মকরমপুরের দিক থেকে কোপাই আর ক্যানেলের মাঝখান দিয়ে মস্ত থালার মতো লাল চাঁদ উঠবে, ধীরে ধীরে। শান্তিনিকেতন ভেসে যাবে জ্যোৎস্নায়... আগামিকাল শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব। 
লিখলেন কৌশিক মুখোপাধ্যায়।

একটা বিশাল বটগাছের কথা মনে পড়ে। তার প্রকাণ্ড গুঁড়ি, অসংখ্য তার শাখা–প্রশাখা। সেই শাখা–প্রশাখার ফাঁকফোকরে, কোটরে আসে যায় নানা বিচিত্র পাখপাখালি, কোনও পাখি দীর্ঘদিন ধরে বাসা বেঁধে থেকে যায়। বটগাছটার নানা শাখা–প্রশাখা থেকে নেমে এসেছে মজার মজার সব আশ্চর্য ঝুরি। কোনও কোনও ঝুরি মাটি ছুঁয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সেই ঝুরি পাল্টে বটগাছের যে কাণ্ডগুলি হল, মূল বটগাছটির কাণ্ড থেকে সেগুলি অনেকটাই শীর্ণ।
সব ঝুরি যদি শেষপর্যন্ত মাটি ছুঁয়ে উঠতে পারত, তাহলে এই বটগাছটা একটা অবাক বটগাছ হয়ে যেত। শিবপুর বটানিক্যাল গার্ডেনে যে বটগাছটা আছে, যার মূল কাণ্ডটিকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায় না, অনেকটা সেরকম, কিন্তু তার থেকে অনেক অনেক বড়!
তবে এই বটগাছের মাটি না–ছোঁয়া ঝুরিগুলি আশ্চর্য, কারণ সেই ঝুরিগুলি ধরে চমৎকার দোল খাওয়া যায়, সারাদিন, হাতে একটুও ব্যথা করে না!
এই বটগাছটার একটা নাম আছে।
ঠাকুরবাড়ি!
সেরকমই একটা ঝুরি বলেন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম ভাবনাই শুধু নয়, সেই আশ্রমের প্রাথমিক নিয়মকানুনগুলিও তাঁরই তৈরি করা। তাঁর অকালমৃত্যুতে অবশ্য সেই আশ্রমের ভিত্তিস্থাপনটুকুও তিনি দেখে যেতে পারেননি।
বটগাছের ঝুরিতে দোল খাওয়ার একটা মজা আছে। একটা ঝুরিতে দোল খেতে খেতে, দোল বাড়িয়ে অনায়াসে ধরে ফেলা যায় আর একটা ঝুরি। এবার সেই ঝুরি ধরে দোল খাওয়া।
এই আশ্চর্য ঝুরিটির নাম শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর... রবীন্দ্রনাথ যাঁকে কৌতুকবশত নাম দিয়েছিলেন ‘শমী ঠাকুর’।
শমীন্দ্রনাথ ব্রহ্মচর্যাশ্রমে ছাত্র হিসেবে এসেছিলেন তাঁর ৭ বছর বয়সে, ১ বছর আগে তাঁর মাকে হারিয়েছেন তিনি।
কাজেই বাবার কাছে আবদার তাঁর সঙ্গে শোওয়ার। সুযোগ পেলেই ‘বাবা গল্প বলো।’
কনিষ্ঠতম পুত্র হিসেবে যেমন রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন রথীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর লেখাপড়ার ভার দিয়েও নিজে নজর রাখতেন সেদিকে, তেমনই শান্তিনিকেতনের বাইরে থাকাকালীন আশ্রমের পড়াশোনা নিয়ে পুত্রের অনুযোগের চিঠি পেয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেন শিক্ষকদের চিঠি লিখে।
বালক শমীর হঠাৎ গান গেয়ে বেড়ানো, বাগান করা নিয়ে বাবার ঠাট্টাকে যে খুব একটা আমল দিয়েছেন শমী এমনটা মনে হয় না।
তার আগেই একই গান, সঙ্গীতভবনের তৎকালীন শিক্ষক অজিতকুমার চক্রবর্তীর সামনে গেয়ে সকলের প্রশংসা কুড়িয়ে তাঁর গানের উৎসাহ বেড়েই চলেছে আপন গতিতে।
ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন সওয়া ১০টি গান, তাঁর নোটবুকে। হোক না সে গান বাবার লেখা, প্রত্যেকটি গানের নীচে সই করা আছে ‘শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর’, বাবারই সই–এর অনুকরণে!
বালক শমীর যখন ১১ বছর বয়স, আশ্রমে পুজোর ছুটি। শমীর একলা লাগে। আবার কলকাতাও তার ভাল লাগে না। তাকে পাঠানো হল মুঙ্গেরে, বন্ধু সরোজচন্দ্র মজুমদার (ভোলা)‌–এর মামার বাড়িতে, ছুটি কাটাতে।
মাসখানেকের আগেই খবর এল মুঙ্গের থেকে, শমীন্দ্রনাথ কলেরায় আক্রান্ত।
ছুটলেন রবীন্দ্রনাথ। যেদিন বুঝলেন শমীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’র সময় হয়েছে, আর কিন্তু ‘শমী ঠাকুর’–এর ঘরে যাননি। সারা রাত পাশের ঘরে ধ্যানে বসেছিলেন। পরের দিন শমীন্দ্রনাথের শেষকৃত্যেও যাননি! এই একই দিনে ৫ বছর আগে কবির ‘ভাই ছুটি’, শমীর মা–ও ‘ছুটি’ নিয়েছিলেন!
পরের দিন রাতেই ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে। শোকের ছাপ কোথাও নেই, শান্ত–সমাহিত রূপ! সত্যি কি রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যুতে শোক পাননি? নাকি ওই বটগাছের নানা পরমপ্রিয় ঝুরিগুলির বারবার মাটি না ছুঁতে পারা, শোকেও অবিচল থাকতে সাহায্য করেছিল তাঁকে? এর উত্তর পাই অনেক দিন পর তাঁরই একটি চিঠিতে। শমী মারা যাওয়ার প্রায় ২৫ বছর পরে সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক্ আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে।... শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি— সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনোখানে কোনো সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়— যা ঘটেছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।’
ক’‌দিন আগেই রাসপূর্ণিমা ছিল।
কিন্তু এ তো দার্শনিক শোক। রবীন্দ্রনাথ তো একজন মানুষ ছিলেন। ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালের স্মৃতি বলছে, শমীন্দ্রনাথকে দাহ করে আসার পর তিনি আর শ্রীশচন্দ্র মজুমদার রবীন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকে দেখেন পাথরের মতো বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। শ্রীশচন্দ্র কেঁদে ভাসাচ্ছেন, কাঁদছেন ভূপেন্দ্রনাথও। এই সময় চোখ বেয়ে জলের ধারা নামে রবীন্দ্রনাথের।
কিন্তু তারপরে প্রিয় ‘শমী ঠাকুর’–এর জন্য চোখের জল ফেলেননি রবীন্দ্রনাথ? একাকী? নিভৃতে? কেউ দেখতে পাননি? একজন দেখে ফেলেছিলেন, হঠাৎ করেই, বহুদিন পর! প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। 
‘ছুটির সময় রথীবাবুরা কলকাতার বাইরে। বাড়িতে কেউ নেই। সন্ধ্যেবেলা গিয়ে দেখি বেশ রীতিমত চেঁচিয়ে কবিতা আবৃত্তি করছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘‌একটু জ্বর হয়েছে কিনা, তাই বোধহয় মাথাটা উত্তেজিত আছে, কিছু চেঁচিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল।’‌ এটা বলে লজ্জিতভাবে একটু হাসলেন। 
সেদিন সন্ধেবেলা মনে পড়ল শমীন্দ্রের কথা। বললেন, ‘‌শমীর ঠিক এরকম হত। ওর মা যখন মারা যায় তখন ও খুব ছোট। তখন থেকে ওকে আমি নিজের হাতে মানুষ করেছিলাম। ওর স্বভাব ছিল ঠিক আমার মতো। আমার মতোই গান করতে পারত আর কবিতা ভালোবাসত। এক–একসময় দেখতুম চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা চেঁচিয়ে কবিতা আবৃত্তি করছে। এইরকম দেখলেই বুঝতুম যে ওর জ্বর এসেছে। ওকে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিতুম। আমার এই বুড়ো বয়সেও কখনো কখনো সেইরকম হয়।’‌
আবার খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শমীর ছেলেবেলার কথা বলতে লাগলেন। ‘‌ওর জন্য অনেক কবিতা লিখেছি। শমী বলত, বাবা গল্প বলো। আমি এক একটা কবিতা লিখতুম আর ও মুখস্থ করে ফেলত। সমস্ত শরীর মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আবৃত্তি করত। ঠিক আমার নিজের ছেলেবেলার মতো। ছাতের কোণে কোণে ঘুরে বেড়াত। নিজের মনে কতরকম ছিল ওর খেলা। দেখতেও ছিল ঠিক আমার মতো।’‌ সেদিন দেখেছি শমীর কথা বলতে বলতে ওঁর চোখ জলে ভরে এসেছে।‌
‘‌১২ ছুঁতে ক’‌দিন বাকি থাকা ঝুরিটি মাটি ছুঁতে পেলে কী হত তা অজানা কিন্তু ১০ বছর বয়সেই সেটি মূল বটগাছটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল।’‌
রবীন্দ্রনাথ তখন কলকাতায়।
ব্রহ্মচর্যাশ্রমে বন্ধুদের জুটিয়ে শুরু করেন প্রথম ঋতু উৎসব, শ্রীপঞ্চমীর দিন। ফুলের মুকুট পরে আরও দু’‌জনের সঙ্গে নিজে সাজেন বসন্ত, মাথায় বসন্তের ফুলের মুকুট! একজন সাজে বর্ষা, তিনজন শরৎ। শমীন্দ্রনাথ একটা গান গেয়েছিলেন, এই গানটির ইঙ্গিত আগেই আছে... এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে!
এই গান নিয়েই রবীন্দ্রনাথের স্নেহসুলভ কটাক্ষ ‘‌শমী ঠাকুর সেদিন লাইব্রেরির বই গোছাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাতে জ্বরে পড়েছে। জ্বরে পড়ে পড়ে খুব গান ও কাব্যালোচনা করচে। আজকাল হঠাৎ তার গানের উৎসাহ অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে। প্রায়ই ‘‌এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’‌ গেয়ে গেয়ে বেড়াচ্চে। সুর যে খুব বিশুদ্ধভাবে প্রয়োগ করচে সত্যের অনুরোধে তা আমি বলতে পারি নে।’‌
আগেই বলেছিলাম, এই বিশাল বটগাছের ঝুরিগুলি আশ্চর্য ঝুরি! মাত্র ১০ বছর বয়সে শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব–এর ভাবনার বীজটি রোপণ করে গেছিলেন শমীন্দ্রনাথ।
শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ১৬ বছর পর শান্তিনিকেতনে প্রথম বসন্তোৎসব অনুষ্ঠিত হল শ্রীপঞ্চমীর দিনই, ১৯২৩ সালে। সকালে আম্রকুঞ্জে ‘ফাল্গুনী’‌র গান আর সন্ধেবেলা  কলাভবনে ছাত্রীদের নিয়ে গান করেন রবীন্দ্রনাথ। ছাত্রীরা সকলে পরে ছিলেন বাসন্তী রঙের শাড়ি। আর রবীন্দ্রনাথ? সেই বাসন্তী রঙের পোশাকেই সুসজ্জিত!
পরের বছরও বসন্তোৎসব কলাভবনে। এবার অনেক বড় করে। তার একটি চমৎকার বর্ণনা আছে সে–বছরই শান্তিনিকেতন পত্রিকায়: ‘‌শ্রীপঞ্চমীর দিন সন্ধ্যাকালে মহাসমারোহে গানের সুরে বসন্তের উদ্বোধন হইয়া গিয়াছে। শ্রদ্ধেয় নন্দলালবাবু, সুরেন্দ্রবাবু ও কলাভবনের শিল্পার্থী ছাত্রছাত্রীগণ সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া কলাভবনটিকে উৎসব তিথির অনুকূল করিয়া তুলিয়াছিলেন। একদিকে বৈতালিকদের বসিবার স্থানটি বিচিত্র বর্ণের আচ্ছাদনে রচিত ও দুইটি সুদৃশ্য বীণাযন্ত্রে খচিত ছিল। মধ্যস্থলে কিঞ্চিদুচ্চে পূজনীয় গুরুদেবের আসন, তন্নিম্নে শ্রদ্ধেয় দিনুবাবুর চারিপার্শ্বে গানের দলের ছাত্রছাত্রীগণ বসিয়াছিলেন। সম্মুখে কারুললিত, আলিম্পিত স্থানে বীণাপাণির বীণাটি অগীত সঙ্গীতে উৎসব প্রহরকে পূর্ণ করিয়া তুলিতেছিল। উভয় পার্শ্বে আশ্রমের অধিবাসিগণের বসিবার স্থান নির্দিষ্ট ছিল। যথাসময়ে গানের দল তাঁহাদের উত্তরীয় ও অঞ্চলে বসন্তের পীতাভাস লইয়া সভাস্থলে উপস্থিত হইলেন। সেদিন সভাতে পূজনীয় গুরুদেবের রচিত অনেকগুলি গান হইয়াছিল। স্বয়ং গুরুদেব ‘‌তোমায় গান শোনাবো তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখো— ওগো দুখ–জাগানিয়া’‌ গানটি গাহিয়াছিলেন।’‌
এরপর থেকে শ্রীপঞ্চমীর দিনই বসন্তোৎসব চলতে থাকে।
কোনও এক বসন্তোৎসবের ভারি সুন্দর বর্ণনা পাই রানী চন্দের স্মৃতিচারণায়। সেদিনের শান্তিনিকেতনে বসন্ত যে শুধুই ফোটা ফুলের মেলা ছিল না, আক্ষরিক অর্থেই ছিল শুকনো পাতা, ঝরা ফুলের খেলা‌ও, পাই সেই ছবিটিও: ‘‌সেবার বসন্তোৎসবে আমবাগানে সাদা মাটি দিয়ে লেপা জায়গার এক ধারে বেদী— বেদী ঘিরে আলপনা দেওয়া হয়েছে আগের দিন বিকেলে। সাদা মাটির আঙিনার উপরে আলপনার শুভ্রতা— যেন হেসে হেসে উঠছে। নন্দদা খুব খুশি দেখে। ভোরে আবার এসেছেন— উৎসব শুরু হবার আগে বেদীর উপরে আসন বিছোতে— গুরুদেব বসবেন তাতে। দেখি আলপনা, আঙিনা, বেদী ছেয়ে হলুদ রঙের পাকা আমপাতা পড়ে আছে এক রাশি। রাত্রে হাওয়া দিয়েছিল জোরে কয়েকবার। পাকা পাতাগুলি তুলে ফেলতে যাব, নন্দদা বললেন, থাক্ থাক্, তুলো না। এও যে এই উৎসবের অঙ্গ, আলপনার বাহার। এমনিই থাক্। 
সেদিন দেখলাম উল্টেপাল্টে পড়া পাকা পাতার কী সৌন্দর্য! তার পর থেকে আশায় থাকতাম— উৎসবের আলপনার উপরে গাছ মুকুল ঝরাক, পাতা ছড়াক, তারাও হাত লাগাক।’‌
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেতে থাকে তার রীতিনীতি, এমনকী দিনটিও পাল্টে হয় ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন, প্রথম বসন্তোৎসবের বেশ কয়েক বছর পর।
কত বছর পর?‌
অশীতিপর শান্তিদেব ঘোষ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন বিশ শতকের তিরিশের দশকের গোড়ায়, ‘হোলি’ উৎসবকে ‘বসন্তোৎসব’ হিসেবে নতুন উৎসবের ভাবনার কারণ দোল উৎসবে পাকা রঙের ব্যবহার, কাদা কালি এমনকী আলকাতরার ব্যবহারও।
অন্য একটি সাক্ষাৎকারে, শান্তিদেবের বয়স তখন ঊনআশি, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি বলছেন ১৯৩৫–এই ‘প্রথম বসন্তোৎসব’–এর সূচনা। সেই সাক্ষাৎকারেই অন্যত্র বলছেন, ‘দোলের প্রসেশনের নাচটা ১৯৩৪ সালের আগে পর্যন্ত হত না।’
আর ‘বসন্তোৎসব’ ভাবনার কারণ?‌ ‘সেই আগের দোল–উৎসব যেটা হতো, সেটাকে গুরুদেব আর বেশি উৎসাহ দিলেন না, কারণ ঐ সময় নানারকম নোংরামি হতো। নোংরামি মানে কী— কাদা দিয়ে দিল, ছেলেরা দুষ্টুমি করে কালি দিয়ে দিল— এরকম একটা এলোমেলো ভাব। উনি ভাবলেন, এটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে বেঁধে দিতে হবে।’
বসন্তোৎসব বলতেই যে সারিবদ্ধ নাচের কথা প্রথম মনে পড়ে, তার ধারাটিও পাল্টেছে বারবার, সে নাচ শুরু করার স্থানটিও। হয়তো ‘শৃঙ্খলা’র কারণেই।
শান্তিদেবের বিশ শতকের তিরিশের দশকের স্মৃতি বলছে, গানের দল ‘ওরে গৃহবাসী’ গানটি গাইতে গাইতে আসত আম্রকুঞ্জের দিকে, শালবীথির পশ্চিম প্রান্ত থেকে। কলাভবন থেকেই তৈরি করা তালপাতার ঠোঙায় ছাত্রীদের একহাতে থাকত রঙিন আবির আর বসন্তের নানা রঙিন ফুল। ধূপের ঝারিও থাকত কারও কারও হাতে। প্রথম দিকে অর্ঘ্য হাতে হেঁটেই আসত ছাত্রীরা আম্রকুঞ্জের দিকে, নাচত না। গানের দল থাকত নাচের দলের সামনে। পরে গানের দলকে নাচের দলের শেষে রাখা হত। পেছনে গেয়ে আসা গানের কথা, মৃদঙ্গ, মন্দিরার তাল লক্ষ্য করে নাচের দল এগিয়ে চলত। প্রথম দিকে নাচের দলে নাচ জানা ছাত্রী কম থাকায়, এক সারিতেই নাচের ছন্দে তারা চলত।
এই সারিবদ্ধ নাচের দলে অনেক দিন পর্যন্ত ছাত্ররা থাকত না। পরে একদল ছাত্রকে শিখিয়ে এই নৃত্যদলে যুক্ত করা হল। 
শান্তিদেব লিখছেন, ‘‌তখন এক সারিতে ছাত্র এবং অন্য সারিতে ছাত্রীদের পাশাপাশি দাঁড় করানো হল। বীরভূমের পুরুষদের রায়বেঁশে নাচের একটি ভঙ্গি শেখানো হল দু’দলকেই। কাঠিয়াবারের ডান্ডিরাসের একপ্রকার সহজ কাঠি হাতে নাচ এবং গুজরাটের হাততালি দেওয়া গরবা নাচের সহজ ভঙ্গিও তখন যুক্ত হল। সারিবদ্ধ এই নাচে এগিয়ে চলার সময়, কয়েকবার, প্রতিটি শালগাছের ফাঁকে ফাঁকে এঁকেবেঁকে নৃত্যছন্দে, আম্রকুঞ্জের মূল উৎসব স্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কয়েকবার, আম্রকুঞ্জের অনেকগুলি আমগাছকে বেষ্টন করে, চিহ্নিত পথে, অনুষ্ঠান মঞ্চের দিকে গিয়ে তাদের অর্ঘ্য রাখতে হয়েছিল। শালগাছ ও আমগাছকে বেষ্টন করে এই এগিয়ে চলার নৃত্যের সময় মনে হত, গাছগুলি যেন বসন্তোৎসবের নৃত্যদলের সঙ্গী। ধূপের গন্ধের সঙ্গে আম ও শালফুলের মিষ্টি গন্ধে চারিদিক ভরে যেত। সারিবদ্ধ চলার নাচ সমাপ্ত হবার পর শুরু হত মূল বসন্তোৎসবের নৃত্যগীত ও কবিতা আবৃত্তি।’‌
এই সারিবদ্ধ নাচের শুরুর স্থানই নয়, চরিত্রটিও ভিন্ন রানি চন্দের স্মৃতিকথায়, প্রথম বসন্তোৎসবের সময়ও: ‘‌...অর্ঘ্যথালায় আবীর–পলাশের স্তূপ একত্র সাজিয়ে রওনা হয় প্রসেশনের দল কলাভবনের ‘নন্দন’ বাড়ি হতে। সেই একটি দিন পলাশের ডাল ভাঙলে অসন্তুষ্ট হতেন না নন্দদা। ঝুড়ি ঝুড়ি পলাশ এনে জড়ো করতাম সকলে সেখানে। সামগ্রীর প্রাচুর্য তখন ছিল না আমাদের। নন্দদার নির্দেশ–অনুযায়ী আবীরে–পলাশে কয়েকটা থালা, কিছু ডালা ভরা হত। ছেলেমেয়েরা আজ সবাই বাসন্তী রঙের ধুতি শাড়ি পরত। অর্ঘ্য–থালা–কাঁসর–ঘণ্টা–শঙ্খ হাতে নিয়ে প্রসেশনের দল গান গাইতে গাইতে রওনা হত। শ্রীভবনের সামনে দিয়ে শালবীথির ভিতর দিয়ে মাধবীবিতানের তলা দিয়ে আম্রকুঞ্জে আসত। 
গুরুদেব বসে আছেন বেদীতে, তাঁর সামনে সারি দিয়ে আবীর পুষ্পের অর্ঘ্যথালা নামিয়ে যে যার জায়গা নিয়ে বসে পড়ল। কোলাহল নয়, কোনো বিশৃঙ্খলা নয়; সংযত পরিবেশ। 
গান হল, কবিতা পাঠ হল। বসন্তকে একেবারে কাছে নিয়ে আসা হল। রঙ লেগেছে বনে বনে নয় শুধু, রঙ লাগে বসনে মনে। শেষের গানের সময়ে নাচিয়ের দল উঠে নাচ শুরু করল গানের সুরে সুরে: আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে। আবীরের থালা হতে মুঠো মুঠো আবীর তুলে নাচিয়ের দল হাওয়ায় ছুঁড়ে দিল, আম্রকুঞ্জের সবুজ আজ হোলির রঙে রাঙা হয়ে উঠল। 
এদিন আমরা গুরুদেবের পায়ে আবীর দিয়ে প্রণাম করি। পা দুখানি আবীরে আবীরে ঢেকে যায়। তাঁর মুখে লেগে থাকে স্নেহমধুর হাসি।’‌
এই অনুষ্ঠানের পরে রবীন্দ্রনাথ চলে যান উত্তরায়ণে। শুরু হয় আবির খেলা। সেখানে আসর জমিয়েছেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার বিশাল চেহারা মাখামাখি হয়ে আছে লাল আবিরে।
এ তবে কোন বসন্তোৎসব? রানী চন্দের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৯৩৩ সালে। দিনেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ১৯৩৪ সালে। কিন্তু রানী চন্দের এই স্মৃতিচারণে কোথাও তো কোনও ‘নোংরামো’র আভাস পেলাম না!
স্মৃতি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ফিকে হয়ে আসে, হয়তো গুলিয়ে যায় সালতামামিও।
স্মৃতিনির্ভর ইতিহাসপাঠ নাকি রবি–জীবনের দীর্ঘ গবেষণা–আরব্ধ তথ্য হিসেবে ১৯২৩ সালটিকেই শান্তিনিকেতনের ‘প্রথম বসন্তোৎসব’ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, সেটির ভার রইল ইতিহাসপিপাসু পাঠকের কাছেই।
আমরা বরং আবির নিয়ে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের একটা মজার গল্প শুনে নিই: ‘‌বসন্ত উৎসবে রঙ মাখানোতে আমি আপত্তি করতাম। হাতে–পায়ে, কপালে দিক, তা বলে মাথার চুলেটুলে মাখানো আমার ভাল লাগত না। 
সকালে বসন্ত উৎসব আম্রকুঞ্জে। উৎসব শেষে— ‘‌যাও, যাও গো এবার যাবার আগে— রাঙিয়ে দিয়ে যাও’‌ গানটা গেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা রঙ মাখাত, আমি সেসময় রাগ করতাম। ওরাও ভাবত, ওঁকে জব্দ করতে হবে। উৎসব শেষ হলে গুরুদেব গাড়ি করে উত্তরায়ণের দিকে চলে যেতেন; তারপর ছেলেরাও উদ্দাম হয়ে উঠত। এবারে গাড়ি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমিও ছুটে উত্তরায়ণে পালিয়ে গেলাম, তাঁর ঘরে আশ্রয় নিলাম। 
আমি ঢুকে ভেতরের দিকে বসে আছি, ছেলেরাও গুরুদেবকে গিয়ে বলেছে— আবির দেব। পায়ে আবির দেওয়া হলে হঠাৎ পা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ওকে রঙ দিবিনে? দে, ওকে দে। ভাল করে মাখিয়ে দে। 
বাইরে হইচই হচ্ছে, রঙ মাখানো হচ্ছে, উনি টের পেয়েছেন আমি পালিয়ে এসেছি। বুঝেছেন যে এসকেপ করেছি, তাই এসব কথা। 
ছেলেরা চলে গেলে আমি বললাম, আপনি আমাকে বিপন্ন করলেন, আমি আপনার কাছে আশ্রয় নিয়েছি, এটা কি আপনার ঠিক হয়েছে?
উনি বললেন, ওরা খুশি হল তো?’‌
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ৬ বছর পর ১৯৪৭ সালে, পাঠভবনের ছাত্র হয়ে এলেন সুপ্রিয় ঠাকুর। তিনি জানালেন, ‘‌বসন্তোৎসব হত আম্রকুঞ্জেই, ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল’ গানের সঙ্গে সারিবদ্ধ নাচের দল আসা তখন শুরু হয়েছে ‘শান্তিনিকেতন বাড়ি’র দিক থেকে। আমগাছের তলায় আলপনা দিয়ে সাজানো থাকত, সেখানেই মঞ্চ তৈরি হত। এখানে এসেই নাচ শেষ হতো, নাচের দল এসে বসত। তারপর মঞ্চে শুরু হত গান, নাচ, আবৃত্তি। সেই সময়ে প্রচুর সংখ্যক আবৃত্তি হতো। মন্ত্রপাঠও হতো। তখন কিন্তু কেউ আবির খেলত না। একটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকত আবির। সেখানেই নাচ হত, কিন্তু কেউ তখন আবির ছুঁত না। অনুষ্ঠান একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবিরখেলা আরম্ভ হতো।’‌
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান ‘বসন্তোৎসব’–এর মূল সুরটাই বোধহয় হারিয়ে গেছে। প্রকৃতি–উৎসব–আবিরের শান্ত, স্নিগ্ধ, মধুর গার্হস্থ্যটিও। আরও অনেক কিছু হারিয়েছে। সে বৃত্তান্ত প্রায় সবারই জানা। পুনরাবৃত্তির কী প্রয়োজন?
আগামিকাল শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব।
মকরমপুরের দিক থেকে কোপাই আর ক্যানেলের মাঝখান দিয়ে মস্ত থালার মতো লাল চাঁদ উঠবে, ধীরে ধীরে। শান্তিনিকেতন ভেসে যাবে জ্যোৎস্নায়।
সেই জ্যোৎস্না সারা গায়ে মেখে মধ্যযামে হয়তো কোনও ‘শমী ঠাকুর’ চেনা–অচেনা আম্রকুঞ্জ শালবীথি ধরে সমস্ত শরীর মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে গাইবে ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণে, প্রাণেশ হে...’
ওর কি জ্বর এসেছে?‌ ■
তথ্যসূত্র: 
১.‌ রবিজীবনী: প্রশান্তকুমার পাল।
২.‌ রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ: পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়।
৩.‌ সব হতে আপন: রাণী চন্দ।
৪.‌ যাত্রাপথের আনন্দগান: শৈলজারঞ্জন মজুমদার।
৫.‌ জীবনের ধ্রুবতারা: শান্তিদেব ঘোষ।
৬.‌ স্মৃতি ও সঞ্চয়: শান্তিদেব ঘোষ।
ঋণস্বীকার:
১.‌ অধ্যাপক তপোব্রত ঘোষ।
২.‌ অধ্যাপক সুপ্রিয় ঠাকুর।

 

ছবি:‌ কুমার রায়
 

জনপ্রিয়

Back To Top