেকানন্দ) বেশি পাণ্ডিত্যের অধিকারী।’‌
ধর্মসম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থাটা পাকা হয়ে গেল। 
৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩, শনিবার
প্রায় মাসখানেক পর ফের শিকাগোতে বিবেকানন্দ। ডিয়ারবোর্ন আর পক স্ট্রিটের মোড়ে ডিয়ারবোর্ন স্ট্রিট স্টেশন। লাল ইট দিয়ে তৈরি। সেখানেই ট্রেন থেকে নামলেন। তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেলবেলা। ‘সারাগোটিয়ান’ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। হেডিংয়ে লেখা ছিল, ‘অর্ধেক মূল্যে বিশ্বমেলায়’। বিজ্ঞাপনের বক্তব্য, ‘ডেলাওয়ার অ্যান্ড হাডসন রেল–রোডে চমৎকার ব্যবস্থা...যাতায়াতে ২৬ ডলার’। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই শিকাগোতে প্রত্যাবর্তন। 
স্টেশনে নামার পর টের পেলেন, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানকার ঠিকানাটাই হারিয়ে ফেলেছেন। ফলে শিকাগোর একটা মালগাড়ির ওয়ার্ডে একটা মালগাড়ির ওয়াগান বা বক্স–কারে রাত্রিযাপন। 
পরদিন রবিবার। সকাল হতেই দরজায় দরজায় ঘুরে খাবার আর অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা। বাদামি চামড়া। মুখে না–কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ। দুমড়ে–মুচড়ে একাকার গেরুয়া আলখাল্লা। মাথায় অদ্ভুত একটা পাগড়ি। এমন চেহারায় ভিক্ষা চাওয়ার নিটফল, বাড়ির কর্ত্রীরা পত্রপাঠ বিদায় করে দিল। পরিচারক–পরিচারিকারা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। কেউ কেউ আবার দু–চার কথা শুনিয়েও দিল। 
পেটে খিদে। শরীরে ক্লান্তি। মনজুড়ে অপমানের জ্বালা। তাই নিয়েই দু–আড়াই মাইল হাঁটলেন বিবেকানন্দ। তারপর আর না–পেরে ডারবোর্ন স্ট্রিটের পশ্চিম দিকটায় একটা কার্ব মেটালের ওপর বসে পড়লেন। 
আচমকা উল্টো দিকের একটা বাড়ির দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলেন শ্রীমতী জর্জ ডব্লিউ হেল। সরাসরি জানতে চাইলেন, স্যর, আপনি কি ধর্মসম্মেলনের প্রতিনিধি? স্বামীজি বললেন, হ্যাঁ। 
বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে বিবেকানন্দকে প্রাতরাশ খাওয়ালেন শ্রীমতী হেল। রেল স্টেশন থেকে তাঁর মালপত্র আনার জন্য লোক পাঠালেন। তারপর নিজে স্বামীজিকে ধর্মমহাসভার অফিসে নিয়ে গেলেন। সেখানে ড. জন এইচ বারোজ–সহ অন্য কর্মকর্তারা স্বামীজির আসার অপেক্ষায় বসেছিলেন। 
সব অনিশ্চয়তার অবসান। 
১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩, সোমবার
শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউট। আজ থেকে এখানে ধর্মমহাসম্মেলনের শুরু। বেলা দশটায় দশবার ঘণ্টা বাজিয়ে উদ্বোধন। ঘণ্টার গায়ে খোদাই করা সেই মহামন্ত্র। ‘তোমাদের কাছে আমার নব নির্দেশ— পরস্পরকে ভালবাসো’। ব্রাহ্ম, ইহুদি, ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, তাও, কনফুসিয়াস, শিল্টো, জরথ্রুস্ট  এবং খ্রিস্টান (যার মধ্যে রয়েছে ক্যাথলিক, গ্রিক চার্চ আর প্রোটেস্ট্যান্ট)— এই প্রধান দশটি ধর্মের জন্য ঘণ্টাটা দশবার বাজানো হল। 
চার–পাঁচ হাজার শ্রোতা প্রেক্ষাগৃহে। আর তাঁদের সামনে, মঞ্চের ওপর বক্তারা বসে আছেন। কারও মাথায় পাগড়ি, কারও মুণ্ডিত মস্তক, কারও আবার লম্বা চুল। কারও পোশাক উজ্জ্বল গৈরিক, কারও পোশাকে আঁকা ক্রস, কারও পোশাকে আধখানা চাঁদ, কারও আবার রামধনু রঙের ঢেউ খেলানো পোশাক। সে এক অপূর্ব মনোহর দৃশ্য, জানিয়েছেন ওয়াল্টার হাউটন, তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে। 
ওই বক্তাদেরই একজন স্বামী বিবেকানন্দ। মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, পরনে লালচে আংরাখা আর ‘ব্রোঞ্জ’রঙা মুখ। এসবই সকলের চোখ টানছিল। 
মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির পর বিকেলের অধিবেশন। চারজন বক্তা বললেন। ভাষণ লিখে এনেছিলেন। সেগুলোই পড়লেন আর কী! স্বামীজির ওসব প্রস্তুতি নেই। মনে মনে জপ করছেন। ধ্যানে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশেই বসেছিলেন ধর্মযাজক বেনেট মারি। ফরাসি সুপণ্ডিত। বলার যখন সুযোগ এল, তখন সেটা অন্য বক্তাকে ছেড়ে দিতে যাচ্ছিলেন বিবেকানন্দ। দ্বিধাগ্রস্ত সন্ন্যাসীকে বেনেট মারিই বললেন, না, আপনিই এবার বলুন। অনুরোধের সুরে কিছু একটা ছিল।  সুযোগটা আর ছাড়লেন না। মনে মনে সরস্বতীকে প্রণাম জানিয়ে উঠে দাঁড়ালেন বিবেকানন্দ। 
প্রাচ্য উঠে এসে দাঁড়াল পশ্চিমের সামনে। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে নয়। প্রতিস্পর্ধার ঔদ্ধত্য নিয়েও নয়। সহিষ্ণুতার আত্মপরিচয় নিয়ে। 
বিবেকানন্দ সম্বোধন করলেন, ‘‌সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা।’‌ 
তারপর প্রায় মিনিট দুয়েকজুড়ে হাততালি। শ্রোতাদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। অজস্র শ্রোতা সামনের বেঞ্চিগুলো টপকে পাগলের মতো ছুটল স্রেফ স্বামীজিকে ছোঁয়ার জন্য। তাঁর কাছে পৌঁছনোর জন্য। সেই দৌড়ে মহিলারাও শামিল।
শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন মিসেস ব্লজেট। প্রেক্ষাগৃহের উন্মাদনা দেখে তিনি তখন মনে মনে বলছেন, ‘‌বাছা, তুমি যদি এই আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারো, তবে বুঝব তুমি স্বয়ং ঈশ্বর’‌। 
মাঝে মাঝে তীব্র হাততালির ছেদ। তার মধ্যেই বিবেকানন্দর বলে চলা। পশ্চিমি দুনিয়ার বুকে তিনি ছুঁড়ে দিতে লাগলেন সনাতন ধর্মের শাশ্বত লক্ষণগুলো। সেদিনের বক্তৃতা শেষ করলেন এই বলে, ‘‌আমি সর্বতোভাবে বিশ্বাস করি, আজ এই ধর্মমহাসম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সম্মান জানাতে যে ঘণ্টাধ্বনি নিনাদিত হল, তা ধর্ম নিয়ে উন্মত্ততার, তরোয়াল বা কলম দিয়ে করা যাবতীয় নির্যাতনের এবং অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া ভাইদের পথে যাবতীয় বাধার মৃত্যু ঘোষণা করবে।’‌ 
ফের হর্ষধ্বনির বজ্রনির্ঘোষ। ফের আকুল শ্রোতাদের বিপুল উচ্ছ্বাস। 
২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই ধর্মসম্মেলন। আরও অনেকবার বলার সুযোগ পাবেন বিবেকানন্দ। ততদিনে মার্কিন জনতা আরও ভালভাবে চিনে নেবে ভারতীয়দের হৃদয়ের রাজাধিরাজকে। 
বাকিটা ইতিহাস।  
   
‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top