বাংলার নদী কখনও স্নিগ্ধ, কখনও উত্তাল। বাংলার নদী কখনও প্রাণ বাঁচায়, কখনও ভয়ঙ্কর। তবে নদীর নাম বড় মায়াময়। নামের পেছনে রয়েছে কোন গল্প, কোন ইতিহাস?‌ খোঁজ করলেন সুপ্রতিম কর্মকার। ছবি আঁকলেন দেবব্রত ঘোষ।  

ওদের একটা ছোট্ট মেয়ে ছিল। মেয়েটার নাম ছিল তিস্তা। আর ওরা ছিল শমিতা ও উৎপল। মা–‌বাবার সংসারে তিস্তা যখন আসল ওদের দু’‌জনের চোখে রঙিন স্বপ্ন। উৎপল এদিকে আনন্দে চিৎকার করছে। কারণটা একটু অদ্ভুত। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে হিমালয়ের ট্রেকিংয়ে যাবে সে। ওদিকে শমিতার মৃদু হাসি মুখে। কিছুতেই মনের কথা মুখে আনছে না। উৎপলও জানে শমিতার মনে এখন কী চলছে।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের কথা। শমিতা ও উৎপল ছিল সহপাঠী। দু‌জনের প্রেমটা ছিল কলেজ জীবন থেকে। কলেজ জীবনে ট্রেকিং করতে দু‌জনেই গিয়েছিল তিস্তার পাড়ে। প্রেমটা যে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে গড়াবে কিনা জানা ছিল না। কিন্তু সেদিনই তারা দুজনে একে অন্যের হাতে হাত রেখে লাভার্স পয়েন্টে দাঁড়িয়ে তিস্তা ও রঙ্গিত নদীকে সাক্ষী রেখে ঠিক করেছিল, যদি তাদের মেয়ে হয় তা হলে নাম দেবে তিস্তা। আর ছেলে হলে নাম হবে রঙ্গিত।
রঙ্গিত নামটা তাদের আর ব্যবহার করা হয়ে ওঠেনি। কারণ প্রথম সন্তানটা তাদের মেয়ে হয়েছিল। নিজের নামের নদীটাকে দেখতে শেষ এসেছিল তিস্তা এগারো বছর বয়সে। তারপর এনসেফেলাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তিস্তা ঢলে পড়েছিল মৃত্যুর কোলে। মানুষ শরীরের তিস্তা নেই তো কী হয়েছে। জল শরীরের তিস্তা নদীকেই শমিতা ও উৎপল নিজের সন্তানের মতো দত্তক নিল। এখন আর তাদের পিছুটান নেই। তাই যে কাজটা তারা এত বছর ভুলে থেকেছিল, সেই কাজটাই আজ করার পালা। নদীর নাম খোঁজার কাজ আজ সে করবে। কেন এই নদীটার নাম তিস্তা হল?‌
সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে পাঁচ হাজার বছর আগের সাহিত্যে। সেই সময় ঋক বেদে এই নদীকে বলা হচ্ছে ‘‌সদানীর’‌। বরফের পাহাড় হিমালয় থেকে এই নদীর উৎপত্তি হয়েছে। আর সারা বছর ধরে এই নদীতে জল থাকে। তাই এই নদীর নাম হল সদানীর। আবার চারুচন্দ্র সান্যালের মতে প্রায় তিন হাজার বছর আগে বোদো জাতি এই নদীর নাম দেয় ‘‌তি–‌স্তা’‌ বা ‘‌দি–‌স্তা’‌। বোদো ভাষায় ‘‌তি’‌ ও ‘‌দি’‌ শব্দের অর্থ হল জল। মনে করা হয় ‘‌তি–‌স্তা’‌ বা ‘‌দি–‌স্তা’‌ শব্দটি হল বোদো ভাষার ‘‌সদানীর’‌–‌এর অনুবাদ। কোচেরা এই দেশে আসার পর তিস্তা–করতোয়া নদীর মিলিত ধরার নাম হয় ‘‌কোত্তা’‌। কিন্তু পাহাড়ের ওপরে তিস্তা নদীর নাম তিস্তাই থেকে গেল। পাহাড়ের মানুষেরা নদীর নাম শুধু তিস্তা রেখেই ক্ষান্ত হল না। তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আরও অনেক নাম দিল তিস্তার।
দুই পাহাড়ি ঝর্না লাচেন–‌চু ও লাচিং–‌চু। একজন থাকে পশ্চিমে আর অন্য জন থাকে পুবে। তিব্বতি ভাষায় ‘‌চু’‌ মানে ছোট ঝর্না বা নদী। দু‌জনের মধ্যে খুব প্রেম। কিন্তু তারা একে অন্যকে কোনও দিন ছুঁতে পারেনি। তারা ঠিক করল তাদের মিলিত জলের ধারা দিয়ে একটা নদী বানাবে। এবার তাদের চিন্তা হল নদী বানাতে যে অনেক জল লাগবে। তাই প্রথমে তারা তাদের মিলিত জলধারার জল এক সঙ্গে করে একটা হ্রদ বানানোর কথা ভাবল। যেমন ভাবা তেমন কাজ, বানিয়ে ফেলা হল ছালামো হ্রদ। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল তিস্তা। জন্মের পর তার নাম হল দি–‌চু। পাহাড় থেকে নেমে আসার পথে গ্রামের মানুষেরা তাদের মনের মতো নাম দিয়েছে নদীটাকে। যেমন স্যাং–‌চু, রং–‌নি–‌ঊং, রঙ্গ, দিস–‌তা, তিস্তা। আর সব শেষে ত্রি–‌স্রো–‌তা। পাহাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা যেন কোনও নদী নয়, বাড়ির মেয়ে।
তিস্তার এত নাম তো জলঢাকা বাদ যায় কেন?‌ নামের মাহাত্ম্যে সেও কম কিছু নয়। জল ঢেলে ঢাকা হয়েছে নদীর শরীর। তাই অনেকে বলে নদীর নাম হয়েছে জলঢাকা। সিকিম রাজ্যের বিতং হ্রদই এই নদীটার উৎসস্থল। তারপর তিনটে পাহাড়ি নদী নি–‌চু, দি–‌চু‌ ও বিন্দু এক সঙ্গে মিশে জলের ধারায় ঢেলে সাজিয়েছে জলঢাকা নদীকে। এ ছাড়াও আরও কয়েকটা পাহাড়ি নদী জলঢাকার সঙ্গে মেশে তার পার্বত্য প্রবাহে। যেমন পারা–‌চু, লাং–‌চু, বাং–‌চু, মা–‌চু প্রভৃতি।
জলঢাকা নদীটার জন্ম ভুটানের উত্তর–‌পশ্চিম সীমান্তের পুনাখা পর্বতমালার ৬ হাজার ৭৯৪ মিটার উচ্চতার গাংছেঙটা পর্বতশৃঙ্গের কাছ থেকে। উৎসের কাছে নদীটার নাম ‘‌মা–‌চু’‌। পরে এর নাম হয় পুনাসাং–‌চু। তারপর সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের মধ্য দিয়ে নদীর যাত্রা। লায়া, গাসা, পুনাখা, ওয়াংডিফ্রোড্রাং নামের পাহাড়ি গ্রামগুলোকে একের পর এক পেরিয়ে শেষে এই নদী জলপাইগুড়ি জেলার কালীখোলার কাছে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে।
এই নদীর বুকে সোনা আছে। এক হাঁটু জলে নেমে বিশেষ ছাকনি দিয়ে এই নদীর বুকের বালু চেলে বের করা হয় সোনার রেণু। এই কাজটা একটা সময় পর্যন্ত স্থানীয় মানুষেরাই করত। সোনা পাওয়া যেত নদীটাতে বলেই নদীর নাম ছিল সুবর্ণ কোষ। পরে অপভ্রংশ হয়ে নদীর নাম হয় সঙ্কোশ। এই মতটাকে আবার অনেকে স্বীকার করে না। তাদের মতে কোচ জনজাতির ভাষায় ‘‌সং’‌ শব্দের অর্থ হচ্ছে গৃহ। অর্থাৎ কোচ জনজাতির গৃহ যে নদীর ধারে, সেই নদীটা হচ্ছে সঙ্কোচ। পরে পরিবর্তিত হয়ে সঙ্কোশ।
এবার কুলিক নদীর কথায় আসি। উত্তর দিনাজপুর জেলার নদী। রায়গঞ্জ শহরের ওপর দিয়ে এই নদী প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করেছে। রাজ্যের একমাত্র পাখির স্যাংচুয়ারি এই নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটার নামের ইতিহাস খুঁজতে গেলে অতীতকালের দিকে ঘুরে তাকাতে হবে।
অতীতকালে উত্তর দিনাজপুর ছিল পৌণ্ড্র দেশের অংশ হিসেবে। শোনা যায় এই অঞ্চলটি ছিল তন্ত্র সাধনার লীলাভূমি। শিবকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আচার যা কৌলিক আচার হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। কৌলিক আচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য নদীটা কৌলিক নামেই পরিচিত ছিল। এক সময়ের পৌণ্ড্র দেশের বড় তন্ত্র বিশারদ ছিলেন ভল্লুকাচার্য। তারই উত্তরসূরি ছিলেন কুল্লুক ভট্ট। যিনি কৌলিক সাধনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন ওতপ্রোত ভাবে। তারই স্মৃতিরক্ষার্থে এই নদীর নাম রাখা হয় কুল্লিক। যা লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কুলিক হিসেবে পরিচিত হয়।
সব সময় আনন্দে থাকে মহানন্দা নদী। শিলিগুড়ি শহর ও মালদার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মহানন্দা নদী বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করে। তারপর বাংলাদেশের গোদাগারী ঘাটের কাছে নদীটা মিলিত হয় পদ্মার সঙ্গে। এই নদীর নাম নিয়ে দুটো মত প্রচলিত আছে। কেউ বলে এই নদী রামায়ণের সময়কার নদী আবার কেউ বলে এই নদী মহাভারতের সময়ের। রামায়ণে ‘‌হ্লাদিনী’‌ বলে একটা নদীর নাম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায় মনে করেন, ‘‌হ্লাদিনী’‌ নদীই পরবর্তীকালে নাম পাল্টে হয় মহানন্দা।
আবার মহাভারতের বনপর্বে ‘‌নন্দা’‌ নদীর কথা জানা যায়। মহাভারতের বনপর্বে পাণ্ডবরা নন্দা নদী পার হয়ে অধিবঙ্গে তীর্থে গিয়েছিলেন। মহাভারতের সময়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই নদীর নামের সঙ্গে ‘‌মহা’‌ শব্দটি যুক্ত হয়ে ‘‌মহানন্দা’‌ নামে পরিচিতি লাভ করে। এমনি অনেকের ধারণা।
আবার নদীর সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদীর নামের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস নিয়েই তৈরি হয়েছে লোকশ্রুতি। কীরকম?‌ হিমালয়ের কন্যা পার্বতী তখন খুব ছোট। একদিন খেলার ছলে নাচতে নাচতে পার্বতী চলে এসেছিল পৌণ্ড্র দেশে। এক সময় নাচ থেমে গেলে সে দেখতে পেল অচেনা এক দেশে সে চলে এসেছে। তাই সে হারিয়ে গেছে ভেবে কাঁদতে শুরু করল। বাচ্চা মেয়ের কান্না শুনে বলি নামের এক দৈত্য আসে পার্বতীর কাছে। তার কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করে। পার্বতী তখন তার নিজের পরিচয় দিল। আর দৈত্যকে অনুরোধ জানাল তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বলি দৈত্য নিজেই পার্বতীকে দক্ষের বাড়িতে দিয়ে আসেন। দক্ষ রাজা বলির আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে বলিকে একটি বর দিতে চান। বলি তখন দক্ষ রাজার কাছে বর চাইলেন যে পার্বতীর মতো একটা নদী টঙ্কন করে পৌণ্ড্র দেশ দিয়ে যেন বয়ে যায়। তার এই নদী দেখে যেন সেই দেশের মানুষের পার্বতীর কথা মনে পড়ে। দক্ষ রাজা বললেন ‘‌তথাস্তু’‌। সেই সময় থেকেই নদীর নাম হল ‘‌টঙ্কন’‌। পরবর্তী সময়ে এই নদীর নাম লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে ‘‌টাঙ্গন’‌ হয়েছে।
মহানন্দা নদীর দুটি উপনদী রয়েছে। তাদের নাম হল বালাসন ও মেচি। এই দুটি নদী ছিল বৃষ্টির জলে পুষ্ট। মেচি নদীটা ভারত ও নেপাল সীমান্তের স্বাভাবিক সীমারেখা। মেচি নদীটা নেপাল থেকে উৎপত্তি লাভ করে বিহারের পূর্ণিয়া জেলাতে প্রবেশ করে মহানন্দা নদীতে মিশেছে। এই নদীর তীরে রাজবংশী, মেচ, ধিমাল ও থারু জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বসবাস করত। এরা সভ্য সম্প্রদায়ের কাছে পরিচিত ছিল ‘‌ম্লেচ্ছ’‌ হিসেবে। তাই নদীটার নাম ছিল ম্লেচ্ছ নদী। ‘‌ম্লেচ্ছ’‌ থেকে পরিবর্তিত হয়ে মেচি শব্দটি এসেছে। আবার বালাসন নদীটার বুকে পাওয়া যেত সোনার মতো রঙের বালু। তাই নদীটার নাম হয় ‘‌বালিসোনা’‌। পরবর্তী সময়ে লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে বালাসন।
পশ্চিম রাঢ়ের নদী কংসাবতী বা কাঁসাই। এই নদীর উল্লেখ রয়েছে মহাকবি কালিদাসের ‘‌রঘুবংশ’‌–‌তে। সেখানে কাঁসাই–‌এর নাম পাওয়া যাচ্ছে ‘‌কপিশা নদী’।‌ চণ্ডী মঙ্গলকাব্যেও কাঁসাই নদীর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে বলা হচ্ছে ‘‌কংস নদী’‌। দ্বিজ মাধবের চণ্ডীমঙ্গল উপাখ্যানে এই নদী সম্পর্কে উল্লেখ করা হচ্ছে এই রকম ভাবে— ‘‌কংস নদীর তট/‌গঠহ সুন্দর মঠ’‌। আবার কাঁসাই নদীর তীরে একটি ক্ষুদ্র আদিবাসী সম্প্রদায় ছিল। যাদের নাম হল কাঁসাই কুল্লা। এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা মনে করেন যে নদী থেকে তাদের জন্ম হয়েছে সেই নদীর নামই হল কাঁসাই। আবার সাঁওতালি ভাষায় ‘‌সাই’‌ শব্দের অর্থ হচ্ছে বেগবতী। অর্থাৎ কাঁকড়ের ওপর দিয়ে যে নদী বয়ে যায় সেই নদীর নাম হল কাঁসাই। আর আর্য রচিত বাংলায় এই নদীর নাম কংসাবতী।
অনেক নদীর নামের সঙ্গে পদবিও রয়েছে। এপার বাংলা ও বাংলাদেশ মিলিয়ে এরকম নদীর সংখ্যা তিনটে। সম্ভাব্য মোগল আমলেই এই নদীগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। এই তিনটে নদী হল রসুলপুর খাঁ বা রসুলপুর খাঁড়ি, আড়িয়াল খাঁ ও মুসা খাঁ নদী। অনেকে মনে করেন এই তিন নদীর ক্ষেত্রেই খাঁ শব্দটি এসেছে খাঁড়ি শব্দের অপভ্রংশ হয়ে।
এর মধ্যে রসুলপুর নদীটি রয়েছে আমাদের রাজ্যে। নদীটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘‌কপালকুণ্ডলা’‌–‌তে রসুলপুর নদীর উল্লেখ রয়েছে। ‘‌রসুল’‌ একটি আরবি শব্দ। আর ‘‌পুর’‌ হল একটি সংস্কৃত শব্দ। রসুল শব্দের অর্থ হল ‘‌পয়গম্বর’‌ বা ‘‌ঈশ্বরের দূত’‌। অর্থাৎ যে নদীর পাশে ঈশ্বরের দূতের স্থান সেই নদীর নাম রসুলপুর নদী। এই নদীর পাশেই রয়েছে বহু প্রাচীন ‘‌মসনদ–‌ই–‌আলার’‌ মসজিদ। ‘‌মসনদ–‌ই–‌আলার’‌ শব্দের অর্থ হল যার আসন সবার উঁচুতে।
এরপর আড়িয়াল খাঁ নদীর কথায় আসা যাক। এই নদীটা মূলত ফরিদপুর বাখরগঞ্জ জেলার নদী হিসেবে পরিচিত। ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশাল এই তিনটে জেলার ওপর দিয়ে এই নদী প্রবাহিত হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে এই নদী ছিল পদ্মার প্রধান শাখা। মীর্জা নাথন‌‌ তঁার লেখা ‘‌বাহারীস্তান–‌ই–‌গায়রী’‌ গ্রন্থে এই নদীটার নাম ‘‌আনান্দ খাল’‌ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে এই নদীর ইসলামি নামে রূপান্তরিত হয়ে আড়িয়াল খাঁ হয়েছে।
রাজশাহি ও পাবনা জেলার নদী মুসা খাঁ বা মুষা খাঁ। মুসা খাঁ বরাল নদীর একটি শাখা। বারোভুঁইয়াদের মধ্যে মুসা খাঁ ছিলেন সব থেকে শক্তিশালী। তিনি ছিলেন ঢাকা ও ময়মনসিংহের জমিদার ঈশা খানের পুত্র। তাঁর নৌবাহিনী ছিল খুব শক্তিশালী। কতগুলো নদীর ওপর তাঁর কর্তৃত্ব ছিল সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত। ‘‌লক্ষা নদী’‌কে কেন্দ্র করেই মুসা খাঁ মোগলবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বীর যোদ্ধা হিসেবে তিনি ছিলেন জনসমাজে খুবই গ্রহণযোগ্য। অনুমান করা হয়, ব্যক্তি মানুষকে সম্মান জ্ঞাতার্থে লক্ষা নদীর নাম পরবর্তী সময়ে নাম হয় মুসা খাঁ নদী। 
এই নদীটার নাম ছিল হাউলি। অনেকে আবার ডাকত পাঙ্গাসি বা পাংশি বলেও। কারণ গ্রীষ্মকালে নদীতে জল এতটাই কম থাকত পাংশি নৌকা ছাড়া অন্য কোনও নৌকা নদীতে চলাচল করতে পারত না। মাজদিয়ার কাছ থেকে এই নদীটারই নীচের অংশটা ইছামতী নামে পরিচিত ছিল। হাউলি নদীটা জন্ম নিয়েছিল পদ্মা নদী থেকে। এদিকে বাংলাতে শুরু হয়ে গেল বর্গী আক্রমণ। সময়টা সপ্তদশ শতকের শেষের দিক। নদিয়ার সিংহাসনে তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। বর্গী আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি তাঁর রাজধানীকে কৃষ্ণনগর থেকে শিবনিবাসে স্থানান্তরিত করেন। 
এর পর রাজার চিন্তা শুরু হল সুরক্ষা নিয়ে। তাই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ঠিক করলেন নতুন রাজধানীকে পরিখা কেটে বেড় দেবেন। তাই রাতারাতি কৃষ্ণচন্দ্র হাউলি নদী থেকে একটা খাল কেটে এনে শিবনাবাসকে বেড় দেন। আর সেখান থেকে আর একটি খাল কেটে অঞ্জনা নদীর সঙ্গে জুড়ে দেন। হাউলি নদীর মাথা ভেঙে আরও একটি খাল তৈরি হল বলে নদীটা পরিচিতি লাভ করে মাথাভাঙা নদী হিসেবে। আর কাটা খালটা যেহেতু হাউলি নদীর মাথা চূর্ণ করে তৈরি হল, তাই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই খালটির নাম দেন চূর্ণী। কাটা খাল চূর্ণী ১৭৮০ সালের পর থেকে চূর্ণী নদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শিয়ালদা থেকে রেলপথে কৃষ্ণনগর বা শান্তিপুরের দিকে যাওয়ার সময় রানাঘাটের পরে কালীনারায়ণপুর স্টেশনটি পরে। এই স্টেশনটির পাশ দিয়ে চূর্ণী নদীটি প্রবাহিত হয়ে পায়রাডাঙার কাছে ভাগীরথী–‌হুগলি নদীতে মিশেছে। 
নদিয়া জেলার নাকাশিপাড়া থানা এলাকার মধ্যে একটা ছোট নদী আঁকাবাঁকা পথে বয়ে এসে জলঙ্গি নদীতে মিশত। নদীটিতে কেবলমাত্র বর্ষাকালেই জল থাকত। স্থানীয় প্রবীণ মানুষ আশাদুর রহমানের এখনও তাঁর দাদুর কাছ থেকে শোনা কথাগুলো স্মৃতিতে রয়েছে। দাদুর মুখ থেকে তিনি শুনেছিলেন নদীটার নামকরণের ইতিহাস। নদীটার ধারে অনেক কলমি শাক পাওয়া যেত। আর তা ছিল খুবই সুস্বাদু। গ্রামের গরিব মানুষেরা কিছু জোটাতে না পারলে নদীপাড়ের কলমি শাক তুলে রান্না করে নুন দিয়ে ভাত মেখে খেত। তাই নদীপাড়ের মানুষেরা নদীটাকে ভালবেসে নাম দিয়েছিল কলমি। পরবর্তী সময়ে এই নদীটা কলমা নদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। 
সোনার মতো সুন্দর ছিল তার জল। জলের নীচে চকচক করতে সোনা রঙের বালি। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বরতি বিল থেকে নদীটা  জন্ম নিয়ে ব্যারাকপুর, ইছাপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাগজোলা খালের সঙ্গে মিশত। এই নদীটার নাম ছিল সুবর্ণমতী। পরে এই নদীর নামটাই অপভ্রংশ হয়ে সোনাই নদী নামে পরিচিতি লাভ করে। 
সুন্দরবনের একটা নদীর কথা বলা যাক। উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত নদীটার আঠারোটি বাঁক রয়েছে। তাই নদীটার নাম হয়েছে আঠারোবাঁকি। সুন্দরবনে অনেক নদীর সঙ্গেই দোয়ানি শব্দটা যুক্ত রয়েছে। সুন্দরবনে ‘‌দোয়ানি’‌ শব্দটি মূলত ব্যবহার করা হয় সেই সব নদীর নামের ক্ষেত্রে যেসব নদীতে উৎস ও মোহনা দু‌দিক দিয়ে জোয়ার–ভাটা খেলা করে। যেমন একটা নদী হয় দুর্গাদোয়ানি। 
বাংলার নদীরা যে রকম ভাবে বাংলাকে গড়েপিটে মানুষ করেছে, সেই রকম ভাবে নদীগুলোর নামও নানা ভাবে ভেঙেগড়ে তৈরি হয়েছে। লোকমুখে পাল্টেও গেছে কত নদীর নাম। আবার দেখা গেল ‘‌গঙ্গা’‌, ‘‌পদ্মা’‌ ও ‘‌সরস্বতী’‌ কোনও একটি নদীর নাম হয়েই ক্ষান্ত থাকল না। নদীখাত পরিবর্তন হলেই সেই খাতের নাম হয়ে গেল ‘‌কাটি গঙ্গা’‌ বা ‘‌মরা গঙ্গা’‌ বা ‘‌ছাড়ি গঙ্গা’‌। পদ্মা নদী বাংলার মেয়ের মতন। উত্তর চব্বিশ পরগনা, মালদা, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় পদ্মা নামের নদী রয়েছে। শুধুমাত্র হাওড়া জেলাতেই সরস্বতী নদী আছে এমনটা নয়। পশ্চিমবঙ্গে ৬টা সরস্বতী নামের নদী খুঁজে পাওয়া যায়। যার মধ্যে একটা নদিয়া জেলায় চাপড়া ব্লকের মধ্যে রয়েছে। 
বাংলার সব নদীই বাংলার ঘরের লোক। এদেরকে নিয়েই বাংলার রোজনামচার টানা–‌পোড়েনের সংসার। আসলে বাংলার সব নদীর নামকরণে রয়েছে নিখাদ ভালবাসার ছোঁয়া। ‌‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top