১৩ সেপ্টেম্বর চলে গেল সৈয়দ মুজতবা আলীর ১১৫তম জন্মদিন। মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন। কেমন ছিল তাঁর রসবোধ। দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখার সুবাদে অনেক অজানা
কথা বললেন সবিতেন্দ্রনাথ রায় 

সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে আমাদের আলাপ হয় একটু অদ্ভুতভাবে। সময়টা ১৯৫৭–‌’‌৫৮ সাল হবে। অবধূতের ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’‌ ভ্রমণকাহিনী বেরিয়েছে। ‘‌দেশে–‌বিদেশে’‌ ভ্রমণকাহিনীর পর এই আর এক ভ্রমণকাহিনী যা পাঠকমহলে জনপ্রিয়তার তুফান তুলল। প্রথমত, লেখক সম্বন্ধেই কৌতূহল ছিল। কে এই অবধূত?‌ তারপর হিংলাজ সুদূর বেলুচিস্তানে, মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেখানেই পড়েছিল সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র। একান্ন পীঠের এক পীঠ। ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’‌ সকালে  (‌৫০০) পাঁচশো বই আসে, বিকেলে শেষ। এই হইচইয়ের মধ্যে একদিন একটা ইনল্যান্ড লেটার এল অবধূতের নামে। উল্টোদিকে প্রেরকের রাবার স্ট্যাম্প, ‘‌সৈয়দ মুজতবা আলী, শান্তিনিকেতন’‌। আমরা লোক দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম অবধূতের ‌কাছে, চুঁচুড়ার জোড়াঘাটায় অবধূতের বাড়ি। 
তারপর দুই কর্তায় আলাপ–‌আড্ডা, কখনও চুঁচুড়ায় কখনও শান্তিনিকেতনে। আমরা শুনি বটে, তবে সে আলাপে–‌আড্ডায় অংশ নেওয়া হয়ে ওঠে না। 
তখন বইপাড়ায় সিগনেট প্রেস তাঁদের দোকান খুলেছেন। তাঁরা প্রকাশনে ছাপা–‌বাঁধাইয়ে বৈচিত্র‌্য এনেছেন। তাঁদের নূতনত্ব আমরা, অন্য প্রকাশকরাও অনুসরণের চেষ্টা করি। আনন্দবাজার পত্রিকার ডেভেলপমেন্ট অফিসার কানাই সরকার মশাই মিত্র–‌ঘোষের আড্ডায় আসতেন। প্রমথনাথ বিশীর অনেকদিনের বন্ধু। প্রমথবাবু তো এই আড্ডার মধ্যমণি। কানাইবাবু যেন আনন্দবাজার পত্রিকার পদাধিকার বলেই আমাদের নানা উপদেশ দিতেন। তারপর আমাদের দৃষ্টান্ত দেখাতেই বোধহয় নিজেই প্রকাশনা খুলে বসলেন, ত্রিবেণী প্রকাশন। বই ছাপলেন রূপদর্শীর, রমাপদ চৌধুরির, সৈয়দ মুজতবা আলীর। কোনওটা বিক্রি হয়, কোনওটা হয় না। আমাদের কাউন্টারে দ্যাখেন অবধূতের বইয়ের বিপুল বিক্রি। অবধূতের তখন দারুণ দোস্তি আলী সাহেবের সঙ্গে। কানাইবাবু আলী সাহেবকে বললেন, অবধূতের একটা বই পাইয়ে দিতে। 
আলী সাহেব অবধূতকে বললেন, ব্রাদার, আমার বন্ধু কানাই সরকার ত্রিবেণী প্রকাশন খুলেছেন, আপনার একটা বই ছাপতে চান।
অবধূত বললেন, আমার প্রথম প্রকাশক মিত্র ও ঘোষ, তাদের না জিজ্ঞেস করে তো বলতে পারি না। 
আলী সাহেব বললেন, আপনি একটু দেখুন। দিলে আমার মুখটা থাকে। 
আমরা ততদিনে অবধূতের চারটে বই ছেপেছি— ‘‌মরুতীর্থ হিংলাজ’‌ তো প্রথম বই, তারপর ‘‌বশীকরণ’‌, ‘‌উদ্ধারণপুরের ঘাট’ ও‌ ‘‌বহুব্রীহি’‌।
অবধূতের কাছে আলী সাহেবের প্রস্তাব শুনে আমাদের মনে হল, এভাবে আমাদের আটকে রাখা অন্যায় হবে, আমরা বললাম— তা হলে আপনিও আমাদের হয়ে বলুন, আলী সাহেবও আমাদের একটি বই দিন প্রকাশের জন্য। 
অবধূত বললেন, এ তো দারুণ প্রস্তাব। আমি কালই বলব। 
অবধূত বললেন, সৈয়দদা, আমি আপনার অনুরোধ মতো কানাইবাবুকে বই দেব, তবে আপনাকেও মিত্র–‌ঘোষকে একটা বই দিতে হবে। ওরা কোথায় কখন আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলুন।
আলী সাহেব বললেন, আমি শুক্রবার উঠব প্যারীদার বাড়িতে। প্যারী মুখুজ্যের নাম শুনেছ তো, ক্যালকাটা ক্লাবের কর্তা, ৪২এ হাজরা রোড, বাড়ির নাম ‘‌নিরালা’‌, শনিবার বিকেলে যেন ওদের কেউ ওখানে চলে আসে, কথা হবে। 
শনিবার বিকেলে আমরা তিনজন গেলাম‌—প্রদোষ, মণীশ ও আমি। প্যারীবাবুর বৈঠকখানা দেখার মতো। সোফা কোচ কার্পেটে সাজানো–গোছানো, কোণে পানীয় পরিবেশনের কর্নার টেবিল। পিছনে কাবার্ডে নানা দামি বিয়ার, হুইস্কি প্রভৃতি সাজানো, ডিকান্টার, সুদৃশ্য গ্লাস।
ঘরে কেউ নেই। সোফায় বসে আলী সাহেব নিবিষ্ট মনে একটি ম্যাগাজিন পড়ছেন। পরনে সিল্কের লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আমাদের আসার শব্দে চোখ তুলে তাকাতে বললাম, আমরা মিত্র–‌ঘোষ থেকে আসছি। 
আলী সাহেব বললেন, ও, তোমরা ত্রিমূর্তি মিত্র–‌ঘোষের। অবধূত–‌এর পরামর্শমতো এসেছ?‌ খুব ভাল।
তারপর একথা–‌সেকথার পর, মিত্র ও ঘোষ নাম কেন?‌ আরে গজেন্দ্রকুমার মিত্র তো নামকরা লেখক, সুমথনাথ ঘোষও লেখক?‌ ওঁর কী, কী বই?‌ তা তোমরা আমার কী, কী বই ছাপবে?‌
আমরা বললাম, সে তো আপনি দেবেন। 
আলী সাহেব বললেন, এখানে তো দেখছ, এই ব্যবস্থা, একটু পরেই ঢুকু ঢুকু শুরু হবে। আমি বলি, তোমরা ত্রিমূর্তি একদিন শান্তিনিকেতনে এসো, সামনের সপ্তাহে বুধবারে, বুধবার বিশ্বভারতী বন্ধ থাকে, জানো তো?‌ কলেজ, ইউনিভার্সিটি বন্ধ, আমারও ছুটি, জমিয়ে আড্ডা দেব। তোমাদের একটা বইয়েরও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বোলপুরে নেমে রিকশা করে চলে এসো। বলবে, কে পি সেন–‌এর বাড়ি।
আমরাও সেদিন নমস্কার জানিয়ে চলে এলাম।

পরের সপ্তাহে বুধবার ভোরবেলার গাড়িতে আমরা তিনজন বোলপুর রওনা হলাম। তখন তো বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস প্রভৃতি গাড়ি হয়নি। সম্ভবত আমরা বরাউনি এক্সপ্রেসেই উঠেছিলাম।
বোলপুর পৌঁছলাম সকাল ১০টা নাগাদ। স্টেশন থেকে দুটো রিকশা নিয়ে তিনজনে সোজা গেলাম শ্রী কে পি সেনের বাড়ি। তাঁর বাড়িটা ভাড়া নিয়ে বিশ্বভারতী অধ্যাপকদের আবাস করেছিলেন। সৈয়দ মুজতবা আলী এখানেই থাকতেন। আলী সাহেব তখন বাইরের ঘরে বসে। রিকশা থেকে আমাদের ত্রিমূর্তিকে নামতে দেখে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন—
বউ, বউ, দ্যাখো কারা এসেছেন!‌
‌একটু পরে রাবেয়া বউদি বাইরের ঘরে এলেন। আমরা জানতাম না, আলী সাহেব তখন সপরিবার শান্তিনিকেতনে আছেন। সঙ্গে আনা সন্দেশের বাক্স বউদির হাতেই তুলে দিলাম। মনে হল, সন্দেশ আর একটু বেশি আনলে হত।
বউদি আগে তো আমাদের দেখেননি। আলী সাহেবই পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরা মিত্র–ঘোষের কর্তা তিন মূর্তি, আর এদের ওপরে দুই কাকা আছেন। আর তারপর বউদিকে দেখিয়ে বললেন– ইনি রাবেয়া আলী, আমার বউ, সহধর্মিণী যা বলো, রান্না করে খাইয়ে–পরিয়ে এই অধমকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
বউদি ততক্ষণে ধাতস্থ হয়েছেন। অনুযোগের সুরে বললেন, দেখেছেন তো আপনাদের দাদার কাণ্ডজ্ঞান, সকালবেলা এমন ‘‌বউ, বউ’‌ বলে চিৎকার শুরু করলেন, যে পাড়ার লোক জড়ো হয়ে যাবে।
আলী সাহেব বললেন, কী আশ্চর্য, নিজের বউকে ‘‌বউ’‌ বলে ডাকতে পারব না!‌ আমি কি পরের বউকে ডাকছি!‌
বউদি বললেন, ঠাকুরপোরা বসুন, আমি চা– খাবার আনছি।
একটু পরে দুই বালক পুত্র এল বাইরের ঘরে, ফিরোজ–কবীর।
আলী সাহেব ছাড়া বাকি সকলের সঙ্গে এই প্রথম পরিচয়।

যাঁরা ‘‌দেশে–বিদেশে’‌ পড়েছেন, তাঁরা সবাই জানেন, মুজতবা আলী কাবুলে শিক্ষা বিভাগে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তার সঙ্গে অধ্যাপনাও ছিল। তাঁর বেতন অন্য সহকর্মীদের চেয়ে বেশি ছিল। এই নিয়ে অন্যদের মনে ক্ষোভ। তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নালিশ করলেন। তাঁরা সব রিকগনাইজড ইউনিভার্সিটির পাশ করা ডিগ্রি হোল্ডার, স্বয়ং লাটসাহেব তাঁদের সার্টিফিকেটে সই করেছেন। আর সৈয়দ মুজতবা আলী এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্টিফিকেট হোল্ডার, ওঁর মাইনে বেশি কেন?‌
মন্ত্রী তাঁদের বলেছিলেন, দেখুন আপনাদের সার্টিফিকেটে লাটসাহেব সই করেছেন ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর ক’‌জন তাঁকে চেনে?‌ আর আলী সাহেবের সার্টিফিকেটে যে রবীন্দ্রনাথ টেগোর সই করেছেন, তাঁকে বা তাঁর নাম তো পৃথিবীর সবাই চেনে, নোবেল লরিয়েট। তাঁর মাইনে তো বেশি হবেই।
অভিযোগকারীরা নিশ্চুপ।
সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্ম ১৯০৪ সালে। আমাকে বলেছিলেন, আমার জন্ম হয় জন্মাষ্টমীতে। জন্মাষ্টমীর তিথি কখনও পড়ে ১৩ সেপ্টেম্বর, কখনও ২৩ সেপ্টেম্বর। যাই হোক, জন্মসূত্রে সৈয়দ মুজতবা আলী ভারতীয়। যদিও পিতৃভূমি শ্রীহট্টে। তাঁর পিতা ছিলেন করিমগঞ্জের কোর্ট রেজিস্ট্রার। সরস্বতী পূজার দিন স্কুলের ছেলেরা ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের বাংলোয় ঢুকে না বলে অনেক ফুল তোলে। সাহেব অগ্নিশর্মা। এই অপরাধে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশে তাঁর আর্দালিরা ছাত্রদের বেত মারে। সে সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দেশ এমনিতে গরম। ছাত্রদের বেত মারার জন্য স্কুলে হরতাল। কেউ ক্লাস করবে না। ক’‌দিন স্কুল বন্ধ। অভিভাবকদের অধিকাংশই সরকারি কর্মচারী। সরকারের চাপে আন্দোলন মিটল। হিন্দু ছাত্ররা ক্লাসে যোগ দিল। কিন্তু মুজতবা অটল। সাহেব ক্ষমা না চাইলে স্কুলে যাবেন না। পিতা রেগে তাঁকে এক মোজা তৈরির কারখানায় ঢুকিয়ে দিলেন।
এর কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ করিমগঞ্জে এক সাহিত্যসভায় এসেছিলেন। বক্তৃতায় তিনি এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যথার্থ মানুষ হতে হলে আকাঙ্ক্ষা উচ্চ করতে হবে। ওই বয়সেই মুজতবা রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখেন, আকাঙ্ক্ষা উচ্চ করতে হলে কী করা উচিত। রবীন্দ্রনাথ উত্তরে লেখেন, আকাঙ্ক্ষা উচ্চ করতে হলে আত্মস্বার্থ ছেড়ে অপরের জন্য, দেশের জন্য ভাবতে হবে।
মোজার কারখানায় ঢুকিয়ে দিয়ে আলী সাহেবের পিতা তো আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন না। পুত্রকে জিজ্ঞেস করেন, একটা কিছু তো পড়তে হবে।
মুজতবা তখন নির্দ্বিধায় পিতার কাছে শান্তিনিকেতনে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পিতা ব্যবস্থা করে দিলেন। আর শান্তিনিকেতনে পড়তে আসা মানে মুজতবার সামনে বিশ্বসভার দুয়ার খুলে গেল। তখন দেশি–বিদেশি পণ্ডিতদের উপস্থিতিতে শান্তিনিকেতন উজ্জ্বল। একদিকে যেমন বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন– গান শেখাচ্ছেন দিনেন্দ্রনাথ– অন্যদিকে বগ্‌দানব, ভিনটারনিৎস, হিডজিভাই মরিস প্রভৃতি বিদেশি পণ্ডিত। এখানেই আলী সাহেব পেলেন তাঁর অগ্রজপ্রতিম আজীবনের সুহৃদ প্রমথনাথ বিশীকে।
শান্তিনিকেতনে আসার পর রবীন্দ্রনাথ তাঁকে যে কোনও একটা কবিতা আবৃত্তি করতে বলেন। মুজতবা রবীন্দ্রনাথেরই একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। রবীন্দ্রনাথ শুনে বললেন, তোর মুখে এখনও শ্রীহট্টের কমলালেবুর রস লেগে আছে। ওটা মুছতে হবে।
মুজতবা আমাদের বলেছিলেন, সিলেটে আমরা ও–কার উচ্চারণে গোলমাল করি। ও–কার উচ্চারণে উ–কার উচ্চারণ করি, চোরকে বলি ‘‌চুর’‌। গুরুদেব এইটাই সংশোধন করতে বলেছিলেন।
শান্তিনিকেতনের কলেজ বিভাগে মুজতবা আলী প্রথম বাইরের ছাত্র। পাঁচ বছর পড়াশোনার পর আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু আলিগড়ের পরিবেশ তাঁর ভাল লাগেনি। শেষে কাবুলের শিক্ষা বিভাগে চাকরি পেলে তিনি নির্দ্বিধায় সেখানে চলে যান। কাবুলে তিনি আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিলেন। এমন সময়ে সেখানে বাচ্চাই সাকোর অভ্যুত্থানে ভারতীয়দের জীবন বিপন্ন হলে, পিতার অনুরোধে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
আফগানিস্তানে যাওয়া ও থাকা নিয়েই তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ’‌দেশে–বিদেশে’‌। আমাকে বলেছিলেন, দ্যাখো, বইয়ের খানিকটা লেখা দেশের বিষয়ে অর্থাৎ ভারতের বিষয়ে, বাকিটা আফগানিস্তানের। তাই নাম দিলাম– ‘‌দেশে–বিদেশে’‌। এমনই কেউ কেউ ‘‌পন্টক’‌ আছে, বলে– আপনার ‘‌দেশে–বিদেশে’‌র মতো বই হয় না।
আমি বললাম, ‘‌পন্টক’‌ কাদের বলছেন?‌
আলী সাহেব বললেন, ‘‌কন্টক’‌ থেকে যেমন ‘‌কাঁটা’‌, বুঝলে না তেমনি ‘‌পাঁঠা’‌ থেকে ‘‌পন্টক’‌।
১৯২৯ সালে, দেশে ফেরার পর তিনি জার্মানি যান। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ডক্টরেট পান। জার্মান ভাষা শিক্ষা করেন। জার্মানি–বাস–এর সুফল হল তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ ‘‌চাচাকাহিনী’‌। জার্মানি থেকে ফিরে এসে তিনি বরোদা কলেজের অধ্যক্ষ হন। জার্মানি ছাড়াও কায়রোতে তিনি অনেকদিন ছিলেন। ফ্রান্সেও ছিলেন। এই সব ভ্রমণ ও আড্ডার অনবদ্য কাহিনী ছড়িয়ে আছে ‘‌পঞ্চতন্ত্র’‌, ‘‌ময়ূরকণ্ঠী’‌ প্রভৃতি গ্রন্থে। মুজতবা আলীর রচনা পাঠ করলে বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়।
মুজতবা আলীরা তিন ভাই। সৈয়দ মোস্তাফা আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী আর ছোটজন আমাদের মুজতবা। তিনজনই অসামান্য পণ্ডিত ও বাংলা ভাষায় অগাধ দখল। বড়জনের আত্মচরিত্রের মতো সুখপাঠ্য গ্রন্থ খুব কমই আছে। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘‌প্রবন্ধ বিচিত্রা’‌, ‘‌আমাদের কালের কথা’‌, ‘‌চর্যাপদের কথা’‌ মূল্যবান সম্পদ। ‘‌চর্যাপদের কথা’–কে তো চর্যাপদ গবেষণার আকর গ্রন্থ ভাবা হয়। ইনি বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসে তাঁর যোগ্যতার জন্য তিনি ডিভিশনাল কমিশনার হয়েছিলেন।
দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার সৈয়দ মুজতবা আলীকে সাদরে বগুড়া কলেজের প্রিন্সিপাল করে নিয়ে যান। কিন্তু মুসলিম লিগ–এর কাজকর্ম, কলেজের কাজে তদারকি তাঁর পছন্দ হচ্ছিল না। একবার কবি ইকবালের জন্ম–জয়ন্তীতে এই অশান্তি চরমে উঠল। কয়েকজন লিগ নেতা ইকবালকে বিশ্বকবি প্রতিপন্ন করতে উঠেপড়ে লাগলেন। চিরকালের স্পষ্টবক্তা মুজতবা সভার মধ্যেই বলে উঠলেন, ইকবাল বড় কবি সন্দেহ নেই, কিন্তু বিশ্বকবি তাঁকে বলা যায় না। বিশ্বকবি হওয়ার কতকগুলি বিশেষ লক্ষণ থাকে, যেমন আছে রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রনাথই বিশ্বকবি।
সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লিগ নেতারা তৎপর হয়ে উঠল। তাঁকে ভারতের চর বলতে শুরু করল। অবস্থা এমন হল, তাঁর মেজদা– তখন ডিভিশনাল কমিশনার– তিনিও ভয় পেলেন। তিনি বলে পাঠালেন– সীতু, তুই অবিলম্বে ভারতে চলে যা। এখানে তোকে আমি বাঁচাতে পারব না। ডিভিশনাল কমিশনার হলেও না।
সেই থেকে সীতু, ‌সৈয়দ মুজতবা আলী,‌ ভারতে চলে এলেন। হয়ে গেলেন ভারতীয়। নিজের দেশে যেতে হলেও ভিসা লাগে। পরে যদিও বিবাহ হল– কিন্তু পত্নী রাবেয়া, পুত্রদ্বয় ফিরোজ ও কবীর পাকিস্তানি। রাবেয়া তো পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের গেজেটেড অফিসার ছিলেন। কী সুখী হতেন তাঁরা যদি রাজনৈতিক কারণে পরিবারটি দ্বিখণ্ডিত না হত।
ভারতে এসে মুজতবা কতরকম কাজ করেছেন। প্রথমে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মন্ত্রকে সাংস্কৃতিক কাজকর্ম। আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্রে– লখনউ, পাটনা, কটক, কলকাতায় স্পেশাল অফিসার। শেষমেশ শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীর ইসলামিক কালচারাল বিভাগের অধ্যাপক এবং জার্মান ভাষার শিক্ষক।
মুজতবা আলীর বন্ধুভাগ্য ভালয়–মন্দয় মিশিয়ে। অনেকে তাঁকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতেন। অনেক সাংবাদিক বন্ধু তাঁকে কাজে লাগাতে চাইতেন।
সুয়েজ খাল নিয়ে যখন মিশর–ব্রিটিশের বিবাদ বাধল, মিশর সুয়েজ খাল দিয়ে ব্রিটিশ জাহাজের যাতায়াত বন্ধ করে দিল, অনেক সাংবাদিক বন্ধু তাঁকে মিশরের বিরুদ্ধে লেখার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন।
আবার ১৯৬৫–তে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লেখার জন্য চাপ এল।
আমার কাছে দুঃখ করেছিলেন মুজতবা, ভানু, এরা কি বোঝে না আমার স্ত্রী, দুই ছেলে পূর্ব পাকিস্তানে, এখানে আমি কিছু লিখলে পাকিস্তান সরকার ওদের শেষ করতে দু’‌মিনিটও সময় নেবে না।
তবে দোষই হোক আর গুণই হোক, স্পষ্টবাদিতা সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনে বার বার সঙ্কট এনেছে। চাকরি কতবার ছেড়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর এক বন্ধু বলেছিলেন, আপনি এতবার চাকরি ছাড়েন, আপনার চলে কী করে?‌
মুজতবা হেসে বলেছিলেন, তুমি শুধু চাকরি ছাড়াটা দেখছ, দুটো চাকরি ছাড়ার মধ্যে যে কাজ করি সেটা দেখছ না। সেই বাবদ মাইনে আর লেখার টাকা– এতেই আমার খরচ চলে যায়। খরচ তো আমার, কাটুর আর মাস্টার অ্যালসেশিয়ানটির।
শেষবেলায় যে বিশ্বভারতীর অধ্যাপনা, সেটাও নিরুপদ্রবে কাটেনি। তারও কারণ এই অতিরিক্ত স্পষ্টবাদিতা।
উপাচার্য সুধীরঞ্জন দাশ তাঁকে একটি আরবি লিপিতে প্রাপ্ত পোস্টকার্ডের মর্মোদ্ধার করতে পাঠিয়েছিলেন। পোস্টকার্ডে ঠিকানা লেখার পাশে খালি জায়গায় মুজতবা চিঠির মর্ম বাংলায় লিখে দিয়েছিলেন। তারপর সেটি উপচার্যের কাছে পাঠিয়ে দেন। উপাচার্য সেটি লক্ষ্য করেননি। অধ্যাপকদের সভার মধ্যে উপাচার্য আলী সাহেবকে বলে বসলেন, ভাই আলী, পোস্টকার্ডটার মর্মোদ্ধার না করে ফেরত পাঠালে যে!‌ মর্মোদ্ধার করতে পারলে না?‌
আলী সাহেবের মনে হল, দাশ সাহেবের কথায় একটু ব্যঙ্গের সুর। উনি বলে বসলেন, দাশ সাহেব কি কখনও ভাজা মাছ উল্টে খাননি?‌
স্পষ্টতই উপাচার্য বিব্রত এবং বিরক্ত– তার মানে?‌
মুজতবা বললেন, পোস্টকার্ডটা বার করুন।
উপাচার্য বার করলেন, এই তো পোস্টকার্ড!‌
মুজতবা বললেন, উল্টে দেখুন, ঠিকানার পাশে বক্তব্য বাংলায় লিখে দিয়েছি।
ততক্ষণে অন্য অধ্যাপকরা মুচকি হাসছেন।
এই ঘটনাটা সুধীরঞ্জন ভোলেননি। নানাভাবে অসুবিধের সৃষ্টি হয়েছিল আলী সাহেবের কাজে।
আমি ঘটনাটা শুনে বলেছিলাম, আপনার এই উক্তি কিন্তু সৈয়দদা অফিসিয়াল ডেকোরাম হিসেবে অনুচিত ছিল।
আলী সাহেব অকপট। আমাকে বললেন, মানছি তোমার কথা, কিন্তু ওই যে সবটা না দেখে সুধীদা আমাকে বললেন, তুমি পারলে না, তাতেই আমার মেজাজ গরম হল।
আমি দেখেছি, ক্যালকাটা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট প্যারীবাবু ও তাঁর ছেলেরা ছাড়া নিঃস্বার্থ বন্ধু আলী সাহেবের কেউ বিশেষ ছিল না। অনেকে তাঁকে কাজে লাগাতে চাইতেন। অথবা তাঁর পয়সায় মদ্যপান বা হোটেলবাজি করা। 
ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানে পত্নী রাবেয়া আলী শিক্ষা বিভাগে উচ্চপদের অধিকারী হয়েছেন। দুই ছেলেকে যথাযথ পড়িয়ে মানুষ করেছেন। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমির ওপর সুন্দর তিনতলা বাড়ি করেছেন। আমরা বাংলাদেশ হওয়ার পর গিয়ে দেখে এসেছি।
‌ভারতীয় আলী সাহেব মাঝে মধ্যে তাঁর পাকিস্তানি পরিবারে গিয়ে থাকতেন। পত্নীর সেবাযত্নে, পুত্রদের সাহচর্যে শরীর–মন দুইই ভাল হয়ে উঠত। কিন্তু বেশি দিন থাকতে পারতেন না।
বিশ্বভারতীর কার্যকাল শেষ হলে বোলপুরে নিচুপটিতে একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। আর কলকাতায় ৫ নম্বর পার্ল রোডে। পার্ক সার্কাস মার্কেটের কাছে। সহচর সেই কাটু।
আমাকে মাঝেমধ্যেই ডাকতেন পোস্টকার্ডে— সম্বোধন কখনও ভানু ভাই, কখনও ভানু মিঞা, অনেকদিন আসোনি। একবার আসবে?‌
একদিন অধ্যাপক বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছি বোলপুরে। বন্ধুর শখ আলী সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। দেখি লেখা চলছে— দেশ পত্রিকার জন্য লেখা। মাঝপথে সেটা থামিয়ে রেখে গল্পে মত্ত এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। বিষয় সুপুরি, কোথায় ভাল সুপুরি হয়, কোথায় সুপুরির ব্যবসা ভাল। ভদ্রলোকটির সুপুরির ব্যবসা বোঝা গেল।
মুজতবা বলছিলেন, সুপুরি সবচেযে ভাল হয় অসমে। অনেক বড় হাট সুপারির ওখানে। গুয়ার হাট থেকে গৌহাটি নাম। সাহেবরা তো গুয়াহাটি বলতে পারে না।
প্রসঙ্গত বলি, তখনও গৌহাটি নাম চালু ছিল। গুয়াহাটি–‌তে বদলায়নি।
এতক্ষণ কাটু ছিল না। বাজার থেকে ফিরে আসতে মুজতবা বললেন, কাটু, এই তোমার বন্ধু এসেছেন। আমি এতক্ষণ অতিথি আপ্যায়ন করছিলাম। এবার তুমি দ্যাখো।
আমাদের বললেন, একটু বোসো, লেখার এই প্যারাটা শেষ করে নিই।
তারপর লেখা হলে গুছিয়ে নিয়ে বললেন, ভানু ভাই, তোমাকে আমার একটা উপকার করতে হবে।
হাজরার কাছে দেওদার স্ট্রিটে আমার এক বন্ধু ব্যারিস্টার আছেন ড.‌ তাপস ব্যানার্জি। তাঁর কাছে কিছু কাগজপত্র পৌঁছতে হবে। এই পাবলিশারটি টাকাপয়সা দিচ্ছে না অনেকদিন, তার বিরুদ্ধে মামলা। (নামটা এখানে করলাম না,‌ অনেকদিন ধরে মামলা চলছিল)‌ তোমাকে আমার হয়ে একটু তদ্বিরের কাজও করতে হবে।
আমি বললাম, সে আর এমন শক্ত কী?‌
এবার আলী সাহেব আমার বন্ধুকে বললেন, সাহেব, আপনার কী করা হয়?‌
বন্ধুটি নিজের পরিচয় দিলেন, ইংরেজির অধ্যাপক। এ কথা, সে কথার পর বন্ধুটি হঠাৎ বলে বসলেন, আপনি লিখছিলেন, আমাদের জন্য, তারপর পরিচারকের বন্ধুর জন্য আপনার অনেক সময় নষ্ট হল।
‌আলী সাহেব বললেন, বলছ কী হে অধ্যাপক, ভানু আমার পাবলিশার। সে তো আমার প্রয়োজনেই এসেছে, তুমি তার বন্ধু, তুমিও আমার অতিথি, আর কাটু আমার পরিচারক হতে পারে, কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে তার বন্ধু তো আমার অতিথি। অতিথি দেব বন্ধু। কাটু নেই, তার বন্ধুকে আপ্যায়ন করা তো আমার কর্তব্য।
ততক্ষণে কাটু আমাদের চা–‌খাবার নিয়ে এসেছে।
আলী সাহেব বললেন, হ্যাঁরে, বন্ধুকে দিয়েছিস?‌
কাটু ঘাড় নাড়ল। আলী সাহেব আমার বন্ধুকে বললেন, ওর নাম কাটু। কাটু কেন জানো?‌ ও বাজার করে, সবজি কাটে, মাছ এলে মাছ কাটে, দরকার হলে আমার পকেটও কাটে।
কাটু হাসল। আমাকে অনেকদিন থেকে চেনে। তার অমায়িক অমলিন হাসি কেন যেন খুব ভাল লাগত। আলী সাহেবের অনেকদিন পরিচর্যা করেছে। আলী সাহেবও ভালবাসতেন পুত্রবৎ।
তারপর আমাদের একটি অনূল্য উপদেশ দিলেন, উপদেশ ঠিক নয়, উপদেশমূলক ঘটনার কথা বললেন। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের জীবনের। এক হকার গরমের দিনে বিদ্যাসাগর মশাইয়ের কাছে একটি কাগজ দিতে এসেছে। তার ঘর্মাক্ত কলেবর দেখে বিদ্যাসাগর মশাই বললেন, চৌবেজি বড় ঘেমে গেছো, বসো একটু। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করলেন। তারপর উঠে গিয়ে এক গেলাস জল ও বাতাসা একটি এনে বললেন, এটা নাও চৌবেজি। চৌবে সলজ্জ ভঙ্গিতে, এ সব আবার কেন, বলে খেয়ে বিদায় নিলেন।
সেখানে বিদ্যাসাগরের এক বন্ধু উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, একটা হকারের জন্য আপনার এটা বড় বেশি আদিখ্যেতা।
বিদ্যাসাগর বললেন, বলছ কী হে, হকারি করলেও ও তো ব্রাহ্মণ, চৌবে মানে চতুর্বেদী। আমি পেটের দায়ে লিখি, ও পেটের দায়ে হকারি করে। এই যা তফাত, তা না হলে তো দুজনেই এক সারিতে দাঁড়িয়ে।
বুঝলে অধ্যাপক কখনও কাউকে ছোট করতে নেই। বৃত্তি যাই হোক।
তারপর নানা কথা উঠল। ভাষার কথা। হঠাৎই আলী সাহেব আমার অধ্যাপক বন্ধুকে বললেন, বলো তো ভায়া, এই যে আমরা বলি, এই রোদ্দুরে কোথায় রোঁদে বেরোবে, এই ‘‌রোঁদে’‌ কথাটা কোথা থেকে এসেছে?‌
অধ্যাপক বন্ধু বললেন, এ তো সহজ, ইংরেজি ROUND‌ থেকে রোঁদে’‌ এসেছে।
আলী সাহেব বললেন, ওই তো অধ্যাপক ভায়া, ঠকে গেলে। ইংরেজি ROUND‌ থেকে যদি ‘‌রোঁদে হয়, বিদ্যাসাগর মশাই POUND‌ থেকে সেটা করলেন না কেন?‌ উনি লিখলেন ‘‌পৌণ্ড’‌। কথাটা আমিও উচ্চারণ করতে পারলাম না, যদিও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অক্লেশে লিখেছেন। তাঁর অভিধানে।
তারপর বললেন, জানো ভায়া, ভানুও শোনো, ‘‌রোঁদে’‌ শব্দটা এসেছে ফরাসি শব্দ 'RONDE'‌ ‌থেকে। চন্দননগরে ফরাসিরা বলত, Policemen et‌ ronde,‌ ‌অর্থাৎ ডিউটিতে। ফরাসি উচ্চারণে শোনাত ‘‌রোঁদে’‌। তাই থেকে পুরুষ–মেয়ে সবাই লিখল ‘‌রোঁদে’‌। গিন্নিকে কেউ জিজ্ঞেস করল, কর্তা কোথায়?‌ গিন্নি বললেন, কোথায় ‘‌রোঁদে’‌ বেরিয়েছেন কে জানে। মেয়েরাও শিখল। চন্দননগরের যত মেয়ের বিয়ে হল বাংলার বিভিন্ন জায়গায়, তারা ‘‌রোঁদে’‌র মতো অন্যান্য ফরাসি শব্দও নিয়ে গেল। বাংলা ভাষায় যত ফরাসি শব্দ দ্যাখো, সব চন্দননগরের মেয়েদের কীর্তি। মায়েদের মুখ থেকে শিশুরাও শুনে শুনে বড় হল। আর মায়ের মুখ থেকে শেখা বলে, নিজের ভাষাকেও আমরা বলি মাতৃভাষা। পিতৃভাষা কখনও শুনেছ?‌
এই কথাগুলি আমি জীবনে ভুলিনি। পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নামে তাঁর মূল্যবান বইটিও এই তত্ত্বের ভিত্তিতে লেখা।
রবীন্দ্র–‌সাহচর্য তাঁর দৃষ্টি নানা দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মনকে উদার, প্রসারিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে একবার দেখা করতে গিয়েছিলেন আলী সাহেব।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দেখেই যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন। বলেছিলেন,
ইচ্ছে করে তোদের এনে রাখি, ছাত্ররা তোদের দেখলে উজ্জীবিত হবে। আবার ভাবি, আমার সে পয়সা কোথায় যে তোদের এনে রাখব।
তবু আলী সাহেব বলেছিলেন, আপনি বলবেন যখনই দরকার হবে, চলে আসব।
রবীন্দ্রনাথ শেষ কথা বলেছিলেন, হ্যাঁ রে সে অবতার কবে আসবেন রে কাঁচি আর ক্ষুর নিয়ে?‌
আলী সাহেব সবিস্ময়ে বলেছিলেন, অবতার তো আসেন গদা নিয়ে, শঙ্খ চক্র নিয়ে, কাঁচি– ক্ষুর তো শুনিনি!‌
হ্যাঁ রে, তাই তো এবার দরকার, টিকি আর দাড়ি সব কামিয়ে একাকার করে দেবেন। হিন্দু–‌মুসলমান আর কতদিন আলাদা–‌আলাদা থাকবে!‌
মুজতবা লিখেছেন, আমি মুসলমান বলেই বোধহয় গুরুদেবের কথা উপলব্ধি করতে পারব ভেবেছিলেন।

এরপর একদিন পার্ল রোডের বাড়িতে গেছি পার্ক সার্কাসে। এক প্রকাশক বন্ধুর পিতৃবিয়োগ, আলী সাহেবেরও বই ছেপেছেন সে প্রকাশক। কথা ছিল, আমি ওঁকে ট্যাক্সিতে নিয়ে ব্রজবাবু, উক্ত প্রকাশকের বাড়ি পৌঁছব। গিয়ে দেখি বন্ধু–‌বান্ধব সমাবৃত হয়ে হুইস্কি পান চলছে। আমি গিয়ে সবিস্ময়ে বললাম, এ কী, আপনি তৈরি হননি, আজ ব্রজবাবুর পিতার শ্রাদ্ধ।
উনি লজ্জিত হয়ে বলে উঠলেন, এই ঝান্ডুগুলোর জন্য সকালবেলা বিপত্তি হয়ে গেল। এই ওঠো ওঠো সব। ভানু একটু বসো, আমি চট করে তৈরি হয়ে নিই।
বন্ধুরা বা ঝান্ডুরা সম্ভবত আমাকে গাল পাড়তে পাড়তে উঠল। আলী সাহেব মুখে– চোখে জল দিয়ে ধুতি–পাঞ্জাবি কোহালাপুরি চটি পরে বেরোলেন। জল দিলেও ফর্সা রঙে আঙুর–‌রসের রক্তিমাভা এড়াবেন কী করে!‌
‌যাই হোক, যখন গিয়ে পৌঁছলাম, তখনও শ্রাদ্ধকর্ম চলছে। এক পাশে দাঁড়িয়ে আলী সাহেব বিনীত ভাবে বললেন, দেখুন আমি মোসলমান, আপনারা যদি অনুমতি করেন, আমি একটু গীতাপাঠ করি।
ব্রজবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কী বলছেন আলীদা, আপনি আমার কাছে বড় ব্রাহ্মণ, আমি আসন আর গীতা আনছি। 
আলী সাহেব বললেন, গীতা লাগবে না, একটা আসন হলেই চলবে।
আসন এল। আলী সাহেব আসন–‌পিঁড়ি হয়ে বসে গীতার একাদশ অধ্যায় পুরো আবৃত্তি করলেন।
এই ঘটনা আমার কাছে আজও এক পরম বিস্ময়। কী অসামান্য স্মৃতিশক্তি!‌

বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় আলী সাহেবের দিন অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে কেটেছে। ফোন–চিঠির আদানপ্রদান একেবারে বন্ধ। স্ত্রী চিঠি পাঠান বিলেতে আত্মীয়র কাছে, সে আত্মীয় সেই চিঠি পাঠান আলী সাহেবের কাছে। আসতে একুশ দিন লাগত। চিঠি পেয়েই আনন্দ হত, আবার উদ্বেগও। এই চিঠি তো একুশ দিন আগে লেখা, এখন বেঁচে আছে তো বউ, ছেলেরা!‌
বাংলাদেশের যুদ্ধ থামতেই বন্ধুরা ওঁকে নিয়ে ঢাকা গেলেন। তাঁদের মুখে শুনেছি, হাসি– কান্নায় মেশা সে মিলন দৃশ্য। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে বেশ কিছু বুদ্ধিজীবীকে আলোচনার জন্য ডেকে হত্যা করে। আহূতদের মধ্যে সৈয়দ–‌পত্নী রারেয়া আলীর নাম ছিল। কী ভাগ্য, কে যেন ওঁকে যেতে বারণ করে। তা না হলে শেষ জীবনে পত্নী সেবা ভাগ্যে জুটত না।
আমি পরে রারেয়া বউদিকে বলেছিলাম, আপনি ধরে বেঁধে আপনার কাছে রাখলে ওঁর স্বাস্থ্য ভাল থাকত।
বউদি বলেছিলেন, চেষ্টা কি করিনি ঠাকুরপো, খুব করেছি। কিন্তু উনি বোলপুর বা কলকাতার জন্য ছটফট করতেন। মনে হত, জলের মাছকে ডাঙায় জোর করে রেখেছি।
বাংলাদেশ হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম, উনি এবার ওখানেই থাকবেন। কিন্তু তা হল না। বছর দেড়েক বাদে কলকাতা পার্ল রোড থেকে ফোন এল, ভানু মিঞা, একবার দেখা কোরো। 
গেলাম, বললাম হঠাৎ আবার এলেন কেন?‌ বেশ তো বউদির যত্নে শরীর সারছিল।
আলী সাহেব বললেন, আসলে কী যেন, এত হঠাৎ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু হল। আর সহ্য হচ্ছিল না। যাওয়ার আগে তুমি তো দেখেছিলে, আমি লাওৎসে নিয়ে ডুবেছিলাম। আসলে ধর্মের আসল উপলব্ধি মনে। বাহ্যিক আড়ম্বর আমার একেবারে সহ্য হয় না।
আমি বললাম, আপনার শরীর কিন্তু এখনও পুরো সারেনি। এখানে তো দেখছি কাটুও নেই। আপনার সেবা–‌যত্ন ঠিক ঠিক না হলে শরীর আবার ভাঙবে। বললাম, কিছু টাকা নিয়ে এসেছি। যদি দরকার পড়ে আরও, জানাবেন।
যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হল। আবার অমিতাচার। আবার শরীর খারাপ। গৌরী আইয়ুব একই বাড়িতে থাকতেন। তাঁরা সবাই মিলে ওঁকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন।
আমরা ফোনে যোগাযোগ করলাম। স্ট্রোক একটা হয়েছে। তবে চিকিৎসা চলছে। তখন শেয়ালদা স্টেশনে দিনের উল্লেখযোগ্য খবর টেলিভিশনের মতো সংক্ষেপে দেওয়া হত।
একদিন বাড়ি ফেরার সময়ে দেখলাম –‌ ১৯৭৪–‌এর ১১ ফেব্রুয়ারি, আলী সাহেব আমাদের ছেড়ে গেছেন।

যে মানুষটি নিজে ধর্মনিষ্ঠ হয়েও মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, দেশভাগ তাঁর পরিবারটিকেই যেন করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করেছিল। একটাই সান্ত্বনা শেষ জীবন তিনি পরিবারের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। অকাতরে নানা ভাবে বাংলা সাহিত্যের সেবা করেছেন। আমরা নরসিংহ দাস পুরস্কার ছাড়া আর কোনও ভাবে তাঁকে সম্মানিত করিনি। শুধু অসংখ্য পাঠকের অনুরাগ ও ভালবাসা তিনি পেয়েছেন এইটাই বড় সান্ত্বনা আমাদের কাছে।

 

ছবি: দেবব্রত ঘোষ ‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top