দেবর্ষি সারগী: এই ওঠ!‌ মাঝরাতে মা ঝাঁকানি দিয়ে আমাকে ঘুম থেকে তুলল।
আমি উঠে বসলাম। চৈত্রের মাঝামাঝি। গরমে ঘুম এমনিই পাতলা হয়। তাছাড়া রাত পর্যন্ত পরীক্ষার পড়া করছিলাম বলে ভাল করে ঘুম আসেওনি।
রেবাদের বাড়িতে কোনও খুনি ঢুকেছে!‌ মা বলল চাপা গলায়।
আমি অবাক হলাম। মায়ের দু’‌চোখে গাঢ় ছানি— বাড়ির জিনিসই ভাল করে দেখতে পায় না, তা এই রাতের বেলায় সামনে থাকা রেবাদির দোতলা বাড়িতে কেউ ঢুকেছে কী করে দেখতে পেল?‌
কী করে বুঝলে?‌ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
গন্ধ শুঁকে। আমার নাকে খুনিটার গায়ের গন্ধ এল।
আমি চুপ করে তাকিয়ে থাকলাম মায়ের মুখের দিকে। চোখের ঘোলাটে মণিদুটো নাইটল্যাম্পের আলোয় একজোড়া সাদা ঝিনুকের মতো দেখাচ্ছিল। আমার বাবা খুন হওয়ার সময় মা খুব কাছ থেকে খুনিকে দেখেছিল বলেই হয়তো খুনিদের চিরকালের জন্য চিনে ফেলেছে। ওদের গন্ধও হয়তো নাকে পায়। এরকম হওয়া সম্ভব কিনা জানি না।
খাট থেকে নেমে আমি জানলার সামনে দাঁড়িয়ে রেবাদির বাড়ির দিকে তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গে রেবাদির বাড়ির দোতলার জানলাটা বন্ধ হয়ে গেল। দুটো হাত বাইরে বেরিয়ে এসে জানলাটার পাল্লাদুটো ভেতরের দিকে টেনে নিল, যেন কোনও অতিকায় কালো পাখি নিজের ডানা বন্ধ করে কাউকে শরীরের ভেতর লুকিয়ে ফেলল। কোনও মুখ আমি দেখতে পাইনি— শুধু দুটো হাত ছাড়া।
লোকটা জানলা বন্ধ করে দিল, আমি বললাম মাকে।
লোকটাকে দেখতে পেলি?‌
না, শুধু হাত দেখলাম।
আমি দেখতে পেয়েছি। ওর মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা।
আমি আবার অবাক হয়ে তাকালাম মায়ের ধূসর চোখদুটোর দিকে। কী করে দেখল কে জানে!‌
যাই হোক, রেবাদির বাড়িতে যে কেউ একজন ঢুকেছে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। রেবাদি থাকে দাদা ও বৌদির সঙ্গে। একটা নার্সিংহোমে নার্সের চাকরি করে। গত সপ্তাহে ওর দাদা ও বৌদি পুরী বেড়াতে গিয়েছে। বাড়িতে রেবাদি একা।
আমার বুক ধক ধক করতে লাগল।
হেদুয়ার কাছে মদন মিত্র লেনে একটা সরু গলিতে আমরা থাকি। আশপাশে একতলা, দোতলা, তিনতলা পুরনো বাড়ি। সবই নিজেদের। ফ্ল্যাট এখানে কম।
মা দাঁড়িয়ে পাথরের মূর্তির মতো। কোলের কাছে হাতদুটো জোড়া করে। মুখে ভরাট, নিস্পন্দ উদ্বেগ। মায়ের বুকের ভেতরও হয়তো ধক ধক করছে। আমি রেবাদির বন্ধ জানলাটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
বাবলুদার কাছে যাব?‌ মাকে জিজ্ঞেস করলাম।
তোর বাবাকে খুন করেছিল এভাবেই মাঝরাতে বাড়িতে ঢুকে। তোর বয়স তখন আড়াই।
বাবলুদার কাছে যাব?‌
ওটা ছিল শীতের রাত, মা বলল।
বলছি, বাবলুদার কাছে যাই।
আমি চেঁচাতেও পারিনি, মা বলল। কারণ ঘরে ঢুকেই আমার মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল।
আমি বাবলুদাকে ডেকে তুলি, অস্থির হয়ে বললাম। তুমি দরজা বন্ধ করে দাও।
আমার সৌভাগ্য, আমার চোখেও ওরা কাপড় বেঁধে দিয়েছিল, মা বলল। ফলে চোখে দেখতে হয়নি।
আমি দরজা খুলে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নিচে নেমে গেলাম। বাবলুদার বাড়ি চারটে বাড়ির পরেই। পাড়ায় দাদা গোছের লোক বাবলুদা। ক্ষমতাবান। রাজনীতিও করে। ওদের বাড়ি একতলা। রাস্তা থেকে ওর শোবার ঘরের ভেতরটা দেখা যায়। গরম বলে জানলা খোলা। পর্দা সরিয়ে দেখলাম খাটের ওপর একটু মোটাসোটা কিন্তু স্বাস্থ্যবান বাবলুদা হাঁ করে ঘুমোচ্ছে।
বাবলুদা!‌ আমি ডাকলাম। আস্তে করে, কারণ জোরে ডাকতে ভয় করছিল। বাবলুদাকে পাড়ার সবাই সমঝে চলে। আমি তো ভয় পাই। সামনে পড়লে মুখ নামিয়ে নিই। আমার সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় কখনওই বলে না।
বাবলুদা!‌ আমি ডাকলাম।
বছর পঁয়ত্রিশের লোকটা নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। হয়তো গরমে বেশি ভাল ঘুমোয়। লুঙ্গিটা অনেকটা উঠে গিয়েছে। হাওয়া লাগবে বলে বাবলুদা হয়তো নিজেই ওটা এতটা তুলে রেখেছে। ঘরে হালকা আলো জ্বলছে।
বাবলুদা!‌ এবার জোরে ডাক দিলাম। এবং আমার বুকের ভেতর আরও জোরে জোরে ধক ধক করতে লাগল।
বাবলুদা চোখ খুলল। লুঙ্গিটা একটু নামিয়ে দিল। তারপর আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে স্থির তাকিয়ে থাকল, যেন একটা চড় মেরে ওর ঘুম ভাঙিয়েছি।
কে তুই?‌
আমি নাম বললাম। তারপর জানালাম পাশেই থাকি— সাতের দুই বাড়িতে।
আরও কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বাবলুদা আমার দিকে, তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
বাবলুদা!‌ আমি আবার ডাক দিলাম।
বাবলুদা চোখ খুলল।
কে তুই?‌
আমি আবার নাম বললাম, তারপর তাড়াতাড়ি জানালাম রেবাদির বাড়িতে কোনও লোক ঢুকে পড়েছে, মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা, আর ওর দাদা–বৌদিও বাড়িতে নেই।
কে রেবা?‌ বাবলুদা জিজ্ঞেস করে।
ওই তো— আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে দোতলায় থাকে। নার্সের চাকরি করে।
বাবলুদা কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল ঘুমমাখা দৃষ্টিতে, তারপর আবার চোখ বুজল।
তুমি একটু চলো, বাবলুদা!‌ মরিয়া গলায় আমি বললাম। রেবাদি একা আছে। ওর দাদা–‌বৌদি পুরী গিয়েছে।
বাবলুদা ঘুমিয়ে পড়েছিল।
বাবলুদা!‌ আমি প্রায় চেঁচিয়ে ডাক দিলাম। বাবলুদা চোখ খুলল, তারপর তড়াক বিছানা থেকে নেমে জানলার কাছে এসে রেগে বলল, ভাগ এখান থেকে!‌ রাতদুপুরে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে লোকের ঘুম ভাঙানো হচ্ছে?‌ কী নাম বললি তোর?‌
আমি আবার নাম বললাম।
ঠিকানা বল।
আমি জানালাম।
দাঁড়া, কাল যাচ্ছি তোর কাছে— মজা দেখাচ্ছি!‌ বলে একটা অশ্রাব্য গাল দিয়ে পর্দা নামিয়ে বাবলুদা ঘরে গেল জানলা থেকে। তারপর পর্দাটা আবার তুলে বলল, কাল সকালে তুই–‌ই এসে দেখা করবি আমার সঙ্গে। ক্লাবঘরে। দশটার পর। মনে থাকবে?‌
ঘাড় দুলিয়ে জানালাম যে মনে থাকবে। মুখ ঘুরিয়ে রাস্তায় পা দিয়ে ভাবতে লাগলাম এবার আমার কী করা উচিত, আর কার কাছে যাওয়া উচিত। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাড়ি ফিরে মাকে জানালাম বাবলুদা শুনল না। ওর ঘুমই ভাঙল না ভাল করে। উল্টে আমার ওপর রেগে গেল।
মা জানলার দিকে মুখে করে নিস্পন্দ তাকিয়ে। রেবাদির জানলা তো বন্ধ। তবু মা হয়তো দেখতে পাচ্ছিল রেবাদির বাড়ির ভেতরটা। খুনিটার গায়ের গন্ধ হয়তো নাকে পাচ্ছিল। রেবাদির বাড়ির নিস্তব্ধতা আমাকে আতঙ্কিত করছিল। কোনও সাড়াশব্দই নেই। রেবাদির গলারও কোনও আওয়াজ নেই। পাড়াটাও নিঝুম। রাত আড়াইটে বাজতে দশ মিনিট বাকি।
কী করি মা?‌ আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম।
মা কোনও উত্তর দিল না।
কী করি বলো?‌ কী করি?‌ কী করি এখন?‌
ধূসর, ছানিপড়া দৃষ্টিতে মা তাকিয়ে থাকল রেবাদির বাড়ির দিকে। আমাদের পাখা ঘোরার বনবন শব্দ কানে বাজছিল। দেওয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ কানে বাজছিল। মাঝে মাঝে চৈত্রের দমকা হাওয়া ভেসে যাওয়ার শব্দ কানে বাজছিল। এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। চারপাশ নিঝুম।
হঠাৎ আমিই বিকট শব্দ সৃষ্টি করলাম। জানলার কাছে এগিয়ে আমি চেঁচিয়ে বলতে লাগলাম— রেবাদির বাড়িতে কেউ ঢুকেছে— রেবাদির বাড়িতে কেউ ঢুকেছে— শুনছেন— রেবাদির বাড়িতে কেউ ঢুকে পড়েছে!‌
একটু দম নিয়ে আমি একনাগাড়ে চেঁচিয়ে বলে যেতে লাগলাম, উন্মাদের মতো, যেন রেললাইনে আমার পা আটকে গিয়েছে, দূরে ট্রেন আসছে, আর আমি সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে চলেছি!‌
কেউ কোনও সাড়া দিল না। নিজেদের বাড়ি থেকে কেউই বেরিয়ে এল না।
এরপর আমি সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় নেমে চেঁচিয়ে গেলাম, এ–‌গলি থেকে ও–‌গলিতে ঢুকে, জোরে জোরে হাঁটতে হাঁটতে। আমার চিৎকারে ছুঁচোরা দৌড়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল, কুকুররা ঘেউ ঘেউ করতে লাগল, একটা বেড়াল রাস্তা পার হচ্ছিল— হঠাৎ থেমে পড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে।
আবার চারপাশ শান্ত। রাস্তা একদম ফাঁকা। জোরে জোরে হেঁটে এভাবে একনাগাড়ে চিৎকার করার জন্য আমার হাঁফ ধরে গিয়েছিল। কিন্তু তবু তো চিৎকার করা দরকার, সবাইকে জানানো দরকার। একটু দূরে একটা লাল ইটের শক্তপোক্ত তিনতলা বাড়ি— একজন উকিলের। তিনভাই মিলে সপরিবার থাকে বাড়িটায়। দ্বিতীয় ভাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। তৃতীয় ভাইটা কী করে আমার মনে পড়ল না। কী করে যেন ওই ভাইটা?‌ কী করে যেন?‌ যাই করুক, আমি ভাবলাম একজন তো উকিল, ওঁর নিশ্চয়ই থানা–পুলিস জানা আছে, উনি সাহায্য করতে পারেন। বাড়িটার দিকে মুখ করে আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম— শুনছেন?‌ রেবাদির বাড়িতে কেউ ঢুকে পড়েছে— রেবাদি একা— ওর দাদা–‌বৌদি বেড়াতে গিয়েছে!‌ শুনছেন?‌ রেবাদির বাড়িতে কেউ ঢুকেছে!‌
বাড়িটা স্তব্ধ পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকল।
ভাবলাম আমার একাই ঢোকা উচিত রেবাদির বাড়িতে। রাস্তা পার হয়ে কয়েক পা হেঁটে রেবাদির বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি গেটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এটা তো স্বাভাবিক— লোকটা দরজা তো বন্ধ করবেই।
কে ঢুকেছ রেবাদির বাড়ি— দরজা খোলো— দরজা খোলো!‌ বলে আমি দুম দুম করে দরজায় ঘুসি মারতে লাগলাম। দরজা খোলো— নইলে পুলিস ডাকব!‌
থানা যাওয়ার কথা একবার সত্যি মাথায় এল। কিন্তু বড়তলা থানা যে অনেক দূরে। ওখানে পৌঁছে পুলিসকে বুঝিয়ে রাজি করাবার আগেই তো লোকটা রেবাদির সর্বনাশ করে চলে যাবে।
বাড়ি ফিরে এসে মায়ের কাছে দাঁড়ালাম। মা আগের মতোই ছানিপড়া মণির ভেতর দিয়ে রেবাদির বন্ধ জানলার দিকে তাকিয়ে।
এবার তুমি একটু চেঁচাও মা, আমি বললাম। হয়তো তোমার ডাকে সাড়া দেবে।
কিছু না বলে মা আগের মতোই নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল।
একটু চেঁচাও— চেঁচাও!‌ আমি বললাম। রেবাদির কিছু হয়ে গেলে আমাদেরও কি বাঁচতে ভাল লাগবে?‌
কেউই শুনতে পাবে না, মা বলল আস্তে আস্তে, যেন কোনও স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিজের মনেই বিড়বিড় করছে। যতই চেঁচা, লোকের কান পর্যন্ত তোর ডাক পৌঁছবেই না।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল মা। তারপর বলল, তোর বাবাকে মেরে খুনি যখন বেরিয়ে যায়, মুখ থেকে গামছা খুলে আমি খুব চেঁচিয়েছিলাম। তুই এখন যেমন চেঁচাচ্ছিলি, তার চেয়েও জোরে জোরে। কাঁদতে কাঁদতে। জানলার শিকে মাথা ঠুকতে ঠুকতে। কিন্তু আমার চিৎকারগুলো হাওয়াতেই ধাক্কা খেয়ে খেয়ে থেমে যাচ্ছিল। এখানকার হাওয়া মানুষের ঘুমকে পাহারা দেয়। যতই চেঁচা, তোর চিৎকারকে এই হাওয়া ছুটন্ত নেকড়ের দলের মাংস লুফে নেওয়ার মতো করে গিলে নেয়। কারও কান পর্যন্ত আর পৌঁছয়ই না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই।
অবাক হয়ে আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। তারপর দু‌জনেই চেয়ে থাকলাম রেবাদির বন্ধ জানলার দিকে।‌‌‌‌‌ ■

ছবি: দেবব্রত ঘোষ

জনপ্রিয়

Back To Top