বরিশাল থেকে দুটো স্টিমার কলকাতার দিকে আসত। দিনের বেলাকার জাহাজটা প্রায়ই আকারে হত বিশাল, গারাণে, সিন্ধু এইরকম নামের গোটা তিন চারেক জাহাজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেত আসত। আর এস এন অ্যান্ড আই জি এন— এই দুটো বিখ্যাত জাহাজি কোম্পানি তখন পূর্ব বাংলা আর অসমের নদীগুলোতে রাজত্ব করত। কোনও ব্যবসায়িক কারণে এই সাহেবি কোম্পানি দুটো মিলে একটা কোম্পানি হয়ে গিয়েছিল। সকালে বরিশাল জাহাজঘাট ছেড়ে বেলা দশটা নাগাদ এসে পৌঁছত হুলারহাটে। ওটাই ছিল আমাদের পিরোজপুরের জাহাজঘাট। প্রায় চার মাইল দূরে। বেলা দশটা থেকে রাত ন’‌টা পর্যন্ত অন্তত দশ–‌বারোটা ঘাটে থেমে তাকে তুলে নামিয়ে, ডাকের থলে বদলা বদলি করে গদাই লশকরি চালে খুলনা গিয়ে থামত। একে বলত বরিশাল মেল। এর সঙ্গে যোগ ছিল বেঙ্গল–‌আসাম (‌বি অ্যান্ড এ)‌ কোম্পানির রেলের বরিশাল মেল। রাত এগারোটায় খুলনা থেকে ছেড়ে শেয়ালদায় পৌঁছত ভোরবেলা। এতটা ধীরগতি হলেও এতে যাওয়ার আলাদা মজা ছিল। যতই ঢিমেতালের স্টিমার হঁাকে, বছরে একবার আমরা এটাতে চেপে যাবই কলকাতা। কখনও স্টিমার থামল নদীর ভাঙা উঁচু পাড়ে— সাজো তিনখানা তক্তা ফেলে পালে হয়ে গেল দোতলার ডেকের সঙ্গে। নেমে গিয়ে কলামুলো কিনে আনা গেল। আবার মাঝগাঙে জাহাজ দঁাড়াল, নৌকাভর্তি আখ, বাতাবি, দইয়ের ভঁাড়, রসগোল্লা। একতলার ডেকে দঁাড়িয়েই কেনাবেচা। উৎসাহী কেউ জেলেদের কাছ থেকে কিনল ইলিশ, রান্না হবে স্টিমারেই। আমরা যাব বরিশাল মেল–‌এ। ঢিমেতালের মেল স্টিমার বলে ভিড় কম হবে। তাই বাছা হল। রাতের এক্সপ্রেস হলে রাত দশটায় উঠে ভোরে খুলনা, এগারোটার মধ্যে শেয়ালদা। না, ভালই হল, মেলে যাব। তারিয়ে তারিয়ে শেষ দেখা দেখতে দেখতে আর কোনওদিন তো এ পথে যাওয়া হবে না। এক সাধারণ কবির দু–‌‌এক চরণ মনে পড়ছে, ‌আর কোনওদিন এই পথে হবে নাকো আসা, দু’‌দিকে যাই বপন করে বুকের ভালবাসা।’‌ কুমুদ মল্লিকের লেখা, একটু ভুল তুললাম নাকি‍‌!‌ কাল সকাল আটটায় দেশ ছাড়ব। গরিবের সংসার। গোটা তিনেক কেবিন ট্রাঙ্ক আর দুটি শতরঞ্চে বঁাধা বিছানা। রাত আটটা নাগাদ গেলাম অ্যাক্টিং হেডমাস্টার মফিজুদ্দিন আহমেদ সারের সঙ্গে দেখা করতে। অনুকূল ব্যানার্জি অপশনে ভারতে চলে গেছেন। এখনও নতুন হেডমাস্টার আসেননি। মফিজু্দ্দিন সারই আপাতত প্রধান। ওঁর সঙ্গে পাকিস্তানের যৌক্তিকতা নিয়ে এককালে অনেক তর্ক করেছি। মতে মিল না থাকলেও ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে দঁাড়াতেই, এই শ্যাষ দ্যাখা, তাই না। বড় করে একটা শ্বাস বেরিয়ে এল। বললেন, খুব ইচ্ছে ছিল হেডমাস্টার হবার। মনে হইত, আমারে যে হেডমাস্টার করা হইত্যাচে না, সেটা হিন্দুগো ষড়যন্ত্র। আমার থিকা যোগ্য আর কাউরে মনে হয় নাই। আপাতত অ্যাক্টিং হইছি, খবর পাইলাম মাসখানেকের মধ্যে আমারেই পুরোদস্তুর হেড করা হইবে।— সে তো সার খুবই ভাল কথা, আপনার মতো হেড সার কয়ডা স্কুলের ভাগ্যে জুটবে!‌ কিন্তু সুখ পাই না রে। খা খা করতাছে এতবড় স্কুলবাড়ি। ক্লাস টেনে তেরোটা ছেলে পড়িয়া রইল। আমি এক শূন্য স্কুলের ফুটা হেডমাস্টার। প্রজা নাই রাজ্যের রাজা। একটু থেমে বললেন, কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের পরে পাণ্ডবগো হস্তিনার রাজা হইয়া বসার মতো। আমি এটুকু বুঝি কয়েক বছরের মধ্যে নতুন মুসলমান ছাত্রে স্কুল ভরে উঠবে। মফিজ সারের দুঃখ থাকবে না। নতুন রাষ্ট্রে নানা ধরনের চাকরির শূন্যস্থান পূরণ করার প্রয়োজন পড়বে। অনেক কৃষিজীবী মুসলমান পরিবারের ছেলে লেখাপড়ার দিকে এগোবে। কিন্তু আজ গমগমে স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারির জায়গায় একটা খঁা খঁা শূন্য স্কুলের হেডমাস্টার, মফিজসারের মনে সত্যিই লেগে ছিল। বেশ কয়েক বছর পরে মফিজসারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল হিন্দু স্কুলের টিচার্স রুমে। আমি গিয়েছিলাম আমার পুরনো সার পিরোজপুর সরকারি স্কুলের প্রফুল্লবাবুর (‌চক্রবর্তী) কাছে কী একটা কাজে। মফিজদ্দিন এসেছিলেন কলকাতায়। তখনও পাসপোর্ট–‌ভিসার ঝামেলা শুরু হয়নি। পুরনো কোলিগ প্রফুল্ল চক্রবর্তীর সঙ্গে এক পলক দেখা করতে ঢুকে পড়েছেন হিন্দু স্কুলে। স্কুলের উঁচু ক্লাসে আমাদের সেরা শিক্ষক ছিলেন তিনজন— প্রফুল্ল চক্রবর্তী, বিজয় মুখার্জি আর মফিজুদ্দিন আহমদ। কী প্রতিযোগিতাই না ছিল তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে ভাল পড়াবার। সেই কথা স্মরণ করে দু’‌জনেই হেসে কুটিকুটি। মফিজসার বললেন, এখন তো খোলামাঠে গোল। কার সঙ্গে পাল্লা দেব?‌ দশ বছরেও তেমন কেউ আসবে না। দীর্ঘশ্বাস প্রফুল্লবাবুরও পড়ল, সেই বিশাল তিনটে–‌চারটে ফুটবল মাঠ, বিরাট দিঘি, লাল শাপলার জঙ্গলে ঢাকা। হিন্দু স্কুলে বসেও সামান্য পিরোজপুর স্কুলের জন্য দীর্ঘশ্বাসে আমার মনও ভরে উঠল। আমার শিক্ষক কট্টর লিগার মফিজুদ্দিন আহমদ এখনও বেঁচে আছেন কিনা জানি না, থাকলেও আমার এই লেখা তাঁর চোখে পড়বার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবু নিজের মনের তৃপ্তির জন্য তঁাকে জানাই শেষ সেলাম। আর সেলাম ভূগোল শিক্ষক আজিজুল সাহেবকে। ’‌৪৬ সালেই তিনি বদলি হয়ে চলে যান বরিশাল সদর জিলা স্কুলে। কিন্তু ’‌৪৬–‌এর ম্যাট্রিকে পিরোজপুরের স্কুলের ১৭ জন ছাত্রকে ভূগোলে লেটার পাইয়ে ছেড়েছিলেন। আমি যে কী মন্ত্রে ৫০–‌এ ৪৭ পেয়েছিলাম তা আজিজুল সারই জানেন। ভদ্রলোক নিয়মিত ম্যালেরিয়ায় ভুগতেন, আর কঁাপতে কঁাপতে কী পড়ানোটাই পড়াতেন। আমরা যে কেউ দু’‌মিনিটে ভারত বা বাংলা বা পৃথিবীর ম্যাপ অঁাকতে পারতাম, নরম মাটি দিয়ে রিলিফ ম্যাপ বানাতে আধ ঘণ্টাই ছিল যথেষ্ট। জানি না, ’‌৪৭–‌এর পরে ভারতের ম্যাপ বানানো বন্ধ হয়ে গেলে দুইচিলতে পাকিস্তানের ম্যাপ তৈরি করে তিনি তৃপ্তি পেতেন কিনা। আর গণিত শিক্ষক সামসুদ্দিন বি এ–‌তে গণিত আর সংস্কৃত ছিল তাঁর কম্বিনেশন। একবার সেকেন্ড পণ্ডিত হরিচরণ ভট্টাচার্য মাসখানেক ছুটিতে যাওয়ায় অনেকগুলি সংস্কৃতের ক্লাস নিয়েছিলেন সামসুদ্দিনসাহেব, তাই নিয়ে আরবির মৌলবিসাহেব একটা ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টাও করেছিলেন। উনি কারক বিভক্তির সূত্র মুখস্থ করার একটা সহজ পন্থা শেখাতে শেখাতে মৌলবিসাহেবের উদ্দেশে ধ্যাৎ বলে একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। ওঁর সঙ্গে দেখা হয় ১৯৫৪ সালে বারাসতের প্ল্যাটফর্মে। কলকাতায় কী কাজে এসেছিলেন, দেশে ফিরছেন বরিশাল এক্সপ্রেসে। সিগন্যালের জন্য রেল দঁাড়িয়ে। আমায় দেখতে পেয়ে একেবারে জড়িয়ে ধরেছিলেন।— জানিস এখন আমি রেগুলার সংস্কৃতের শিক্ষক। মৌলবিসাহেব আর আপত্তি করে না।
সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ দরজা ঠেলল এক চেনা গলা। বাঘের মতো বিরাট হঁাড়িমুখ, চিবুকে দু’‌গোছা দাড়ি। আরে কালুমাঝি!‌ ঠিক ওর কথাই ভাবছিলাম। কত খোঁজ করেছি। অনেক দূরে সওয়ারি নিয়ে চলে গিয়েছিল কালুমাঝি, মাছলুঠ এক পার্টির সঙ্গে ছোটখাটো দাঙ্গাও হয়ে গেছে নলচিঠির বঁাকে। কাল রাতে নাকি হঠাৎ স্বপ্নে বুড়া ঠাইরন অর্থাৎ আমার ঠাকুরমাকে দেখে সে লাফিয়ে ওঠে। আমার পোলাপানেরা সব দ্যাশ ছাড়িয়া যায়, আর তুমি নৌকা লইয়া এই দূর গাঙে ঘুইর‌্যা বেড়াইত্যাছ?‌ কালু আর দেরি না করে জোর লগি ঠেলে চলে এসেছে।‌ সে এসে গিয়েছে, আর চিন্তার কারণ নেই। ভাতটাত খেয়ে কালু নৌকায় শুতে যাবে, বাড়ির সামনে তারোব আলি দারোগার সঙ্গে দেখা। তুমি মুসলমানের পোলা.‌.‌.‌ হিন্দুর বাড়ি ঘোরাঘুরি কেন?‌ কালু শুধু গলা নামিয়ে বলল, নলচিঠির বঁাকে হুজুরের সঙ্গে সেই রাত্তিরে মোলাকাত হবার পর এত জলদি আবার দেখা হইবে আশা করি নাই। তারোব দারোগার মুখ চুন। পরে শুনলাম, মাছ লুঠ হচ্ছিল এই তারোব দারোগার তত্ত্বাবধানে। দানবের মতো কালু মাঝিকে দারোগা চেনে এবং মনে মনে ডরায়। পরের সকালে জনা দুই কনস্টেবল এসে হাজির। মালপত্র সার্চ হবে পাকিস্তানের থেকে সোনাদানা বাইরে ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাওয়া যাবে না। দারোগার হুকুম। কালু রুখে দঁাড়াল। দারোগাসাব, ঘাড়ের ব্যথা তিনদিনেই মইর‌্যা গেল। মানুষের গলায় বাঘের হুঙ্কার আমি আগে শুনিনি। তারোব আলি সুর পাল্টে বলল, না ডাক্তারবাবু শহরের মান্য লোক, সার্চ হবে না। বাবা ধীরে বললেন, ভাববেন না দারোগাসাহেব, আমি এখন দেশ ছাড়ছি না। জায়গাগুলি কাউরে লিখে দেবার জন্য দেরি করব আরও মাসছয়েক, অতএব চিন্তা নাই। ডাক্তারখানার ঘাট থেকে কালুমাঝি নৌকা ছাড়ল। দুঃখে দেশ ছাড়ব ভেবেছিলাম, ছাড়ছি আতঙ্কে। বাবা হুলারহাটে আমাদের বরিশাল মেলে তুলে দিয়ে ফিরে আসবেন। কালু বলল, সে যাবে খুলনা পর্যন্ত। আমাদের রেলে চড়িয়ে তবে ফিরবে। তার ভাতিজা নৌকা নিয়ে হুলারহাট থেকে ফিরবে। পিরোজপুরে আসবে। শহর থেকে মাইল আধেক এসেই খালের ধারে শ্মশান। আমরা বলতাম মড়কখালো, তার একটু আগে লাশকাটা ঘর। নৌকাটা আপনিই থামাল কালুমাঝি। বলল, কী কমু বাবু, বিশ্বাস যাবেন না, বুড়া ঠাইরন ওই খানডায় দঁাড়াইয়া আমারে কাইল সন্ধ্যায় হাত নাড়িয়া কইলেন, বসুকী, আমার পোলাপানগুলারে দেখিস। আমাদের গায়ে কঁাটা দিয়ে উঠল। কিছুকাল আগে এই মড়কখালোয় পুড়িয়েছি ঠাকুরমাকে। মনে হল, তঁাকে একা এই বিদেশ বিভুঁইয়ে ফেলে যাচ্ছি। এই দ্বিতীয়বার পিতামহীর মৃত্যুশোক ভোগ করলাম।

 

হুলারহাটে লোক থই থই করছে। বাক্সপ্যঁাটরা নিয়ে দলে দলে আতঙ্কিত মানুষ পালাচ্ছে। অনেকে চলেছে বাড়ির মেয়েদের ভারতে পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কোনওমতে তুলে দিয়ে ইজ্জত বঁাচানো। অত্যাচারের ঘটনা, এমন কিছু ঘটেনি তখনও। কিন্তু অতি তীব্র ভয়। এত শোক দেখে দধি পাণ্ডা তার হোটেল বন্ধ করে সরে পড়েছে। কলা আখ শশা গুড় চিঁড়ে মুড়ি নিয়ে দু–‌‌চারটি দোকান তাল সামলাতে পারছে না। স্টিমারের টিকিট দিচ্ছে না। রাতে বরিশাল এক্সপ্রেস জেটিতে ভেড়েনি। আজ কি বরিশাল মেল দঁাড়াবে?‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top