অনেকেই মনে করেন, আত্মপ্রচার না করলে শিল্প-সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। এখন দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়, মঞ্চে,
বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সর্বক্ষণ চলতে থাকে নানা কৌশলে নানা ধরনের আত্মবিজ্ঞাপন। এটাই নাকি যুগধর্ম। অথচ শ্রেষ্ঠরা চিরকালই থেকেছেন আড়ালে,
একা, সৃষ্টিতে আত্মমগ্ন। লিখেছেন রাহুল দাশগুপ্তছবি: দেবব্রত ঘোষ
অনেকেই মনে করেন, আত্মপ্রচার না করলে সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। এখন দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায়, মঞ্চে, বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সর্বক্ষণ চলতে থাকে নানা কৌশলে নানা ধরনের আত্মবিজ্ঞাপন। এটাই নাকি যুগধর্ম। চলতি হাওয়া। প্রশ্ন হল, এরকম ধারণা নিয়ে যাঁরা আছেন, তাঁরা কি নিজেদের অজান্তেই সত্যের বিকৃতি ঘটিয়ে চলেছেন?‌ সাহিত্যের ইতিহাসে কি এমন বহু দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে, যেখনে দেখা যায় আত্মপ্রচার ও আত্মবিজ্ঞাপন সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীনতা?‌ অমরত্বের দাবিদার সেইসব স্রষ্টা শুধু নিজেদের কাজেই মগ্ন থেকেছেন, সারাক্ষণ নিজেদের ঢাক পিটিয়ে যাওয়ার কথা মোটেই ভাবেননি।‌
ফ্লোরেন্সের দান্তে অ্যালিগিয়েরি তখন ‘‌দিভাইনা কম্মেদিয়া’‌র প্রথম পর্ব ‘‌ইনফের্নো’‌ লিখছেন। প্রথম সাতটি ক্যান্টো (‌‌পর্ব)‌ লেখার পরই তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হলেন। উন্মত্ত জনতা তাঁর বাড়ি আক্রমণ করে, এই কাগজগুলি তখন লুকনো ছিল একটি গোপন কুঠুরিতে। সেই সময় কেউ একজন কাগজগুলি পেয়ে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে দ্রুত সেগুলিকে লুকিয়ে ফেলে। কিন্তু এখানেই ঘটনার শেষ নয়। দান্তের মৃত্যুর পর কোথায় তিনি শেষ তেরোটি ক্যান্টো রেখে গেছেন, তা নিয়ে রহস্য ঘনিয়ে ওঠে। তাঁর পুত্র ও শিষ্যরা মাসের পর মাস ওই শেষ তেরোটি ক্যান্টো খুঁজতে থাকে। বিশেষ করে, দান্তের দুই পুত্র, ইয়াকোপো এবং পিয়েরো ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শেষ পর্যন্ত ইয়াকোপোই সেগুলি খুঁজে পেলেন। দেওয়ালের গায়ে একটি মাদুর টাঙানো ছিল। সেটা পরবর্তীকালে যাকে বলা হয়েছে, ‘‌খ্রিস্টীয় দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য’‌, সেটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণতা পেল, যে বইয়ের সঙ্গে ময়ূরের সৌন্দর্যের তুলনা করেছিলেন দান্তের উত্তরাধিকার, জিওভানি বোকাচ্চিও।
দান্তে যাকে নিজের গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন, সেই ভার্জিলের জীবনেও এরকম একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। মৃত্যুর আগে তিনি নির্দেশ দিয়ে যান, ল্যাটিন সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘‌ঈনিড’‌ যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সম্রাট আউগুস্তুসের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত না পুড়িয়ে কবির জীবনের এই সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তিটিকে রক্ষা করা হয়। অথচ এই মহাকাব্য শেষ করবেন বলেই ভার্জিল ইতালিয়া ছেড়ে গ্রিসে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কয়েক বছর কাটাবেন বলে সঙ্কল্প করেছিলেন!‌ পর্তুগালের শ্রেষ্ঠ কবি লুই দ্য ক্যামোয়েস যখন গোয়ায় আসেন, তখন তিনি ‘‌ওস লুদিয়াদস’‌ লিখতে শুরু করে দিয়েছেন। যখন তিনি লিসবনে ফিরে যান, তাঁর হতদরিদ্র অবস্থা। নিজের মহাকাব্যের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দরজায় দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ছেন। কেউ তাঁর ‘‌মাস্টারপিস’‌–‌এর উপযুক্ত দাম দিতে চায়নি। স্পেনের নাট্যকার লোপ দ্য ভেগা এই গ্রন্থকে ‘‌স্বর্গীয়’‌ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর নোবেল বিজয়ী হোসে সারামাগো বলেছিলেন, তিনিই পর্তুগালের সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। 
আধুনিক আখ্যানের দুই মহৎ স্রষ্টা, নিকোলাই গোগোল এবং ফ্রানৎস কাফকার জীবনেও ঘটেছে এরকম ঘটনা। ১৮৪২ সালে প্রকাশিত হয় গোগোলের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ‘‌ডেড সোলস’‌।‌ গোগোল নিজেই বলেছিলেন, এটি একটি গদ্যে লেখা মহাকাব্য। দান্তের ‘‌দিভাইনা কম্মেদিয়া’‌র প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব ‘‌ইনফের্নো’‌ এবং ‘‌পার্গেতেরিও’‌র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এই বইয়ের প্রথম দুটি পর্বকে। ১৮৪৮ সালের এপ্রিল মাসে গোগোল জেরুজালেমে তীর্থযাত্রা সেরে রাশিয়ায় ফিরে আসেন। ক্রমেই তিনি গভীর নৈরাশ্যে নিমজ্জিত হন এবং তাঁর স্বাস্থ্যেরও দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৮৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি নিজের হাতে ‘‌ডেড সোলস’‌ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপির অধিকাংশই পুড়িয়ে দেন। কিন্তু এরপরই তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং নয় দিন পর মারা যান।
মৃত্যুর আগে ফ্রানৎস কাফকা তাঁর বিশিষ্ট ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের কাছে অন্তিম প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, ‘‌দেখ ব্রড, আমার শেষ অনুরোধ, আমার যত লেখা আছে, বাড়িতে, বুক কেসে, অফিসের ড্রয়ারে কিংবা অন্য কোনও বন্ধু বা তোমার কাছে, সেগুলি সমস্ত পুড়িয়ে ফেলো। শুধু তাই নয়, আমার চিঠিগুলি পর্যন্ত যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়।’‌
কাফকার লেখার টেবিল আরও ভাল করে অনুসন্ধানের পর ব্রড একটি বিবর্ণ, প্রায় হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি পান। এই চিঠিতে কাফকা লিখেছিলেন, ‘‌বোধহয় এবার আমি বাঁচব না। আমি চাই আমার সমস্ত লেখা নষ্ট হয়ে যাক। তুমি কোনও দ্বিধা কোরো না। আমার সমস্ত লেখা, এমনকী তাদের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। কী হবে এই লেখায়?‌’‌ কিন্তু ব্রড কী করেছিলেন?‌ তিনি লিখেছিলেন, ‘‌কাফকার এত স্পষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও আমি তা মানতে পারিনি।’‌ তিনি বরং কাফকার গ্রন্থগুলিকে প্রকাশ করলেন, তাঁর জীবনী লিখলেন। 
১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মার্সেল প্রুস্ত তাঁর অসমাপ্ত উপন্যাস, ‘জ্যঁ সাঁত্যই’‌ নতুন করে ঢেলে সাজাবার পরিকল্পনা নিয়ে লিখতে শুরু করেন, ‘‌রিমেমব্রেন্স অফ থিংস পাস্ট।’‌ কিন্তু কোনও প্রকাশক বইটি প্রকাশ করতে রাজি না হওয়ায় ১৯১৩ সালে প্রুস্ত নিজের খরচায় বইটি ছাপেন। অদ্রেঁ জিদ উন্নাসিকতা এবং অপরিপক্বতার অভিযোগে উপন্যাসটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন। জিদ তখন ছিলেন এন আর এফ–‌এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশক গালিমারের পরামর্শদাতা। ১৯১৯ সালে অদ্রেঁ জিদের উদ্যোগে বইটি আবার প্রকাশিত হয়। যদিও অনুতপ্ত জিদ ১৯১৪ সালের জানুয়ারিতেই প্রুস্তকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‌গত কয়েকদিন ধরেই তোমার বই আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। তোমার বইটি প্রত্যাখ্যান করাই এন আর এফ–‌এর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল। এই ব্যাপারে আমার ভূমিকা সম্পর্কেও আমি লজ্জিত। আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা গভীর অনুতাপগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। এন আর এফ শুধু প্রথম খণ্ডটিই নয়, পরবর্তী খণ্ডগুলিরও সমস্ত খরচ বহন করতে রাজি।’‌ আর প্রুস্তের মৃত্যুর অনেক পরে, ১৯৫১–’‌‌৫২ সালে তাঁর অসমাপ্ত ‘‌জ্য সাঁত্যই’‌ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। পাণ্ডুলিপিটি পাওয়া গেছিল বার্নার্দ দ্য ফল্লোইসের টুপির বাক্সের মধ্যে।
জেমস জয়েস ‘‌ইউলিসিস’‌ লেখার পর ইউরোপে তার কোনও প্রকাশক পাওয়া যায়নি। আমেরিকায় উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়া মাত্র অশ্লীলতার দায়ে মার্কিন সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এদিকে জয়েস তখন নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন, এবং দৃষ্টিহীন হওয়ার উপক্রম হয়েছেন। অসুস্থতা, অর্থাভাব এবং পারিবারিক সমস্যায় তখন তিনি জেরবার। বই থেকে আয়ের পরিমাণ সামান্যই ছিল। বন্ধু‌বান্ধব এবং নামহীন অনুরাগীদের কাছ থেকে পেতেন অর্থসাহায্য। অধিকাংশ অর্থ কন্যা লুসিয়ার চিকিৎসার জন্য খরচ হয়ে যেত। স্নায়ুর অসুখের জন্য মেয়েটিকে রাখা হয়েছিল একটি স্যানাটরিয়ামে। ১৯৪০ সালে জার্মান সৈন্য প্যারিস অধিকার করলে মেয়েকে স্বাস্থ্যাবাসে রেখেই জয়েস পালিয়ে এলেন সুইৎজারল্যান্ডে। দারিদ্র‌্য, ক্রমবর্ধমান দৃষ্টিহীনতা, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তখনও তিনি একাগ্র হয়ে লিখে চলেছেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস, ‘‌ফিনিগানস ওয়েক’‌।‌ জয়েসের উৎসাহেই প্রচার–‌বিমুখ ইতালো স্যাভো লেখেন ‘‌দ্য কনফেশনস অফ জেনো’‌। বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ ইতালীয় রচনা বলে পরবর্তীকালে যা স্বীকৃতি পায়।  
কিন্তু সবার ভাগ্যে এই উৎসাহটুকুও জোটেনি। যেমন জার্মানভাষী উপন্যাসের তিন মহৎ স্রষ্টা, রবার্ট মুসিল, হেরমান ব্রচ এবং আলফ্রেড ডবলিন। আর এটা হয়েছে, তাঁদের অন্তর্মুখী, প্রচারবিমুখ স্বভাবের জন্যই। তাঁরা আবিষ্কৃত হয়েছেন, মৃত্যুর অনেক পরে। এদের মধ্যে ১৯৪২ সালে ব্রুনো শুল্‌জকে গুলি করে মারে নাৎসিরা। স্তানিসল ইগনাসি উইটকিয়েউইকজ ১৯৩৯ সালে আত্মহত্যা করেন। উইটোল্ড গমব্রোইচ আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। তাঁদের লেখা কেউ ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারেনি।
বাংলা সাহিত্যেও এরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর প্রায় রোজের মতোই জীবনানন্দ লেকের ধারে বেড়াতে বেরোলেন, কিন্তু আর ফিরলেন না, ট্রামের নীচে চাপা পড়ে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হলেন। শুধু রয়ে গেল তাঁর রচনার পাণ্ডুলিপি ভর্তি গোটা পাঁচেক ট্রাঙ্ক, যার মধ্য থেকে পাওয়া গেছিল প্রায় সাড়ে তিনশোর মতো পাণ্ডুলিপির খাতা। কবিতা ছাড়াও ওই খাতাগুলিতে ছিল গল্প, উপন্যাস, লিটারারি নোটস, যার একটাও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। একমাত্র পর্তুগালের ফার্নান্দো পেসোয়া ছাড়া বিশ শতকের দুনিয়ায় আর কোনও মহৎ কবির জীবনে এরকম আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে কি?‌ ১৯৫৪ সালেই প্রকাশিত হল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌‌হরফ’‌। ওই বছরের শেষের দিকেই গ্যাসট্রাইটিস, মৃগী আর অত্যধিক মদ্যপানে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে তাঁর শরীর। অর্থাভাব আরও বেড়েছে। কাগজ কেনারও পয়সা নেই। মুড়ির ‌সাদা ঠোঙায় গল্প লিখে পাঠিয়েছেন বিভিন্ন পত্রিকা দপ্তরে। বাঁশি বাজানো ছেড়ে দিয়েছেন। বরানগরের দুই কক্ষবিশিষ্ট ভাড়াবাড়ির বাইরের দিকের ঘরটিকে সস্তা ক্যানভাসের পার্টিশন দিয়ে দুই ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। তার একটি ভাগেই মানিকের লেখার জায়গা, বৈঠকখানা ও শয়নকক্ষ। অর্থের জন্য প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। ডায়েরিতে লিখছেন, ‘‌কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি কোথায় যাই, কী করি।’‌ এক প্রকাশক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‌কী স্পর্ধা, বলে কিনা অন্যভাবে লেখা ভাল বই চাই।’‌
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন রয়েছেন কলকাতার লুম্বিনী মানসিক হাসপাতালে। কিছুদিন পর সেখানে ভর্তি হলেন সঞ্জয় ভট্টাচার্য। সঞ্জয় ভট্টাচার্য একসময় আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন। ক্ষুর দিয়ে নিজের গলার নলি ছিন্ন করার চেষ্টা করেন। আর একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বাঁ হাতের শিরা কেটে। পাশাপাশি চলেছে অবিরাম অধ্যয়ন এবং অর্থাভাব। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে লেখা একটি চিঠিতে কমলকুমার মজুমদার লিখেছেন, ‘‌আমি দরিদ্র। ধারকর্জ করিয়া চালাইতেছি।’‌ আর্থিক সচ্ছলতার অভাব ছিল, বাসস্থানের সমস্যা ছিল, তবু তাঁর স্ত্রী দয়াময়ী মজুমদারের ভাষায়, ‘‌আমার দেখার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এইটাই আমি দেখে এসেছি, একটি মানুষ সারাজীবন নিরলস প্রয়াসে কীভাবে অধ্যয়নচর্চায় কাটিয়ে গিয়েছেন।’‌ ‘‌নতুন ফসল’‌ উপন্যাসের লেখক সরোজকুমার রায়চৌধুরির শেষ জীবন কাটে অতি দুঃখে, দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে তখন তিনি অত্যন্ত বিপন্ন। সারা জীবন নিভৃত সাহিত্য সাধনায় মগ্ন ছিলেন এই মানুষটি। নিজের ঢাক নিজে পেটাতে চাননি ‘‌মান্ধাতার মুখ’‌–এর লেখক বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়। তাঁর ওই ম্যাগনাম ওপাস একের পর এক প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছেন।
কলকাতা থেকে অনেক দূরে সমকালীন পাঠকের উপেক্ষা সহ্য করতে হয়েছিল সতীনাথ ভাদুড়ীকে। এই উপেক্ষাই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল অবিরাম অধ্যয়নের দিকে। দারিদ্র‌্য ছিল জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর নিত্যসঙ্গী, সারাজীবন ভাড়াবাড়িতে জীবন কাটিয়েছেন তিনি, কখনও মেসবাড়িতে, আবার অনেকটা সময় ছিলেন বেলেঘাটার বারোয়ারিতলার একটি বস্তিতে। যে কাঠের চেয়ারে বসে লিখতেন, তার কোনও হাতল ছিল না পর্যন্ত। বলতেন, ‘‌লেখার কাজে যে সময়টা আমি এখন দিতে পারছি, তার অনেকটাই তো চাকরির পিছনে চলে যেত। চাকরি আমার দ্বারা হবে না।’‌ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘‌অভিধান প্রণয়নে কেহই আমার পথপ্রদর্শক ছিলেন না।’‌ টানা বারো বছরের পরিশ্রমে তিনি অভিধান লেখার কাজ শেষ করেছিলেন। অসম্ভব আর্থিক অনটনের মধ্যেই কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন তিনি। কবি বলেছিলেন, ‌‘‌আমাদের বাংলা ভাষায় ভালো অভিধান নেই। তোমাকে একখানি অভিধান লিখতে হবে।’‌
ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল হয়ে কলকাতা শহরে এসেছিলেন অমরেন্দ্র ঘোষ। দিনে কাজের খোঁজ করতেন, আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন ঘুম আসত না বলে। বাজারে যেতেন, মুটেমজুরদের সঙ্গে বসে গল্প করতেন, ফুটপাথে বসে থাকতেন, শেয়ালদা স্টেশনে চলে যেতেন। তিনি লিখতে পারতেন না, কারণ, কাগজ–‌কলম কেনার মতো অর্থ তাঁর ছিল না। অমরেন্দ্র ঘোষের ‘‌চরকাশেম’‌ আজ বাংলা সাহিত্যে ক্লাসিক হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে ক্লাসিক হয়ে গেছে রমেশচন্দ্র সেনের ‘‌কাজল’‌, ‘‌গৌরীগ্রাম’‌ বা ‘‌শতাব্দী’‌। এই মানুষটি ছিলেন পুরোপুরি আত্মপ্রচারবিমুখ। ‘‌ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’‌য় শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‌সাহিত্যক্ষেত্রের নবাগত অনেক লেখককে তাঁর সমিতির সহায়তায় প্রতিষ্ঠালাভে সাহায্য করলেও তিনি নিজে কখনও সামনে এগিয়ে এসে নিজেকে জাহির করতে চাইতেন না। খ্যাতির মোহ কোনোদিন তাঁর দেখিনি। সাহিত্যিকসুলভ কোনও অহংকারও তাঁর ছিল না।’‌ তরুণ সাহিত্যিকেরা যাতে দাঁড়াতে পারে, এই ছিল যার জীবনের ধ্যানজ্ঞান, সেই রমেশচন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর শুধুমাত্র একজন ধূলিধূসরিত তরুণ হাজির ছিলেন। তাঁর নাম ছিল, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।‌‌
পশ্চিমি দুনিয়ায় যে পাঁচজনের হাত ধরে চিন্তার ইতিহাসে বিপ্লব ঘটে যায়, তাঁদের অন্যতম ছিলেন ‘‌ভাষাবিজ্ঞান’‌–‌এর জনক ফার্দিনান্দ দ্য সস্যুর। বাকি চারজন, কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এমিল ডুর্কহাইম এবং চার্লস ডারউইন। ১৯০৬–’‌‌১১, তিন দফায় সস্যুর ভাষাতত্ত্বের পাঠ দেন জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। সস্যুরের ছাত্র শার্ল বাল্লি এবং ছাত্রী আলবার্ত সেখেহায়ে ঠিক করেন সস্যুরের শেষ জীবনের লেকচারের একটি সঙ্কলন তাঁরা সম্পাদনা করবেন। লেকচারের আগে খেটেখুটে নোট বানাতেন সস্যুর। কিন্তু বক্তৃতা দেওয়া হয়ে গেলেই সেইসব খসড়া নিজের হাতেই আবার ধ্বংস করে দিতেন তিনি। অসহায় সম্পাদকদ্বয় বাধ্য হয়ে ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে লেখেন, উপায় না দেখে তাঁরা সস্যুরের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস নোটের ওপরেই পুরো নির্ভর করতে বাধ্য হন। বক্তৃতা চলাকালীন শুনতে শুনতে যেটুকু টুকে রেখেছিলেন তাঁরা, তার থেকেই তৈরি হয় সস্যুরের লেকচারপত্রের সার–‌সঙ্কলন। ১৯১৬ সালে মূল ফরাসিতে প্রকাশিত হয় পাতলা একটি বই, ‘‌কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিক্স’‌। 
কার্ল মার্কস সম্পর্কে বার্নার্ড শ লিখেছিলেন, ‘‌দ্য ম্যান হু রোট ক্যাপিটাল ডায়েড অফ স্টারভেশন’‌। দর্শনে ডক্টরেট হয়েও মার্কস একটা অধ্যাপনার চাকরি জোটাতে পারেননি। সর্বত্রই তাঁর আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়। তাঁর ছ‌টি সন্তানের মধ্যে তিনটির অকালমৃত্যু হয়। ১৮৫২ সালে আদরের মেয়ে ফ্রানসিসকার মৃত্যু হয়। তিনদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে সন্ধেবেলায় তার মৃত্যু হয়। অর্থের অভাবে মৃতের সৎকার হয় না। পরের দিন একজন ফরাসি উদ্বাস্তু তাঁদের দু’‌পাউন্ড দিলেন। তাই দিয়ে একটি কফিন কেনা হয়। মার্কসের স্ত্রী জেনি লিখেছেন, ‘‌জন্মকালে মেয়েটিকে একটি দোলনায় শোয়াতে পারিনি, মৃত্যুকালেও তার জন্য একটি শবাধার সংগ্রহ করতে মুশকিল হয়েছিল।’‌ দারিদ্র‌্য, ক্ষুধা আর ব্যাধি, এই ছিল মার্কসের নিত্যসঙ্গী। আর এদের পাশে নিয়েই আঠারো বছর ধরে তিনি লিখে গেছেন তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ, ‘‌দাস কাপিটাল’‌। 
১৮৮৩ সালে যখন ফ্রেদেরিক নিৎসের অমর রচনা ‘‌দাস স্পেক জরথ্রুস্ট’‌ প্রকাশিত হয়, তখন তাঁর মাত্র চল্লিশ কপি বিক্রি হয়েছিল। ১৮৮৯ সালে তাঁকে পাঠানো হয় একটি উন্মাদাগারে এবং বারো বছর জীবন্মৃত অবস্থায় তিনি বেঁচেছিলেন। জীবিতকালে কিয়ের্কেগার্দ ছিলেন সম্পূর্ণ অনাদৃত। বিদগ্ধজন তাঁর পাণ্ডিত্যের ঠাট্টা করতেন। ধর্মপ্রচারকগণ তাঁর উদ্দেশে অবিরাম গালিবর্ষণ করতেন। কার্টুনিস্টরা পর্যন্ত তাঁকে রেহাই দেয়নি। এই ছিল বিশ্বের তিন মহৎ চিন্তকের বাস্তব অবস্থা।
স্তালিন–‌যুগে বহু প্রধান কবি–‌লেখককে শুধু শারীরিকভাবেই মেরে ফেলা হয়নি, তাঁদের রচনাবলিকেও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ওই যুগের চার প্রধান কবি ছিলেন, ওসিপ ম্যান্ডেলস্তাম, আন্না আখমাতোভা, বোরিস পাস্তারনেক এবং মারিনা সুইতায়েভা। ওসিপের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী নাদেজদা রাত্রির শিফটের আট ঘণ্টা শুধু কাপড় বোনার কল তদারক করতেন না, ওসিপের কবিতা মুখস্থ করতেন। আন্না আখমাতোভার কথায়, তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন যেন প্রাক্‌–‌গুটেনবার্গ পর্বে, ছাপাখানা আবিষ্কারের আগের দিনগুলিতে। ১৯১৯ সাল নাগাদ আখমাতোভাকে সমস্ত সমালোচক একজন মহৎ কবি বলে স্বীকার করে নেন। ১৯২৫–’‌‌৪০, সময়কালে আন্নার কোনও লেখা প্রকাশিত হতে পারেনি, অপমান ও শোক ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী, নিজের বহু কবিতা তিনি পুড়িয়ে ফেলেন, যা বেঁচে থাকে শুধুমাত্র কিছু পাঠকের স্মৃতিতে।
নোবেল–‌জয়ী বরিস পাস্তারনেক তো সন্ত্রাসের রাজত্বে মৌলিক রচনা লেখা মোটামুটি বন্ধই করে দেন। তিনি জীবিকার্জন করতে থাকেন মূলত অনুবাদের কাজ করে। পাস্তারনেককে লেখক ইউনিয়ন থেকে বার করে দেওয়া হয়, তাঁর রেশনকার্ডও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পাস্তারনেক বলেছিলেন, সাহিত্যিক আমলারা যদি বীভৎস, হৃদয়হীন ব্যবহার না করত, তা হলে মারিনা সুইতায়েভা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেন না। বই বিক্রি করে দিনের পর দিন মারিনাকে জোটাতে হয়েছে ক্ষুধার অন্ন, জ্বালানির কাঠ। তাঁকে কবিতার বই ছাপতে দেওয়া হয়নি। ১৯৪১ সালে বাসন মাজার কাজের জন্য আবেদন করেও মারিনা প্রত্যাখ্যাত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।
আলেকসান্দার সলঝেনিৎসেন বারো বছর ধরে গোপনে সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। সোবিয়েত গুপ্ত পুলিশের ভয়ে তিনি যা লিখেছেন তার অধিকাংশই অতি ক্ষুদ্র অক্ষরে খসড়া অবস্থায় সিলিন্ডারে ভরে শ্যাম্পেন বোতলের মধ্যে পুরে বাগানের মাটির নীচে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল তাঁকে। 
তাই বলা যায় জোর করে হয়তো সাময়িকভাবে প্রচার আদায় করে নেওয়া যায়। কিন্তু যিনি প্রকৃতই কীর্তিমান, তিনি শেষ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হন। মানুষের কাছে তিনি পৌঁছন এবং মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেন। প্রচারের অধিকার তাঁকে নানা কৌশলে ছিনিয়ে নিতে হয় না। প্রচার তাঁর পিছনে ছোটে এবং তাঁর ওপর আলো ফেলে নিজেও ধন্য হয়। ‌■‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top