সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণায় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

কোনও একটা ব্যাপারে কারও খুব নাম হয়ে গেলে সেটাই তাঁর খুব বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। অন্যান্য ক্ষেত্রেও যে তাঁর কিছু গুণপনা রয়েছে লোকে সেদিকে সবসময় খুব একটা নজর দেয় না। সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রকার হিসেবে কতটা নাম করেছিলেন, সে তো সবাই জানে। ফলে মুশকিল হল যে, সত্যজিৎ রায়ের কথা উঠলেই তাঁর চলচ্চিত্র ছাড়া এবং চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্য কোনও পরিচয়ের কথা অনেকে ভাবতেই চায় না। অথচ এই মানুষটি অন্যান্য নানা দিকে যথেষ্ট গুণী ছিলেন। যেমন, উনি কিছু কিছু অনুবাদ করেছিলেন। অসাধারণ সে অনুবাদ। একটা নাম করি— ‘ব্রাজিলের কালো বাঘ’। তাছাড়াও আর্থার ক্লার্কের কিছু গল্পও। অতি চমৎকার সে সব গল্প। এতটাই চমৎকার অনুবাদ করেছিলেন যে, আমরা বুঝতেই পারি না, সেগুলো একটা ভাষান্তরিত ব্যাপার। মনে হয়, এই ভাষাতেই বুঝি লেখা হয়েছিল!‌ উনি ছড়াও লিখতেন চমৎকার। কিন্তু ছড়া বেশি লেখেননি। আমি ইতস্তত, পাঁচ–ছটা পড়েছি। সেগুলো ছড়ার অনুবাদ। যেমন গল্পের অনুবাদের কথা বললাম, তেমনি ছড়ার অনুবাদও অসম্ভব ভাল করতেন। বাবা সুকুমার রায়ের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। লিয়ারের কিছু ছড়াও। যাকে আমরা ননসেন্স রাইম বলি। তার মধ্যে একটা হচ্ছে বেশ বড় অনুবাদ, ‘পাপাঙ্গুল’। এগুলো বেরিয়েছিল, কিন্তু তাঁর কোনও বইয়ের মধ্যে যায়নি বলে স্মৃতিতে নেই। অনেকে তো আবার পড়েনইনি। আর যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। তাঁদেরও স্মৃতি এই অনুবাদ সম্পর্কে অনেক ধূসর হয়ে গেছে। 
সত্যজিতের গুণপনার মধ্যে দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা হচ্ছে তাঁর গল্প। ওই সিনেমার যে সব গল্প উনি লিখেছিলেন, তার যে সিনারিও করে দিয়েছিলেন, এগুলো নয়, আমি বলছি, তাঁর গল্পের বইয়ের কথা। বিভিন্ন রকমের গল্প। আমি এখানে সত্যি কথাটা বলি, তাঁর খুব বেশি নাম হয়েছিল ফেলুদা লিখে। ফেলুদাকে নিয়ে অনেকগুলি বই আছে। কিন্তু ওর চেয়েও অনেক ভাল গল্প উনি লিখেছিলেন। ওঁর যে একটিমাত্র ছোটদের উপন্যাস আছে, ‘ফটিকচাঁদ’, সেটা আমিই ওঁকে দিয়ে লিখিয়েছিলাম। সেটা আনন্দমেলায় বেরিয়েছে। উনি কিন্তু দ্বিতীয় কোনও ছোটদের উপন্যাস লেখেননি। আমি একেবারে ঝুলে পড়েছিলাম। ওঁকে মানিকদা বলতাম। আমার চেয়ে বয়সে তিন বছরের বড়। ওঁর খুব নাম কিন্তু ফটিকচাঁদ–এর জন্য নয়, ফেলুদা লিখে। আরেকটা হচ্ছে, প্রফেসর শঙ্কু। এর মধ্যে কেউ ফেলুদার ভক্ত, কেউ প্রফেসর শঙ্কুর। আমি এ দুটোই খুব পছন্দ করি। তবুও তুলনামূলক বিচারে ফেলুদার চাইতে প্রফেসর শঙ্কুর গল্প আমার আরও বেশি মজার লাগে। কিন্তু যেখানে ওঁর আসল গুণপনা প্রকাশ পেয়েছে বলে আমার মনে হয়, সেগুলো নিজস্ব গল্পগুলো। প্রথমে তো এক ডজন গল্প লিখলেন, তারপর আরও এক ডজন। তারপর আরও বারো লিখলেন ইত্যাদি। গল্প খুব কম লেখেননি। প্রত্যেকটি গল্প স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। ঝকঝক করছে। কত রকমের গল্প লিখেছেন!‌ তার মধ্যে প্যারাসাইকোলজির গল্প আছে, ভূতের গল্প আছে, নানান রকমের গল্প। এবং সে সব গল্পের তুলনাই নেই। আরেকটা ব্যাপার সত্যজিৎ সম্পর্কে বলি। যেটা হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। সেটা হচ্ছে গিয়ে সম্পাদক সত্যজিৎ। যেটায় তাঁর কোনও তুলনাই নেই। ওঁদের সন্দেশ পত্রিকা প্রথম বের করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি। উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর কিছুদিন সুকুমার রায়। সুকুমার খুব ক্ষীণায়ু মানুষ। অল্পবয়সে মারা গিয়েছিলেন। তারপরেও সুনির্মল রায়রা কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভালভাবে চালাতে পারেননি। কাগজটা বন্ধ হয়ে যায়। আমার ছেলেবেলায় আমি কিন্তু সন্দেশ দেখিনি। না উপেন্দ্রকিশোরের সন্দেশ দেখেছি, না সুকুমার রায়ের। সুনির্মল রায়দের সময় কিছুদিন যে চলেছে, সেটাও দেখিনি। আমার ছেলেবেলায় এই কাগজ তখন লুপ্ত হয়ে গেছে। ষাটের দশকে, ১৯৬০, তখন আমার অনেক বয়স, তখন নতুন করে যে সন্দেশ বের হয়েছে, তার সম্পাদক সত্যজিৎ। উনি সঙ্গে রেখেছিলেন সুভাষ মুখুজ্যেকে। ওই সন্দেশের কোনও তুলনাই নেই। তাতে ওঁর ছবি যেমন ছিল, ওঁর গল্প নির্বাচন ছিল, ওঁর নিজের গল্প তেমনই ছিল। তাছাড়া ছিল নানান রকম ধাঁধা, মজা ইত্যাদি। সম্পাদনার যে কাজটা করেছিলেন, সে কাজটা আমার কাছে এখনও পর্যন্ত সেরা। কত তো ছোটদের পত্রিকা পড়ি!‌ ছেলেবেলায় পড়েছি রামধনু, মৌচাক, মাসপয়লা। সবই ভাল। কোনওটাই খারাপ নয়। কিন্তু ষাটের দশকে যে সন্দেশ বেরিয়েছে, তার কোনও তুলনা আমি খুঁজে পাইনি। বস্তুত, আমি যখন ‘‌আনন্দমেলা’‌ বের করি, তখন আমার তো ছোটদের কাগজ চালানো সম্পর্কে কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমি ছিলাম পাঠকমাত্র। ছোটদের লেখক হেমেন্দ্রকুমার রায়ের গল্প পড়েছি, সুনির্মল বসুর ছড়া পড়েছি, এইরকম। আমি তখন আনন্দবাজারে। সেটা ১৯৭৫। আমাকে বলা হল, আমরা আনন্দমেলা বের করছি, আপনাকে সম্পাদনা করতে হবে। কী করি। আমি একটা কাজ করলাম। ছেলেবেলাটা মনে মনে পুনর্গঠন করে নিলাম। ছেলেবেলায় কী পছন্দ করতুম। যেমন, ভালবাসতাম অ্যাডভেঞ্চার গল্প, হাসির গল্প, ভূতের গল্প। ভালবাসতুম খেলাধুলো সম্পর্কে লেখা, অত্যন্ত মজাদার সব ধাঁধা। তখন মনে হল, এই ভাললাগার ব্যাপারটা সবই তো ষাটের দশকে সন্দেশে ছিল। তাই ওই ষাটের সন্দেশই আমার রোল মডেল হয়ে উঠল। পুরোনো সন্দেশে অসাধারণ সব ধাঁধা থাকত, যা আমার এখনও কিছু কিছু মনে আছে। পুরোনো সন্দেশ আমি দেখিনি, লাইব্রেরিতে বাঁধানো ছিল। তা থেকেও কিছু কিছু ছাপিয়ে দিতাম। একটা মজার মিল দেওয়া ছড়ার কথা বলি— ‘‌হরুবাবু কাজ নিয়ে গেছেন জাপান, টাকাকড়ি এনে দেন যখন যা পান।’‌ এই জাপানের সঙ্গে আরেক যা পান–এর মিল। এই সম্পাদক সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের আড়ালে পড়ে গেছেন। 
তবে চলচ্চিত্রের সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটানোর সুবাদে ওঁর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নজরে পড়েছে। জেনেছি, কেন ওঁর বিশ্বখ্যাতি। এই অবসরে, সেটাও পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিই। সিনেমা নিয়ে আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল। কীভাবে ব্যাপারটা হয়, কীভাবে ছবি তোলে। একদিন ওঁকে সাহস করে বললাম, ব্যাপারটা দেখতে চাই। উনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি। বললেন, চলুন লখনউয়ে, ‘‌সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’র শুটিং দেখবেন। অফিসকে বললাম, সত্যজিতের ঘরের ঠিক উল্টোদিকের ঘরটা ব্যবস্থা করে দিতে। ‌এই ছবির শুটিংয়ের সময় বেশ কয়েকটা দিন ওঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলাম লখনউয়ে আর কলকাতায়। তার আগে শুটিং দেখার অভিজ্ঞতা বলতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছবি ‘বিশ বছর বাদে’। প্রেমেনদাই নিয়ে গিয়েছিলেন। একটা লোক বাড়ি থেকে চলে গিয়ে ২০ বছর পরে ফিরে আসে। সে খুব মজার ঘটনা। প্রকৃত অর্থে শুটিং বলতে যা বোঝায়, তা দেখা ওই ‘‌সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’তেই। শুটিং ব্যাপারটার সঙ্গে আমার দেখা এক লেখকের লেখার বেশ মিল পাই। নামটা বলেই দিই— সুবোধ ঘোষ। সাধারণত গল্প লেখকরা কী করেন। লিখতে বসলেন। আজকে খানিকটা লিখলেন, পরের দিন, আগের দিন যেখানে শেষ করেছেন, তার পর থেকে লিখতে শুরু করলেন। হয়তো সেদিনও শেষ হল না, তার পরের দিন। এইভাবেই গল্প লেখা হয়। কিন্তু সুবোধ ঘোষ এক অদ্ভুত কায়দায় লিখতেন। উনি তিন স্লিপ করে লিখছেন, এক দুই তিন নম্বর দিয়ে কম্পোজে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আবার তিন স্লিপ লিখছেন, পাঠিয়ে দিচ্ছেন। লেখা হয়ে গেলে নিজে প্রেসে গিয়ে যেগুলো কম্পোজ হয়ে আছে সেগুলো সাজাতেন। একের পরে পাঁচ বসাচ্ছেন, পাঁচের পরে তেরো, এইভাবে। ওইভাবে সাজিয়ে কীভাবে একটা গল্প খাড়া করতেন, দেখে অবাক লাগত। সিনেমা জগতের লোকেরাও ঠিক তাই করেন। ‘‌সতরঞ্চ কি খিলাড়ি’‌র কথাই ধরুন। গল্পের প্রায় সবটাই লখনউয়ের। কিন্তু কিছুটা শুটিং হল কলকাতায়, কিছুটা লখনউয়ে। যেটা লখনউয়ে না গেলেই হবে না, সেই অংশটা ওখানেই করলেন। ওখানে দশদিন ছিলাম ওঁর সঙ্গে। কলকাতায় স্টুডিওতে লখনউয়ের মচ্ছিমহল ইত্যাদি সেট বানিয়ে দিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত। রিচার্ড অটোনবরোর অংশটা হল কলকাতার স্টুডিওয়। সেখানেও গেছি। লখনউয়ে গিয়ে অবাক। উনি তো ধরবেন নাইনটিন্‌থ সেঞ্চুরি, মানে ১৮৫৭–র সিপাহি বিদ্রোহের সময়টাকে। তখনকার লখনউ আর এখনকার লখনউ তো এক নয়!‌ উনি গিয়ে তখনকার রাস্তাঘাট সব বানিয়ে নিলেন। যেমন তখনকার লখনউয়ের রাস্তায় স্ট্রিট ল্যাম্প ছিল না। কর্পোরেশনকে বলে রাস্তার সমস্ত আলো সরিয়ে দিলেন। তখন ছিল তবকওলা পান। ওইসব খুঁজতে কী ঘোরান যে ঘুরেছি, ভাবা যাবে না। সকালবেলা বেরিয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে লখনউয়ের বাজারে চলে গেলাম। গিয়ে এক জায়গায় ধুপ ধুপ ধুপ করে শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমায় বললেন, ওটা কীসের শব্দ জানেন? আমি বললাম, না। উনি বললেন, তবক বানানো হচ্ছে। রুপো, সত্যিকারের রুপো পেটাতে পেটাতে হালকা ফিনফিনে হয়ে যাচ্ছে। লখনউয়ের হাটবাজার, রাস্তাঘাট সমস্ত নতুন করে তৈরি করে শুটিং করলেন। যেখানে দাবা খেলাটা হল, সেটা লখনউ থেকে ১২–১৪ মাইল দূরে একটা গ্রাম। সেই গ্রামে গিয়ে ওই দৃশ্যগুলো তোলা হল। গ্রাম পাল্টায় না, পাল্টায় শহর। তখনকার গ্রাম ঠিক বেছে বেছে বের করলেন। সেখানে পুরো একদিন। তখন ঘুড়ি ওড়ানোর কম্পিটিশন হত। মেড়ার লড়াই, মুরগির লড়াই, এগুলো হত। সমস্ত লোকজন জোগাড় করে সেগুলো আবার রিঅ্যারেঞ্জ করলেন। সব লখনউতেই হল। বাদবাকি সমস্তটা হল কলকাতায়। তার মানে কী?‌ তার মানে, ছবিগুলো আমি দেখলাম, এখান থেকে ওখান থেকে নিয়ে সাজিয়ে ফেলা। সব মিলিয়ে একটা কমপ্লিট হল। যখন হল, তখন আর বোঝাই গেল না যে এটা এইভাবে হয়েছে!‌ 
হোটেলে ওঁর উল্টোদিকের ঘরে থাকতাম। রোজই একসঙ্গে বেরোতাম রাস্তায়, বাজারে। কখনও ওঁর ঘরে বসে গপ্পো করতাম। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম, কী পরিমাণ সময়নিষ্ঠ। দশটার সময় কাজ শুরু করতেন, পাঁচটায় বলতেন প্যাক আপ। তবে যেদিন ওই গ্রামে যাব, গ্রামটা তো অনেক দূরে, যেতে গেলে ভোর পাঁচটায় রওনা হতে হবে। তখন শীতকাল। আমাকে বললেন, নীরেন, কাল কিন্তু আমাদের ভোর সাড়ে চারটের সময় হোটেলের লাউঞ্জে নেমে আসতে হবে। পাঁচটা নাগাদ বেরোনো। আমি তো অত ভোরে উঠতে পারি না!‌ ওয়েক কল দিয়ে রাখলুম। ওরা চারটের সময় ডেকে দিল। উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে নিচে নামলাম। নেমে আমি অবাক। আমার সামনের সোফায় বসে আছেন সঞ্জীবকুমার!‌ ওঁর ডাকনাম হরি। দেখলাম, বসে বসে একটু ঢুলছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌আপনার এত সকালে ওঠা অভ্যাস আছে? কখন ঘুম থেকে ওঠেন?’‌ বললেন, ‘‌আমি বারোটার আগে ঘুম থেকে উঠি না।’‌ তাহলে আজকে কী করে?‌ উত্তরে খুব মজার কথা বললেন— ‘‌বিকজ ইট ইজ সত্যজিৎ রায়।’‌ তবে সত্যজিৎ রায় কিন্তু পাঁচটার পরে আর কাজ করতেন না। আরেকটা জিনিসও দেখেছি, সেটা হল যাকে বলে র ফিল্ম, তা একদম বাজে খরচা করতেন না।
আমি একবার রিচার্ড অটোনবরোর ইন্টারভিউ করেছিলাম। ওঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি নিজে তো একজন বড় ডিরেক্টর, আপনি অন্য পরিচালকের অধীনে কাজ করতে চট করে রাজি হয়ে গেলেন কী করে?‌ উনি তার উত্তরে বলেছিলেন, এই লোকটাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। কবে থেকে করি সেটাও বলে দিচ্ছি। একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমরা দুজনেই বিচারক ছিলুম। সত্যজিৎও ছিল, আমিও ছিলাম। সেখানে ওঁকে অনেক প্রশ্ন করা হচ্ছে। ‘‌পথের পাঁচালী’‌ নিয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন— ‘‌পথের পাঁচালী’‌তে একটা ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করতুম, দেয়ার ওয়াজ আ লিরিক্যাল কোয়ালিটি অ্যাবাউট ইট। এই লিরিক্যাল কোয়ালিটি, যেমন, আপনার ক্যামেরা একটা কচুপাতার ওপরে, সঙ্গে সঙ্গে সরে যাচ্ছে না। কচু পাতাটার ওপর একবিন্দু জল জমে রয়েছে। খানিকটা দেখে আবার সরে যাচ্ছে। একটা ফড়িং কোথাও বসে আছে। আপনার ক্যামেরা ফড়িংটার ওপর পড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে সরে যাচ্ছে না, খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছে। তার মধ্যে লিরিক্যাল কোয়ালিটি ছিল। আপনার এখনকার ছবি অনেক বেশি দ্রুত। আপনি ওরকমভাবে ক্যামেরাকে কোথায় দাঁড় করিয়ে রাখেন না। ওটার সহজ উত্তর দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। এই নিয়ে অনেক ফিলোজফাইজ করতে পারতেন। করেননি। খোলাখুলি বলেছিলেন, ‘‌আই ডিড নট হ্যাভ আ ট্রলি দেন।’‌ একটা ট্রলির ওপর ক্যামেরাটা বসিয়ে ঘোরাব, তার উপায় ছিল না। আমাকে হাতে নিয়ে ঘোরাতে হত।  ওই ভারী ক্যামেরা হাতে নিয়ে নিয়ে ঘুরতে হত!‌ এইটুকু বলে অটোনবরো বললেন, এই লোকটা সত্যবাদী লোক। তখন থেকেই ওঁকে শ্রদ্ধা করি। তাই উনি যখনই আমায় বললেন, আমি এককথায় রাজি হয়ে গেলাম।’‌ উনি টালিগঞ্জ পিরিয়ডটা করেছেন। পরে যখন ছবিটা তোলা হয়ে গেল, আমাকে আরেকটা কথা উনি বলেছিলেন। বলেছিলেন, একটা ব্যাপার দেখে আশ্চর্য হই। সেটা হচ্ছে, উনি একবার শট নিয়েই ওকে। এই সাহসটা কোথা থেকে আসে? ওঁর ফিল্মে এনজি বলে কিছু নেই!‌ তার কারণ, উনি প্রযোজকের পয়সা খোলামকুচির মতো ওড়াতেন না।
ওই ক’‌টা দিন সত্যজিতের সঙ্গে না কাটালে ওঁর সম্পর্কে অনেক কিছু অজানাই থেকে যেত।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top