‘‌ভালো-বাসার বাসিন্দা নবনীতা দেবসেন’‌কে নিয়ে লিখলেন সাহিত্যিক, প্রকাশক
সবিতেন্দ্রনাথ রায়।

হিন্দুস্থান পার্ক–‌এর ‘‌ভালো–বাসা’‌ বাড়িতে আমি প্রথম যাই সম্ভবত ১৯৪৮ সালে। তখন আমরা মণিমেলা–‌সংগঠনে যুক্ত। মৌমাছি বিমল ঘোষ তাঁর ‘‌আনন্দমেলা’‌ পাতা মারফত সারা ভারতজুড়ে এই সংগঠনটি গড়ে তুলেছিলেন। দক্ষিণ কলকাতার মণিমেলা–‌সংগঠনের একটা আঞ্চলিক অধিবেশন হল হিন্দুস্থান পার্কে। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বাড়ি ‘‌ইলাবাস’‌–‌এর পাশে অনেকখানি খোলা মাঠ মতো জায়গা ছিল, সেইখানে। মৌমাছি–‌র পরামর্শেই আমরা গেলাম ৭২ হিন্দুস্থান পার্ক–‌এ কবি নরেন্দ্র দেব মশাইয়ের বাড়ি। কবি নরেন্দ্র দেবকে সভাপতি হওয়ার অনুরোধ জানাতে।
সেখানেই নবনীতাকে প্রথম দেখি। তখন সে নেহাতই বালিকা। ‘‌ভালো–বাসা’‌ বাড়িতেও সেই আমার প্রথম যাওয়া। আমার শ্বশুরমশাই বিমলানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ওই পাড়াতেই বাজপেয়ী মশাইদের বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন সপরিবারে। বিয়ের পর অর্চনার মুখে এ কথা শুনেছিলাম। ও–‌পাড়ার দুর্গাপুজোর কমিটিতে নরেন্দ্র দেব প্রেসিডেন্ট, বিমলানন্দ ভাইস প্রেসিডেন্ট— এটা নাকি বাঁধা ছিল। এই কারণেই নবনীতার সঙ্গে প্রকাশক সম্পর্ক হওয়ার পরে অর্চনার প্রতি নবনীতার স্নেহাধিক্য বেশি ছিল। অর্চনা যখন চলে গেল, নবনীতা ‘‌রোববার’–এ‌ লিখেছিলেন, আমার আদুরে বউদিটি কী আরামে শুয়ে আছে শেষশয্যায়। এখন নবনীতাও সেখানে।
অর্চনার মুখেই শুনেছিলাম, নবনীতা–‌অমর্ত্যর বিয়ের উৎসবের ঘটা। আমার শ্বশুরবাড়িও স্বভাবতই নিমন্ত্রিত ছিল। যদিও আমি তখনও তাঁদের জামাই হইনি। অর্চনার মুখেই শুনেছিলাম, কী সুন্দর সাজানো হয়েছিল নবনীতাকে। অমর্ত্যকেও দেখাচ্ছিল রাজপুত্রের মতো।
এই ২০০০ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অর্চনা– আমি শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম। সুবর্ণরেখা বইয়ের দোকানে এটা–‌সেটা দেখছি। অমর্ত্য ও নবপরিণীতা রকফেলার–‌কন্যা ঢুকলেন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর এই প্রথম দেখা। আমাদের সঙ্গে ছিলেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আশিস ও শম্পা। শম্পার বাবা অমর্ত্যর পিতা আশুতোষবাবুর ছাত্র ছিলেন। আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। শম্পা প্রস্তাব দিল বাড়ি গিয়ে একসঙ্গে ছবি তুলবে। অমর্ত্য তখনই সম্মতি দিলেন। অর্চনা বলছিল, আপনার–‌নবনীতাদির বিয়েতে আমরা গিয়েছিলাম। আপনাকে রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছিল।
অমর্ত্য হেসে বললেন, ওসব কথা এখন ভুলে যাওয়াই ভাল।
রাধারানি দেবী–‌নরেন্দ্র দেবের বিবাহও সেকালে একটা আলোড়নকারী ঘটনা। রাধারানি অল্প বয়সে বিধবা হন। সাহিত্যচর্চায় আসক্তি ছিল। সাহিত্য না বলে কাব্য বলাই সঙ্গত। কবিতাই লিখতেন রাধারানি। তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে এক সমালোচক বলেছিলেন, মহিলাদের কবিতা সবসময় একটা যেন নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকে। সে গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে না।
বোধহয়, তার জবাব দিতেই আর এক মহিলা কবি অপরাজিতা দেবীর উদয় হল। তার কবিতার একটা–‌দুটো পঙ্‌ক্তি আজও মনে আছে—
এবারের ছুটিতে
যাবে নাকি উটিতে
আমি বলি তার চে’‌
এপ্রিল মার্চে
কাশ্মীরে যাই কেন চলো না।
অপরাজিতা দেবীই যে রাধারানি, সেকথা অনেকদিন কেউ জানত না। বিবাহের বেশ কিছুকাল পরে নরেন্দ্র দেব আবিষ্কার করেন রাধারানিই অপরাজিতা দেবী ছদ্মনামে লেখেন।
নবনীতা পরে অপরাজিতা দেবীর কবিতাগুলি একত্র করে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেন। ‘‌নবনীতা’‌ নামকরণ করেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। এই কবি–‌দম্পতির প্রতি বরাবর তাঁর স্নেহাশীর্বাদ ছিল। শরৎচন্দ্রও এই পরিবারটিকে বড় ভালবাসতেন। এই ভালো–বাসায় মানুষ হওয়া ‘‌নবনীতা’‌ বরাবরই একটু মুখফোঁড়। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের নিমন্ত্রণ করেছেন। খেতে বসে নবনীতা বলল, এ কী নেমন্তন্ন বাড়িতে পোলাও নেই, শুধু ভাত!‌ তখন নবনীতার বয়স মাত্র তিন।
রবীন্দ্রনাথের রন্ধন–‌পটীয়সী ক্ষমতা ছিল। উনি ঠাকুরকে ডেকে ঘিয়ে ছোট এলাচ ভেজে ঘি–‌ভাত করে দিতে বললেন। নবনীতার পোলাওয়ের দুঃখ কিছুটা দূর হল।
বিয়ের পর নবনীতা দুই কন্যা সন্তানের জননী হল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সংসার টিকল না। রাধারানি দেবী আমাকে যা বলেছেন, অমর্ত্য চাইতেন, নবনীতা পড়াক, কলেজে চাকরি নিক। নবনীতা রাজি ছিলেন না, দেশে হলে মায়ের কাছে মেয়েদের রেখে না হয় পড়াতে যেতাম। বিদেশে মেম–আয়াদের কাছে রেখে মেয়েদের ছেড়ে চাকরি করব না। এখনও তাদের দুধ–‌দাঁত বেরোয়নি। শেষ পর্যন্ত দাম্পত্যজীবন ভেঙে গেল।
অমর্ত্য পরে একাধিক বিবাহ করেছেন। কিন্তু নবনীতা মেয়েদের নিয়েই থেকেছেন। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। যদিও বিয়ের পর থেকে নবনীতা দেবসেন এই পদবি দেখতে আমরা সবাই অভ্যস্ত। নরেন্দ্র–‌রাধারানি এবং অমর্ত্য সেনের মা— দুই পরিবারে সৌহার্দ্য কিন্তু অটুট ছিল। আমি একবার সকালে গিয়েছি ওঁদের বাড়ি। দেখি অমর্ত্যর মা এসেছেন, নবনীতাকে বলছেন, আমাকে একটু বোলপুরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কর‌, তুই বা তোর মেয়েদের কেউ সঙ্গে চল।
একটু আড়াল হতে নবনীতা বললেন, দেখছ ভানুদা, ওঁর ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক কবে চুকে গেছে। তবু আমাকে এইসব কর্তব্য করতে হয়।
নবনীতার স্বাস্থ্য বিশেষ ভাল ছিল না। অ্যাজমা বা হাঁপানির মতো একটা কষ্ট ছিল। কাকেও কোনও অসুখের কথা জিজ্ঞাসা করা রুচিকর নয়। তবে বাইরে থেকে তাই মনে হত। কিন্তু ওঁর মনোবল অসীম ছিল। তা না হলে দুই মেয়েকে মানুষ করে সঠিক পথে দাঁড় করিয়ে দেওয়া খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।
অকুতোভয়তা তাঁর প্রধান সম্বল ছিল। ওই স্বাস্থ্য নিয়েই তিনি অ্যান্ট্রার্কটিকা ঘুরে এসেছেন। হিমালয়ের সব দুর্গম পথে ঘুরেছেন। মেয়েরা কেউ সঙ্গে, কখনও একাই। তাঁর ভ্রমণ কাহিনিতে তাঁর দুর্গম পথের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে। একবার হিমালয়ের এক দুর্গম স্থানে রাত কাটাতে হল। কোথাও হোটেল বা রেস্ট–‌হাউস নেই। শেষকালে এক বাঙালি ডাক্তারের কোয়ার্টার পাওয়া গেল। কোয়ার্টার বলতে একটি ঘর। খাট, সোফা আর কাঠের মেঝে। ডাক্তার বললেন, ম্যাডাম, আপনি খাটে শোন, একটা রাত আমি সোফায় কাটিয়ে দেব।
নবনীতা বললেন, না ডাক্তারবাবু, আপনি খাটে শোন, আমার স্লিপিং ব্যাগ আছে, পাহাড়ে ঘুরি তো। আমি ফ্লোরেই আরামে ঘুমোব।
নবনীতা ঘুমের মধ্যেই দেখেন, ডাক্তারবাবু মাঝে মাঝেই উঠছেন, জল খাচ্ছেন। সম্ভবত এক মহিলার সঙ্গে এক ঘরে বাস অস্বস্তি জাগাচ্ছিল।
ঘুম ভেঙে যেতে নবনীতা বলে উঠলেন, ডাক্তারবাবু আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন, আমি আপনাকে রেপ করব না।
এই রসবোধ, দেশ ও মানুষ দেখার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি নবনীতাকে এই দীর্ঘদিন চালিয়ে নিয়ে এসেছে। নয়তো যে শারীরিক অবস্থায় নবনীতা পেরু–‌ভ্রমণে গিয়েছিলেন, নারী তো দূরের কথা, কোনও পুরুষও সাহস করত না। সেই সঙ্গে ওঁর ছিল নানান বিষয়ে পড়াশোনা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও–‌ও ওঁর বিদ্যা–‌বুদ্ধির প্রশংসা করতেন। দেখা হলেই খোঁজখবর নিতেন।
এই ভ্রমণের নেশা ও স্বাস্থ্যের কারণে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেওয়া মাঝে মধ্যেই অনিয়মিত হয়ে যেত। তৎসত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীরা ওঁকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। প্রখ্যাত নাট্যকার বাদল সরকার পরিণত বয়সে ওঁর ছাত্র হয়েছিলেন। আমি বিস্ময় প্রকাশ করলে, বাদলবাবু বলেছিলেন, আমি আসলে এই তুলনামূলক সাহিত্য ব্যাপারটা কী জানতে চাই। মনে হল, নবনীতাদির ক্লাসে ভর্তি হলেই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারব।
মিত্র–‌ঘোষের বার্ষিক পুরস্কার যেবার বাদল সরকারকে দেওয়ার কথা, সে অনুষ্ঠানে নবনীতা সোৎসাহে এসেছিলেন, আমার ছাত্র পুরস্কার নেবেন, আর আমি দেখব না।
দুঃখের বিষয়, বাদলবাবুই সে অনুষ্ঠানে আসতে পরেননি। তখন তিনি সেরিব্রাল–‌স্ট্রোকে শয্যাশায়ী।
নবনীতার ছাত্র‌ছাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা কেমন ছিল তার একটা উদাহরণ দিই। নবনীতার সৃষ্ট সাহিত্যের নয়টি প্রকার বা ধরন নিয়ে একটি সংগ্রহ মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয়। এতে নয়টি বিষয় ছিল— উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, রম্যরচনা, কবিতা ইত্যাদি।
১৯৯৯–‌এ এই বইটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। নবনীতার ছাত্র‌ছাত্রী, ‌পাঠক–পাঠিকারা মিলে প্রায় দুই শত জনে একটি বই কিনে— দুই দিকের পুস্তানিতে তাদের নাম স্বাক্ষর করে। ১৯৯৯–‌এর বইমেলায় অনুষ্ঠান করে নবনীতার হাতে তুলে দেয় সেই স্বাক্ষরিত বইটি।
এই অভূতপূর্ব ঘটনায় নবনীতা অভিভূত হয়ে পড়েন। হয়তো বইটি তাঁদের বাড়িতে আছে। নবনীতা ভাইফোঁটায় আমাকে নিমন্ত্রণ করতেন। আমার জন্য ফ্যাব‌–ইন্ডিয়ার পাঞ্জাবি কিনতেন। পরে আমার শরীর ভাঙল। বেরনো, সিঁড়িভাঙা বন্ধ হল। ও নিজের আশি বছরের জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করল। আমার শারীরিক অক্ষমতার কথা জানালাম। নবনীতা বলল, তা হলে মেয়ে–জামাই–নাতনি যেন অবশ্য আসে।
নবনীতার বাড়ির সবাই আমার আপনজন। কানাইও বলেছিল, মামা, আপনি এলে দিদি খুব খুশি হতেন। বললাম, বাবা, আমি যে অচল।
দেখা হত না, ফোনে কথা হত। ভাবতাম, তবু একটি ভগ্নি আছে, খবর নেয়। সেও চলে গেল। তবে একটাই এখন আশা বা ভরসা— এ দুঃখ আমাকে বেশি দিন ভোগ করতে হবে না— ওষুধের গায়ে লেখার মতো— expiry date ‌আমার অনেক দিনই চলে গেছে।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top