অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়: অন্তহীন’‌ ছবিতে গান লিখে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। কী মনে হয়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের সবথেকে ভাল কাজই কি ‘‌অন্তহীন’–এ?‌ নাকি এর থেকেও ভাল কাজ ছিল যার দাম পাননি?‌
● চন্দ্রবিন্দুতেই তো কত ভাল গান রয়েছে আমার। আসলে পুরস্কার দিয়ে কোনও কিছুর বিচার হয় না। তবে ‘‌অন্তহীন’‌ আমার কাছে চিরদিন মনে রাখার মতো একটা স্মৃতি। কারণ, এই প্রথম সিনেমার কোনও কাজ আমি আর চন্দ্রিল একসঙ্গে করেছি। তা ছাড়া শান্তনু মৈত্রের মতো একজন প্রতিভাবান মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করা তো কম কথা নয়। আর এ জন্য ছবির পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরিকে আমি অবশ্যই ধন্যবাদ জানাব। খুব মজা করে কাজ করেছিলাম প্রত্যেকে। আর কাজের মধ্যে যত বেশি ভালবাসা থাকবে, সেই কাজ তত উৎকৃষ্ট হবে। সেদিক থেকে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি এটা অবশ্যই ভাল লেগেছে। তবে যদি নাও পেতাম, তবুও কাজটা মিথ্যে হয়ে যেত না। 
আপনাকে কোনওদিন কোনও ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাতে দেখা যায়নি। তা হলে সুর কীভাবে তুলে রাখেন?‌ সেটা কি মাথাতেই থাকে শুরুর মুহূর্তে?‌
● এই ধারণাটা অনেকেরই আছে। বলা যায় বেশিরভাগ মানুষেরই আছে। কিন্তু এটা একদম ভুল ধারণা। সত্যিটা হল, যারা সুর করে তারা কেবল কোনও ইনস্ট্রুমেন্টেই সুর তুলে রাখে এমনটা কিন্তু নয়। সেরকম হলে যন্ত্রীরাই সবথেকে ভাল সুরকার হতে পারতেন। গান গাইতে পারা যেমন একটা গুণ, যন্ত্র বাজাতে পারা যেমন একটা গুণ, ঠিক সেরকমই গান কম্পোজ করাও একটা অন্যতম কোয়ালিটি। এটা কারওর থাকে কারওর থাকে না। যিনি সারা জীবন রাগরাগিণীর সঙ্গে ঘর করেছেন, তিনিও যে গান বানাতে পারবেন এর কিন্তু কোনও মানে নেই। তবে যন্ত্র ছাড়া সুরটা থাকে কীভাবে এটা বলাটা খুব শক্ত। তা হলে বলতে হয় যাঁরা কবিতা লেখেন, তাঁরা কীভাবে তাল লয়–ছন্দ মনে রাখেন?‌ যাঁরা কবিতা নিয়ে রিসার্চ করেন, তাঁরাই কি খুব ভাল কবি?‌ জয় গোস্বামীর মতো মানুষ, যাঁর সেভাবে প্রথাগত শিক্ষার বাড়াবাড়ি নেই, তাঁর মতো ভাল কবিতা তো অনেকেই লিখতে পারেন না!‌ এটা তা হলে কীভাবে হয়?‌ 
কোন পরিচয়টাকে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেন?‌ গায়ক, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, সিনেমা পরিচালক, অভিনেতা নাকি লেখালেখি?‌
● কোনওটাকেই দিচ্ছি না। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় একজন মানুষ। যে নিজের মতো করে বাঁচে। এটাই আমার সবথেকে ভাল পরিচয়।
ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। আপনার এই ছবি তৈরি, গান লেখা, সুর দেওয়া এ সব ক্ষেত্রে ঋতুপর্ণর প্রভাব কতটা?‌
● ঋতুদা রবীন্দ্রসঙ্গীত আর চন্দ্রবিন্দুর সঙ্গীত ছাড়া জীবনে কিচ্ছু শোনেননি। চন্দ্রবিন্দু শুনেছেন কেবল গানের কথার কারণে। তবে ঋতুদার সঙ্গে দীর্ঘদিন ছবি নিয়ে কাজ করেছি, একটা ছবি অ্যাসিস্টও করেছিলাম। সেটা অবশ্যই শেখার মতন। একটা ধরন ছিল কাজের। এত সুন্দর মানুষের মনন বুঝতেন, মহিলা মন বুঝতেন সেটা খুব কম পরিচালক পারেন। আমি আমার প্রথম সিনেমাটা ঋতুদাকে দেখাতে পারিনি এই আফসোস সারা জীবন থাকবে। আর আমার অভিনয় করাটা কিন্তু ঋতুদার জোরের জন্যই। এখন মনে হয়, সিনেমাটা করে ভালই করেছিলাম। কারণ, ওই সময়টায় আমি সবসময় ঋতুদার সঙ্গ পেয়েছিলাম। এটা বিশাল ব্যাপার। ঋতুদাকে মিস করি। খুব মিস করি। 
অ্যালবামের বাজার পড়ে যাচ্ছে। সবাই ওয়েবে চলে যাচ্ছেন। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির এই নতুন চেহারাটা কীভাবে দেখছেন?‌
● আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন ক্যাসেট ছিল। তারপর সিডি এল। এখন ইউ টিউব.‌.‌.‌। টেকনোলজি তো চেঞ্জ করবেই। যত দিন যাবে তত বদলাবে। যেটা পাল্টাবে না সেটা হল সৃজনশীলতা, কনটেন্ট। সেটা একই থেকে যাবে। গানটা তো আগে ঠিকঠাক তৈরি করতে হবে। তারপর তো অ্যালবাম না ইউ টিউব তার প্রসঙ্গ। তাই এইসব ব্যাপারে মাথা না ঘামিয়ে আগে নিজের কাজটা ভাল করে করে যেতে হবে। তা ছাড়া, এখন গান প্রকাশ করার জন্য কোনও কোম্পানির প্রয়োজন হচ্ছে না। ইউ টিউব আছে। এর থেকে বড় স্বাধীনতা আর কী হতে পারে?‌ এখন আর মনমরা হয়ে থাকার কোনও ব্যাপার নেই। নিজের মতো কাজ করে পোস্ট করে দাও। ভাল কাজ হলে লোকজন নিশ্চয় প্রশংসা করবে। 
রিয়্যালিটি–শো সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?‌
● সত্যি বলতে কী, আমি অনেক গান বুঝি না। আমাকে যদি গানের কারিকুরি জিজ্ঞেস করো, রাগরাগিণীর বৈশিষ্ট্য জিজ্ঞেস করো, আমি কিন্তু বলতে পারব না। কিন্তু একটা গান শুনে এটুকু বুঝি যে একজনের হবে, না হবে না। যারা রিয়্যালিটি–শো তে নাম করছে, আমি দেখেছি তাদের মধ্যে গানটা আছে। তবে তাদের উচিত অন্য শিল্পীদের গান না গেয়ে নিজেদের মতো করে নতুন গান গাওয়া। অন্যের গান গেয়ে কিছু বাহবা কুড়োতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।‌■

জনপ্রিয়

Back To Top