(সুকুমারমতি যৌবন হঠাৎ আবেগের বশে এমনটা ঘটিয়ে ফেলেছে, এমন যুক্তি দেওয়া যেতেই পারে। দেবাশিস পাঠক)

টুপ করে আচমকা খসে গেল। কেন কিংবা কখন, কেউ টেরটিও পেল না। এই ছিল। হাসছিল, খেলছিল, জীবনকে মাখছিল সমস্ত অস্তিত্বে। এই নেই। একটা মোবাইল ফোন না পাওয়ার যন্ত্রণা কিংবা মা–দাদার বকুনি কিংবা সবচেয়ে প্রিয় বলে ভেবেছিল যে মানুষটাকে তার সরে যাওয়া— এরকমই কোনও একটা কারণ বাঁচার ইচ্ছেটাকে গপ্‌ করে গিলে নিল।
আর একটা জলজ্যান্ত জীবন স্বেচ্ছায় নিজেতে লগ্ন করল যতি।
এ এক অদ্ভুত খেলা। এ এক বিচিত্র আরোপণ। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যাওয়া। বাঁচতে বাঁচতে হঠাৎই মৃত্যুকে জাপ্টে ধরা। এ খেলায় যে জল্লাদ, সে–ই বলি। ঘাতক আর নিহত একই ব্যক্তি। শার্ল বোদলেয়ারের ভাষায় 'Et la victime. et le. bourreau'‌। এর নাম আত্মহনন।
কতই না নগণ্য কারণ থাকে এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ার। ইচ্ছে করে হারিয়ে যাওয়ার। অনস্তিত্বের ভিড়ে সচেতন আত্মগোপনের। কিন্তু, নেড়েচেড়ে দেখলে সব কারণেরই মূল রংটা একই বলে চিনে নেওয়া যায়। জীবনের সঙ্গে সহসা আড়ির অভিন্ন হেতু।
‘‌আর ভাল্লাগছে না’‌ কিংবা ‘‌আর পারছি না।’‌
সহ্যশক্তি হাঁপিয়ে উঠেছে কিংবা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠুনকো আঘাত, আর তাতেই সব শেষ। শাপাক্ত হৃদয় আর শোকের প্রকোষ্ঠ ঠেলে বেরিয়ে আসে আত্মার তেতোবোধ। ‘‌হেরে গেছি’‌, এই শব্দবন্ধ শাশ্বত হয়ে আঁকিবুকি কাটে চৈতন্যের গলিঘুঁজিতে। চারপাশে তখন মনে হয় কেবল চাপ চাপ না–চাওয়া, গোছা গোছা না–পাওয়া।
ব্যস!‌ ওতেই সব শেষ। ওতেই লেখা হয়ে যায় চলে যাওয়ার দিনক্ষণ।
জীবন বইতে থাকে নিজের তালে। তারই মধ্যে আকাশের নীল থেকে নেমে আসে মরণের চিল। হেরোর ডাকে। তার পর ঠোঁটে করে একটা প্রাণ তুলে নিয়ে হারিয়ে যায় অসীম নীলেই। জীবনের ভারী বয়ে গেছে, ওই চলে যাওয়াটাকে সর্বস্ব মেনে থমকে যেতে। ফলে, তার প্রবহমানতায় ছেদ পড়ে না। মাঝখান থেকে হাপিস হয়ে যায় একটা জলজ্যান্ত প্রাণ একেবারে স্বেচ্ছায়।
হেমন্তের বিকেলে ঝরাপাতা নিয়ে দীর্ঘ বিলাপ করতে গাছের ভারী বয়ে গেছে। নতুন কচি সবুজদের নিয়ে সে ডগমগ। বৃষ্টিতে ভিজে কিংবা বাসন্তী হাওয়ায় দুলে সে আনন্দকে ঠিক খুঁজে নেয়। মাঝখান থেকে ঝরাপাতারা হারিয়ে যায় বাতাসের ঘূর্ণিতে।
এসব আত্মহত্যার আদিখ্যেতা কিন্তু সকলের নেই। যাদের ব্লাউজের বগলে পরিশ্রমের গন্ধ লেগে থাকে, কাঁধে থাকে দায়িত্ব সচেতনতার জোয়াল, যারা বোঝে জেতা–হারার টুকরোগুলো দিয়ে তৈরি হয় জীবনের কোলাজ, তারা এভাবে মরে না। তাদের হাত ফ্যাকাসে হয় ক্ষারে, তাতে কড়া পড়ে, চুলোতে সেকা হয় তা, তারা এভাবে পালায় না।
আসলে, আমরা কেউ আত্মহত্যা করতে চাই না। তবু যে কেউ কেউ, হঠাৎ হঠাৎ, কোনও এক বিচিত্র সামান্য অছিলায় হারিয়ে যায়, টুপ করে খসে পড়ে কাউকে কিচ্ছুটি বুঝতে না দিয়ে, তার কারণ একটাই। তারা হঠাৎ কোনও ধাক্কার কাছে হার মানে। মুহূর্তকে অনন্ত ভেবে নেয়। ক্লান্তিকে যোগ করে দেয় সমর্পণের কাছে। আর, তারই জেরে, জীবনকে সঁপে দেয় মৃত্যুর আঁচলে। আত্মহত্যা আসলে একটা ক্ষণিক ইচ্ছে। সেটাকে টেনে লম্বা করে জড়িয়ে নিলেই মুশকিল। বাতিকগ্রস্তরাই এমনটা করে।
‌এমিলি ড্রুকহেম আত্মহনন নিয়ে গভীরে ভেবেছেন। আর সেই চিন্তন প্রক্রিয়ার সুবাদে তাঁর কলমে উঠে এসেছে একটা অনবদ্য দৃষ্টান্ত। সেই দৃষ্টান্তের আশ্রয়ে মোক্ষমভাবে চিনে নেওয়া যায় হননেচ্ছুর মানসিকতা এবং তাকে বাঁচানোর সুলুক, যুগপৎভাবে।
ভয়ানক বিপদ–সম্ভাবনার ক্রমাগত চিন্তা মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার বীজ বোনে, লিখেছেন এমিলি। সে বিপদ আদৌ আসবে কি না, তার ঠিক–ঠিকানা নেই। কিন্তু তার সম্ভাবনার কথা কল্পনায় ক্রমাগত ঘাই মেরে মেরে বাঁচাটাকে অস্থির করে তুলতে পারে। এমন আপদসঙ্কুল সময়ে কোনও কোনও মানুষ মৃত্যুকেই অনিবার্য আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করে। এমনই মরার বাতিকে ত্রস্ত এক ব্যক্তি ভেবেছিল জলে ঝাঁপ দিয়ে মরবে। অপেক্ষমাণ বিপদের কল্পনা তাকে ঠেলে পাঠিয়েছিল এক নদীর কিনারায়। নদীটা যে অগভীর, সেটা লোকটার ভালমতোই জানা ছিল। তবু, অবচেতনের এক বিচিত্র ইশারায়, সেই নদীতেই ঝাঁপ দেবে বলে মনস্থ করে লোকটি। দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল এক কাস্টমস অফিসার। লোকটা তখন ডুবে মরার মতো গভীর জল খুঁজছে। অফিসার চিৎকার করে উঠল, ‘‌উঠে এসো এখুনি নদী থেকে, নয়তো তোমাকে আমি গুলি করে মারব।’‌ লোকটার দিকে বন্দুক তাক করে অফিসার, আর লোকটা?‌ যে কি না জলে ডুবে মরতে গিয়েছিল সে গুলি খেয়ে মরার ভয়ে সুড়সুড় করে নদী থেকে উঠে বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
আসলে, এটাই হয়। আত্মহত্যার ইচ্ছে একটা তাৎক্ষণিক বাসনা। ঘোর কাটলেই ওসব ইচ্ছে–টিচ্ছের মেঘ সরে গিয়ে জীবনের দাপুটে রোদ্দুর। স্রেফ ওই ঘোরটুকু, সাময়িকভাবে দানাবাঁধা ইচ্ছেটাতে একটা জোর ধাক্কা মারা দরকার। একবার ঘোরলাগা মানুষটাকে নাড়িয়ে তার সংবিৎ ফিরিয়ে আনা দরকার। ব্যস!‌ এইটুকুই। এটুকু করলেই আত্মহননেচ্ছুকে মৃত্যুর স্যাঁতসেঁতে উপত্যকা থেকে টেনে আনা যায় চলতি জীবনের ঝলমলে ডাঙায়। আর, একবার ফেরত আনতে পারলেই কেল্লা ফতে। তখন আর মৃত্যুর কোনও জারিজুরি খাটে না। ডানায় বাতাস খুঁজে নিয়ে ফের উড়ান প্রাণের। মৃত্যুর মুষড়ে পড়া তখন অনিবার্য।
ইঁদুরদৌড়ে ব্যর্থ হয়ে আত্মহননে নিবিড় শান্তির খোঁজ করে অনেকেই। বিশেষ করে, ফিল্মি দুনিয়ার তারকারা। এমন–কি রাজনীতির জগতের লোকরাও।
আর কী আশ্চর্য!‌ এই আত্মঘাতীদের তালিকায় বেশিরভাগই মহিলা।
যেমন বিতস্তা সাহা, প্রত্যুষা ব্যানার্জি, জিয়া খান এবং অবশ্যই, সুপ্রিয়া দে। বিতস্তা, প্রত্যুষারা একই সঙ্গে জোড়া ফাঁদে আটকেছিল। চেয়েছিল ঝকঝকে কেরিয়ার। কিন্তু অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতিলাভ সত্ত্বেও ব্রেক পাচ্ছিল না সেভাবে। সেই সঙ্গে জীবনের কার্নিসে উড়ে এসেছিল অবৈধ প্রেম। কেরিয়ার আর সম্পর্ক, দুয়ের নিজস্ব টানাপোড়েনে হোঁচট খেতে খেতে শেষে দু‌জনেই মৃত্যুর প্যাঁচার ঠোঁটে তুলে দিয়েছিল ইঁদুর–‌জীবনের পরিণতি। জিয়া খানও নিজেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল সিলিং ফ্যান থেকে, দড়ি দিয়ে। মৃত্যুর চারদিন পর ওই ঘর থেকে পাওয়া গিয়েছিল তার সুইসাইড নোট। জিয়ার বোন কবিতা উদ্ধার করে সেটা। সেখানেও ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্লান্ত এক প্রাণের নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বাসনা–‌বিলাস।
আর সুপ্রিয়া দে?‌ নদীয়ার কুপার্স ক্যাম্পের পুরসভা নির্বাচনে ১ নং ওয়ার্ডের নির্দল প্রার্থী। এলাকায় জনপ্রিয়। কিন্তু দলীয় প্রতীকে দাঁড়াতে পারেননি। টিকিট না–‌পাওয়ার ক্ষোভ তো ছিলই। তার সঙ্গে, কেকের ওপর আইসিংয়ের মতো জুটেছিল ভোটে সামান্য ব্যবধানে হার। নিজের দলের কর্মীরাই পরাজিত নির্দল প্রার্থীকে টিটকিরি দিয়েছিলেন। তারই অভিঘাতে ঘুমের বড়ি খেয়ে মরেছিলেন সুপ্রিয়া।
ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণে সমাজতাত্ত্বিক কারণগুলো অন্বিত হয়ে এভাবেই বেসামাল করে দেয় অতিসংবেদনশীল নারীহৃদয়কে। তারা মরে যায়। ইচ্ছে করে হারিয়ে যায় মরণের শূন্যতায়।
তবু, তবুও, এসব ব্যতিক্রমী ঘটনা। অধিকাংশ নারীই ব্যক্তিচেতনা আর সামাজিক চাহিদাগুলো সামলে বাঁচিয়ে রাখে নিজেকে, নিজের চারপাশকেও, স্রেফ আপন মেহনতে। প্রতিদিন তারা মুছিয়ে দেয় গেরস্থালির চোখ, অনামিকায় ফোটায় আশ্বিন। আমাদের মা, মাসি, দিদা, ঠাম্মারা, আমাদের বোন, বান্ধবী, প্রেমিকারা, আমাদের কাজের মাসি, রাঁধুনি–দিদিরা— এভাবেই প্রবহমান থাকেন, যতদিন না মৃত্যু বয়স কিংবা অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার নখরামিতে তাঁদের জীবনে শেষ আঁচড় টেনে দেয়।
এঁরা নিজেরা বাঁচেন এবং বাঁচিয়ে রাখেন তাঁদের আত্মীয়–‌বান্ধবদের। কারণ, এঁরা হাত ধরে চলতে জানেন, হেরে যাওয়ার দুঃখটাকে ভাগ করে নিতে জানেন আর জানেন, জীবন এক অতি দুর্লভ প্রাপ্তি। তাকে যত্ন করে লালন করতে হয়।
হেরে গিয়েছ?‌ তাতে কী হয়েছে?‌ প্রিয়জনের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদো। ঝরিয়ে ফেল যাবতীয় বিষাদচেতনা।
ভীষণ একা লাগছে?‌ তাতে কী হয়েছে?‌ নিরন্তর কথা বলে চলো চেনা–অচেনা নির্বিশেষে চারপাশের সঙ্গে। উগরে দাও যাবতীয় নৈসঙ্গ।
শুধু মৃত্যুকে ঘেঁষতে দিও না চারপাশে। শীতের শেষে গাছের ন্যাড়া ডালপালার ভেতর দিয়ে সাফল্যের চাঁদের জ্যোৎস্না গায়ে মেখে নেওয়ায় যেন খামতি না হয়। ব্যর্থ ভালবাসাগুলোকে দলা পাকাতে দিও না গলার ভেতর।
মৃত্যুর খাদে দাঁড়ানো মনকে জীবনের রোজনামচায় টেনে আনার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
কিন্তু এই ব্যর্থতাবোধের বাইরেও আছে দু–‌দুটো বিষয়, যা জীবনকে মরণমুখী করতে পারে বিলোল ন্যাকামির ইশারায়। সে দুটো বিষয় হল— অতি–‌অভিমান আর অতি–প্রশান্তি। দুটো যেন একই মুদ্রার দুটো পিঠ। টস করলে ঘুরপাক খেতে খেতে একটা পিঠ পড়বেই। আর তাতেই অনিবার্য হয়ে ওঠে মৃত্যুর জিত। কিংবা, বেঁচে থাকার ইচ্ছের হার।
এই অতি–অভিমানেই জীবনের অন্তিম আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলেন শ্রীরাধিকা। কৃষ্ণ–‌বিরহিণী রাইকিশোরী প্রাণপ্রিয়র বেণুধ্বনি শুনতে শুনতে স্বেচ্ছায় দেহত্যাগ করেছিলেন। কৃষ্ণহীন জীবন কৃষ্ণগতপ্রাণার কাছে অর্থহীন বোঝামাত্র। কৃষ্ণের হ্লাদিনীশক্তি তিনি। সেই কৃষ্ণ যদি তাঁর আহ্লাদের উপায় অন্যত্র খুঁজে নেন তবে আর আরাধিকা রাধিকার বেঁচে থেকে কী লাভ!‌
ক’‌দিন আগে গোয়ালাপাড়ায় রুমি বলে যে মেয়েটা গলায় দড়ি দিল কিংবা আমাদের আগের পাড়ার ঝুমা বৌদি ফলিডল খেল, সে–ও তো ওই অতি–অভিমানের বশেই। প্রিয় হারানোর আকুলতায়।
এরই বিপ্রতীপে রয়েছে অতিপ্রশান্তি।
জৈন ধর্মে রয়েছে এই অতিপ্রশান্তি থেকে জাত জীবন–নিরাসক্তির প্রসঙ্গ। সে হল সল্লেখনা সাধনা। ‘‌রত্নকারণ্ড প্রবকচারা’‌ গ্রন্থে ব্যাখ্যাত হয়েছে এই সাধনার অধিকারীদের যোগ্যতামান। রোগে কিংবা বয়সের ভারে জীর্ণ যাদের শরীর, যারা জীবনের ধর্মপালনে একান্ত অক্ষম, তারাই, কেবল তারা এই সাধনার সাধক বা সাধিকা হতে পারে। অনিবার্য মৃত্যুর দিকে তাড়াতাড়ি এগোনোর তাগিদে সে প্রথমে ছাড়বে কঠিন খাদ্য। তারপর খাবে দুধ, তারও পর স্রেফ গরম জল পান। এরপর সেটাও বন্ধ। নিরন্তর পঞ্চমন্ত্র জপ। কেবল বন্ধুরা আমায় মনে রাখুক, এই ইচ্ছাটুকু নিয়ে আগামী জীবনে মনকে লেপ্টে দেওয়া।
শ্রীরামচন্দ্র এমন সল্লেখনার সাধক ছিলেন না। তবু, তবুও, অতিপ্রশান্তির বশেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজেকে উৎসর্জনের পথ। যেভাবে বাস্তুসাপ খোলস ছাড়িয়ে মাঠে আসে, যেভাবে হিচ–হাইকার অবসন্ন বোধ করলে ফেলে দেয় বাড়তি রসদ, যেভাবে খসে পড়ে ব্যাঙাচির লেজ, কিংবা আকাশে আরও ওপরে ওঠার তাগিদে বেলুন–কেবিন থেকে বালির বস্তা ফেলে দেওয়া হয়, ঠিক সেইভাবে, শুধুমাত্র চেতনাকে সম্বল করে জীবনতৃপ্ত রামচন্দ্র রাজ্যসিংহাসন ছেড়ে ডুব দিয়েছিলেন সরযু নদীর জলে। আর ওঠেননি। কারণ, তিনি আর ফিরতে চাননি।
শ্রীরাম থেকে শ্রীমতী রাধিকা যাই–ই করুন না কেন, আমাদের সাধারণ জীবনের সতত অবলম্বন লক্ষ্মীর পাঁচালির হুঁশিয়ারি:‌ ‘‌আত্মহত্যা মহাপাপ, নরকে গমন।’‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top