• আপনার স্কুল, কলেজ জীবনের কথা শুনতে চাই। 
– ছোটবেলার কথা আমি বহুবার বহু জায়গায় বলেছি। তবে সবসময়ই নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, বড় হচ্ছে। সবাই যে পুরনো লেখাগুলো পড়বে, এমন তো নয়। তা ছাড়া আমার ভালই লাগে ছেলেবেলার গল্প করতে। এটা বোধহয় বয়সের দোষ। যতবার এই গল্পগুলো করি, ততবারই সেই ছেলেবেলাতেই ফিরে যাই। ছেলেবেলায় স্কুলজীবন কেটেছে গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলে। বেশ কড়া স্কুল। বাংলা কথা স্কুলে একদমই বলা বারণ ছিল। মনে মনে সেইসময় যে একটু রাগ হত না এমন নয়। ‘কেন বাপু একটু বাংলা বলতে পারব না!‌’ পরে বড় হয়ে বুঝলাম, যে সেটা ভুল কিছু নয়। একবার বাংলা বলতে শুরু করলে, ওটাই অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাবে, ইচ্ছেও করবে। তা ছাড়া ভাল ইংরেজি বলাটাই বা তবে শিখতাম কী করে? ভাষা হিসেবে বাংলা, ইংরেজি দুটোরই শেখার প্রয়োজন আছে।
• সেই সময়ে ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে নিশ্চয়ই এখনকার মতো প্রচুর ছাত্রী হত না!‌ কেমন ছিল ছাত্রী সংখ্যা?
– খুব বেশি না হলেও মন্দ নয়। আমাদের পাড়া থেকে আমরা তিন–‌চারজন পড়তাম। এই স্কুলে যেসব পরিবার থেকে মেয়েরা পড়তে আসত, তাদের বেশিরভাগই ব্রাহ্ম পরিবারের। রটনা ছিল, উত্তর কলকাতায় ব্রাহ্ম গার্লস আর দক্ষিণ কলকাতার গোখেল মেমোরিয়াল, ব্রাহ্ম আদর্শে গড়া।
• পড়াশোনা কেমন হত?
– বলাই বাহুল্য, খুব ভাল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলোকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হত। আমি স্পোর্টসে বেশ ভালই ছিলাম। রিলে রেস, লংজাম্প, হাইজাম্প, দৌড়ে নিয়মিত অংশ নিতাম এবং প্রথম– দ্বিতীয়ের মধ্যেই থাকতাম। আমার চেহারাটাও ছিল অ্যাথলেটিক্সের উপযুক্ত। রোগাসোগা। আমাদের স্কুলে বেশ কিছু শিক্ষিকা বিদেশিনি। পড়াশোনা ছাড়াও নিজেকে গঠন করবার নানারকম শিক্ষা দিতেন তাঁরা। সবসময় বলতেন শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটবে, মাথা শরীরের সঙ্গে সমান রেখায় থাকবে। ব্যালেন্স রক্ষার জন্য মাথায় বই নিয়ে হাঁটা অভ্যাস করতে বলতেন। আমি নিজে বহুবার বাড়িতে এইভাবে হাঁটার চেষ্টা করেছি। এইভাবে ধীরে ধীরে স্কুল জীবন শেষ হয়ে কলেজ জীবনের শুরু।
• কোন কলেজ, কোন বিশ্ববিদ্যালয় দিদি?
– আমার প্রথম কলেজ লেডি ব্রেবোর্ন, এরপর প্রেসিডেন্সি। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যাদবপুর। সব জায়গাতেই কত স্মৃতি জড়িয়ে।
• যদি সেই স্মৃতির পাতা থেকে আমাদের জন্য কিছু তুলে ধরেন।  
– লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ভর্তি হওয়ায় পরিবারের সবাই খুশি ছিল। তার একটা প্রধান কারণ, কলেজটা মহিলা কলেজ। সেখানে ইন্টারমিডিয়েটে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার প্রিয় বন্ধু যশোধরা, কৃষ্ণা ওরা প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হল। আমারও তাই খুব ইচ্ছে প্রেসিডেন্সি কলেজেই ভর্তি হই। তখনকার দিনে খুব কম মেয়েই প্রেসিডেন্সিতে পড়াশোনা করত। যেহেতু প্রেসিডেন্সি কো–এড কলেজ। সবাই ভাবত মেয়েরা ওখানে গেলেই খারাপ হয়ে যাবে। আর এই কলেজটির পাশে ‘কফি হাউস’ বলে একটা জায়গা আছে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ছেলে–মেয়েরা সেখানে একসঙ্গে বসে আড্ডা দেয়। আমার মামার বাড়ির লোক এবং অন্য আত্মীয়স্বজনদেরও তাই প্রবল আপত্তি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার প্রচণ্ড ইচ্ছেয় বাবা–মা আমাকে পরে প্রেসিডেন্সিতেই ভর্তি করেন। তখন আমার চোদ্দো বছর বয়স। তবে মা বলেছিলেন, প্রেসিডেন্সিতে পড়ছো পড়ো, কিন্তু কফি হাউসে যেতে পারবে না। আমিও মায়ের সেই বিশ্বাসটা রেখেছিলাম শেষ পর্যন্ত। যতদিন প্রেসিডেন্সিতে পড়েছি, কফি হাউসে যাইনি। কিন্ত কফি হাউসের পরিবেশ যে খারাপ ছিল, মোটেই তা নয়। 
• আপনাদের সময় তো খুব কম মেয়েরাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বা প্রেসিডেন্সির মতো কলেজে পড়ত। আপনার এই পড়াশোনা নিয়ে পাড়াপড়শির প্রতিক্রিয়া কীরকম ছিল?
– আমাদের পাড়া থেকে তো আমি, আমার এক বান্ধবী যেতাম। আমরা ইংলিশ মিডিয়ামে একসঙ্গে পড়েছি আবার প্রেসিডেন্সিতেও পড়েছি। তবে হ্যাঁ, সবাই একটু তো আলাদাভাবেই দেখত। ভাবত এদের চলনে–বলনে, কথাবার্তায় ব্রাহ্ম সমাজের ছাপ, ব্রাহ্ম আদর্শকে মেনে চলে বলেই ওদের জীবনযাত্রা অন্যরকম।
কিন্তু কলকাতায় তখন বহু মেয়েই পড়াশোনা করত। সাধারণ বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতেই পড়াশোনা করত। গোখেল বা প্রেসিডেন্সিতে নয় তো কী হয়েছে, অনেক ভাল বাংলা মিডিয়াম স্কুল তো ছিলই। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছোনোর আগেই তারা সংসার জীবনে ঢুকে যেত। বিয়ে হয়ে যেত। বাড়ি বা পরিবেশের চাপে অথবা নিজের ইচ্ছেতেও হতে পারে।
• বিশ্ববিদ্যালয় তো আপনার যাদবপুর। তখনকার যাদবপুর আর পরবর্তীকালের যাদবপুরের মধ্যে কী, কী পার্থক্য চোখে পড়ে আপনার?‌
– পার্থক্য বলতে আমি ছিলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পারেটিভ লিটারেচার বিভাগের প্রথম রোল নম্বর এবং এরপর দুই, তিন বলে কেউ ছিল না। সবেধন নীলমণি, এই একটি ছাত্রী, আমি। আর সেইসময় খুব বেশি মহিলা প্রোফেসরও ছিলেন বলে আমার মনে পড়ে না। এরপর ধীরে ধীরে যাদবপুরে ছাত্র–ছাত্রীর সমাগম হয়েছে, বহু মহিলা প্রোফেসরও এসেছেন আমার কম্পারেটিভ ডিপার্টমেন্টে। এটা একটা বড় পার্থক্য। কম্পারেটিভে একটিই নতুন ছাত্রী, যেখানে একটার পর একটা পিরিয়ডে শিক্ষকরা আসছেন, ছাত্রীটি ক্লাস করছে। আমায় সবাই চেয়ে দেখত। এখন তো আর সেটা নেই। যাদবপুরে কম্পারেটিভের বেশ নামডাক। ভাল ভাল স্টুডেন্ট, সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। আমার সঙ্গে এখনও ডিপার্টমেন্টের অনেকেরই যোগাযোগ আছে। পুরনো, নতুন। ছাত্র, শিক্ষক সবার সঙ্গে যোগাযোগ কম–বেশি আছে।
• আচ্ছা দিদি, স্কুল–কলেজের পোশাক, অর্থাৎ যাকে আমরা বলি ড্রেস কোড, কেমন ছিল? শুধুই শাড়ি?
– আমি কলেজে ফ্রক পরে যেতাম, আর বাড়িতে শাড়ি পরা প্রাকটিস করতাম। আমার বন্ধুরা উল্টো। বাইরে শাড়ি পরত, আর বাড়িতে ফ্রক। আমি বাইরে স্কার্ট, ফ্রক সবই পরতাম এই কারণে যে, এই পোশাকগুলো গা থেকে সরবে না। শাড়ি সরে যেতে পারে, খুলে যেতে পারে এই আশঙ্কা ছিল আমার মনের মধ্যে। তবে বেশিরভাগই শাড়িই পরত।
• আপনাদের সময় বাইরে বন্ধুরা মিলে বেড়াতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া— সেটা কেমন ছিল?
– আমার বাড়িতে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা পছন্দ করত না। এমনকী বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে গেলেও আমার মা–ই টিকিট কেটে গাড়ি করে পাঠিয়ে দিতেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে কিছু করিনি। বাড়িরও আস্থা, বিশ্বাস ছিল আমার ওপর যে মিথ্যে বলে আমি কোথাও যাব না।
• লেখালেখি, পড়াশোনা ছাড়াও আর কী, কী বিষয়ে আপনার আগ্রহ ছিল?
– আমার বাড়িতে গানবাজনা, লেখালেখির সংস্কৃতি তো ছিলই। আমার বাবা–মা–র কথা সবাই জানে। তাই লেখালেখি ছোট থেকেই দেখে এসেছি। ভাবতাম বড় হওয়া মানেই লেখালেখি করা। কিন্তু আমি নিজে
খেলাধুলো ছাড়াও ছবি আঁকতাম। আঁকতে ভালবাসতাম। আর কবিতা, লেখালেখি তো ছিল আমার চলার পথের সঙ্গী। বাড়িতেও শিল্পী, লেখকদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। তাই ভাবতাম, বড় হওয়া মানেই লিখতে হবে। তবে ছোটবেলায় আমার মনে একটা কষ্ট ছিল। ভাল লিখলেও বাইরের লোকেরা ভাবতেন, বুঝি আমার বাবা বা মা লিখে দিয়েছেন। মাঝে মধ্যে রাগ হত। ভাবতাম, লিখবই না। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে, বলি। তখন দশ–বারো বছর বয়স। কবিতা লিখতে শুরু করেছি। একটা কবিতা পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়। অথচ বাবা জানেন না। তিনি তখন বাইরে। সুনির্মল বসুর হাত থেকে প্রথম পুরস্কার নেওয়ার পর তিনি আমার কানে কানে জিজ্ঞাসা করলেন, কীরে, বাবা লিখে দিয়েছেন? শুনে সব আনন্দ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। খুব কষ্ট হয়েছিল। 
• আপনার প্রথম বইয়ের কী নাম ছিল?
– ‘প্রথম প্রত্যয়’। কবিতার বই।
• আপনাদের সময়ে ইন্টারনেট ছিল না। তখন অতিরিক্ত কোনও তথ্য বা কোনও বিষয়ে কিছু জানতে কোথায় যেতেন?
– সে তো বটেই— এইসব ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিছুই ছিল না। লাইব্রেরিতেই পড়াশোনা করতাম বেশিরভাগ। লাইব্রেরিগুলো ছিল আমাদের ভরসার জায়গা। আর ভাল লাইব্রেরি হলে তো কথাই নেই। সেখানে গিয়ে সবাই ভিড় জমাতাম।
• আপনাদের সময়ে গ্রাম, মফস্‌সলের মেয়েরাও কি সমানভাবে পড়ার সুযোগ পেত কলকাতার মেয়েদের মতো?‌
– সেটা আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে আমাদের সময় প্রেসিডেন্সিতে একজন পড়ত। একটি মেয়ে, দমদম থেকে আসত। কিন্তু খুব চুপচাপ ছিল। কম মিশত। আমি তাকে লক্ষ করতাম। কিন্তু কোনওদিন কথা বলিনি। তবে গ্রাম থেকে শহরে খুব কম মেয়েই পড়াশোনা করতে আসত। মেয়েরা খুব বেশি একটা পড়াশোনা করার সুযোগ না পেলেও ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত প্রায় সবাই পড়ত। কিন্তু কলেজের গণ্ডি ক-জন পেরিয়েছে বলতে পারব না। খুব কম মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেত— সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top