‘‌লোটাকম্বল’‌, ‘‌সোফা কাম বেড’‌, ‘‌শ্বেত পাথরের টেবিল’‌–‌এর মতো অজস্র লেখা   নিয়ে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। ‘‌শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ বইটির জন্য আকাদেমির সম্মান পেলেন রসিকচূড়ামণি, বাঙালি পাঠকের প্রিয় সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। ‘‌লোটাকম্বল’‌ নিয়ে এবার শ্রীকৃষ্ণের রথে উঠে যেন আরও গতি পেল তঁার জয়যাত্রা। বাংলা সাহিত্যে তঁার দীর্ঘ পথচলার কথা শুনলেন সমীরকুমার ঘোষ। এটি নিছকই একটি মাপা এবং চাপা সাক্ষাৎকার নয়, এখানে তিনি হীরে পান্নার মতোই নিজের জীবন ও সৃষ্টির হাসি-কান্নাকে প্রকাশ করলেন মুক্ত মনে।


লোটাকম্বল নিয়ে ‘‌‌ধর্ম’‌তলায়
‘‌লোটাকম্বল’‌কে অনেকে আমার লেখার একটা মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু ওর আগে একটা পর্যায় আছে। আমার জীবনে শিক্ষার নানা পর্ব আছে। প্রথমত ছিলাম দেওঘর রামকৃষ্ণ মিশনের শিক্ষক। শিক্ষকতার ফাঁকে অবসর সময়ে সেখানে একজন শিল্পগুরুর কাছে ছবি আঁকা শিখি। এরপর কলকাতায় এসে আমি গান শিখি। সেটা পরে। রামকৃষ্ণ মিশন এমন একটা জায়গা, যেখানে গান, লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা সবই থাকে। যে সময়ের বিদ্যাপীঠের কথা বলছি, সেই সময় লেখাপড়ার ধরনধারণটা ছিল একেবারে অন্যরকম। এখনকার মতো এত জটিল হয়ে যায়নি। ওটা আবাসিক স্কুল। ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাত্ররা আসত। ফলে একটা অপূর্ব সুন্দর জীবন ওখানে শুরু হয়। বিরাট একটা গ্রন্থাগার ছিল, সেখানে লেখাপড়ারও খুব সুযোগ পেতাম। আমার আসল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকতা নয়, সন্ন্যাসী হব। যে কোনো কারণেই হোক সেটা হল না। কলকাতায় ফিরে এলাম। ফিরে এসে প্রথমেই একটা চাকরির দরকার পড়ল। তখনকার বিখ্যাত ক্যালকাটা কেমিক্যালস–‌এ কেমিস্ট হিসাবে যোগ দিলাম। সেখানে কিছুদিন চাকরি করতে করতেই মিশনের সূত্রে আলাপ হল বিখ্যাত গায়ক রামকুমারবাবুর সঙ্গে। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি অত্যন্ত ভালবেসে গ্রহণ করলেন। সেই আমার পুরতনী, শ্যামাসঙ্গীত এবং রাগসঙ্গীত ইত্যাদির চর্চা শুরু। সেই চাকরি থেকে হঠাৎ চলে গেলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কটেজ অ্যান্ড স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রিজ ডিপার্টপেন্টে। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল, জেলায় জেলায় কী আছে দেখে সেখানে কী কী শিল্প করা যায় তার খতিয়ান তৈরি করা। সে সময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা প্রবল তাড়না এসেছিল। সেই কাজের দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। এখানেই আমার সাংবাদিকতা পেশার শুরু হল বলা যায়। প্রচার তো শুধু পায়ে হেঁটে বা মুখে হয় না, তার জন্য প্রকাশন দরকার। আমার একটা আলাদা দপ্তর হল। সেখান থেকে স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ নিউজ বলে একটা মাসিক কাগজ প্রতিটি জেলার ওপর হ্যান্ডবুক তৈরি করলাম, বিনামূল্যে বিতরণের জন্য। তখন ষোলটা জেলা ছিল। এর সঙ্গে তৈরি হল নানারকম প্রচার, ফোল্ডার, প্যামপ্লেট আর বিজ্ঞাপন। কলকাতায় বড় বড় সাইনবোর্ড পড়ল। এটা ষাটের দশকের কথা। 
তখন কলকাতার যত কিছু আধুনিক বিজ্ঞাপন, কোনোটা টেক্সটাইলের ওপর, কোনোটা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের ওপরে, কোনোটা ক্ষুদ্রশিল্প গড়ার জন্য যুবকদের আহ্বান। বড় বড় হোর্ডিং পড়ে গেল। কলকাতার কিছু বিজ্ঞাপন সংস্থার সঙ্গেও পরিচয় হল। প্রচুর বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। সেই সঙ্গে জেলায় জেলায় ঘুরে ঘুরে সভা করতে হত। 
এই সময়ে একটা অস্থির সময় পেলাম। সেটা মারাত্মক। নকশালপন্থী আন্দোলন। এর জন্য আমি যত ভুগেছি, খুব কম লোকেই এরকম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। যে বাড়িটিতে থাকি, সেটি ছিল বর্ডার জোনে। ওপাশে নকশালপন্থীরা, এপারে অন্যরা। এইটাই ছিল ব্যাটল ফিল্ড। এই সময়েই একটা রাতে ‘‌গ্রেট কিলিং’‌ হল। ঠিক তার আগের রাতেই আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠল। ততক্ষণে বিভিন্ন দিকে গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। বাড়িটাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খুনও হয়েছে অনেকে। রাত বারোটার সময় এক সাইকেলরিকশওয়ালা বলল, ‘‌আপনারা কিছু ভাববেন না, আমি মরে যাই আর যাই হোক, এই মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাব।’‌ সেই অন্ধকার রাত, মাঝে মাঝে বোমা পড়ছে, ওকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। ভোরবেলা তার একটি সন্তান হল। সেই সময় দেখছি, একদিকে কাতারে কাতারে আহত লোক ঢুকছে, ডেডবডি বেরিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে একটি শিশুর ক্রন্দন। ঘটনাটি মনকে নাড়া দিল। তা নিয়েই একটা গল্প লিখলাম। গল্পটা তৎকালীন সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘‌অমৃত’‌য় ছাপা হল। সম্পাদক ভবানী মুখোপাধ্যায় আমায় খুব ভালবাসতেন। এরপর তিনি আমার আরও একটি গল্প ছাপলেন। তৃতীয় গল্পটি নিয়ে যেতে বললেন, এটি তুমি ‘‌দেশ’‌ পত্রিকায় নিয়ে যাও। সেই আমার ‘‌দেশ’‌ পত্রিকায় যাওয়া। একেবারে আনকোরা তরুণ। হাতে একটা গল্প নিয়ে গিয়ে হাজির। তখন প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল কর ছিলেন ছোটগল্প বিভাগের সম্পাদক। তাঁকে গিয়ে দিলাম। তিনি আমায় জিজ্ঞাসাবাদ করে যখন জানলেন, আমি সরকারি দপ্তরে এই এই করি, বললেন, ‘‌একটা গল্প তো একবারই বেরোবে, আচ্ছা আপনি একটা ধারাবাহিক লিখতে পারবেন?‌’‌ শুনে তো আমি থ। উনি একটা স্লিপে লিখে দিলেন— জীবিকার সন্ধান পশ্চিমবঙ্গ। এটি দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এক বছর বেরোল। এবং একটা বিরাট আলোড়ন তৈরি হল। এটা যে শুধুই টেকনিক্যাল আর্টিকল ছিল তা নয়, তার মধ্যে প্রচুর সাহিত্যও ছিল। এটি বই হয়ে বেরনো মাত্রই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেল। এরপরে দেশ পত্রিকায় আমার গল্পও প্রকাশিত হল। প্রথম গল্পটি ছিল ‘‌চকমকি’‌। আমারই এক মহিলা সহকর্মীকে নিয়ে লেখা। গল্পটি বেরনোর পর শ্রদ্ধেয় গজেন মিত্র মহাশয়, বিমল মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র— এঁরা সবাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেশে চিঠি লিখলেন— ‘‌মনে হচ্ছে যেন, একজন নতুন লেখকের আবির্ভাব হল।’‌ এরপর আরও দুটি গল্প। তৃতীয় গল্পটি হল ‘‌শ্বেত পাথরের টেবিল’‌। গৌরী আয়ুব এবং আবু সঈদ আয়ুব আগেও চিঠি লিখে প্রশংসা করেছেন। এটা বেরোতেই তাঁরা চিঠিতে লিখলেন, ‘‌এই লেখক যদি আর কিছু নাও লেখেন, এই একটি গল্পের জন্য বাংলা সাহিত্যে তাঁর নাম থাকবে।’‌ ওই বছরেই আমার প্রথম উপন্যাস দেশ পত্রিকার শারদ সংখ্যায় বেরোল। নাম ‘‌পায়রা’। ওটা সম্ভবত সত্তর দশকের শেষের দিক। এটাও সমাদৃত হল। এগুলো সবই পরে আনন্দ পাবলিশার্স বই হিসাবে ছেপেছে। আমার প্রথম গল্প সঙ্কলন ‘‌শ্বেত পাথরের টেবিল’‌, দ্বিতীয় বই ‘‌পায়রা’‌। পায়রা পড়ে গৌরীদি, মানে গৌরী আয়ুব খুব খুশি। বললেন, ‘‌তুমি পেরেছ’‌। এদিকে আমার সরকারি চাকরি চলছে। তার ব্যস্ততাও তুঙ্গে। ইতিমধ্যে আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হল, ধারাবাহিক লিখতে হবে। এইটা আমার কাছে একটা মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এর মাঝে কিন্তু দেশ–‌এ অনেকগুলো গল্প বেরিয়ে গেছে। ‘‌পায়রা’‌ বেরনোর পর পুজো সংখ্যায় ‘‌মৃগয়া’‌ ইত্যাদি উপন্যাসও পরপর বেরোচ্ছে। এসবের মাঝেই শুরু করলাম ধারাবাহিক। এই আমার ‘‌লোটাকম্বল’‌–‌এর জন্ম। 
রমাপদদা ছক কষে বললেন, তোমার লোটাকম্বল খুব হিট করবে
এ প্রসঙ্গে একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার বলি। আমাকে খুব ভালবাসতেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরি। তিনি বড় জ্যোতিষীও ছিলেন। অনেকেই জানেন, শরদিন্দুবাবু চরিত্র তৈরির আগে একটা ছক তৈরি করতেন। রমাপদদা বললেন, ‘‌দাঁড়াও আমি শরদিন্দুবাবু হই।’‌ জিজ্ঞেস করলেন, কবে লেখা শুরু করব। বললাম, এই দিন, এই তারিখ। উনি শুনে একটা ছক কষে ফেলে বললেন, তোমার উপন্যাসটা খুব হিট করে যাবে। বলে তিনি মুড়ি খেতে খেতে চলে গেলেন। আর সত্যিই তাই হল। সাগরদা ডেকে বললেন, ‘‌সঞ্জীব তুমি তো মাত করে দিলে!‌’‌ যাই হোক, এই হল লোটাকম্বলের জন্মের ক্ষণ। তারপর চলতেই লাগল। ইতিমধ্যে আমার ওই বিভাগটা খুলে গেল— রঙ্গব্যঙ্গ। ‘‌কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই’‌ এবং ‘‌রসেবশে’‌। ছোটদের লেখায় নিয়ে এলেন প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আমার নীরেনদা। বললেন, ‘‌তোকে লিখতেই হবে ছোটদের জন্য।’‌ সেই শুরু হল— রুকুসুকু। এরপর এসে গেল ‘‌বড়মামা মেজমামা’‌। এইভাবে লেখার তিনটে ভাগ হল, একটা হল ছোট গল্প, উপন্যাস, একটা ট্রাভেলগ আর একটা ছোটদের জন্য। এইবার প্রস্তাব এল আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার। আমি তখন ভাল সরকারি চাকরি করি। এককথায় ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম। তবে আনন্দবাজারে ঢোকা মাত্রই মনটা খারাপ লাগছে। একটা বিরাট জায়গা থেকে এলাম। কিন্তু সে দুঃটাও ঘুচে গেল। সবটাই তো মানুষ করে ঈশ্বরের প্রেরণায়। সাতদিনের দিনই সাগরদা ডেকে বললেন, ‘‌রেডি হয়ে নাও, তোমাকে আন্দামান যেতে হবে। চিফ কমিশনার জাহাজটা দেবেন। ওইতে চেপে ফোর এইট্টিএইট আইল্যান্ড আছে, তার মধ্যে যে দ্বীপে যাওয়ার যাবে, ফিরে এসে একটা বই লিখবে।’‌ আমি এক মাস জলে ভেসে পড়লাম। ভারত মহাসাগরে। ফিরে এসে লিখলাম ‘‌ভারতের শেষ ভূখণ্ড’‌। তাতে ছবি দিলেন রঘু রাই। সে একটা হৈচৈ–‌ফেলা বই। তারপর দেশ পত্রিকায় চাকরি শুরু। এখানে এসে থামল না, চলতেই থাকল। 
ভবিষ্যতে আমরা
ছোটবেলায় যে স্কুলে পড়তাম তার নাম বরাহনগর ভিক্টোরিয়া স্কুল। ভিক্টোরিয়া নাম, কারণ কুইন ভিক্টোরিয়ার জুবিলি ইয়ারসে স্কুলটি স্থাপিত। গঙ্গার ধারে চমৎকার একটা স্কুল। সেখানে কিন্তু প্রাচীন পদ্ধতিতেই লেখাপড়া হত। কে কবিতা লিখবে, কে গল্প লিখবে, এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে একদল শিক্ষক এবং ছাত্র আমাদের স্কুলে এলেন। তাঁরা সঙ্গে করে এই কালচারটা নিয়ে এলেন। এদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করেছেন। এ কথাটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পূর্ববঙ্গ থেকে যাঁরা এলেন, তাঁরা কিন্তু আমাদের থেকে কালচারালি অ্যাডভান্স ছিলেন। তখনই ঠিক হল, আমরা স্কুলে একটা দেওয়াল পত্রিকা করব। নাম হল ‘‌ভবিষ্যতে আমরা’‌। বেশ হত। নিজেরাই লিখতাম, ছবি আঁকতাম। তারপর দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। শিক্ষকমশাইরা বাহবা দিতেন। বাইরে থেকে সবাই এসে পড়ে পড়ে যেতেন। এই প্রচেষ্টাকে কেউ হাস্যকর বলতেই পারেন, কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই শুরু হল সাহিত্যচর্চা। ওই দেওয়াল পত্রিকার ছাত্র সম্পাদক আমাকে বললেন, তোমাকে মহাত্মা গান্ধীর ওপর একটা জীবনী লিখতে হবে। গান্ধীর জীবনী লিখতে গিয়ে তাঁর অটোবায়োগ্রাফিটা পড়ে ফেললাম। পড়ে আমার জীবনে তাঁর ছন্দ, তিনি যেমন সিম্পল লাইফ লিড করতেন, মনাস্টিক লাইফ, আমার মধ্যে ঢুকে গেল। এই যে সাধু হব, সাধু হব, এই ভাবটা কিন্তু বিভিন্ন সাধুসন্তর জীবনী পড়তে পড়তেই হয়েছে।
মন্ত্রীদের বক্তৃতা লিখে দিই
আমি যখন সরকারি চাকরিতে, তখন একবার ইচ্ছে হল, পাশেই তো বেতার কেন্দ্র, ওখানে একটা ‘‌টক’‌ দিলে কেমন হয়। এত ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে। পল্লীমঙ্গল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোগ্রাম মজদুরমণ্ডলী–‌র অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমিও মন্ত্রীদের বক্তৃতা লিখে দিই, তাঁরা পড়ে আসেন। নিজে কথিকা লিখি না কেন। একদিন এমনিই গেছি। তখন এত কড়াকড়ি ছিল না। দোতলায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, কোথায় যাব। এমন সময় দেখি, দীর্ঘদেহী, সোনার ফ্রেমের চশমা, ধুতি–‌পাঞ্জাবি পরা, কোঁচা লুটছে, গৌরবর্ণ মানুষ হঠাৎ এসে আমাকে বললেন, ‘‌সঞ্জীব তুমি এখানে?’‌‌ আমি তাকিয়ে দেখি, আমার বাংলার অধ্যাপক। বললাম, ‘‌স্যর আপনি এখানে?‌’‌ উনি বললেন, ‘‌আমি এখানে কথিকা বিভাগের ইন–‌চার্জ।’‌ আমি জানালাম, আমি একটা কথিকা দেব বলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শুনেই আমার হাত ধরে টানতে টানতে চেম্বারে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘‌তুমি এখুনি লিখে নিয়ে এস, সন্ত তুকারাম।’ ১৩ মিনিটের কথিকা প্রচারিত হল। সেই আমার রেডিওয় প্রবেশ। তারপর সরকারি বহু প্রোগ্রাম নিয়ে যাওয়া–‌আসা। টিভি যখন এল, তখন প্রথম শিল্পবিষয়ক প্রচারও কিন্তু আমারই করা। এসবের দৌলতে রেডিও ও টেলিভিশনে অনবরত যাওয়া–‌আসা, ঘনিষ্ঠতা। 
এরপর এল শ্রুতিনাটক। কলকাতার এমন কোনো হল নেই বা বাংলার এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমাদের জুটি, আমি এবং তুলসী রায়, শ্রুতিনাটক করিনি। আর এইদিকেই মানুষের ভাল লাগার খবর পেয়েছি। এ আমার আরেক দিক। 
আমার যিনি শিল্পগুরু, তিনি মানিকদা, মানিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অবনীন্দ্রনাথের ছাত্র। বেঙ্গল স্কুলের। তিনি ছিলেন আর্ট কলেজের অধ্যাপক। আমায় ছবি আঁকা শেখালেন। মজার ব্যাপার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে আমার আঁকা  ছবির প্রদর্শনী হয়ে গেল দুটো। আনন্দবাজারে তা নিয়ে লেখাও বেরোল। আমার কতগুলো জগৎ— গান হল, শ্রুতি নাটক হল, ছবি হল, তারপর সাহিত্য হল। 
এরপর রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বেরোলাম। ইংল্যান্ডের কমনওয়েলথ কনফারেন্স এবং মেক্সিকোয় নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট। বিরাট ভ্রমণ। তা নিয়ে রবিবারের আনন্দবাজারে ধারাবাহিক লিখতে শুরু করলাম ‘‌দানব ও দেবতা’‌। সেটাও খুব প্রশংসা পেয়েছে। অন্য যারা গিয়েছিল, ছোট ছোট রিপোর্ট করল। আমি একটা বড় বই লিখে ফেললাম। এর দৌলতে একেবারে ভূপ্রদক্ষিণ করা হয়ে গেল। মায়া সভ্যতার ওপরেও আমার একটি অথরেটেটিভ বই আছে। 
সভা করতে গেলে মেয়েরা তেড়ে আসত
‘‌শ্বেতপাথরের টেবিল’‌ বেরনোর পর এক সহকর্মী বললেন, ‘‌শিবরাম চক্রবর্তীর পর সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়।’‌ এটা ঠিক নয়, ত্রৈলোক্যনাথের ধারাটাকেই আমি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, মাঝে পরশুরামকে টপকে। আমার ক্ষেত্রটা ছিল ভিন্ন। যা কিছু করেছি মধ্যবিত্তের জীবন থেকে তুলে নিয়ে। আমরা বাড়িতে প্রতিদিন বহু রঙ্গরস তৈরি করছি। দুঃখের মধ্যেও করছি, অশান্তির মধ্যেও করছি। আমি ভাবলাম, আমি একটা এমন অদৃশ্য চক্ষু হব, যে এগুলোকে দেখব। ফলে সবাই বলত, ও বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে গেছে!‌ কোথাও সভাটভা করতে গেলে মেয়েরা তেড়ে আসত। বলত, ‘‌আপনি ভেবেছেনটা কী!’‌‌ এর মধ্যে আসলে ভালবাসাই ছিল। আবার কয়েকজন মহিলা হয়ত কথা বলছে, আমি গিয়ে হাজির হয়েছি, অমনি ওরা বলল, এই চুপ কর, চুপ কর, কী লিখে ফেলবে!‌ 
এটার মধ্যে থেকে একটা দর্শন বেরিয়ে এল। তা হল পরিবারেই মানুষ আসে। পরিবার ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। সেই কারণেই পরিবার আমার বিষয়। আমার গল্পে দুঃখ আছে, বেদনা আছে, মনোমালিন্য আছে, আবার প্রেম আছে, ভালবাসা আছে, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বও আছে। সেই বেদের কাল থেকে যে ধারাটা চলে আসছে, সেই ধারা থেকে আমরা কিন্তু বেরোতে পারব না। এটা হল আমাদের হিন্দু ওয়ে অফ লাইফ।
দিনে একবার খাই 
আমি সন্ন্যাসী হতে না পারলেও চিরকাল সন্ন্যাসীর জীবনই কাটিয়েছি। যেমন ভূমিতে শয়ন এবং হোম, যাগযজ্ঞ— যা যা শাস্ত্রে নিদান আছে, সব পালন করেছি। এখনও করি। একটা সময় একাহারী ছিলাম, এখনও তাই। দিনে একবার খাই। দীর্ঘ ৫০ বছর গঙ্গায় চান করেছি। এখন পারি না। গঙ্গা আমার খুব প্রিয়। ছেলেবেলায় মা মারা গিয়েছিলেন। তাই গঙ্গায় গিয়ে স্রোতের সঙ্গে কথা বলতাম। খুব ভাল সাঁতার কাটতে পারতাম। যখন–‌তখন ধপাস করে গিয়ে পড়তাম। কেউ তো বাধা দেওয়ার ছিল না!‌ বান আসার পরে পরেই জলে নামতাম স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে। এক যোগীকে দেখতাম গঙ্গায় মরার মতো ভেসে আছেন। সেটাও আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম। একবার তো আমার পেটের ওপর দুটো কাক এসে বসল!‌ 
উদ্বোধনের সম্পাদক স্বামী অব্জজানন্দ একদিন আনন্দবাজারে আমার কাছে এসে বললেন, ‘‌তোমরা যদি ঠাকুরের কথা না লেখ, তাহলে মানুষ কেমন করে তাঁদের কথা জানতে পারবে। শুধু আমাদের লেখায় হবে না।’‌ এই অনুরোধে দীর্ঘ বছর সতের ‘‌পরম পদকমলে’‌ বলে একটা বিভাগে লিখেছি। সেটা বই হিসাবে বেরোয়। এখনও বেস্ট সেলার। মহারাজই একটা সভায় নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘‌বলো ঠাকুরের কথা।‘‌ ভয় পেয়েছিলাম। এখন ঠাকুরের কথা ছাড়া কিচ্ছু বলি না। 
বরুণদা, বরুণ সেনগুপ্ত  একদিন বললেন, ‘‌তোমাকে স্বামীজির ওপর লিখতে হবে।’‌ শুরু হল ‘‌অনন্ত জীবনের জীবনী’‌ লেখা। শেষ ১৮ বছর চারটে খণ্ড বেরিয়ে গেছে। পঞ্চম খণ্ডের কাজ করছি। 
‘‌একতারাতে যে সুর বাজে’‌ বই হিসাবে বেরোবে। এটা আত্মজৈবনিক। লোটাকম্বলে আমি আছি। কিন্তু সেটা গল্প। এটায় আমাদের পরিবারের নানা ঘটনা আছে। কোথা থেকে এখানে এল আমাদের পরিবার। ঠাকুরদা উপনয়নের পরই বীতশ্রদ্ধ হয়ে গৃহত্যাগ করেন। জমিদারি ছেড়ে। বরানগরে এসেছিলেন একবস্ত্রে, একটি পৈতে গলায় দিয়ে। 
পুরস্কারটা পাঠক–‌পাঠিকাদের প্রত্যাশা পূরণ করল
এই পুরস্কারটা আমি আদৌ পাইনি। আমার পাঠক–‌পাঠিকাদের প্রত্যাশা পূর্ণ হল। এইখানেই এই পুরস্কারটার একটা অদ্ভুত মজা। এটাও আমার কাছে একটা বিরাট সত্যলাভ। আমি যখন লিখতাম, কর্মজীবনে আছি, তখন তো বুঝতাম না, কী লিখছি, সেটা কেমন হচ্ছে। সমালোচকেরা সমালোচনা করছেন, ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের অন্দরমহলে কি আমি যেতে পারছি?‌ পুরস্কারটা যেন একটা এক্সপ্লোসন। মনে হল, সব দরজাজানলা খুলে গেল। পাঠক–‌পাঠিকাদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল, এই পুরস্কারটা যেন প্রতীক, আসলে তারা যেন অপেক্ষা করেছিলেন কবে পাব। দেরি হয়ে ভাল হয়েছে। আগে পেলে মনে হত, একটা বই লিখেছিলুম পেয়েছি। লোকে ভুলে যেত। যা পেয়েছি প্রথম দিনে, তাই যেন পাই শেষে। প্রথম দিন যে সমাদর পেয়েছি, সেটাই যেন হাজার গুণ বেশি হয়ে যাবার পথে বলছে, এই নাও তোমার পোঁটলাপুঁটলি, এইবার চলে যাও। পুরস্কারটা কিছু নয়, মানুষের মন সেটা তো গুপ্তধন, সেটাই পাওনা। 
ধর্মপথের যাত্রী
অনেক শাস্ত্র, পুরাণ পড়তে পড়তে প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব ধর্ম, নিজস্ব দর্শন গড়ে ওঠে। প্রথমে আমার ধাক্কাটা এসেছিল, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ পরিণতি পড়ে। তিনি অবতার। আসনে বসলেন, একটা জ্যোতি বেরিয়ে গেল। তা হল না!‌ ভীষণ কর্কট রোগ ধরল। ভীষণ কষ্টকর। উনি বললেন, আমি কষ্ট পাচ্ছি না তোমরা পাচ্ছ। জীবনের তিনভাগই কষ্ট। তাকে সুখ করাটাই একটা ধর্মের সাধনা। যাঁর এত অলৌকিক ক্ষমতা তিনি চাইলে নিমেষে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি অপেক্ষা করলেন জাগতিক নিয়মে শরীরটা যেদিন যাবে, সেদিন যাবেন। এটা একটা মস্ত বড় শিক্ষা। তাঁর ঢের আগে বুদ্ধদেব। তিনি এত কাণ্ড করলেন, কিন্তু শেষটা!‌ কী যন্ত্রণাদায়ক। ‘‌গৌতম বুদ্ধের শেষ কটা দিন’‌, আমার প্রথম বই। তারপরে মনে হল, শ্রীকৃষ্ণও তো বাদ যাননি!‌ তিনি তো সোনার রথে চেপে আমাদের সামনে দিয়ে ওপরে চলে যাবেন। তা তো গেলেন না!‌ পরে আমার ভাবনায় এল, রাধে রাধে বলি। রাধার কী হল?‌ ‘‌শেষ প্রহর’‌ বলে আরেকটা লিখলাম। সত্য, ত্রেতা আর দ্বাপর মারা গেছে। দ্বাপরের মৃত্যু এবং কলিতে পা। তা নিয়েই কাহিনী। 
শেষের সে দিন
শেষের দিন নিয়ে লিখি বলে মৃত্যুচেতনা যে আমার মধ্যে প্রবল তা নয়। আমি মৃত্যু বলি না। আমি বলি এক্সটিংশন। প্রদীপ জ্বলছিল, নিবে গেছে। 
রঙ্গব্যঙ্গ চলছে
ধর্ম নিয়ে লেখালিখি বেশি করছি বলে রঙ্গব্যঙ্গ একেবারে ছেড়েছি তা নয়। আমার বই বেরোচ্ছে ‘‌ডাউনলোড’‌, ‘‌সঞ্জীবনী সুধা’‌। আনন্দ থেকে বেরোচ্ছে ‘‌রসেবশে সমগ্র’‌। আমার সমস্ত লেখার মধ্যে একটা লাইন যদি সিরিয়াস হয়, পরের লাইনটাই হিউমার। 
সাহিত্যপ্রেরণা
অহঙ্কার নয়, সাহিত্যের ছাত্র হিসাবেই বলি, আমার ধারাটা একটা নতুন ধারা। ডিকেন্সের পিকউইক পেপারের মতো। কবি মঞ্জুভাষ মিত্র এটাকে ‘‌ডিকেন্সেনিয়ান ধারা’‌ বলেন। স্টোরি, হিউমার, স্যাটায়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সাহিত্যগুরু বিমল কর এটাকে বলতেন, জেরোম কে জেরোমের ধারা। 
অস্ত গেল হাস্যরস
অনেকেই জানতে চান, এখন হাস্যরসের ধারার লেখক নেই কেন?‌ তার কারণ একটা বড় সর্বনাশ আমাদের জীবনে ঘটে গেছে। সেটা হল পরিবার নেই। এগজিসটেন্স আছে, ডুয়াল লিভিং আছে, পরিবার নেই!‌ একসঙ্গে বাবা আমাদের চেঞ্জে নিয়ে যাচ্ছেন— শিমুলতলা, মধুপুর, কার্মাটাঁড়। আছে এখন!‌ এখন বড় বড় ব্যাপার। ট্যুর করছি। ওরা প্রোগ্রাম করে নিয়ে যাবে, এখানে একদিন, ওখানে দুদিন। কতগুলি রিসর্ট আছে। আর আমরা বাবার সঙ্গে বেড়াতে গেছি। চালাবাড়িতে থেকেছি। সামনে ফাঁকা মাঠ। বাবা এস্রাজ বাজাচ্ছেন, আমি গান গাইছি। গোয়ালারা এসে শুনছে। বলছে, ‘‌বাবু রে তোদের আর দুধ কিনতে হবে না। সকালে এক বালতি করে দুধ দিয়ে যাব।’‌ পরিবার ভেঙে গেছে। আমরা আমাদের সর্বনাশ করেছি। হাস্যরস আর আসবে কোথা থেকে!‌ 
যে পাঠ ঋদ্ধ করে
এখনকার বাংলা সাহিত্য আমি পড়ার চেষ্টা করি। তবে মূলত যা আমাকে সমৃদ্ধ করবে, সেটাই পড়ি। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। বহু পড়ার জিনিস বাকি আছে। আমার বাড়িতে হাজার হাজার বই। এই তো কদিন আগেই খুঁজে পেলাম ‘‌প্যারিটিভ লস্ট’‌। হিউমারাসলি ক্রিয়েশন এবং এন্ড অফ দ্য ক্রিয়েশন নিয়ে লেখা, এক বিজ্ঞানীর। পড়লাম ‘‌হোয়েন দ্য ক্লক স্ট্রাইকস জিরো’‌, ঘড়িতে যখন শূন্য বাজবে। আবার মনে হল, একটু স্টিফেন হকিং পড়ি। এখন তো সিরিয়ালের যুগ। কনফ্লিক্ট ছাড়া মানুষ কিচ্ছু চায় না। আর সেটা একই বৃত্তে ঘোরে। এর বাইরে এসকেপ নেই। নাহলে সায়েন্স ফিকশন। কতগুলো উদ্ভট লেখা। আমি তো মনে করি, সত্যজিৎবাবুর মতো লেখক খুব কম। উনি ছবি করে বিখ্যাত হয়েছেন। লিখেও বিখ্যাত হতে পারতেন। 
প্রিয় সাহিত্য সাহিত্যিক
আমাকে যিনি প্রথম খুব নাড়া দিয়েছিলেন তিনি ত্রৈলোক্যনাথ। ভয়ঙ্কর ইন্টেলেকচুয়াল। তারপর কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবা বলতেন, এগুলো যখন পড়ছ, পিকউইক পেপার্স পড়ো। ওটা স্বামীজিরও কণ্ঠস্থ ছিল। উনি পড়তেন আর হা হা করে হাসতেন। লোকে ভাবত, সন্ন্যাসী ইংরেজি বই পড়ে হাসছে কেন!‌ হিউমার এবং স্যাটায়ার জিনিসটা কিন্তু ইংলিশ। খানিকটা হয়ত ফ্রেঞ্চও। আমাদের এখানে মহাভারতেও দেখা যায়, সূক্ষ্ম হিউমারাস প্যাচ আছে। যেমন, পাশাখেলার সভা বা যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে দ্রৌপদীর এনকাউন্টার। ভাগবতের রাসলীলাতেও প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। 
কথা আপনা আপনি আসে
আমি কাজের সূত্রে গ্রামেগঞ্জে ঘুরতাম, লোকের সঙ্গে কথা বলতাম। তাছাড়া শ্রুতিনাটক করতাম। স্টেজ ফ্রাইট বলে আমার কিছু নেই। বলতে আরম্ভ করেই বুঝি, আমি বলছি না। কে যেন ভেতর থেকে বলাচ্ছে। অনেকে বলেন আপনার মধ্যে কি টেপরেকর্ডার আছে?‌ এটা কী করে হয় জানি না। বোধহয় একটা মগ্নতা। 
সন্ন্যাস থেকে গার্হস্থ্য
বিয়ে করার আমার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমি তো সন্ন্যাসী হব বলেই মনস্থির করেছিলাম। এদিকে সেই সময় আমার পরিবারের সবাই মারা গেছে। আমি আর বাবা। দুজনে মিলে রোজ সকালে উঠে রান্না করি। বাবা চলে যান অফিসে। আমিও। সারাদিন বাড়ি তালাবন্ধ। রাতে ফিরি। এখনও সেদিনগুলোর কথা মনে আছে। বাবা ভাদুয়া ঘিয়ের টিন কিনে আনতেন। রাতে বললেন, নে বার কর ময়দা। ময়দা ঠাসা হল। বাবার হাতের রান্না আলুরদম, মুগের ডাল আজও জিভে লেগে আছে। আমাকে শেখাচ্ছেন কীভাবে পাকা তেলে মাছ ভাজতে হয়। একদিন কাঁচা তেলে মাছ ছেড়েছি, হল মাছের হালুয়া!‌ ছেলেবেলায় যার সঙ্গে খেলা করেছি। তার নাম গীতা। সে আমাকে মারধরও করেছে। মেয়েরা যেমনটি করে। রেগে গেলে আঁচড়ে, কামড়ে দেয়। ওর বাবা আমার বাবা ও জেঠামশাইয়ের সহপাঠী। ডিফেন্সের চাকরি সূত্রে উনি বিভিন্ন জায়গায় বদলি হয়ে শেষে যান জব্বলপুরে। ইতিমধ্যে যাঁর সঙ্গে মারদাঙ্গা করেছি, তিনি তরুণী। ছুটিতে এখানে এলেন। আসার পরে দু বাড়ির যোগাযোগ। গীতা বাবাকে কাকাবাবু বলত। ও প্রবল ইমপ্রেসড হল আমাদের পরিবারের ওপর, বিশেষ করে বাবার প্রতি। তখন বিয়ে করব না বললে, ওর দিক থেকে একটা সঙ্কট তৈরি হত। অগত্যা সন্ন্যাস জীবনে ইতি।
বাবা আমাকে সাবলম্বী করে দিয়েছিলেন। একটা সময় আমি গোটা বাড়ি ধুতাম, মুছতাম। এটা নিয়ে অনেক রঙ্গব্যঙ্গও হত। তখন নতুন বাড়ি। ঝকঝকে মোজায়েকের মেঝে। আমি মোজা পরে বাড়ি মুছছি। আর সেই সময় বিমল মিত্র এসেছেন। মোজা পরতাম, শীতকালে পায়ে ঠাণ্ডা লাগত বলে। বিমলদা বললেন, ‘‌ও তো হাফপ্যান্ট আর মোজা পরে ঘর মোছার জন্য পৃথিবীতে এসেছে।’‌ ঘরদোর সাজানোর ওপরেও খুব ঝোঁক। যেন চারপাশ দেখতে সুন্দর হয়। পুত্র অপূর্ব ব্যস্ত সাংবাদিক। পুত্রবধূ সুস্মিতা আর দুই নাতনি পূজা ও শুদ্ধাকে নিয়ে এক আনন্দদায়ক পরিবারে থাকি। 
দিনলিপি 
এখন সারাদিন অখণ্ড সময়। তাই লিখতেও হয় প্রচুর। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বসে যাই। লিখতে লিখতেই চা আসে। তারপর ঘণ্টা তিনেক যায় পুজোয়। আগে নিত্য হোম করতাম। হোমের ধোঁয়া থেকে হাঁপানির মতো হল। একবার তো শ্বাসবন্ধ হয়ে মারাই যেতে বসেছিলাম। বউমা বারণ করায় আর করি না। দুপুরে খাওয়ার পর আগে একটু গড়িয়ে নিতাম। গুরু বলেছিলেন, শবাসন করতে। এখন চেয়ারে বসেই বিশ্রাম নিই বা বই পড়ি। 
‌‌‌
 

 

ছবি: দেবব্রত ঘোষ

জনপ্রিয়

Back To Top