শক্তিদা যখন ফর্মে থাকেন, একাই একশো। লঞ্চ এগোতেই উদ্‌ঘাটিত হয় শক্তিদার আসল ফর্মা। প্রচুর কথা বলেন, হাসেন হো হো করে। দু–‌চার কলি গানও গেয়ে ওঠেন উদাত্ত কণ্ঠে। সুনীলদা ঠিক বিপরীত চরিত্রের। কথা বলেন খুব কম। যেন, একমনে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য। দু’‌পাশে নদীবাঁধ, মাঝখানে জল, জল, শুধু জল।
সেই আশ্চর্য ভ্রমণের কথা
লিখেছেন সাহিত্যিক
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবি: দীপক গুপ্ত

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ডাবল–‌ডিমাই সাইজের একটি কবিতার বই বেরিয়েছিল সুনীল–‌শক্তির যুগলবন্দি হিসেবে। সুনীল–‌শক্তি জুটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। তারও অনেক আগে, উনিশশো ছিয়াত্তরের এপ্রিল মাসের শেষাশেষি এই যুগলকে আমি বন্দি করে ফেলেছিলাম লঞ্চের কেবিনে।
আমার তখন চাকরিসূত্রে কাকদ্বীপে বসবাস। সুনীলদার সঙ্গে তার কিছুকাল আগে আলাপ। আমার চাকরির জায়গা সুন্দরবনের খুব কাছেই শুনে ইচ্ছে প্রকাশ করলেন সুন্দরবন দেখার। ক’‌দিন পরেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি, ‘‌তোমার চিঠি পেয়েছি। সুন্দরবন যাওয়ার খবর তো চমৎকার!‌ কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই, আমার স্ত্রীর খুব যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, ওই সময়ে আমার পুত্রের পরীক্ষা। সেই জন্য ৩০ এপ্রিলের পর কোনও দিন হলে ওর পক্ষে যাওয়া সম্ভব হত। কিন্তু তার জন্য তোমার বিশেষ তৎপর হওয়ার দরকার নেই। ২৭ তারিখের ব্যাপারটা যদি অনিবার্য হয়ে থাকে, তাহলে সেদিন আমি যেতে পারি— অবশ্য যদি তারাপদরা কেউ যায়! একদম একা নামখানা পর্যন্ত পৌঁছতে পারব?‌ যাই হোক, যা ঠিক হয় তা আমাকে বা তারাপদকে জানিও। প্রীতি জানাই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়‌।’‌
আমার কর্মক্ষেত্র জঙ্গল ‌এলাকা নয়, সুন্দরবন ‌হাসিল–‌করা লোকালয়ে এক ব্লক ‌এলাকার উন্নয়ন। ক্বচিৎ–‌কদাচিৎ আমার কাছে সরকারি লঞ্চ থাকে। আপাতত নেই। গভীর সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়ার মন করলে শরণাপন্ন হই নামখানা ফরেস্ট রেঞ্জারের। সুনীলদার চিঠি পেয়ে রেঞ্জার মহোদয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি তিনি ছুটিতে। মাথায় হাত। কথা না–‌রাখতে পারলে প্রেস্টিজ পাংচার। এখন কিংকর্তব্যং!‌ যোগাযোগ করি সেচ দপ্তরের অ্যাসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার দিবাকর মণ্ডলের সঙ্গে। পাথরপ্রতিমা এলাকার সহকারী বাস্তুকার দিবাকরবাবু ভারি সজ্জন মানুষ, তাঁকে প্রায়ই যেতে হয় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায়। বাঁধ সংরক্ষণের গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে। এক শনি–‌রবিবার তাঁর টুর ধার্য করে দিনক্ষণ জানিয়ে দিই সুনীলদাকে।
পত্রপাঠ সুনীলদার আসার খবর এল। একদিন এক ঘোর–‌লাগা সকালে সুনীলদা, শক্তিদা ও বরুণ চৌধুরি (‌যাঁর ডাকনাম ছিল শীতল। ফ্রেঞ্চকাট, সুদর্শন চেহারা, খুব আমুদে। সুনীলদার ভায়রা সম্পর্কে, ভাল বন্ধুও)‌ চলে এলেন কাকদ্বীপ। আমি খুঁজছিলাম তারাপদদাকে। তারাপদ রায় থাকা মানে হাস্যরসের পর্যাপ্ত সম্ভার। তাঁর জায়গায় বরুণ চৌধুরি আমার অপরিচিত হলেও দু–‌তিনটি সংলাপেই বুঝিয়ে দিলেন, তিনি যেন আমার বহুকালের পরিচিত। কৃত্তিবাস–এ একটি উপন্যাস ধারাবাহিক লিখে তিনি তখন খ্যাতিমান।
আমার কোয়ার্টারে সামান্য চা–‌জলখাবারের ব্যবস্থা ছিল, তাই খেয়ে সবাই বেরিয়ে পড়লেন নামখানা ঘাটের উদ্দেশে। লঞ্চ প্রস্তুত ছিল ঘাটে। হাতানিয়া–দুয়ানিয়া আকারে ছোটই, সুন্দরবনের অন্য নদীর তুলনায় বেশ স্বল্পায়তনের, চঞ্চলা বালিকার মতো জোয়ার–‌ভাটায় সারাদিন ছটফটে।
নদীর কিনারে পৌঁছে সুনীলদা কিছু সময় সংবিৎহীন। নিজের ভেতর ডুব দিচ্ছেন আগামী দু’‌দিনের সম্ভাব্য পরিক্রমণের ছবি মানসচক্ষে দেখে। গুনগুন করে গান ধরেছেন শক্তিদা। রাস্তায় একটু কি ‘‌খেয়ে’‌ এসেছেন!‌ একদিকে বরুণদা কী যেন পরখ করছেন লঞ্চের পেছনে ঘুরন্ত প্রপেলারটির দিকে তাকিয়ে। ঘূর্ণায়মান জলের সাদা ফেনা একটা রেখা কেটে এগিয়ে চলেছে লঞ্চের পিছু পিছু।
সেচ বিভাগের অ্যাসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার দিবাকর মণ্ডলের সরকারি কাজ পাথরপ্রতিমার এক প্রত্যন্ত লোকালয়ে, সীতারামপুর নামের একটি দ্বীপে। সেখানে বাঁধ সংরক্ষণের কাজ চলছিল, তারই তদারকি করতে যাওয়া। সবাই লঞ্চে উঠতে মণ্ডলসাহেবের নির্দেশে লঞ্চ চলল তার গন্তব্যে। একটানা ভটভট শব্দ, অবশ্য কিছুক্ষণ পর কান–‌সওয়া হয়ে যায়। একটু পরেই ডানে লোথিয়ান দ্বীপ, জনমানবহীন, গেঁউয়া, বাইন, কেওড়া, হেঁতাল গাছে ভর্তি। কিন্তু কোনও হিংস্র বন্যজন্তু নেই।
লঞ্চ একটু এগোতেই সুনীলদা বললেন, ‘‌শক্তি, তপন বৈষ্ণব। আমরাও এ দু’‌দিন বৈষ্ণব হয়েই কাটাব, বুঝলে।
শক্তিদা যখন ফর্মে থাকেন, একাই একশো। লঞ্চ এগোতেই উদ্‌ঘাটিত হয় শক্তিদার আসল ফর্মা। প্রচুর কথা বলেন, হাসেন হো হো করে। গেলাস হাতে না–‌নিয়েও হাঁটেন টলতে টলতে। দু–‌চার কলি গানও গেয়ে ওঠেন উদাত্ত কণ্ঠে।
সুনীলদা ঠিক বিপরীত চরিত্রের। কথা বলেন খুব কম। যেন, একমনে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে তবেই উত্তর দেন বা কথা বলেন, নইলে সাধারণত নিশ্চুপ ভঙ্গি। দু’‌পাশে নদীবাঁধ, মাঝখানে জল, জল, শুধু জল। সমুদ্রের জল প্রতিদিন দু’‌বার পৌঁছচ্ছে হাতানিয়া–দুয়ানিয়ায়।
লোথিয়ান ডাইনে রেখে লঞ্চ চলেছে সাদা ফেনা–‌কাটা জলের রেখা পেছনে আঁকতে আঁকতে। আপাতত কয়েক ঘণ্টা টানা জার্নি। ফেলে যেতে হবে দ্বীপের পর দ্বীপ। লঞ্চের ওপরে একটি কেবিন, নীচে আরও দুটি। সকালের এই নরম রোদের মুহূর্তে কেবিনে কেউ নেই। জমিয়ে আড্ডা চলেছে ডেকের ওপর। তুমুল ঠান্ডা–‌ঠান্ডা হাওয়ায় মন–‌জুড়নো পর্যটন।
প্রশস্থ ডেকের ওপর কারুকাজ করা বেতের সেন্টার টেবিল। তার চারপাশ ঘিরে অনেকগুলি বেতের চেয়ার। খুবই সুদৃশ্য চেয়ার–‌টেবিল। কিছু সময় ডেকে পায়চারি করার পর সুনীলদা আর বরুণদা বসেছেন চেয়ারে। তাঁদের সঙ্গে আমি আর আমার ব্লকের পঞ্চায়েত অফিসার প্রণবেশ ঘোষাল।
শক্তিদা বসছেন না। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ছটফট করে ঘুরছেন ডেকের এ ‌প্রান্ত থেকে ও ‌প্রান্ত। মাঝে মাঝে বলছেন, ও তপন, কিছু ব্যবস্থা রাখোনি?‌ ডিহাইড্রেশন হয়ে মরে যাব যে!‌
বললাম, এখনই হেভি ব্রেকফাস্ট আসছে। ইরিগেশন লঞ্চের কুকরা একদম ফাইভ স্টার হোটেলের মতো এক্সপার্ট।
— ব্রেকফাস্ট!‌ শক্তিদার মুখ বেজার।
আমার ব্যবস্থাপনা মনঃপূত হচ্ছে না শক্তিদার। বাধ্য হয়ে ভাব জমাচ্ছেন কেবিনের সামনে আর এক ছোট্ট কেবিনে বসা সারেংয়ের সঙ্গে। সারেং স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নদীর গতিপথ অনুযায়ী তার লঞ্চ সাব্যস্ত করতে ব্যস্ত। কাঁচাপাকা চুলের সারেং তেরো বছর বয়স থেকে লঞ্চের চাকরিতে বহাল হয়েছে শুনে বললেন, সে কী লরেন, তখন থেকেই হাতে স্টিয়ারিং!‌
সারেংয়ের নাম লরেন নয়। শক্তিদা এই মুহূর্তে তাকে এই নামকরণ করতে সে হাসতে শুরু করে। শক্তিদা যে একজন বড় কবি, তা ইতিমধ্যে আমি জানিয়ে দিয়েছি সারেংকে।
সারেং হেসে বললেন, না স্যর, বেশ ক’‌‌বছর খালাসি। তারপর ড্রাইভার, তারপর সারেং।
শক্তিদা হেসে বললেন, তাহলে তো তোমার অনেক প্রমোশন হয়েছে, লরেন। কিন্তু দেখো, আমার কোনও প্রমোশন নেই। আগেও কবি, এখনও কবি, পরেও কবি থাকব। সারা জীবন একই পোস্টে!‌
সারেং হয়তো বোঝেনি শক্তিদা ঠিক কী ধরনের চাকরি করেন। কবিদের প্রমোশন হয় না জেনে তার অভিব্যক্তিতে সহানুভূতি।
টানা পাঁচ–‌ছ’‌ ঘণ্টা একটি গতিতে ছুটে অবশেষে সীতারামপুর। জেটিতে লঞ্চ ভিড়তে সবার মধ্যে চাঞ্চল্য। ইরিগেশনের অফিসার–‌কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ব্যস্ততা। আমরা, যারা মণ্ডল সাহেবের সহযোগী হয়ে এসেছি, তাদের মধ্যে আরেক ধরনের ছটফটানি।
সুন্দরবনের জনবসতি এলাকার অসংখ্য দ্বীপের একটি সীতারামপুর। সীতারামপুরের ওপারেই গভীর জঙ্গল। এই তল্লাটের মানুষজন ‘‌বাঘের সঙ্গে লড়াই করিয়া’‌ বেঁচে থাকে। সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে মাঝেমধ্যে বাঘেরা বেরিয়ে ঢুঁ মারতে চলে আসে সীতারামপুরে। সীতারামপুর দ্বীপের চারপাশে মাঝারি আকারের নদী। সেই নদী পেরোনো বাঘবাবুদের পক্ষে কোনও ব্যাপারই নয়। তার ফলে সীতারামপুরের জনজীবন রয়্যাল বেঙ্গল সাহেবদের দাপটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে প্রায়ই।
দিবাকর মণ্ডল ঘুরে ঘুরে দেখছেন বাঁধের দৈর্ঘ্য–প্রস্থ। তাঁর সহকারীরা মাপামাপি করছেন চেন ফেলে–‌ফেলে, আর তাঁর অতিথিরা সবাই জেটিঘাটে নেমে পায়ে ‌পায়ে ঘুরে দেখছেন গ্রামটি। ডাঙার দেশ থেকে বহু জলপথ ভেতরে সীতারামপুর এক আশ্চর্য জনজীবন।
সীতারামপুরের বাঁধ দেখা শেষ হতে বিকেল। কোথায় রাতে নোঙর করা হবে তার খোঁজে লঞ্চ পাড়ি দিতে থাকে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গল অভিমুখে। লঞ্চে ওঠার পর থেকে শক্তিদা বেশ খোশমেজাজে। বললেন, তপন কোনও ব্যবস্থা রেখেছ তো?‌
ব্যবস্থা বলতে ঠিক কী, তা আমি বুঝেও যেন বুঝলাম না। আমি মৌনব্রত।
শক্তিদা বললেন, নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা আছে। তপন ভাঙছে না।
সুনীলদা তাঁকে নিবৃত্ত করতে বললেন, আগে সরকারি কাজ মিটুক, তারপর—
বাঁধের তদারকি সেদিনের মতো শেষ করে সেচ দপ্তরের অধিকারিকেরা বলে এলেন, কাজ চলুক। কাল আবার আসবেন বাকি কাজ দেখতে।
অতঃপর দুপুরের খাওয়া। শেষ হতে বিকেল। আড্ডা চলছে বিরামহীন।
লঞ্চ আবার যাত্রা শুরু করেছে সুবিধামতো জায়গায় নোঙর করতে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধের আঁধার। লোকালয় পেরিয়ে লঞ্চ তখন গভীর জঙ্গলের পাশ ঘেঁষে চলেছে। সারেং খুঁজছেন রাত্রিবাসের নিরাপদ জায়গা। হালকা অন্ধকার টুসকে দিচ্ছে গেঁউয়া, ক্যাওড়া, বাইনের ঝোপ। সবাই বাঘ দেখতে চাইছিলেন। সারেং বলছে, স্যর, সন্ধের সময় তেনারা জল খেতে নদীর পাড়ে আসবে। খেয়াল রাখুন।
সবাই কেবিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে ডেকের ওপর চেয়ারে বসে দেখছেন রাশি রাশি নোনা জল ফেনা কেটে এগোচ্ছে আঁধার ছিঁড়েখুঁড়ে। তিরতির ঢেউয়ের আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের ঝুঁকে‌পড়া ডাল। মুহূর্তগুলো কাটছে রক্তচাপ ঊর্ধ্বমুখী করে। সত্যিই বাঘ আসবে!
কিছুক্ষণ নিঃশব্দ থাকার‌ পর শক্তিদা বললেন, বাঘেরা খুব চালাক। টিকিট কাটিনি তো আমরা। ফ্রিতে দেখা দেবে কেন!‌
সত্যিই ঘণ্টাখানেক ডেকের আরামে বসেও তেনাদের নাক বা লেজ কোনওটারই দেখা নেই। তারা নিশ্চয়ই লঞ্চটাকে ভটভট শব্দ করতে দেখে ভেংচি কেটে অন্য ঘাটে চলে গেছে জল খেতে। ঘাট তো সবখানে। সত্যিই তো, ফ্রিতে কি বাঘ দেখা যায়!‌ তার ওপর সুন্দরবনের ডাঁটিয়াল রয়্যাল বেঙ্গল।
অতঃপর গোটা চরাচরে শুধু নিশ্ছিদ্র আঁধার। জল আর জঙ্গল সব একাকার। শুধু লঞ্চের নীচে জলের অনন্ত ছলচ্ছল। লঞ্চের সার্চলাইটে দেখা যাচ্ছে অনন্ত জলরাশি।
ডেকের চেয়ারের মায়া কাটিয়ে কেবিনে ফিরে এসে সুনীলদা বললেন, সময়টা তো কাটাতে হবে। তাস আছে?‌
ইরিগেশনের লঞ্চ যেন ঠাকুরমার ঝুলি, হাত ঢোকালেই রূপকথা। দিবাকর মণ্ডল সারেং গোবিন্দকে বলতেই বেরিয়ে এল দু’‌জোড়া তাস। হোক না সাতপুরনো।
সেই ভ্রমণেই জেনেছিলাম সুনীলদা শুধু ভাল কবিতা বা গল্প–‌উপন্যাস লেখেন না, ব্রিজ খেলাতেও তুখোড়। শক্তিদা তাস খেলার দিকে গেলেন না, ব্যস্ত রইলেন সারেংয়ের কেবিনে ঢুকে তার সঙ্গে জমিয়ে গল্প করতে।
ব্রিজ খেলায় কে কার পার্টনার হবে তা নিয়ে কিছুক্ষণ দোনামনা। আমি কখনও একটু–‌আধটু ব্রিজ খেলেছি, তাও অকশন। কনট্র‌্যাক্ট ব্রিজ খেলিইনি কখনও, যদিও নিয়ম‌টিয়ম জানি। সুনীলদা হতাশ হয়ে বললেন, ‘‌তাহলে অকশনই হোক।’‌ আমি কয়েক দান খেলতে বসে বাহান্নটা তাসের হিসেবে কিছু গোলমাল পাকাই। পার্টনারের বিরক্তি। অতএব পরবর্তী সময়ে শুধুমাত্র দর্শক। সুনীলদা ও বরুণদা একদিকে, দিবাকর মণ্ডল ও আমার অফিসের পঞ্চায়েত অফিসার প্রণবেশ ঘোষাল অন্যদিকে। শুরু হল তুমুল খেলা।
কেবিনের ভেতর খেলা চলছে, টু ক্লাবস, টু ডায়মন্ডস পেরিয়ে সোজা থ্রি স্পেডস। আমি কখনও খেলার দর্শক, সুনীলদার পাশে বসে দেখছি কী নিপুণ দক্ষতায় কার্ড ফেলছেন, ট্রাম্প করছেন। কখনও কেবিনের বাইরে এসে সামলাচ্ছি শক্তিদাকে। শক্তিদা তখন সারেংয়ের সঙ্গে ভাব পাতিয়ে লঞ্চটা চালাতে চাইছেন। বলছেন, কী গোবিন্দ, স্পিড তোলো, রাতের মধ্যে বঙ্গোপসাগর পার হওয়া চাই। না হলে স্টিয়ারিং আমার হাতে দাও। দেখবে কী সুন্দর লঞ্চ চালাই।
সারেং তখন লরেন থেকে গোবিন্দে পদোন্নতি অথবা অবনতি। গোবিন্দও তো তার নাম নয়!‌
— গোবিন্দ, এবার স্টিয়ারিংয়ে ভাল করে মোচড় দাও, অ্যাক্সিলেটরে চাপ দাও, যাতে লঞ্চ আজ রাতের মধ্যে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। আহা, কতদিন সমুদ্র দেখিনি।
মধ্যবয়স্ক সারেং তার বাহনটি নিয়ে পার হচ্ছে বিশাল ঠাকুরান নদী। হঠাৎ শক্তিদা কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করলেন সারেংয়ের কেবিনে। তার গায়ে–‌মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, গোবিন্দ, তুমি ঠিক পারছ না। আমাকে একটু চালাতে দাও। জলে তো ট্রাফিকের ভিড় নেই। অ্যাক্সিডেন্ট করব না, ভয় নেই।
শক্তিদার যা স্বভাব, খুব দ্রুত ভাব জমিয়ে নিতে পারেন যে কোনও ধরনের মানুষের সঙ্গে। তাঁর কাছে জেলার এসপি আর থানার হোমগার্ড একই ধরনের অভ্যর্থনা পান, দু’‌জনেরই কাঁধে হাত রেখে কথা বলতে পারেন আন্তরিক ভঙ্গিতে। সারেংয়ের কেবিনে ঢুকে তার পাশে বসে পড়ে বলছেন, দাও না বাওয়া, স্টিয়ারিংটা।
সারেং হাসছে শক্তিদার রকমসকম দেখে।
স্টিয়ারিং না পেয়ে শক্তিদা তখন অস্থির। বলছেন, গোবিন্দ, এখানে কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই যে, সেখান দিয়েই আমাকে চালাতে হবে। দাও, গোবিন্দ স্টিয়ারিংটা দাও। দেখি, বঙ্গোপসাগরের ওপারে কী আছে।
সারেং না ‌না করছেন, কিন্তু শক্তিদা শুনবেন না। বলছেন, আমি তো লঞ্চ চালাতে জানি। সেবারে আটলান্টিক পার হয়েছি অনেকবার।
সারেং তখনও ঘাড় নেড়ে চলেছে, আর না না করছে।
— বুঝেছি, তুমি ভাবছ কেবিনের মধ্যে তাস খেলতে খেলতে উঠে এসে তোমার বস দেখে ফেলবে তুমি স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়েছ আমার হাতে। আরে, তাসের নেশা মদের চেয়েও বেশি। এখন উঠতেই পারবে না!‌ আমি ওই জন্যই তাস খেলি না!‌
শক্তিদা জোর করছেন, আর সারেং এড়িয়ে যাচ্ছে তার বসের কথা ভেবে।
শক্তিদাও নাছোড়। বলছেন, আরে বাবা, কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হবে না। লঞ্চ চালানো খুব সোজা। একটাও গিয়ার নেই। গিয়ার নেই বলেই লঞ্চ চালানো সবচেয়ে সোজা। সামনে কোনও লঞ্চও নেই যে, অ্যাক্সিডেন্ট হবে। কথা দিচ্ছি, তোমার সাহেবরা কিছু মনে করবেন না। আরে আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়—
যাকে বলে প্রমাদ গোনা, আমার সেই অবস্থা। লঞ্চ তখন সুন্দরবনের জঙ্গল ঘেঁষে চলছে ঢিমেতালে। হাত বাড়ালেই গেঁউয়া, গরান, কেওড়া, বাইন গাছের সবুজ উপস্থিতি। জঙ্গলের একটা সোঁদা গন্ধও ভেসে আসছে তুমুল হাওয়ায়। সমুদ্র খুব বেশি দূরে নয়। সারেং যদি সত্যিই সমুদ্রে নিয়ে যায় কী পরিণাম হবে কে জানে!‌ কিন্তু শক্তিদাকে তখন সারেংয়ের কেবিনের বাইরে আনাই মুশকিল। তিনি ক্রমাগত সারেংকে বলছেন, দাও না স্টিয়ারিংটা, সাহেবরা দেখতে পাচ্ছে না। এই তপন, তুমি নীচে যাও। ওরা তাস খেলছে দেখো গে, যাও। তোমার জন্য গোবিন্দ মন খুলে চালাতে পারছে না!‌
কিছুক্ষণ পর শক্তিদা বেরিয়ে এলেন সারেংয়ের কেবিন থেকে। হঠাৎ ডেকের ওপর হোঁচট লেগে পড়লেন হুমড়ি খেয়ে। তাঁর শরীরের অর্ধেকটা ঝুলছে লঞ্চের বাইরে, বাকি অর্ধেক ডেকের কিনার ঘেঁষে। আশ্চর্য এই যে, এত বিপদের মধ্যেও তিনি হাসিমুখ। খুব সময়মতো ধরে না ফেললে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি স্রেফ পপাত নদীজলে। আর পড়লে কী যে কাণ্ড ঘটত, তা ভেবে শিউরে উঠেছি আমি। 
পরক্ষণে শক্তিদা হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে উঠলেন ডেকের ওপর। উঠেই বললেন, বুঝলে, অগস্ত্যযাত্রা হয়ে গিয়েছিল এক্ষুনি।
হাতে–‌পায়ে ছড়েও গিয়েছিল কিছুটা, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। লঞ্চটা থেমে গেছে দেখে বলছিলেন, কী রে, লঞ্চ আর যাবে না?‌ আমাদের সমুদ্রযাত্রার কী হবে?‌
আমি সন্ধান করছিলাম ডেটলের, কিন্তু শক্তিদার কাছে এরকম ঘটনা বোধহয় তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। জীবন নিয়ে তিনি সারা জীবন এতটাই বাজি ধরেছিলেন যে, নিশ্চয়ই এরকম আরও বহুবার পতন ঘটেছে তাঁর জীবনে। ডেটলের প্রস্তাব বাতিল করে তিনি তখন ডেকের ওপরে তুমুল নৃত্যরত। সেই অবস্থায় চেঁচাচ্ছেন, কই গোবিন্দ, চলো আজ সমুদ্র অভিসারে যাই। কতকাল সমুদ্র দেখিনি!‌ এই তপন, তুমি যাও, তাস খেলা দেখো গে যাও। যাও—
শক্তিদার সামনে তখন বেশিক্ষণ থাকতে ভরসা হচ্ছে না। হয়তো ‘‌যাও’‌ বলে আমাকে এমন ধাক্কা দেবেন যে আমি সোজা নদীর মধ্যে—
অতএব ফিরে আসি কেবিনে। দেখি বেশ জমে উঠেছে তাসখেলা। স্কোর দেখে বুঝলাম সুনীলদা খেলছেন নিখুঁত।
কিছুক্ষণ তাসখেলা দেখছি, হঠাৎ মনে হল লঞ্চটা ভয়াবহভাবে দুলছে। সুনীলদা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, তপন, দ্যাখো তো, কী হল?‌ নিশ্চয়ই শক্তি কিছু একটা করছে!‌
বাইরে গিয়ে দেখি শক্তিদা সারেংকে কেবিন থেকে হঠিয়ে দিয়ে লঞ্চের স্টিয়ারিং ধরে প্রবলবেগে ঘোরাচ্ছেন। তাতেই লঞ্চটা শুরু করেছে ছৌয়ের মতো প্রবল নাচ। সারেংয়ের কেবিন ভেতর থেকে লক করা। সারেং ঢুকতে পারছে না, নিবৃত্তও করতে পারছে না তাঁকে।
সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা।
অবশেষে সবাই মিলে অনেক বলে‌কয়ে তাঁকে সরানো গেল স্টিয়ারিং থেকে। শক্তিদা নিজেও বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা গোলযোগ হয়েছে তাঁর চালানোয়। তবুও তিনি বলে চলেছেন, চলো বাবা, সমুদ্রে যাই। কতকাল সমুদ্র দেখিনি!‌ ও গোবিন্দ—
সারেং স্টিয়ারিং ধরতেই লঞ্চ আবার সিধে। শক্তিদার লাগাতার প্ররোচনা সত্ত্বেও সেই মধ্যরাতে লঞ্চ নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করেনি সারেং। আরও কিছুটা গিয়ে জঙ্গলের কোল ঘেঁষে নোঙর করে বলল, স্যর, একদম গরম চটে নোঙর করলাম। তেনাদের ডাকে ঘুম ভেঙে গেলে ভয় পাবেন না যেন!‌
গরম চট মানে যে–‌জঙ্গলে বাঘের দাপট আছে।
লঞ্চ আজকের মতো চলা শেষ করতে তাসখেলাতেও ইতি। অতঃপর লঞ্চের ডাইনিং হলে নৈশভোজন। তবে সে–‌রাতে বাঘের ডাক না–‌শুনলেও শুনেছিলাম ভোররাতে হরিণের টু–‌উ–‌উটু–‌উ–‌উ মিষ্টি ডাক।
তাসের নেশা বড় নেশা। পর দিন সকালে ব্রেকফাস্ট শেষ হতে পুনর্বার শুরু অকশন ব্রিজ। ওদিকে শক্তিদা বলছেন, ‘‌তপন, ডিহাইড্রেশন হয়ে মারা যাব যে!‌ এখানে কোথাও মদের দোকান আছে?‌’‌ এই বিপুল জলরাশির দেশে মদের ঠেক নেই শুনে খুব বিরক্ত।
আশ্চর্য এই যে, সুনীলদার কোনও বিরক্তি নেই। লঞ্চ নামখানা ঘাটে পৌঁছোনো পর্যন্ত চলল ম্যারাথন তাসখেলা।
ইরিগেশনের লঞ্চে ঢালাও লাঞ্চ, ডিনার ও ব্রেকফাস্টের আয়োজন থাকলেও আমি অ–‌মদ্যপ বলে একদম ভুলে গিয়েছিলাম উষ্ণ পানীয়ের ব্যবস্থাপনা করতে।
সুন্দরবনের কিনারে লঞ্চ রেখে আরও বহুবার রাত কাটিয়েছি, কিন্তু বিখ্যাত কবিদের সঙ্গে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা অন্যরকম। পর দিন সকালে সীতারামপুরের জেটি বেয়ে নেমে দেখেছিলাম একটি অদ্ভুত দর্শনের কালীমন্দির। শক্তিদা পরে অধুনালুপ্ত ‘‌ভূমিলক্ষ্মী’‌ পত্রিকায় বিস্তারিত লিখেছিলেন মন্দিরটি নিয়ে। কী নিখুঁত সেই দেখা, তা বুঝেছিলাম ফিচারটি পড়ে। আর সেই দু’‌দিনের ভ্রমণ নিয়ে সুনীলদা লিখেছিলেন ‘‌দেশ’‌ পত্রিকায়, ‘‌সুন্দরবন ভ্রমণ’‌ নামের একটি চমৎকার ভ্রমণকাহিনি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভ্রমণকাহিনি পড়ার পর বহু কবিই আমাকে চিঠি লিখেছিলেন সুন্দরবন ভ্রমণের অভীপ্সায়।‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top