তিনি ১৯৫৮–৬০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার রিসার্চ ফেলো হয়ে কলকাতার সমাজসংস্কৃতি নিয়ে গভীর ব্যাপ্ত লেখালিখিতে বহুমাত্রিকতা আনেন। তাঁর প্রখর জিজ্ঞাসু নাগরিকমন যৌবনকাল থেকেই সচেতন ছিল। তঁার হুতোমি–‌তীক্ষ্ণ সমাজবীক্ষণ ‘‌কালপেঁচার নক্‌শা’‌, ‘‌কালপেঁচার দু’‌কলম’‌‌ ও ‘‌কালপেঁচার বৈঠকে’‌‌ তিনটি বইয়ে সুচারু রসব্যঞ্জনায় চিত্রিত। রাজশেখর বসু তঁাকে লেখেন, ‘‌মনে করেছিলাম আপনার বইখানার শুধু পাতা উল্টে যাব, কিন্তু একটু দেখার পরেই বাধ্য হয়ে সবটা পড়তে হল। তিনি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক, বিরল গবেষক বিনয় ঘোষ। ১৪ জুন তাঁর জন্মদিন। তঁাকে মনে করলেন কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক শান্তি সিংহ। ছবি: দেবব্রত ঘোষ
 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হয়েও সাহেবি আমলে তাঁর পরনে থাকত থান ধুতি, গায়ে মোটা চাদর, আর পায়ে তালতলার চটি। পরবর্তীকালে ‘‌বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ’‌ (‌তিন খণ্ড, ১৯৫৭–’‌‌৫৯ প্রকাশিত, পরবর্তীকালে একখণ্ডে)‌ গ্রন্থের লেখক বিনয় ঘোষ (‌১৯৭৭–‌১৯৮০)‌ কলকাতার বাসিন্দা হয়েও প্রথম জীবনে একটা মাদুর পেতে লিখতেন। পাশে থাকত তাকিয়া। উত্তর জীবনে একটা নীচু তক্তাপোশের ওপর বসে লেখাপড়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। অবন ঠাকুরের ডিজাইনে তৈরি নীচু খাট আর বিভিন্ন উপকরণে তৈরি মোড়া ছিল তাঁর ড্রইংরুম অর্থাৎ বসবার ঘরের বাহার। বাড়িতে এন্ডির তৈরি ফতুয়া গায়ে থাকত। নিজের স্টাইলে ট্রাউজার–‌পাজামা আর র–‌সিল্ক ডিজাইনের তাঁতের তৈরি হালকা গেরুয়া পাঞ্জাবি তাঁর পছন্দের পোশাক। যা সুগঠিত দিঘল গড়নের শরীরে মানানসই। ভোজনপ্রিয় মানুষটি দেশি–‌বিদেশি খাবার পরিতৃপ্তি করেই খেতেন। অথচ গ্রামবাংলায় ক্ষেত্রসমীক্ষার সময় সাধারণ মাছ–‌ভাতেই খুশি থাকতেন।
১৯৫৬ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সময় তিনি বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালায় মোট ছ’‌টি ভাষণ দেন। তার পরিমার্জিত গ্রন্থরূপ ‘‌বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ’‌। ১৯৫৮–’‌‌৬০ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার রিসার্চ ফেলো হয়ে কলকাতার সমাজসংস্কৃতি নিয়ে গভীর ব্যাপ্ত লেখালেখিতে বহুমাত্রিকতা আনেন। অবশ্যি তাঁর প্রখর জিজ্ঞাসু নাগরিকমন যৌবনকাল থেকেই সচেতন ছিল। তাই হুতোমি–‌তীক্ষ্ণ সমাজবীক্ষণ ‘‌কালপেঁচার নক্‌শা’‌ (‌১৯৫১)‌, ‘‌কালপেঁচার দু’‌কলম’‌ (‌১৯৫২)‌ ও ‘‌কালপেঁচার বৈঠকে’‌ (‌১৯৫৭)‌ তিনটি বইয়ে সুচারু রসব্যঞ্জনায় চিত্রিত। রাজশেখর বসু ১৯৫১ সালের ১৪ নভেম্বর একটি পত্র স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিনয় ঘোষকে লেখেন, ‘‌মনে করেছিলাম আপনার বইখানার শুধু পাতা উল্টে যাব, কিন্তু একটু দেখার পরেই বাধ্য হয়ে সবটা পড়তে হল।.‌.‌.‌ আপনি একজন বিস্মৃতপ্রায় অসামান্য লেখকের তর্পণ করেছেন, নিজেও আশ্চর্য শক্তি দেখিয়েছেন। নানা জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে মনোহর সরস ভাষায় আপনি সেকালের আর একালের যে খণ্ডখণ্ড বর্ণনা দিয়েছেন, তা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।’‌
বিনয় ঘোষের ‘‌কলকাতার কালচার’‌ (‌১৯৫৩)‌, ‘‌সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র’‌ ১ম–‌৭ম খণ্ড প্রকাশিত ১৯৬২–‌৬৮ সালে। ‘‌কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’‌ (‌১৯৭৫)‌ এবং ‘‌মেট্রোপলিটন মন:‌ মধ্যবিত্ত বিদ্রোহ’‌ (‌১৯৭৩)‌ আজও আমাদের মনস্ক করে। ১৯৬৪ সালে তিনি লিখেছেন দীর্ঘ ‘‌কলকাতার মন’‌ প্রবন্ধ। 
তাঁর ‘‌টাকা আর টাকা আর মন’‌ ১৯৬৫ সালে লেখা। প্রবন্ধটির শেষাংশ আজ যেন তীব্রতর ও সংবিতজাগানো— ‘‌শুধু যে মানুষকেই কেনা যায় তা নয়, মানুষের মনও কেনা যায় টাকার বিনিময়ে। মর্যাদা, খ্যাতি–‌প্রতিপত্তি এসব সমাজের নিলেমে ডাক দিয়ে দামে কেনার বস্তু মাত্র। নিলেমের মাল। খেতাব, উপাধি এসব বাহারে প্যাকেট বা মোড়ক, মাল–‌বিকোনোর জন্য। যত পচা মাল ততবেশি তার মোড়কের বাহার। নাগরিক মন যত বিবর্ণ ও বিকৃত হতে থাকে, তত তার নিত্যনতুন লেবেল ও মোড়ক বদলায়, এবং বোঝা যায় যে লেবেলের তলায় যে মন তা শীতের পাষানের মতো হিমশীতল, কোনো উত্তাপ নেই তার মধ্যে। তাই কৃত্রিম তাপের জন্য কলকাতার মন সর্বদান উন্মুখ। তাপ মানে উত্তেজনা, প্রবল থেকে প্রবলতর উত্তেজনা।’‌
।। দুই ।।
বিনয় ঘোষ কলকাতা আশুতোষ কলেজে অর্থনীতি নিয়ে বিএ অনার্স পড়ার সময় ‘‌পরিচয়’‌ পত্রিকায় তাঁর একটি লেখা পড়ে মুগ্ধ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁকে পত্রিকার জন্য বই–‌রিভিউ করতে দেন। রিভিউটিও কবিকে মনস্ক করেছিল। প্রগতিশীল বামপন্থী ভাবনায় বিনয় ঘোষ যুবাকালেই মার্কস, মামফোর্ড, ম্যাকলুহান, অ্যালবার্ট কমাস, মার্ক্যুসে, টি.‌এস.‌ এলিয়ট, জেমস জয়েস, অ্যানাবিয়র কামু থেকে জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে পাঠে নিজেকে তৈরি করেন। সেই সঙ্গে সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সঙ্ঘ, ইয়ুথ কালচারাল ইনস্টিটিউট, ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ, গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে তাঁর মানসিক সংযোগ ঘটে। ‘‌পরিচয়’‌, ‘‌অরণি’‌, ‘‌জনযুদ্ধ’‌ প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি লেখা দেন। হিরণকুমার সান্যাল, মুজফ্‌ফর আহমেদ, অরুণ মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সমাজবাদী ব্যক্তিদের ভাবধারায় তিনি আগ্রহী হন। এ সময় তিনি লেখেন ‘‌ফ্যাসিজম ও জনযুদ্ধ’,‌ ‘‌সোভিয়েত সমাজ ও সংস্কৃতি’,‌ ‘‌আন্তর্জাতিক রাজনীতি’‌ প্রভৃতি বই। রাজনীতিতে সক্রিয় কর্মী বীণার সঙ্গে ১৯৪১ সালে তাঁর বিয়ে। এম.‌এ.‌বি.‌টি.‌ পাশ বীণা ঘোষ ৩২ বছর অবিচ্ছিন্ন স্কুল শিক্ষয়িত্রী থেকে সংসারের হাল ধরে রাখেন। বিনয় ঘোষের গবেষণাভিত্তিক লেখালেখিতে কোনও ফিকির বা ফাঁক থাকত না। তাঁর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ে একাগ্রতার কথা তাঁর স্ত্রী বীণা ঘোষ অকপটে লিখেছেন, ‘‌‌লিখে চলেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা— সময়ের কথা, সুবিধা–‌অসুবিধার কথা— এমনকী চায়ের কথা পর্যন্ত ভুলে যেতেন। আমাদের টিনের কুটিরে বিজলি পাখা ছিল না। ছোট ছোট ঘর, একখানা ঘরে খাট আর ফোল্ডিং টেবিল পেতে তার আনাচ–‌কানাচে বইয়ের তাক, আর তাকের ওপরে স্তূপীকৃত বই। এতটুকু জায়গা ছিল না। ছোট ছোট দুটো জানালা। ওপরে টিনের ছাউনি। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসে দেখতাম ঘাম ঝরছে অবিরাম।.‌.‌.‌ পরে যখন নিজের বাড়ি করলেন তখন দেড়তলায় গ্যারজের ওপর ঘরটা লেখার জন্য ঠিক করলেন। সেটা বাড়ির পশ্চিম দিক। অফিসের মতো সকাল এগারোটা থেকে বিকেল চারটে–‌পাঁচটা অবধি একটানা কাজ করেছেন। নীচু ছাদ আর পশ্চিমের রোদ্দুরে সন্ধে অবধি ঘরটা আগুনের মতো গরম হয়ে থাকত।’‌ (‌বিনয় ঘোষ:‌ তাঁর মানস ও জীবন, পৃষ্ঠা ৪১। প্রকাশ ভবন, কলকাতা ৭৩)‌
।। তিন ।।
বিনয় ঘোষের ‘‌পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’‌ সুবিশাল গ্রন্থটি ১৯৫৭ সালের ২৬ জানুয়ারি পুস্তক প্রকাশক, কলকাতা–‌১২ থেকে প্রকাশিত হয়। তখন গ্রন্থটির বিক্রয়মূল্য আঠারো টাকা মাত্র। পুরোপুরি ক্ষেত্রসমীক্ষা নির্ভর গবেষণা। বিনয় ঘোষ উত্তর জীবনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি— নৃতত্ত্ব বিষয়ে এম.‌এ.‌ পাশ করার সুফল তাঁর ক্ষেত্রসমীক্ষা কর্মে পেয়েছেন। নীহাররঞ্জন রায়ের ‘‌বাঙালির ইতিহাস, আদিপর্ব’‌ গ্রন্থের অনুরূপ আকরগ্রন্থ ‘‌পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’‌। এই গ্রন্থটি ১৯৫৭ সালে রবীন্দ্র–‌পুরস্কার পায়। গ্রন্থটির পরিমার্জিত–‌পরিবর্ধিত রূপ পরবর্তীকালে প্রকাশ ভবন থেকে চারখণ্ডে প্রকাশিত। প্রকাশক স্বপন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি জানতে পারি— বইটি বেস্ট সেলার।
লক্ষণীয়, ৮১৪ পৃষ্ঠার একখণ্ডে প্রকাশিত ‘‌পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’‌ গ্রন্থটি রবীন্দ্র–‌পুরস্কার পেলেও বিনয় ঘোষ যথার্থ গবেষক হিসেবে আত্মতৃপ্ত ও ক্ষান্ত হননি। তাঁর নিরন্তর সন্ধিৎসু চেতনায় নিজের গবেষণাকর্মে তখনও বিধৃত হয়নি পুরুলিয়া, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ ও উত্তরবাংলার জেলা সমীক্ষা। ফলত প্রামাণ্য গবেষণা কর্মে সেই সব জেলা–‌সমীক্ষায় নিরত হন। কিন্তু ৬৩ বছরের জীবদ্দশায় উত্তরবাংলা সমীক্ষার সময় পাননি।
।। চার ।।
পুরুলিয়া জেলা সমীক্ষায় যুক্ত হয়ে বিনয় ঘোষের সন্ধিৎসু চোখ আমার সন্ধান পায়। তখন আমি সর্বভারতীয় আবাসিক প্রতিষ্ঠান পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতায় যুক্ত থেকেও ছুটির দিনে ঘুরছি মানভূম পুরুলিয়ার দুর্গম, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাচীন পুরাকীর্তিমালার তথ্য সন্ধানে। সেই রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারে সহযাত্রী বন্ধু জুটে যায়। পুরুলিয়া শহর থেকে বড় জোর মাইল পঁচিশ দূরে পাকবিড়র‌্যা গ্রাম। গ্রামের একপ্রান্তে কয়েকটি ভগ্নপ্রায় জৈন মন্দির। সেখানে খোলামেলা পরিবেশে সাত ফুটেরও বড় শিল্পশোভন পদ্মপ্রভ দিগম্বরের কালো চিকন প্রস্তরমূর্তি। কাছেই ঋষভনাথ। ১৯৬৮ সালের কথা। গ্রামবাসীদের চোখে তাঁরা ‘‌কালভৈরব’‌। তাই তাঁদের প্রসন্নতায় পশু–‌পাখি হিসেবে পাঁঠাবলি, মোরগবলি দিতেন। পাকবিড়র‌্যার অনতিদূরে কাঁসাই নদীর ওপারে বুধপুর গ্রাম। নির্জন নদী তীরে ভাঙাচোরা পাথরের মন্দির। ভগ্নস্তূপের মাঝে দেখেছি পাথরের নৃত্যরত গণেশমূর্তি। প্রায় চারফুট উঁচু। পুরুলিয়ার ছড়রা, পাড়া, আনাই–‌জামবাদ, বড়াম, দেউলঘাট অঞ্চলে দেখেছি প্রাচীন পুরাকীর্তি। দেউলঘাটে নবম–‌দশম শতাব্দীর ইটের বিশাল দেউল ভগ্নপ্রায়। অনতিদূরে কালো পাথরের অষ্টভুজ মহিষমর্দিনী দুর্গা। উচ্চতায় চার ফুটের ওপর। বৌদ্ধতান্ত্রিক যুগের। বরাকর রোডে, শহর থেকে অনতিদূরে পাড়া গ্রাম। সেখানেও আছে দেউলঘাটের অনুরূপ ইটের মন্দির। সেখানে প্রায় দু’‌ফুট উঁচু ও দেড় ফুট চওড়া অষ্টভুজা দেবীমূর্তি। গ্রামবাসীরা উদয়চণ্ডী রূপে পূজা করেন।
১৯৬৯ সালের মার্চ মাস। এক রোববার বেলা দশটা। পরিচিত এক জনের মুখে শুনি–‌ বিনয় ঘোষ দেখা করতে চান। পুরুলিয়া স্টেশনের কাছেই হোটেলে উঠেছেন। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি গাড়ি পাঠিয়েছেন। অবাক বিস্ময়ে গাড়িতে উঠি। হোটেলের দোতলায় তাঁর সঙ্গে দেখা। আন্তরিক আলাপী মন নিয়ে সস্নেহে আমার মন্দির–‌পুরাকীর্তি দেখার কথা শুনতে চান। আমার সহজ কথাবার্তায় খুশিও হন। নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝি মিলিয়ে নেন। তাঁর একদা পুরুলিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথাও হেসে বলেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় দুপুর সাড়ে বারোটা। তখন তিনি হেসে বলেন, ‘‌আমার সঙ্গে দুপুরে মাছ–‌ভাত আজ খাও।’‌ তাঁর আন্তরিকতায় এক টেবিলে পাশাপাশি বসে খাই। তিনি হোটেল কর্মীকে বলেন, আরেক পিস মাছ আমার প্লেটে দেওয়ার জন্য। খেতে খেতে বলেন, ‘‌পরে এক রোববার তোমাদের মিশনের মিউজিয়াম দেখতে যাব।’‌ তারপর গাড়ি করে আমাকে রামকৃষ্ণ মিশনে একা ফিরে আসার সুযোগ করে দেন।
‌অল্পকাল ব্যবধানে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার সুযোগ হয়। তিনি ফোন করেন এক রোববার সকালে। বিদ্যাপীঠ–‌মিউজিয়াম দেখতে আসবেন জানান। বেলা ১০টা নাগাদ। তখন মুম্বই রামকৃষ্ণ মিশন থেকে বিদ্যাপীঠে এসেছেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক স্বামী হিরণ্ময়ানন্দ মহারাজ। বিনয় ঘোষের আসার কথা তাঁর কানে যেতেই আমাকে বলেন, ‘‌খুব বড় গবেষক কালপেঁচা। ওনার বই পড়েছি।’‌ তাই তাঁকে সাদরে আমন্ত্রণ জানান।
স্বামী হিরণ্ময়ানন্দজি মহারাজ খুশি মনে অভ্যর্থনা জানান বিনয় ঘোষকে। বিদ্যাপীঠ–‌জেনাপেল অফিস প্রাঙ্গণ থেকে সারদা মন্দির নামে স্কুল বিল্ডিংয়ের দিকে দুজনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যান। সঙ্গে আমি শ্রোতা। শিল্পী সুনীল পাল হিরণ্ময়ানন্দের শিল্পভাবনাকে রূপ দেন বিদ্যাপীঠে। যা বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শ জাত। হিরণ্ময়ানন্দ সারদা মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয় ঘোষকে দেখান সারদা মন্দিরের চূড়া। সেখানে দুটি মকর মূর্তি। যা মকর রাশির প্রতীক। হিরণ্ময়ানন্দ বলেন, ‘‌এর মধ্যে মকর রাশিতে সূর্যের সংক্রমণ বোঝাতে দুই মকর–‌প্রতীকের মাঝে একটি সূর্যমুখী ফুল। মানে মাঘ মাসে সরস্বতী পুজোর প্রশস্ত কাল। শিল্পী সুনীল পালের অপরূপ ভাস্কর্য দেবী সরস্বতী। তাঁর পদযুগলে বিকচোন্মুখ পদ্ম। যা ছাত্রদের হৃদয়পদ্ম। তার নীচে রয়েছে উত্তরমুখী রাজহাঁস। মনের গতি মানস সরোবরের দিকে। মানে Intellectual ‌যে Life ‌তাই। সরস্বতী পুজোর সঙ্গে শ্রীদেবীর পুজো। অর্থাৎ বিদ্যা ও শ্রীর আরাধনা পঞ্চপ্রদীপে। দেবী সরস্বতীকে আরাধনার জন্য অসংখ্য জ্ঞানদীপ। যা ছাত্রদের হৃদয়ের প্রতীক। সারদা মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে সুনীল পালের তৈরি সরস্বতী। তার ভেতরদিকে, মানে সারদা মন্দির বিল্ডিং–‌এর ঠিক ভেতরে আছেন সুনীল পালের চিত্রিত দেবী সারদার বিশাল রূপ। দুজন মহান ব্যক্তির পদচারণা ও কথাবার্তার শ্রোতা আমি!‌ বিনয় ঘোষ মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা হয়েছেন স্বামী হিরণ্ময়ানন্দের।
বিদ্যাপীঠ–‌মিউজিয়াম ভবন তৈরি সরকারিভাবে তখন তৈরি হয়নি। তাই সারদা মন্দির বিল্ডিং–‌এর ২০ নম্বর বিশাল ঘরে বিদ্যাপীঠ সংগ্রহ সুচারুভাবে তখন প্রদর্শিত হত। সেই ২০ নম্বর আর্ট গ্যালারি বিনয় ঘোষ দীর্ঘ সময় নিয়ে ঘুরে দেখেন স্বামী হিরণ্ময়ানন্দের সঙ্গে। সঙ্গী আমিও। কুষাণযুগের মুদ্রা, মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সমকালীন মুদ্রার সঙ্গে বিনয় ঘোষ তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে দেখেন কানাডা, ব্রাজিল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, রাশিয়া, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, প্যালেস্টাইন, আফ্রিকা, হংকং দেশের নানা ধরনের মুদ্রা। সেইসঙ্গে বিদ্যাপীঠের চিত্র প্রদর্শনীতে অবনীন্দ্রনাথ–গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুষ্প্রাপ্য চিত্রের পাশাপাশি নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, যামিনী রায়, সুনীল পাল, প্রাণকৃষ্ণ পাল, অসিতকুমার হালদার, গোপাল ঘোষ, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ চিত্রশিল্পীর চিত্র। রবীন্দ্রনাথের ‘‌আহ্বান’‌ কবিতার পাণ্ডুলিপি। সবিশেষ উল্লেখ্য, বার্মিজ কাঠের ভগবান বুদ্ধ ও রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দ বিষয়ক সংগ্রহ।
বিনয় ঘোষ সেদিন দুপুরে বিদ্যাপীঠ ছেড়ে পুরুলিয়া শহরের হোটেলে যাওয়ার আগে, জনান্তিকে আমায় বলেন, ‘‌বিকেলে যাব ফিল্ড ওয়ার্কে। দেউলঘাট, বড়াম থেকে ঝালদা এলাকায় সরেজমিন সমীক্ষা। সরকারি অফিসারদের সৌজন্যে গাড়ি পাই। তুমি যদি সঙ্গী হও, খুশি হব।’‌
দুর্লভ বেড়ানোর সুযোগ পেয়ে ছুটি নিয়ে তাঁর সঙ্গী হয়েছি। সেদিন বিকেলে গড়জয়পুর গ্রাম–‌রাস্তার বাঁদিকে ভারডি, সিরডি, শ্যামপুর গ্রাম ছাড়িয়ে, কাঁসাই নদী পেরিয়ে যাই নির্জন দেউলঘাট মন্দির–‌পুরাকীর্তি দেখতে। বিনয় ঘোষ মগ্ন চিত্তে ঘুরে ঘুরে দেখেন ও ফটো তোলেন নিজের ক্যামেরায়। কথা প্রসঙ্গে বলেন, অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামেরার হাত ভাল। নদী তীরে, ভগ্ন পুরাকীর্তিশালার কাছে, করম–‌অর্জুন–‌পলাশ গাছের নির্জনতায় কিছুক্ষণ আত্মমগ্ন হন বিনয় ঘোষ। তারপর স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে সহজভাবে কথাবার্তা বলেন। অষ্টভুজা দুর্গা দেখে বলেন, বেগলার সাহেব একশো বছর আগে এ–‌সব জায়গায় এসেছেন। অষ্টভুজা দুর্গা দেখে তাঁর লেখায় বলেছেন, ‘‌The finest piece of sculpture in the place‌’‌। এসব কথা বিনয় ঘোষ পরবর্তীকালে লিখেছেন তাঁর ‘‌Cultural Profile of Purulia‌’‌‌ লেখায়। পুরুলিয়ার ঝালদা কুটিরশিল্পের ছুরি–‌কাঁচি–‌গুপ্তি–‌ভোজালি ইত্যাদি তৈরি প্রণালি খুঁটিয়ে জেনে নেন লোকশিল্পীদের মুখে।
ঝালদায়, নৈশ আহারের পর রাত্রিবাস। তখন তাঁর মুখের কথা গল্পচ্ছলে শুনেছি। কলকাতার সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ইত্যাদি জনের নানা কথা সরসভাবে বলেন। ফিল্ড ওয়ার্ক–‌এর সময় কীভাবে নোটস নেন, তা দেখান।
পরের দিন স্থানীয় গ্রামবাসীদের লোকাচার, লোকউৎসবের ওপর সমীক্ষা তিনি করেন। সহযাত্রী হয়ে সাগ্রহে দেখি তাঁর ক্ষেত্রকর্ণের ধারা। তখন গ্রামবাসীদের ভালবাসায় যা জুটেছে তাই খাওয়া। সবার মাঝে মিশে তিনি গ্রামেরই যেন একজন!‌ গাড়িতে পুরুলিয়া শহর ফেরার পথে তিনি অনেক কথার মাঝে বলেন— ‘‌পুরুলিয়া লোকসংস্কৃতির সম্পদে ধনী। তুমি এখানে আছো। যদি পারো ভালবেসে একদিন গবেষণা কোরো।’‌
।। পাঁচ ।।
বিনয় ঘোষের উৎসাহে, পরবর্তীকালে ছুটির দিন ভোরে গ্রামসমীক্ষায় গেছি, সহজ ভালবাসায়। পুরুলিয়া শহর থেকে বহু দূরে সুইসা গ্রাম। গ্রাম প্রান্তে দেউলি গ্রাম। সেখানে প্রাচীন পুরাকীর্তির বিশাল ভগ্নস্তূপ। যেন ভূমিকম্প ঘটেছে। ভগ্নস্তূপের ওপরে উঠে দেখতে পাই একপ্রান্তে সাত–‌আট ফুট নীচে মন্দিরের গর্ভগৃহ। এগিয়ে গিয়ে দেখি এক জৈন তীর্থঙ্করের বিশাল মূর্তি। স্থানীয় গ্রামবাসীদের চোখে তিনি ‘‌ইড়গুনাথ’‌। লোকবিশ্বাসে তিনি পূজিত। সেই দেবতার কাছেই বেশ কয়েকটি ছোট আকারের মূর্তি। পরবর্তীকালে দেখেছি সেখানে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত হয়েছে।
পরবর্তী সমীক্ষা করি, দামোদর নদ তীরবর্তী চেলিয়ামা গ্রাম পেরিয়ে পাঞ্চেত জলাধার–‌নিমগ্ন তেলকুপি এলাকায়। বেশ কয়েকটি জৈন মন্দির তখনও জলরাশির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে!‌ ফিরে এসে বিনয় ঘোষকে অ্যাডভেঞ্চার–‌ভ্রমণের সব বিবরণ দিয়ে ইনল্যান্ডে দীর্ঘ চিঠি লিখি। তাঁর যাদবপুর সেন্ট্রাল রোডের বাড়ির ঠিকানায়। সেই বাড়িতে একাধিকবার গেছি। কথাবার্তা হয়েছে লেখার ঘরে বসে। আমার চিঠির উত্তরে চিঠি দেন বিনয় ঘোষ। আমার ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘‌বাঁকুড়া–‌পুরুলিয়ার শিল্প ও সংস্কৃতি’‌ গবেষণাগ্রন্থে ‘‌পুরুলিয়ার প্রাচীন মন্দির–‌পুরাকীর্তি’‌ শীর্ষক সুদীর্ঘ প্রবন্ধের পরিশেষে, ৩৪২ পৃষ্ঠায় সেই চিঠি মুদ্রিত। তা নিম্নরূপ:‌
প্রীতিভাজনেষু,
৪ মার্চ ১৯৭১
তোমার ১/‌৩ তারিখের চিঠি পেলাম। আগের চিঠির উত্তর দিয়েছি, তারপর আর কোনও চিঠিপত্র পাইনি। আমরা যে–‌অবস্থার মধ্যে বাস করছি তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম আর চলছে না। কাজেই আমার চিঠি না–‌পেলেও মধ্যে মধ্যে চিঠি দিলে খুশি হব।
যে–‌সব জায়গা ঘুরে এসেছ— জানতে পেরে যথেষ্ট অস্বস্তি বোধ করছি, মনে হচ্ছে আমি সঙ্গে ঘুরতে পারলে ভাল হত। সময়টা ভাল হলে চলে যেতাম, যদি পরে একটু অবস্থার উন্নতি হয় চলে যাব। তোমাদের বিদ্যাপীঠেই থাকব কযেকদিন, এবং তোমাদের সঙ্গে খুব ঘুরব।
নিজের কাজকর্ম মনোযোগ দিয়ে করতে পারছি না, তার জন্যে মন খারাপ। তোমার কাজ কেমন হচ্ছে?‌ ঘোরাঘুরির অভ্যাস ও নেশাটা ছেড়ো না— এটাই শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবে, যেমন আমাকে রেখেছে। অর্থাৎ নিজের দেশ, দেশের মানুষ, তার কাজকর্ম, কীর্তি নিজের চোখে–‌দেখা— এর চেয়ে বড় কাজ মানুষের জীবনে নেই বলে মনে হয়। এ বিষয়ে তোমার নিষ্ঠা ও সততা দেখে সত্যিই খুব আনন্দ হয়।
আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিও।
ইতি
বিনয় ঘোষ
শতবর্ষ–‌অতিক্রান্ত বিরল ঘরানার গবেষক বিনয় ঘোষকে আমরা কতটুকু মনে রেখেছি?‌ ‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top