লেখা, জীবনচর্চা, বিশ্বাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি কেমনভাবে দেখছেন রবীন্দ্রনাথকে।
রবীন্দ্রনাথের ১৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে তার সন্ধান করলেন প্রশান্ত মাজী।  

‘‌ব্যর্থ নমস্কারে’‌ শিরোনামে শঙ্খ ঘোষ একটি লেখা লিখেছিলেন ১৯৭৯–‌তে। বিষয়— রবীন্দ্রনাথ। পঁচিশে বৈশাখের সক্কালবেলায় সে লেখা দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত হয়। শোনা যায়, লেখাটি পাঠ করে তাঁর পিতৃদেব মণীন্দ্রকুমার ঘোষ সাতসকালেই সেদিন পুত্রকে একটু বকেছিলেন। শঙ্খবাবু তখন মাঝে মাঝেই যেতেন হিন্দুস্থান পার্ক–‌এ পুলিনবিহারী সেনের বাড়ি। সেদিন সন্ধ্যায় গিয়ে তাঁর কাছেও তিনি মিষ্টভাষায় মৃদু একটু ভর্ৎসনা শোনেন।
কী এমন লেখা হয়েছিল, যার জন্য এতকিছু!‌ সেই লেখাটি হুবহু শঙ্খ ঘোষের কোনও গদ্যগ্রন্থে কি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে?‌ আজ আর আমাদেরও সব মনে পড়ে না। তবে, তার একটুখানি ঝাঁঝ কিঞ্চিৎ মনে পড়ে। পরে শুনি, হুবহু না ছাপা হলেও ওই লেখার নির্যাস নিয়ে একটি লেখা (‌চালচিত্র)‌ অবশ্যই আছে তাঁর ‘‌নির্মাণ আর সৃষ্টি’‌ বইতে।
রবীন্দ্র জন্মদিন–‌এর পুণ্য প্রভাতে সবাই যখন কবিপ্রণামে ব্যস্ত, কবিতায়–‌গানে চতুর্দিক আলোড়িত, তখন প্রবল রবীন্দ্র–‌অনুরাগী সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক কৃতী সন্তান রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কিছু প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিচ্ছেন, হোক না তা সবিনয়ে। সে কারণেই হয়তো বিব্রত হয়েছিলেন তাঁর পিতৃদেব, নিকটজনেরা। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির পরবর্তী সময়ে বিদেশভ্রমণ সূত্রে উঠেছিল সে প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথের তৎকালীন কিছু ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ওই সময়ে লেখা চিঠিপত্রে পাওয়া যায় তিনি বিশ্ববরেণ্য অনেক কবি, লেখক, চিন্তকদের সঙ্গে দেখা করেছেন, কথাও হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে নানা বিষয়ে। কিন্তু তাঁর কথা বলার প্রেক্ষিতে তাঁরা কী বলছেন বা তাঁদের প্রতিক্রিয়াগুলি কী— রবীন্দ্রনাথের লেখায় গভীরভাবে তা পাওয়া যায় না। কেন?‌ পশ্চিম সেদিন পুরোপুরি দ্বার খুলে দেওয়ার পর সেই যে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর কতখানি যোগ হ‌ল ওই লেখকসমাজের সঙ্গে। কতটা অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তিনি জানতে চাইলেন তাঁদের কৃতিত্বগুলি। সম্ভবত এগুলিই ছিল তাঁর প্রশ্ন।

স্বল্প পরিসরে শঙ্খ ঘোষের রবীন্দ্রনাথ চর্চার সামান্য একটু ছোঁয়া দিতে গিয়ে, শুরুতেই কেন আবার ওই বেদনা জাগানো?‌ আমার মনে হ‌ল পরম সত্যটি কিন্তু এখানেই নিহিত রয়েছে। এবং পাতালছায়ায়। সারাটা জীবন ধরে নিরন্তর শুদ্ধ রবীন্দ্র অনুধ্যানে, আমরা কিন্তু কখনও দেখিনি শঙ্খ ঘোষের অন্ধ ভক্তের মতো শুষ্ক দৃষ্টি। ভিন্নরুচির অধিকারে তিনি প্রশ্নও করেছেন। 
ন’‌বছর বয়সে ‘‌মুক্তধারা’‌ পাঠ ক‌রে তাঁর রবীন্দ্রনাথ জানা শুরু। ‘‌এগারো প্লাস’‌–‌এ উপহার পাওয়া ‘‌জীবনস্মৃতি’‌র হলুদ হ‌য়ে যাওয়া পাতা এখনও তিনি নিয়মিত উল্টিয়ে যান। এমন–কি তা ঝোলায় ভরে নিয়ে গিয়ে এই সেদিনও তাঁর নাতনিদের সঙ্গে কাশ্মীর, ডালহৌসি ভ্রমণকালে পড়ে শোনাতে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলি চিহ্নিত করতে গিয়ে। ‘‌যার নাম বিতস্তা, সেটারই তো নাম ঝিলম?‌ ঝিলমের স্রোত।’‌
‘‌সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি আঁধারে মলিন হল— যেন খাপে ঢাকা বাঁকা তলোয়ার—’‌
অর্থাৎ তাঁর রবীন্দ্রভ্রমণে ইশারা এখনও অবিরত। আর তাই কখনও তিনি হয়ে ওঠেননি নিছক পণ্ডিত বা রবীন্দ্রব্যাখ্যাতা। তাঁর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি পেরেছেন রবীন্দ্র–‌মননের, সাধনের এক ফুরফুরে মুক্ত বাতাস বইয়ে দিতে। গোটা রবীন্দ্র–‌জীবনীটি কখনও কখনও মনে হয় তাঁর তালুতে লেখা রয়েছে বা রয়েছে ওষ্ঠে। এইরকম এক মুক্তমনা সদা সৃষ্টিশীল লেখকের কখনও, কোথাও তর্জনী যদি একটু ওঠে নিঃশব্দে, ক্ষতি কী?‌
এই লেখা লিখতে বসেই এক সকালে আমার কাছে একটি ফোন আসে। প্রবীণ এক চিকিৎসকের। চেন্নাইবাসী ওই বাঙালি চিকিৎসক দেবীদাস রায় চিকিৎসার পাশাপাশি লেখালেখিতে সময় কাটান। এবং ইংরেজিতে। এতদিনে প্রকাশিতব্য তাঁর একটি বাংলায় কবিতার বই নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, ইংরেজিতে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে একটি বইও লিখেছেন— ‘‌টেগোর অ্যান্ড মি’‌। রচনাকালে তিনি যাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছেন, তিনি শঙ্খ ঘোষ। আমি এইসব শুনে আদৌ বিস্মিত হইনি। কেননা, গত চল্লিশ বছর ধরে মাঝে মাঝে হলেও তাঁর কিছু সান্নিধ্য লাভ ক‌রে বুঝেছি, দেখেছি, শুনেছি— এক বিপুল সংখ্যক জিজ্ঞাসুকে শঙ্খ ঘোষ কী অপরিসীম ভালবাসায় ধারাবাহিকভাবে উত্তর দিয়ে গেছেন। অলক্ষ্যে কতশত ছাত্র‌ছাত্রীর যে তিনি ‘‌অলৌকিক গাইড’‌ হয়েছেন, সে সব ব‌লে শেষ করা যাবে না। কত লেখক–‌কবি, সম্পাদক, চিত্র–‌পরিচালক, গায়ক, সঙ্গীত প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান, রবীন্দ্রজীবনীকার— সকলকে তো দেখেছি তাঁর কাছে বসে পাঠ নিতে। মনে পড়ে, প্রবাদপ্রতিম রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল মশাইকেও একসময় দেখতাম রবিবারের আড্ডায় আসতে, কতশত প্রশ্ন নিয়ে। এই তো ক’‌দিন আগেই পড়েছি অমিয় দেব মশাই–‌এর লেখা। তিনি তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন— ‘‌রবীন্দ্র–‌মানচিত্র’‌। নিজের লেখার পাশাপাশি, তাঁর বাড়ির রবিবারের আড্ডায় স্রোতের মতো আসা মানুষের রবীন্দ্র–জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছেন। শঙ্খ ঘোষের রবীন্দ্রচর্চায় এগুলোর উল্লেখ কি গুরুত্বপূর্ণ নয়?‌ আমার ব্যক্তিগত একটি বোকা–বোকা প্রশ্নের মীমাংসার কথা এখানে ব‌লে এ–‌পর্ব শেষ করি। একদিন হোয়াটসঅ্যাপে কেউ পাঠিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের এক রঙিন ছবি। পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। অ্যালবার্ট কোহেনের ১৯২১–‌এ তোলা সেই ছবিতে আছেন পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী, কন্যা বেলা। পরিচিতিতে এরকমই উল্লেখ ছিল। এক সকালে তাঁকে দেখাই সে ছবি, মুচকি হেসে তৎক্ষণাৎ ব‌লে ওঠেন— ‘‌সে কী ক’‌রে হয়, বেলা তো তখন প্র‌য়াত।’

তাঁর রবীন্দ্রনাথ চর্চা নিয়ে দু‌টো–একটা কথা বলতে গিয়ে কেবলই ভাবছি শুরু করব কোনটি দিয়ে?‌ খুঁজতে খুঁজতে বাড়িতে পেয়ে গেলাম ‘‌হে চির নূতন’‌, ক্ষীণকায় এক পুস্তিকা। ১৪০০ সালে ১২৫ বৎসর উপলক্ষে রবীন্দ্ররচনার এক সংকলন। বর্ষ শুরু বর্ষশেষ। কৃতজ্ঞতা স্বীকারে দেখি অনেকের সঙ্গে তাঁর নামও রয়েছে। কিন্তু বোঝা যায় না, এরকম চমৎকার এক সংকলনের পরিকল্পনাটি বা সম্পাদনা কার?‌ আবার ভিতরে অত্যন্ত ছোট্ট ক‌রে সম্পাদকরূপে নাম উল্লেখ আছে— রবীন্দ্র কবিতার আর এক সংকলন ‘‌সূর্যাবর্ত’‌য়। ‘‌সঞ্চয়িতা’‌‌কে অনেকদিন ধরেই অনেকের বড় মনে হচ্ছিল। প্রয়োজন হয়েছিল তাই একটি অপেক্ষাকৃত ছোট সংকলনের। কিন্তু কে করবেন সেই সংকলন?‌ শেষ পর্যন্ত শঙ্খ ঘোষ। সংখ্যায় ‘‌সঞ্চয়িতা’‌র প্রায় অর্ধেক কবিতা নিয়ে প্রকাশিত ওই সংকলন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করি:‌
—এর পরেও আপনাকে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি সংকলন কেউ করতে বললে, রাজি হবেন?‌
—কেন, আমার পছন্দমতো সংকলনই তো ‘‌সূর্যাবর্ত’‌। আমাকে সেরকমই বলা হয়েছিল বিশ্বভারতী থেকে।
তিনি বিশ্বাস করেন রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতার সংকলন এক একজন নিজস্ব ভাবনার ওপর ভর ক‌রে করতে পারেন। 
রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে সুলভে রবীন্দ্র–‌রচনাবলি‌র যে সংস্করণ প্রকাশিত হয়, তার বাইরে আরও একবার ষোলো খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলি প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে। দেশব্যাপী বিচ্ছিন্নতাবাদ, মূল্যবোধহীনতার হাত থেকে বাঁচতে রবীন্দ্রনাথই তো একমাত্র রাস্তা— আর এই ধারণায় আরও বেশি মানুষকে রবীন্দ্ররচনা পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আটের দশকে। এই পর্বের শেষ তিনটি খণ্ডের নির্মাণে, অর্থাৎ অগ্রন্থিত রবীন্দ্রনাথ ও গ্রন্থপরিচিতি প্রস্তুতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে এখনও সহজেই পাওয়া যায় তাঁর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত বই–‌এর অনেকগুলি। তাঁর গদ্য সংগ্রহেরও দশটি খণ্ড ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। রচনা ধরে ধরে তার ব্যাখ্যা করা সাধ্যের অতীত। বরং এই ফাঁকে টুক ক‌রে বলে নিই তাঁর শান্তিনিকেতন–‌অধ্যায়।
এখনও পর্যন্ত যতদূর জানি, অন্তত তিনটি পর্বে তিনি শান্তিনিকেতনে থেকেছেন আনুষ্ঠানিকভাবে। এই তিন পর্বে, রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন, পড়িয়েছেন, লিখেছেন, হয়তো লিখিয়েছেন এবং কিছু প্রশাসনিক কাজেও সময় দিয়েছেন। এবং কাটিয়েছেন কিছু লাবণ্যময় সময়। পেয়েছেন বিচিত্র মানবসঙ্গের উজ্জীবন। প্রথমবার সম্ভবত ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি থেকে গোটা একটা বছর কাটে সেখানে ভিজিটিং ফেলো হয়ে। সে সময়ই লেখা হয় ‘‌জার্নাল’‌— সারাদিনের কাজের পর প্রায় প্রতিদিন রাতে লেখা ডায়েরির মতো। কী নেই সেখানে?‌ কবিতার কথা, শৈলজারঞ্জন, নিখিল ব্যানার্জির সেতার, ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরী বা জীবনানন্দর গ্রাম ও শহরের গল্প প্রসঙ্গে রক্তকরবী–‌র চন্দ্রা আর বিশুর সংলাপ। এইসব। চলে আসার ঠিক আগে তাঁদেরই অনুরোধে তিনি দুটি বক্তৃতা শেষ পর্যন্ত দিতে রাজি হন চীনা ভবনে। দুটি বক্তৃতার একটি তো হয়ে উঠেছিল বিতর্কিত— যতদূর শুনেছি। প্রসঙ্গত, সল্টলেকের ‘‌নাট্যশোধ’‌–‌এ রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর দেওয়া আরও একটি ভাষণ এখনও অগ্রন্থিত বলেই জানি। শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আসার পর লেখেন গুরুত্বপূর্ণ সেই বই— ‘‌নির্মাণ আর সৃষ্টি’‌। রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের রচনাগুলিকে সামনে রেখে তিনি ওই গ্রন্থে পাঠককে নিয়ে যান এক সমগ্রতার দিকে।
দ্বিতীয়বার শান্তিনিকেতন যাত্রা ১৯৮৪–‌তে, এক বছরের জন্য ‘‌রাইটার ইন রেসিডেন্স’‌। যদিও তিন মাসের পর তিনি থাকতে পারেননি। শারীরিক অসুস্থতায়। আর শেষবার ১৯৮৯–‌তে রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ হয়ে। সম্ভবত ৯ মাস থেকে চলে আসেন। শারীরিক কারণেই।
১৯৮৭–‌তে তাঁর সুযোগ হয়েছিল সিমলায় ‘‌ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’‌–‌এ ‘‌পোয়েট ইন রেসিডেন্স’‌‌ হ‌য়ে যোগদান করার। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমকালীন ভারতীয় কবিদের মানসিক যোগ কতটা স্থাপিত হয়েছিল, সেই কাজটি তিনি শুরু করেন এখানেই। ‘‌ইকবাল’‌ অনুবাদের বিশাল কর্মযজ্ঞটি তিনি এতদিনে সম্পন্ন করলেন বটে, কিন্তু তার শুরু তো ওই সময়েই। এবং অনেকটাই তখন হয়ে গিয়েছিল।
সবশেষে, তাঁর একবারই মাত্র বিদেশযাত্রা (‌আইওয়া)‌–‌র কথা। আইওয়ার লাইব্রেরিতে বসেই ১৯৬৭–’‌‌৬৮ সালে তিনি অবাক হয়ে দেখেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আস্ত একটি বই স্প্যানিশ ভাষায়। ঐতিহাসিক সেই বই ‘‌ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’‌–‌এর ভূমিকা, অনুবাদ ও অনুষঙ্গ রচনা করেন তিনি। সেই প্রথম আমাদের সুনীল সাগরে ও শ্যামল কিনারের সেই বিদেশিনীকে ভাল ক‌রে চিনে নেওয়ার সুযোগ হয়।
একটি প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ না ক‌রে উপায় নেই।  কবি সুমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শঙ্খ ঘোষের কথাবার্তা (কথার পিঠে কথা, প্রকাশক দে’‌জ পাবলিশিং)‌। এত বছর ধরে তিনি তাঁর ষোলো–সতেরোটি গদ্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের নাটক, কবিতা, গান, উপন্যাস, ছবি— প্রায় সব বিষয়েই আলো দেখিয়ে অনেককে অন্বেষণে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে কোনও বড় লেখা লেখেননি কেন?‌ সুমন্তর এই প্রশ্নে তিনি জানিয়েছিলেন— ‘‌হয়তো এ ব্যাপারে সেভাবে কেউ চেপে ধরেননি।’‌ আর চাপে না থাকলে যে কোনও গদ্যলেখা হয়ে ওঠে না, একথা তিনি বারেবারেই বলেছেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ে নিজের লেখার পাশাপাশি আর যে কাজটি একসময় তিনি প্রাণের আরামে করেছিলেন তা হ‌ল সুভাষ চৌধুরী পরিচালিত ‘‌ইন্দিরা’‌র অনেক গানের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা। তার মধ্যে ‘‌একটি রক্তিম মরীচিকা’‌ বা ‘‌বাসায় ফেরা ডানার শব্দ’‌ উল্লেখযোগ্য।
এত কিছুই যখন বলা হ‌য়ে গেল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের তাঁর রবীন্দ্রনাথ পড়ানোর জাদুকথা, দু‌টো একটা, বাদ যায় কেন?‌ হাতের কাছেই যখন রয়েছে তাঁর ছাত্র অভীক মজুমদারের স্মৃতিকথা। অভীক মজুমদারের লেখায় শঙ্খবাবুর ‘‌রক্তকরবী’‌ পড়ানোর অভিজ্ঞতার একটু অংশ ছিল এইরকম:‌
রক্তকরবী পড়ানো শুরু করার দিন আমাদের তিনি ব’‌লেছিলেন, ‘‌রূপক’‌, ‘‌প্রতীক’‌, ‘‌সংকেত’‌, ‘‌তত্ত্ব’‌— এইসব বাদ দিয়ে রক্তকরবী নাটকের গল্পটা কেবল শোনাতে। আমাদের প্রথম মনে হয়েছিল এ একেবারে জলবৎ প্রশ্ন!‌ কিন্তু বলতে গিয়ে সবিস্ময়ে আবিষ্কার করতে থাকি, ঐসব পরিভাষা আর ‘‌জ্ঞান’‌ শিক্ষেয় মাথাটা পুরো জমাট হয়ে আছে.‌.‌.‌ পরে শঙ্খবাবু নিজেই উদ্ধার করলেন আমাদের সে যাত্রা,‌.‌.‌.‌ শেখালেন ধীরে ধীরে যে, তত্ত্ব–‌রূপকের বেড়াজালে জীবন থেকে রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর নাটকের বক্তব্য দূরে রাখাটা কত অন্যায়, কত ভুল.‌.‌.‌’‌
সুমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে ওই সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা ক‌রেছিলেন— ‘‌আপনার কি নিজের মত ক’‌রে রবীন্দ্রভাবনার কোনও অভিমুখ আছে?‌’‌
তাঁর উত্তর ছিল:‌
—বিশেষ কোনও অভিমুখ নিয়ে শুরু করেছিলাম এমন নয়, তবে গোড়ার দিকে ঝোঁক ছিল আঙ্গিকটা লক্ষ্য করবার। নাটক, গান আর সৃষ্টিশীলতার শেষ দশ বছর, বারেবারেই নজর গেছে সেখানে। কিন্তু আলগা–‌আলগা ভাবে নয়। সবটাকে মিলিয়ে।

আমরাও যেন শঙ্খ ঘোষ–‌কে পাই অনুরূপভাবে। তাঁর সৃষ্টিকর্মও যেন সমগ্রতায় আমাদের নিয়ে যায় আরও আরও ভিতর পানে। এ আমির আবরণ খুলে ফেলে সেই যাওয়া যেন নিজেকেই জানার খোঁজে। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ ধরা দেন এক সংযোগ সন্ধানের প্রক্রিয়ায়। এই লেখা লেখার জন্য তাঁর সঙ্গে একদিন কথা বলতে গিয়েছিলাম। চলে আসার সময় তাঁকে একটি প্রশ্ন করতে গিয়ে দু‌টি প্রশ্ন ক‌রে বসি:‌
—এত রবীন্দ্রনাথ সম্পৃক্ত হ‌য়েও শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দেখলাম আপনার গদ্য, কবিতা লেখার আঙ্গিক তো একেবারে ভিন্ন। কোনও সাদৃশ্য পাই না তো?
তাঁর উত্তরও ছিল সংক্ষিপ্ত— ‘‌আমারও তাই মনে হয়।’
আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে তিনি কিছু বলেন, কিছুটায় নীরব থেকে যান। আমার প্রশ্ন ছিল:‌
—এত সব রবীন্দ্রনাথ পড়ে, পড়িয়ে, নাটক কবিতা গান শুনে, শুনিয়ে, পাঠ্যপুস্তকে তাঁকে এত অন্তর্ভুক্ত ক‌রে, সুলভে তাঁর রচনাবলি পুনঃপুনঃ প্রকাশ ক‌রে কিছু কি পরিবর্তন হল আমাদের মূল্যবোধের?‌ চেতনার?‌ উত্তরে তিনি বলেন:‌
—এখনও কত মানুষ সংকটে, বিষাদে, অস্থিরতায় রবীন্দ্রনাথ পড়ে শান্ত হন। তাঁদের কথা একবার ভাবুন।
জানি, হয়তো তাঁর ভিতরেও স্থির বিশ্বাসের পাশাপাশি আছে কিছু ক্ষরণ। না হ‌লে সংকটমুহূর্তে তিনিই–বা কেন কিছুটা বিষাদে, হতাশায় রবীন্দ্রনাথকে নিবেদন করেন একদা এই লেখা:‌
আমার পৃথিবী নয় এইসব ছাতিম শিরীষ
সব ফেলে যাব বলে প্রস্তুত হয়েছি, শুধু জেনো
আমার বিশ্বাস আজও কিছু বেঁচে আছে, তাই হব
পঁচিশে বৈশাখ কিংবা বাইশে শ্রাবণে আত্মঘাতী।
এই লেখাটি লেখার সুযোগ পেয়ে আমি শঙ্খ ঘোষ–‌কে শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলাম একটি নমস্কারে। শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হ‌ল। হোক। সান্ত্বনা একটাই। যা রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন একবার প্রমথনাথ বিশী–‌কে:‌
—আমাকে জানা কি এতই সহজ!‌ ■
তথ্যসূত্র/‌ঋণ
শঙ্খ ঘোষের গদ্য সংগ্রহ
‘‌কবিসম্মেলন’‌ পত্রিকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮
‘‌অনুষ্টুপ’‌ পত্রিকা, শঙ্খ ঘোষ সংখ্যা
বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ
পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত ষোলো খণ্ডের রবীন্দ্র রচনাবলি‌‌‌‌‌

 

কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক    —    সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার
    ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ    —    দে’‌জ পাবলিশিং
    এ আমির আবরণ    —    প্যাপিরাস
    ঊর্বশীর হাসি    —    প্যাপিরাস
    নির্মাণ আর সৃষ্টি    —    প্যাপিরাস
    ঐতিহ্যের বিস্তার    —    প্যাপিরাস
    সূর্যাবর্ত (‌সম্পাদিত)    ‌—    বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ
    ছন্দোময় জীবন    —    দে’‌জ পাবলিশিং
    কবির অভিপ্রায়    —    রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
    দামিনীর গান    —    প্যাপিরাস
    অন্ধের স্পর্শের মত    —    গাঙচিল
    ভিন্নরুচির অধিকার    —    তালপাতা
    জানার বোধ    —    বহুরূপী
    দেখার দৃষ্টি    —    তালপাতা
    হে মহাজীবন    —    প্যাপিরাস
    হওয়ার দুঃখ    —    অনুষ্টুপ
    নির্বাচিত প্রবন্ধ: ‌রবীন্দ্রনাথ    —    কথা প্রকাশ (‌ঢাকা)‌ বাংলাদেশ

জনপ্রিয়

Back To Top