রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুবসমাজের অবক্ষয় ও চরম বেকারত্বকে সামনে রেখে ১৯৬৮–তে তপন সিংহ ‘‌আপনজন’‌ ছবিটি করেছিলেন। আজ ৫০ বছর পরেও সেই ছবি কতটা প্রাসঙ্গিক? লিখলেন‌ ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল।
 

 

ঘটনাটা ভাববার। ভাবিয়েও ছিল তপন সিংহকে। তিনি তখন ইন্দ্রমিত্রের ‘‌আপনজন’‌ গল্পটি নিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখায় ব্যস্ত ছবি করবেন বলে। এমন সময় একদিন এলাকারই একদল মস্তান টাইপের ছেলে বয়েস বড় জোর ১৮ থেকে ২৪–‌এর মধ্যে হবে জিপে করে এসে হাজির। উদ্দেশ্য, তাদের ফাংশনে গান গাওয়ার জন্য হেমন্ত মুখার্জিকে ঠিক করে দিতে হবে। তপনবাবু অবাক!‌ বললেন, আমি তো ভাই এসব করি না। এটা ওঁদের প্রফেশন। তা ছাড়া কাউকে বিনা পয়সায় গাওয়ার অনুরোধ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। ছোকরার দল তখন কুছ পরোয়া নেহি— এরকম একটা ভাব দেখিয়ে ব্যাগ থেকে গোছা গোছা নোটের বান্ডিল বার করে বলল, আমরা ওঁকে টাকা দিয়েই আনব স্যর। যত লাগে। আপনি শুধু একটু বলে দিন যাতে ফাংশনে আসেন! ওদের কাছে অত টাকা দেখে বিস্মিত তপনবাবু জানতে চান, এত টাকা ওরা পেল কোথায়! ওরা বলল, সামনে ইলেকশন। এখনই তো টাকার খেলা। যে রাজনৈতিক নেতার হয়ে তারা কাজ করছে তিনিই এই টাকার জোগানদার। তপনবাবুর কৌতূহল বেড়ে যায়। কী সেই কাজ, যার বিনিময়ে এত টাকা!‌ মারামারি, বোমাবাজি, না বিপক্ষকে খতম করা। কথাবার্তার পর ছেলের দল ফিরে গেলেও চিন্তা থামে না পরিচালকের। মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে অনর্গল। এই যে বেকার ছেলেগুলো পকেটভর্তি টাকা নিয়ে হিরোর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এ তো ক্ষণিকের জন্য। এরপর যখন নির্বাচন পর্ব মিটে যাবে, টাকার সোর্স বন্ধ হবে, তখন কী করবে!‌ ততদিনে তো খরচের হাত লম্বা হয়ে গেছে। তখন কি পয়সা উপার্জনে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হবে?‌ হয়তো তাই। হয়তো এই ভাবেই সমাজে অপরাধ ও অপরাধী তৈরি হয়। আর তার জন্মদাতা কারা?‌ কোনও কোনও সময় রাজনৈতিক নেতারা কি?‌ বা এমন কেউ যারা এদের সাহায্যে কাজ উদ্ধার করতে চায়।
এই চিন্তা থেকেই চিত্রনাট্যের গতি–‌প্রকৃতির কিছুটা পরিবর্তন করেন তপন সিংহ। পারিবারিক সমস্যা নিয়ে ছবিটি শুরু করলেও পরে তিনি এই বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার দিকে দর্শককে টেনে নিয়ে যান। আর তাতেই বাজিমাত। 
ছবি মুক্তি পাওয়ার পর শহরে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। শুধু হলে ভিড় বাড়াই নয় পাড়ার চায়ের দোকানেও আলোচনার বিষয় হয় ‘‌আপনজন’‌। অথচ প্রথমে নিতান্তই একটা পারিবারিক ছবি বানানোর জন্য তপনবাবু ‘‌আপনজন’‌ গল্পটি বেছেছিলেন। একাকিত্বের যন্ত্রণা নিয়ে ইন্দ্রমিত্রের এই লেখা একটি দৈনিকে পড়ে তাঁর ভাল লেগেছিল। পরে ১৯৬৮–‌র মে মাসে কলেজ স্ট্রিটের ‘‌বাক্‌সাহিত্য’‌ থেকে প্রকাশিত লেখকের একটি গল্প সঙ্কলনে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই গ্রন্থটির নামও ছিল ‘‌আপনজন’‌। যাক সেকথা, মোটামুটি এই গল্পটিকে রেখেই পরিচালকমশাই শেষে তৎকালীন যুব সম্প্রদায়ের অবক্ষয়ের এক উপকাহিনি জুড়ে দেন। 
১৯৬৮–‌র ৬ ডিসেম্বর মিনার–‌বিজলি–‌ছবিঘরে ‘‌আপনজন’‌ মুক্তি পায়।
এই ছবির শুরু এক গ্রাম্য বৃদ্ধা আনন্দময়ীর দিনলিপি দিয়ে। তাঁকে কেন্দ্র করেই ছবি। দূর পল্লী অঞ্চলের এই স্বামী–‌সন্তান পরিজনহীনা মানুষটির দিন কাটছিল অনাড়ম্বরেই। সংস্কারের অভাবে জীর্ণ তার বাড়ি। দেখভাল না থাকায় সামান্য ধানজমি থাকা সত্ত্বেও তার হালচাল খুবই দারিদ্র‌্যপীড়িত। আসলে দীর্ঘদিন নির্বান্ধব একঘেয়ে জীবন কাটানোয় খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাই যৎকিঞ্চিৎ সম্পদকে পরিকল্পনামাফিক খাটিয়ে নিজেকে সচ্ছল করে তোলার বদলে শুধু একা জীবন থেকে বাঁচতে হঠাৎই আপনজন বলে আসা অচেনা মন্টুর সাদর আমন্ত্রণে তিনি কলকাতা রওনা হন। মন্টু পরিচয় দিয়েছিল সে সম্পর্কে ভাগনা হয়। আর আনন্দময়ী তার মামিমা। এবং কলকাতায় তাদের সঙ্গে থাকলে তিনি খুব ভাল থাকবেন। যত্ন–‌আত্তির ত্রুটি হবে না। যদিও এটা ছিল মন্টু ছেলেটির ছল। তারা স্বামী–‌স্ত্রী দুজনে চাকরি করে। বাড়িতে ছেলে দেখার বিশ্বাসী লোক দরকার। আনন্দময়ীর মতো একজন হলে ভাল হয়। আর আপনজন বলে পয়সাকড়িও দিতে হয় না। আনন্দময়ী সাদাসিধে মানুষ। অতশত ভাবেননি। সত্যিই তো এমন আত্মীয় আজকাল আছে যে বাড়ি বয়ে এসে নিয়ে যেতে চাইছে। তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। কতকালের স্বামীর ভিটে ছেড়ে যেতে প্রাণ কাঁদে না। কিন্তু কলকাতা গিয়ে কিছুদিনের মধ্যে ঘোর কাটে। চোখ খুলে দেয় বাড়ির ঠিকা কাজের মাসি। বুঝতে অসুবিধে হয় না বাবা–‌মা, কাকা–‌কাকিমা, খুড়তুতো–জ্যাঠাতুতো ভাইবোনেরা মিলেমিশে থাকা একান্নবর্তী পরিবারের দিন শেষ। এসেছে নতুন যুগ। ছোট ছোট সব সংসার। স্বামী–‌স্ত্রী ও তাদের সন্তান। তাই তো আনন্দময়ীদের মতো লোক এখন আকাশের চাঁদ। মোটা টাকা মাইনে দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। আর সে কিনা বিনা পয়সায় কাজ করবে। ঠিক তাই। কাজের মাসির কথা অনুযায়ী ভাগ্নে মন্টুকে চেপে ধরতেই মাসিক মাহিনা বরাদ্দ হল। সুযোগ সুবিধাও কিছু বাড়ল। এইবার আনন্দময়ী চিনে ফেলেছেন কলকাতা শহরটাকে। তাই তিনি পদে পদে গৃহকর্তাকে ভয় দেখান, কেউ যদি বেশি টাকা দেয় তো চলে যাবেন। এইভাবেই দিন কাটছিল। তবে এমন আপনজনদের সান্নিধ্যে আনন্দময়ীর বেশিদিন থাকা সম্ভব হল না। ওদের আশ্রয় ছাড়তে হল। দুটি অনাথ ছেলেমেয়ের কারণেই ঘটল আশ্রয় ত্যাগের ঘটনা। এবং সেই সূত্রে পরিচয় হল বলগাহীন ‘‌মস্তান’‌ ছেলেদের সঙ্গে যাদের গুরু রবি। তিনি বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন, প্রতিনিয়ত গুন্ডামি, বদমাইশি করলেও ওই অনাথযুগল চুনচুন ও টুনটুনের জন্য রবি গুন্ডার মায়া মমতা অপরিসীম। তার পয়সায় বাচ্চা দুটির ক্ষুধা নিবারণ হয়। এমনকী আনন্দময়ীর দুধ–‌খই–ফুলফলের জোগানও দেয় রবি। তাই গুন্ডা মস্তান হলেও তারাই তাঁর প্রকৃত আপনজন হয়ে ওঠে। এবং শত অপরাধ করলেও তিনি তাদের সোনার চাঁদ বলেন।
সিনেমা আরও গড়ালে দেখা যায় মস্তান রবি ওরফে স্বরূপ দত্ত‌র দলের সঙ্গে ছেনোর (‌শমিত ভঞ্জ)‌ দলের ব্যাপক সঙ্ঘর্ষ। তাদেরকে নেতাদের ব্যবহারের কৌশল। সেই অ্যাকশনের মধ্যে পড়ে প্রৌঢ়া আনন্দময়ীর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া।
আগেই বলেছি ‘‌আপনজন’‌–‌এর মধ্যে দিয়ে তপন সিংহ মূলত সমাজের একটি জ্বলন্ত সমস্যা যুব সমস্যাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। শিক্ষিত যুবকদের একটা অংশ, যারা সুস্থ জীবনধারা থেকে বিচ্যুত, রকবাজ, মস্তান বা গুন্ডা হিসেবে পরিচিত, যারা আত্মীয় পরিজনের সহজ স্বাভাবিক স্নেহ ভালবাসা না পাওয়া নিষ্ঠুর সামাজিক ব্যবস্থা এবং অবস্থার দৃশ্য বা অদৃশ্য চক্রান্তের শিকার, তাদের দিনযাপন, হঠকারিতা, রাগ–উত্তেজনাকে অত্যন্ত মুনশিয়ানায় সিনেমায় হাজির করেছেন তপন সিংহ। এবং লক্ষণীয় এই বিপথগামী তারুণ্যের বহিঃপ্রকাশ প্রথম দেখা গেল বাংলা ছবিতে।
আসলে যে সময়টায় ‘‌আপনজন’‌–‌এর জন্ম সেই যুগটাকে ভাল বলা যায় না। রাজ্য জুড়ে এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। খাদ্যসঙ্কটের জ্বালা তখনও জুড়োয়নি। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে সঙ্ঘাত লেগেই রয়েছে। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা। সঙ্গে চরম বেকারত্ব। কী নেই। সবই নেগেটিভ। এর মধ্যে ‘‌আপনজন’‌–‌এর মতো ছবি করা সত্যিই সহজ ছিল না। তবু তিনি করেছেন। মাথা উঁচু করে করেছেন। রবির দলের সঙ্গে ছেনোর দলকে লড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কার্যসিদ্ধির চিত্রকে তুলে ধরে তিনি এক জমজমাট অথচ রূঢ় বাস্তব ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। এ বড় কম কথা নয়। 
আর একটা বাধা তখন পরিচালক মহলে ঘুম কেড়েছিল তা হল, সেন্সর বোর্ডের বাড়াবাড়ি। এই নিয়ে প্রতিবাদও কম হয়নি। শেষে ‘‌আপনজন’‌ মুক্তির বছরেই অক্টোবর নাগাদ খোসলা কমিটির সদস্যরা বাংলা চিত্রজগতের মতামত জানতে কলকাতায় আসেন। সেই উপলক্ষে এফএফএসআই–‌এর ফিল্ম স্টাডি অ্যান্ড ইনফরমেশন গ্রুপের উদ্যোগে সেন্সর নীতির ওপর কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে চলচ্চিত্র ও সমাজ বিষয়ে তিন দিনের সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেখানে চিত্রনির্মাতা প্রভাত মুখার্জি তাঁর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছিলেন, আজকের সমাজ জীবনের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে ছবি করার উপায় নেই। শাসনযন্ত্রের দুর্নীতি, পুলিশের গুলিবর্ষণ, গান্ধী টুপিধারী প্রতারক ইত্যাদি যদি দেখানো হয় তবে বিতর্কমূলক আখ্যা দিয়ে সেন্সর বোর্ড সেগুলির ছাড়পত্র নাকচ করে দেবে। অর্থাৎ সমাজভাবনা রহিত অদ্ভুত, অবাস্তব ছবি না করলে সে ছবির মুক্তির সম্ভাবনা নেই। এদিকে সমালোচকেরা বলে যাচ্ছেন, বাংলা সিনেমা নাকি সমকালীন সমস্যার সম্মুখীন হয় না। কিন্তু কী করে হবে!‌ হওয়ার উপায় কোথায়!‌ ওঁরা তপন সিংহকেও ছাড়েননি। ‌এই ‘‌আপনজন’‌–‌এর ক্ষেত্রেই আঙুল তুলেছেন। বলেছেন, রবি–‌ছেনোর দলের মধ্যে মারামারি সংক্রান্ত দৃশ্যে মদতকারী দুই রাজনৈতিক নেতাকে কেন চিহ্নিতকরণ করা হল না। জানানো হল না তারা কোন দলের প্রতিনিধি। তপনবাবু কিন্তু এই সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে যাননি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি বলেছেন, ‘‌আপনজন’‌ ছবিতে দুজন ভোটপ্রার্থী চরিত্রকে দুই রাজনৈতিক অংশের প্রতিভূ করে সমাজ সমালোচনা করার ইচ্ছে তাঁর ছিল কিন্তু সেন্সর বোর্ড যে হাঁ করে বসে আছে। পারবেন কীভাবে। পারলে ভালই হত। আরও খুলত ছবিটা। তবু এ সব বাধা–বিপত্তি সত্ত্বেও যে দূরদর্শিতা তপন সিংহ তাঁর ‘‌আপনজন’‌ ছবিতে দেখিয়েছেন তাতে তাঁকে শাবাশ জানাতে হয়। 
যদিও বাহবা শুধু তাঁর প্রাপ্য নয়, এখানে সকলের অভিনয়ও তারিফযোগ্য। আগাগোড়া আনন্দময়ীর ভূমিকায় ছায়াদেবীর কী অসামান্য অভিনয়। ভাবা যায় না। কখনও তিনি অতীত চিন্তায় মগ্ন। কখনও বর্তমানের রূঢ়তায় বিমূঢ়। কখনও স্নেহ–‌কোমল আবার কখনও বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এক মানুষ একাধিক ভূমিকা যেভাবে পালন করেছেন গোটা ছবিতে তা ছায়াদেবীর মতো শিল্পীদের পক্ষেই সম্ভব। তাই তো তপনবাবু তাঁকে একশো ভাগ ভরসা করতেন। তিনি বলতেনও ছায়াদি বাংলা ছবির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। অনেকটা জায়গা জুড়ে তিনি অভিনয় করতে পারতেন। কী বডি ল্যাঙ্গুয়েজ!‌ সেই সঙ্গে কণ্ঠে মডুলেশন!‌ ঠিক মঞ্চাভিনেত্রীর মতো। অথচ তিনি কোনওদিন মঞ্চে অভিনয় করেননি! অন্যদিকে দুই রকবাজ দলের নায়ক রবি ও ছেনোর ভূমিকায় স্বরূপ দত্ত, শমিত ভঞ্জদের অভিনয়েরও তুলনা নেই। এ ছাড়া তাদের সাকরেদ পার্থ মুখোপাধ্যায় (‌মনু),‌ মৃণাল মুখোপাধ্যায় (‌বিলু),‌ কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়ের (‌মন্টু)‌ বলিষ্ঠ সহযোগিতায় চরিত্রগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নির্মলকুমার হয়েছেন মন্টু চাটুজ্যে, তাঁর স্ত্রী ‘‌লতু’‌ অর্থাৎ সুমিতা সান্যালকে বেশ লাগে। প্রেমাংশু বসুর ছোট্ট রোলটিও সুঅভিনীত। আর যাঁরা সহজেই চিত্রনাট্যের দাবি মিটিয়েছেন, তাঁরা হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, দিলীপ রায়, পূর্ণিমাদেবী প্রমুখ। তবে এঁদের তপনবাবু নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে নতুনদের। প্রায় মাস তিনেক রিহার্সাল চলেছিল। পরিচালক মশাই নিজে একজন ভাল অভিনেতা হওয়ায় বিভিন্ন চরিত্র অ্যাক্টিং করে দেখিয়ে দিতেন। তাতে সকলের সুবিধে হত। তা ছাড়া তপনবাবু প্রতিভাবান নতুন ছেলেদের নিয়ে কাজ করতে ভালও বাসতেন। স্বরূপ দত্তের সঙ্গে তাঁর আলাপ সহকারী বলাই সেনের ছবি ‘‌সুরের আগুন’‌–‌এর প্রিমিয়ার শো–‌তে। তখন নানা জায়গায় নাটক করে বেড়াচ্ছেন স্বরূপ। প্রথম দর্শনেই ভাল লাগা এবং অফার। আর শমিত ভঞ্জের সঙ্গে পরিচয় তমলুকে ‘‌কেদার রাজা’‌ শুটিংয়ের সময়। শমিতের বাড়ি ছিল ওখানেই। ছটফটে সুন্দর চেহারার ছেলে স্বরূপের মতো একই নেশায় মেতে আছে দেখে তাকেও নিয়ে নিলেন। এই ভাবেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ‘‌আপনজন’‌–‌এর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া জুটিকে। অবশ্য একেবারে সূচনায় কিশোরী আনন্দময়ীর স্বামী চিন্ময় রায় (‌নেপু)‌ দারুণ মজা দিয়েছেন দর্শকদের। সর্বদা রাগে তিড়িং তিড়িং করলেও তাঁর মনটা ছিল নরম। রোমি চৌধুরির সঙ্গে জবরদস্ত হয়েছিল স্বামী–‌স্ত্রীর অ্যাক্টিং। সিনেমাপ্রিয় প্রবীণ মানুষজন নিশ্চয় এখনও ভোলেননি ফুলশয্যার রাতে নতুন বউয়ের মুখ দেখে চিন্ময়ের সেই উক্তি, ‘‌ও বাবা, মা যে বলেছিল বউয়ের চাঁদপানা মুখ। এ তো গোলগাল কচ্ছপ। গুট গুট করে হাঁটছে।’‌ সেই শুনে দর্শকদের কী হাসি। তাঁর এমন সরস অভিনয় তারাশঙ্করেরও মন ছুঁয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘‌শরীরটাকে একটু ভাল করো। তবে এ শরীরেই তুমি দারুণ অভিনয় করেছ।’‌ কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, সব মিলিয়ে হালকা মেজাজের বিরাট বক্তব্য সমৃদ্ধ ছবিটি সাধারণ মানুষের ভাল লাগলেও মন পাওয়া গেল না রাজনৈতিক জগতের অনেকেরই। তপনবাবুকে শুনতে হয়েছিল, এই ছবি নাকি সিআইএ–‌র টাকায় করা। হয়তো এটাই তপনবাবুর পুরস্কার। আর এহেন সম্মানে উজ্জীবিত হয়েই তিনি এগিয়ে যান। করেন ‘‌সাগিনা মাহাতো’‌–‌র মতো আরও এক দুর্দান্ত সিনেমা।
‌‌এই যে এত বাধা–বিপত্তির মধ্যে তাঁর পথ চলা এটা তাঁকে দেখে বোঝা যেত না। বড় সহজ সরল মানুষ ছিলেন। ছায়াদেবীও বলতেন, চলনে বলনে ডিরেক্টরদের কতই না কেতা। কিন্তু তপনবাবু ইনডোর–‌আউটডোর যেখানেই যান না কেন, একেবারেই সিম্পল। অকারণে ওঁকে কোনও দিন জাহির করতে দেখিনি। ছায়াদেবী নিজেও তাই ছিলেন। অত বড় মাপের একজন অভিনেত্রী কখনও কো–‌আর্টিস্টদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। ‘‌হাটে বাজারে’‌ ছবিতে শমিত ভঞ্জের সঙ্গে প্রথম আলাপ। নবীন শমিতকে কখনও আপনি ভিন্ন সম্বোধন করেননি। আবার ‘‌আপনজন’‌–‌এ দুজনে খুব সহজ হয়ে যান। ‘‌আপনজন’‌–‌এ স্বরূপ, শমিত চরিত্র দুটিকে তিনি প্রায়শই গুলিয়ে ফেলতেন। ছেনোকে বলতেন রবি আর রবিকে ছেনো। ছবিটা দেখে দুজনের অভিনয়ের খুব প্রশংসা করেছিলেন।
স্বরূপও ছায়াদেবীর খুব ফ্যান ছিলেন। বলতেন, অভিনয়ের সময় ছায়াদি এমন সব ‘‌পোজ’‌ নিতেন যা সচরাচর দেখা যেত না। ক্যামেরাটা খুব ভাল বুঝতেন। তাই তপনবাবুর অধিকাংশ ছবিতে তিনি ছিলেন তুরুপের তাস। অন্যদিকে তপনবাবুর মেধাও প্রশ্নাতীত। একটি দৈনিকে গল্পটি পড়ে তিনি রমাপদ চৌধুরির মাধ্যমে যখন ইন্দ্রমিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তখনও তিনি ভাবতে পারেননি ‘‌আপনজন’–কে কেন্দ্র করে এই পর্যায়ের একটি ছবি করতে পারবেন। লেখকও পরিচালকের সঙ্গে ‘‌বিজলি’‌–‌তে ছবিটি দেখতে দেখতে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে যুব সমাজের অধঃপতনের কাহিনিটা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এছাড়াও ছবির বিষয়বস্তু পরিচয় লিপির ওই দৃশ্যে আভাসিত অদ্ভুত সাজে সজ্জিত, মুখোশ পরা যুবকদের উল্লাস ও অস্থিরতা। একটানা গোলোযোগের শব্দ। তারই ভিতর উঠ গো ভারতলক্ষ্মী গানের করুণ সুর বেশ মানানসই। এবং শেষটা যাদের সঙ্ঘর্ষ থামাতে আনন্দময়ী প্রাণ দিলেন। পুলিশ তাঁদের সকলকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ ভ্যানে ওঠার আগে তাঁদের মৃতদেহের দিকে ফিরে তাকানো। সেই চাহনিতে যেন নিজেদের অপরাধবোধের স্বীকৃতি। আর অ্যাম্বুল্যান্সের যে গাড়িতে নিথর আনন্দময়ীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল তার পিছু পিছু ক্রন্দনরত দুই অনাথ শিশুর দৌড়। দেখে মনে হয়, তাদের নিজের বলে আর কেউ রইল না। 
তপনবাবু হয়তো এই অন্তিম দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখ খুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা কি আজও এই বিষয়ে সচেতন হতে পেরেছি?‌ তাই বোধহয় এই ছবির চরিত্ররা এখনও আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।‌‌ ‌‌■

জনপ্রিয়

Back To Top