অভিজিৎ দাশগুপ্ত: হাওদার তিন পাশে চিকের আড়াল। বহুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় হস্তী। রেসিডেন্সি ঘিরে রয়েছে বাদশার সেনাদল। মধ্যে–‌মধ্যে ছাউনি। তাঁবুতে ঢুকছে খাবারদাবার, গোলাবারুদ। হাওদায় বসে দূর থেকে রেসিডেন্সির ডানপাশে উঁচু মিনারটার দিকে চেয়ে ছিলেন বেগম সাহেবা। বেগম হজরত মহল। কী হচ্ছে ওই মিনারটায়?‌ যুদ্ধের প্রস্তুতি?‌ নিজেদের শক্তি সংহত করে নেওয়ার চেষ্টা!‌ পারবে ওরা?‌ নাকি অপেক্ষায় রয়েছে বাইরে থেকে আসা সাহায্যের!‌‌ চুপচাপ বসে থেকে এক–‌একটা করে দিন কাটিয়ে যাওয়ার কৌশল। বিদ্রোহী সিপাহিদের কোনও মতে ঠেকিয়ে রেখে অন্যান্য রেসিডেন্সির ব্রিটিশ ফৌজের জন্য অপেক্ষা করা।
কপালে দুশ্চিন্তার ভঁাজ গভীর হল বেগম সাহেবার। কী করতে চায় ওরা?‌ কত রসদ মজুত আছে ওদের ভঁাড়ারে!‌ কামানের সংখ্যাই বা কত!‌ সিপাহিদের কাছে বেগম শুনেছেন, প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে আছে রেসিডেন্সিতে। এদের মধ্যে ছ‌শো মহিলা আর শিশু। যারা বন্দুক ধরতে পারে, কামান চালাতে পারে, তাদের সংখ্যাও কম নয়— প্রায় ১৭০০। তাদের মধ্যে ৭০০ ফৌজির গায়ের রং বাদামি— ওরা দেশি যোদ্ধা। বন্দুকের টোটা নিয়ে অশান্তির যে আগুন ছড়িয়েছে, তার আঁচ তো লেগেছে ওদের মনেও। ব্রিটিশ প্রভুদের হুকুম তামিল করার প্রবৃত্তি কি ওদের আছে?‌
অযোধ্যার চিফ কমিশনার হেনরি লরেন্সের মতিগতিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না বেগম সাহেবা। দূরদর্শী ব্রিটিশ শাসক আগে থেকে হুকুম দিয়েছিলেন লখনউ রেসিডেন্সিতে গোলাবারুদ আর খাবারদাবার মজুত করতে। এক ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সকালে বিদ্রোহী সিপাহিরা যখন রেসিডেন্সির চারপাশে পজিশন নিল, ভিতর থেকে ছুটে আসতে লাগল গোলা, ‌পাল্টা জবাব দিল বিদ্রোহীরাও, সেদিনই বোঝা গিয়েছিল ওরা দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। তবে অযথা শক্তিক্ষয় করতে ইংরেজরা রাজি নয়। বরং অপেক্ষা করাই ওদের নীতি। অবরুদ্ধ হয়ে থাকো, ছটফট কোরো না, শুধু নজর রাখো বিদ্রোহীদের দিকে, কতদিনে ওরা শিথিল হয়ে পড়ে, নিশ্চিন্ত আত্মতৃপ্তিতে ডুবে যায়, ঢিলেমি এসে যায় বিদ্রোহী সত্তায়।
কেন অপেক্ষা?‌ কীসের অপেক্ষা?‌ তবে কি কোনও অমাবস্যার রাতে অতর্কিতে ঝঁাপিয়ে পড়তে চাইছে কোম্পানির বাহিনী?‌ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে চাইছে অবরোধকারী সিপাহিদের?‌ কী ওদের রণকৌশল?
প্রায় ঘণ্টা কয়েক পর এক–পা এক–পা করে রণক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে গেল বেগম হজরত মহলের ফৌজি হাতি। বেগম ইতিমধ্যে কথা বলেছেন সিপাহিদের কয়েকজনের সঙ্গে। সাহস জুগিয়েছেন তাদের। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সবরকম সাহায্যের। কিন্তু দুশ্চিন্তা কিছুতেই যাচ্ছে না। কী পরিণতি হবে এই বিদ্রোহের?
অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। ততদিনে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এসেছেন কলকাতায়। সঙ্গে এসেছেন তঁার হারেমের বেগম–বাঁদিরা। এসেছে রঁাধুনি–বাবুর্চি–বাজনদারদের বিরাট বাহিনী। এসেছে নবাবের নিজস্ব দেহরক্ষীর দল। কোম্পানির কর্তারা কলকাতার এক প্রান্তে, মেটিয়াবুরুজ সংলগ্ন যে–‌এলাকায় নবাবকে এনে বসিয়েছেন, দু–‌তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই এলাকা যেন ছোটখাটো লখনউ নগরী। অযোধ্যা–লখনউ হাতছাড়া হয়েছে। কিন্তু ওয়াজেদ আলি শাহর যেন কিছুই আসে–যায় না। কলকাতায় এসে তিনি নতুন করে নাচগান আর বিলাসব্যসনে ডুবে গেলেন।
সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যপূরণে নানারকম অজুহাত খঁুজছিল ইংরেজ শাসকরা। দেশীয় নবাব আর রাজাদের বিরুদ্ধে এবার তারা আনল অপশাসনের অভিযোগ। কথায় বলে, দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। বেশ কয়েকটা দেশীয় রাজ্য দখল করে এবার তারা হাত বাড়াল অযোধ্যার দিকে। এবং কী আশ্চর্য, ওয়াজিদ আলি শাহ এতবড় চক্রান্তের কোনও খবরই পেলেন না!‌ যখন পেলেন, তখন ব্রিটিশ বাহিনী অযোধ্যায় ঢুকে পড়েছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নবাব নিজেই নজরবন্দী। লোকলশকর, বিদূষক–বাবুর্চি আর হারেমের জেনানাদের সঙ্গে নবাবকে পাঠিয়ে দেওয়া হল কলকাতায়। মুষ্টিমেয় দাসি–বাঁদি আর অনুচর নিয়ে বেগম হজরত মহল থেকে গেলেন অযোধ্যায়। সঙ্গে রইল তঁার নাবালক পুত্র বিরজিস কাদের।
হজরত মহল প্রথমে কিন্তু ওয়াজিদ আলি শাহর বেগম ছিলেন না। ছিলেন বাইজি। চোখধঁাধানো তঁার রূপ। ফৈজাবাদের অতি দরিদ্র পরিবারের এই সুন্দরী মেয়েটির নাম ছিল ইফতিকারউন্নিসা। প্রথমে তিনি ‘‌খোয়াজিন’‌ হিসেবে নবাব ‌হারেমে আসেন। তারপর স্বীকৃতি পান নর্তকীর। পরে নবাবের অন্যতম রক্ষিতা। শেষে যখন সন্তান এল, ইফতিকার স্বীকৃতি পেলেন ‘‌মহল’‌ অর্থাৎ রানির। নাম হল হজরত মহল। ইংরেজরা যখন ওয়াজিদ আলি শাহকে কলকাতায় নিয়ে চলে গেল, এই বেগমই হাল ধরলেন অযোধ্যার। নাবালক পুত্রকে নবাব হিসেবে ঘোষণা করে পর্দার আড়াল থেকে বিদ্রোহী সিপাহিদের নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করলেন। বিরজিস কাদেরের নামে ঘোষণাপত্র জারি করে অযোধ্যার সাধারণ মানুষ, জমিদার, তালুকদার সকলের কাছে আবেদন পাঠালেন:‌ আসুন সবাই মিলে ইংরেজ হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। তাদের দেশছাড়া করি।
পরপর দেশীয় রাজ্য দখল করে চলায় ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে এমনিতেই অসন্তোষ জমে উঠেছিল বেতনভুক ভারতীয় সিপাহিদের মনে। বেগম হজরত মহল, ছেলেকে সিংহাসনে বসিয়ে কার্যত যিনি তখন অযোধ্যার শাসক—‌ তাঁর আবেদনে সাড়া দিতে সিপাহিরা দেরি করেননি। বিরজিসের নামে ততদিনে মুদ্রা প্রচলন হয়ে গিয়েছে। সরকারি পদে লোক নেওয়া হচ্ছে। শুরু হয়েছে রাজস্ব আদায়। নাবালক নবাবের অভিভাবক হিসেবে হজরত মহল বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন, ইংরেজদের দাপট সত্ত্বেও অযোধ্যার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়নি। মহাবিদ্রোহের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করতে রানিসাহেবা পুরোপুরি প্রস্তুত।
১৮৫৭ সালের ১০–‌১১ জুন দিল্লি আর মিরাটের দেশীয় সিপাহিরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। এর আগে ৩০ মে লখনউয়ের সিপাহিরা ইংরেজ সেনা অফিসারদের হুকুম তামিল করতে অস্বীকার করে। ইংরেজরা অবাধ্য সিপাহিদের দমন করতে দেরি করেনি। চটপট ফাঁসিতে ঝোলানো হয় অভ্যুত্থানের নেতাদের। বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। ঠিক একমাস পর চিনহাটে আবার মুখোমুখি ইংরেজ সেনাবাহিনী আর এদেশি ফৌজিরা। সিপাহিদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের সামনে সেবার দাঁড়াতে পারেনি ব্রিটিশ সেনাদল। উদ্দীপিত সিপাহিরা এরপর রওনা হয় লখনউয়ের দিকে। পরাজিত ব্রিটিশ বাহিনীর হতোদ্যম সেনা আর অফিসাররা ততদিনে লখনউ রেসিডেন্সিতে ফিরে এসেছেন। পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে তাঁদের কিছুটা অবসরের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে ফুরসত দেয়নি দেশি ফৌজিরা। এক বৃষ্টিভেজা দিনে রেসিডেন্সির গোটা চত্বর ঘিরে ফেলল তারা। অবরুদ্ধ হলেন বিশ্রামের আশায় রেসিডেন্সিতে আশ্রম নেওয়া ইংরেজরা। স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া ভারতীয় সিপাহিরা তাদের আর সুযোগ দিতে রাজি ছিল না। বহুদিনের প্রস্তুতি নিয়ে রেসিডেন্সির বড় বড় ভবনগুলো বেষ্টন করে বসে গেল তারা। হয় এস্‌পার, না হয় ওস্‌পার। আর ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন বেগম হজরত মহল। সিপাহিদের শিবিরে গিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেন, খাবারদাবার, যুদ্ধের রসদের কোনও অভাব হবে না। তোমরা অবরোধ চালিয়ে যাও। আমি তোমাদের পাশে আছি।
পাশে আছেন মানে প্রকৃত অর্থেই পাশে আছেন বেগম হজরত মহল। যেভাবে ইংরেজরা দেশীয় রাজ্যগুলো দখল করে নিচ্ছিল, বেগম তা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। নবাব ওয়াজিদ আলি শহর সঙ্গে বছর ছয়েক আগেই তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় তিনি নবাবের শত্রু। ভারতবর্ষের শত্রু ব্রিটিশ প্রভুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সুযোগ‌সুবিধা আদায় করবেন। বরং উল্টোটাই। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের ‘‌ডন’‌ পত্রিকা লিখেছে, স্থায়ী স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াইয়ের শপথ নিয়েছিলেন বেগম হজরত মহল। সিপাহিরা দিকে দিকে বিদ্রোহ ঘোষণা করছিল সে–সময়ে। কিন্তু একটা ব্যাপারে তারা সমস্যায় পড়ছিল বারবার—‌ ইংরেজদের হারাতে কৌশলগত নেতৃত্ব দেবে কে?‌ লখনউ অযোধ্যা অঞ্চলের বিদ্রোহী সিপাহিদের সমস্যা ছিল আরও তীব্র। নেতৃত্বহীনতার সঙ্কট। এই শূন্য স্থানটাই পূরণ করলেন বেগম সাহেবা। লখনউ রেসিডেন্সির চারপাশে থানা গেড়ে থাকা বিদ্রোহী ফৌজিদের জন্য পাঠালেন খাবারদাবার, কাঁচা আনাজপাতি, জ্বালানি, তাঁবু। পাঠালেন আগ্নেয়াস্ত্র। মাঝে মাঝেই হাতির পিঠে চেপে চলে আসতেন রণক্ষেত্রে।
শলা‌পরামর্শে বসতেন বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে। তাদের উৎসাহ দিতেন, ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু ঝাঁসির হিন্দু রানি লক্ষ্মীবাইয়ের মতো যোদ্ধার পোশাক পরে ঘোড়ায় চেপে রণক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া বেগমের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ, তিনি ছিলেন মুসলিম নবাবের অন্তঃপুরের মহিলা। তাঁকে যা কিছু করতে হবে চিকের আড়াল থেকেই।
শুধু রেসিডেন্সি অবরোধ নয়। লখনউ শহরকে নিশ্ছিদ্র দুর্গে পরিণত করতে চেয়েছিলেন বেগম হজরত মহল। এ জন্য অযোধ্যার নাবালক নবাবের রাজকোষ থেকে মঞ্জুর করিয়েছিলেন পাঁচ লক্ষ টাকা। তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ পাঁচিল, অনেকটা দুর্গের ধরনে দূত মারফত যোগাযোগ রাখতেন বিভিন্ন সেনানিবাসের ভারতীয় ফৌজিদের সঙ্গে। কানপুরের ভারতীয় সিপাহিরা তখনও ইংরেজদের অধীনে। ব্রিটিশ সেনাপতিরা বেগমের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছেন। গুপ্তচর মারফত সে খবর পেলেন হজরত মহল। গোপনে সিপাহিদের বার্তা পাঠালেন, তারা যখন বেগমের বাহিনীর মুখোমুখি হবে, এমনভাবে যেন ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে যাতে ইংরেজরা তাদের মতলব বুঝতে না পারে। ফাঁকা গুলিবর্ষণের মধ্যেই বেগমের বাহিনী এগিয়ে যাবে। যুদ্ধক্ষেত্রে দুই বাহিনী যখন পরস্পরের মধ্যে মিশে যাবে ঠিক তখনই যেন অবস্থান পাল্টে অনুগত সিপাহিরা ইংরেজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইংরেজরা তখন প্রত্যাঘাতের সুযোগই পাবে না। বাধ্য হবে আত্মসমর্পণ করতে। জয়ী হবে বেগমের ফৌজ আর ইংরেজ–‌অনুগত সিপাহিদের মিলিত বাহিনী।
কিন্তু না, শেষরক্ষা হয়নি। ১৮৫৭–‌র জুলাই মাস থেকে দফায় দফায় চেষ্টার পর নভেম্বরে পৌঁছে রেসিডেন্সি উদ্ধারে সমর্থ হল ইংরেজ সেনাবাহিনী।‌‌ ইংরেজ বাহিনীর আক্রমণ যখন চারপাশ থেকে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল, সেই প্রবল গোলাগুলির মুখে তিন–চারদিনের বেশি দঁাড়াতে পারল না ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর সিপাহিরা। আধুনিক ওয়ারস্ট্র‌্যাটেজির মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। মৃতদেহের স্তূপ জমে উঠল বিরাট প্রাঙ্গণজুড়ে। অনেকে বলছেন, এই পরাজয়ের পিছনে সিপাহিদের দায়িত্ব কম নয়। বেগম হজরত মহলের সঙ্গে যারা প্রতিনিয়ত পরামর্শ করেছেন, তাঁদের অনেকেরই নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার অন্যরকম উদ্দেশ্য ছিল। বেগম হয়তো অনেক কিছু বুঝতে পারতেন। কিন্তু পর্দার আড়াল ছেড়ে তাঁর পক্ষে বাহিনীর অধিনায়িকা হওয়া সে যুগে সম্ভব ছিল না। ফলে মাসের পর মাস সাহায্য দেওয়ার পরেও তিনি চোখের সামনে দেখতে পেলেন, সব কিছু ঠিকঠাক চলছে না। বিদ্রোহীদের ‘‌ফোকাস’ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট উপদল তৈরি হচ্ছে। মাথায় ছোট ছোট সিপাহি দলপতি। ব্রিটিশদের কৌশলী আক্রমণের মুখে যাদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে যেতে সময় লাগেনি। সেনাপতি কলিন ক্যাম্পবেল দেখলেন, রেসিডেন্সি উদ্ধার করেই কাজ শেষ করলে চলবে না। বেগম হজরত মহল যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে চলেছেন, লখনউ দখল করতে না পারলে ব্রিটিশ বাহিনীকে আবার সেই রেসিডেন্সিতেই মাথা গুঁজতে হবে। অথবা পালাতে হবে অন্য কোথাও। গোটা অঞ্চল ইংরেজদের হাতছাড়া হয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। রণকৌশল ঠিক করে শহরের দিলখুশ বাগে ঘঁাটি গড়লেন ক্যাম্পবেল। রেসিডেন্সি হাতছাড়া হওয়ার পরেও দমে যাননি হজরত মহল। বেগমের নির্দেশে লখনউয়ের বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ শুরু করেছিল তাঁর বাহিনী। একইরকম তেজে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সেনাদের উৎসাহিত করতেন রানিসাহেবা। শেষ পর্যন্ত, আরও চার মাস পর, ১৮৫৮ সালের ২১ মার্চ ইংরেজদের নিখুঁত রণকৌশলের সামনে আর দঁাড়াতে পারল না বেগমের সেনাবাহিনী। বেগম পিছু হটলেন। কিন্তু হাল ছাড়লেন না। এবার তঁার ঘঁাটি হল বুন্দি দুর্গ। সেখান থেকে আরও ছ’‌মাস— ১৮৫৮ সালের ডিসেম্বর অবধি লড়াই চালিয়ে গেলেন হজরত মহল। ব্রিটিশ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অসাধারণ যোদ্ধা এরপরে আর প্রতিরোধে সমর্থ হননি। বিপুল লোকক্ষয়, অর্থক্ষয় আর বিশ্বাসঘাতকতার দশচক্রে পড়ে তঁার বিদ্রোহী সত্তার কোমর ভেঙে যায়। হাতছাড়া হয়ে যায় সাধের রাজ্য অযোধ্যাও। কিন্তু এতকিছুর পরেও মহারানির আত্মসম্মানবোধ এতটুকু টোল খায়নি।
শত্রু চিনতে ব্রিটিশরা ভুল করেনি। লখনউ–অযোধ্যার দখল নেওয়ার পর তারা আলোচনায় বসল, বেগমকে নিয়ে কী করা যায়। অনেক তর্কবিতর্কের পর স্থির হল, তিনি যদি বশ্যতা স্বীকার করেন, তঁাকে বছরে বারো লক্ষ টাকা পেনশন দেওয়া হবে। দেওয়া হবে নিরাপদ বাসভবন, ভৃত্য–বাবুর্চি, জনাকয়েক দেহরক্ষী। দূত মারফত প্রস্তাব পাঠানো হল হজরত মহলের কাছে। তাচ্ছিল্যভরে প্রস্তাব উড়িয়ে দিলেন বেগম। অযোধ্যা এরপর তাঁর কাছে আর নিরাপদ ছিল না। সবার অলক্ষ্যে জনাকয়েক বিশ্বস্ত সঙ্গীকে নিয়ে গৃহত্যাগ করলেন হজরত মহল। চলে গেলেন তরাইয়ের গভীর জঙ্গলে। কিন্তু ইংরেজরা তঁাকে নজরছাড়া করল না। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ব্রিটিশদের গুপ্তচর। 
নির্জন অরণ্য, পাখির কূজন, টিলা আর ঝর্না সবুজে মাখামাখি, কিন্তু শান্তি কোথায়?‌ ইংরেজদের চোখ এড়াতে অনবরত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন ক্লান্ত, বিধ্বস্ত বেগম সাহেবা। নেপালের রানার কাছে গোপনে বার্তা পাঠালেন আশ্রয় চেয়ে। ইংরেজদের ভয়ে রানা প্রথমে রাজি হননি। পরে কী মনে করে সম্মত হন। হতক্লান্ত হজরত মহল যখন নেপালে পৌঁছলেন, তাঁকে আশ্রয়–বাসস্থান দেওয়া হল বটে, কিন্তু তিনি হয়ে গেলেন নজরবন্দী। বিনা অনুমতিতে ভবন চত্বর থেকে বেরনোর উপায় ছিল না। অযোধ্যা থেকে যেটুকু ধনসম্পদ সঙ্গে করে আনতে পেরেছিলেন, সবই কেড়ে নিল নেপালের রাজার নিয়োগ করা প্রহরীরা। সঙ্গী নেই, সাথী নেই, সহায়সম্বল বলে কিছু নেই, অযোধ্যার সুন্দরী রানি অন্তরে এক অগ্নিকুণ্ডকে বঁাচিয়ে রেখে দিনে দিনে বৃদ্ধ হতে লাগলেন। ইংরেজরা তঁাকে ভুলে গেল। ভুলে গেল ভারতবাসীও। যাদের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন, নিরাপত্তা, রাজ্যপাট সবই উৎসর্গ করেছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর বিবাহবিচ্ছিন্না এই বেগম। কাঠমান্ডুতে ১৮৭৯ সালে যখন তিনি মারা যান, তঁার বাসভবনের কাছেই ফঁাকা একটুকরো জমিতে অবহেলাভরে তঁাকে কবর দেওয়া হয়। ১০০ বছর পরে একটি ইংরেজি কাগজ লিখছে,— ইনি সেই বীরাঙ্গনা, যাঁর মৃত্যুতে কেউ কঁাদেনি। ইনিই সেই তেজোদ্দীপ্ত রানি গোটা দেশ যাঁকে কোনও দিন সম্মান দেয়নি। পেট্রলপাম্প আর গণশৌচাগারের মাঝে, একটুকরো জমিতে, কুণ্ঠিত হয়ে শুয়ে আছেন বেগম হজরত মহল। বিবর্ণ, ভাঙাচোরা সেই সমাধিতে একটা সম্মানফলকও কেউ গুঁজে দেয়নি। শতাব্দীভর এখানে তিনি নিদ্রিত। কিন্তু সমাধি বেদির কোনও কোনায় এক লাইনও লেখা নেই— কে ইনি!‌
মানুষ আর মানুষের একপেশে ইতিহাস এমনই নির্মম আর স্বার্থপর। 

জনপ্রিয়

Back To Top