শাশ্বতী ঘোষ: বড়দিনের সময়ে অফিস আর স্কুল দুয়েরই হপ্তা দুয়েকের ছুটি। আমাদের শহর ক্যালগেরি, রকি পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা কানাডার এক বৈচিত্র‌্যপূর্ণ চিরহরিতের শহর। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হল, রকিসের মধ্যে দিয়ে। ছোট ছোট লোকালয়, হিমবাহ, হ্রদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পথের দু’‌ধারে আর প্রাচীন রকিসের গায়ে হাওয়া আর বরফ মিলে খোদাই করে চলেছে কত ভাস্কর্য প্রতিনিয়ত।
ক্রিসমাসের পরদিন খুব সকালে আইস বক্সে কিছু ম্যারিনেটেড চিকেন, পোর্ক, মিটবল, সসেজ ভরে বেরিয়ে পড়ি। অন্ধকার চিরে এগিয়ে যাই দু’‌পাশের ছড়ানো সম্পদ আবিষ্কার করতে করতে। গাঢ় অন্ধকার, পথে পাতলা হয়ে আসে। এখানে শীতের সূর্য, সহজপাঠে পড়া ভুপুর মতোই অলস আর ঘুমকাতর। সকালের আলস্য ভেঙে মেঘের লেপ সরিয়ে উঁকি দিতে তার সাড়ে আটটা বেজে যায়। ললিতের সুরে ততক্ষণে আমরা ক্যালগেরি ছাড়িয়ে ঢুকে পড়েছি শৈলশহর ক্যানমোরে। চমৎকার বাড়ি দিয়ে সাজানো শহরটা, তার মধ্যে আছে কিছু হলিউডের চিত্রতারকাদেরও বাড়ি। এখানে মানুষ আসে সূর্যোদয়ের রং দেখবে বলে।
চারদিকটাই গাছহীন ন্যাড়া পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাথরের চূড়াগুলো যেন সাদা পরচুলা পরা। ক্যানমোরে গেলেই আমার মনে হয়, আমরা যেন কোনও স্টেডিয়ামের মাঠে। চারপাশের পাহাড়গুলো যেন গ্যালারি আর তার তলায় নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় ইতস্তত ছড়ানো কিছু কনিফেরাস। গাড়ি থামিয়ে কফি শপ থেকে গরম কফি তুলে চুমুক দিতে দিতে বেরিয়ে এসে দেখি, গ্যালারিতে জ্বলে উঠেছে লাল মশাল আমাদের অভ্যর্থনায়। মনে পড়ে দার্জিলিং থেকে ভোররাতে জিপ তুলে নিয়ে গিয়েছিল টাইগারহিল, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাতে। সেদিন মেঘের আস্তরণ সরিয়ে কাঞ্চনবর্ণা হয়ে ওঠেনি হিমালয়ের চূড়াটা আর আজ অপ্রত্যাশিতভাবেই রকিস–‌এ কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলল। পাহাড়গুলো এত কাছে যে, আমরাও হয়ে উঠলাম কাঞ্চনবর্ণা।
এবার সেতার রে গা ধা নি কোমলে ভৈরবীর আলাপ ধরল। আমরাও দু’‌পাশে রকি পর্বতমালার প্রাচীরের মাঝখান দিয়ে পথ করে এগিয়ে চললাম। সাথী হিমবাহে পুষ্ট শীতের পাহাড়ি নদী। সদ্য পাটভাঙা সাদা খোলের মোটা তাঁতের শাড়িতে ঢেকে নিয়েছে নিজেকে। মাঝেমধ্যে তার সজল, উন্মুক্ত কটি নজরে আসে। কখনও সে আমাদের একেবারে গা ঘেঁষে যায় আবার কখনও অনেক নিচে পড়ে থাকে তার সাদা আঁচল। এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে নানা রঙের বিচ্ছুরণ দেখে থামলাম। পাহাড়ের গা বেয়ে নামা একটা থমকে থাকা জলপ্রপাত আর তাতে সকালের আলোর ছটা। যেন কাচ বসানো রাজস্থানি ঘাগরা, ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ থেমে গেছে, যেন একটা ঘুরন্ত ঘাগরার স্টিল ফটোগ্রাফ। হাওয়া নেই, ঝকঝকে দিন গাড়িতে ফুটে উঠছে, বাইরের তাপমান শূন্য থেকে ১৫ ডিগ্রি নিচে। স্রোতস্বিনী পাহাড়ি ঝোরা তাই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই নির্জন প্রান্তরে, রাস্তার ধারে চোখে পড়ল একটি পার্ক করা গাড়ি। অল্পবয়সি একটি মেয়ে নিচু হয়ে জুতোর ফিতে বাঁধছে আর দুটি ছেলে ব্যস্ত বস্ত্রোন্মোচনে। আমরা ভাবি হচ্ছেটা কী!‌ এত ঠান্ডায় একের পর এক জামা খুলে আবার ব্যাগ থেকে অন্য জামা পরতে শুরু করল, পাঁচ–‌ছয় লেয়ার চড়িয়ে ক্ষান্ত হল তারা। এদের পোশাক সবই পাতলা আর বডি ফিটিং হলেও বিশেষভাবে তৈরি, যা এই শীতকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে। শীতকাল মানেই ফোলা ফোলা নানা রঙের মায়ের হাতে বোনা সোয়েটার পরে, মাথায় স্কার্ফ বেঁধে মোটা কেঁদো ‌বাঘ–‌ভাল্লুক হয়ে খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে হস্টেল থেকে লাইন দিয়ে কিচেনে কোকো বিস্কিট খেতে যেতাম। আর বিশেষ কোনও ভ্যারাইটি ছিল না আমাদের শীতের মরশুমি পোশাকে। কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম পোশাক পরিবর্তনের হেতু। যা শুনলাম, তাতে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। ওরা সামনের ওই মস্ত পাহাড়ের গা বেয়ে নামা প্রায় দেড়শো তলা উঁচু জমাট জলপ্রপাতটায় সিধা চড়বে। একে বলে আইস ক্লাইম্বিং। ছোট ছোট গাঁইতি আর দড়িদড়া নিয়ে তখন তৈরি হচ্ছে তারা, সঙ্গে নিল টর্চ, শীতের ছোট বেলা ফিরতি পথে যদি সন্ধ্যা নামে। এই ভয়ানক শীতে, নির্জন পাহাড়ে, কঠিন জলরাশি জয়ের অভিযানে চলেছে.‌.‌.‌।
এগিয়ে চললাম এক পায়ে দাঁড়ানো বহুভুজধারী ত্রিভুজাকৃতি স্প্রুশ গাছগুলোর মাথায় ম্যাগপাই, র‌্যাভনের বাসা চিহ্নিত করতে করতে। 
প্রায় সাত ঘণ্টা পর দু’‌পাশের চলন্ত দৃশ্য স্থির হল একটি লগ কেবিনের হোটেলে এসে। ঝকঝকে, উন্মুক্ত মাউন্ট রবসন, রকিসের উচ্চতম শৃঙ্গকে চিনিয়ে দিল হোটেলের রিসেপশনিস্ট ছেলে। জানাল, রবসন খুব লাজুক, মেঘের পর্দার আড়ালে থাকতেই পছন্দ বেশি, আজ অনেকদিন পর সে দেখা দিল আমাদেরই জন্য। ছেলেটি কলেজ–পড়ুয়া, উইন্টারে কাজ করে পয়সা জমিয়ে তার পেরু যাওয়ার ইচ্ছে। এদের স্বপ্ন সার্থক করার কত সুযোগ পায় এরা। এই দেশগুলোকে মানচিত্রের পাতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছি আমি ওর মতো বয়সে। তখনও কম্পিউটার শরীরের অঙ্গ হয়ে ওঠেনি, বইয়ের পাতায় হত আমাদের বিশ্বদর্শন। সেভাবেই মেক্সিকোর ইনকা আর পেরুর মায়াকে চেনা।
এসপার নয় ওসপার নয় জায়গাটার নাম জ্যাসপার। তবে বঙ্গদেশের মানচিত্রে থাকলে বাংলা নামকরণে হয়ে উঠত যশোপুর বা যশোগড়। এখানে গ্রীষ্মে ভিড় বেশি। মেলিন নামের একটি স্বচ্ছ নীল হ্রদ আছে, যেটায় নৌকাবিহার এখানের অন্যতম আকর্ষণ। দু’‌পাশে উঁচু হয়ে উঠে গেছে পাহাড়, তাতে নানা জন্তু‌-‌জানোয়ারের বাস। শীতে যারা আসে তারা স্কি করতেই আসে, তাই তাদের ভিড় স্কি পাহাড়ের তলায়। এই হোটেলটির নাম পোকাহোনটাস। শহর ছাড়িয়ে নির্জনে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন লগ হাউস। একটি ডুপ্লে কেবিন আমরা একশো ডলারে পেলেও সামারে তিনশো হয়ে যায় অনায়াসে। নিচের তলায় বসার ঘরে সোফা, ফায়ার প্লেস, অন্যদিকে রান্নাঘর। আধুনিক রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম সেখানে, খাওয়ার টেবিল–‌চেয়ারও পাতা। বসার ঘর থেকে আধফালি করা সিডার গাছের গুঁড়ি, সিঁড়ি হয়ে উঠে গেছে ওপরে। ওপর তলায় দুটো ঘর, সামনে খোলা বারান্দা আর তার তলা থেকেই উঠেছে পাহাড়। তখনও বিকেলের আলো ছিল, জিনিসপত্র রেখে বেরোলাম। শহরতলির পথে একদল হরিণ বরফ খুঁড়ে শুকনো ঘাস খাচ্ছে। এরা স্বর্ণমৃগ নয়, মনোহরণকারী বাহারি রূপও নেই। এরা দণ্ডকারণ্যে থাকলে রামায়ণের ক্লাইম্যাক্স তৈরি হত কিনা জানার উপায় নেই। এদের চেহারা বাছুরের মতো বড়, পেছনটা সাদা। ঘাড় উঁচু করে দেখলেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই, গুরুত্বই দিল না আমাদের। রাস্তার একধারে রেললাইন, অন্যধারে নানা সাজের দোকান, ল্যাম্পপোস্টগুলো ক্রিসমাসের আলোয় সেজেছে। ঢুকলাম একটা রেস্তোরাঁয়। অর্ডার করলাম থিনক্রাস্টের উডবার্ন পিজা। খুব পাতলা রুটি বেলে তাতে মাংস, সবজি, চিজ দিয়ে জ্বলন্ত কাঠের চুল্লির গরমে তৈরি করে আনল পিজা। বৈদ্যুতিক আলো আসার আগে এরকম কাঠের ওভেনেই তৈরি হত পাঁউরুটি, পোড়া কাঠের গন্ধমাখা খাবার এখন বড় রেস্তোরাঁর ডেলিকেসি। খেতে খেতে কাচের ভেতর থেকে দেখলাম সূর্যাস্ত। পাহাড়–ঘেরা দেওয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা ছড়িয়ে গেল গলা সোনার রং।
রাস্তার ধারে গাছহীন পাথুরে টিলার ওপর একদল তুষারশুভ্র মাউন্টেন গোট। এরা কীভাবে এত খাড়া পাথুরে পথে ওঠানামা করে, সেটা সত্যিই বিস্ময়ের!‌ জ্যাসপারের আরেকটা আকর্ষণ ওয়াইল্ড লাইফ— মাউন্টেন গোট, প্যাঁচালো শিংওলা বিগ হর্ন গোট, রেনডিয়ার, হরিণ, বরফ গলে গেলে কালো ভল্লুক আর কার্নিভোরাস গ্রিজনিও চোখে পড়ে প্রায়শই। রাস্তার ধারে বা রাস্তা জুড়ে তাদের অবাধ বিচরণ। এর জন্য আলাদা কোনও ট্যুর নিতে হয় না। বছরের যে সময়েই যাও না কেন, জ্যাসপার কাউকে নিরাশ করে না। বাইরে তখন তাপমান শূন্যের অনেক নিচে। বেশি ঠান্ডায় নাকের ফ্লুইড গড়িয়ে এসে বেরোবার পথটিতে শক্ত বরফ হয়ে যায় ঠান্ডার সংস্পর্শে। বাধা পেয়ে মুখ শ্বাসপ্রশ্বাসের পথ তৈরি করে দেয়, কিন্তু মুখ থেকে বেরোনো গরম হাওয়া তৎক্ষণাৎ আইল্যাশে বরফকণা হয়ে চোখ দুটিকে বারবার আটকে দেয়। ছোটবেলায় যেমনটা হত। শীতের সকালে বিছানায় চিটে–‌যাওয়া চোখ দুটোকে মা গরমজলে ভেজানো তুলে দিয়ে ছাড়িয়ে দিত, অনেকটা সেরকম অনুভূতি। এই দুটি ইন্দ্রিয়কে সচল রাখতে বারবার নাক আর চোখ ঘষার পালা। রাস্তার ধারে খাড়া পাথরে চড়া একদল সাদা মাউন্টেন গোট দেখে হাতের মোটা দস্তানা খুলে ছবি নিতে গেলাম। ওই দোর্দণ্ড ঠান্ডায় স্বল্প আলোয় ছবিও ভাল এল না, আর হাতের আঙুলের ডগা অসহ্য যন্ত্রণায় খসে পড়তে লাগল। তাপমান শূন্য থেকে কুড়ির নিচে হলে শরীরের কোনও জায়গা বেশি সময় ধরে উন্মুক্ত থাকলে ফ্রস্ট বাইট হয়। সেরকম বাড়াবাড়ি না হলেও হোটেলে ফিরে খানিকক্ষণ গরমজলে আঙুল ডুবিয়ে রাখার পর তারা সচল হল। এসেছি যখন কিছুই বাদ দেব না, কারও সঙ্গ না পেয়ে একাই সুইমিং স্যুটের ওপর জ্যাকেট আর স্নো বুট পরে বেরোলাম বাইরে রাখা হট টাবটায়। চারপাশে জমা বরফের মাঝে জ্যাকেট খুলেই ঢুকলাম গরম বাষ্প–ওঠা জাকুজি পুলে। সেখানে সঙ্গী হিসেবে পেলাম নরওয়ে থেকে আসা ৮ মাসের শিশু আর তার বাবা–‌মাকে। যখন উঠলাম, জলের বাষ্পগুলো মাথার চুলে বিন্দু বিন্দু বরফের কুচি হয়ে আটকে আছে, যেন হাজার তারায় ভরা কালো আকাশ। শীতকালে এই হোটেলটির রেস্টোরেন্ট বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র সকালের জলখাবারের আয়োজনটুকু তারা করে বিনামূল্যে। তাই ক্যালগেরি থেকে আনা তন্দুরি মশলা মাখানো চিকেন ঢুকিয়ে ফেললাম ওভেনে। লাইম কার্ডিয়াল আর বিনা তন্দুরের তন্দুরি চিকেন নিয়ে জানলার ওপারে বাইরের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ মনে হল চেক ইন করার সময় কয়েকজন রেসিডেন্ট রাতে ক্যাম্পফায়ারের নেমন্তন্ন করেছিলেন। ডিনারের জন্য ওভেনে পর্ক ঢুকিয়ে টাইমারে দিয়ে বেরিয়ে দেখলাম, আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। কুড়ুল দিয়ে কাঠ কাটছেন যিনি, তাঁর বয়স সত্তরোর্ধ্ব। কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত ও ইউরোপ থেকে আসা কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হল। ফায়ার পিটের কাঠগুলো থেকে নীল, সবুজ, লালরঙা আগুনের শিখাগুলো বেরিয়ে এসে একসঙ্গে সবাই আগুনরঙা কমলাতে মিশছে। যেখানেই যাই না কেন, ছেলেবেলা সঙ্গে থাকে। প্রতি বছর পৌষমেলার পর আমরা আবাসিক ছাত্রছাত্রীর দল কেউ বাড়ি যেতাম না। এক্সকারসনে যেতাম। হয়তো খুবই সাধারণ, অখ্যাত জায়গা সে সব। কিন্তু গানে, গল্পে, খেলায় সাতটা দিন অনন্য হয়ে উঠত শিক্ষক, শিক্ষয়িত্রীদের পরিচালনায়। আজ অন্য দেশে অচেনা মানুষের মাঝে আগুনের পরশমণির ছোঁয়ায় আবারও পূর্ণ হল জীবন।
ততক্ষণে ওভেনে পর্ক তৈরি। গুছিয়ে খেতে বসলাম সকলে, আর সঙ্গে ইন্টারনেট থেকে আইপডে ডাউনলোড করে আনা কলকাতার এফএম রেডিওয় প্রচারিত ‘‌সানডে সাসপেন্স’‌–‌এর গল্প। বাংলা থেকে সহস্র মাইল দূরে থাকার কারণেই বোধহয় আমরা বাংলাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরি।
একটা ছবি দেখেছিলাম কোথাও, শীতের জ্যাসপারের। মস্ত বরফের স্তম্ভ এতই বড় যে আর তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষকে অতিকায় ক্ষুদ্র দেখায়। সকালে রিসেপশনে জিজ্ঞেস করে জানলাম ছবিটি মেলিন কেনিয়ানের এক ফ্রোজেন জলপ্রপাতের। হোটেলের বেশ কাছেই। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ির জিপিএস ডাইনে–‌বাঁয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে অবশেষে পৌঁছে দিল মেলিন ক্যানিয়ান লেখা বোর্ডের পাশে। কোথাও কেউ নেই, একে অফসিজন, তায় রোদহীন অসম্ভব ঠান্ডা একটা দিন। সেখানে একটা সাঁকো চিরে যাওয়া দু’‌দিকের পাহাড়কে যুক্ত করেছে। নিরীহ সাদা ফিতের মতো নদীটা ঘুমিয়ে আছে অনেক নিচে। সাঁকো পেরিয়ে সরু একফালি ঢালু রাস্তা। রেলিং ধরেও হাঁটতে গিয়ে বুঝলাম অসাধ্য প্রয়াস। একদিকে পাথুরে পাহাড় অন্যদিকে গভীর গিরিখাত। খাদের দিকে লোহার রেলিং দেওয়া। রেলিং ধরে হাঁটতে গিয়ে বুঝলাম, অসাধ্য প্রয়াস। দু–‌একজন করে পঙ্‌তি থেকে ঝরে পড়তে লাগল। পুরো পথটাই শক্ত পিছল বরফ। আমাদের পায়ে স্নো বুট কিন্তু তাপমাত্রার তারতম্যে নরম তুষার, ডিপ ফ্রিজের পিছল বরফ হয়ে গেছে। বরফে হাঁটার জন্য জুতোয় আইস গার্ড লাগাতে হয়। সে সব উপকরণের আয়োজন না করেই নেমে পড়েছি অভিযানে। কী করব, ফিরে যেতে হবে!‌ চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল। হঠাৎই জনহীন পথ ফুঁড়ে নিচ থেকে উঠে এল দেবদূতের মতো এক যুবক আর যুবতী। তারা ক্যানিয়ানে নামার অন্য একটি সহজ ও নিকট পথের সন্ধান দিল। ‌‌নতুন পথটিতে দু–‌চারজন লোক দেখা গেল। তবু আমরা পথ হারিয়ে কখনও ঝোপ ধরে ওপরে উঠলাম কখনও স্লাইড করে নামলাম। পাকদণ্ডী ছেড়ে এবার জমাট নদীর ওপর দিয়ে হাঁটলাম গিরিখাতের মধ্য দিয়ে, একে ‘‌আইস ওয়ক’‌ বলে। তখন নদীপথে ক্যানিয়ানে আর কোনও মানুষ নেই। পাহাড়ের গা ভেঙে কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে গুহা, সেখানে চড়ে উঁকি মেরে দেখি সাদা পিগমিদের সংসার। ছোট ছোট স্ট্যালাগটাইট ছত্রাকের মতো ছড়িয়ে আছে ভেতরে। তাদের দেহ ট্রান্সপারেন্ট আর মাথা ট্রান্সল্যুসেন্ট। গুহা আর গুহার ভেতর ঐশ্বর্য আবিষ্কারের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য স্বামী আর ছেলে ছাড়া আর কেউ ছিল না সেই নির্জন নদীপথে। অপূর্ব কারুশিল্প দেখে গুঁড়ি মেরে খানিকটা ঢুকে তুলে আনলাম একটা মূর্তি। নদীর নিম্নগতি ধরে এগোলাম সেখান পর্যন্ত যেখানে দু’‌পাশের ফাটল চওড়া হয়ে এসেছে আর সাদা চাদর সরিয়ে নদী জল হয়ে বয়ে যাচ্ছে।
আলিবাবার গুহার দেখা মিললেও অনেক ঘুরেও ছবিতে দেখা ক্রিস্টাল স্তম্ভটির দেখা পেলাম না। মনে কিছুটা অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে চললাম। ফিরতি–পথে মনটা হুহু করে উঠল অদেখা স্তম্ভের জন্য। তাই আবার একাই ফিরে এলাম। এগোলাম যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম তার বিপরীতে, নদীর ঊর্ধ্বগতিতে। সেদিন ঠান্ডাটা একটু বেশি ছিল, শূন্যের কুড়ি ডিগ্রি নিচে, ক্যানিয়ানের ভেতরের তাপমান আরও কম। জনা পাঁচের একটি ছোট দলের সঙ্গে দেখা হল, গাইড নিয়ে এসেছে তারা। এদিকের পথ খুব পিছল। বাঁকের মুখে পাথরের ওপর থেকে আছড়ে পড়েছে স্তব্ধ নদী। পাথরটিতে চড়তে গিয়ে ধমক খেলাম এক ব্যক্তির কাছে জুতোয় আইস গার্ড না থাকার জন্য। এদেশে সাধারণত কারও ব্যাপারে কেউ কথা বলে না, তাই একটু অবাকই হলাম। সত্যি সেদিন আমি অনভিজ্ঞতার কারণে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলাম। এক এক জায়গায় স্বচ্ছ কাচের মতো বরফের আস্তরণের তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্রোতস্বিনী। কোথাও কোথাও সরু নদীপথ দু’‌মিটারের বেশি নয়, দু’‌পাশের খাড়াই পাথরের দেওয়াল আকাশটাকে আড়াল করেছে। ফাটল ধরেই প্রায়ান্ধকার সাদা পথ ধরে এগিয়ে চলি সাবধানে একাকী। প্রায় দশ মিনিট চলার পর অন্ধকারের বাঁক ঘুরতেই মনে হল যদি আজ এই ভিনদেশি ফল্গুতে তলিয়েও যাই আফশোস নেই। সামনে খানিকটা খোলা আকাশ আর সেই স্ফটিকের স্তম্ভ। জমা জলপ্রপাত, যেন গলা মোমের কারুকার্য। ফাটলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে দেখি ছোটবড় আরও কয়েকটা স্তব্ধ জলধারা। থমকে থামা নিঃশব্দ জলপ্রপাতের নিচে তাকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকি বিস্ময়ে, নির্জনে। জলের কণা, তার ঘূর্ণি, সফিল ফেনা সব কিছু আলাদা করে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, ছোঁয়া যাচ্ছে। ছোটবেলায় স্ট্যাচু খেলার মতোই কেউ স্ট্যাচু বলে দিয়েছে ওদের কয়েক মাসের জন্য। শীতের শেষে অন্যরূপ নিয়ে, শব্দহীনা আবার সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে, দেবে ছুট।
এ পথে লোকে গাইড ছাড়া আসে না কারণ পায়ের তলার বরফের স্তর কোথায় কতটা ভঙ্গুর বহুদিনের অভিজ্ঞতায় তারা জেনে নিয়েছে। স্পাইকের দাগ লক্ষ্য করে সাবধানে পা ফেলি। এক এক জায়গায় পাতলা কাচের টেবিল নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছতোয়া স্পষ্ট দেখা যায়। মেলিন ক্যানিয়ানের এদিকটায় আছে বেশ কয়েকটি জলপ্রপাত। পাহাড়ের মাথা থেকে পাগলাঝোরা প্রচণ্ড গতিতে আছড়ে পড়ার কারণে কয়েক জায়গায় জলের ধারা আর পাহাড়ের মাঝের ব্যবধানটাতে তৈরি হয়েছে শূন্য কক্ষ। একদিকে একটু ফাঁকা থাকায় ঢুকে পড়ি, তিনজন দিব্যি এঁটে যাবে সেখানে। লুকোচুরি খেলার একটা দারুণ জায়গা আবিষ্কার করে ফেললাম, খেলার বয়সটাকে ধরে রেখেছি ইচ্ছের মুঠোয় যখন খুশি ফিরে যেতে পারি যে কোনও বয়সে কিন্তু এখানে খেলার সাথি কোথায়?‌ সোনার কাঠি, রুপোর কাঠির খোঁজ না করেই ঘুমন্তপুরী থেকে বেরিয়ে আসার সময় গাইডের সঙ্গে আসা আরও কিছু মানুষের দেখা পেলাম। গিরিখাতে প্রায় মাইনাস ৩০ থাকা সত্ত্বেও আমার অনুরোধে হাসিমুখে হাতের মোটা দস্তানা খুলে একজন আমার ক্যামেরায় আমাকে বন্দি করল। তাদের দলে না থাকলেও গাইড আমার হাত ধরে বিপজ্জনক জায়গাটি পার করে দিল।
এখানে এসে এদের কাছে জেনেছি সেফটির গুরুত্ব, জীবনটা কত ভঙ্গুর সেটা উপলব্ধি করেছি। অদ্ভুত দেশ— কারও কোনও তাড়া নেই, নিঃশব্দ জলপ্রপাতের সৌন্দর্যকে কোলাহলমুখর করে না তুলে নিঃশব্দেই উপভোগ করতে জানে এরা।
নদীপথ ছেড়ে ওপরে উঠে ফিরতি পথে পাড়ি দিলাম উত্তেজনায় উড়তে উড়তে। গাড়িতে হিটিং চালিয়ে আমার বর আর ছেলেরা চিপস আর প্রচণ্ড ঝাঁঝওয়ালা ওয়াসাবি (‌জাপানি মাস্টার্ড)‌ মাখানো মটরভাজা খাচ্ছে। গাড়ির দরজা খুলতেই ‘‌ঝন ঝন ঝন পায়েল মোর বাজে.‌.‌.‌’‌ মল্লিকার্জুন মনসুরের দরদভরা সুরে মথুরাবাসী রাধার অভিসারের সাক্ষ্য হয়ে রইল এই নির্জন প্রান্তর। জলের খোঁজে বোতল নিয়ে দেখি স্টিলের বোতলের  গায়ে লম্বা ফাটল, সেখান থেকে বেরিয়ে আছে শক্ত বরফ, গলা মোমের মতো। মনে পড়ে গেল ভূগোলের ক্লাস। পাহাড়ি নদীর জল বরফ হয়ে আয়তনে বেড়ে পাহাড়ে ফাটল তৈরি করে তার পথ প্রশস্ত করে। জেনেছিলাম সেই কবে। সারারাত গাড়ি বাইরে ছিল আর এই জলের বোতলও। অগত্যা জল না পেয়ে গাড়ির পেছন থেকে নিয়ে এলাম ক্যালগেরি থেকে আনা বীজহীন ছোট ছোট কমলালেবুর বাক্সটা, মনে ভাবলাম ভাগ্যিস কাল গাড়ি থেকে নামাতে ভুলে গিয়েছিলাম‌!‌ জলের তৃষ্ণা কমলায় নিবৃত করতে হবে। কিন্তু একি!‌ খোসা লেবুর থেকে আলাদা করা গেল না। লেবুগুলো প্রচণ্ড শক্ত ডিউস বল হয়ে গেছে। ‘‌অবাক জলপান!‌’‌ এভারেস্ট অভিযানের পথে যাত্রীরা মাটি থেকে বরফ তুলে স্টোভে গরম করে জল বানিয়ে নেন। আটিকের মানুষ ইলুইতরা (‌কানাডায় এসে জেনেছি এস্কিমোরা পছন্দ করে না তাদের ওই নামে কেউ ডাকুক কারণ ওদের ভাষায় এস্কিমো শব্দের অর্থ কাঁচা মাংস খাদক।)‌ যখন শিকারে বেরোয় আইসবার্গের টুকরো গরম করে পানীয় জল বানিয়ে নেয় তারা কারণ ধু ধু বরফের লোনা সমুদ্রে ওটাই সোর্স অফ ফ্রেশ ওয়াটার। জল আর জুটবে না বুঝে তখনকার মতো সে আশা পরিত্যাগ করে ক্যানিয়ানের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ময়ের তৈরি ইন্দ্রপ্রস্থের সভাগৃহের স্ফটিক স্তম্ভের বর্ণনায় মুখর হলাম আমি। চারদিকের জমা জলের মাঝে জমে থাকা ঝর্না, প্রপাতকে উৎসাহের উত্তাপে গলিয়ে, কলকল করে ভাসিয়ে নিয়ে গেলাম সকলকে। ■

জনপ্রিয়

Back To Top