লিখলেন পীতম সেনগুপ্ত। 
ছবি অঁাকলেন দেবব্রত ঘোষ। 

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি নামটি শুনলেই বিস্ময়ের ঘোর জাগে। এই বাড়ির অন্দরমহলের পরতে পরতে কত যে ইতিহাস, কত যে চমক, কত যে কৃষ্টিকথা তা লিখে ও বলে শেষ করা যায় না। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে স্বর্ণকুমারী, জ্যোতিরিন্দ্র রবীন্দ্রের হাত ঘুরে তা পৌঁছেছিল প্রতিভা, অবন, সরলা, ইন্দিরা এবং দিনেন্দ্র, সৌমেন্দ্র, নীতিন্দ্রের রুচিতে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। সাহিত্যে, সঙ্গীতে, শিল্পে তাঁর ছাপ তিনি নিপুণভাবে রেখে গিয়েছেন। কেমন করে রবীন্দ্রনাথের গান ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক সৌহার্দ্য এবং পৃষ্ঠপোষকতায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছিল? এই প্রসঙ্গে‌ স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবীর একটি স্মৃতিচারণ দেখে নেওয়া যেতে পারে। ‘জীবনের ঝরাপাতা’ গ্রন্থে সরলা দেবী লিখছেন, ‘‌মেজমামীদের সঙ্গে রবিমামাও প্রথমবারের বিলেত যাত্রা থেকে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। আমরা ছোটরা গানের ভিতর দিয়ে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কে এলুম।... বাড়িতে গানবাজনা ও অভিনয়াদির দিক থেকে রবিমামার প্রাধান্য ক্রমশ ফুটছে.‌.‌.।‌’‌ 
রবীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র, ফলে তাঁর বড় দাদা–দিদিদের সন্তানসন্ততিরা তাঁর বয়সের কাছাকাছিই ছিলেন সকলে। এই সমস্ত ভাইপো ভাইঝি বোনপো বোনঝিদের কাছে অমিতপ্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কাছের মানুষ এবং অনুপ্রেরণার উৎস। অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন , ‘‌বাড়িতে কিছু একটা হলেই তখন ‘রবির গান’ নইলে চলত না। আমরা ছিলুম সব রবিকাকার অ্যাডমায়ারার।’‌  
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে মাঘোৎসবের অনুষ্ঠানে মহর্ষি সরে যাওয়ার পর প্রথমদিকে সত্যেন্দ্রনাথ এবং পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথই নেতৃত্বে থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে আসার পর তিনি নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন। এই সময় থেকেই বাড়ির সব গাইয়ে ছেলেমেয়েদের ডাক পড়তে লাগল। এর আগে শুধু হেমেন্দ্রনাথের বড় মেয়ে প্রতিভারই ডাক পড়ত। 
‘রবীন্দ্রনাথের জন্য বাড়িতে ভূমি তৈরি’ এই কথাটির সমর্থনে একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাব দেবেন্দ্রনাথ–সহ তাঁর সন্তানদের মধ্যে বিশেষ করে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সকলেই গান লিখতেন। দেবেন্দ্রনাথই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং তারিফ করেছিলেন। ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায় কবি সে কথা স্বীকারও করেছেন মুক্তকণ্ঠে। ‘‌যখন সন্ধ্যা হইয়া আসিত পিতা বাগানের সম্মুখে বারান্দায় আসিয়া বসিতেন। তখন তাঁহাকে ব্রহ্মসংগীত শোনাইবার জন্য আমার ডাক পড়িত। চাঁদ উঠিয়াছে, গাছের ছায়ার ভিতর দিয়া জ্যোৎস্নার আলো বারান্দার উপর আসিয়া পড়িয়াছে, আমি বেহাগে গান গাহিতেছি।’‌ আর চুঁচুড়ার বাড়িতে ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে’ গানটি একাধিকবার শোনার পর পাঁচশো টাকার চেক উপহার যে কবির জীবনে প্রথম স্বীকৃতি তা আজ সর্বজনবিদিত। মহর্ষির জ্যেষ্ঠ কন্যা সৌদামিনী দেবী ‘পিতৃস্মৃতি’তে লিখেছেন, ‘‌রবির গান শুনিতে তিনি ভালোবাসিতেন। বলিতেন, রবি আমাদের বাংলা দেশের বুলবুল।’‌
দেবেন্দ্রনাথের পরই ওই বাড়ির যে মানুষটির নিরন্তর সাহচর্য ছাড়া তাঁর শ্রীবৃদ্ধি কেমন হত তা গবেষণার বিষয় হতে পারে, তিনি হলেন কবির নতুনদাদাটি। শুধু জ্যোতিদাদা নিজে নন, তাঁর স্ত্রী কবির নতুন বৌঠানও কবির গানকে নানাভাবে উৎসাহ দিতেন। তাঁকেও যে নিয়মিত গান শোনাতে হত। নতুন বৌঠান রবির গান শুনে টিপ্পনী কাটতেন। বলতেন, ‘‌রবির গলা যেন কী রকম। সত্য এর চেয়ে ভালো গাইত।’‌ ‘ছেলেবেলা’য় তাঁকে গান শোনানোর স্মৃতির কথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখে গেছেন, ‘‌বউঠাকরুন গা ধুয়ে চুল বেঁধে তৈরি হয়ে বসতেন। গায়ে একখানা পাতলা চাদর উড়িয়ে আসতেন জ্যোতিদাদা, বেহালাতে লাগালেন ছড়ি, আমি ধরতুম চড়া সুরের গান।... সূর্য-ডোবা আকাশে ছাদে ছাদে ছড়িয়ে যেত আমার গান।’‌
মহর্ষির সপ্তম পুত্র, সোমেন্দ্রনাথ বয়সে কবির থেকে মাত্র দু-বছরের বড় ছিলেন। বাল্যবন্ধুও ছিলেন। একটা সময়ে জোড়াসাঁকোর ছয় নং বাড়ির একটি ঘরে তিনি একাকী কাটাতেন। উন্মাদগ্রস্ত সোমেন্দ্রনাথকে অনেকেই সে সময়ে এড়িয়ে চলত। চমৎকার গানের গলা ছিল তাঁর। একা একাই রবির গান গাইতে পছন্দ করতেন। গাইতেনও গলা ছেড়ে। দ্বারকানাথের ভাগনে ঈশ্বরচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলতেন, ‘‌‌গলা হচ্ছে সোমবাবুর। যেমন গলা তেমনি গান গায়ও বটে।’‌ আবার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অর্ধেন্দুকুমার গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ‘‌সোমবাবু গান করতেন বেশ ভালো। বেশিরভাগই রবীন্দ্রনাথের রচিত গান গাইতেন। তাঁকে বৈঠকখানায় বসিয়ে দিলেই ফরাশে বসে তামাক-টামাক চাইতেন। তারপর রবির গানে আসর দিতেন মাতিয়ে।’‌ নিজেই ‘সম্মুখেতে বহিছে তটিনী’ গানটি নিবেদন করার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‌রবির এই গান গাইলে আমি বড় এক্সাইটেড হয়ে পড়ি।’‌
বলা বাহুল্য রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ এমন কথা বা প্রশংসা শুনে উৎসাহিতবোধ করতেন। ১৮৭১ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ এবং সোমেন্দ্রনাথ একসঙ্গে বেহালা ব্রাহ্মসমাজের সাংবাৎসরিক সভায় গান গাইতে গিয়েছিলেন। 
রবীন্দ্রনাথ যখন গান রচনা শুরু করে দিয়েছিলেন, সেই সময়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্বরলিপি রচনায় পরিশীলিত এবং দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের কাছে শিক্ষিত হয়ে স্বরলিপি রচনায় সিদ্ধহস্ত হন কবির সেজদা হেমেন্দ্রনাথের বড় মেয়ে প্রতিভা দেবী। ১৮৮১ সালের ২৬ জানুয়ারি মহর্ষি ভবনের তেতলার ছাদের ওপর স্টেজে অভিনীত ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’য় রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে সরস্বতীর ভূমিকায় তাঁর অভিনয় সেই সময়ে বিদ্বজ্জনদের মুগ্ধ করেছিল। পরে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিককার বেশ কয়েকটি গানের স্বরলিপি লিখেছিলেন। তাঁর তৈরি ‘বল্ গোলাপ মোরে বল্’ গানটির স্বরলিপি রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম মুদ্রিত স্বরলিপি। বাল্মীকিপ্রতিভা ও কালমৃগয়া-র গানগুলির প্রথম স্বরলিপিও তাঁর করা। প্রথমদিকে রবীন্দ্রনাথের গানের জগতে তিনি ছিলেন কবির এক নির্ভরযোগ্য সহচরী। কবির থেকে বয়সে তিনি মাত্র পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন। তাঁর বোন অভিজ্ঞার ছিল আবার অসামান্য কণ্ঠ। ইন্দিরা দেবী এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, 
‘‌‌অভি একাসনে বসে সমস্ত বাল্মীকিপ্রতিভা বা মায়ার খেলা-র গানগুলি প্রথম থেকে অভিনয় করে গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখতে পারত।’‌ 
অভিজ্ঞার পর রবীন্দ্রনাথের গানে আরও দুই বোনের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। একজন ভাগনি সরলা দেবী, অপরজন ভাইঝি ইন্দিরা দেবী। সরলার সঙ্গে কবি তাঁর গান নিয়ে অনেক আলোচনাই করতেন। মহীশূর থেকে সরলা দেবী অনেক গান শিখে এসে রবীন্দ্রনাথকে শোনালে কবি সে সব গান ভেঙে বেশ কয়েকটি গান রচনা করেন। ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’, ‘এস হে গৃহদেবতা’, ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’, ইত্যাদি গান ‘‌‌আমার আনা সুরে বসান গান’‌ একথা স্বয়ং সরলা দেবীরই। ‘‌রবিমামার পায়ের তলায় সে গানের সাজিখানি খালি না করা পর্যন্ত মনে বিরাম নেই। সাজি থেকে এক একখানি সুর তুলে নিলেন তিনি, সেগুলিকে মুগ্ধচিত্তে নিজের কথা নিয়ে নিজের করে নিলেন— তবে আমার পূর্ণ চরিতার্থতা হল।’‌ জানা যায় দার্জিলিং বসে সরলা দেবীকে পাশে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন একটি–দুটি গান তৈরি করে, সরলাকে সে সব শিখিয়ে দিতে দিতে মায়ার খেলা গীতিনাট্যটি রচনা করেছিলেন। সরলার মতো ইন্দিরাও ছিলেন রবিকাকার নেওটা। নিজের ‘‌সংগীতস্মৃতি’‌ প্রবন্ধে ইন্দিরা এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, 
‘‌পরবর্তী জীবনে আমি... রবিকাকার অনেক বিলিতি গানের সঙ্গে পিয়ানো বাজিয়েছি, সেসব এখনো সেদিনের মূক সাক্ষী-স্বরূপ আমার গানের বাঁধানো বইয়ে পড়ে আছে..‌.।’‌ সঙ্গীত প্রতিভার গুণে প্রতিভা, অভিজ্ঞা, সরলা, ইন্দিরা সকলেই কমবেশি কবির প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। সরলা এবং ইন্দিরাও প্রতিভার মতো রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি রচনা করেছিলেন। 
ভাইঝি ভাগনিদের মতো ভাইপোরাও কবির গানের নিত্য সহচরী হয়ে কবিকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। এই ব্যাপারে প্রথমেই কবির বড় দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র সুধীন্দ্রনাথের নাম করতে হয়। তাঁর গলায় গান তেমন খুলত না। তাই অর্গান বা পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন। বাড়িতে যখনই নাটক বা থিয়েটার হত সুধীন্দ্রনাথ বসে যেতেন অর্গানে কিংবা পিয়ানোয়। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গেও তাঁর পিয়ানোবাদন ছিল যোগ্য সঙ্গত। সুধীন্দ্রনাথের পুত্র সৌমেন্দ্রনাথের ভাষায়,
‘‌পিতার গানের গলা ছিল না, কিন্তু খুব সুরবোধ ছিল আর তাঁর বাজনার হাত ছিল খুব মিষ্টি।’‌ রবীন্দ্রনাথ ‘সুধীর বিবাহদিনে’ ‘‌‌বাজিল কাহার বীণা’‌‌ গানটি লিখে উপহার দিয়েছিলেন। কবির সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের পুত্র হিতেন্দ্রনাথের গানের গলাটি ছিল মধুর। খুব ভাল সেতার এবং তবলা বাজাতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথের গানও গাইতেন। 
সে আমলে ওস্তাদ কানাইলাল ঢেঁড়ির কাছে এসরাজ বাজানো শিখতে যেতেন ঠাকুরবাড়ির তিন ছেলে— অবনীন্দ্র, অরুণেন্দ্র এবং সুরেন্দ্র। অবনীন্দ্রনাথ রানী চন্দকে কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘‌ইচ্ছে হল পাকা বাজিয়ে হব। যাকে বলে ওস্তাদ।’‌ আরও বলেছেন, ‘‌রবিকাকা গান গাইতেন আর আমি এসরাজ বাজাতুম, বহুবার এমনটি হয়েছে।... গরমকালে সন্ধেবেলা চাঁদনি রাতে ছাদে বসা হত।’‌ 
সেখানে গল্প হত। গানবাজনা হত। ‘‌রবিকাকার গান আর আমার এসরাজ’‌। অবনঠাকুরের এই স্মৃতিচারণেই স্পষ্ট হয় যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের এসরাজ সঙ্গতকে কতটা মান্যতা দিয়েছিলেন। 
নাতি-নাতনিদের মধ্যে যাঁরা রবিদা’র গানকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের সর্বাগ্রে দিনেন্দ্রনাথের অবদানের কথা বলতে হয়। কবির গানের কান্ডারি ছিলেন তো তিনিই। একাই কবির ছশোর ওপর গানের স্বরলিপি লিখেছেন। তাছাড়া নানা জায়গায় রবীন্দ্র-গানে অভিনয়ে শেখানোয় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ‘রবীন্দ্রসংগীত’ এই নামটিও দিনেন্দ্রনাথের দেওয়া। নিঃসন্দেহে তাঁকেই কবির গানের শ্রেষ্ঠ সহচর বলা যায়। নাতনিদের মধ্যে প্রতিভা ও আশুতোষ চৌধুরীর কন্যা অশোকা গানে খুবই দক্ষ ছিলেন। একবার আশুতোষ চৌধুরীর বাড়িতে  বাল্মীকিপ্রতিভা অভিনয়ে অশোকা সরস্বতীর ভূমিকায় এবং দিনেন্দ্রনাথ বাল্মীকির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত থেকে অশোকার অভিনয় এবং গানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। অশোকাও রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গানের স্বরলিপি লিখেছিলেন। 
‘খুব শিশু বয়স থেকেই আমি গান গাইতে পারতুম।... আমার বয়স তখন পাঁচ বৎসর হবে, মনে পড়ে বাড়ির উঠোন ভরে গেছে লোকে, আমার দাদা দিনেন্দ্রনাথ মাথায় গেরুয়া পাগড়ি গায়ে আলখাল্লা, আমাকে তাঁর কাঁধে বসিয়ে তাঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে গান ধরেছেন, ‘‌‌সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’‌, আমি তাঁর কাঁধের উপর বসে গাইতুম তাঁদের সঙ্গে।...’‌ আবার ‘‌একবার এগারোই মাঘে আমি অনেকগুলো গান গাইলুম।... রবীন্দ্রনাথ আর আমি দুজনে ‘‌তুমি যত ভার দিয়েছ’‌ এই কীর্তনটি গাই। তখন আমার বয়স সাত আট হবে।’’‌ এই স্মৃতিচারণ যাঁর তিনি রবীন্দ্রনাথের নাতি সৌমেন্দ্রনাথ। ভাবা যায়!‌ একেবারে শিশু বয়স থেকেই রবিদা’র গানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। 
সৌমেন্দ্রনাথের দিদি, রমা ঠাকুর মুখোপাধ্যায়ও অসম্ভব ভাল গান গাইতেন। নিজের মেয়ের ঘরের নাতি, মীরাদেবীর পুত্র নীতীন্দ্রনাথও যে সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। শেষে ঠাকুরবাড়ির বৌমাদের রবীন্দ্রনাথের গানের প্রীতির কথা বলা যাক। 
কবির ভাইপো দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী, সুশীলা দেবী খুবই ভাল গান গাইতেন। ইন্দিরা দেবীর লেখনী থেকে সে কথা জানা যায়।
“আমার পিসতুতো বোন সুপ্রভাদিদির বিবাহের সময়, (২৪ জুন, ১৮৮৫) আমাদের সেই ‘বিবাহ উৎসব’ অভিনীত হয়। দিনুর মা সুশীলা বউঠান নায়ক সেজেছিলেন। তিনি গান এবং অভিনয় দুইই সুন্দর করতেন। তাঁর একটি গান, “ও কেন চুরি করে চায়” তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।”
অমিতা ঠাকুর হলেন অজিতকুমার চক্রবর্তীর মেয়ে। মহর্ষির প্রপৌত্র অজীন্দ্রনাথের স্ত্রী। তাঁদের বিবাহ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছিলেন, ‘‘‌এসো এসো আমার ঘরে এসো’’। শান্তিনিকেতনে ছোট থেকেই থাকার সুবাদে রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর অঙ্গে জড়িয়ে আছে, খুবই ভাল গান করতেন। তাঁর গাওয়া কবির একটি গান আজও লোকমুখে প্রশংসিত। গানটি হল ‘কে রয় ভুলে তোমার মোহন রূপে’। এমন আরেক নাতবউ হলেন অমিয়া। বেথুন কলেজে পড়ার সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চেনেন। তখন ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে আসেননি অমিয়া। কবি একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “বেথুন কলেজে অমিয়া রায় বলে একটি মেয়ে আছে তাঁর গলা ঝুনুর চেয়েও ভালো।” ঠাকুরবাড়িতে মায়ার খেলা-য় প্রমদার চরিত্রে অভিনয় করানোর জন্য তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন প্রতিভা দেবীর বোন মনীষা। সরলা দেবীর কাছে গান শেখার পর অভিনয় এবং গানের তালিম পান স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে। হেমেন্দ্রনাথের নাতি, হৃদীন্দ্রনাথ অমিয়ার অভিনয় এবং গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁর বিয়ের পর কবি কলকাতায় এলেই গান শিখতেন। তাঁর কণ্ঠে ‘এ ধ্বনি চরণ পরসত’ খেয়ালটি শুনে কবি লিখেছিলেন, “কী ধ্বনি বাজে”। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে রবিঠাকুরের গানের তিনিও ছিলেন একজন যোগ্য সহচরী।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top