হান্স হার্ডার: হান্স হার্ডার যতটা জার্মান, ততটাই বাঙালি। কথাবার্তা, বাচনভঙ্গি, খাদ্যাভ্যাস— অন্ততপক্ষে দুই বাংলায় যখন থাকেন আরেকটি সাধারণ বাঙালির সঙ্গে, তখন তাঁর ফারাক নেই বললেই চলে। ইমেল যুগে তাঁর সঙ্গে আলাপ চলে ২০১৮–‌এর ডিসেম্বরে। তখন আমার ভাইঝি দেবারতি বসু মাসখানেকের ছুটিতে আমেরিকার মিসৌরির সেন্ট লুই থেকে বাড়িতে এসেছিল। বলল, কাকা তোমার জন্য এমন একটা জিনিস এনেছি যে চমকে যাবে। ভাবলাম গবেষক, বিজ্ঞানী ভাইঝি ওর পোস্ট ডক গবেষণা পর্যায়ের কিছু দেখানোর জন্য আমার চোখের সামনে ল্যাপটপের ডালাটা খুলে ধরল। কিপ্যাডে ওঁর আঙুলের আলতো স্পর্শে স্ক্রিনে এক সাহেবের ছবি ফুটে উঠল। ঝরঝরে বাংলায় তিনি বলছেন— অমর একুশে বইমেলায় এসে আজ আমি ধন্য। দিকে দিকে প্রতিদিন কত ভাষার মৃত্যু ঘটছে, অথচ ইংরেজি ভাষার প্লাবনের সামনে আমার এই বাংলা ভাষা অলঙ্ঘ পাহাড়ের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলা ভাষার মনীষীদের আমার প্রণাম। দেবারতির এক বাঙালি বান্ধবী প্রথমে এই সাহেবের খোঁজ দেন। তাঁর আরেক বন্ধু এই সাহেবের কাছেই বাংলা ভাষার একটা বিশেষ সময় নিয়ে গবেষণা করছে।
মেল পাঠালাম। জবাবও দিলেন। 
ফেব্রুয়ারির শেষে একদিন ফোন পেলাম অচেনা নম্বর, অচেনা কণ্ঠ কিন্তু ভীষণ আন্তরিক। 
‘‌অরূপ, ক’‌দিন হল আমি কলকাতায়। পেট খারাপ হওয়ায় যোগাযোগ করতে দেরি হল। সময় মতো জানিও কখন, কবে আমরা আড্ডায় বসব। বুঝতে পারছ না বোধহয় আমি হান্স হার্ডার।’‌
মার্চের ২ তারিখ ২০১৯ গড়িয়াহাট মোড়ের কাছে অ্যাপোলো গ্লেনইগলসের পাশের বহুতল ‘‌ঐকতান’‌। তার দু তলায় শিল্পী রাজা মুখার্জির ফ্ল্যাট। বন্ধুর কাছে উঠেছেন হান্স। দীর্ঘ ৩০ বছরের বন্ধুত্ব। হান্স যখনই কলকাতায় আসেন, বাংলা কথ্য ভাষার নিবিড় চর্চার জন্য হাঁটাপথে কলকাতা ঘুরে বেড়ান। পথের দোকানে খাওয়া–‌দাওয়া করেন। কখনও বোতলের জল কিনে খান না। তাঁর গায়ের রং, শারীরিক গঠন আড়াল করতে পারেন না বলে তাঁর আপশোস। পারলে হয়তো পথেঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আরও সহজে মেলামেশা করতে পারতেন। তবু যেটুকু মেলামেশা করছেন, তা যে কতটা গভীর আড্ডা শুরু হতেই বোঝা গেল।
‘‌ছেলেবেলা থেকে ভারত সম্পর্কে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আমার মধ্যে কাজ করত, কেন জানি না হাইস্কুলের পড়া শেষ করার পর তাই ভারতবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করব বলে ঠিক করলাম।’‌
এভাবেই শুরু করলেন হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবিদ্যা বিভাগের প্রধান হান্স হার্ডার।
সেদিন আমার জিজ্ঞাসা, তাঁর জবাব। হান্স বললেন, ‘‌হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে কিছুটা হিন্দি ভাষা রপ্ত করে ফেলেছি। সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কিন্তু রপ্ত করতে পারিনি। তখনও বাংলা ভাষার সঙ্গে তেমন পরিচয় হয়নি। ঠিক করলাম, এবার ভারত দেশটা ঘুরে আসব। সেবার বাংলার দিকে আসিনি। গিয়ে ছিলাম রাজস্থান, হিমাচলপ্রদেশ, বম্বে, দিল্লি এবং গোয়ায়। সেটা ১৯৮৭ সাল। হিন্দিটা খুব কাজে লেগেছিল তখন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেবাসে হিন্দির পাশাপাশি আরেকটি ভারতীয় ভাষা নেওয়ার দরকার পড়েছিল। সেখানে তামিল, বাংলা আরও কয়েকটা ভাষা ছিল। ঘটনাচক্রে বাংলা নিয়েছিলাম। বিশেষ কোনও কারণ ছিল না। ১৯৮৭ সালে ভারতে ভ্রমণ করতে এসে খুব ভাল লাগল। ঠিক করলাম এটা চালিয়ে যাব। পাশাপাশি আরও দুটো ব্যাপারে জোর দিলাম। হিন্দি ও বাংলা বইপত্র নিয়মিত পড়তে শুরু করলাম, আর কিছুটা সাংবাদিকতা শুরু করলাম। তখন আমার সাংবাদিক হওয়ার খুব শখ।
এর দু’‌বছর পর ১৯৮৯ সালে ফের ভারতে এলাম। এবার ঢাকা হয়ে সরাসরি কলকাতায়। সেবার কলকাতায় নানা জায়গায় গিয়ে, নানা জনের সঙ্গে মিলেমিশে পরিচিত হয়ে অভিভূত হয়েছিলাম। ওখানে আমি অধ্যাপক ও লেখক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে আসি তখনই আমার ভিতর বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি নিবিড় ভালবাসার বীজ বপন হয়। হিন্দিকে ছাপিয়ে যায় বাংলা ভাষার প্রতি ভালবাসা। একটা কথা বলা হয়নি তা হল ভাষা শিক্ষার জন্য হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব নাম আছে, সহজে জায়গা পাওয়া যায় না।’‌
●‌ ওখানে কি শিক্ষাবর্ষের মাঝখানে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়া যায়?‌
●● ঠিক সেভাবে বলা যায় না, তবে যায়। সেই জন্যই তো বিশ্ববিদ্যালয় বদল করেছিলাম। এভাবেই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির একজন হয়ে উঠতে শুরু করলাম।
● আপনার বাংলায় পুরোপুরি বাঙালির কথ্য ভাষা উঠে আসে। এটা রপ্ত করলেন কী করে?‌ তা ছাড়া আপনি দুই বাংলার দুটি বড় শহরে, কলকাতা ও ঢাকায় বারবার এসেছেন, সময় কাটিয়েছেন। এই একেকটি শহরের মধ্যে অনেক শহর। নানারকম জীবন। এখন যেমন কলকাতা–‌এর মিছিল। এর নাটকে আড্ডা, রোয়াকের আড্ডা, পার্ক স্ট্রিট, ঝুপড়ি— এক বাংলা–বাঙালির কতরকম রং। কোথায় কেমনভাবে সময় কাটিয়েছেন?‌
●● কথ্য ভাষা রপ্ত করেছি বারবার এখানে এসে। কলকাতায়, ঢাকায় দিনের পর দিন পথে পথে হেঁটেছি। ঘুরেছি। এইভাবে ঘোরাটা আমি খুব উপভোগ করেছি। বাংলাদেশে একটা কাগজ আছে ‘‌প্রথম আলো’‌। সেখানে একটা লেখা লিখেছি বাংলাদেশের পথে হাঁটা। এই সব শহরের রাস্তার জীবন বেশ চর্চা করার মতো বিষয়। একটা সময় আমি কলকাতার ব্রড স্ট্রিটের দিকে থাকতাম। ওখানে একদিকে পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে সম্পন্ন উচ্চবিত্ত এলিট মানুষের আনাগোনা, আরেকদিকে পার্ক সার্কাস অঞ্চলে গরিব মানুষের বাস। প্রকৃত বাংলা ভাষা চর্চা বাংলার জীবন সম্পর্কে নিবিড় ধারণা হয়েছে এখানে এসে এসে। কত দিন শ্যামবাজার থেকে, শিয়ালদার দিক থেকে কতটা পথ হেঁটে গেছি। শহুরে মানুষের কত রকম জীবন দেখেছি। 
● আপনি তো পৃথিবীর অন্য শহরেও গেছেন। এইরকম একটা শহরের মধ্যে আরও অনেক রকম শহর ঢুকে আছে। সেটা কি দেখেছেন?‌
●● বার্লিনেই আজ এরকম পরিস্থিতি। আগে ছিল না, এখন হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পর থেকে সিরিয়া, আফগানিস্তান থেকে শরণার্থী, উদ্বাস্তুদের ভিড় বাড়ছে। বার্লিন শহরেও ভিখিরি আছে, তবে তাদের থাকার ব্যবস্থাও সরকার ঠিক করে দেয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার স্বভাবে ভিখিরি, অভাবে নয়। আসলে তারা ছকবাঁধা জীবনের বাইরে থাকতে চায়। এই কলকাতার পথে হাঁটতে হাঁটতে যা দেখেছি যা শুনেছি, এই কলকাতা নিয়ে যা পড়েছি তাতে বোঝা যায়, ৩০০–‌৩৫০ বছর আগে যখন গ্রাম থেকে এখানে একটা শহর গড়ে উঠেছিল কিংবা সেই শহর গড়ে ওঠার পরেও তার একটা নিজস্ব ভাষা ছিল— বাংলা। ঔপনিবেশিক কারণে সেখানে নানা দেশের লোক এল। কাজের খোঁজে, ব্যবসার তাগিদে ভারতে নানা ভাষাভাষীর লোক এল। একটা ভাষার ঘাড়ে আর একটা ভাষা চাপল। এই শহরের পথেঘাটে চলতে চলতে তাই দেখেছি, শহরের একেকজন লোক শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত, তিন–‌চারটি ভাষা নিয়ে অনায়াসে দিনযাপন করে। ওড়িয়া, বাংলা, হিন্দি ভাষা তো জানেই, মোটামুটি ইংরেজিও জানে। যতদিন যাচ্ছে বার্লিন শহরেও এরকম একটা চেহারা দেখছি।
এখন আর শুধু লোকে জার্মানিতে কথা বলে না। ইংরেজি ভাষা তো আছেই অন্যান্য ইওরোপীয় ও এশীয় ভাষাতেও কথা বলতে শোনা যায়। বিশ্বের অনেক বড় শহরেই এমনটা দেখা যাচ্ছে। সব শহর যে সবাইকে আশ্রয় দিচ্ছে তা নয়। খণ্ডিত হয়ে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পূর্ববঙ্গ থেকে যারা কলকাতায় এসেছিল, তাদের সবাইকে কলকাতা স্বাগত জানিয়েছিল তা কিন্তু নয়। তবু তারা এ শহরে থেকে গেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের সময়ও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। একটা ভাষা শিখতে গেলে, চর্চা করতে গেলে সেই ভাষাভাষী রাজ্য বা দেশ, জনজাতির ভিতর–‌বাহির সবটাই জানতে হয়। আমি সেভাবেই জানার চেষ্টা করেছি বলে এ সব কথা আসছে।
● বাংলা সাহিত্যের পাঠক হিসেবে কী ধরনের লেখার প্রতি আপনার আগ্রহ জন্মাল?‌
●‌●‌ আমি আসলে গদ্যের পাঠক। যদিও আমার গুরু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত একজন বড় কবি। ‘‌কমলাকান্তের দপ্তর’‌ দিয়ে আমার বাংলা বই পড়া শুরু। আমার মাস্টারমশাই ওটা পড়তে দিয়েছিলেন। কঠিন তবে আমার খুব ভাল লেগেছিল। এখন দারুণ লাগে। এখান থেকে বেশ কিছুটা অংশ অনুবাদ করেছি জার্মানিতে। অল্প হলেও তার পাঠক আছে। এখন যে সমস্ত ছাত্র–‌ছাত্রী ভারতবিদ্যা নিয়ে ‌‌গবেষণার কাজে আসছেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই গবেষণার বিষয় বলিউড ফিল্মের নানা দিক।  
●‌ আপনার কাছে একজন বাঙালি গবেষক গবেষণার কাজ করেছে। তিনিই আমার ভাইঝিকে আপনার নাম ও কাজের কথা প্রথম বলে। 
●‌●‌ প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই জার্মান বাঙালির জবাব, পারমিতা দাশগুপ্ত?‌ ও কিন্তু সরাসরি আমার কাছে গবেষণা করেনি। করেছিল আমার বন্ধুর কাছে। সে জুরিখে থাকে। আমি ছিলাম ওর অ্যাডভাইসার।
●‌ বঙ্কিমচন্দ্র দিয়ে শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথে এলেন কখন কীভাবে?‌ 
●‌●‌ রবীন্দ্রনাথে এসেছি অনেক পরে। আমার খুব ভয় ছিল সবাই তো রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করছে। রবীন্দ্রনাথকে জানতে গেলে একটা আস্ত লাইব্রেরি পড়তে হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘‌গোরা’‌, ‘‌চতুরঙ্গ’‌ দিয়ে শুরু করেছিলাম। ছোট গল্পে এসেছি অনেক পরে। কবিতা আরও অনেক পরে। রবীন্দ্রনাথের গান খুব শুনেছি। রবীন্দ্রনাথের গানের চর্চা বাঙালি সমাজে তুলনায় অনেক কমে গেছে। বাংলা সাহিত্যে আমার ঝোঁক ঔপনিবেশিক ভারত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ। পরবর্তীকালে অনেকের লেখাই খুব ভালভাবে পড়েছি। সমরেশ বসু আমার খুব প্রিয় লেখক। বিশেষ করে কালকূট ছদ্মনামে লেখাগুলো। ‘‌অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’‌ দারুণ লেগেছে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী— এরকম অনেক নাম এসে যাবে। ‘‌পথের পাঁচালী’‌, ‘‌ঢোঁড়াই চরিত মানস’‌ আমার প্রিয় বাংলা বইগুলোর অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের নিয়ে  বাংলাদেশে যেরকম চর্চা দেখি, বাংলাদেশের লেখকদের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের সেরকম আগ্রহ দেখি না। এর কারণ কী?‌ সেটাও বুঝতে পারি না। বাংলাদেশে এখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে দারুণ কাজ হচ্ছে। ওখানে বইয়ের মেলা হয় ‘‌অমর একুশে’‌। এছাড়াও আরেকটা বইমেলাও হয়।
●‌ আপনি তো ‘‌অমর একুশে’‌ বইমেলায় গতবার বলেছিলেন ইংরেজি প্লাবনের সামনে বাংলা ভাষা এখানে অলঙ্ঘ পাহাড়ের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।  ইংরেজি ভাষার বই–প্লাবনে সত্যি সত্যি কি অন্য ভাষা ভেসে যাচ্ছে?‌
●‌●‌ ইংরেজি ভাষার এই আক্রমণ ঠেকানো খুবই কঠিন। ইংরেজি ভাষা বর্তমান বিশ্বে কুবেরের ভাষা, রাজার ভাষা। ইংরেজি এখন আন্তর্জাতিক ভাষা। গোটা ইওরোপের কমন ল্যাঙ্গোয়েজ হয়ে উঠেছে এই ইংরেজি। জার্মানিতেও অবস্থা বেশ জটিল। গোটা ভারতে সবচেয়ে বেশি কাজের ভাষা এখন ইংরেজি। কথা ছিল হিন্দি বর্তমান ভারতের কমন ল্যাঙ্গোয়েজ হয়ে উঠবে। ওঠেনি। সে জায়গাটা নিয়েছে ইংরেজি। ইংরেজির পাশাপাশি ইওরোপে অনেকগুলো স্থানীয় ভাষা বা উপভোষা থাকবে। যেমন ভারতেও হিন্দি, বাংলা, তামিল, ওড়িয়া এগুলো বিভিন্ন স্থানীয় উপভাষা হয়ে উঠবে। পশ্চিমবঙ্গে তো বাঙালির মধ্যেই বাংলার ব্যবহার কমে আসছে। এ কথাও বলতে শোনা যাচ্ছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করে কী লাভ?‌ এখানে কোনও কাজ–‌কর্ম নেই। বাংলাদেশের চেহারাটা কিন্তু অন্যরকম। পরিস্থিতি যা মানুষকে দু–‌তিনটে ভাষা নিয়ে চলতে হবে। ইংরেজির মতো একটা ভাষা, কাজের ভাষা, ব্যবসার ভাষা। আরেকটা ভাষা সাহিত্যচর্চা কিংবা আবেগ, অনুভূতির ভাষা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটাই মাতৃভাষা। এছাড়াও আরেকটা প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাব বিনিময়ের ভাষা। 
●‌ বাংলা ভাষার কোনও লেখা জার্মান ভাষায় প্রভাব ফেলে?‌
●‌●‌ নারসিসেস অ্যান্ড ওল্ড মু্ন্ড। হেয়ারমান এসে–‌র লেখা রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত। 
●‌ এখন বাংলা ভাষায় কি পড়ছেন?‌ এই বাংলার বা ওই বাংলার?‌
●‌●‌ সহিদুল্লা পড়েছি। চট্টগ্রামের সুফি কালচার নিয়ে ১৫–‌২০ হাজার লোকগান আছে। সুফি গান, আধ্যাত্মিক গান। ওই সম্প্রদায় নিয়ে কাজ হয়েছে। ওপার বাংলার লেখকদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সহিদুল জুহির লেখা পড়েছি।
রাজশাহিতে একটা আলোচনাচক্রে গিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কাজ নিয়েই বেশি আলোচনা হল, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের লেখকদের কাজ নিয়ে আলোচনা অনেক কম। 
●‌ আপনি তো বেশ কিছু বাঙালি লেখকের বই অনুবাদ করেছেন। সেগুলোর পাঠক, ক্রেতা কেমন?‌
●‌●‌ পাঠক আছে। ক্রেতা নেই। নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘‌হারবার্ট’‌ অনুবাদ করেছি। লেখকের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। জার্মানিতে কাউকে উপহার দিলে সেটা হয়তো পড়ে, কেনে না। আন্তর্জাতিক স্তরে ঝুম্পা লাহিড়ী, অমিতাভ ঘোষের মতো বাঙালি লেখকের কদর আছে। বাংলা সাহিত্যের তেমন কদর নেই। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ব্যতিক্রম। জার্মানিতে নানা ভাষা থেকে নানা লেখকের অনুবাদের একটি প্লাবন চলছে। এই প্লাবনে কোনও বাঙালি লেখকের কোনও বই হঠাৎ জায়গা করে নেয়। আমার অনুবাদ নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘‌হারবার্ট’–এ সে সৌভাগ্য হয়নি। তসলিমা নাসরিন–‌এর বেশ কিছু জার্মান অনুবাদের ভাল চাহিদা ছিল একটা সময় পর্যন্ত। মানে ‘‌লজ্জা‌’‌ যখন বেরোয় সেই সময় পর্যন্ত। তারপর আর সেটাও নেই। একটা কথা বলতে চাই যে একজন জার্মান–বাঙালি হিসেবে, বাংলা সাহিত্য– সংস্কৃতি পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি শুধু বাংলাদেশেই বারবার ডাক পেয়েছি, তা ঠিক নয়। পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, যোগমায়া দেবী কলেজ— এই সব জায়গায় ডাক পেয়েছি। অনেক সময় এমন সব বিষয় বলতে হয়েছে যাতে আমি খুব সড়গড় নই। আলোচনার মধ্যে উভয়পক্ষের সুবিধে হয় এমন বিষয় নিয়ে শেষ পর্যন্ত বলে থাকি, যোগমায়া দেবী কলেজে যেমন বলেছি বাংলা সাহিত্যে ‘‌‌জাদু–বাস্তবতা’‌ বা ‘‌ম্যাজিক–‌রিয়ালিজম’‌ নিয়ে। এ ব্যাপারে আমি মহাশ্বেতা দেবীর কাজকে ভীষণভাবে টেনে এনেছি। নবারুণ ভট্টাচার্য, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আরও কারও কারও প্রসঙ্গ টেনেছি, সবার নাম এখন ঠিক মনে পড়ছে না। 
● কিছুটা উদাহরণ দিন। 
‌●●‌ আমি প্রথমে উদাহ‌রণ দিয়েছিলাম মার্কস–‌এর লেখা থেকে। কুহক বা ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা কীভাবে বাংলা সাহিত্যে এসেছে তা বোঝাতে গিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর ‘‌টেরোড্যাকটিল’‌ গল্পের উদাহরণ দিয়েছি। সেখানে আদিবাসীদের বাস্তবতা এবং আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতা পাশাপাশি বিরাজ করছে। সাংবাদিক পূরণ সহায় আদিবাসী গ্রামে গিয়ে বিরাট, বিকট দৈত্যাকৃতি প্রাণীর অস্তিত্বের কথা টের পাচ্ছেন। আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিতে এরকম কোনও অস্তিত্ব নেই। এইভাবে দু’‌ধরনের বাস্তবতা পাশাপাশি রাখাকে আমি মনে করি জাদু বাস্তবতা।
●‌ আপনি কি মনে করেন বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সঙ্কটাপন্ন?‌ বিদেশি ভাষার প্লাবনে এই ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি আশাবাদী?‌
●‌●‌ অবশ্যই আশাবাদী। বেশ কিছু ভাষার ভবিষ্যৎ সঙ্কটাপন্ন কিন্তু সে তালিকায় বাংলা নেই। বিশ্বের ৬ নম্বর ভাষা বলেই নয়। এ ভাষার প্রাণ, গভীরতা, বিস্তার— কোনও সন্দেহ নেই দুর্নিবার। ‌‌‌‌‌‌■
(‘‌বারণরেখা’ পত্রিকায় আংশিক প্রকাশিত। ‌)

জনপ্রিয়

Back To Top