হাজার চেষ্টা করেও মিলল না অঙ্ক। সভ্য দূরত্বে থেকে এবার দুজন আনন্দে থাক। জীবন একটাই। 
ঈশানী রায়চৌধুরী 

তিনজন নারী, দু‌জন পুরুষ। ওঁরা কেউ কাউকে চেনেন না, তবু কোথাও তাঁদের মধ্যে একটা অদৃশ্য বন্ধন আছে। বন্ধনহীনতার বন্ধন। ওঁরা পাঁচজনই বিবাহবিচ্ছিন্ন। পাঁচজনের গল্প আলাদা আলাদা।
প্রথম চরিত্র
নাম: জয়তী সেন 
বয়স: ৬৩ 
পেশা: স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রনির্মাণ
নিবাস: পুনে 
 —আপনার বিবাহবিচ্ছেদের কারণ?
—বাড়ির বিরুদ্ধে গিয়ে যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলাম, দুটি সন্তান জন্মের পরেও বুঝিনি যে সে এক–নারীতে সন্তুষ্ট থাকার মানুষ নয়। প্রথমে আমার চোখের আড়ালে, তারপর আমার সামনেই এত কিছু যে, বাধ্য হয়েছিলাম আদালতে যেতে।
—আপনার বাবা–মা আপনার পক্ষে ছিলেন?
—আমি কারও সাহায্য চাইনি, করুণাও নয়। বিয়ে করার সিদ্ধান্ত আমার বা আমাদের দুজনের ছিল, ভাঙার সিদ্ধান্তও আমাদের।
—আর আপনাদের সন্তানেরা?
—দেখুন, আমার প্রাক্তন স্বামী যে আমার সন্তানদের পিতা, সেটা অস্বীকার করি কী করে!‌ ওর জীবনযাপন আমার সন্তানদের কম বয়সে বিচলিত করত, তাই আলাদা থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু ও সপ্তাহে নিয়ম করে একদিন এসেছে, ওদের নিয়ে বেড়াতে গেছে, ওদের অসুখবিসুখ করলে খোঁজখবর করেছে...স্বামী হওয়ার আগে আমরা বন্ধু ছিলাম। বিচ্ছেদের পরে বিয়ের সিলমোহরটা মুছে গেলেও বন্ধু হয়ে আছি এখনও। 
—এই যে ওঁর বহু নারীসঙ্গ...।
—হ্যাঁ, অনেক বান্ধবী। আর মজাটা কী জানেন, স্ত্রী হিসেবে যেটা মেনে নিতে অসুবিধে ছিল, এখন বন্ধু হিসেবে সেটা মানতে অসুবিধে হয় না আর। আমরা ভালই আছি। 
দ্বিতীয় চরিত্র
নাম: সমীরণ চক্রবর্তী 
বয়স: ৩৭ 
পেশা: মার্কেটিং প্রফেশনাল
নিবাস: কলকাতা 
—আপনার দাম্পত্য জীবনের আয়ু ?
—সাত মাস দশ দিন।
—কেন এই সিদ্ধান্ত?
—দেখুন, আমাদের খুব রক্ষণশীল পরিবার। কুষ্ঠি–ঠিকুজি মিলিয়ে বিয়ে। বাড়ির লোকের পছন্দেই আমার পছন্দ। প্রথমদিকে সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল জানেন! তারপরে ওই যা হয়, মায়ের সঙ্গে নিত্যি–খিটিমিটি। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। আমি কী করতাম, বলুন তো! আমার শালা শাঁখের করাত পুরো! অবস্থা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল। শেষে মনে হল, মানে–মানে আলাদা হয়ে যাওয়া ভাল! 
—এখন বাড়িতে শান্তি? 
—আরে দূর! আবার মাথা মুড়োনোর ব্যবস্থা চলছে। সেটা শুনে নীলা বলল...
—কে নীলা?
—আমার আগের বৌ।
—আপনার সঙ্গে যোগাযোগ আছে?
—থাকবে না কেন? আমাদের অফিসের কাছেই তো ওর স্কুল, মানে যেখানে পড়ায়। আমরা মাঝেমধ্যে কফিশপে আড্ডা দিই। আমরা তো বন্ধু! একসঙ্গে থাকতে পারা যায়নি বলে শত্রুতাও তো নেই কিছু!
—তা কী বললেন নীলা?
—বলল, ‘‌দেখো বাপু, তোমার মাকে এবার আগেভাগে একটু বুঝিয়ে বলে রেখো। তা না হলে আবার কয়েক মাস পর থেকে আমাদের আড্ডায় তিন কাপ কফি অর্ডার করতে হবে! তোমার আর তোমার দুই বান্ধবীর।’‌
তৃতীয় চরিত্র 
নাম: কবিতা নায়ার
বয়স: ২৬ 
পেশা: ফিনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট
নিবাস: মুম্বই 
—এত জাঁকজমক করে বিয়ে হয়েছিল আপনার, বললেন বিয়ের আগে হবু স্বামীর সঙ্গে সামান্য মেলামেশাও করেছেন, তা হলে এই সিদ্ধান্ত কেন?
—জানতাম না, ও সমকামী।
—উনি পুরোটাই গোপন করেছিলেন?
—ওকে দোষ দেবেন না। ওর বাড়ির লোকজনের হালকা একটা অনুমান ছিল, কিন্তু যা হয় আর কী! আমাদের সমাজ এখনও অতটা পারমিসিভ হয়ে ওঠেনি।
—কবে ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন?
—ও বিয়ের পরপরই আমার কাছে সব খুলে বলেছিল। আমরা কয়েক মাস একসঙ্গে ছিলাম, ওই আইনি ব্যাপারস্যাপারগুলোয় যে সময়টুকু লেগেছিল। 
—আপনাদের দু–বাড়িতে সমস্যা হয়নি?
—হয়েছিল। আমার বাবা বলেছিলেন, উচিত শিক্ষা দেবেন। আমি আটকেছি। ওর সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন আলাদা...এ তো হতেই পারে! ভালবাসা কি অত নিয়মকানুন মেনে হয়? ও আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল ওর নিজের ভীরুতার জন্য, ওর বাড়ির লোকের ইচ্ছে করে এই গোপন করে যাওয়ার জন্য। আমার সঙ্গে অনেক দিক দিয়েই ওর পছন্দ–অপছন্দের খুব মিল। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল, ওর কষ্ট দেখে। ভালবাসা মানুষকে কষ্ট দেবে কেন বলুন তো? সে তো আনন্দের! তাই সবাই যখন ওকে ছি–ছি করছিল, আমি ওর পাশে দাঁড়িয়েছি শক্ত হয়ে। নাই বা হলাম স্বামী–স্ত্রী!‌ ভাল বন্ধু হতে পারা কি কম দামি নাকি? আমি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ভালবাসার স্বাধীনতাতেও।
চতুর্থ চরিত্র
নাম: অনীক মিশ্র
বয়স: ৪৬ 
পেশা: সাংবাদিক
নিবাস: দিল্লি 
—কত বছর আপনারা স্বামী–স্ত্রী আলাদা থাকেন?
—ন’‌বছর।
—সন্তান?
—একটি ছেলে, সিমলায় হস্টেলে থেকে পড়াশোনো করে। ক্লাস ইলেভেন। 
—তার গার্জেন কে?
—কে আবার! বাবা–মা থাকতে কি পাড়ার লোক গার্জেন হবে? আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই!
—না মানে এই তো বললেন আপনারা আলাদা হয়ে গেছেন।
—তাতে কী হল? আমি ওর বাবা রইলাম না, নাকি শালিনী ওর মা রইল না?
—কাস্টডি কার ছিল?
—শালিনী চেয়েছিল ও আমার কাছে থাকুক। আইনত কাস্টডি আমার। কারণও ছিল, আমাদের যৌথ পরিবারে ছেলেটাকে দেখার অনেকে ছিল। শালিনীর বাপের বাড়ির দিকে কেউ নেই। ও নিজের প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত। ছেলেটার অযত্ন হত।
—উনি পেশায়...
—ডান্সার।  প্রচুর শো করে বেড়াতে হয় দেশে বিদেশে। ছেলেটার ভবিষ্যৎ তো ভাবতে হবে!
—ছেলে মাকে চায়নি?
—দূর মশাই, ও জ্ঞান হয়ে ইস্তক ঠাকুমাকেই ‘‌মা’‌ বলে ডেকে এসেছে। আমারও তো কাজের সময়–অসময় নেই। ছেলেটা আমাদের কাকেই বা তেমন পেয়েছে! বরং এখন আমরা দুজনই সময় ম্যানেজ করে কিছুটা সময় ওর সঙ্গে কাটাই।
—বিয়েটা ভাঙল কেন?
—ইগো ক্ল্যাশ। আমরা যে যার খুঁটি আগলে বসে ছিলাম। 
—বাচ্চাটার কথা ভাবলেন না?
—ওর কথা ভেবেই আমাদের আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত। কোনও শিশুর পক্ষে খুব জরুরি হল, বাড়ির পরিবেশ। সেখানে বাবা–মা চুলোচুলি করে মরছে, তার চেয়ে দুজনেই গ্রেসফুলি স্টেয়িং অ্যাপার্ট.‌..এটাই সুস্থ পরিবেশ নয় কি?
—আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক এখন কেমন?
—খাসা! বরং বিয়েটা না–ভাঙলেই হয়ত একজন খুন হত, আর অন্যজন জেলের ঘানি টানত। ও সারাদিন খেটেখুটে প্র্যাকটিস করে এসে দেখত আমি তখন কাজে বেরোচ্ছি। সাংবাদিকের জীবন! নিশাচর পেঁচা মশাই আমরা! দিনের বেলা ও ব্যস্ত, আর আমি পড়ে পড়ে ঘুমোতাম। শালিনীকে দোষ দিই না! কোন বৌ দিনের পর দিন সহ্য করবে এমন রুটিন?
পঞ্চম চরিত্র 
নাম: নয়না মীরচন্দানি
বয়স: ৩৪
পেশা: মিউজিক টিচার 
নিবাস: বেঙ্গালুরু
—কী এমন হল নয়না যে সংসার–স্বামী সব ছেড়ে চলে এলেন? মাত্রই তো পাঁচটা বছর ছিলেন একসঙ্গে।
—ওদের খুব বড় ব্যবসা, বুঝলেন! ঝটপট উত্তরাধিকারী চাই। তা–ও তো ওরা পাঁচ বছর সময় দিয়েছিল আমাকে। আমি নিজেই কি জানতাম যে আমার ফ্যালোপিয়ান টিউব দুটোই ব্লকড? কিছুই করার ছিল না। আর ওরা দত্তক নিতেও রাজি নয়... কে জানে কার রক্ত বইছে শরীরে! তাই যখন বুঝলাম আমি মা হতে পারব না, নিজেই সরে এলাম। নিখিল অনেকবার বুঝিয়েছিল আমাকে, বাড়ির সঙ্গে সে অনেক যুদ্ধ...কিন্তু বুঝতে পারতাম, ওরও ভেতরে ভেতরে খুব ‘‌বাবা’‌ ডাক শুনতে ইচ্ছে করে।
—নিখিল কি আবার বিয়ে করেছেন?
—করেছে তো! একটা ছোট্ট ছেলে আছে, দু বছরের। নিখিল বলেছে আর দু–তিন বছর পরে আমার কাছে ওকে নিয়ে আসবে পিয়ানো শেখার জন্য।
—ওর বৌ?
—খুব ভাল মেয়ে। 
—সংসারের কথা না হয় ছেড়েই দিন, সন্তানহীনতার জন্য দুঃখ হয় না?
ঝরঝর করে হেসে নয়না বলল, 
—গোটা আকাশটা যার নিজের হয়ে যায়, কোনও কিছুর অভাবই তাকে আর দুঃখ দিতে পারে না।
এই যে পাঁচজন মানুষ, এমন আরও অনেকে আছেন...‌যাঁরা বিবাহবিচ্ছিন্ন। কিন্তু তাঁরা এঁদের সমগোত্রের নন, কারণ তাঁরা অপ্রাপ্তিবোধের অন্ধকারটুকু যতটা মনে মনে লালন করেছেন, তার সিকিভাগ চেষ্টাও করেননি অন্ধকারটুকু ছেনে আলো খুঁজে বার করার।
অনেক বছর আগে বাসু ভট্টাচার্যের একটি ছায়াছবি দেখেছিলাম, ‘‌গৃহপ্রবেশ’‌। রাজেশ খান্না–শর্মিলা ঠাকুর। তাদের প্রণয়, পরিণয় এবং বিচ্ছেদ। তাতে বিবাহিত জীবনে যখন দুজন দুজনকে নতুন করে প্রতি মুহূর্তে চিনছে, একটু একটু করে তখন চেনা আলোতে ছায়া পড়ছে। আসলে কাউকে পুরোপুরি দেখা, চেনা বা জানা.‌..এবং তারপরেও তার ভাল–মন্দ সবটুকুকে নিয়েই তাকে ভালবাসতে পারা...‌এ বোধহয় এমন এক প্রাপ্তির বোধ, যা প্রায় অলীক। 
মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন পরস্পরের ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে দিকটি উজ্জ্বলতম, তাকেই প্রাধান্য দেয়। কারণ, শুধু যে যার নিজের ভালটুকুই সযত্নে সাজিয়েগুছিয়ে আমরা পরস্পরের সামনে নিয়ে আসি। আমরা পরস্পরের অন্ধকার দিকগুলো মেনে নিতে পারি কি? খামতিগুলো? আমরা কি পারি বলতে, ‘‌সব কিছু মিলিয়েই ওকে ভালবাসি...খারাপগুলো থেকে ভাল তৈরি করে নিতে জানি।’‌  বলতে পারি না, বলিও না...‌কারণ আমরা চাই যা ভাল, তা আজীবন সেভাবেই থেকে যাক, আর যা কিছু অন্ধকার, তাকে আলোয় আনার মতো ধৈর্য বা মন আমাদের নেই বললেই চলে!
সুখী বিবাহিত জীবন মাপার জন্য চাই স্বামী–স্ত্রীর না বলা কথা, না বলা দুঃখ, না বলা বিরক্তির ফিরিস্তি। তা যত দীর্ঘ, দাম্পত্য হয়ত ততটাই সুখকর। জীবন বড় কঠিন। একা থাকা আরওই কঠিন। কিন্তু সময়ে সময়ে দাম্পত্য এতই অসহ্য হয়ে ওঠে যে, মনে হয় একা থাকাই ভাল। আসলে একই সঙ্গে তো সব কিছু পাওয়া যায় না। আমরা সব সময়েই অসাড় হয়ে থাকি পাওয়া, না–পাওয়া, চাওয়া, না–চাওয়ার অস্থির দোলাচলে। ভাবি, যা পাচ্ছি, তা–ই বেঠিক। যা চাইছি সেটাই নির্ভুল!‌ 
কাউকে আকাঙ্ক্ষা করা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। যে মুহূর্তে আমি তাকে সত্যিই খুব চাইছি, সে অনুভব অনেকটা তীক্ষ্ণ সুচ দিয়ে ওই মানুষটির শরীরে আর মনে সুখ আর অধিকারবোধের রেশমি বালাপোশ সেলাই করে দেওয়ার মতো। তাতে কিছু সময়ের জন্য এক ধরনের ওম ছড়ালেও খানিক পরে দম বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, দিনের শেষে প্রত্যেক মানুষ যে যার নিজের মতো। আর তখনই শুরু হয় সোচ্চার বা নিরুচ্চার সঙ্ঘাত।
দুজন মানুষ, তাদের মধ্যে যদি অন্ত্যমিল না থাকে, তারা থাকবে কোথায়? মাছ আর পাখির মতো? একজন জলে, অন্যজন আকাশে? সেইভাবে এক ছাদের নিচে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসবাসে ভালবাসা কি আদৌ বেঁচে থাকে? থাকে না। সত্যিকারের প্রেমে বা সফল দাম্পত্যে ওই তীব্র অধিকারবোধ বা আকাঙ্ক্ষার চেয়েও অনেক বেশি–বেশি প্রয়োজন নির্ভরতা, সম্মান, আস্থা আর বিশ্বাস। পরস্পরের প্রতি এবং সমানভাবে। দাম্পত্য তখনই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, যখন আমরা জীবনের সব সাধ–আহ্লাদ, ইচ্ছে–অনিচ্ছেগুলো অন্য একটি মানুষের কাঁধে অবহেলায় আর অক্লেশে চাপিয়ে দিই আর অক্লেশে নিজে ঝাড়া হাত–পা হয়ে কাটিয়ে দিতে চাই।
যখন দুটি মানুষের মনের মধ্যে যোজনবিস্তৃত ব্যবধান আলসেমির রোদ্দুর মেখে শুয়ে থাকে...দীঘল কালো চুলের সর্পিল বেণীটির মতো...‌তাকেই আমি বহুব্যবহারে জীর্ণ দাম্পত্য বলি।
সাপের কামড়ে যেমন ক্ষতস্থানের ওপরে নিচে শক্তপোক্ত বাঁধন দিতে হয়, যাতে রক্তে ওই দূষণ না ছড়ায়; আমরা দাম্পত্যে ওইরকমই গরলস্রোত ব্যাহত করার জন্য অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করি পারিবারিক সম্মান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, একদা–অনুভূত তীব্র আকর্ষণ ইত্যাদি হরেকরকম অদৃশ্য কিন্তু মোক্ষম লতাপাতার বাঁধন। 
দাম্পত্যে প্রেম থাকাটা কি খুব জরুরি? অবশ্যই, কিন্তু প্রেমই শেষ কথা বলে না। বরং অনেক বেশি অপরিহার্য আর গুরুত্বপূর্ণ, একটা সময়ের পরে পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠা। বেশিরভাগ দাম্পত্যে প্রথম ঝোঁক কেটে যাওয়ার পরে কেমন যেন একধরনের উদাসীন অভ্যস্ততা প্রতিনিয়তই কাজ করে যায়। দুজনেই দুজনের অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কিন্তু আপ্লুত নয়, অনেকটা ওই বিছানার পাশবালিশের মতো। থাকলে আরামের ঘুম, না থাকলে কিছুটা অস্বস্তি...‌অনেকদিনের অভ্যেস তো! কিন্তু ঠিক আছে...কতদিন আর এপাশ–ওপাশ করে না ঘুমিয়ে কাটানো যায়! ঘুম আপনি আসবে।
তবে একেবারে কিছুই কি নেই? থাকে তো! কিছুটা অভ্যস্ত নির্ভরতা, কিছুটা বিশ্বাস, পরস্পরের জন্য খানিক মানসিক উদ্বেগ, সন্তানদের নিয়ে কারণে–অকারণে অস্থিরতা, পারিবারিক দায়দায়িত্ব পালন..‌.এইরকম কিছু কিছু যৌথ প্রয়াস তো থেকেই যায়! কিন্তু যা ফুরিয়ে যায়, তা হল পরস্পরের জন্য সময় দেওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছে।
স্বামী–স্ত্রী শুধুমাত্র দুজন দুজনের জন্য ঠিক কতটুকু সময় দিতে রাজি? এমনও তো দিনের পর দিন হয় যে আর পরস্পরের সঙ্গে নেহাত ক’‌টা কাজের কথা ছাড়া অন্য কোনও কথাই তারা বলে না। শরীর যখন নিয়মিত বিনিময় বন্ধ করে দেয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অথবা বহুব্যবহারের একঘেয়েমি আর বিরক্তিতে, উদাসীনতা যখন অন্ধকারের আড়ালে মুখ লুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, মন তখন কোথায় থাকে? সে চুপ করে শুয়ে থাকে অভিমানে, অবহেলায় আর অবসন্নতায়।
নিছক স্বয়ংক্রিয়তা সম্বল করে তখন সকালে ওঠা, সারাদিন অজস্র কাজ, ব্যস্ততা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, ভালমন্দ খুঁটিনাটি, রাতে কড়িকাঠ গুনতে গুনতে সারাজীবন কী কী পেলাম না...‌তার সালতামামি আর দীর্ঘশ্বাস..‌.এভাবেই দিন, মাস, বছর, জীবন কেটে যাওয়ার উপক্রম হয়।
দাম্পত্য অনেকটা বন্ধ দরজার বাইরে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে অধীর  অপেক্ষা। জল্পনাকল্পনার চাবির গোছা হাতের মুঠোয় নিয়ে ছটফটানি...না–জানি কী আছে বন্ধ দরজার ওপারে। দরজা খুলে গেলে প্রথম প্ৰথম অবাধ্য কৌতূহল, রোমাঞ্চ..‌.তারপরেই বন্ধ ঘরের দমচাপা কষ্ট আর অসহ্য অসহায়তা..‌.কতক্ষণে দরজা–জানালা হাট করে খুলে দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে পাব!
দাম্পত্যের প্রথমদিকে ভোরের আলো..‌.নরম, মায়াবী..‌. রোদ বাড়ছে...ক্লান্তির দুপুর গড়িয়ে যায় বিকেলবেলার কবিতায়..‌.তখনও কিছু মায়াময় মুহূর্ত পড়ে থাকে অভ্যস্ততা  আর অভ্যাসের বিপন্ন গোধূলিতে...তারপর আর কিছুই থাকে না... রোজ রোজ রাতের আকাশে চাঁদও ওঠে না...কৃত্রিম আলো জ্বালিয়ে অন্ধকারকে হারিয়ে দেওয়ার অক্ষম প্রয়াসে আমরা ত্রিভুবন এক করে ফেলি।
আমার তো মনে হয় অসফল দাম্পত্য জোর করে টিকিয়ে রাখা নিছকই ধোঁকার টাটি! দুজনের কেউ কাউকে ভালবাসতে পারছে না, সহ্যও করতে পারছে না..‌.তবুও এক ছাদের নিচে থাকতেই হবে..‌.দুটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো! যে যার নিজের মতো আছে..‌.হয়ত–বা অন্য সম্পর্কের পাকে পাকে নিজেকে জড়িয়েও নিয়েছে, তবুও ঠোঁটের কোণে আলগা হাসি...‘‌দেখো, দেখে যাও..‌. কেমন ভালবাসি!’‌
তাই দাম্পত্যে বা এই সহবাসে না হয় কিছু খোলা আকাশ থাকুক। সেখানে থাকুক মুক্তছন্দে মুক্ত বাতাস..‌.‌ভালবেসো...কিন্তু ভালবাসাকে বন্ধন করে না তোলাই ভাল। ভালবাসা হোক দুটি মানুষের আত্মার বালুতটে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ফেনিল জলরাশির মতোই।  কিছুটা সময়, কিছু অবসর থাকুক একান্ত গোপন, ব্যক্তিগত, নিজস্ব... সেতারের তার যেমন...আলাদা অস্তিত্ব..‌.কিন্তু ঝঙ্কার তোলে একই সঙ্গে। হৃদয় হোক বাধ্য মেয়েটি.‌..কিন্তু তাকে বিকিয়ে দিতে নেই। কারণ জীবন অনেক বড়। 
দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকুক, কিন্তু আগ্রাসী দমবন্ধ করা ঘনিষ্ঠতা কাঙ্ক্ষিত নয়। আর দুজন যদি এক ছাদ আর চারটে দেওয়াল নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে না–ই থাকতে পারা যায়, দরকার কী! বরং আলাদা থেকেও দুজন দুজনের বন্ধু হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি। কারণ, প্রত্যেকে নিজের ভাললাগা, মন্দলাগা, সুখ বা অসুখ সম্বল করে নিজের নিজের নিজস্বতা নিয়ে আমৃত্যু একা! জীবন অনেকটা মন্দিরের মতো, অথবা গাছের মতো। মন্দিরের স্তম্ভগুলিও একাই দাঁড়িয়ে থাকে। সোনাঝুরি গাছে জড়িয়ে থাকে যে অর্কিড, তারা দুটিতেও পরস্পরের ছায়ায় বাঁচে না। একটি অন্যটির থেকে প্রাণরস আহরণ করে ঠিকই; কিন্তু রোদে, জলে, ঝড়ে, বৃষ্টিতে নিজেদের মতো করেই বাঁচে।
তাই প্রয়োজনে দুজনের কক্ষপথ আলাদা হয়ে যাক, যে–যার নিজের মতো করে ভাল থাকুক, দুজনই শরীর মন নতুন করে ধুয়ে নিক স্বর্গগঙ্গাজলে..‌.কারণ জীবন অনেক বড় এবং জীবন একটাই। তাকে গুঁড়িয়ে ফেলতে নেই, ফুরিয়ে ফেলতে নেই। দাম্পত্যের মাটি যদি উর্বর না–ও হয়, বন্ধুত্বের রোদে–জলে শুকনো সম্পর্কের গাছে সবুজ পাতা আর আর সুগন্ধিফুল নিশ্চিত দেখা যাবে।‌‌‌‌

এই নিবন্ধে যে সব দম্পতিদের কথা এসেছে, প্রত্যেকেই শিক্ষিত। কারণ তাঁরা শিখেছেন নখ দাঁত বার করে এক তরফা বা পারস্পরিক আক্রমণের ভয়ঙ্কর খেলা থেকে বিরত থাকতে। আর যাঁরা ঘরোয়া হিংসার পৃষ্ঠপোষক ও ভুক্তভোগী?‌ সেই সব শিকারী ও শিকারদের কথা আবার সুযোগ পেলে লেখা যাবে।
                                                                                                                          মডেল  প্রিয়াঙ্কা, প্রীতিময়। ছবি:‌ কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top