কে বলে ভেতো বাঙালি ভিতু?‌ সমুদ্রত্রাস শ্বেত হাঙরকে ছুঁয়ে–‌দেখা দূরত্বে নিয়মিত দেখেন রাজশেখর আইচ। বর্তমানে ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। সার্ক অ্যানথ্রোপলজিস্ট। গবেষণার বিষয় মানুষ ও হাঙরের সম্পর্ক। সেই সূত্রেই শ্বেত হাঙরের মুখোমুখি।
তাঁর রোজনামচার একটা পাতা উড়ে এল পাঠকের সামনে।

টবেলায় দুটো সিনেমা আমাকে খুব টেনেছিল। একটা ‘‌মবি ডিক’‌। হারমান মেলভিলের লেখা একটা খুনে স্পার্ম হোয়েল বা সাদা তিমি শিকারের কাহিনী। সিনেমায় গ্রেগরি পেক ছিলেন মুখ্য চরিত্রে। তার অনেক পরে হলে এসেছিল ‘‌জস’‌। খুনে হাঙরকে নিয়ে। এটা ছিল আরও ভয়ানক। পরে এর সিকুয়েলও হয়েছে। জস–‌এর ঘটনাটা বেশি করে মনে গেঁথেছিল। কিন্তু সেই জস–এর যে ছুঁয়ে–‌দেখা দূরত্বে গিয়ে এই কলকাত্তাইয়াকে পড়তে হবে কে জানত!‌ ঘটনাচক্রে সেটাই হল। সেই মোলাকাতের কথা, রোমাঞ্চকর অনুভূতির কথাই খুলে বলি।
ঘটনাটার প্রায় দু’‌বছর হতে চলল। এখন বসে আছি কলকাতার বাড়িতে। বাইরে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির সঙ্গে যেন শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। বাইরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত কোনও কাকভেজা সাইকেল–‌আরোহীর পিছনে ধাওয়া করেছে। সাইকেল চলেছে জল ছিটকে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে দৃশ্যগুলো সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো।

অ্যান্টার্টিক বা দক্ষিণ মেরুতে, যাকে কুমেরুও বলি, যে বৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি তার সঙ্গে কলকাতার বৃষ্টির একেবারেই মিল নেই। আমি কে, এই সুযোগে একটু বলে নিই। পরিভাষায় সার্ক অ্যানথ্রোপলজিস্ট। কাজ করি মানুষ ও হাঙরের সম্পর্ক নিয়ে। অ্যান্টার্টিকা থেকে ১৬০০ কিলোমিটার দূরে নিউজিল্যান্ডের বাফ উপকূলে কেজ ডাইভারদের সঙ্গে কাজ করেছি। কেজ ডাইভাররা খাঁচার ভিতরে ঢুকে সমুদ্রের নিচে নামে। ওদের সঙ্গে জলে নেমেছি, কাজ করেছি। থেকেছি। তৈরি হয়েছি বিশ্বের সবচেয়ে আদিম লুটেরা হোয়াইট সার্ক বা শ্বেত হাঙরের মুখোমুখি হওয়ার। আমার ফিল্ড জার্নালে রোজ দিনলিপি লিখে রাখতে হত। সেই দিনলিপি থেকে এক বিশেষ দিনের কথা। 

২৬ অক্টোবর ২০১৬। রাত সাড়ে তিনটে
মাসচারেক ধরেই আমরা ঘাঁটি গেড়েছিলাম যে জায়গাটায়, তার নাম ব্লাফ। নিউজিল্যান্ডের মূল ভূমির একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে। একটা ছোট্ট গেঁয়ো শহর। চারদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এই জায়গাটা বিখ্যাত ঝিনুক, সি আর্চিন আর মানুষগুলোর দিলখোলা হাসির জন্য। জায়গাটাকে দক্ষিণের মুক্তো (‌পার্ল অফ দ্য সাউথ)‌ বলা হয়। ১৮২৩ সালে ইউরোপীয়রা এখানে এসে আস্তানা গেড়েছিল। তারা এমন কিছু চিহ্ন রেখে গিয়েছে, যা আজও মুছে যায়নি। তারই একটি হল পিয়ানো। যেটা ঠিকঠাক সুরে বাজে না। ১৮ শতকের এই বাদ্যযন্ত্রটি ছিল আমার ভারি প্রিয়। ফুরসত পেলেই টুংটাং করতাম। যন্ত্রটি পাওয়া গিয়েছিল এক জেলের, মানে মৎস্যজীবীর গ্যারেজে।
ব্লাফ উপকূল থেকে দূরে ফোবে স্ট্রেইট। বাংলায় বললে ফোবে প্রণালী। ভূগোলের পরিভাষায় স্ট্রেইট হল সরু জলপথ, যা দুটো সমুদ্রকে জোড়ে। ভূগোল বইয়ে পড়া জিব্রাল্টার প্রণালীর কথা মনে করুন। ফোবে স্ট্রেইটই বিশ্বের সবচেয়ে মোহময়, একই সঙ্গে ‌বিপজ্জনক প্রণালী। আর সেখানেই আমরা যাব হাঙর–‌অভিযানে।
ব্লাফে ‌আমি যে বাড়িটায় থাকতাম, সেটা অন্তত একশো বছরের পুরনো। রাত্তিরটা এমনই যে আমার মতো ৩৫ বছরের এক যুবাকেও আলো জ্বেলে শুতে হত। আমার অভ্যেস ছিল মাঝরাত্তিরে উঠে–‌পড়া আর বাইরে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, যদি অন্ধকার আকাশে অরোরা অস্ট্রেলিসের মায়াময় আলোকছটা চোখে পড়ে!‌ মাসখানেকের পুরনো সিগার মুখে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম। চলে যেতাম একদম সমুদ্রের কিনারে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতাম কয়েক হাত দূরের অন্ধকার সমুদ্রের দিকে। এদিকে ওপরে অনন্ত আকাশ, যা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমার প্রতীক্ষা ছিল যদি তার দেখা পাই। মানে, তার পাখনার ওপরটুকু, যা জলকেটে তিরতির করে ছুটে চলে। কিন্তু কখনই তাকে দেখতে পাইনি। তিনদিন হল প্রবল বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, কেমন যেন গোমড়া মুখ করে রয়েছে। খাবার ও অন্য জিনিসপত্র যে আনতে যাব, তারও জো ছিল না। তবে আজ রাতে বৃষ্টিটা থেমেছে। কাল ভোরে সম্ভবত আবহাওয়া ঠিক হয়ে যাবে। আর আমরাও সমুদ্রে যেতে পারব।
ব্লাফ ওয়ার্ফে আমাদের কেজ ডাইভিং বোটটা নোঙর করা ছিল। এদিন সকালে আমি নিজেই ঠিক করলাম খাঁচার বাইরেটা পরিষ্কার করব। যদিও দুর্ভাগ্যবশত, তখনও টের পাইনি যে, আমার মনের মধ্যেও শ্বেত হাঙরদের নিয়ে আতঙ্ক গেড়ে আছে।

কীভাবে সেই আতঙ্ক কাটানো যায়, সে কৌশলটা জানতাম। সেটা হল, মনে মনে বলে চলা— ‘‌ওসব নিয়ে একদম ভেবোই না।‌ জলে ঝাঁপ দাও।’‌
জলে নামতেই হঠাৎ করে একগাদা বুদবুদ আমার মুখটা ঢেকে ফেলল। বেশ কিছুটা সময় কেটে গেলে তবেই জলের তলায় যেটা দেখতে পেলাম, সেটা হল খাঁচাটা। ‌পরিষ্কার করার জন্যই রাখা ছিল‌। আমার মন বলে উঠল, ‘‌চুলোয় যাক, এটা মোটেও ঠিকঠাক সময় নয়। আমার তো খাঁচার ভেতরেই থাকার কথা, বাইরে তো নয়!’‌ ভয়ে ওপরে উঠে পড়েছিলাম। ওপরে উঠেও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, এক বিশাল পাখনা ধীরে ধীরে আমার দিকে আসছে। মনকে শক্ত করে আবার জলে ডুব দিলাম। বুঝতে পারলাম, আমার সংবেদী স্নায়ুতন্ত্রের অতি–‌উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করা আমার কম্মো নয়। তবু সাহসে ভর করে একটু একটু করে এগোতে লাগলাম। জাহাজের নিচে আমার কানে একটাই শব্দ আসছে, সেটা হল আমার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া বুদবুদ আর তেজে দৌড়নো বুকের ধুকপুকুনির। হৃৎপিণ্ড এত জোর ধকধক করছে, যেন পাঁজরখানাই ফাটিয়ে ফেলবে। আর এদিকে, আমার মস্তিষ্ক সারাক্ষণ বলে চলেছে— ‘‌এখান থেকে পালাও, এখান থেকে পালাও।’‌ বারবার মনে হচ্ছে, আজ যদি সেই দিনটা হয়, যেদিন হঠাৎ একটা হাঙরের সাধ হল হোয়ার্ফে ঘুরে যেতে। আর আমি তখন জলের তলায় কেজ ডাইভিং নৌকোর কাঠামো পরিষ্কারে ব্যস্ত!‌
আমার হাতে একটা ঝামার মতো জিনিস ছিল, যা দিয়ে প্রপেলার থেকে শুরু করে খাঁচার কাঠামো, শেওলাগুলোকে ঘষে ঘষে একেবারে মূল থেকে তুলে ফেলছিলাম। তাতে জলটা এতটাই ঘোলা হয়ে যাচ্ছিল যে, কিছু দূরের জিনিসও নজরে পড়ছিল না। শুধু মন্ত্রের মতো একটা জিনিসই জপছিলাম, ‘‌পিছনে তাকিও না।.‌.‌.‌ ওটা একেবারেই মূর্খামি।’‌ 
ভয় কাটানোর জন্য আমি সাধারণ যা করে থাকি সেটাই করলাম। জলের তলাতেই গান ধরলাম। কিন্তু টের পেলাম, গান আদৌ আসছে না, যা হচ্ছে সেটা কাঁপা কাঁপা গলায় ছড়া আওড়ানোর মতো। এদিকে, হৃৎপিণ্ড এত জোর ছুটছে, মনে হচ্ছে বুঝি লাফিয়ে বুকের খাঁচা থেকেই বেরিয়ে আসবে। এত কিছুর পরেও কাজ কিন্তু থামাইনি। আর কাজ শেষ না করে জল থেকেও ওঠার প্রশ্নই ছিল না। শেষমেশ কাজটা শেষ করলাম।
এখন আমার কানে একটাই শব্দ আসছে বাইরের বৃষ্টির। নানা ধরনের আওয়াজ আসছে। এত জোর হাওয়া বইছে যে আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করতেও পারছি না। প্রবল আতঙ্ক গ্রাস করেছে আমাকে। এই একাকীত্ব আমার মনের মধ্যে বিচ্ছিরি রকমের অস্বস্তি তৈরি করেছে। সেটা হয়তো স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস জানার দরুনও হতে পারে। এরই মধ্যে একটাই ভাবনা দুঃস্বপ্নের সেই সময় কাটাতে সাহায্য করে— যাই হোক, সূর্য উঠবেই।

২৬ অক্টোবর, ২০১৬‌, সকাল ৬টা
ফোভে প্রণালী দিয়ে আমাদের জাহাজ চলেছে অশান্ত সমুদ্রের জল কেটে। জলটা এতই ঠান্ডা যে কেউ জলে পড়ে গেলে শরীরের তাপমাত্রা নেমে গিয়ে মৃত্যু আসা কয়েক মিনিটের ব্যাপার। সমুদ্রের এই অংশে গত কয়েক শতকে শয়ে শয়ে জাহাজডুবি হয়েছে। তা হোক, তাই বলে আমরা আজ যে সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছি, তাকে কোনও মতেই হারাতে চাই না। এমন এক জলের প্রাণীর সঙ্গে মোলাকাতে যাচ্ছি, যারা পৃথিবীতে এসেছে ৪০ লক্ষ বছর আগে।
আমাদের জাহাজে সারা পৃথিবী থেকেই ডুবুরিরা এসে জড়ো হয়েছে। তারাও সেই বিশেষ মুহূর্তের জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়— কখন মুখোমুখি হবে সেই বিশেষ মাছের, পূরণ হবে তাদের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বপ্ন না বলে দুঃস্বপ্ন বললেই ভাল হয়। এই দুঃস্বপ্নের পিছনে মূলত দায়ী সেই বিখ্যাত সিনেমা ‘‌জস’‌। অজানা বিশাল সমুদ্রে মানুষ ‘‌দ্য গ্রেট হোয়াইট সার্ক’‌–‌এর সামনে কতটা অসহায়, সেটা নিয়েই ছিল ছবিটা। নিউজিল্যান্ড হল পৃথিবীর পাঁচটি জায়গার অন্যতম, যেখানে এই হাঙরদের নিয়মিত দেখা যায়। আমাদের জাহাজ এডওয়ার্ড আইল্যান্ড নামে একটা দ্বীপের কয়েক মিটার দূরে নোঙর ফেলল। এই দ্বীপে অবশ্য কোনও জনমনিষ্যি থাকে না। খাঁচাটা নামিয়ে দেওয়া হল জলে। তারপর থেঁতলানো টুনা মাছ টোপের মাধ্যমে শুরু হল বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার। আমাদের খাঁচাটা জাহাজের পিছনে লাগানো। ওটা সাদার্ন আইলস। তবে খাঁচাটা যেখানে নামল, সেখানে এসে মিশেছে তাসমান সমুদ্র আর দক্ষিণ সমুদ্র (‌সাদার্ন ওশিয়ান)। সেই জল থেকেই সূর্য পূ্র্ব গগনে উঠতে চলেছে। আমরা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছি, কখন দেখা দেবে সেই শ্বেত হাঙর। মুশকিল হল, এই প্রতীক্ষা কয়েক মিনিটেরও হতে পারে, আবার লেগে যেতে পারে পুরো দিনও।

কারণ পুরোটাই নির্ভর করে ওর মর্জির ওপর। যদি মনে করে এ পথ মাড়াবে না, তো আদৌ আসবে না। 
‌এদিকে আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ থেকে খারাপতর হয়ে উঠছে। যেমন কনকনে ঠান্ডা, তার ওপর বিচ্ছিরি হাওয়া দিচ্ছে, সঙ্গে বৃষ্টিও। আমরা প্রত্যেকেই ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছি। কিন্তু তীক্ষ্ণ নজর জলের দিকে, যদি পাখনার চুড়োটা, কিংবা জলে ওর ছায়াটুকুও দেখা যায়। শরীর গরম রাখতে আমাদের সম্বল ছিল গরম সুপ আর কফি। জাহাজটা এদিক–‌ওদিক দুলছে। আমার মুখ আর হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা আগে খাঁচা পরিষ্কারের হাড়ভাঙা খাটুনির দরুন কেমন গা বমিও করছে। আমার কাছে খাবার কেনার মতো খুব একটা পয়সা ছিল না। ফিরে আসার পর দিনে একবারই মাত্র খিচুড়ি খেতাম। তাই সারাক্ষণই খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করত। এত কিছু উপেক্ষা করেও জাহাজের একেবারে মাথায় উঠে হাঙরের দেখা পাওয়া যায় কিনা লক্ষ্য রাখছি। সেই সঙ্গে অন্য ডুবুরিদের চাঙ্গা রাখারও চেষ্টা করছি।
হঠাৎ আমাদেরই একজন চেঁচিয়ে উঠল ‘‌হাঙর, হাঙর’‌। চকিতে সেদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম তিন ফুট লম্বা পাখনাকে। ধীরে ধীরে নীল–‌সবুজ জল কেটে চলে যাচ্ছে। আমাদের নৌকা থেকে বড়জোর ফুট পাঁচেক দূর দিয়ে। অ্যালুমিনিয়ামের খাঁচাটার অর্ধেকটা জলে ডোবানো ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি লাফ দিয়ে নামলাম ওটার ওপর। আমি নিশ্চিত, ওটা ১৫ ফুটের পুরুষ গ্রেট হোয়াইট সার্ক। ওটা আসছে টোপের দিকে। আমাদের ক্যাপ্টেন আমার হাতে টোপের দড়িটা দিয়েছিল। ও যেহেতু আরও কাছাকাছি এগিয়ে আসছে, আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম ওর চেহারাটা। পেটটা একটা বড় গাড়ির অর্ধেক মাপের। শান্ত এবং অনায়াস ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। মুহূর্তের জন্য অনুভব করলাম ওর বিপুল ক্ষমতা। ওটাই উদ্দীপিত করল। ডুবুরিদের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘‌চলো, চলো’‌। হাঙর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, এটাই তো জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুবর্ণ সুযোগ। হৃৎপিণ্ড দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করেছে, মনঃসংযোগ অখণ্ড, এদিকে জিভ শুকিয়ে কাঠ। ডুবুরিরা খাঁচার ভেতর লাফিয়ে পড়ল। আর খাঁচাটা যতটা পারে শক্ত করে পারে ধরে রইল। কারণ ঢেউয়ের দোলায় সেটা বিশ্রীরকম দুলছে। তারপর চলল প্রতীক্ষা, আবার কখন জলদানবের দেখা মেলে। ওটা আমাদের দেওয়া খাবার–‌শৃঙ্খলের কাছে ওপরের দিকে, আমরা জলের নিচে। 
আমাদের খাঁচাটা এন্তার বেরনো বুদবুদে ভরে গিয়েছে। সামনে তাকিয়ে দেখি শুধু নীল জলরাশি।
ডুবুরিরা এদিকে–‌ওদিক দেখছে, এমনকী পায়ের নিচের দিকেও। কিন্তু কোথাও কিছু চোখে পড়ছে না। হঠাৎ সামনে ১৫ ফুটের এক বিশাল ছায়া ভেসে উঠল অতল গভীর থেকে। মুহূর্তে বুদবুদ–‌বৃষ্টি থেমে গেছে। আমাদের কিছু জনের কাছে এটা আজীবনের স্বপ্ন। যার জন্য অনেকেই সমস্ত জীবনটা অপেক্ষায় কাটিয়েছে। কিন্তু দানবের বদলে তারা সামনে দেখছে শক্তিময়, স্ফূর্ত, কৌতূহলী এক প্রাণীকে। তার গায়ে সাতরঙা রামধনুর মতো ত্বক লক্ষ লক্ষ দাঁত দিয়ে তৈরি। পরিভাষায় বলে ‘‌ডার্মাল ডেন্টিকলস’। আলো খাঁচার গায়ে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে ওর গায়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন মিটমিট করে জ্বলছে। কোনও সোনালি চুল, নীল চোখ সুন্দরীর চেয়েও ওর চোখ আরও বেশি নীল। ও খাঁচার কাছে এসে যখন দেখছে, মনে হল, ও যেন আমাদের অন্তরাত্মাটাকে দেখতে চাইছে। কিন্তু দানব নয়, ও হল সমুদ্র–‌সম্রাট। শুধু আমাদের দেখতে এসেছে। হয়তো আমাদের প্রতি ওর করুণাই হল। হঠাৎ কী মনে করে লেজের এক ঝাপটা মেরে শরীরটাকে পুরো উল্টোদিকে ঘুরিয়ে অতল সমুদ্রে কোথায় হারিয়ে গেল। আমাদের সঙ্গে যা রয়ে গেল, তা হল ওর অমিত শক্তির অনুভব। ওর ঝকমকে ত্বকের উপস্থিতি। উত্তেজনায় নিজেদের হৃৎপিণ্ড যেন নিজেদের হাতে!‌ কারও কারও চোখে জল। সেই চোখের নোনতা জল মিশে গেল সমুদ্রের নোনা জলে।

পোড়ো বাড়িটায় অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছু স্বপ্ন ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই। আমি জায়গাটা বেছে নিয়েছি আরেক স্বপ্নপূরণের জন্য। এ বছরটা আমার মোটেই মসৃণ ছিল না। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে কত কী করতে হয়েছে— আসবাব বওয়া, পিয়ানো শেখানো, সবুজ পাথর গুঁড়ো করা, যাকে মাওরিরা বলে ‘‌পুনামু’‌, এক ফিলিপিনবাসীকে মার্শাল আর্ট শেখানো। কী করছি সেটা বড় কথা নয়, আমার আর কোনও উপায়ই ছিল না। এখন আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সাকুল্যে ১৭ ডলার পড়ে। একটা কবজিতে চোট। এবার বই লিখতে বসতে হবে। ব্যাগভর্তি অভিযানের যন্ত্রপাতি, নথি, তথ্য আর কিছু ফাউন্টেন পেন। এবার আমাকে রওনা হতে হবে। পাড়ি দিতে হবে অনেক দূর। আবার কোনও অভিযানে!‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top