চলে গেল ৭ সেপ্টেম্বর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ৮৫তম জন্মদিন।  তিনি আছেন আমাদের মন ভাল লাগায়, আমাদের মনকেমনে। তঁার জন্মদিন উপলক্ষে এই লেখাটি তঁার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা। লিখেছেন কবি সুবোধ সরকার। যিনি সুনীলবাবুর সঙ্গে বহু দিবস ও রজনী কাটিয়েছেন। দেশে, বিদেশে ঘুরেছেন একসঙ্গে। পরস্পরের সুখ-দুঃখের সাথি। কবিতা, পত্রিকা, শিল্প, জীবন নিয়ে কতই না কথা হত দু‌জনের! আজ আবার হল। এবার‌ সুবোধ কল্পনায় মিলিত হলেন সুনীলের সঙ্গে। রচিত হল এক কাল্পনিক অথচ গুরুত্বপূর্ণ ডিসকোর্স। আলাপ।


সুনীলদা একটু রোগা হয়েছেন। সিগারেট প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। ঝুলপিটা যেমন সাদা ছিল, তেমনি সাদা আছে, যেটা দেখে একবার একটি উনিশ বছরের মেয়ে সুনীলদার মুখের ওপর বলেছিল, আপনি ঝুলপিতে সাদা রং লাগিয়েছেন কেন?‌ তাতে কী শিশুর মতো হাসি সুনীলদার। একটা টকটকে লাল পাঞ্জাবি পরে আছেন, যে পাঞ্জাবিটা দেখে স্বাতীদি বলেছিলেন, ষাঁড়ে তাড়া করবে। কিন্তু না, ষাঁড় নয়, তাড়া করেছিল এমন এক অসুখ, যে অসুখ না এলে এখন আমি একটা টেবিলে সুনীলদার সঙ্গে বসে থাকতাম।‌ বসে থাকতাম?‌ বসে আছি তো।
আমি প্রথমেই সুনীলদাকে বললাম, ‘‌কাফকা থেকে বিভূতিভূষণ, শেক্সপিয়র থেকে রবীন্দ্রনাথ— সবাই মৃত্যুকে নিয়ে বার বার ভেবেছেন, বলেছেন। আপনি মৃত্যু নিয়ে, অসুখ নিয়ে কথা বলতে চাইতেন না। এখন বলবেন’‌?‌
সুনীল:‌ আসলে যে চারজনের নাম করলে তুমি, ওঁরা চারজনই অমরত্ব চেয়েছিলেন। পেয়েছেন। যাঁরা যত বেশি অমরত্ব প্রত্যাশী, তাঁরা তত বেশি বেশি মৃত্যু নিয়ে লেখেন, ভাবেন, বলেন, তত বেশি মৃত্যুকে ভয় পান। আমি তো ছোটবেলাতেই ঘোষণা করেছিলাম, আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি। আমি অমরত্ব চাই না। কে আমার লেখা পড়ল, কে পড়ল না, কী আসে যায়, আমি তো আর দেখতে আসছি না। কে আমাকে এখনও ভালবাসে, কে আমাকে এখনও অপছন্দ করে, আতে আর কিছু যায় আসে না। আমি জীবন খরচ করে লিখেছি, মানুষের ভালবাসা পেয়েছি। বহু দেশ–‌বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছি, ভাল খাবার খেয়েছি, ভাল সুরা পান করেছি, বহু সুন্দরী নারীর সঙ্গ লাভ করেছি। আমি মুখ ভার করে বসে থাকিনি। মৃত্যুর আগেও, কয়েক মিনিট আগেও, বাথরুমে পড়ে যাওয়ার আগে, আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানীয় মুখে দিয়েছি।
সুবোধ:‌ মৃত্যুর পর লেখকের একটা জীবন থাকে। বহু বড় লেখক আর বড় থাকেন না, বহু লেখক হারিয়ে যান, আবার বহু লেখক উঠে দাঁড়ান, যা তিনি জীবদ্দশায় পাননি, মৃত্যুর পরে পেয়ে যান। যেমন এলিজাবেথান যুগের কবি জন ডান–‌কে কেউ চিনত না, চারশো বছর বাদে তরুণ কবি এলিয়টের হাত ধরে উঠে এসেছিলেন, যেমন আপনাদের হাত ধরে উঠে এলেন জীবনানন্দ দাশ। এটা কি আপনাকে টানে না যে, জীবদ্দশায় এত জনপ্রিয় একজন লেখক কীভাবে মৃত্যুর পরে বিলীন হয়ে যান?‌
সুনীল:‌ দেখো, কেউ তো আর এসব ভেবে লিখতে বসে না, আমি মৃত্যুর পরে বিখ্যাত হব। আমাকে নিয়ে সিনেমা হবে, আমাকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় শতবর্ষ হবে। পাড়ায় পাড়ায় স্ট্যাচু বসবে। কিন্তু একটা অহঙ্কার সমস্ত লেখকেরই থাকে। অভিমান থাকে, বিশেষ করে যাঁদের লেখা সমকালে ঠিকমতো গৃহীত হয় না, তাঁরা কফিহাউসে বসে বিড় বিড় করে বলেন— আজ আমার লেখা কেউ পড়ছে না, কাল পড়বে। এই বিশ্বাসটাকে আমি সম্মান করি, এটা না থাকলে লেখা যায় না। চলতি লেখাকে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। চালু লেখাকে না বলতে পারার মধ্যেই একজন লেখক জন্ম নেন। সেই চালু লেখা যতই অপ্রতিরোধ্য হোক অথবা ট্র‌্যাশ।
সুবোধ:‌ আপনাকে কখনও জিজ্ঞসা করা হয়নি, আপনার পাশে এতবার এতরকম মঞ্চে বসার সুযোগ পেয়েছি, কখনও কখনও আগুনের গোলার সামনেও বসেছি আমরা, বিশেষ করে উত্তাল সময়ের টেলিভিশনের মঞ্চে, যেটা জিজ্ঞেস করতে পারিনি আজ করছি। আপনি কি মনে করেন লেখকের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া উচিত?‌
সুনীল:‌ লেখক একজন মানুষ। তিনি একটি রাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁর রয়্যালটি থেকে টিডিএস কাটা হয়। তিনি একজন ট্যাক্স পেয়ার। তিনি সংবিধানের অংশ। তিনি আইনের অংশ। রাষ্ট্রের যা ভাল তিনি যেমন তাঁর অংশ তেমনি খারাপেরও তিনি অংশীদার। তিনি রাজনীতিতে যদি উপস্থিত থাকেন, সেটা স্বাভাবিক বলে ধরতে হবে। যদি তিনি বলেন আমি বাবা ওসবে নেই, তা হলে বুঝতে হবে, তিনি কিছু লুকোচ্ছেন না। কোনও লেখক নিউট্রাল থাকতে পারেন না। পৃথিবীর তাবড় তাবড় লেখক রাজনীতিতে জড়িয়েছেন, মতামত দিয়েছেন, মতামত ফিরিয়ে নিয়েছেন, আবার নতুন মতামত তৈরি করেছেন। শেক্সপিয়র থেকে মিলটন— কে রাজনীতি করেনি?‌ আরে শোনো, তুমি তো শেক্সপিয়র পড়াতে, এখানও পড়াও?‌
সুবোধ:‌ হ্যাঁ, পড়াই সুনীলদা।
সুনীল:‌ ‘‌ম্যাকবেথ’‌ লেখা হয়েছিল রানিকে খুশি করার জন্য। রানি এলিজাবেথ। ম্যাকবেথ আসলে এমন একটা নাটক, যার ভেতর একটা ক্যাপসুল ভরা আছে। সেটা নতুন নতুন সময়ে খুলে দেখা যায়। এমন কোনও সময় নেই ইতিহাসে, যেখানে অত্যাচার নেই, এলিজাবেথান যুগটাকে আমরা সুবর্ণ সময় বলি, কিন্তু ইংল্যান্ডে তখনও তো জ্যান্ত মানুষ পোড়ানো হত। ওই ক্যাপসুলটাই আসল। ওটার ভেতরে সময়ের আত্মা লুকনো থাকে। ওর মতো মহান লেখক যদি রানিকে খুশি দিয়ে থাকে, আমরা কোন ছার?‌ দুটো ট্রেন্ড দেখা যায় সারা পৃথিবীতে। একটা হল রাষ্ট্র বিরোধিতা আর একটা হল রাষ্ট্র–‌সমর্থন। দু’‌দিকে জোরালো জোরালো লেখক থাকে। যখন জার্মানিতে, সারা পৃথিবীতে অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট লেখকসঙ্ঘ তৈরি হয়েছে, তখনও অনেক লেখক ওই সঙ্ঘে নাম লেখাননি। যেমন একটা বিস্ময়কর নাম এজরা পাউন্ড। আরও বিস্ময়কর ঘটনা হল ১৯২৩ এবং ১৯২৬ সালে, তারিখটা একটু এদিক–‌ওদিক হতে পারে, এখন তো আর ক্যালেন্ডার নিয়ে ভাবি না, সময়টা আমার কাছে মহাসময় রূপে আমার কাছে চা খেতে আসে। দু’‌দুবার রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করতে ইতালি গিয়েছিলেন। কম কথা হয়নি সেদিন, বিশেষ করে ইউরোপের কাগজগুলো তো রবীন্দ্রনাথকে ধুয়ে দিয়েছিল।
সুবোধ:‌ আপনি কেন জড়িয়েছিলেন?‌
সুনীল:‌ দাঁড়াও, দাঁড়াও, তুমি আবার এসব কী প্রশ্ন করছ?‌ তুমি নিজেই বা কেন গিয়েছিলে?‌
সুবোধ:‌ আমি গিয়েছিলাম বুদ্ধদেববাবু মানুষটাকে ভাল লেগেছিল। উনি আমার কবিতাকে প্রকাশ্যে যে সম্মান দিয়েছিলেন, সেটি তিনি কোনও সিপিএম–‌এর কবিকেও দেননি, সেটা ছিল আমরা কাছে, আমার পর্ণকুটিরে চাঁদের আলো। এখনও মনে আছে, কবিতা উৎসবের পরের দিন সকালে শঙ্খবাবু ফোন করে বলেছিলেন, ‘‌বুদ্ধদেব আপনার কবিতার খুব প্রশংসা করছিলেন’‌। তখন আমি মধ্য চল্লিশ, আমার কাছে ওটা ছিল অল্প বয়েসে রবীন্দ্র পুরস্কার। মাথা ঘুরে গিয়েছিল। সিপিএম যখম মধ্যগগনে, তখন আমি সিপিএম–‌এর বিরুদ্ধে ১৯টা কবিতা লিখেছি, তা সত্ত্বেও বুদ্ধদেববাবু বলেছিলেন, ‘‌কবিতার ভাষায় যদি কেউ সমালোচনা করেন, সেটা আমাদের নিতে হবে, সহ্য করতে হবে’‌। এটা নিয়ে কবি জয়দেব বসু খুব গাঁইগুঁই করত, আপনার কাছেও করেছে। আমি তো ওঁর মতো কার্ডহোল্ডার ছিলাম না। কিন্তু আমি ওদের জন্য টেলিভিশনে গিয়ে ফাটিয়েছি। ভুল করেছিলাম। বেণুবনে মুক্ত ছড়িয়ে ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের মূল্য এখনও দিয়ে চলেছি। এখনও ওরা আমাকে প্রতিদিন অপমান করে। আমার কথা থাক সুনীলদা। আপনি ছিলেন আমাদের চোখে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক সম্রাট।
সুনীল:‌ আমাকে ওরা যেদিন বঙ্কিম পুরস্কার দেয়, তখন ওদের একজন বড় মন্ত্রী আমাকে কুলাঙ্গার বলেছিল। আমিও ওদের বিরোধিতা করেছি। ওদের ভ্রান্ত নীতির নিন্দা করে ইন্টারভিউ দিয়েছি। কিন্তু বুদ্ধদেবের সঙ্গে একটা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠায় আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম। আমি ওদের সমর্থন করেছিলাম। আমার কোনও রিগ্রেট নেই তোমার মতো। আমাকে কেউ আর ছুঁতে পারবে না, আমি বেঁচে গেছি। কিন্তু তোমাকে ওরা ছাড়বে না। আরও ছিঁড়ে খাবে। যেমন সুভাষদাকে (‌মুখোপাধ্যায়)‌ ওরা আমৃত্যু খেয়েছে।
সুবোধ:‌ আপনি অমরত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু পসচারিটি তৈরি করে গেছেন। আপনি যেভাবে তরুণ লেখক, তরুণ কবি, তরুণ গবেষকদের জন্য করেছেন, তা অতি বিরল এক ঘটনা। আপনার সময়ের কোনও লেখক এটা করেননি। তাঁরা নিজেদেরটুকু নিয়েই থেকেছেন, বলেছেন, ‘‌আমি কাউকে রেকমেন্ড করি না’‌। বলেই নিজের ঘরের ছেলেকে পাইয়ে দিয়েছেন। আপনি চেয়েছিলেন তরুণ কবিরা উঠে আসুক, তাঁরা সামনে এসে দাঁড়াক। আপনি আপনার পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে তাদের বসতে বলেছেন, এটা কি আপনি সত্যি ভবিষ্যতের কথা ভেবে করেছেন, না দল বাড়ানোর জন্য, কৃত্তিবাস করার জন্য করেছেন?‌
সুনীল:‌ দল তো করতেই হবে। কে দল করে না?‌ দেখাতে পারবে?‌ প্রতিটি লিটল ম্যাগাজিনের দল আছে। আবার এও সত্যি ভবিষ্যতের জন্যেও কয়েকটা মুখ রেখে যাওয়ার দরকার আছে, যাঁরা তোমার টর্চ বেয়ারার হতে পারবে। তবে আমার আসল জায়গাটা অন্যত্র। আমি তরুণ কবিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালবাসতাম। তারা কী লিখছে, তারা কী ভাবছে, তারা কী চায়— এগুলো জানা থাকলে আমার নিজের লেখা লিখতে সুবিধে হত। একজন লড়াকু তরুণ কবিকে আমি যখন দেখতাম রাস্তা পার হচ্ছে, তখন আসলে আমি দেখতে পেতাম আমাকে, যেন আমি রাস্তা পার হচ্ছি চল্লিশ বছর আগে।
সুবোধ:‌ আপনার শেষ জন্মদিনের আগে একজন লেখিকা, যাঁকে আপনিই তুলেছিলেন, কলকাতায় নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, তিনি লিখলেন, আপনি তাঁকে যৌন–নিগ্রহ করতে চেয়েছিলেন। আমরা ধিক্কার দিয়েছিলাম সেই লেখিকাকে ও তাঁর কলকাতার সমর্থকদের। কিন্তু ততদিনে আপনার যা হওয়ার হয়ে গেছে, জরা এগিয়ে এল আপনার ত্বকে, অসুখ বেরিয়ে এল সারা শরীরে, চোখের সামনে দেখলাম, ভয় আপনাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলতে শুরু করেছে। তখন আমি, মল্লিকা, স্বাতীদিই আপনাকে নিয়ে গোয়ায় গিয়েছিলাম, যাতে মন ভাল হয়। কিন্তু গোয়ার সমুদ্রের ধারে তিনটে বিকেল, তিনটে রাত্রি কাটিয়ে আমি হাহাকার করে উঠলাম গোপনে— ‘‌মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই’‌। আপনি কোনওদিন কোনও নারীকে জোর করেছেন?‌
সুনীল:‌ শোনো সুবোধ। আমি অনেক নারীকে ভালবেসেছি, অনেক নারী আমার জীবনে এসেছেন। তোমরা নিজের চোখে দেখেছ। তুমি একটু বেশিই দেখেছ, কেন না, তুমি আমার সঙ্গে বহুবার দিল্লি, বম্বে, ভোপাল গিয়েছ। কখনও কোনওদিন আমি কোনও মেয়েকে জোর করিনি। যে এসেছে আমি তাকে সম্মান করেছি। যে আসেনি আমি তাকে কোনওদিন অসম্মান করিনি।
আমার লেখায় নারী একটা বিরাট জায়গা জুড়ে আছে। আমি বিশ্বাস করি, নারীকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট পাড়ায়, স্কুলে, কলেজে, তেমনি বড় বড় পাড়ায়, বড় বড় যুদ্ধে, পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সেক্সসুয়াল টেনশন আছে। প্রতিটি বাড়ির ভেতর এবং বাইরে নারীকে নিয়ে একটা গোপন ইতিহাস থাকে। আমি যে লেখায় নারীকে নিয়ে কোনও চাপা উত্তেজনা নেই, টেনশন নেই, সে লেখায় আমি খুব একটা আগ্রহ পাই না। আমার কবিতায় যেমন, তেমনি আমার উপন্যাসে নারী আসলে সেই বিশল্যকরণী, যাকে ধরে আমি বহুবার উতরে গেছি। সে হল আমার প্রথম এবং শেষ পারানির কড়ি।
সুবোধ:‌ আপনি জীবনে অনেক পেয়েছেন। ছোটবেলায় অনেক কষ্ট করেছেন। কিন্তু প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আপনি সিঁড়ি দিয়ে অনেক অনেক ওপরে উঠে গেছেন। কেউ আপনাকে আটকাতে চাইলেও পারেনি। একদিন আপনি দিল্লিতে সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি হয়েছেন। সারা দেশের লেখক আপনাকে সম্মান করেছেন। আপনার আগে একমাত্র বাঙালি, যিনি সভাপতি হয়েছিলেন, তাঁর নাম সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। লেখক হিসেবে, কবি হিসেবে আপনাকে সবাই মাথায় করে রেখেছিল। আপনাকে রাজার রাজা বানিয়েছেন আপনার পাঠক। আপনার বই বিক্রি হয়েছে হট কেটের মতো। আপনি বাঙালির হাউজহোল্ড নেম। সাহিত্যে দুটো জগৎ আছে, একটা ক্লাস, একটা মাস। ক্লাস আপনাকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দিয়েছে। মাস আপনাকে বুকে নিয়ে পৃষ্ঠা খুলে গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আপনি এত পেয়েছেন, তবু আপনার লেখায় আমি একটা ‘‌তৃষ্ণা’‌ লক্ষ্য করেছি। যেটাকে ইংরেজিতে বলে ‘‌আনকোয়েন্চেবল থ্রাস্ট’‌, যে তৃষ্ণা মেটে না। কীসের এত তৃষ্ণা আপনার?‌ আপনি আকণ্ঠ সাফল্য পান করেছেন। বালিগঞ্জের ৯ তলায় এবং আমেরিকার বস্টনে আপনার ভরা সংসার, স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি নিয়ে আপনি সেই সুন্দর প্যাট্রিয়ট, যাকে সবাই চায়, সবাই চিঠি লেখে। তা হলে কেন আপনার এত তৃষ্ণা?‌
সুনীল:‌ এইরে, এটা তো আমি জানি না। তুমি জানলে কী করে?‌
সুবোধ:‌ এটা একটা টিপিক্যাল সুনীলীয় বাউন্সার। জানি আপন এড়িয়ে যাবেন।
সুনীল:‌ আমার এক পৃথিবী তৃষ্ণা। সেটা লিখেওছিলাম। এই তৃষ্ণা কখনও মেটে না। কিন্তু এটা আমাকে লেখায়। এটা যদি না থাকত, আমি লিখতে পারতাম না। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ কবে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। তারপরেও কত লেখা লিখেছেন। কোনও লেখাই তাঁর ‌ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউডের মতো আর হয়নি। তবু রোজ লিখেছেন, এটা কি তৃষ্ণা নয়?‌ তিনি লিখতেন, তিনি জানতেন, তিনি লেখা থামিয়ে দিলে মরে যাবেন। মদন তাঁতির তাঁতে সুতো ছিল না, তবু তাঁত চালাত। তাঁত না চালাতে পারলে আমরা সবাই মারা যাব। পল গঁগা যখন তাহিতি দ্বীপে চলে গেলেন, তখন সেখানে গিয়ে তিনি স্থানীয় লোকের রোষে পড়লেন। দ্বীপের লোকেরা তার দিকে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করল, তবু তিনি ছবি আঁকা ছাড়েননি। তিনি কি ছবিতে নোবেল প্রাইজ পাবেন বলে এঁকে গেছেন?‌ মোটেও না। ওই তৃষ্ণা। ওটা না থাকলে ওখানে পড়ে থাকতেন না। ওইভাবে ছবি এঁকে গেছেন বলেই তিনি অমরত্ব পেয়েছেন। আমার একটা সুবিধে হল এই যে, আমি ওটা প্রথমেই ডিক্লাইন করেছি।‌‌‌‌ ■


‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top