দেবেশ রায়: কোনও কোনও বই পড়ে, বা পড়তে–‌পড়তেই প্রাথমিক ধাক্কাটা যে কোত্থেকে এসে কোনদিকে নিয়ে যায়— তা আন্দাজও করা যায় না। সেই ধাক্কা অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন— এলোমেলো, প্রবল, শ্বাসরুদ্ধকর ও বাঁচার যে–‌সব অভ্যেস আমাদের জন্মের পর থেকেই নিজের অজান্তে রপ্ত হয়ে যায়— চোখের পাতা ফেলে চোখ বাঁচানো বা কোনও আওয়াজ থেকে ঘাড় ঘোরানো, বা অনভ্যস্ত কোনও শিউরনো ঘটলেই স্তনে ঠোঁট ডোবানো ও স্তন না পেলে কেঁদে ওঠা। বইটি শেষ করার ধাক্কাটা হয় ভূমিকম্পের মতো— রিখটার স্কেল বাড়তেই থাকে ও তার ফলে ভাঙচুর।
আমি এত দুর্বল প্রতিরক্ষার পাঠক যে এতদিন এই দুই ধাক্কা সত্ত্বেও এখনও পড়ি কেন এটা রহস্য। নিজের সব দুর্বলতা তো আর প্রকাশ করা যায় না। আপাতত প্রাথমিক ধাক্কার কথাই বলছি কারণ সেটাই প্রসঙ্গ।
এই প্রাথমিকতা ঠিক মাপা যাবে না যে কখন আমি তরাসে স্তনান্তর খুঁজি ও অবধারিত না পেয়ে আতঙ্কে পৃথিবীজোড়া নির্জনতায় কেঁদে উঠি। ‘‌নৌকাডুবি’‌তে ঘটেছিল নৌকাডুবির ঝড়ের পর— এ কী অসম্ভব লেখক, যিনি যা কিছু অযৌক্তিক তার প্রত্যেকটিকে সম্ভব করে তোলেন। ‘‌কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’‌–‌তে হয়েছিল একেবারে প্রথম বাক্যেই যদিও কথাটা তো শুনতে–‌শুনতে চেনাই— কিন্তু বইয়ে, ইংরেজি অনুবাদেই ঘোষণার নিশ্চয়তায় ও চরমতায় সত্যি আমার মনে হয়েছিল বোধিদ্রুমের আসন থেকে বুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ধ্বংসের নাস্তিকতা ও সৃষ্টির আস্তিকতা নিয়ে। এমন করে তো এখন সাজাতে পারছি। তখন— ওই প্রথম বাক্যেই হতজ্ঞান। ‘‌পুতুল নাচের ইতিকথা’‌–‌তে প্রথম লাইন দশেক পর্যন্ত বেশ অনায়াসই। তার পর চতুর্থ প্যারা থেকেই শ্বাসকষ্ট বুঝি। কিন্তু তার পরের দুই প্যারাতে সামলে নেই। সেই সামলানোতেই কাল হল। অপ্রস্তুত পৌঁছে যাই সপ্তম প্যারার শেষ দুই জটিল বাক্যে ও উপন্যাসটির প্রথম ‌‌#‌ এই ছাড়ে:‌ ‘‌মরা শালিকের বাচ্চাটিকে মুখে করিয়া সামনের মাঠ দিয়া ছপ ছপ করিয়া পার হইয়া যাওয়ার সময় বারবার মুখ ফিরাইয়া হারুকে দেখিয়া গেল। ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে।’‌ কবে প্রথম পড়েছিলাম— কে জানে। ষাট–‌বাষট্টি বছর ধরে গল্প–‌উপন্যাস লেখার অভ্যেসের পরও যখন এই আরম্ভটি পড়ি তখন বাঙালি পাঠক হিসেবে নিজেদের নালায়েকপনায় কষ্ট হয় বড়। বড় কষ্ট। উপন্যাস পড়তেই শিখলাম না। লিখব কবে?‌ ১৯৩৬ সালে লেখা এই উপন্যাসের প্যারাভাগ, প্যারার শব্দসংখ্যার হেরফের, বাক্যের জটিলতা ও সরলতার বৈষম্য, যতিচিহ্ন— #‌ সহ ব্যবহার কিছুই যদি না পড়তে পারি, তা হলে, তো আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে ১৯৪২ পর্যন্ত, আলবেয়ার কামু–‌র ‘‌আউটসাইডার’‌–‌এর প্রথম বাক্যটিতে বিস্মিত হতে। ইংরেজি অনুবাদ বোধহয় আমরা পড়েছি অনেক পরে। কামু ভালই লেখক, কিন্তু নিশ্চয়ই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়–‌এর সমতুল নন। কিন্তু মানিকের স্বভাষী পাঠকরা তো উপন্যাস পড়তেই জানে না আর কামু বা তাঁর মতো অন্য ইউরোপীয় লেখকদের পাঠকরা তো ইউরোপীয় ক্লাসিকসে শিক্ষিত।
‘‌পুতুল নাচের ইতিকথা’‌র তো তাও সপ্তম প্যারায় ত্রাস ঘটেছিল। মলাটেই খাবি খেয়েছিলাম ফুকো–‌র লেখা ‘‌ম্যাডনেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’‌–‌এ। পুরো ‘‌এজ অব রিজন’‌কে উল্টে দেওয়া?‌ এর ইংরেজি অনুবাদে ‘‌ম্যাডনেস’‌–‌এর বদলে ‘‌আনরিজন’‌ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল ও তাই নিয়ে ইউরোপীয় বিদ্বজ্জনরা তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
কিন্তু আমার ব্যাপারটা একেবারে ব্যক্তিগত। আমাদের তো সভ্যতার দায় নেই। কোনও সভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের পাগলাগারদ বানাবার দায় ছিল না। আমরা সমাজের লোক। আর সে–‌সমাজ এমন পাগলদের বাড়িতেই রাখত। এটা আমার মাথায় ঢোকার পর একেবারে ছোটবেলা থেকে এই বুড়োবেলা পর্যন্ত কেবলই দেখতে পাই— আমরা আমাদের রোজকার জীবনে কিছু পাগলামি বা বাতিক লালন করি। ফুকোর ওই বইটির পর, সেই ১৯৬২ থেকে, নিজেদের মধ্যে পাগলামি বা বাতিক খোঁজা আমার একটা বাতিক হয়ে উঠেছে। আর, এতদিনের বাতিকে আমি খানিকটা দক্ষতাও অর্জন করেছি। আমি পাগল চিনতে পারি। আমি তো আর ফুকো নই যে ‘‌আমাদের সমাজ ও পাগলামি’‌ বলে একটা বই লিখতে পারব!‌
সত্যি লেখা যায়। পাগলামি কতকগুলি নির্দিষ্ট লক্ষণ।
আমার আদিতম পাগলামি দেখা সম্ভবত পাঁচ–‌ছ বছর বয়সে একসঙ্গে অনেকে। নিধি পাগলার কথা আমি লিখেছি। এখনও নিধি আমার ব্যক্তিগত দার্শনিক। কমল ঠাকরুন ছিলেন গ্রামে আমাদের তিন–চার বাড়ি পরে এক বাড়ির বামুন বালবিধবা পিসি। তাঁর ভাই, অর্থাৎ ওই বাড়ির কর্তা। তিনি ছিলেন পূর্ণ পাগল। একেবারে ন্যাংটো হয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যেতেন। আমাদের একটা বড় পুকুর ছিল। পুকুরটা সকলেই ব্যবহার করত। কমলপিসিও স্নান করতেন। কিন্তু কেউ যদি তাঁকে পেছন থেকে বা দূর থেকে জিজ্ঞেস করত, ‘‌একাদশী হইছে’‌, তা হলেই তিনি ভেজা কাপড়েই পুকুরে স্নান করে উঠতেন। আরও–‌একজন খালিগায়ে লম্বা পৈতে পরে মোটা মোটা বই নিয়ে এসে দাদুকে সেই সব বই খুলে ইংরেজিতে কী সব পড়ে শোনাতেন আর জিজ্ঞেস করতেন— ‘‌তা হলে বলেন তাঐমশায়, সম্পত্তিটা কার, যদি ১৬ সালে ওটাকে আমাকে ব্রহ্মত্র করে দিয়ে থাকে, তা হলে ১৮ সালে কী করে বলে ওটা তার বাবার সম্পত্তি, তাতে বর্তেছে।’‌ আমি দাদুকে দু–‌একবার জিজ্ঞেস করেছি— ‘‌ওকে কি কেউ মিথ্যে কথা বলেছে?‌’‌ দাদু কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারেন না। বললেন, ‘‌জমিদারি সম্পত্তিতে এমন হয়। ও এখন বাড়িতে থাকে না, অন্য জায়গায় থাকে। তাই দাবি করছে— বাড়িটা ওর।’‌
সেই ৫/‌৬ বছরের স্মৃতি আমার হুহু করে ফিরে এল টিভিতে মুকুল রায়ের বিশ্ব বঙ্গের ‘‌লোগো’‌, ‘‌লোগো’‌ শুনতে–‌শুনতে। একেবারে সেই ভদ্রলোকের মতো চেহারা, চুল আলুথালু, জামা পরা বলে পৈতে আছে কি না দেখা যাচ্ছে না। মুকুল রায় ঠিক সেই বামুন ভদ্রলোকটির মতো কয়েকটি কাগজ নাড়িয়ে–‌নাড়িয়ে ‘‌লোগো’‌ ‘‌লোগো’‌ বলে যাচ্ছেন। দেখতে–‌দেখতে আমার সেই পুরনো কৌতূহল ফিরে এল— ‘‌আমাদের সমাজ ও পাগলামি’‌— যে–‌বইটা লেখা আমার সাধ্যের বাইরে কিন্তু লেখা যে সম্ভব তা আমার কল্পনা ও ভাবনার অন্তর্গত।
এখন তো আমার পাশে দাদু নেই। এখন তো আমিই দাদু। আমার ভাইপো বড় উকিল, তাই প্র‌্যাকটিস না করে–করে কোম্পানি–‌অ্যাকাউনটেনসির পরামর্শ দেয়। ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম। লোগো কী?‌
ও বলল, ‘‌তোমার ও–‌সব ফালতু কথা না জানলেও চলবে। কাজ নেই না কী?‌’‌ কিন্তু জানতে তো হবেই। ওকে তো ফুকো বলতে পারি না। মুকুল রায় যে কাগজ দেখাচ্ছে।
আইনত লোগো শব্দটি লোগোটাইপ কথাটির সংক্ষেপণ। ‘‌লোগো’‌র আইনত কোনও অর্থ নেই। যে–‌কোনও পরিচয়–‌জ্ঞাপনের প্রয়োজনে একটিই চিহ্ন ব্যবহার করা। যেমন, বাংলার পুলিসের পরিচায়ক লোগো BP‌ থেকে কতবার বদলাল। ব্যবসা–‌বাণিজ্যের জন্য ‘‌লোগো’‌ বাধ্যতামূলক নয়। ট্রেডমার্কও বাধ্যতামূলক নয়। কেউ যদি চায়, তাকে ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। ট্রেড–‌লাইসেন্স ও ট্রেডমার্ক এক নয়।
২৯ নভেম্বর মমতা ব্যানার্জি বিধানসভায় বলেছেন— বিশ্ব বাংলা লোগো তাঁর তৈরি। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। তাঁর ইচ্ছে হলে তিনি সেটা ফেরত নেবেন। ‘‌লোগো’‌র একটা কপিরাইট আছে। সেই কপিরাইট তো তাঁর। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ব্যবহারকারী। এমন–কি পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি এটা ট্রেডমার্কও করে নেয়, তা হলেও মমতা ব্যানার্জির কপিরাইট বহাল থাকবে— তাঁর মৃত্যুর পরও ৬০ বছর। ২০১৩ সালে অভিষেক ব্যানার্জি যদি রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করে থাকেন— তা বেআইনি হবে কেন?‌ তিনি তো যিনি তৈরি করেছেন সেই কপিরাইটের একমাত্র মালিকের (‌এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর)‌ অনুমতি নিয়েই করেছেন। আবার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে এটা ব্যবহার করছে একমাত্র কপিরাইট=‌অধিকারীর (‌এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর)‌ অনুমতি অনুযায়ীই। কপিরাইট যাঁর তিনি তো একাধিক লোককেই ব্যবহার করতে দিতে পারেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর একটি উপন্যাসের সিনেমা করার অনুমতি হিন্দি প্রযোজক ও বাংলা প্রযোজক দু’‌জনকেই আলাদাভাবে দিয়েছিলেন। প্রযোজকরা জানতেন না। এই নিয়ে কথা ওঠায় সুনীল এক কথায় জবাব দিয়েছিলেন— আমাকে অনুমতি নিতে হবে না কি,‌ আমিই তো অনুমতি দেওয়ার মালিক। 
এই বয়সে দাদুর উত্তরটা মনে পড়ছে— ‘‌ও এখন বাড়িতে থাকে না। তাই দাবি করছে বাড়িটা ওর।’‌ আমার সমস্যা মুকুলবাবুর পৈতেটা কোথায়?‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top