বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে বিস্মিত হই। ফল ভোগ করি। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার খবর কতটুকুই বা পাই! বেশিরভাগই থাকে অজানা। ভবিষ্যতের বিজ্ঞান কোন দিকে?‌ খানিকটা আলো ফেললেন অর্ণব হালদার

বিজ্ঞানের আবিষ্কার কখনও হয় আকস্মিক, কখনও নিরন্তর সাধনায়। যেভাবেই আসুক তা জীবনে এনে দেয় নতুন বাঁক, জাগায় ঔৎসুক্য। আজ থেকে বছর পঞ্চাশ আগে বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক জন ডেসমন্ড বার্নাল তাঁর ‘‌ইতিহাসে বিজ্ঞান’‌ বইয়ের ভূমিকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে পূর্ণবেগের বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। 
দুনিয়া জুড়ে গবেষণাগারে নিত্যনতুন আবিষ্কার হচ্ছে, তার খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছয় না। বিজ্ঞান মানেই সবসময় খটমট ব্যাপার নয়। গবেষণার কথা সাধারণের বোধগম্য করে তুলতে পারলে আখেরে বিজ্ঞানেরই লাভ। গত দু–‌এক বছরের অত্যাশ্চর্য কিছু আবিষ্কারের গল্প বলা যাক।
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে একাকী মানব শুধু বিস্ময় নিয়ে থেমে নেই। সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই সে জানতে চায়, বুঝতে চায় চন্দ্র, সূর্য, গ্রহতারাময় আকাশকে। অসীম কৌতূহলের জোরেই সে আজ আকাশজয়ী। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অপার রহস্য তার কাছে ক্রম–‌উন্মোচিত। 
আসা যাক লিগো–‌র কথায়। লেজার ইন্টার ফেরোমিটার গ্র‌্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি। ২৭  মাস আগে এই যন্ত্রেই ধরা পড়েছে এক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। লিগোর উদ্ভাবনে গত বছর দেওয়া হয়েছে পদার্থবিদ্যায় নোবেল। এই যন্ত্রেই ধরা পড়েছে আরও এক মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, যার সৃষ্টি দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সঙ্ঘর্ষে। যে ঘটনা লক্ষ বছরে একবার ঘটে কিনা সন্দেহ!‌ নিউট্রন নক্ষত্র কী?‌ এরা মৃতপ্রায় তারা। সূর্যের চেয়ে দেড় থেকে তিনগুণ ভারী। বিশ্বের হাজার চারেক বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় প্রায় ১৩ কোটি আলোকবর্ষ দূরে–‌থাকা দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সঙ্ঘর্ষকে চাক্ষুষ করা সম্ভব হয়েছে রেডিও টেলিস্কোপ ও অন্য যন্ত্রের সাহায্যে। এই পর্যবেক্ষণ মান্যতা দিয়েছে জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানের বিভিন্ন মডেলকে। মিলিয়ে নেওয়া গেছে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বকেও। কীভাবে জন্ম সোনা, সীসা, প্ল্যাটিনাম প্রভৃতি ভারী ধাতব মৌলের, জানা গেছে তাও। বিজ্ঞান–‌গবেষণায় এ এক অতি–‌গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। 
২০১৮–‌র শুরুতেই ‘‌নেচার’‌–‌এ ছাপা হয়েছে এক অদ্ভুত ঘটনা। সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি যে মস্ত এক গ্যাসের পিণ্ড সে কথা ইতিমধ্যেই জানা। নাসা–‌র ‘‌জুনো মিশন’‌ দিয়েছে ওই গ্যাসীয় গ্রহের উপরিতলে ঘটে যাওয়া এক ঝড়‌ঝঞ্ঝার খবর। যার সঙ্গে পৃথিবীর ঝঞ্ঝার খুব মিল। বৃহস্পতির দুই মেরুর মধ্যে ঘটে যাওয়া সুপার সাইক্লোনেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য। সৌরমণ্ডলে এ ঘটনা আগে দেখা যায়নি। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বৃহস্পতির সৃষ্টি, ভর ও অভ্যন্তরীণ গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। জ্যোতি‌র্পদার্থ বিজ্ঞানীরা আশাবাদী।
সেই কতযুগ আগে ভারতীয় দার্শনিক কণাদ ও পরে গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস পরমাণুর ধারণা দিয়েছিলেন। তা পূর্ণতা পেয়েছিল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন ডাল্টনের হাতে। পরমাণু অবিভাজ্য, তাকে আর ভাঙা যাবে না, কবেই বাতিল ধারণা!‌ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণার সন্ধান করতে গিয়ে কোয়ার্ক, নিউট্রিনো, মেসন, লেপ্টন, গ্লুওন, গ্যাভিটন–‌এর মতো নতুন নতুন মৌলিক কণার কথা জানা গেছে। এরা এতই ছোট ও স্বল্পায়ু যে তাত্ত্বিক ধারণা থাকলেও এরা সহজে ধরা দেয় না!‌ 
সম্প্রতি মহাবিশ্বের এইসব মৌলিক কণাকে প্রায় ধরেই ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৭–‌য় ‘‌সায়েন্স’‌–‌এ প্রকাশিত এক লেখায় চার দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। সম্ভব হয়েছে নিউট্রিনোর সনাক্তকরণ। ৮১ বিজ্ঞানীর দল ১৪.‌৬ কেজি সোডিয়াম সিজিয়াম আয়োডাইডের কেলাস ব্যবহার করে নিউট্রিনোর তরঙ্গের মতো বিচ্ছুরণকে সনাক্ত করতে পেরেছেন। আগামী দিনে পরমাণুর হাঁড়ির খবর দিতে পারবে এই আবিষ্কার। 
পাশাপাশি ৫৩ বছর আগে ধারণা পাওয়া টেট্রা কোয়ার্ক কণার অস্তিত্বের সন্ধানও পাওয়া গেছে। এদের আয়ুষ্কাল খুব কম। কতটা কম?‌ এক দানা নুনকে পেরোতে আলোকরশ্মির যে সময় লাগে তারও অর্ধেক!‌ তা সত্ত্বেও ‌সার্ন‌–‌এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার সন্ধান দিয়েছে স্বল্পায়ু কণাদের। যে যন্ত্র কয়েক বছর আগে খোঁজ দিয়েছিল আরও এক মৌলিক কণার, যার সঙ্গে জড়িয়ে বাঙালির গর্ব সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নাম— ‌হিগস্‌ বোসন।
আধুনিক রসায়ন গবেষণার সঙ্গে জীববিদ্যার সম্পর্ক নিবিড়। জীবদেহের প্রায় সমস্ত ক্রিয়াকলাপই জটিল অণুর ক্রিয়া–‌বিক্রিয়া ও রূপান্তর। জৈব অণুর গতিপ্রকৃতি ও চরিত্র বুঝতে পারলে রোগনির্ণয় ও নিরাময় সম্ভব। অগত্যা রসায়ন, জীববিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যা একযোগে লেগে পড়েছে। 
স্কুলে–‌পড়া বংশগতি, মেন্ডেলের তত্ত্ব মনে করুন। জিনের মূল উপাদান ডিএনএ। প্রোটিন উৎপাদনে সহায়তা করে জেনেটিক কোডের মাধ্যমে। ৬০ হাজারের বেশি জিনবিন্যাস মানুষের নানা অসুখের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের খুব সামান্য হেরফের করে প্রায় ৩৫ হাজার রকমের জিন বিন্যাস সম্ভব। তার মধ্যে কারিকুরি ঘটিয়ে নানা জটিল রোগের সমাধানও করা যায়। সম্প্রতি CRISPR ‌নামক পদ্ধতির আবিষ্কার জিন সম্পাদনায় অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে এসেছে। মানবভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। দেখিয়েছেন জিনের গঠনগত ত্রুটি শুধরে ভ্রূণের হৃদযন্ত্রের অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। গর্ভবতী মায়েদের জিন সম্পাদনা করতে পারলে আগামীদিনে জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন পথ খুলে যাবে। এই পদ্ধতিতে ৬০ জন মহিলার সারভিক্স টিউমার বৃদ্ধি বন্ধ করা গেছে। মেরুদণ্ডের স্নায়ুকোষের হারিয়ে যাওয়া জিনকে সংযুক্ত করে শিশুদের জন্মগত স্নায়বিক মারণ রোগ সারিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ‌এই কাজ ২০১৭–‌য় নজরকাড়া বৈজ্ঞানিক সাফল্য। 
ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা চলছেই। ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন’‌ ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অন্য এক পদ্ধতির সন্ধান দিয়েছে। ওষুধ সরাসরি রোগীর রক্তকোষের মধ্যে গিয়ে ক্যান্সার আক্রান্ত ডিএনএ–‌কে বিনষ্ট করছে বা ডিএনএ–‌র গঠন বদলে রোগ নিরাময় করছে। জন হপকিনস্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানী লুইস ডিয়াজের নেতৃত্বে এই গবেষণা ক্যান্সার নিরাময়ে এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছে ৩৭ শতাংশ রোগীর মধ্যে তিন মাস পর ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যৎই বলবে এই পথ মানবসমাজকে ক্যান্সারমুক্ত করতে পারবে কিনা।
গতিময় বর্তমান জীবন বাড়াচ্ছে মানসিক অস্থিরতা। আলঝাইমার্সের মতো স্মৃতিবিলুপ্তি এক বড় সমস্যা। এর জন্য মস্তিষ্কের একটি উৎসেচক, HDAC2 যে দায়ী, তা প্রমাণিত। এর জমা বন্ধ করার পথ বের করায় সাফল্য এসেছে ২০১৭–‌য়। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির গবেষকেরা সন্ধান পেয়েছেন এক প্রোটিনের, যার মাধ্যমে একে বিনষ্ট করা সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ আবিষ্কার আক্ষরিক অর্থেই যুগান্তকারী।
বিশ শতকের শেষ দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক বিজ্ঞান গবেষণার একাধিক শাখা একটা জায়গায় এসে মিলিত হচ্ছে। মেটিরিয়াল সায়েন্স বা বস্তুবিজ্ঞান। আগামী দিন হল ন্যানো সায়েন্স ও ন্যানো টেকনোলজির। ১৯৫৯ সালে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সভায় নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এর অমিত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ন্যানো মিটার মানে এক মিলিমিটারের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ। এই ক্ষুদ্র মাত্রায় বস্তুর ধর্মের বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। ন্যানো সায়েন্সে ২০০৪ সালে দ্বিমাত্রিক গ্রাফিনের আবিষ্কার স্মরণীয় ঘটনা। কার্বন পরমাণু সজ্জিত এই দ্বিমাত্রিক পদার্থের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ২০১০–‌এ পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। এই গ্রাফিনের সুনির্দিষ্ট ধর্ম আছে। তা জানতে পেরে ব্যবহার করলে নিত্যনতুন প্রযুক্তির সন্ধান মিলবে। 
হাইড্রোজেন গ্যাসকে তরলে পরিণত করা কঠিন। কঠিনে রূপান্তর তো প্রায় দুঃসাধ্য। ২০১৭–‌র জানুয়ারিতে বিজ্ঞানীরা সেই কাজ করে ফেলেছেন। ধাতব অবস্থায় হাইড্রোজেনের তড়িৎ পরিবহন ক্ষমতা সাধারণ ধাতুর থেকে বহুগুণ বেশি। রকেট প্রযুক্তি ও শক্তি সংরক্ষণে এই আবিষ্কার বিপ্লব আনতে পারে।
স্টিফেন হকিন্স বলতেন, মানবজাতির নতুন বাসভূমি সন্ধান জরুরি। আগামী ১০০ বছরে তা না পাওয়া গেলে সমূহ বিপদ। কিন্তু কোথায় মিলবে জল, অক্সিজেন, কার্বনসমৃদ্ধ ভূমি?‌ ২০১৭–য়  ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংগঠন (ESO) ‌মহাবিশ্বে ৪০ আলোকবর্ষ দূরে ‘‌ট্রাপিস্ট–‌১’‌ নামে এক খুদে নক্ষত্রের খোঁজ পেয়েছে। ওখানে আছে জল ও মিথেন। তাপমাত্রাও প্রাণের প্রতিকূল নয়। ইএসও আশার কথাই শোনাচ্ছে। ■

তথ্যসূত্র:‌ ‘‌‌ইতিহাসে বিজ্ঞান’, জে ডি বার্নাল, অনুবাদ আশীষ লাহিড়ী, আনন্দ পাবলিশার্স।  ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার, ২০১৭:‌ অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স, ২০১৭। নেচার, মার্চ ২০১৮। সায়েন্স, অক্টোবর ২০১৭। ‌ দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন, ২০১৭। সেল রিপোর্টস, ২০১৭। 

 

 

লেখক রসায়নবিদ্যার অধ্যাপক, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি।
 

জনপ্রিয়

Back To Top