পবিত্র সরকার: ক’‌‌দিন থেকে আমি, ভাষার মাস্টার বলেই, একটা জিনিস লক্ষ্য করে একটু বিচলিত বোধ করছি। জানি না এটা নাটক, সিনেমা বা পরাক্রমী মাধ্যম টেলিভিশনের প্রভাব কি না, ঘোষক বা সঞ্চালকেরা রঙ্গগৃহে যাঁরাই উপস্থিত আছেন তাঁদের সকলকেই ‘‌দর্শক’‌ হিসেবে সম্বোধন বা উল্লেখ করছেন। যেখানে বক্তৃতা হচ্ছে সেখানেও, যেখানে গান হচ্ছে‌ সেখানেও। হ্যাঁ, বক্তৃতামঞ্চে বক্তাদের এবং গানের মঞ্চে গায়কদেরও (‌‘‌গায়িকা’‌ বলছি না স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ফ্যাশনের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে)‌, দেখার অনেক কিছু আছে। কে কীরকম পোশাক পরে এসেছেন, পায়ের জুতো বা চপ্পল কীরকম, শীতকালে সাদা ধুতির সঙ্গে নীল মোজা বা টাক ঢাকবার জন্যে, বা টাকের সুখজনক অনুপস্থিতিতে শুধুই সর্দির হাত থেকে বাঁচার জন্যে মাঙ্কি ক্যাপ পরেছেন কি না, মঞ্চে কোনও প্রভাবশালী লোক থাকলে একগাদা চ্যালাচামচা গাদাগাদি করে মঞ্চে উঠে গেছে কি না, টেলিভিশন ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় তারা নেতার সামনে এসে পড়িমরি করে দাঁড়াচ্ছে বা তাঁর বগলের তলা দিয়ে মুখ বার করছে কি না— এই সব মহা দর্শনীয় ঘটনা ঘটতে থাকে, যা দেখলে শ্রোতাদের চোখের পরিতৃপ্তিও ঘটে। কিন্তু শুধু সেই জন্যেই তাঁদের দর্শক বলা যায় না।
তেমনই গানের অনুষ্ঠান শুনতে যাঁরা আসেন তাঁদেরও সঞ্চালকেরা কখনও কখনও দর্শক বলে ফেলেন তা দেখেছি। যাই হোক, তাঁরাও আমার মতে প্রাথমিকভাবে শ্রোতাই, দর্শক নন। যদি কেউ লক্ষ্য করেন কে চোখ বুজে গান, কে চোখ বড় বড় করে খুলে চোখ বুজে আসার সমস্ত প্রবণতার সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করতে করতে, কার চুলের একটি ধারা কপালের সামনে দিয়ে, ডান চোখের কোণ ঘেঁষে নেমে এসেছে, গানে সব সময় কার হাসিমুখ থাকে আর কার মুখ থাকে পেটব্যথায় আক্রান্ত, কে কীরকম পাঞ্জাবি বা গয়না পরে এসেছেন, পুরুষদের দাড়ি এবং মেয়েদের শাড়ির বৈচিত্র‌্য কীরকম— দেখার বহু জিনিস আছে। তবু যাঁরা গান শুনতে আসেন, তাঁদের দর্শক বলা যায় না, কীরকম ব্যাকরণবিরোধী বলে মনে হয়।
কিন্তু এ লেখা সঞ্চালকদের সমস্যা নিয়ে নয়। আমি জানি, অনেক দর্শক আছেন, তাঁরা দর্শক কি না তা নিয়ে আমার ঘোরতর সংশয় আছে। ধরুন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয়া উপাচার্য (‌দীর্ঘদিন প্রয়াত)‌ একসময় রোজ রবীন্দ্র সদনে যা কিছু হোক, এসে প্রথম সারির একটা সিটে বসতেন (‌সে সিটটা তাঁর নামেই চিহ্নিত ছিল)‌, এবং অনুষ্ঠান শুরু হওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়তেন। সেটা যে ঘুম ছিল, ধ্যান বা যোগ নয়, এ নিয়ে আশপাশের মানুষের কোনও সন্দেহ থাকত না। কারণ ঘুমের ঘোষণাও থাকত তাঁর নিশ্বাস–‌প্রশ্বাসে। অনুষ্ঠান যেই শেষ হল, ওমনি তিনি চটপট উঠে পড়তেন, এবং সদনের একজন কেউ গিয়ে তাঁকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসত। তাঁকে আমি কি দর্শক বলব, না শ্রোতা?‌ চোখ বুজে কিছু দেখার ক্ষমতা কারও আছে বলে আমি জানি না, আর গাঢ় ঘুমের মধ্যে শুনবই বা কী?‌  বাংলা আকাদেমিতেও আমি দেখতাম, একজন বিশেষ ‘‌শ্রোতা’‌ সব সেমিনারেই হাজির থাকতেন, সামনের রোতে একটা জুতসই সিটে এসে বসতেন, এবং অনুষ্ঠান শুরু হওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়তেন। এরকম ঘুমন্ত শ্রোতারা সাধারণভাবে কার্যক্রমে কোনও ব্যাঘাত ঘটান না, তাঁকে অগ্রাহ্য করেই বক্তারা বক্তৃতা দেন, গায়কেরা গান করেন। একজন বা একাধিক ঘুমন্ত শ্রোতা সিটে ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে পড়ে আছে, হয়তো নাকের ডাকও শোনা যাচ্ছে কারও কারও, তার জন্য বক্তা বক্তৃতা বন্ধ করবেন, গায়ক গান— ইয়ার্কি নাকি?‌ বরং আমার তো ধারণা, বক্তা বা গায়কেরা এ ধরনের ঘুমন্ত শ্রোতাকে রঙ্গালয়ের অলঙ্কার হিসেবেই দেখেন, বক্তৃতায় অনুষ্ঠানে ঘুমন্ত শ্রোতা না দেখতে পেলে খুব হতাশ হন। জানি না ইতিহাসে বক্তারা বা শিল্পীরা কেউ দু–‌একজন ঘুমন্ত শ্রোতা জোগাড় করে সিটে বসিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করেছেন কি না। ‘‌এ রে ভাই, কী ব্যাপার, একটা লোকও ঘুমোচ্ছে না হলে, আমার তো বক্তৃতার/‌গানের মুডই আসছে না!‌ শিগগির একটা কিছু ব্যবস্থা করো!’‌
আমার মনে পড়ছে ১৯৯২ সালে মিশরের একটা ঘটনা। কায়রোতে আইসিসিআরের কেন্দ্র খোলা হবে, আমরা গেছি শুভেচ্ছা সফরে, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে বক্তৃতারও কথা ছিল, কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়ায়। না, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নামে সেই ভারতীয় সংস্কৃতি কেন্দ্র উদ্বোধনের মূল অনুষ্ঠানে কোনও গন্ডগোল হয়নি, কেউ ঘুমিয়ে পড়েনি, নাক ডাকায়নি— মিশরীয় বিদ্বজ্জনের সেই দীক্ষাটা নেই বোধ হয়। কিন্তু গোল বাধল পরদিন সন্ধেবেলায়। মিশর সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের মনোরঞ্জনের জন্যে নীলনদে একটি লঞ্চবিহার এবং ডিনারের আয়োজন ছিল। শুধু নীলনদ–‌বিহার ইত্যাদি হলেও কথা ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে ছিল মিশরের বিখ্যাত নর্তকীদের উদর–‌নৃত্য বা বেলি–ডান্সের একটি মহান অনুষ্ঠান, যার সৌন্দর্য আর শিল্পে আমরা হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কেচ্ছা হল, যখন আমাদের সঙ্গে ভ্রমণরত কেন্দ্রীয় এক শিক্ষামন্ত্রী (‌কোনও এক শোলাংকি বোধ হয় নাম ছিল)‌ সেই নৃত্যের মধ্যে বুকের ওপর মাথা ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন, নাকের আওয়াজ ছেড়ে, আমাদের স্তম্ভিত করে। জানি না, এটা তিনি পরিকল্পিতভাবে করেছিলেন কি না, গান্ধীবাদী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ওই ‘‌অসভ্য’‌ নাচ দেখা উচিত নয় বলে, কিন্তু লক্ষ্য করেছিলাম যে একটি নর্তকী তাঁর সামনে দিয়ে নাচতে নাচতে তাঁকে একটি অনতিসূক্ষ্ম ভেংচি কেটে গেল, তাঁর সঙ্গিনীরা তাই দেখে মুখ টিপে হাসল।
সব ঘুমন্ত শ্রোতা যে এমন নির্বিরোধী এবং শান্তিপ্রিয় হয় তা কিন্তু নয়। আমার মনে আছে, এশিয়াটিক সোসাইটিতে একজন এক সেমিনারে আগাগোড়া ঘুমিয়ে যাচ্ছিলেন। চা–বিস্কুট আসার পর হঠাৎ জেগে উঠলেন, আর তখন একজন বক্তাকে কী একটা প্রশ্ন সবে শুরু করছেন, সেই লোকটি বলে উঠলেন, ‘‌আপনি অনেকক্ষণ ধরে অবান্তর বকবক করছেন, এবার থামুন!‌’‌ আর সেদিন একটি অনুষ্ঠানে আর–এক মহিলাকে দেখলাম, সবাইকে চা–শিঙাড়া আর জয়নগরের মোয়া দেওয়া হচ্ছে দেখে তিনি তাঁর ব্যাগ থেকে সযত্নে একটি ভাঁজ করা প্লাস্টিক বের করে তাতে খাদ্যবস্তুগুলি নিলেন, এবং দ্বিতীয়বার দিতে এলে আবার নিলেন, নিয়ে ব্যাগটিতে রাখলেন। তারপর গীতা ঘটকের গানের প্রসঙ্গ এল, তখন তিনি পাশে বসা আমার ছাত্রী গোপাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‌এই গীতা ঘটক কি পরে গীতা দত্ত হয়েছিলেন?‌’‌
দর্শক হোক, শ্রোতা হোক, তাঁদের কত কত রূপ, কত কত ভাষা।‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top