মীনাক্ষী দত্ত:

‌৪ঠা আগস্ট, ১৯৯৮। টোকিওর একটা হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে শিরিঙ শেরপা। সে আঁকড়ে আছে এই আশা যে তার স্বামী সোনম ছেরিঙ শেরপা কোমা ভেঙে জেগে উঠবে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখানে কত উন্নত!‌
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ক্রু’‌‌র স্টুয়ার্ড ও পার্সার তার স্বামী। বম্বে থেকে টোকিও নিত্য যাতায়াত। স্টপ ওভারে হোটেলে ডিনারের পর হাঁটতে বেরিয়েছিল, পেছন থেকে একটা গাড়ি এসে ধাক্কা মারে। সেই থেকে সে হাসপাতালে কোমায়। শিরিঙ নিজেও এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মী, গ্রাউন্ড স্টাফদের একজন। খবর পাওয়ামাত্র বোনঝির কাছে দুই ছেলেকে রেখে চলে গেল টোকিও। তারপর থেকে চলেছে তার স্বামীর জ্ঞান ফেরার জন্য প্রতীক্ষা। জাপান তো!‌ মহাকাশ যুগের হাসপাতাল যন্ত্রের মতো চলে, নৈর্বক্তিক ব্যবস্থা, কিন্তু সে ভাষা বোঝে না তার শুধু বিছানার পাশে বসে ব্যাকুল অপেক্ষা। অবশেষে, দশ দিন বাদে ডাক্তাররা বললেন, দুঃখিত। কিছু করা গেল না।
এয়ার ইন্ডিয়া ও ভারতীয় অ্যাম্বাসির প্রযত্নে সে চলল স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে দিল্লি হয়ে বাগডোগরা পৌঁছে গাড়ি নিয়ে দার্জিলিঙে। সে হয়ে গেছে পাথর। বুকে টিপটিপ করছে একটাই চিন্তা— সোনমকে নিয়ে তার মা–‌বাবার বাড়িতে ঠিকমতো পৌঁছতে পারবে তো!‌
শিরিঙ কালিম্পঙের মেয়ে, সোনম দার্জিলিঙের এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে। শিরিঙের বাবা গিয়ালৎসিঙ ছিরিং শেরপা কাজ করতেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এসআইবি–‌তে (‌সাবসিডিয়ারি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো)‌। মা এভারেস্টের পাদদেশে শোলাখুম্বু গ্রামের মেয়ে। কালিম্পঙে পড়াশশোনা করতে এসে ভাবী স্বামীর দেখা পেয়েছিলেন।
বৌদ্ধ রীতিতে ৪৯ দিন শোক পালন। শিরিঙের মা–‌বাবা চলে এলেন তার দুই ছেলেকে নিয়ে, বড়জন সাত–‌সাড়ে সাত, নাম নরবু। ছোটজন তিন–‌সাড়ে তিন, নাম সাঙ্গে। শিরিঙ সঙ্কল্প করল, এই দার্জিলিঙেই সে মানুষ করবে ছেলেদের, তাদের বাবার বাড়িতে ঠিক বাবার মতো শৈশব কাটাবে তারা, সেই মাটি, সেই স্কুল সেই বাড়ি। শিরিঙ চাকরি ছেড়ে দেবে, তার জীবনে আর কিছু থাকবে না, সব সঁপে দেবে সোনমকে। এক বান্ধবীর হাতে দিয়ে দিল এরিয়া ইন্ডিয়ার দপ্তরে দেওয়ার জন্য তার পদত্যাগপত্র।
কিন্তু তার শোকের পাথর ভেদ করে ক্রমে‌ই উঁকি দিতে লাগল একটা অস্বস্তি। বাইরের জগৎ যতটা সে উপলব্ধি করে, তাতে মনে আসে একটা সংশয় ও সন্দেহ। কোনও পারলৌকিক ক্রিয়াকরমে তাকে অংশ দেন না শ্বশুরবাড়ির লোকেরা, ডাকেন না কোনও আচার–‌অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ৪৯ দিন শোক পালনের পরের ক্রিয়াকর্মে কী করা হবে তার পারিবারিক মিটিংয়ে শিরিঙের অংশ নেই। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম তো আছেই, অর্থনৈতিক দিকও একটা আছে। শিরিঙ জানতে পারল যে শ্বশুর–‌শাশুড়ি এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়ার জন্য বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের টাকা এবং অন্যান্য প্রাপ্য তাঁরা দাবি করেছেন, সেই সঙ্গে দ্বিতীয় পুত্রের জন্য কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ডে চাকরি। শিরিঙের মা–‌বাবাকে আত্মীয়স্বজন উপদেশ দিচ্ছেন, মেয়ে ও নাতিদের নিয়ে কালিম্পঙ চলে যেতে ও মেয়ের আবার বিয়ের জন্য চেষ্টা শুরু করতে।
দাহ‌র পরে চিতাভস্ম ও ছাতু মিশিয়ে বৌদ্ধ পুরোহিতরা ছোট ছোট মন্দির আকৃতির পিণ্ড বানান যা বিসর্জন দেওয়া হয় নদীতে। পারলৌকিক ক্রিয়ার সেটা একটা জরুরি অংশ। শিরিঙ যখন তাতেও ডাক পেল না, তখন দুটি পিণ্ড, চুরি করে এনে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখল। নদীতে স্বামীর অস্থি বিসর্জনে হয়ত তার ডাক পড়বে না।
তার আশঙ্কা সত্যি হল। তাকে বাদ দিয়েই হয়ে গেল বিসর্জন অনুষ্ঠান। সোনমের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে দুই ছেলেকে মানুষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে, বদলাতে হল সেই সিদ্ধান্ত। মা–‌বাবার কাছে কালিম্পঙে ছেলেদের রেখে সে গেল নেপালে ও কাশীতে সেই লুকিয়ে রাখা‌ অস্থি বিসর্জন দিতে হিমালয়ে ও গঙ্গায়। 
এবার আবার বম্বে। তার দূরদর্শী, বিজ্ঞ বন্ধু এয়ার ইন্ডিয়ায় জমা দেননি পদত্যাগপত্র।  চাকরি বজায় আছে, আছে সেই হাউজিং সোসাইটির ফ্ল্যাটও। শিরিঙের নতু সঙ্কল্প, জীবনের এভারেস্ট সে জয় করবে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কোলে প্রায় কার্শিয়াঙের উচ্চতায় পাঁচগণি তার বোর্ডিং স্কুলের জন্য বিখ্যাত। সেখানে পাঠাল বড় ছেলে নরবুকে। সঞ্জীবনী হস্টেলে। সমস্যা ছোট ছেলে সাঙ্গে। তার প্রবল হাঁপানি। তাকে হস্টেলে পাঠানো যায় না। তাকে নিজের কাছে রেখেই চাকরি চালাতে হবে। তার জন্য বহাল করল একজন দক্ষ সেবিকা। নিজের কাজে তাকে উন্নতি করতে হবে, হতে হবে তন্নিষ্ঠ। স্বামীর ক্ষতিপূরণের টাকার ২৫ শতাংশ শ্বশুর–‌ শাশুড়িকে দিয়ে বাকিটা ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিটে রাখল। ছেলেদের ভবিষ্যতের জন্য। 
আমার ছেলে গোগো ও তার স্ত্রী কেসাঙের সঙ্গে তার হঠাৎই আলাপ হয়েছিল বম্বে এয়ারপোর্টে বছর সাতেক আগে। সিকিম–‌কন্যা কেসাঙ ও কালিম্পং কন্যা শিরিঙের বন্ধুত্ব হয়েছিল প্রথম দর্শনেই। আমার সঙ্গে পরিচয় যখন, সে দুই ছেলেকে নিয়ে আমেরিকায় আমাদের বাড়িতে এসে উঠল। ঘনিষ্ঠ হলাম যখন সে নিউ জার্সির নেওয়ার্ক (‌New‌ark)‌ এয়ারপোর্টে স্টেশন ম্যানেজার হয়ে এল। আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে অফ ডে কাটাতে আসে শিরিঙ। অফ ডে‌?‌ একে যদি অফ ডে বলা হয়, তবে কাজের দিন কী?‌ তার ফোন বেজেই চলেছে দিবারাত্র। প্রতিটি ফ্লাইট শিরিঙের দায়িত্ব। প্যাসেঞ্জার, কারগো, ক্রু, রিসেপশন, ইমিগ্রেশন, ডিপোর্টেশন এবং প্রতিটি অনুপুঙ্খের ভার তার ওপর। শিরিঙ বলে, 'Good, bad ‌বা indifferent-Air I‌ndia Newark is me‌. 
‌মসৃণ ত্বক ঈ‌‌ষৎ হলুদ মেশানো, ছিপছিপে, মধুর মুখশ্রী আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পঙের সুন্দর প্রতিনিধি শিরিঙ শেরপা। আনন্দিত, উচ্ছল তার ব্যক্তিত্ব। তার মুগ্ধ অনুরাগী পুরুষের অভাব আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু তারা কেউ সোনম শেরপা নয়, মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে যে চলে গেছে। ১৩ বছরের বিবাহিত জীবনের পর। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স থেকে শিরিঙ নিবেদিতপ্রাণ দুই ছেলেকে মানুষ করার জন্য অন্য কোনওদিকে সে তাকায়নি। যেমন সে সফল চাকুরে, তেমনি সে সফল মাতা। কেরিয়ার আর মাতৃত্ব একটা–‌অন্যটার বিকল্প নয়। সে ২৪ ঘণ্টার মা, ২৪ ঘণ্টার চাকুরে। 
শিরিঙ মনস্থ করেছিল ছেলেদের পাইলট করবে। নরবুকে পাঠিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার ফ্লাইং স্কুলে। তার খরচ সে দিয়েছি ছেলের বাবার ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে, কারুর কাছে হাত পাততে হয়নি। নরবু পাস করেই চাকরি পেয়েছে জেট এয়ারওয়েজে। সাঙ্গে গেছে ফ্লোরিডার ফ্লাইং স্কুলে। তারপর নিচ্ছে বোয়িং চালানোর জন্য বিশেষ কোর্স। তার জন্য ২২ লাখ টাকা শিরিঙ দিয়েছে নিজের জমানো টাকা থেকে। বড় ছেলেকে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে, কারণ সে বিয়ে করবে। তার প্রেমিকাও পাইলট, একই এয়ারলাইন্সে কাজ করে দুজনে। 
টাকা জমানো ও ব্যয়ের তার আছে এক বিশেষ শৃঙ্খলা। অনেকে, বিশেষত আমি, সারাজীবন চাকরি করেও কিছুই জমাতে পারিনি। ঝোঁকের মাথায়, আবেগের বশে অনেকে টাকা উটকো খরচ করি। শিরিঙের মাথায় আছে একটা সজাগ অ্যাকাউন্টিং। তার বন্ধুরা অনেক সময় ভাবে খরচের ব্যাপারে সে নিতান্ত অনুদার। আসলে সে তার লক্ষ্য ঠিক করে, লাইন ধরে চলে। একটুও এদিক–‌ওদিক করে না। পাইলট জননীই বটে। 
আমি যে শিরিঙ শেরপাকে চিনি, তার পাঁচ আঙুল আলাদা নয়, অঞ্জলিবদ্ধ। দিতে সে ঠিকই জানে। আমাকে সে কত উপহার দিয়েছে— শাড়ি, শাল। কেসাঙকেও ভারত থেকে এনে দিয়েছে বাছাই করা পোশাঙ। কস্টিউম জুয়েলারি। সে যখন দেয়, তা একটা ভাব বহন করে। একটা ভাষা। আহা, বাংলার আবেগপ্রবণতার সঙ্গে পাহাড়ের এই শেরপা‌–‌শক্তি মিলিত হোক। 
কেসাঙ আর তার পাহাড়ি বন্ধুদের দেখি— একদিকে তারা কাজেকর্মে, শৃঙ্খলায়, পরিশ্রমে পশ্চিমি, অন্যদিকে সৌজন্যে–‌বিনয়ে, বয়স্কদের প্রতি মনযোগে, সেবায়, পারিবারিক জীবনের নৈপুণ্যে প্রাচ্য ট্র‌্যাডিশনাল, এমনকি অনাধুনিক। আমার দুই নাতিই বিবাহযোগ্য হতে চলেছে। তাদের মগজধোলাই করার চেষ্টা করি এই বলে, ‘‌যতই ‘‌ডেট’‌ করো, বিয়ে কিন্তু করতে হবে পাহাড়িনীকে’‌। 
নেপালি, তিব্বত, সিকিম, কালিম্পং দুহিতারা মার্কিনি পোশাকে, আচারে–‌ব্যবহারে অনায়াসে মিশে যায়। তারা পাব–‌এ যাচ্ছে, নাচতে যাচ্ছে, খাদ্য–‌পানীয়তে কোনও ইনহিবিশন নেই। অথচ কী পরিপাটি নিপুণ গৃহকর্ম। 
কিন্তু তার মধ্যেও বিশেষ শিরিঙ শেরপা। সে যথন তার দুই পাইলট ছেলেকে নিয়ে আমার সামনে দাঁড়ায়, ভাবি, একেই তো বলে এভারেস্ট বিজয়ী। ‌‌‌‌■

 

চেয়ারে বসে শিরিঙ শেরপা।তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে বড় ছেলে নরবু, পেছনে প্রেমিকা সিমরন। বাঁ পাশে ছোট ছেলে সাঙ্গে।

জনপ্রিয়

Back To Top