আর কিছুদিন পরেই রথযাত্রা। রথযাত্রা শুধু ধর্ম বা ভক্তি নয়, এ এক উৎসব। দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এই উৎসবে মেতে ওঠেন। অবশ্যই এই উৎসবের কেন্দ্রস্থল পুরী। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা আর রথযাত্রা ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস, মিথ, বিজ্ঞান, লোকাচার। লিখলেন দেবাশিস পাঠক। ছবি তুলেছেন কুমার রায়।  

এখন জগন্নাথ
স্নানযাত্রা হয়ে গেছে। রথযাত্রা আসছে। ১০৮ ঘটি জল ঢেলে স্নান। সহ্য হয়? ফলত জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রার ভীষণ জ্বর এখন। প্রভুদের এ হল অনবসরকাল। দেবদর্শন নিষিদ্ধ। 
জগমোহনের পাশে নিরোধন–গৃহ। গৃহ বলতে যা বোঝায়, এ তা নয়। বাঁশ আর আগাছা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী কুটির। জ্বর না কমা অবধি এখানেই থাকবেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। তবে অনেক জল ঢেলে স্নান হয়েছে। ফলে রং চটে চোখমুখ ধেবড়ে একাকার। সেসব ঠিকঠাক করার কাজও চলে এই সময়টায়। তাই সাধারণ ভক্তদের চোখের আড়ালে শ্রীবিগ্রহগুলো। সাজানোর, রং করার পর্ব চলে। তবু কী আশ্চর্য! সেবকবৈদ্যরা এখন ভারি ব্যস্ত। দশমূল সেবন করিয়ে জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রাকে সারিয়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তাঁরা নিষ্ঠাভরে পালন করে চলেন। 
নিরোধন–গৃহে আলো জ্বলছে টিমটিম করে। শ্রীবিগ্রহগুলোর গায়ে সাদা কাপড় জড়ানো। আর রয়েছে সাদা গন্ধহীন ফুল। এই দিয়েই দেবার্চনা এই কটা দিন। রথযাত্রার দিন সুস্থ হয়ে উঠবেন দেবতারা। হাজির হবেন ভক্তদের সামনে। মন্দির ছেড়ে একেবারে রাজপথে। 
কথা হচ্ছিল ডা. দুর্গানন্দন মিশ্রের সঙ্গে। বাড়ি পুরীতে নয়, ভুবনেশ্বরে। জগন্নাথ আর তাঁর ভাইবোনদের শুশ্রূষার কাজে নিবেদিতপ্রাণ সেবকবৈদ্যদের অন্যতম। তিনিই জানালেন, এখন রুগির ওষুধ আর পথ্য দেওয়া হচ্ছে দেবতাদের। পথ্য বলতে মূলত ‘পানা’। দুধে চিনি আর কর্পূর মেশানো পানীয়। 
আর ওষুধ? সেটার নাম ‘দশমূল’। শ্রীজগন্নাথ মন্দির (প্রশাসন) আইন, ১৯৫২ অনুসারে ১৯৫৪-তে ওড়িশা সরকারের বিশেষ আধিকারিকরা প্রণয়ন করেছিলেন সেবায়েতদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের তালিকা। ১১৯টি বিষয়ের উল্লেখ আছে সেখানে। বলা আছে, অনবসর দশমীর সন্ধেতেই বৈদ্যরা ‘দশমূল’ তৈরি করে মন্দিরের অফিসে জমা করবেন। পরদিন অর্থাৎ একাদশীতে তিন বিগ্রহকে নিবেদন করা হবে তা।
নাম ‘দশমূল’। আসলে পাঁচটা গাছের ছাল আর পাঁচটা গাছের ‘সর্বাঙ্গ’ ব্যবহার করে তৈরি হয় এই বিশেষ পাচন। প্রতিটি উপকরণকে সমান ওজনে সংগ্রহ করা হয়। তারপর সেগুলো রোদে শুকানো হয়। তারপর সব একসঙ্গে গুঁড়ো করে ছাঁকা হয়। মাটির উনুনে নতুন কাঠের জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় এই দেবতার ওষুধ। ওষধি মিশ্রণের তেতো ভাব কাটাতে, তাতে মেশানো হয় ঘি, চিনি আর দুধের সর। 
‘দশমূল’-এর তরল মিশ্রণ তখন ‘মোদক’। অসুস্থ দেবতাদের একমাত্র ওষুধ। ‘দশমূল’ তৈরিতে কোন কোন গাছের ছাল বা ‘সর্বাঙ্গ’ ব্যবহার করা হয়? এ বিষয়ে বিশদে বলতে নারাজ ডা. দুর্গানন্দন মিশ্র। এই ওষুধ আর পথ্য তৈরি করাটা নিতান্তই ‘গুপ্তসেবা’। সবকিছু বলা হবে কী করে? শুধু বুঝিয়েছিলেন ‘সর্বাঙ্গ’ বলতে কী বোঝানো হয়? পাঁচটি গাছের মূল, ডাল, ছাল, ফল আর ফুল ব্যবহার করা হয়। এগুলোই হল ‘সর্বাঙ্গ’। 
সেবকবৈদ্যদের পীড়াপীড়ি করে জানা গেল ‘দশমূল’-এর দুটো উপচারের কথা। গোখুর আর বেল। দুটোরই ‘সর্বাঙ্গ’ ব্যবহার করা হয়। গোখুরের শিকড় খিদে বাড়ায়, যন্ত্রণার উপশম করে, অর্শ সারায়। আয়ুর্বেদ মতে, বাত, পিত্ত আর কফ সারাতে এর জুড়ি নেই। গোখুর ফলের স্বাদ টক টক। পাতা খেলে রক্ত বাড়ে। মুখের ঘা সারাতে গোখুর ফল সমেত জল ফুটিয়ে তা দিয়ে গার্গল করতে বলা হয়। অন্যদিকে বেলের শিকড় মিষ্টি মিষ্টি খেতে। পেটে ব্যথা, হৃৎকম্পন আর বাত-পিত্ত-কফ সারাতে এটা নাকি অনবদ্য। বেলপাতা নাকি শ্বাসকষ্ট দূর করতে দারুণ উপকারী। আর পাকা বেল ফল কোষ্ঠকাঠিন্য সারানোর পাশাপাশি হার্ট আর ব্রেনের অসুখেও দারুণ কাজে দেয়। 
আরও যেসব গাছ ‘দশমূল’ তৈরিতে কাজে লাগে, সেগুলো পাওয়াটাই ক্রমশ দুষ্কর হয়ে উঠছে। ফলে হাতের কাছে যা পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ‘দশমূল’ তৈরি করে মন্দির অফিসে জমা করার প্রবণতাও ক্রমশ বাড়ছে। অনেক সময় সেই ‘অসম্পূর্ণ’ পাচনই পৌঁছে যাচ্ছে ভক্তদের হাতে, স্রেফ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। আক্ষেপ দুর্গানন্দনের। 
এ সব হবে নাই বা কেন?
১২১২ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসলেন রাজা দ্বিতীয় অনঙ্গভীমদেব। জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতদের মধ্যে ক্ষেত্রবৈদ্য আর শাস্ত্রবৈদ্যদের নিয়োগ করার প্রথা তিনিই চালু করেন। তখন বছরে পনেরোটা মোহর পেতেন বৈদ্যরা। প্রতিটি মোহরে থাকত ৫.৮ গ্রাম সোনা। আর এখন ভগবানের জ্বর সারানোর কাজে নিবেদিতপ্রাণ বৈদ্যরা পান মাথাপিছু মাত্র কুড়ি টাকা। তবু দুর্গানন্দনের মতো কেউ কেউ স্রেফ দেবসেবার মতো সৌভাগ্য লাভ করার তাগিদে কাজটা করেন। ভালবাসেন এ কাজ করতে।   
এরপর রথযাত্রা
অনবসর কাল কেটে গেলে রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষে দ্বিতীয়ার দিন। বহুকাল ধরে এই রথযাত্রায় শামিল হচ্ছেন নানা মানুষ। নানাভাবে তাঁরা দেখছেন, বুঝেছেন এই উৎসবকে। কেউ আপ্লুত। কেউ বিস্মিত। কেউ বা স্রেফ বিরক্ত। 
প্রথমেই ‘‌বাহ-রুল-আরসার’‌। মাহমুদ-বিন-আমির ওয়ালি বালখির ভ্রমণবৃত্তান্ত। উত্তর আফগানিস্তানের বলখ অঞ্চলের বাসিন্দা। ১৬২৪-’‌২৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারতে আসেন। বয়স তখন তিরিশের আশেপাশে।
গন্তব্য ছিল শ্রীলঙ্কা। তাই বর্ধমান থেকে মেদিনীপুর। সেখানেই একদল তীর্থযাত্রীর সঙ্গে দেখা। তারা এসেছে অধুনা ঝাড়খণ্ডের বনাঞ্চল থেকে। ফি–বছর তারা রথের সময় পুরীতে যায়। বিশ্বাস, প্রত্যেক হিন্দুকে জীবনে অন্তত একবার পুরীর রথযাত্রা দেখতেই হবে। আর প্রতি বছর গেলে পূর্বপুরুষদের পাপক্ষয় হয়। তাঁদের অক্ষয় স্বর্গবাস নিশ্চিত হয়।
মাহমুদ ভিড়ে গেলেন তাদের দলে। মাথা নেড়া করলেন তাদের অনুকরণে। তাদেরই মতো খালি পা আর মুখে ‘‌হরিবোল’‌। রাত নামলে শুরু হত তাদের হাঁটা। এভাবে ৩২ দিন পর এসে পৌঁছলেন শ্রীক্ষেত্রে। ছদ্মবেশে বিনা বাধায় ঢুকে পড়লেন জগন্নাথ মন্দিরে। মন্দিরের বিরাটত্ব দেখে তিনি তাজ্জব বনে গেলেন। রথযাত্রা উৎসব দেখেও মুগ্ধ। ৫০০ জন ব্রাহ্মণ নারকেল ফাটিয়ে নিবেদন করছে রথে আসীন দেবতাদের। হাজারখানেক কলাকারের নৃত্যগীতে মু্খরিত আকাশ-বাতাস।
একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। প্রতিটি শব্দে যেন গুঁজে দিয়েছেন নিজের বিস্ময়মুগ্ধ অনুভূতি। শুধু গোল পাকিয়েছেন গন্তব্য নিয়ে। ভাষায় প্রতিবন্ধকতা। ইশারা–ইঙ্গিতে ভাব– বিনিময়। ভ্রমণবৃত্তান্তে রথের গন্তব্য গুন্ডিচা বাটি নয়, জগন্নাথের রসুইঘরের পাশে অবস্থিত পুকুর। 
এর প্রায় ১৮২ বছর পর রথযাত্রার সময় পুরীতে এসেছিলেন রেভারেন্ড ক্লডিয়াস বুকানন। আদৌ ভাল লাগেনি তঁার। জেরুজালেমের মৃত্যু–উপত্যকা হিন্নোমের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন জগন্নাথধামের। 
রথের দিন বেলা বারোটা। হাজার হাজার ভক্তের জয়ধ্বনি। মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন জগন্নাথদেবের শ্রীবিগ্রহ। প্রধান পুরোহিত চড়লেন রথে। শুরু করলেন মন্ত্র-উচ্চারণ। বুকাননের মনে হয়েছিল, এ সব কানে শোনা, চোখে দেখাও নাকি গভীর অন্যায়। বিরক্ত যাজক তাই লিখেছেন, ‘‌আই ফেল্ট লাইক আ গিল্টি পারসন’‌। অপরাধবোধে ভুগেছেন তিনি। রথযাত্রা উৎসবে আগত পুণ্যার্থীদের ওপর তীর্থকর বসিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। এভাবে রাজস্ব আদায়ের প্রবল বিরোধী বুকানন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের এমন ‘‌পিকিউলিয়ার সোর্স অফ রেভেনিউ’‌ দেখে ক্ষিপ্ত। 
জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ একেবারেই ভাল লাগেনি উইলিয়াম ব্যাম্পটনের। তিনিও খ্রিস্টান ধর্মযাজক। বুকাননের তিন বছর পর, ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে এসেছিলেন। বলেছিলেন, এই আস্থা-বিশ্বাস বেশি দিন টিকবে না। ১৯ বছর পর ফের পুরীতে। এবার রথযাত্রার সময়। মানুষের উৎসাহ–উদ্দীপনা দেখে বুঝলেন তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ধোপে টিকবে না। জগন্নাথের প্রতি মানুষের টান এই উনিশ বছরে আরও বেড়েছে। কেবল গেঁয়ো প্রান্তিক মানুষ নয়। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত অভিজাতদের রথযাত্রা নিয়ে মাতামাতি দেখে তাঁর বিস্ময়ের সীমা–পরিসীমা রইল না। 
অন্য রথযাত্রা 
মাহমুদ, বুকানন, ব্যাম্পটন, এঁরা সবাই যে রথযাত্রার সাক্ষী ছিলেন, সেটা ঘোষযাত্রা। ঘোষিত, তাই প্রায় সর্বজ্ঞাত। এছাড়াও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় আরও একটি রথযাত্রা। আষাঢ় মাসে নয়। আশ্বিন মাসে। বিজয়াদশমীর দিন। সেদিন বিমলা মন্দির থেকে রথে চেপে জগন্নাথের কাছে ফিরে আসে দুটো দেবমূর্তি। শ্রী এবং মদনমোহনের। ঘোষ রথযাত্রার দিনও এঁরা থাকেন। সুভদ্রার রথ ‘‌দেবদলন’‌। সেই রথের দ্বারে থাকে শ্রী-র বিগ্রহ। জগন্নাথদেবের রথের নাম ‘‌নন্দিঘোষ’‌। সেই রথে জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহের পাশে অধিষ্ঠান মদনমোহনের। আশ্বিনের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে জগন্নাথ মন্দির থেকে বিমলা মন্দিরে যান দুজন। পালকিতে চেপে।। শুক্লা নবমী অবধি সেখানেই পুজো পান তাঁরা। তারপর দুর্গা-মাধব উৎসব। বিজয়াদশমীর দিন শ্রী এবং মদনমোহনের ফিরে আসা। 
রথযাত্রা উৎসবে বৌদ্ধসংস্কৃতির ছাপ। স্বয়ং রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতে, রথযাত্রার ব্যাপারটাই বৌদ্ধসংস্কৃতির অঙ্গ। আর, দুর্গা-মাধব উৎসব? তাতে শাক্তভাবনার ছোঁয়া। বৌদ্ধ থেকে হিন্দুত্ব, শাক্ত থেকে বৈষ্ণব, সব ধারারই মহামিলন জগন্নাথ সংস্কৃতিতে।
রথযাত্রার ধরন যেমন দুরকম, তেমনই রথযাত্রা উৎসবে লেগে আছে দুটো জায়গার নাম। একটা অতি চেনা। পুরীধাম। আর-একটা জায়গা প্রায় অজ্ঞাত। গঞ্জাম জেলার মারাদা। পুরীর মতো পর্যটক বা পুণ্যার্থীর ভিড় নেই সেখানে। জগন্নাথ মন্দিরেও নেই কোনও বিগ্রহ। অথচ শ্রীক্ষেত্র যদি হয় পুরীধাম, তবে মারাদার পরিচয় ‘শরণ শ্রীক্ষেত্র’ হিসেবে। কারণ, বিপদে পড়ে শ্রীক্ষেত্রের জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এই জায়গারই শরণাপন্ন হয়েছিলেন। এখানেই কাটিয়েছিলেন টানা তিন বছর। ২৯ ডিসেম্বর, ১৭৩৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ১৭৩৬। 
পুরী আক্রমণ হতে পারে। এই খবর পেয়ে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব থেকে তিন শ্রীবিগ্রহকে বাঁচানোর তোড়জোড় শুরু হল। প্রথমে বানপুরের হরিশ্বর। সেখান থেকে কালিকটের চিকিলি। তারপর কোদালার রামগড়। সেখান থেকে গঞ্জামের অথগড়। সব জায়গা ঘুরে শেষমেশ গঞ্জামের মারাদায় অন্তিম আশ্রয় লাভ। চারদিকে ঘন জঙ্গল আর পাহাড়। তার ওপর জায়গাটা মুঘল সাম্রাজ্যের বাইরে, হায়দরাবাদের নিজামের শাসনাধীন। স্থানীয় শাসক জগদেব হরিচন্দন। খুরদার গজপতি বংশের রাজাদের সঙ্গে রীতিমতো পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁর আশ্বাস পেয়েই গজপতিরাজ মারাদাতে রেখে গেলেন তিনটি মূর্তি। রাতারাতি সেখানে তৈরি হল মন্দির। দেবসেবায় যাতে এতটুকু ত্রুটি না থাকে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি জগদেব হরিচন্দনের। এখানেই তিন-তিনটে বছর পালিত হল রথযাত্রা উৎসব, মহা–সমারোহে।
সব শান্ত হলে ফের পুরী মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে। শূন্য হয়ে গেল মারাদার দেবমন্দির। কিন্তু আজও সেখানে নিত্যসেবার আয়োজন। প্রত্যেক একাদশীতে শূন্য বেদির সামনে প্রদীপ জ্বালানো হয়। হরিচন্দন জগদেবের কীর্তির কথা স্মরণ করে পাঠ করা হয় শ্লোক। রথযাত্রার দিন বাজানো হয় নানা বাদ্যযন্ত্র। সম্ভবত মারাদার মন্দির বিশ্বের একমাত্র জগন্নাথ মন্দির, যেখানে রত্নবেদিতে কোনও বিগ্রহ না-থাকলেও নিত্যসেবাতে কোনও শিথিলতা নেই।

পুরীর মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে নিত্যসেবার জন্য মারাদায় অর্থ পাঠানো হয় আজও। এই খাতে দৈনিক বরাদ্দ ১০০ টাকা। মারাদায় তিন বছর। পুরীর মন্দিরে রত্নবেদি শূন্য। তবে রথযাত্রা উৎসব হয়েছিল। পুরীতে না হলেও মারাদায়। 
আর একবার ১৪৬ বছর শূন্য ছিল মন্দিরের রত্নবেদি। রথযাত্রাও হয়নি। দুষ্কৃতী আক্রমণের ভয়ে শ্রীবিগ্রহগুলো ঠাঁইনাড়া করতে গিয়েই এই বিপত্তি। মাদলা পাঁজি ওল্টালেই পাওয়া যাবে সে বিপন্নতার বৃত্তান্ত। 
আরব দেশের শাসক। রাজত্বকাল সপ্তম শতাব্দীর শেষ ভাগ। ৬৭০ থেকে ৬৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পুরী আক্রমণ করে তাঁর সেনা। আরব্য শাসক রক্তের হোলি খেলেছিল। মাদলা পাঁজিতে আরব্য শাসক তাই উল্লিখিত ‘রক্তবাহু’ পরিচয়ে।
সমুদ্রপথে পুরী এসে পৌঁছল রক্তবাহুর সৈন্যবাহিনী। ওড়িশার রাজা তখন প্রথম শুভকর। ভৌমকর বংশীয় এই রাজার কথা মাদলা পাঁজিতে মিলবে। তবে সেখানে তাঁর নাম রাজা শুভনাদেব। তৃতীয় শুভকরের হিন্দোললিপি থেকে জানা যায়, আরব্য রক্তবাহুর কাছে পরাস্ত হয়ে পুরী ছাড়তে বাধ্য হন প্রথম শুভকর। যাওয়ার সময় প্রাণের দেবতা জগন্নাথদেব-সহ তিনটি শ্রীবিগ্রহকে নিতে ভোলেননি তিনি। বৌদ্ধ হলেও জগন্নাথের প্রতি তাঁর ভক্তি প্রবল। 
পালানোর সময় গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিলেন তিনটি দেবমূর্তি। পশ্চিম সীমান্তে সোনেপুর। পুরী থেকে দূরত্ব প্রায় ষোলো মাইল। সেখানে পৌঁছল গো-শকটগুলো। এখানকার একটা গ্রাম গোপালি। সেখানকার মাটিতে পুঁতে ফেলা হল তিনটি মূর্তিই।
তারপর?
ইতিহাস বেবাক ভুলে গেল এই বৃত্তান্ত। গোপালিতে মাটির নিচে চাপা পড়ে রইলেন জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রা। পুরীর মন্দির তখন বিগ্রহশূন্য। রথযাত্রা আর হয় না সেখানে। এভাবেই কেটে গেল ১৪৬ বছর। 
খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীর শেষে ওড়িশার শাসনক্ষমতায় এল সোম বংশ। এই বংশের রাজা যযাতিকেশরী। ইতিহাস তাঁকে দ্বিতীয় যযাতি নামেও চেনে। সিংহাসনে বসার পর থেকেই তিনি খোঁজ চালাচ্ছিলেন তিনটি শ্রীবিগ্রহের। পুঁথিপত্র আর লোকগাথার সূত্র ধরে চলছিল অনুসন্ধান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান মিলল গোপালির। 
কোথায় এই গোপালি? একালের ইতিহাসবিদরা বলেন, কোতসামালির ছালিয়া পাহাড়ের গায়ে এই গ্রাম। এরকম একজন ওড়িশার ইতিহাস গবেষক অনিরুদ্ধ দাস। তিনি খুঁজে পেয়েছেন একটা নতুন মাদলা পাঁজি। নয়া হদিশ পাওয়া এই মাদলা পাঁজির বিবরণ অনুসারে, ওইসময় ওড়িশায় এসেছিলেন শঙ্করাচার্য। শ্রীক্ষেত্রে এলেন তিনি। যযাতিকেশরী তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। শঙ্করাচার্যের নির্দেশ মেনে চলল জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রার শ্রীবিগ্রহ অন্বেষণের অভিযান। অবশেষে গোপালিতে একটা বটগাছের নিচে মিলল খোঁজ। মূর্তি ততদিনে প্রায় মাটিতে মিশে গিয়েছে। দারুব্রহ্মের সামান্য অংশ পড়ে আছে। কোনওরকমে টিকে আছে মূর্তির ভেতরকার ব্রহ্মবস্তু। সেগুলো শনাক্ত করলেন শঙ্করাচার্য। তাঁর কথা মতো তৈরি হল নতুন তিনটি দারুমূর্তি। তৈরি হল নতুন মন্দিরও। নবকলবরে প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের পূজাবিধিতেও বদল আনলেন আচার্য শঙ্কর। সম্ভবত তখনই জগন্নাথদেবের অর্চনায় বৌদ্ধ প্রভাব মুছে ফেলে বৈদিক বিধি শিকড় ছড়িয়েছিল। ওড়িশার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন যাঁরা, তাঁদের অন্যতম রবীন্দ্রনাথ প্রতিহারী। তিনি হিসেব কষে দেখিয়েছেন, গোপালি থেকে শ্রীক্ষেত্রে তিনটি বিগ্রহের প্রত্যাবর্তন ৮১৪ থেকে ৮১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনও এক সময়ে। 
জগন্নাথদেবের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যযাতিকেশরী হয়ে উঠলেন ‘দ্বিতীয় ইন্দ্রদ্যুম্ন’। স্কন্দপুরাণ এবং ব্রহ্মপুরাণে আছে ইন্দ্রদ্যুম্নের কাহিনী। উজ্জয়িনীর রাজা তিনি। তাঁর নির্দেশেই ছদ্মবেশে বিশ্বকর্মা এসে তৈরি করেন তিনটি শ্রীবিগ্রহ। ব্রহ্মার পৌরোহিত্যে পুরীর মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয় সেগুলি। পুরাণের সেই রাজার নাম এবার জুড়ে গেল ইতিহাসের রাজার নামের সঙ্গে, উপাধি হিসেবে।
মন্দিরে বিগ্রহ না থাকার ঘটনা মহাপ্রভু চৈতন্যের সময়েও ঘটেছিল। ১৪৩১ শকাব্দ। ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ। বাংলা থেকে শ্রীক্ষেত্রে পা রাখলেন চৈতন্যদেব। কিন্তু জগন্নাথ দর্শন হল কই? 
কুমুদবন্ধু সেন ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের ভাদ্র সংখ্যার ‘ব্রহ্মবিদ্যা’ পত্রিকায় জানাচ্ছেন, ওইসময় বাংলার সুলতান ওড়িশা আক্রমণ করতে পারেন, এরকম একটা আশঙ্কা দেখা দেয়। ফলে, ‘শ্রীমূর্তিগুলি পাঠানদের শ্রীক্ষেত্রে প্রবেশ করিবার পূর্বেই নৌকাযোগে চিল্কাহ্রদের চড়াইগুহা পর্বতে অপসারিত করা হইয়াছিল।’ শুধু তাই নয়, অবস্থাপন্ন লোকজনও তখন আক্রমণের ভয়ে পুরী থেকে আশেপাশের জায়গাগুলোতে সরে যাচ্ছিল। জগন্নাথহীন পুরীতে থাকার কোনও যুক্তি শ্রীচৈতন্য খুঁজে পাননি। সম্ভবত সেইজন্যই তিনি পুরী ছেড়ে দাক্ষিণাত্যের পথ ধরেন। ফিরে আসেন ১৫১২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে। অর্থাৎ ১৪৩৪ শকাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে। সেবারই তিনি প্রথম জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা দেখেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্য চরিতামৃত’-এর একাদশ পরিচ্ছদে লেখা আছে, ‘‌স্নানযাত্রা দেখি প্রভু পাইল বড় সুখ। ঈশ্বরের অনবসরে পাইল মহা দুঃখ।’‌ এরপর ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ অবধি প্রতি বছর তিনি পুরীর রথযাত্রা দেখেছেন, তাতে অংশ নিয়েছেন।  
রথযাত্রার পর  
এই যে এখন দেখছেন সাদা কাপড় আর সাদা ফুলে ঢাকা, পানা আর পাচন-মোদক খাওয়া তিন দেবতা, এঁদের চেহারা-আচরণ বদলে যাবে রথযাত্রার পর। তখন অন্য বেশ, অন্য খাবার, অন্য রূপ। 
উল্টোরথের পর গুন্ডিচা বাটি থেকে শ্রীমন্দিরে ফেরত আসবেন তিনজন। রথ দাঁড়াবে মন্দিরের সিংহদরজায়। সোনাবেশ উঠবে তাঁদের শ্রীঅঙ্গে। 
সোনাবেশ মানে আপাদমস্তক সোনার গয়নায় মুড়ে ফেলা। সেসব গয়নাগাটির জন্যই তো রথযাত্রার আগে রত্নভাণ্ডারের চাবি হারানো নিয়ে এত হইচই। 
মন্দির অফিসে আইন বিভাগ। সেখানে যান, কিংবা পুরীর কালেক্টারের ডিসট্রিক্ট রেকর্ড রুমে, পেয়ে যাবেন গয়নাগাটির তালিকা। ১৯৭৮-এর জুলাই মাস অবধি সোনারুপোর অলংকারের একটা মোটামুটি আন্দাজ পেয়ে যাবেন। জানাচ্ছেন ড. ভাস্কর মিশ্র। একদা ডেপুটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের পদে ছিলেন। 
রত্নভাণ্ডারে রাখা ওই তালিকায় তিনটি শ্রেণি বিভাজন। প্রথম শ্রেণিতে আছে ‘ভিতর ভাণ্ডার’-এ গচ্ছিত অলংকারসামগ্রী। সেসব অলংকারে হাত পড়ে না কোনওদিনই। তৃতীয় শ্রেণিতে আছে সেইসব অলংকার, যেগুলো রোজ ব্যবহার করা হয়। এগুলো আছে ‘বাহার ভাণ্ডার’-এ। দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত অলংকারগুলোরও ঠিকানা ওই ‘বাহার ভাণ্ডার’। তবে সেগুলো পরানো হয় সোনাবেশ উৎসবের সময়।
তালিকায় চোখ রাখলেই জানা যাবে, সোনাবেশে পরানো গয়নার সংখ্যা ৭৯টি। সেগুলোর মোট ওজন ৮,১৭৫ ভরিরও বেশি। অর্থাৎ ৯৫ কেজিরও বেশি। রুপোর গয়নাও আছে সংখ্যায় ৩৯টি। ওজন ৪৬৭১ ভরি ২ আনা, অর্থাৎ ৫৪ কেজিরও বেশি। 
সোনাবেশে পরানো হয় সোনার হাত, সোনার পা। জগন্নাথের সোনার হাত-পায়ের ওজনই হল ৮১৮ ভরি অর্থাৎ প্রায় সাড়ে নয় কেজি। বলরামের ক্ষেত্রে ওজনটা একটু কম। ৭১০ ভরি অর্থাৎ আট কেজির বেশি। সোনার মুকুট পরানো হবে তিনটি বিগ্রহকে। জগন্নাথের স্বর্ণমুকুটের ওজন ৭ কেজিরও বেশি। বলরামেরটা ৫ কেজি আর সুভদ্রাদেবীরটা ৩ কেজির সামান্য বেশি। এ সময় তিনটি বিগ্রহের গলায় যে হার পরানো হবে, সেগুলোকে বলা হয় ‘হরিদা খান্ডি মালি’। এই তিনটে হারের মোট ওজন প্রায় এক কেজি চারশো গ্রাম। একেবারে পাকা সোনায় তৈরি সেগুলো।
রোজ যেসব গয়নাগাটি তিনটি দেববিগ্রহকে পরানো হয়, তাতে অবশ্য জাঁক খানিকটা কম। তিন দেবতার নিত্য ব্যবহারের জন্য সোনার গয়না রাখা আছে মোটে আটটি। মোট ওজন ২৯৯ ভরি ১ আনা। অর্থাৎ, মাত্র সাড়ে তিন কেজির কাছাকাছি। এ ধরনের রুপোর গয়নার সংখ্যা ২৩টি। মোট ওজন ২৬০৩ ভরি ৮ আনা। অর্থাৎ, প্রায় ৩০ কিলো। 
শুধু বেশভূষা নয়, খাবারদাবারেও ব্যাপক বদল ঘটবে রথযাত্রার পর। কথায় আছে, জগন্নাথদেবের ছাপ্পান্ন ভোগ। ওড়িশা রাজ্য সরকারের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক হরিপদ শতপথী। ওড়িশার সাংস্কৃতিক পরম্পরা নিয়ে গবেষণা করছেন অনেকদিন। ‘কালিনারি কালচার ইন শ্রীমন্দির’‌ শীর্ষক একটি তথ্যদীপ্র প্রবন্ধে তিনি জানাচ্ছেন, বাস্তবে ৫৬-র চেয়ে অনেক বেশি পদ রোজ নিবেদন করা হয় জগন্নাথকে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ৭৫০টি উনুনে তৈরি করা হয় এই ভোগ। হরিপদর নিজস্ব ধারণা উনুনের সংখ্যা দেড়শোর বেশি হবে না। 

মিথ বিজ্ঞান মিলমিশ   
জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার ভোগ রান্নার পদ্ধতি দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। মাটির উনুনগুলো তিন-চারটে করে একসঙ্গে জোড়া। তাতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ঝাউকাঠ কিংবা কাঠকয়লা। প্রতিটা উনুনে একটার ওপর একটা মাটির হাঁড়ি বসানো। গুনলে দেখা যাবে, প্রতিটি ক্ষেত্রে নয় কিংবা নয়ের গুণিতক কোনও সংখ্যায় হাঁড়িগুলো চাপানো হয়েছে। হাঁড়িগুলোর আকৃতি নানারকম। নামও। এক-একটা পদের জন্য এক-একটা নামের হাঁড়ি। যেমন, ডালের জন্য ‘দাসিয়া’, সবজি রান্নার জন্য ‘সমাধি’ বা ‘এমার’। ভাত ফোটানো হয় ‘কুদুয়া’-তে। উনুন থেকে গরম হাঁড়ি নামানোর জন্য ব্যবহার করা হয় মোটা দড়ি, কাঠের হাতা আর আঁকশি। ভাতের ফ্যান গালার জন্য কুদুয়ার একটা বিশেষ জায়গায় ফুটো করে দেওয়া হয়। 
পরপর এতগুলো হাঁড়ি। উনুনের আঁচ পাচ্ছে স্রেফ নিচের হাঁড়িটা। অথচ সবচেয়ে ওপরের হাঁড়িটার জিনিসও সেদ্ধ হচ্ছে, রান্না হচ্ছে কোনও একটা পদ। 
এমন রন্ধনকৌশল দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর পেছনে আছে ‘ইকমিক কুকার’-এর রন্ধন প্রযুক্তি। অর্থাৎ, চীনের রাস্তায় খাবারের ফেরিওয়ালারা যেভাবে খাবার তৈরি করে, সেটা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যাপক ইন্দুমাধব মল্লিক যে রান্নার কৌশল প্রয়োগ করে ‘ইকমিক কুকার’ বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে, সেই একই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগন্নাথদেবের রন্ধনশালায় স্মরণাতীত কাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ নিয়ে মিথ প্রচুর। কিন্তু বিজ্ঞানটা অজানা। 
এরকমই একটা মিথ-মাখানো মেসেজ হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে প্রায়ই দেখা যায়। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পতাকা নাকি হাওয়ার গতির অভিমুখের উল্টোদিকে ওড়ে। অনেকে বলেন, এ একেবারে নির্জলা মিথ্যে। আবার অনেকে বলেন, এ হল শ্রী জগন্নাথের চমৎকারী। আসলে ঠিকঠাক কথাটি কোনও পক্ষই সচরাচর তুলে ধরেন না। 
সত্যিটা হল এই যে জগন্নাথের মন্দিরের শীর্ষ পতাকা হাওয়ার গতির উল্টোদিকে ওড়ে। তবে সবসময় নয়, কখনও-কখনও। কিন্তু কখন?
বিজ্ঞান বলছে, সমুদ্রবায়ু মন্দির চূড়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় কখনও-কখনও ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করে। ভোঁতা কোনও জিনিসের চারপাশ দিয়ে প্রবাহী ধারাপ্রবাহে কারমান ঘূর্ণাবর্ত পথ তৈরি হওয়াটা প্রবাহী গতিবিদ্যার হিসেবে একটা সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা। সমুদ্রের কাছাকাছি লম্বা চোঙাকৃতি বাড়ি থাকলে এ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তার ওপর সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকায় আর্দ্রতা বেশি বলে এবং পদার্থবিজ্ঞানের রেনল্ড সংখ্যাসূত্র মেনে সেখানে বায়ুর ঘনত্ব কম আর তা গতিবেগের সঙ্গে সমানুপাতিক। এ সবের নিটফল কারমান ঘূর্ণাবর্ত পথের গঠন। প্রবাহী গতিবিদ্যার জগতে দিকপাল থিওডোর ভন কারমান। তাঁর নামেই চিহ্নিত বায়ুপ্রবাহের এমন বিভ্রান্তিকর চলাফেরা। আর তারই পরিণতিতে কোনও কোনও মন্দিরের শীর্ষ গম্বুজের পতাকাটি হাওয়ার গতিপথের বিপ্রতীপে ওঠে। 
আসলে বিজ্ঞান আর বিশ্বাস, ইতিহাসসম্মত সত্যি আর কল্পনার ডানা ছড়ানো জনশ্রুতি, জ্ঞাত তথ্য আর প্রায় অজ্ঞাত ঘটনাসম্ভার, সবতাতেই জগন্নাথদেবের জুড়ি মেলা ভার! বিস্ময়ও বুঝি বিস্মিত হয় তাঁর তাবৎ কথা জানলে। বলে, জয় জগন্নাথ। 
‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top