নবকুমার বসু: মানুষ এবং লেখক একে অপরের পরিপূরক নবকুমার বসু ডিসেম্বর মাসটা শুরু হতে–‌না–‌হতেই এই দূর দেশেও এক নিবিড় স্মৃতিমেদুরতা পেয়ে বসে। আমাদের পরিবারের কয়েকটি সদস্যের জন্মদিন পড়ে এ–‌মাসে। কিন্তু তার জন্য স্মৃতিমেদুরতা বা উল্লেখের তো কোনও কারণ নেই।  কারণ ঘটে যখন ‘‌পরিবার’‌ শব্দটাই বিপুল এবং ব্যাপক অর্থে ‘‌আমাদের’‌ হয়ে যায়। আর আমাদের সেই পরিবারেরই এক কৃতী, খ্যাতিমান বঙ্গসন্তানের জন্ম এই মাসের প্রায় ঠিক এই সময়ে‌.‌.‌.‌ (‌হিসেব অনুযায়ী আগামিকাল)‌ এগারোই ডিসেম্বর। কতদিন হয়ে গেল তিনি অসময়ে প্রয়াত হয়েছেন। আর ঠিক তিন মাস পরেই তাঁর মৃত্যু ত্রিশ বছর অতিক্রম করে যাবে। জীবদ্দশায় থাকলে এবার তিনি তিরানব্বই পার হতেন। সমরেশ বসু (‌জন্ম:‌ এগারোই ডিসেম্বর, উনিশশো চব্বিশ;‌ প্রয়াণ:‌ বারোই মার্চ, উনিশশো অষ্টাশি)‌র চলে যাওয়ায় আমাদের বৃহৎ পরিবার এক ব্যতিক্রমী, শক্তিশালী, প্রতিভাধর বাঙালি লেখককে হারিয়েছেন। আর ছোট পরিবারের গুটিকয়েক সদস্য— আমরা হয়েছি পিতৃহারা। বুঝতে পারি, মানুষটার জন্মদিনে আমাদের স্মৃতিমেদুরতা তাই একটু বেশি বাজে। বাবা–‌ই যে!‌ ভাবনায়, স্মরণে বড় বেশি যাতায়াত এসময়টায়। রক্তের সম্পর্ক স্মৃতি আর বেদনা ছাড়া কী–‌ই বা দিতে পারে!‌ শেষ পর্যন্ত!‌‌ 
স্বনামধন্য মানুষটার সৃষ্টিমালা, রচনাসম্ভার, বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় তাঁর ভূমিকা, বিভিন্ন রচনায় তাঁর ভাষা ব্যবহারের বৈচিত্র‌্য.‌.‌. ‌ইত্যাদি নিয়ে নানান কথা হয়, আরও অনেক হবে এবং সেইসব নিয়ে কথা বলার গুণীজনও অনেক আছেন। আমরাও সেইসব শুনে, জেনে ঋদ্ধ হই। ‌তবু জন্মদিনে যেন গোটা লোকটাকেই আলাদা করে ভাবতে, দেখতে ইচ্ছে করে। আর ‌কী আশ্চর্য, মেঘে–মেঘে বেলা গড়িয়ে যত সন্ধের দিকে (‌বয়সের নিরিখে)‌ এগিয়ে যাচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁর রচনা বা সৃষ্টি নয়, ঘরোয়া–সাংসারিক, জন্ম থেকে নিত্য দেখা বাবা–‌মানুষটাই যেন অবচেতন মনে এ–‌জীবনের বেশ খানিকটা দখল করে বসে আছে। জন্মদিনটা তো আর কিছু নয়, শুধু ধোঁয়াশার মধ্যে থেকে স্মৃতির আঁচ উঠে আসার মতো.‌.‌. ‌মানুষটাকে আলোয় দেখি। 
মনে আছে, শ্রদ্ধেয় কৃতী সাহিত্যিক দেবেশ রায়, পিতৃবিয়োগের পরে এক রচনায় এরকম একটি মন্তব্য করেছিলেন যে, স্মৃতি শীতল হয়ে গেলে তখনই লেখকের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় (‌ভাষা সামান্য অন্যরকম হলেও, অর্থ এটাই ছিল)‌। আজ ভেবে দেখছি, সে তো একশোবার, কিন্তু স্মৃতির উষ্ণতা সময়ের ব্যবধানে কমলে, ব্যক্তি–‌মানুষটাও যেন অন্য আর একমাত্রায় প্রতিভাত হতে শুরু করেন। ঘরের মানুষটাকেও আবেগবর্জিত অন্য এক মানবিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়।
আর তখনই মনে হয়, মানুষ এবং লেখক সমরেশ বসু তথা কালকূট সত্যি সত্যিই একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। জন্মদিনে আমরা সেই মানুষটাকেই কিঞ্চিৎ স্মরণের আলোয় দেখতে পারি, যে মানুষটার বিভিন্ন সত্তা এমন–কি কখনও তাঁর লেখকসত্তাকেও অতিক্রম করে চিহ্নিত হয় অন্য পরিচয়ে। বলা যায় না, হয়তো আবার সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁকে নিয়ে বিতর্ক। 
একটা ব্যাপার বোঝা যায়, মানুষ সমরেশ বসুর জীবনে রাজনৈতিক বোধবিশ্বাস থেকে শুরু করে নিজস্ব জীবনচর্যা নিয়েও টানাপোড়েন ছিল। দুর্ভাগ্যবশত এই মন্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যার সুযোগ নেই আপাতত, তাহলেও আজ জন্মদিনে তাঁর অপেক্ষাকৃত কম আলোকিত কিছু ভাবনা–‌রচনা–‌ঘটনার দিকে আমরা কাছের মানুষের মতো তাকাতে পারি। উনিশশো–‌ছিয়াত্তর সালে, যখন তিনি খ্যাতির প্রায় মধ্যগগনে বিরাজ করছেন— ঠিক তখনই তাঁর ডায়েরি‌তে লেখা একটি রচনার অংশ পরবর্তীকালে পড়ে বেশ বুঝতে পারি, কীভাবে তিনি একই সঙ্গে লেখক এবং মানুষ হয়েছিলেন। ‌‘‌‌.‌.‌.‌রাজনৈতিক দল এবং ধনী একচেটিয়া পত্রপত্রিকা সৃষ্টিধর্মী সাহিত্য শিল্পের স্বাধীনতা হরণ করে— এই উভয়গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই সাহিত্যিক শিল্পীকে সংগ্রাম করতে হয়— অন্যথায় স্বাধীন চিন্তা ও সৃষ্টি ব্যাহত হতে বাধ্য। আপস করা সম্ভব নয়। দলীয় মতবাদ ও মালিকের মর্জি— এই দুই শ্রেণীর বাধ্যবাধকতার মধ্যে শিল্পীর আপন সত্যের পথ পরিক্রমা অচল হয়ে পড়ে। সাহিত্যিক এক অর্থে সমগ্র সমাজ ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত, অন্য অর্থে তেমনি একাকী— সাহিত্য তার আত্মানুসন্ধানের বিচরণভূমি।’‌
‌‌‌রাজনীতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষটাকে বারবার ভাবিয়েছে। আর ভাবিয়েছে বলেই, বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও, তার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মাথাভারী রাজনীতিকরা যে বড্ড একবগ্গা। সমালোচনার অর্থ তাঁদের কাছে বিরোধিতা।  আমরা দেখেছি কমিউনিস্ট পার্টির ভাগাভাগি, কার্যকলাপ নিয়ে মাঝেমধ্যেই বাবাকে মুষড়ে পড়তে। ষাটের দশকের শেষদিক আর সত্তরের গোড়ায় নকশাল আন্দোলন নিয়েও খুব দ্বিধা আর উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শত্রুরা অনেক সবল। দুই, মানুষকে বিপ্লব সম্পর্কে আরও সচেতন করার দরকার। তিন, যাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতায় আকণ্ঠ ভোগপিপাসা, তাদের নেতৃত্বে বিপ্লব হয় না।‌ খুব সম্প্রতি পুরোপুরি নকশাল আন্দোলনের ওপর রচিত একটি বই, কাহিনী (‌আটটা নটার সূর্য, অশোককুমার মুখোপাধ্যায়)‌ পাঠ করতে গিয়ে, সমরেশ বসু‌র উপরোক্ত মন্তব্যেরই যেন সমর্থন পাওয়া গেল।.‌.‌.‌ যাক।
আসলে‌ ‌যত দিন যাচ্ছে এখন তত বেশি করে মনে হয়, পারিবারিক মানুষ এবং বাবা হলেও, সমরেশ বসু মানুষটারই জীবন–‌যাপন–‌লেখালিখি–‌সৃষ্টি, বোধবিশ্বাস, পাওয়া–‌হারানো, ভাবনা–‌দর্শন–‌প্রেম–‌নিঃসঙ্গতা.‌‌.‌. ‌সব মিলে এত বেশি, যাকে বলে, ডাইভার্সিটি, যে তাঁর জন্মদিন নিয়ে কিছু লিখতে গেলেও, তাকে সীমাবদ্ধ এলাকায় ধরানো মুশকিল। ও হ্যাঁ.‌.‌. এর মধ্যে সংস্কারের কথা তো উল্লেখই করলাম না। জন্মদিনে বাবা নিয়ম করে লিখতে বসত, ঠিক যেমন বছরের প্রথমদিন, বাংলা ও ইংরেজি। কারণ সহজেই অনুমেয়। সন্ধেবেলায় ড্রিংক্‌স–‌এর গ্লাস হাতে নিলে কখনও কলম ছুঁতেন না।‌ যতদিন ঠাকুমা বেঁচেছিলেন, বিশেষ–‌বিশেষ দিনে প্রণাম করতে ভুলতেন না। মারা যাওয়ার পরে ঠাকুমার ছবি দেখে, কপালে হাত ঠেকিয়ে বেরুতেন। পরিবারের সকলের সঙ্গে খাঁটি পূর্ববঙ্গীয় (‌বাঙাল)‌ ভাষায় কথা বলতেন।
নৈহাটির প্রতি‌ সমরেশ বসু‌র এক নিবিড় প্রীতিময় আকর্ষণ ছিল। এমনিতেও মা (‌‌গৌরী বসু)‌‌ বরাবর নৈহাটির মেয়ে। বাবা‌ও চোদ্দো–‌পনেরো বছর বয়সে ঢাকা থেকে পাকাপাকি নৈহাটিতেই চলে আসেন বড় জেঠার রেল কোয়াটার্স–‌এ। মা–‌র সঙ্গে বাবার যোগাযোগ পরবর্তীকালে নৈহাটির সাংস্কৃতিক আবহে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তথাকথিত বাঙাল–‌ঘটি, আর ব্রাহ্মণ–‌কায়স্থ মিক্সচার তো হয়েছিলই। এখনও বোঝা যায়, সমরেশ বসুর জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মায়ের। বাবার জন্মদিন পালনও শুরু করেছিলেন মা। আবার মা–‌র প্রতি বছর জন্মদিনে (‌‌দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী)‌‌ বাবা ঠিক শাড়ি কিনতেন। নৈহাটির বাড়িতে প্রতি বছর নিয়ম করে আমাদের লক্ষ্মী এবং সরস্বতীপুজো করা হত, কাছের মানুষজনের নিমন্ত্রণ হত।‌ এসবেরই হোতা বাবা–‌মা দুজনই।
জন্মদিনের অনুষঙ্গে স্বনামধন্য মানুষটিকে একটুখানি স্মরণ করে কিঞ্চিৎ তুষ্টি অনুভূত হল এবং তা আমাদের বৃহৎ পরিবারের পক্ষ থেকেই বলা উচিত। তাহলেও আদ্যন্ত মানুষটি লেখক তাইতে কোনও সন্দেহ নেই। কালান্তরের পাঠকরা তাঁকে সেই পরিচয়েই স্মরণ করবেন।‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top