একটি দেশকে রাতারাতি লুপ্ত করার চক্রান্তে নিঃস্ব হয়ে পথে বসল কত মানুষ। আমিও ভুক্তভোগী। অরুণ সোম

মস্কো, ৭ নভেম্বর, ১৯৯১। প্রায় প্রতি বছরই বছরের এই দিনটিতে আকাশের মুখ গোমড়া। আজও তাই। কিন্তু আকাশের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে উৎসবের বর্ণাঢ্য মিছিলে শামিল হতে। দিনটি হাজার হোক অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বার্ষিকী। এই সম্মান তার প্রাপ্য, কারণ সোবিয়েত ইউনিয়ন নামে দেশটি, সোবিয়েত সংস্কৃতি, সোবিয়েত মানুষ— এ সবই সেই বিপ্লবের অবদান।
সোবিয়েত শাসনের সাত দশকেরও বেশি কাল ধরে— এমন–কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী যখন মস্কোর দ্বারপ্রান্তে তখনও দেশ রেড স্কোয়্যারে মহাসমারোহে উদযাপন করেছিল তার বিপ্লবের বার্ষিকী। রেড স্কোয়্যারে কুচকাওয়াজ সেরে সেনাবাহিনী সেখান থেকেই সোজা ফ্রন্টে চলে গিয়েছিল। এমনই গুরুত্ব ছিল এই দিনটির।
কিন্তু আজ পুঁজিবাদের প্রবক্তা ইয়েলৎসিনের আমূল অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ বাতিল করার উদ্দেশ্যে ১৯–‌২২ আগস্ট ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য কমিউনিস্টরা হঠকারী উপায়ে যে মরিয়া অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল তা বানচাল হয়ে যাওয়ায় সমাজতন্ত্রের পতন সুনিশ্চিত হয়ে গেছে। আর মাত্র মাস দুয়েকের অপেক্ষা। ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে যাচ্ছে। কিন্তু এখন থেকেই অক্টোবর বিপ্লব আর বিপ্লব নয়— অভ্যুত্থান মাত্র। তাই জাতীয় উৎসবের তালিকায় তার নাম রাখা যাচ্ছে না। এ বছরও দিনটা ছুটির দিন থাকছে, যেহেতু যথাসময়ে নতুন সরকারি নির্দেশ জারি করা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে তাও থাকবে না। আজকের এই ছুটি কোনও কিছুর জন্যই নয়— অকারণ। এমন ছুটি শুধু রাশিয়াতেই সম্ভব!‌
আজকের মতো ভবিষ্যতেও ৭ নভেম্বরের এই বিশেষ দিনটিতে ক্রেমলিনের রেড স্কোয়্যারে আর দেখা যাবে না রেড স্কোয়্যার ছাপিয়ে যাওয়া শ্রমিক ও মেহনতি জনতার সুবিশাল সমাবেশ, অবিরত জনস্রোত।
এমনিতেও সাধারণ লোকজনের কারওই উৎসবের শোভাযাত্রায় যোগদানের কোনও তাড়া নেই, নেই কোনও আগ্রহ। জনতার ভিড় খাবারের দোকানের সামনে— দুধ আর রুটির জন্য মাইলখানেক লম্বা লাইন— আক্ষরিক অর্থে। উৎসবের আনন্দের স্থান নিয়েছে মানুষের অস্তিত্বরক্ষার লড়াই।
১৯৯১ সালের এপ্রিলে দীর্ঘ কয়েক দশক পরে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে সোবিয়েত ইউনিয়নে। সরকারি অর্থনৈতিক কর্মপন্থা সম্পর্কে ঘোরতর সন্দেহ দেখা দিল লোকের মনে। কিন্তু এটা যে বাজার অর্থনীতির প্রথম ধাপ সেটা কারও মাথায় ঢুকল না। সাধারণ মানুষের ধারণা হল সোনার কাঠি আছে গর্বাচভের প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়েলৎসিনের হাতে। কিন্তু কিছুদিন বাদে ইয়েলৎসিন পুরোপুরি ক্ষমতায় চলে এলে দ্রব্যমূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া হল, পুরোমাত্রায় বাজার অর্থনীতি চালু হয়ে গেল। চালু হল আরও অনেক কিছু। যে–সমস্ত কারণে রুশ বিপ্লব ঘটেছিল সে সবই আবার ফিরে এল।
৭ নভেম্বরের উৎসবটি গত বছরই ছোট করে করা হয়েছিল। বাদ দেওয়া হয়েছিল রেড স্কোয়্যারে সামরিক কুচকাওয়াজ। তবে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে বেরিয়েছিল সুবিশাল একটি গণমিছিল। রেড স্কোয়্যারে উপস্থিত ছিলেন গর্বাচভ। কিন্তু গত বছর ওই মিছিল থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গর্বাচভের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছিল। তিনি অবশ্য সেদিন তাঁর ভাষণে এমন কথাও বলেছিলেন যে ‌‘‌আমরা দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছি এক নতুন জগতের দিকে— কমিউনিজমের জগতে।‌ সে পথ থেকে আমরা কখনও বিচ্যুত হব না।’‌ কিন্তু জনতা তাঁর মুখের কথায় ভোলেনি। বেগতিক দেখে বন্ধ করতে হয়েছিল ওই অনুষ্ঠানের টেলিভিশন সম্প্রচার। বিক্ষোভ এড়াতে ভাষণ অসমাপ্ত রেখে রেড স্কোয়্যার ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল গর্বাচভকে। 
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকাশের অবাধ সুযোগ— এই দুয়ের সংযোগে এক বিপ্লবের সূচনা হল গর্বাচভের সোবিয়েত  ইউনিয়নে। সোবিয়েত আমলে যাকে চোরাবাজার বলা হত তা হয়ে দাঁড়াল খোলাবাজার। কোনও রাখঢাক নেই। রাস্তাঘাটে বসে গেল বিকিকিনির হাট। জুয়াখেলার আসর। 
এ ছাড়া খুলে গেল রোজগারের আরও একটি পন্থা‌— ভিক্ষাবৃত্তি। সে দৃশ্যও রাস্তাঘাটে বিরল নয়। পাতাল রেলের সাবওয়েগুলিতে বেড়েই চলল ভিখারির সংখ্যা। সকলেই যে পেটের দায়ে ভিক্ষা করছে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। ত্‌ভেরস্কায়া স্ট্রিট (‌এই সেদিনও নাম ছিল গোর্কি স্ট্রিট)‌ দিয়ে যেতে যেতে দেখলাম একজন দাঁড়িয়ে আছে সামনে একটা কাগজে–লেখা–‌আবেদন পেতে— ‌ইংরেজিতে লেখা— সপরিবারে মার্কিন মুলুকে চলে যেতে চাই— সাহায্যপ্রার্থী। অদ্ভুত আবদার!‌ মেট্রোর সাবওয়েতে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন— মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি— আমার জামার আস্তিনে টান মেরে বলল, স্তালিনের দমননীতির শিকার, সাহায্যপ্রার্থী। 
এরই মধ্যে এক জায়গায় এক মহিলা খঞ্জনি বাজিয়ে গান গাইছে। গলাটা ভালই। সাধে কি আর এক শ্রেণির লোক এমন কথাও বলছে যে মেট্রোর সাবওয়েগুলিতে নাচ–‌গান–‌বাজনার কল্যাণে আজকাল মেট্রোতে যাতায়াত করাটা বড় আনন্দের আর বৈচিত্র‌্যময় হয়ে উঠেছে। 
হাটবাজার আর রেল স্টেশনের সংলগ্ন এলাকাগুলি এবং বড় রাস্তার আশপাশে সর্বত্র ফেরিওয়ালাদের ভিড়। পুরনো দিনের ছায়াছবিতে দেখা সোবিয়েত–পূর্ববর্তী রাশিয়া অথবা বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাশিয়ার এক টুকরো দৃশ্য!‌ তখনও এই আজকের মতোই মধ্যবিত্ত ঘরের নারী–‌পুরুষের অনেককে পেটের দায়ে নিজেদের বাড়ির জামাকাপড় বাসনপত্র বিক্রি করার জন্য রাস্তায় নামতে হয়েছিল। দেখছি বৃদ্ধারা বাজারের সামনে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ভদকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন। বাজারে এখন এ জিনিসটি আক্রা— তাই চড়া দামেই বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা। পেনশনের টাকায় সংসার চালানো দায়। ব্যাঙ্কে যে জমানো টাকা ছিল তাও নিঃশেষ। চেনা লোকজনের নজর এড়ানোর জন্য অনেকেই বেপাড়ায় যান জিনিসপত্র বেচতে। 
উত্তর পেরেস্ত্রৈকা পর্বে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়ে দেশের জনসাধারণের যখন নাভিশ্বাস উঠছে, তখন সরকারপক্ষের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তাঁদের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার মধ্যে গরিবগুর্বোদের দেখভালের দিকটাও ভেবে দেখা হয়েছে। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়— গরিবদের স্বার্থরক্ষার এমন সমস্ত সামাজিক পরিকল্পনা রাশিয়ার সরকারের এবং অন্যান্য সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলের আছে যা এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত অকল্পনীয় ছিল— ভবঘুরেদের জন্য রাতের আশ্রয়, ধর্মশালা, লঙ্গরখানা, সেকেন্ড হ্যান্ড জামাকাপড়, জুতো কেনাবেচার দোকান। আবার জমে উঠেছে বন্ধকের কারবার। 
রাশিয়ায় আবার ফিরে আসছে বণিক সমাজ, তার কসাক ঐতিহ্য, স্টক এক্সচেঞ্জ আর বিজনেস হাউস। এককালে যা যা ছিল সে সবই ফিরে আসছে একে একে। উলটপুরাণের কী অপার মহিমা!‌
এ যেন ইতিহাসের এক যুগ থেকে আরেক যুগে পাড়ি দেওয়া— সোবিয়েত ইউনিয়নের শেষ মহাকাশচারী সের্গেই ক্রিকালিয়োভের অভিজ্ঞতার মতো, যা ছিল কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর মতোই রোমাঞ্চকর। ১৯৯১ সালের ১৮ মে তিনি যখন মহাকাশ যাত্রা করেন সোবিয়েত ইউনিয়ন তখনও ভাঙেনি, মিখাইল গর্বাচভ তখনও প্রেসিডেন্ট, তখনও ক্রেমলিনের মাথার ওপর সগর্বে উড়ছে কাস্তে হাতুড়ি লাঞ্ছিত লাল পতাকা, কিন্তু দীর্ঘ দশ মাস মহাকাশের ভারসাম্যহীন অবস্থার মধ্যে কাটিয়ে যখন কাজাখস্তানের তুষারাচ্ছন্ন বুকে নামলেন তখন তিনি পায়ের তলায় মাটি পাচ্ছিলেন না— না পারারই কথা, কারণ ততদিনে তাঁর দেশের মানচিত্রই পাল্টে গেছে, সোবিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিহ্ন, যে মাটিতে তিনি নামলেন সেই কাজাখস্তান আর তাঁর নিজের দেশ নয়। এমন–কি তাঁর নিজের জন্মস্থান লেনিনগ্রাদ শহরও আর নেই— নাম পাল্টে হয়েছে সাংক্‌ত পেতের্বুর্গ।
এই যুগপরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া একেক জনের ওপর একেক রকম, তবে অধিকাংশের পক্ষেই দুঃসহ, নেতিবাচক। পোল্যান্ড সীমান্তে রাশিয়ার দুর্গনগরী ব্রেস্ত্‌–‌এর ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রেস্ত্‌–‌দুর্গের মুষ্টিমেয় কয়েকজন সৈনিক সীমান্ত রক্ষার জন্য আপ্রাণ লড়াই করে প্রবাদ‌পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। ব্রেস্ত্‌–‌কেল্লার রক্ষক ‌বীর সৈনিকদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁদেরই একজন তিমিরগেন জিনাত। ব্রেস্তে বেড়াতে এসেছিলেন ১৯৯২ সেপ্টেম্বরে। অনেকক্ষণ হাঁটলেন, ফাঁকা দুর্গের ভেতরে, ব্রেস্তের রাস্তায় রাস্তায়। তারপর‌ ‌আত্মহত্যা করলেন চলন্ত ট্রেনের চাকার তলায় মাথা পেতে দিয়ে। ‌‘‌তখন যুদ্ধের সময় যে আঘাত পেয়েছিলাম তাতে যদি আমার মৃত্যু হত তা হলে অন্তত জানতে পারতাম জন্মভূমির জন্য প্রাণ দিয়েছি।’ চিরকুটে এই কথাগুলি তিনি লিখে যান। তিনি তাঁর মৃত্যুকে বিশাল দেশের ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বলে সকলকে জানাতে বলেন।
গর্বাচভের পেরেস্ত্রৈকা ইয়েলৎসিনের সংস্কারনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন ঘোষণা করেছিলেন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তিনি রেলের চাকার তলায় প্রাণ দেবেন। কিন্তু প্রাণ দিলেন অন্যেরা— সমস্ত কিছুর ওপর আস্থা হারিয়ে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে।
এই সময় থেকেই শুরু হল রুবলের দ্রুত অধোগতি। সর্বত্র তৃতীয় শ্রেণির বিদেশি জিনিসের ছড়াছড়ি।  কোনও জিনিসের কোনও গ্যারান্টি নেই, যেমন গ্যারান্টি নেই দেশের মুদ্রার। ভবিষ্যতের একমাত্র গ্যারান্টি ডলার। 
১৯৯৩ সালের মার্চ মাসের কোনও এক সময়ের ঘটনা:‌ মস্কোর বেলারুস স্টেশনে রেলের কামরা থেকে ছোটখাটো সুটকেস হাতে নামলেন গ্রেট ব্রিটেনের মিলিটারি অ্যাটাশে। সফর সেরে ফিরছেন। সঙ্গে সঙ্গে কুলি ছিনিয়ে নিল তাঁর হাতের সুটকেস। বয়ে নিয়ে চলল প্রতীক্ষমাণ মোটরগাড়ির কাছে।‌
ইংরেজ ভদ্রলোকটি কুলির সাগ্রহ ‌‌‌‌‌দৃষ্টির সামনে মানিব্যাগ খুললেন। কিন্তু হা ভগবান!‌ এ কী!‌ কোথায় ডলার–পাউন্ড?‌ মানিব্যাগ খুলে কুলির হাতে ধরিয়ে দিতে গেলেন একশো রুবলের একখানা নোট। তখন অবশ্য ১ ডলার ৮০০ রুবলের সমান। কুলি সেই নোট ঘৃণাভরে ফেলে দিয়ে ভদ্রলোকের গায়ে থুতু ছিটিয়ে স্থান ত্যাগ করল।‌ পরে দূতাবাস থেকে স্টেশনমাস্টারের কাছে অভিযোগ করা হয়। তবে কোনও ফল পাওয়া যায়নি। স্টেশনমাস্টারের জবাব:‌ ‘‌থুতু অনেকেই ছিটোয়।‌’‌ তা ঠিক, কিন্তু সে থুতু তো নিজের গায়েই এসে পড়ছে!‌ এ বোধ আজ আর অনেকের নেই।
মস্কোয় কী না বিক্রি হচ্ছে?‌ লেনিন স্মৃতিসৌধের মুখোমুখি জ্বলজ্বল করছে ফরাসি বিজনেস হাউস লাফাইয়েতের বিজ্ঞাপন। সর্বত্র প্রাইভেট ব্যাঙ্ক, যৌথ উদ্যোগ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, বার, জুয়া খেলার ঘর। কবি আলেক্সান্দ্র ব্লোকের নামে ক্যাসিনো‌ হয়েছে। চেখভ স্ট্রিটে চেরি অর্চার্ড একটা ব্যাঙ্কের নাম। সোবিয়েত আমলে হলে বলা যেত ধৃষ্টতা। কিন্তু আজ শিল্পসংস্কৃতি সবই পণ্যসামগ্রী।
মেট্রোর সাবওয়েতে টুপি হাতে বসে আছেন এক বৃদ্ধ, বুকে শোভা পাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদক— একসময় বুক দিয়ে রক্ষা করেছিলেন দেশকে। টুপিতে পড়ে আছে মাত্র কয়েকটি রুবল—‌ একটা রুটি কেনার পক্ষেও যথেষ্ট নয়। বৃদ্ধের গাল বেয়ে বড় বড় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের তা চোখে পড়ে না।
এত দ্রুত মানুষের মূল্যবোধের এমনই আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে যে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দীর্ঘ সত্তর বছরের শিক্ষা কি তাহলে এমনই ওপর–‌ওপর ছিল, এতই ঠুনকো ছিল?‌
মস্কো, ১ জানুয়ারি, ১৯৯৪। এবারে বর্ষবরণ উপলক্ষে ৩১ ডিসেম্বর–১ জানুয়ারির মাঝরাতে জনসমাগম ও জৌলুসের দিক থেকে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়্যারের কাছাকাছি চলে এসেছিল মস্কোর রেড স্কোয়্যার। নববর্ষ উৎসব উপলক্ষে আলোকমালায় সজ্জিত রেড স্কোয়্যার অঞ্চলে জনসমাগম সোবিয়েত আমলেও ঘটত। কিন্তু সেই জনতার চেহারা ছিল অন্য। তখন পরিবার– পরিজন–বন্ধুবান্ধবসহ প্রমোদভ্রমণে বের হতেন রাজধানীর অধিবাসীরা। ১৯৯১ সালে সোবিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে পাল্টে গেছে সেই ধারা। এখন মাঝরাতের এই উৎসবে নিছক হল্লাবাজ আমোদলোভী ছাড়া আর কেউই কাম্য নয় সঙ্গী হিসেবে। আগে মাঝরাতের ভ্রমণকারীদের ভিড়ের মধ্যে দেখা যেত মুষ্টিমেয় জনাকয়েক বিদেশিকে—‌ এখন রাজধানীর অধিবাসীদের জায়গা নিয়েছে অতিথিরা—‌ অধিকাংশই বিদেশি।
সন্ত ভাসিলি গির্জার বাইজানটাইন চূড়া, ক্রেমলিন নগরদুর্গ, লেনিন স্মৃতিসৌধ, হোটেল রাশিয়া ও তার উজ্জ্বল নিওন লাইট.‌.‌.‌ প্রকাশ্য উন্মুক্ত কোনও স্থানে, একই জায়গায় এত ইতিহাসের সমাবেশ কদাচিৎ ঘটে। ইতিহাসের সেই নীরবতা, রুশিদের তীর্থস্থানের গাম্ভীর্য সেই রাতে খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল সুরাভক্তদের উৎকট নৃত্যগীত উল্লাসধ্বনিতে, শ্যাম্পেনের ছিপি খোলার ফটাফট আর শূন্য বোতল আছড়ে ভাঙার ঝনঝন আওয়াজে। শীতটা এবার ডিসেম্বর–‌জানুয়ারিতে খুবই সামান্য পড়েছিল। তবে, কড়া শীত পড়েছিল নভেম্বরে। –২০ ডিগ্রি। এ বছর ফুটপাতের কঠিন বরফ চেঁছে তোলার কোনও উদ্যোগ পুরসভার তরফ থেকে দেখা যাচ্ছে না। ফলে, বরফে পিছলে পড়ে হাত–‌পা ভাঙার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। নতুন বছরের আগেও জঞ্জালের স্তূপ সাফ করা হয়নি আমাদের বাড়ির সামনে থেকে। পুরসভার গাড়ি ও লোকজনের অভাব। ফেরার পথে সেই আবর্জনা স্তূপের ওপর পড়ে থাকতে দেখলাম একটা পুতুল। আমার ছোট মেয়ে শনাক্ত করল:‌ ‘‌আমাদের ওপরতলার মাশার পুরনো পুতুলটা বাবা। ফেলে দিয়েছে। ওর বাবা ওকে নতুন পুতুল কিনে দিয়েছেন কি না— নতুন বছরের উপহার, বার্বি পুতুল। ৮৪ ডলার দাম। জান বাবা।’‌ চু–‌রা–‌শি ডলার!‌ রুবলে সে তো ৮৪ হাজার!‌ আমার সারা মাসের সংসার–খরচ!‌ তেতো হয়ে গেল বছরের প্রথম দিনটা। রাশিয়া কি আমেরিকার ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে?‌ 
১৯৯১ সালের আগস্টে কমিউনিস্টদের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর সোবিয়েত ইউনিয়ন কার্যত ভেঙে গিয়েছিল। আরও মাস কয়েক গড়িমসির পর ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় কেন্দ্রীয় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে গর্বাচভ নীতিগত কারণে সোবিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন। আগের দিন ২৪ ডিসেম্বর রাত বারোটার পর থেকেই সোবিয়েত ইউনিয়ন আর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রইল না। তার স্থান নিল রুশ ফেডারেশন। 
সোবিয়েত ইউনিয়নের পতনের চূড়ান্ত নিদর্শনস্বরূপ সেদিন মধ্যরাতে ক্রেমলিনের চূড়া থেকে যখন লাল পতাকা নামিয়ে দেওয়া হল তখন সাধারণ মানুষের অনুভূতি অবিমিশ্র ছিল না। সে দৃশ্য দেখার জন্য সেদিন মাঝরাতে মস্কোর রেড স্কোয়্যার লোকজনের ভিড়ে উপচে পড়ছিল। সেই ভিড়ের মধ্যে নতুন রাশিয়ার সরকারের ‌‌‌‌‌‌উৎসাহী সমর্থক কবি য়েভ্‌গিয়েলি য়েভ্‌তুপিয়েন্‌কোও (‌১৯৩১–২০১৭)‌ ছিলেন। তঁার অভিজ্ঞতার কথাই শোনা যাক:‌
‌‘‌সকলেই নীরব দর্শক। কারও মুখে টুঁ শব্দটি নেই, কোনও ঠাট্টাতামাশা শোনা যাচ্ছে না, ধারেকাছে মাতাল–টাতাল কেউ নেই। সকলে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, যেন ভাবতেই পারছে না আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পতাকা নামিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু পতাকা যখন নেমে এল তখন সকলের চোখ বয়ে হুহু করে জল নেমে এল। না, কোনও ফোঁপানি অবশ্য শোনা যাচ্ছিল না। লোকে যেন যন্ত্রণায় বোবা হয়ে গেছে। কেউ কেউ চোখ বুজে ফেলল।.‌.‌.‌ লোকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে–পতাকা একদিন বিজয়গর্বে রাইখ্‌স্টাগের মাথায় উড়েছিল তা আজ ভূলুণ্ঠিত। কী বলবে কারও মাথায় ঢুকছিল না।’‌ কবি নিজেই হতভম্ব হয়ে ওখানে ঘণ্টা দুয়েক দঁাড়িয়ে রইলেন। অনেকের কাছেই এ এক ট্র‌্যাজেডি। কিন্তু অনেকে, অনেকের মধ্যে কবি নিজেও তো একসময় মনে মনে সোবিয়েত শাসনের অবসানই কামনা করেছিলেন।
এখানেও আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো কবিরও পরস্পরবিরোধী মনোভাব প্রকট। এমন–কি একেক সময় সোবিয়েত পতাকার দুর্গতি দেখে রুশ জাতির আহত শ্লাঘার কথা ভেবে অঁাতকে ওঠেন তিনি। সেদিন ক্রেমলিনের চূড়া থেকে চুনিপাথরের বিশাল লাল তারাটাও খসিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সম্ভব হয়নি। বিপ্লবের সব সাফল্যই কি মুছে ফেলা যায়?‌ অবলুপ্ত সোবিয়েত ইউনিয়নের শেষ চিহ্নটুকু আজও সেখানে সমান জ্বলজ্বল করছে।
একটি দেশ রাতারাতি লুপ্ত করে দেওয়ার এই জুয়াখেলার পরিণামে কত মানুষ যে নিঃস্ব হয়ে গিয়ে পথে দঁাড়াল, লুপ্ত হয়ে গেল তার ইয়ত্তা নেই। আমি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। সোবিয়েত ইউনিয়নে ধনী–দরিদ্রের বৈষম্য তেমন একটা চোখে পড়ার মতো না হলেও আমরা বিদেশি কর্মীরা ছিলাম, ওদের ভাষায়, ‘‌সোবিয়েত ইউনিয়নের কোটিপতি’‌। তাতে অবশ্য লাভ বড় একটা কিছু হত না, কেননা চাহিদা অনুযায়ী জোগান ছিল না, ফলে টাকাপয়সা জমানোই সার। অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকেরা টাকাপয়সা তেমন একটা জমাত না, কেননা তাদের দেখভাল এবং ভবিষ্যতের সমস্ত দায়িত্বই তো রাষ্ট্রের। বিশ বছরে আমার যা পুঁজি জমেছিল তাই দিয়ে আমি দুটো বড় বড় ফ্ল্যাট কিনতে পারতাম, একটা দামি গাড়িও কিনতে পারতাম— যার অবশ্য অনেকটাই বাস্তবে সম্ভব ছিল না— বিদেশিদের পক্ষে তো নয়ই— সর্বোপরি বাড়িঘর অমনিতেও কেনাবেচার সামগ্রী ছিল না। সরকারের কঠোর সংস্কারনীতি ও তজ্জনিত অস্বাভাবিক মুদ্রাস্ফীতির ফলে এক বছরের মধ্যে আমার সেই সঞ্চয় শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকল। সাধারণ মানুষের দশা তো অকল্পনীয়। ডাস্টবিন থেকে খাবার সংগ্রহ করতেও দেখেছি, সেখানে নাকি ভাল ভাল খাবারও পাওয়া যেত, কেননা ততদিনে দেশে ফেলে–ছড়িয়ে খাবার মতো সুপার ধনী সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছে।
বিপ্লবের পর পঁাচ বছরের গৃহযুদ্ধে যে ক্ষতি হয়েছিল পেরেস্ত্রৈকা এবং উত্তর পেরেস্ত্রৈকা পর্বে তার চেয়ে কম ক্ষতি দেশের হয়নি। ক্ষতির পাল্লা কোন দিকে ভারী এখনও তা চূড়ান্ত নির্ধারণ করার সময় আসেনি, কেননা আজও তার জের চলছে। সমাজতান্ত্রিক বণ্টনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে রাশিয়া যে পুঁজিতন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে তাতে এই মুহূর্তে বৈষম্যমূলক অর্থনীতির দেশগুলির মধ্যে রাশিয়া এখন শীর্ষস্থানে।
‘‌সমস্ত ক্ষমতা সোবিয়েত ইউনিয়নের হাতে।’‌ এই স্লোগান দিয়ে রুশ বিপ্লব শুরু হয়েছিল। কিন্তু কার্যত কী তা হয়েছে?‌ যেখানে ক্ষমতার মূল কেন্দ্র রাষ্ট্রযন্ত্রটাই ভেঙে দেওয়ার কথা, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র বিলুপ্ত তো হয়ইনি, বরং ক্ষমতা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হতে হতে রাষ্ট্রযন্ত্র কলেবরে বৃদ্ধি পেয়ে দানবীয় আকার ধারণ করেছে, তার চাপে সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত। এ ছাড়া সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য যে নতুন মানুষ তৈরি করা, যে মানুষ অন্যের জন্য ভাববে, অন্যের বঁাচার মধ্যে নিজের জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাবে, সে মানুষ তৈরি করার কাজে যেমন আশানুরূপ যত্ন নেওয়া হয়নি, তেমনি মানুষে মানুষে সমতাও এত বছরের সমাজতন্ত্রে তেমন একটা সাধিত হয়নি। কিন্তু সে তো প্রয়োগের প্রশ্ন। প্রয়োগে সিদ্ধিলাভ করতে না পারলে বিপ্লবের বার্তা ব্যর্থ হয়ে যায় নাকি?‌
যে গর্বাচভ ১৯৯১ সালে সোবিয়েত ইউনিয়নকে ভরাডুবি করার আগের মুহূর্তেও জঁাক করে কমিউনিজমের প্রশস্তি গেয়েছিলেন, তার দু’‌বছর পরেই তিনি ঘোষণা করলেন, ‘‌কমিউনিজম মৃত’‌। লাতিন ভাষায় কথা আছে:‌‌ মৃতদের সম্পর্কে হয় ভাল, নয়তো কিছুই নয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে মৃত ধরে নিয়ে আজ সমাজতন্ত্রের অনেক নিন্দুকও তার সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল কথা বলবেন;‌ কিন্তু তঁাদের আশ্বস্ত করে বলা যেতে পারে সমাজতন্ত্র আজও প্রাসঙ্গিক, তার প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি, কোথাও কোথাও যে তার অগ্ন্যুদ্‌গীরণ ঘটছে না এমনও তো নয়।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top