কোচবিহারের সুনীতি অ্যাকাডেমি বিদ্যালয় আজ বাংলার গর্ব। অন্যদের কাছে দৃষ্টান্তও বটে। এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় এই স্কুলের চারটি মেয়ে মেধাতালিকায় রয়েছে। জীবন গড়ার নানা উপাদানে আজ তারা উজ্জ্বল। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস জানালেন, মেয়েদের মনোযোগ, একাগ্রতার কথা।

সকালের গুমোট গরম আর তীব্র রোদ্দুরে বাইরে বেরোনো তো দূর, তাকাতেই ভয় করছিল। 
বেরোতে হল, রেজাল্ট বলে কথা। তবে শেষ পর্যন্ত ‌সবটুকু দাবদাহ জুড়িয়ে দিল সঞ্জীবনী। সকাল ৯টা থেকেই ফোন। ক্লান্তি– শ্রান্তি–হতাশা দূর ক‌রে আবার দৌড়োনোর উদ্দীপনায় ফেরা। কিশোরী সঞ্জীবনী, ময়ূরাক্ষী, ঐতিহ্য, প্রগতি, সঞ্চারী, স্মৃতি.‌.‌.‌ আরও কত যে মুখ ক্লাসঘর উজ্জ্বল করে বসে থাকে!‌ ওদের জন্য ক্লাসঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া সূর্যের আলোর সঙ্গে লতানে গাছপালাও বড় উজ্জ্বল হয়। ওরা মনোযোগী। শুধু পড়াশোনামনস্ক হওয়াই কি বড় কথা? না, মন রয়েছে আরও অনেক কিছুতে‌।‌ 
দেখি, দলবল নিয়ে স্কুল পারফরমেন্সের ক্লাসে মশগুল। স্কুলের ঐতিহ্য অনুযায়ী মহীয়সী নারীর নামে নামে বিভিন্ন হাউসে ভাগ হয়ে বসে যায় ওরা। প্রতি শনিবার। থাকেন শিক্ষিকারাও। গার্গী, নিবেদিতা, রাসমণি, লক্ষ্মীবাঈ। চারটি ভাগই বড় চমৎকার!‌ পরস্পরের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা। নিজেদেরই আরও সুন্দর, আরও দক্ষ,আর সমৃদ্ধ করে তোলার প্রয়াস। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, লেখায়, সঙ্ঘবদ্ধতায় মেতে ওঠে আনন্দে। মন প্রাণ ঢালে। তাদের ‘‌বিষহরা পালা’‌ নাটক পৌঁছে যায় বাংলা পেরিয়ে সুদূর ভূপালে। এখানেও নাট্যমনস্ক কন্যারা তুলে আনে সর্বভারতীয় পুরস্কার। দেয়াল পত্রিকা তৈরিতে ওরা দারুণ। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি?‌ ‘‌মৃণালিনী’‌ ক্লাবের উদ্যোগে পরিবেশ–পরিচ্ছন্নতায়, নারী দিবস পালনে কিংবা রবীন্দ্র–নজরুল জয়ন্তী উৎসবে। সবে ওরা অনন্যা আর অসাধারণ। এই তো এবছরই ‘‌বুড়ির ঘর পুড়িয়ে’‌ দারুণ এক বসন্ত–উৎসবের সূচনাও করল মেয়েরা। স্কুলে দিন শুরু হয় কচি কণ্ঠের শুভ সূচনায়। ‘‌ওঁ পিতা নো হসি পিতা নো বোধি মা মা হিংসী সবিতা গীতানি.‌.‌.‌‌ মন্ত্রপাঠে বা ‘‌তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে.‌..‌‌’‌ প্রার্থনা সঙ্গীতে। স্কুল শেষে এসে দাঁড়ায় সুনীতিদেবীর শ্বেতশুভ্র মূর্তির পাশে। প্রণাম জানায়। এই মেয়েরাই তো ভালবাসা কেড়ে নেয় সবটুকু। মনে হয়, এ আমার সবথেকে বড় পাওয়া। বড় আনন্দের।  স্কুলের অনন্যা, শতাব্দী, প্রত্যুষা, পিয়াসী, সোহিনী, মনীষিতা, শঙ্খমালা, অমিতা, তোর্সারা বড় কথা শুনে চলা লক্ষ্মী মেয়ের দল। 
ওদের দুষ্টুমিও অন্যরকম। মানে বলতে চাইছি, অল্প ক‌জন গ্রন্থন, নীলাব্জ, মৃন্ময়, স্বপ্লিল, দেবস্মিত, তাপসকে বাদ দিলে অনেক বেশি সংখ্যায় ঐতিহ্য, সঞ্জীবনীদের গভীর মনোযোগী হতে দেখেছি আমার এই দীর্ঘ শিক্ষিকাজীবনে। এক স্কুল থেকে অন্য স্কুল একই ছবি। ঐতিহ্যের মতো ওরা কেউ কেউ বছরের পর বছর টিভি না দেখেও কাটিয়ে দিতে পারে।
মেয়েরা অনেক বেশি মন দিয়ে লেখাপড়া করে। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। অনেকের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অন্যরকম হ‌তেই পারে। কিন্তু আমি এমমটাই দেখেছি। 
সঞ্জীবনীর প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বড় মন নরম করা এক ভাললাগা জড়িয়ে যায় তক্ষুনি। শৈশবে যখন বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠগ্রহণ করছে, হাতের লেখা লিখছে কিংবা সহজপাঠ, পথের পাঁচালী পড়ছে আমি দেখেছি ভাললাগার, আগ্রহের, আবেগের, মনোযোগের পার্থক্য। একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের পরিবর্তন। বয়েজ হাইস্কুলের যে ছেলেদের আমাকে পড়াতে হয়েছে, তার কয়েক বছর পর আমার ছেলেও পড়েছে, ওরা মূল (‌টেক্সট‌)‌ বইয়ের সুন্দর করে পড়িয়ে দেওয়া লাইনগুলোর প্রতি মনোযোগী হচ্ছে খুব কম।.‌.‌.‌ ‘‌চটজলদি ম্যাম, কতগুলো প্রশ্ন বলে দাও তো!‌ ইম্পর্ট্যান্ট কী আছে বলো.‌.‌.‌’‌ সেখানে মার খেল আমার জীবনানন্দ বোধ, ধুয়ে গেল রবীন্দ্রচেতনা, মুছে গেল কর্ণকুন্তী সংবাদের আবেদন। অথচ এই কর্ণকুন্তী সংবাদই যখন আমি আমার ক্লাস ঘুরে ছাত্রীদের পড়িয়েছি, নিজেই হয়ে পড়েছি একাত্ম, দেখেছি অনেক ছাত্রীর চোখে জল। অদ্ভুত পরিচ্ছন্ন হাতের লেখায় নিজেরাই উত্তর লিখে দেখিয়ে নিয়েছে। মহেশ পড়াতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ক্লাস ফ্রেন্ড। তা হলে ছাত্র আর ছাত্রীর মধ্যে মনোজগতের মূলগত এক তারতম্য ঘটে যায় নাকি?‌‌
দুঃখ পাই, আমি কেন একজন অন্তত ‘‌গ্রন্থন’‌ গড়ে তুলতে পারলাম না ?‌‌
আসলে মেয়েদের মনের গঠনগত কোমলতা বা গভীরে নেওয়ার ক্ষমতার কথা বললে হয়তো অনেকে এ পার্থক্য করে নেওয়াকে ঠিক সাদা চোখে দেখবেন না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট দেখেছি কন্যাদের ধারণ ক্ষমতা, মনে রাখা, সহনশীলতা, সংস্কৃতিমনস্কতায় গভীর মনোযোগের ছবি।
সুনীতি অ্যাকাডেমি বিদ্যালয় আমাকে শৈশবের চারণভূমিতে নিয়ে এসেছে। স্কুলের গেট থেকে আমার ছোটবেলা লাফিয়ে বেড়ায়। এক্কা–দোক্কা খেলে, আমলকী গাছের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। টিফিনঘরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া চিলের নখ ডানার ঝাপটের শব্দ শুনি। এখন সেখানে নেই অনেককিছু। হারিয়ে গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে ইতিহাস আর মহারানির তৈরি করা স্কুলের ধারাবাহিক ঐতিহ্যটুকু। 
সে সময় নারী জাগরণ, বাইরে বেরিয়ে শিক্ষা নেওয়া মেয়েদের কাছে সাবলীল হয়ে ওঠেনি, সে সময় এই প্রান্তিক রাজনগরে কেশবচন্দ্র সেন–কন্যা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লব। অন্তঃপুরিকা বধূদের, বাড়ির মেয়েদের ফিটন গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিলেন মেমসাহেবের কাছে সব রকম শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে। সে ট্র‌্যাডিশন সমানে চলছে। অন্য উপায়ে আধুনিকতায় অধিকাংশ মেয়েই ঘরের কাজ সামলে বহু বাধা বিপত্তিতেও পড়াশোনা ছাড়েননি। প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী হয়ে ওঠার পিছনে তাঁর পরিশ্রম আর একাগ্রতা, ইচ্ছের কথা কে না জানে!‌ আর মাদাম কুরি?‌ তাঁর নতুন আবিষ্কারকে নারী বলে মর্যাদা আদায় করতে কত না প্রয়াস করতে হয়েছে। শুধু বাংলায় নয় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নারীরা যাঁরা প্রথম থেকে দাঁতে দাঁত চেপে একাগ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়েছেন, তাঁরা নিজের পায়ের তলার মাটি তৈরি করতে পেরেছেন, হয়তো সে সময়ের নিরিখে নয়, কয়েক যুগ পেরিয়ে যাওয়ার পর ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছেন আজও।
অন্তঃপুরে সমাজের চোখের অন্তরালে বেড়ে উঠেছে যে নারী, অনেক সময় রণক্ষেত্রে তুলে ধরেছে তারা খোলা তরবারি। ইতিহাসের গতিপথ চিনিয়ে দিয়েছেন এঁরা। এই নারীরাও এক একজন কারও মা, বোন, কন্যা কিংবা স্ত্রী। কিন্তু সবার ওপর তাঁরা সাহসী যোদ্ধার পরিচয় দিয়েছিলেন দীর্ঘ সময়জুড়ে। রানি দুর্গাবতী, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, কিট্টুর চেন্নাম্মা, বেগম সামরু, তারাবাঈ ভোসলে, চাঁদ বিবি, রানি অবন্তী.‌.‌.‌ কতজন!‌ এ সব তো ইতিহাস। কিন্তু সদ্য চোখের সামনে যেসব নারীর মিছিল দেখি— তাঁরা আইপিএস। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কলকাতা পুলিসের প্রথম ডেপুটি কমিশনার দময়ন্তী সেন ১৯৯৬–‌র। ভদ্রেশ্বরে এক দরিদ্র কুমোরকন্যার দারিদ্র‌্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও উনিশতম স্থান অধিকার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নাম তাঁর শ্বেতা আগরওয়ালা। ১৯৮৯–‌এ ভগবতীপ্রসাদ গোপিকা অ্যানিম্যাল রিসোর্স ডেভেলপমেন্টে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হন প্রথম। ১৯৯৪–‌এ ইন্ডাস্ট্রি কমার্স অ্যান্ড এন্টারপ্রাইসেও নন্দিনী চক্রবর্তী প্রথম সেক্রেটারি। এফ পি আই, ডব্লিউ বি সি এস‌‌–‌এ এগিয়ে থাকা নারীরা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ একাগ্র মনোযোগের। স্টেট ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান পদে অরুন্ধতী ভট্টাচার্য, ১৯৭৩ সালে, হায়ার সেকেন্ডারিতে লেখক–কবি অনিতা অগ্নিহোত্রীর বোর্ডে স্থান করে নেওয়ার খবরটাও লিখতে ইচ্ছে করে। ইন্দ্রাণী সেন গায়িকা, তিনিও হায়ার সেকেন্ডারিতে স্ট্যান্ড করেছিলেন।
এই এগিয়ে থাকা নারীরাই মেয়েদের একাগ্র, একাত্ম মানসিকতার প্রশ্নে উদাহরণ হয়ে থাকবে।
আসলে বরাবর যেটা আমার ছাত্রীদের বলি, ‘‌ইচ্ছে’‌। ইচ্ছের বিকল্প কিছু নেই। পিছন ফিরে না তাকিয়ে নিজের ভিতরের অদম্য ইচ্ছের বারুদগুলো আগুন হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা চাই। শুধু একটু উসকে দেওয়া। নিজেই হ‌তে হয় এক সময় নিজের শিক্ষক। অপছন্দের কিছু নির্ভাবনায় ত্যাগ করতেই হবে। বর্তমান শতাব্দী নারীর চরম অবমাননার সাক্ষী। কিন্তু সে অবমাননা মেনে না নিয়ে তাঁরা ফুঁসে উঠেছে। নিজস্ব ভাবনার বাগানে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে নিজের জগৎ। কবিতার সেই লাইনগুলো বোধহয় উঠে আসে সে কারণেই.‌.‌.‌ ‘‌অঙ্কুরিত বীজের কান্না ছুটছিল খুব/‌কান্নারা সব স্ফটিক হল/‌বীজের নরম ছোঁয়া এখন মহীরুহ.‌.‌.‌/‌বাবা, তুমি দাঁড়িয়ে দেখো/‌বালতি রঙে বিষ মিশিয়ে মারতে পারে/‌মেয়েটা তোমার মানুষ মারে.‌.‌.‌/‌ ছোবল দিয়ে বাঁচতে শেখে.‌.‌.‌’‌। (‌রক্তপ্রহর)‌
কন্যাশ্রী প্রকল্পও অবশ্যই সারাদিনে কর্মপ্রচেষ্টার এক পরম প্রাপ্তি দারিদ্র‌্যসীমায় বাস করা মেয়েদের।
এভাবেই যুগ একে একে বদলেছে, বদলে গেছে নারী মুখ। মানুষের মুখ। অন্য দেশ থেকে এসে ভগিনী নিবেদিতা ভারতবর্ষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।  
মহারানি বৃন্দেশ্বরী, সুনীতিদেবী, নিরুপমাদেবী যে সাহিত্যচর্চার সূচনা করেছিলেন রাজনগরে সেও আজ অব্যাহত সঞ্জীবনী, আলোকিতার হাত ধরে।
দু’‌বছর আগের কথা মনে পড়ছে। এটিআই বিল্ডিংয়ে প্রধান শিক্ষক–শিক্ষিকার ট্রেনিং। আমাকে পাঠানো হ‌ল কলকাতার নামকরা গভর্নমেন্ট কো–‌এড স্কুলে। আমার সঙ্গে সেখানে অনেকেই পড়াবেন। আমার ছিল ক্লাস এইটের এক সেকশন। সদ্য শেষ হয়েছে তখন ইংলিশ ক্লাস। টগবগ করছে সব। আমি ঢুকছি, একটি ছেলে আর কয়েকটি মেয়ে ছাড়া সকলেই ছুটোছুটি, ব্যস্ততায়। কেউ গল্পগুজবে রয়েছে। ফুরসত নেই। পরের ক্লাসের যে ঘণ্টা পড়েছে, সে খেয়ালই নেই। আমি সেখানে অচেনা শিক্ষক। চার্ট ব্যবহার করে, গান গেয়ে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। অতগুলো ছেলের মধ্যে মেয়েরা প্রথম থেকেই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ‘‌ই টু ই’‌ পদ্ধতিতে ক্লাসে ঘুরে ঘুরে গ্রুপ করে আয়ত্তে আনা গেল। সেদিনের সেই ছাত্রীদের কথা মনে থাকবে। বলতে দ্বিধা নেই, সেদিন মনে হয়েছিল, ছেলেরা যখন বড় হবে তাদের দুষ্টুমিগুলোর বড় হয়ে চোখে পড়বে না তো?‌‌ ক্লাস শেষ হ‌তে স্বস্তিবোধ করেছিলাম।‌ আবার সে কথাই ঘুরে আসে, মেয়েদের একাগ্রতা বোধ অত্যন্ত প্রখর।
সমবয়সি মহিলা দলের গসিপে কোনওদিন থাকিনি। পর‌ম বন্ধু তাই খুদে মেয়েরাই। এখন তো লাল ঘরের পর্দার আড়াল থেকে আমার এই ‘‌আমি’‌ হয়ে ওঠবার ইতিহাস আর ছেলেবেলা খুঁজি। চলচ্চিত্রের মতো ভেসে ওঠে ছবি। বুঝি, সেই ‘‌হারিয়ে যাওয়া’‌ কবিতাটা বলার সময় আমি হয়ে উঠি আমার বাবার বামী। আর আমার মেয়ে হয়ে যায় আমার বামী। মেয়েকে ছোট্টবেলায় যখন কবিতা শুনিয়ে ভাত খাওয়াতাম, গভীর মনোযোগী সে কবিতা শুনতে শুনতে একেবারে শেষে ‘‌আকাশ জুড়ে উঠত কেঁদে হারিয়ে গেছি আমি’‌.‌.‌.‌ শেষ করেছি কী করিনি, হাউ হাউ ক‌রে কেঁদে উঠেছিল। কী বুঝেছিল আড়াই বছরের মেয়েটি!‌
ফলাফলে সর্বস্তরে মেয়েরা এগিয়ে আসছে দৃপ্ততায়। যে কোনও প্রশাসনিক দপ্তরে সিংহভাগ অংশে খুব ধীরে হলেও কয়েক বছরে দ্রুত মেয়েদেরই দেখছি। ঘরে বাইরে প্রবল চাপ নানাভাবে তাদের চেপে রাখার চেষ্টার পরেও তারা শিক্ষা–সংসার সবেতেই এক নম্বর হতে পারে। সে ক্ষমতার পরিচয় বার বার পেয়েছি।
সব চেয়ে বড় চমক ছিল মাধ্যমিক রেজাল্টের দু’‌দিন পর। ৮ জুন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরোনোর দিন। স্কুলে আমার ঘরে চেয়ারে বসে আছি। রেজাল্ট এসেছে, কে কত নম্বর পেয়েছে দেখে নিচ্ছি। ঠিক সে সময়ই ফোনটা এল। 
— কে বলছেন.‌.‌.‌!‌
— আমি কি হেড মিস্ট্রেসের সঙ্গে কথা বলছি?‌
— হ্যাঁ বলুন.‌.‌.‌
— আমি ’‌৫৯ সালের পাশ আউট।.‌.‌.‌ আমি রোমাঞ্চিত।
— কী নাম আপনার?‌‌
— ভবানী চক্রবর্তী (‌মুখোপাধ্যায়)‌। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী।
সত্যি বলতে কী, শীর্ষেন্দুবাবুর নাম শোনার আগেই আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। এত ভাল লাগা জীবনে হয়নি। উনি বলছেন, চার–চারটে মেয়ে আমার সুনীতি অ্যাকাডেমির রত্ন।.‌.‌.‌ সেই হেড মিস্ট্রেসের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ততক্ষণে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনে চলেছি। .‌.‌.‌ তখন মাত্র ত্রিশ জন কী তার বেশি মনে নেই। অ্যাংলো হেড মিস্ট্রেসের কাছে পড়েছি, তাঁর নামও মনে পড়ছে না। মনে হ‌ল, মুহূর্তে ছুটে যাই। এক প্রস্থ ভাল লাগা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে তো আছেই। কথা দিলাম যাব। যোধপুর পার্কের বাড়ির ঠিকানা দিলেন, আমাকে দেখতে চান। আমি তাঁকে ছুঁয়ে আসার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। তাঁর সে আগুনটুকু আমার মধ্যে সঞ্চারিত করতে চাই যে। রোমাঞ্চিত আমি দেখতে পাচ্ছি বর্তমান রামভোলা স্কুলের কাছে এক লালচে ইটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন সেই মেয়ে, ’‌৫৮–’‌৫৯ ‌সাল। সেই ট্র‌্যাডিশন সমানে চলেছে, একাগ্রতার, মনোযোগের। 
প্রান্তিকতার কথা অনেকে বলেন। আমি তাতে বিশ্বাসী নই। উত্তরবঙ্গে বেড়ে ওঠা ‘‌আমি’–‌র সঙ্গে যে চিরকালীন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর সুর আর কবিতা। আমার ছোট্ট খুদে বন্ধু আর কন্যাসম ছাত্রীদের মধ্যে। এ চলা থামবে না। ওরা শীর্ষে পৌঁছবেই। শুধু চাই সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব আর সহানুভূতি। মেয়েদের কোমলতার সুযোগটুকুর অসৎ ব্যবহার তো হয়েই চলেছে দেশ থেকে দেশান্তরে। সে গণ্ডিটুকুর মধ্যে সহ্য করে মুখ বুজে তো তারা বসে নেই। প্রতিরোধ করছে। রুখে দঁাড়াচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। অতি মেধাবী থেকে মাঝারি, মাঝারি থেকে কম নম্বর পাওয়া মেয়েরা—সকলেই কোনও না কোনও ভাবে মেলে ধরছে নিজেকে। অঙ্ক, বিজ্ঞান না পারলে কলাবিদ্যা আছে, সাংস্কৃতিক মঞ্চ আছে, শিল্পের কত ভাগই না আছে। একাগ্রতা মূলমন্ত্র বলেই ছন্দা গায়েন ছুঁয়ে আসে উচ্চতম শৃঙ্গ। 
কষ্ট, অনটন, প্রতিবন্ধকতার পাহাড় টপকে মেয়েরাই পারে সফলতর উচ্চতম শৃঙ্গকে ছঁুতে। 

 

সুনীতি অ্যাকাডেমির কৃতী ছাত্রীদের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা।  ছবি:‌ প্রসেনজিৎ শীল

‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top