অমর মিত্র: দেশটির নাম কাজাখস্তান। সোবিয়েত যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে গেলে ১৯৯১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই দেশের কথা যতটুকু জানি তা রুশ সাহিত্যে। আলেকজান্ডার পুশকিনের ক্যাপ্টেনের মেয়ে উপন্যাসের কথা মনে পড়ে, তুষারাবৃত সেই স্তেপভূমিতে পথ হারিয়েছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যাওয়া  প্রাক্তন সামরিক কর্তার তরুণ পুত্র। তাকে সেই তুষারপাতের ভিতর থেকে পথ চিনিয়েছিল এক কশাক। সেই স্তেপভূমি এই দেশে। কাজাখস্তান দেশটি ইউরেশিয়ার হৃদয় যেন। আছে এশিয়াতে, ইয়োরোপ রাশিয়ার গায়ে। এই দেশে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতমালা, সির দরিয়া আরও কত নদী, উরাল হ্রদ, যাযাবর উপজাতি নিয়ে অপূর্ব। আমি ‘‌ধ্রুবপুত্র’‌ লেখার সময় মানচিত্রে চিনেছিলাম প্রাচীন এই রেশমপথ, অক্সাস নদী, হিন্দুকুশ পর্বতমালা, গ্রিক উপনিবেশের কথা। তা ছিল উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশ হয়ে এই দিকে। ভাবিনি কোনওদিন সেই দেশে যাব। স্বপ্ন ব্যতীত তা কী করে সম্ভব হবে?  
আমার ফেসবুকের অথরস পেজ আছে একটি। কালেভদ্রে খোলা হয়। সেখানে দূর কাজাখস্তান থেকে একটি মেসেজ এসেছিল গত এপ্রিলের ৩ তারিখে। কাজাখস্তান  রাইটার্স ইউনিয়নের সিনিয়র লিটারারি অ্যাডভাইসর দুমান আতাইবেক আমাকে জানিয়েছিলেন, যে কাজাখস্তানের রাজধানী নুর সুলতান শহরে আগস্টের ১৪,১৫,১৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় প্রথম এশিয়ান লিটারারি ফোরামে আমি অংশগ্রহণ করতে সম্মত কি না। আমি সেই বার্তাটি দেখেছি জুন মাসের ২০ তারিখে আচমকা ওই পেজটি খুলে। বার্তাটি আড়াই মাস আগে এসেছে, আমি দেখিনি, সেই মতো দুঃখ প্রকাশ করে উত্তর দিয়েছিলাম। সঙ্গে আমার ই–মেল ও ফোন নম্বর জানিয়ে দিই সেখানেই। ভেবেইছিলাম ততদিনে সব কিছুই স্থির হয়ে গেছে। আমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু তা গ্রহণ করতে পারলাম না। সুতরাং আমার ইন–বক্সের উত্তরের কোনও মানে নেই। কিন্তু সেই উত্তরের ঠিক এক মাস বাদে গত ২২ জুলাই আমার কাছে মেল আসে কাজাখস্তান রাইটার্স ইউনিয়নের সভাপতির। দেরিতে লিখিত আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান যে তারিখ বদল হয়েছে। ৪, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, কাজাখস্তানের রাজধানী নুর সুলতান শহরে (পূর্বতন নাম ‘আস্তানা’) প্রথম এশীয় রাইটার্স ফোরাম অনুষ্ঠিত হবে। যাওয়া আসা, সেখানে থাকার সমস্ত দায়িত্ব তাঁদের, এমনকী ভিসার ব্যবস্থা তাঁরা করবেন দিল্লিস্থ কাজাখ হাইকমিশনের ব্যবস্থাপনায়। এই উদ্যোগে কাজাখস্তান সরকার এবং তাদের বৈদেশিক দূতাবাসের সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে। সুতরাং একে একে যাওয়া এবং ফেরার টিকিট এল। ই-মেল-এ এল দূতাবাসের চিঠি। আমাকে বলা হল মূল আমন্ত্রণ ও দূতাবাসের চিঠির রঙিন প্রতিলিপি নিয়ে রওনা হতে। নুর সুলতান এয়ারপোর্টে নেমে পাসপোর্টে ছাপ মেরে মূল ভিসা দেবে কাজাখ সরকার। হ্যাঁ, আমার পাসপোর্টের ছবি আমি ওঁদের কথামতো মেইল করে পাঠিয়েছিলাম আগেই। যাত্রা শুরু হল গত ৩ সেপ্টেম্বর। সকাল ৯-৪৫–এ এমিরেটস এয়ারলাইন্স বিমানে দুবাই যাত্রা। সেখান থেকে উড়ান বদল করতে হবে। আমি ভাবছিলাম, সেই কৈশোর যৌবনের স্বপ্ন সোবিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল এমন এক দেশে আমি যাচ্ছি, যেখানে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। লন্ডন–আমেরিকা যায় মানুষ, বাঙালিদের বঙ্গ সম্মেলনে যায়, অস্ট্রেলিয়া যায় বঙ্গ সম্মেলনে, কিন্তু আমি একা এমন এক সম্মেলনে যাচ্ছি, যে দেশে সচরাচর যাওয়া হয় না। সেই দেশের মানুষের ভাষা আমার জানা নেই। সেখানে বাঙালি থাকলেও তাদের কাউকে আমি চিনি না। উদ্যোক্তাদের ফোন করে জেনেছিলাম, আমিই ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি। বহু অনুসন্ধান করে, বিচার বিবেচনা করে, তাঁরা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগের দিন ভেবেছিলাম এ কখনও হতে পারে? সেই ৪৫ বছর আগে অবিভক্ত মেদিনীপুরের ডেবরা থানার করন্ডা নামের এক গ্রামে গিয়েছিলাম সেটেলমেন্ট কানুনগো হয়ে। কংসাবতী পার হয়ে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট পায়ে হাঁটতে হত। সেই ১৯৭৪–এর এপ্রিলে একটি গল্প লিখি, ‘মেলার দিকে ঘর’। সেই গল্প লেখার পর মনস্থির করে নিই, লিখব। হ্যাঁ, লিখব। লেখা ব্যতীত আর কিছু হবে না আমার দ্বারা। সেই গল্প ছাপা হয়েছিল স্থানীয় ‘একাল’ পত্রিকায়, মুদ্রণ সংখ্যা ছিল ২০০। বড় চাকরি করার এলেম আমার ছিল না। মানসিকতাই ছিল না। ক্যাম্প অফিসে অধস্তন কর্মচারী, ডি–গ্রুপ পিয়ন, আমিন কিংবা মোহরার পেশকার বাবুর সঙ্গে মেস করে থেকেছি। কারও জ্বর হলে শিয়রে বসে মাথায় জলপট্টি দিয়েছি। আমাকেও তারা শুশ্রূষা দিয়েছে, মনে পড়ে। যাই হোক, সেই গল্প সন্তোষকুমার ঘোষ, কবি আলোক সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অধ্যাপক অমলেন্দু বসুর ভাল লেগেছিল ‘‌কবিপত্র’‌ পত্রিকায় পুনর্মুদ্রণ হওয়ার পর। ৪৫ বছর কেটে গেছে, জীবনে এত বিস্ময় থাকে? মা– বাবা কেউ এখন নেই। আমার জন্য তাঁদের দুঃখ ছিল। তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্রটি কোন হাটে মাঠে চাকরি করে বেড়ায়, মফস্‌সলে ঘুরে বেড়ায়, জীবনটা গুছিয়ে নিতে পারল না। এখন বৃদ্ধ হয়ে আসা দুই দাদা, স্ত্রী ও দুই সন্তান, আত্মজন মৈনাক যখন শুনেছে এই আমন্ত্রণের কথা, আনন্দ করে বলেছে, ঘুরে এসো, ঘুরে এসো, তুমি তো ডেবরা, গোপীবল্লভপুরে, হাটে মাঠে হেঁটে বেড়ানো মানুষ, তুমি ঠিক পারবে একা, ভয় নেই। বড়দা মনোজ, মেজদা উদয়ন বললেন, যা জয় করে আয়। মা–বাবার মুখ উজ্জ্বল করে আয়। মা–বাবা মানে দেশ, মা–বাবা মানে বাংলা ভাষা, মা–বাবা মানে রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিতের এই শহর। 
যাওয়ার পথে দুবাইয়ে আট ঘণ্টার অপেক্ষা ছিল। এখান থেকে ভারতীয় সময় সকাল ৯-৪৫-এর উড়ান দুবাইয়ের সময় ১২-৩০টায় নামল। সময়ের তফাত ২ ঘণ্টা। একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয় এমিরেটস এয়ারলাইনসে ঘোষণা বাংলায় হয়, খাদ্যতালিকায় বাংলা ভাষা আছে। ভারতীয় কোনও উড়ান কি হিন্দি আর ইংরেজি ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষা ব্যবহার করে? বাংলাদেশের জন্যই তা হয়েছে স্বীকার করতে হবে। দুবাই এয়ারপোর্টের বিস্তার বিশাল, এক টার্মিনাল থেকে বাসে অন্য টার্মিনালে যেতে মিনিট চল্লিশ। বাসের গতি অবশ্য কম। আমি ভিতু মানুষ। দুবাই থেকে কাজাখস্তানের রাজধানী নুর-সুলতানের উড়ান রাত ৯-১০-এ। আমার নির্দিষ্ট গেটে আমি পৌঁছেছি বেলা ১-৩০ (দুবাই টাইম) নাগাদ। কাঁধে ঝোলা, কেবিন ব্যাগ নিয়ে বসেই আছি কলকাতার সামান্য মানুষ। ক্ষুধার্ত হয়ে সঙ্গে আনা বিস্কুট, শোনপাপড়ি খেয়েছি। বসেই আছি, বসেই আছি। সময় আর পারই হয় না। ওই গেট থেকে মধ্য এশিয়ার নানা দেশের নানা শহরের উড়ান ছেড়ে যাচ্ছে, রিয়াধ, জেড্ডা, ইস্তাম্বুল, বাগদাদ, বাস্তান— উড়ে যাচ্ছে নানা পোশাকের নানা রকম মানুষ। সকলেই খুব লম্বা, স্বাস্থ্যবান। আমার মতো ৫ ফুট ২ ইঞ্চি নয়, দুবলা নয়। সপরিবারে কত মানুষ কত শহরে ফিরছে। আমি ঘুমিয়ে নিই বরং। ঘুম কি হয়? এসি-র তাপমাত্রা মনে হতে লাগল খুব কম। দেখলাম যারা বসে আছে, কেউ কেউ শীতবস্ত্র গায়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার বেশ শীত করছে যে। কেবিন ব্যাগ থেকে হাতকাটা সোয়েটার বের করে গায়ে দিলাম। মাফলার বের করে মাথায় জড়িয়ে নিলাম, উঁহু শীত যাচ্ছে না। হি হি করে কাঁপছি। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। ভয় লাগছে। একা বিদেশ বিভুঁইয়ে। হায়! তখন হাফ হাতার ওপর ফুল হাতা ভারী সোয়েটার চাপালাম। মাথায় টুপি। গলায় মাফলার। কেউই আমার মতো এত চাপায়নি। কিন্তু কারও তেমন কৌতূহলও নেই। বিদ্রুপাত্মক হাসিও নেই মুখে। আমি কাঁপতে কাঁপতে উঠে একটি কফি শপে গিয়ে ৫ ডলারে বড় এক গ্লাস কফি নিয়ে এলাম। ধীরে ধীরে শরীর শান্ত হচ্ছিল। কিন্তু শীত ছিলই। কাঁপুনি কমেছিল মাত্র। আমার পাশে মস্ত চেহারার এক ব্যক্তি এসে বসলেন। প্রবীণ। কী জানি কেন, সন্দেহ হওয়ায় জিজ্ঞেস করলেন, হ্যালো, হাউ আর ইউ। ফাইন বলতে, জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে আসছি, যাব কোথায়? উত্তর পেতে তিনি বললেন, তিনি লেবাননের মানুষ, বেইরুট যাচ্ছেন। আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমার দিকে তাকাতে তাকাতে উঠে গেলেন। তাঁর উড়ানের বোর্ডিং আরম্ভ হচ্ছে তখন। রাত ৮-৪০ নাগাদ আমার উড়ানের বোর্ডিং শুরু হলে ভিতর থেকে বেরিয়ে এলাম রানওয়েতে। নেমেই টের পেলাম গরম হাওয়া। সারাদিন দুবাইয়ে ৪৫ ডিগ্রি ছিল। তখনও গরম হাওয়া বইছে। আহ, কী আরাম। টুপি–মাফলার–সোয়েটার খুলে মাথা ও গা গরম করে উড়ানের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা বাসে গিয়ে উঠলাম।
নামতে রাত ৩-৩০ (কাজাখস্তান সময়, ভারতের চেয়ে ৩৫ মিনিট এগিয়ে)। নুর সুলতান এয়ারপোর্টে নেমে অন অ্যারাইভাল ভিসা হল। তখন চিনলাম শ্রীলঙ্কার পি বি জয়সরকারা, অশোক ফেরারা, ইয়েমেন, কম্বোডিয়ার লেখকদের। এক মুহূর্তেই আমরা বন্ধু। ভিসা করতে এক ঘণ্টা সময় লাগল। উদ্যোক্তাদের চিঠিতে জেনেছিলাম এশিয়ার ৪৩টি দেশের ১০০ জন লেখক, কবি  আসবেন। আর থাকবেন রাশিয়ান, কাজাখ, উজবেক লেখকরা। আমরা বাইরে এসে দেখি দাঁড়িয়ে আছে দুমান আতাইবেক। সুদর্শন এক তরুণ। আর আছেন কয়েকজন তরুণ–তরুণী। তরুণ কজাখ লেখক টাংশু। হোটেলে এলাম ভোর ৫টা নাগাদ। ঝকঝকে  অতি আধুনিক এক শহর। গাড়ির বাম দিকে ড্রাইভার বসেন, যেমন দেখেছিলাম মার্কিন দেশে। এসেছি প্রথম এশীয় লেখক ফোরামে। সাড়ে আটটার ভিতর প্রাতরাশ সেরে হোটেলের লাউঞ্জে আসতে দেখি দুমান আতাইবেক আর কত সব ভলান্টিয়ার তরুণ– তরুণী অপেক্ষা করছেন। সব দেশের লেখক এই পাঁচতারা হোটেলে। বাস দাঁড়িয়ে। আমাদের যেতে হবে সম্মেলনের কংগ্রেস হলে। বাসের পর বাস আসছে। আরব, ইরাক, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভারত...বাস নিয়ে চলল কংগ্রেস হলে। সেই হলের নির্মাণ শৈলী দাঁড়িয়ে দেখতে হয়। অতিকায় এক রুপোলি কাছিম কিংবা অর্ধবৃত্তকে এক দিকে টেনে দীর্ঘ করে দেওয়া হয়েছে। দালির ঘড়ি। আমার গলায় ফার্স্ট ফোরাম অফ এশিয়ান রাইটার্স–এর নাম এবং নেমের নীচে স্পিকার লেখা মালা। বাস থেকে নামতেই এক তরুণী, তিনি যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, ওয়েলকাম স্যর বলে আমাকে নিয়ে চললেন ভিতরে। দ্বিতীয় সারিতে আমার নাম লেখা চেয়ারে বসালেন। আমাকে একটি যন্ত্র দিলেন। অনুবাদ যন্ত্র। চ্যানেল ঘুরিয়ে ভাষা নির্বাচন করতে হয়। আমি ইংরেজিতে শুনতে পারব অন্য ভাষার বক্তৃতা। কিন্তু যন্ত্রটিকে আমি প্রথম দিন বাগে আনতে পারিনি। সেই সময়ই পাইনি। কাজাখস্তান রাইটার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এক দোভাষী নিয়ে আমার কাছে এলেন। পরিচয় করলেন। বললেন, আমার প্রতিবেদন ‘মিথিকাল লাইফ’ তাঁদের পছন্দ হয়েছে (দশ দিন আগে মেইল করে পাঠিয়েছিলাম)। এই প্রসঙ্গে বলা যে আমাকে আগে, আগস্টের প্রথমে বলা হয়েছিল ১০-১২ মিনিটের লিটারারি টক অনুষ্ঠানে বলতে হবে। ইংরেজিতে এবং লিখিত প্রতিবেদন ব্যতীত সাহিত্য বিষয়ে যা মনে হবে আমি বলতে পারি। সেই প্রস্তাব আগস্টের ১৫ তারিখে বদল করে মেইল করা হয়, এশীয় সাহিত্যে পুরাণের ব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে। সময় পাঁচদিন। আমি তখন ফোন করে বলেছিলাম, পাঁচদিন সময়ে আমি ভারতীয় পুরাণ, যার ভিতরে আদিবাসী পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত নিয়ে লিখতে পারি, এশীয় মিথোলজি নিয়ে লেখা সম্ভব নয়। আমি ভারতীয় পুরাণ, মিথোলজি নিয়ে লিখিত প্রতিবেদন পাঠাতে পারি। ওঁরা সম্মতি দিয়েছিলেন। রাইটার্স ইউনিয়নের সভাপতি আমাকে বললেন, উদ্বোধনী প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন দেশের রাষ্ট্রপতি, পাঁচজন এশীয় লেখক মঞ্চে থাকবেন তাঁর সঙ্গে, তাঁর ভিতরে দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন, মঙ্গোলিয়ার ঔপন্যাসিক ডি, উরাঙ্খাই, কাজাখ লেখক, আজারবাইজানের লেখকের সঙ্গে আমিও থাকব। সামনে মঞ্চ, দেখতে পাচ্ছি মঞ্চ সেজে উঠেছে। প্রত্যেক লেখকের নাম ফলক সাজানো রয়েছে। আমার নাম দেখতে পাচ্ছি। হ্যাঁ, কো উন এবং ডি, উরাঙ্খাই, দক্ষিণ কোরিয়ার কবি এবং মঙ্গোলিয়ার ঔপন্যাসিক এ বছর নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন শুনলাম। সেইভাবে ঘোষণা করা হল মঞ্চে আহ্বানের সময়। আমরা পাঁচজন মঞ্চে গিয়ে বসেছি। ভাবছি এ কী স্বপ্ন না বিভ্রম! এই লেখক ভারতের কোনও লিটারারি মিট চোখে দেখেননি। তা কলকাতা, মুম্বই, জয়পুর কিংবা দিল্লিতে হোক। এখানে যে লিটারারি মিট হয় সেখানে চলচ্চিত্র অভিনেতা, অভিনেত্রীদের ডাকা হয় পরম আদরে। এশিয়ান লিটারারি ফোরামে সকলে কবি এবং ঔপন্যাসিক, সৃজনশীল মানুষ। কোথা থেকে কোথায় এলাম? ওরা অনেকদিন অনুসন্ধান করে আমাকে নির্বাচিত করেছেন। আমার ফোন নং কিংবা ই–মেইল ঠিকানা জানতেন না। তখন ফেসবুকে খুঁজে বের করেন। অবাক অবাক। আমি নিজের ওপর আস্থাবান হয়ে উঠতে লাগলাম মঞ্চে বসে। সেই ডেবরা, গোপীবল্লভপুর, হল্কা ক্যাম্প, মফস্‌সলে দীর্ঘ ১৭ বছর বাস...  সবের পরিণতি এই! মায়ের কথা, বাবার কথা মনে পড়তে লাগল। মা আমার মাথায় হাত রেখে বলছেন, বাবুজি তোর সঙ্গে এসেছি। বাবুজি তুই স্থির হয়ে বস। চোখের কোণের দু-এক বিন্দু অশ্রু সামলালাম। রাষ্ট্রপতি এলেন সঠিক সময়ে। বসলেন মধ্যমণি হয়ে। উদ্বোধন হল তাঁর বক্তৃতার। বক্তৃতার মূল সুর ছিল এক ঐতিহ্য, এক বিশ্ববীক্ষা, এক সভ্যতা। এশিয়া, এশিয়া, এশিয়া। আমি ভারতীয় পুরাণ, আদিবাসী পুরাণ, রামায়ণ–মহাভরত থেকে উদ্ভূত মিথ, গ্রাম বৃদ্ধদের গল্পকথন, মা-ঠাকুমাদের বলা লোককাহিনি, মেঘের জন্ম, যে মেঘে বলাকারা গর্ভবতী হয় সেই মেঘের কথা, পাহাড়ের ছিন্ন ডানা মেঘের কথা, প্রাচীন উজ্জয়িনীর কথা, রাজপুত্র সিদ্ধার্থর সারথী ছন্দক এবং তাঁর ঘোড়া কন্থকের কথা  বললাম। ঘোড়াটির পলায়নের কথা বললাম।  অনুবাদ যন্ত্রের মাধ্যমে সকলের মাতৃভাষায় সকলের কাছে তা পৌঁছোতে লাগল। করতালি। মা রাধারানিকে দেখতে পাচ্ছি আমার নামাঙ্কিত আসনে দর্শকের ভিতর বসে আছেন। মা হাততালি দিচ্ছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে কো উন এবং ডি উরাঙ্খাই আমার হাত ধরে ভেরি গুড ভেরি গুড বলতে লাগলেন। ওঁরা ইংরেজি জানেন না। নিজের মাতৃভাষায় আমার কথা শুনেছেন। সেই মুহূর্ত থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার বৃদ্ধ কবি আমার বন্ধু হয়ে গেলেন। ৪,৫,৬ সেপ্টেম্বর--তিনদিন দেখা হলেই হাসি, হাত মেলান, ওর সঙ্গের এক দোভাষী মহিলার মাধ্যমে কথা বলা চলতে লাগল। সেদিন দুই অধিবেশন হল।  মাঝের কফি ব্রেক–এ অনেক কথা বলতে হল তরুণ প্রজন্মের কাছে। নানা টিভি চ্যানেল এবং খবরের কাগজের প্রতিনিধি ছিলেন তাঁরা। শেষ যে সাক্ষাৎকার দিলাম তাঁর ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধান এক টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক এক কাজাখ কন্যা। জানতাম না সকলে চলে গেছেন তখন, ক্যামেরাম্যান দুজন, সাক্ষাৎকার নিচ্ছে যে যুবক এবং সেই কাজাখ কন্যাই রয়েছে তখন। আমি তাঁর নামটি জিজ্ঞেস করে করে বুঝতে না পেরে  বললাম, তা হলে জয়িত্রি? তিনি হেসে বললেন, তাইই। তিনিই আমাকে সেই তাঁর গাড়িতে পৌঁছে দিলেন হোটেলে। দূরের শহর আলমাতা থেকে এসেছিলেন নুর সুলতান শহরে এই সম্মেলন উপলক্ষে।  
সেদিন সন্ধেয় আমাদের হোটেল রিক্সস-এ ছিল ডিনার পার্টি। ডিনার পার্টিতে আফগানিস্তান, ইরান, সমরখন্দের লেখকরা তাঁদের টেবিলে নিয়ে গেলেন। বেশিরভাগ তরুণ। রেজা মহম্মদ এসেছেন কাবুল থেকে। অসামান্য তারুণ্য তাঁর। আমি তাঁর ওস্তাদ। ভদকা, ঘোড়ার মাংসের ফিলেট, চিকেন, আঙুর, স্যালাড-ই খাদ্য। আমাদের ডানদিকের মঞ্চে শুরু হল কাজাখ সঙ্গীতের আসর। সেই  বাদ্যে কত রকম যে বাদ্যযন্ত্র। আমি মূর্খ সব চিনি না। লৌকিক অচেনা বাদ্যযন্ত্রই বেশি। গান ছিল, শুধু বাদ্য ছিল। মঞ্চে যেন পরিরা নেমে এসেছিল। তাদের কত রঙের পোশাক। তাদের গান আর আবহ সঙ্গীত শুনতে শুনতে কম বয়সে শোনা রুশি ছবির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল চাইকোভস্কি বাজাচ্ছেন অন্তরাল থেকে। মনে পড়ে গেল একটা ছবির কথা, কতকাল আগে দেখেছি, জিপসি ক্যাম্প ভ্যানিশেস ইনটু দ্য ব্লু ছবির কথা। ম্যাক্সিম গোর্কির গল্প নিয়ে সেই ছবি সাবেক সোবিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে নির্মাণ করা হয়েছিল। সে ছিল এক হৃদয় বিদারক প্রেমের কাহিনি। সুন্দরী জিপসি কন্যা রাডা এবং এক ঘোড়া চোর জোবারের প্রেম আমাদের ২৬-২৭–এ মুগ্ধ করেছিল। সেই ছবির সঙ্গীত যেন ফিরে ফিরে আসছিল। মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন তিনজন। ইয়েজিন ডোগা, ভ্যালেরি জুবকভ, ইসিডোর বারডিন। আহা সোবিয়েত। রাশিয়ান সাহিত্য পড়েই তো বড় হওয়া। গ্রেট রাশিয়ান লিটারেচার। গ্রেট ফিল্ম। চোখের সামনে সেই জিপসি ক্যাম্প আর সেই জিপসি কন্যা ভেসে উঠতে লাগল। মাথার ভিতরে ভদকা ছিল তো। পরের দিন সকালে লিটারারি টক। অনুবাদ যন্ত্রের মাধ্যমে শুনলাম সকলের কথা। রাশিয়ান কবি মিউজিক এবং কবিতার সংশ্লেষ ঘটাতে চান। তুরস্কের লেখক বললেন, গল্পই লিখবেন। গল্পই নিঃসঙ্গ মানুষের কথা বলতে পারে। তরুণ প্রজন্ম কত প্রথা বিরোধী কথা বলতে লাগলেন। আর প্রবীণরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। লেখার ফর্ম এবং কন্টেন্ট নিয়ে বললেন। সেদিন সন্ধেয় অপেরা হলে গেলাম সকলে আস্তানা অপেরার এক সঙ্গীত নাট্য দেখতে। সারা এবং বীরজাঁ, লৌকিক প্রেম কাহিনি। সেই অপেরা সাবেক সোবিয়েতের স্মৃতি আবার ফিরিয়ে আনল। গানে গানে ভরা এক আশ্চর্য উপস্থাপনা ছিল তা। মঞ্চে সাদা ঘোড়া, কালো ঘোড়া, বাদামি ঘোড়া, হাট বাজার, বাদ্যাদি, ঘোড়ায় টানা গাড়িতে ক্ষমতাবান মোড়লের আবির্ভাব, সে ভোলা যায় না। জাতিটিই আনন্দময়। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমান অধিবাসীর দেশ কিন্তু খোলা মনের। শিল্পবোধের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখলাম সেই থিয়েটারে। এখানে যত্রতত্র দেবালয় তা মসজিদ হোক, গির্জা হোক নির্মাণে নিষেধ আছে। সরকার অনুমতি দিলেই করা যায়। ব্যালে, থিয়েটার, অপেরা, গান নিয়ে সে দেশ যেন শান্তির দেশ। কদিন ধরে দোভাষীর মাধ্যমে আলাপ করেছি কাজাখ, রুশ, বার্মিজ, ইরান, শ্রীলঙ্কার লেখকের সঙ্গে। তাঁরা রবীন্দ্রনাথের শহর, সত্যজিৎ রায়ের শহর থেকে গিয়েছি বলে আমাকে বাড়তি খাতির করেছে। টেগোর বলতেই কপালে হাত। আর রাজ কাপুরের ছবির স্মৃতি মেলে ধরেছেন প্রবীণ রুশ এবং কাজাখ লেখকরা। হ্যাঁ, জয়িত্রীও জিজ্ঞেস করেছে রবীন্দ্রনাথের শহর নিয়ে। রামায়ণ–মহাভারত নিয়ে। মেঘের জন্ম নিয়ে। সব জিজ্ঞাসার পর সে মিলিয়ে গেছে নীলের ভিতর, সে ছিল যেন এক জিপসি কন্যা। ৭ তারিখ শেষ রাতে,  সাড়ে চারটের উড়ানে আমরা নিজ নিজ দেশের দিকে যাত্রা করেছিলাম।‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top