মাপা হাসি, চাপা কান্না নিয়ে আর কতদিন‍‌!‌ এই নারীদিবস থেকেই কি ঘুরে দাঁড়ানো যায় না?‌

মায়া সিদ্ধান্ত

আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ এখন যে এত হইচই, তা কিন্তু ২৫–‌৩০ বছর আগেও সেভাবে দেখা যেত না। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে বড় জোর একটা প্রতিবেদন থাকত, যা পড়ে সচেতন নাগরিক জানতে পারত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারীদিবস। সেই সঙ্গে কয়েকটা সেমিনার, আলোচনাসভা। মাসখানেক ঘুরতে না ঘুরতে লোকজন সে সব বেবাক ভুলে যেত। নারীদিবস, তার তাৎপর্য, ওসব ভারী ভারী কথা মনে রাখতে তাদের বয়েই গেছে। পরের বছর দিনটা আবার ফিরে আসার আগে আগে দেখা যেত সচেতনতা ফিরে আসছে। ব্যস!‌ ওইটুকুই। অনেক সময় ৮ মার্চ তারিখটার বিশেষ তাৎপর্য শিক্ষিত নারীদেরও ভুলে যেতে দেখেছি।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি সব নারীর ক্ষেত্রে সত্যি একটি প্রবাদ—‌বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না‌। 
প্রথমেই কাবেরীর কথা। মিডিয়া জগতের একটি অতিপরিচিত নাম। বাবা–মা সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়েটা টেকেনি। কারণ, তার ব্যাপক পরিচিতি। বউ কর্মস্থলে যায়। তা নিয়ে শ্বশুরের কটূক্তি, শাশুড়ির তুচ্ছ–‌তাচ্ছিল্য আর, তার চেয়েও বড় কথা, তথাকথিত শিক্ষিত স্বামীর কাছে হেনস্থা হওয়া। কাজের জগতে পরিশ্রম অন্তহীন। আর, ঘরে অবজ্ঞা আর অত্যাচার। এভাবেই কাটছিল কাবেরীর দিন। সহ্য করতে করতে একদিন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় কাবেরী ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। ঠিকানা ফের পিত্রালয়। বাবা তখন জীবিত নন। বিধবা মা, ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের সংসারে এসে পড়ল কাবেরী। বলা বাহুল্য, এরা কেউ কাবেরীকে সাদরে গ্রহণ করেনি। ভাইয়ের বক্তব্য ভীষণ স্পষ্ট, ‘‌বাইরের কাজকর্ম ছেড়ে জামাইবাবুর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মন দিয়ে সংসার করলেই তো পারতিস।’‌ কাবেরীর একটা নিজস্ব রোজগার ছিল। তাও ভাইয়ের বাড়িতে জায়গা জুটল না। অগত্যা কাবেরী পেইং গেস্ট হল। ডিভোর্সটাও হয়ে গেল। এরপর কাবেরীর সঙ্গীহীন জীবনে এলেন ডা.‌ সুরজিৎ ভদ্র। ‘‌বর্ন ব্যাচেলার’‌, কিন্তু এক বন্ধুর বাড়িতে কাবেরীর সঙ্গে পরিচয়, তার মুখ থেকেই তার ফেলে আসা জীবনের কথা জানা এবং তারপর কাবেরীকে বিবাহের প্রস্তাব, স্বামী হয়ে তার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানানো। কাবেরী ডা.‌ ভদ্রকে ফেরায়নি। কিন্তু বাধ সাধলেন ডা.‌ ভদ্রের মা। মহিলা শিক্ষিতা। কাবেরীর জন্য ছেলের বিয়েতে মতি হয়েছে জেনে আদৌ খুশি হলেন না তিনি। বরং বেঁকে বসলেন, ডিভোর্সি মেয়েকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নেবেন না বলে।
ডা.‌ সুরজিৎ ভদ্র মায়ের কথা শোনেননি, তিনি কাবেরীকে যে কথা দিয়েছিলেন সে কথা রাখতে বদ্ধপরিকর। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষিত মানুষটি কিন্তু বিবাহিতা পত্নীকে কোনওদিন মায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। কাবেরী তার আন্তরিকতা দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে খানিকটা প্রবেশাধিকার পেলেও কোনওদিন বাড়ির বউ হিসেবে যথাযথ মর্যাদা পায়নি। কে‌ন তাকে স্বামীর সঙ্গে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকতে হয়, সে কথা কাবেরী নিজের আত্মীয়‌স্বজনকেও কোনওদিন বলে উঠতে পারেনি।
আর এক ডিভোর্সি মেয়ে সংযুক্তার কাহিনী কিছুটা আলাদা। ডিভোর্স হওয়ার পর সংযুক্তার পরিচয় হয় অফিস কলিগ স্যমন্তকের সঙ্গে। বয়সে সংযুক্তা স্যমন্তকের চেয়ে সামান্য বড়। সে কথা স্যমন্তকের বাড়িতে জানানো মাত্র স্যমন্তকের উচ্চশিক্ষিত বাবা বেঁকে বসলেন। এ বাড়িতে ও মেয়ের জায়গা হবে না। আমরা এ বিয়ে মানব না। ডা.‌ সুরজিৎ ভদ্রের মতো স্যমন্তকও বাবা–‌মায়ের কথা শোনেনি। সংযুক্তাকেই বিয়ে করে সে। সংযুক্তারও শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি। স্যমন্তককে নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাটে সংসার তার। শ্বশুরবাড়ি না পাওয়ার যন্ত্রণায় গুমরে গুমরে কেঁদে মরে সে। কেঁদে মরেন স্যমন্তকের মা–‌ও। স্যমন্তক তাঁর একমাত্র সন্তান। ভালবেসে বিয়ে করে সেই সন্তান তাঁর কাছ থেকে বহুদূরে সরে গেছে, তাঁর যন্ত্রণাই বা কম কীসে!‌ দু‌জন অসমবয়সী নারী নিজের নিজের জায়গায় গুমরোতে থাকে। পরিস্থিতি বদলানোর কোনও চেষ্টা ছাড়াই তাদের বিলাপ। স্রেফ একটা মনগড়া সামাজিক ভয়— পাত্রী পাত্রের চেয়ে বয়সে বড়, সমাজে এরকম সম্পর্ক স্বীকৃত নয়, এ ধরনের ভাবনা— তাদের দু’‌দিকে ঠেলে দেয়।
ঋতুপর্ণার বিয়েটা অবশ্য হয়েছিল সম্বন্ধ করেই। দুটি শিক্ষিত পরিবারের মধ্যে বৈবাহিক বন্ধন। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই ঘটল একটা বিপত্তি। শাশুড়ি ফিমার বোন ভেঙে শয্যাশায়ী হলেন। তারপর একদিন মারা গেলেন। ব্যস!‌ অমনি শ্বশুরবাড়ি থেকে যাবতীয় দোষের খাঁড়া নেমে এল ঋতুপর্ণার ওপর। সে অপয়া বলেই না শাশুড়ির প্রাণত্যাগ!‌ দিনরাত ‘‌অপয়া’‌ বলে খোঁটা। সংসারে সিঁটিয়ে থাকতে হত মেয়েটিকে। সুন্দরী শিক্ষিতা ঋতুপর্ণার সঙ্গে তার স্বামীর কোনও সম্পর্কই তৈরি হল না। কোনওরকম ভালবাসা ছাড়াই জন্ম নিল তাদের দু’‌দুটো পুত্রসন্তান। প্রেমহীন প্রজনন। অনাদৃত অপয়া বউয়ের ছেলে দুটোও বড় হতে লাগল আদরহীন পরিসরে। আরও একটি ঘটনা ঘটল। দ্বিতীয় সন্তান জন্মাবার পর স্বামী নামক মানুষটি ঋতুপর্ণার থেকে একেবারেই সরে গেল। শোওয়ার ব্যবস্থা করে নিল আলাদা ঘরে। সেই সঙ্গে ছেলেদের থেকেও মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। গত বিশ বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বাস করছে ঋতুপর্ণা, কিন্তু দু‌জনের মধ্যে কোনও শারীরিক বা মানসিক সম্পর্ক নেই। ঋতুপর্ণার একমাত্র অবলম্বন তার দুই ছেলে। নিজের বুকের ভেতরকার এই গভীর গোপন ক্ষতের কথা সে কাউকে বলতে পারে না। বাবা–‌মা–‌ভাই–‌বোনদের সঙ্গে তো এসব কথা আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না, এসব অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনও বন্ধুও তার নেই। সুদর্শন স্বামী অন্য মহিলার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। ঋতুপর্ণা দেখে। একা একাই যায় ছেলেদের পেরেন্টস–‌টিচার মিটিং–‌এ যোগ দিতে। শপিং মলে তাদের ঘোরাতে নিয়েও যায় একাই। কেউ স্বামীর অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে ওর একটাই উত্তর, ওদের বাবার এক্কেবারে সময় নেই;‌ তাই আমাকেই সব করতে হয়। ঋতুপর্ণাকে যখনই কেউ স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করে, তার একটাই উত্তর, আমাদের দু‌জনের সম্পর্ক খুবই ভাল। ওর অপরিসীম সহ্যক্ষমতা দেখলে অবাক হতে হয়। এরকম কত ঋতুপর্ণাই না রয়েছে আমাদের চারধারে, আমাদেরই অগোচরে। মাপা হাসি দিয়ে তারা কান্না চাপতে সদাব্যস্ত। অভ্যস্তও বটে।
নন্দিনীকে কেন মেয়ের হাত ধরে ঘর ছাড়তে হয়েছিল সে খবরও তো কেউ রাখে বলে মনে হয় না। প্রেম করে বিয়ে তার। সুপ্রিয় চায়নি তার বউ চাকরি করুক। অথচ বাবা–‌মা–‌ভাই–‌বোনদের নিয়ে অতবড় সংসার টানাও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সামান্য সরকারি কেরানির চাকরি। তার আয় সংসারের সব চাহিদা মেটাতে অপারগ। অতএব চাকরিরতা স্ত্রীর মাস–‌মাইনেটাও দরকার। বিজ্ঞাপন দুনিয়ায় নন্দিনীর বেশ নামডাক ছিল। স্ত্রীর যশ, নামডাক কবে কোন পুরুষ আর সহ্য করেছে?‌ এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। তার মধ্যে শুরু হল স্ত্রীকে রীতিমতো সন্দেহ করা। একদিকে সুপ্রিয় নন্দিনীর প্রতি সন্দিহান, অন্যদিকে সে–‌ই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গৌরবের অনুপস্থিতিতে তাদের ফ্ল্যাটে যায়। ব্যবসার কাজে মাঝে মাঝেই মুম্বই ছুটতে হয় গৌরবকে। সেই সুযোগে গৌরবের স্ত্রী শান্তার সঙ্গে সুপ্রিয়র শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। প্রতিদিন রাত করে বাড়ি ফেরা, ফিরে নন্দিনীর ওপর হম্বিতম্বি করা, এসব তার রোজকার রুটিন। স্রেফ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নন্দিনী সব মেনে নিচ্ছিল মুখ বুজে। আর কী–‌ই বা তার করার ছিল?‌ এসবের মধ্যেই ঘটে গেল ঘটনাটা।
মুম্বই থেকে বড়দিনের ছুটিতে কলকাতায় ফিরল গৌরব। সস্ত্রীক সুপ্রিয়কে নিমন্ত্রণ করল নিজের বাড়িতে। রাতে ডিনার, একটু মদ্যপান। তারপর গৌরবদের বাড়িতেই রাত্রিযাপন। বাচ্চারা যে যার মায়ের কাছে। বন্ধুগৃহ, তাই রাত্রিযাপনে আপত্তি ছিল না কোনও তরফেই। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় নন্দিনীর। নিজের শরীরের ওপর আবিষ্কার করে গৌরবকে। কানে আসে ফিসফিসানি। তোমার স্বামী তো আমার স্ত্রীকে নিয়েই থাকে। আজও.‌.‌.‌ দ্যাখো, আমাদের ছেলের বিছানায়। তাহলে আমিই বা তোমায় ছাড়ব কেন?‌
ঘুম পুরোপুরি ভেঙে গেছিল। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সে। ঘরের আলো জ্বালায়, তারপর যে দৃশ্য সে দেখেছিল তা কোনওদিন কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারেনি নন্দিনী। এমন–কি ডিভোর্সের মামলার সময় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও না।
দোলনের গল্পটা একটু আলাদা। সে বেশ সুন্দরী। বিয়েটা হয়েছিল সম্বন্ধ করেই। সেই থেকে টানা বিবাহিত জীবন। স্বামী তার থেকে পনেরো বছরের বড়। তা নিয়ে কোনও অভিযোগের সুযোগ পায়নি দোলন। প্রতিবাদহীন দাম্পত্যই আমাদের সমাজে সুস্থতা এবং স্বাভাবিকত্বের লক্ষণ। স্বামীর কাঠের ব্যবসা। সে কাজে প্রায়ই নর্থ বেঙ্গল যেতে হয় তাকে। বাড়িতে তখন দোলনকে শয্যাসঙ্গিনী করে তার থেকে বছর পাঁচেকের ছোট দেওর। কলেজে পড়ে। রাতে একা বিছানায় শুতে দোলনের ভয় করে। সেই সুযোগেই দেওরের প্রবেশ। স্বামীর আদেশেই। প্রথম প্রথম আপত্তি করেছিল দোলন। ধোপে টেকেনি। কারণটা পরে বুঝেছিল দোলন। উত্তরবঙ্গে তার স্বামীর আর একটা সংসার আছে, এ জন্যই দোলনের স্বামীর এমন সুবন্দোবস্ত!‌
একটা ছেলে হল দোলনের। বাবা কে?‌ স্বামী না দেওর?‌ দোলনেরও এর উত্তর সঠিকভাবে জানা নেই। স্রেফ সমাজ– সংসারের নিয়মরীতি মেনে সে একসময় দেওরের বিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়। ততদিনে দেওরটি দোলনের মনের আঙিনায় পোক্ত আসন পেতেছে। আর দোলন অবাক হয়ে দেখল, সেই দেওর, তার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সম্পর্ক গড়ে তোলা দেওর, কেমন চুপচাপ, বাধ্য ছেলের মতো নতুন বউকে ঘরে এনে তুলল। নববধূকে বরণ করল দোলনই। ফুলশয্যার খাট সাজানোর সময়েও সে–‌ই অগ্রনায়িকা। মনের মধ্যে তোলপাড়। ঝড় উথাল–‌পাথাল। কিন্তু মুখ ফোটেনি দোলনের। মেয়েদের তো বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না।
কথা হচ্ছিল পাঞ্চালীর সঙ্গে। খুব অল্পবয়সে প্রেম করে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল সুধন্যর সঙ্গে। বাবার একটা অতিসাধারণ সোনার দোকান বারুইপুরে। সেটাই পাঞ্চালীর বাপের বাড়িতে অন্নসংস্থানের একমাত্র উপায়। তারই সামান্য আয় থেকে পাঞ্চালীর লেখাপড়া শেখা। বাবার ইচ্ছে ছিল, লেখাপড়া শিখে পাঞ্চালী নিজের পায়ে দাঁড়াবে, সেইসঙ্গে সংসারের হাল ধরবে— এক্কেবারে উপার্জনশীল ছেলের মতো। সে–‌ই পাঞ্চালীই নিজের পছন্দমতো ছেলের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছে। কিন্তু মাস দুয়েকের মধ্যেই পাঞ্চালীর পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন। সোজা বাবার পায়ে কেঁদে পড়ল সে। খুব ভুল করে ফেলেছি।
সুধন্য নাকি বিয়ের দু–‌চারদিনের মধ্যেই নিজমূর্তি ধারণ করেছিল। বাবার যখন সোনার দোকান তখন তাঁকেই দু–‌চারটে সোনার গয়না গড়িয়ে দিতে হবে পাঞ্চালীকে। সাজিয়ে দিতে হবে সুধন্যর ফুটপাথের দোকানটাও। মেয়ের বাবা বলে কথা!‌‌
প্রথম প্রথম বাক্যবাণ। তারপর শুরু হল শারীরিক নির্যাতন। নিরুপায় পাঞ্চালী তাই ফিরে আসে বাবার কাছে। আর বাবা?‌ তিনি অসহায় মেয়ের হাতে তুলে দিলেন কিছু সোনার গয়না আর হাজার দশেক টাকা। অপত্যস্নেহের অনন্যেপায়তা। তবু শেষরক্ষা হল কই?‌ সুধন্যর সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্কে ইতি টেনে, দাম্পত্যজীবনের পাট চুকিয়ে ছ’‌মাসের মধ্যে পাঞ্চালীর পাকাপাকি প্রত্যাবর্তন বাবা–‌মায়ের আশ্রয়ে। সুধন্য ততদিনে বহু টাকা পণ নিয়ে আর একটা মেয়েকে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে। তাই পাঞ্চালীকে বাধ্য করা হয়েছে মিউচুয়াল ডিভোর্সের কাগজে সই করতে। আর কী–‌ই বা করার ছিল ওর?‌
বাবা–‌মায়ের কাছে ফিরে এসে ফের পড়াশোনা। কলেজে যাতায়াতের পথে আলাপ–‌পরিচয় দেবার্ঘ্যর সঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে, দেখতে–শুনতেও ভাল। পরিচয়ের বয়স কয়েকটা দিন। তার মধ্যেই দেবার্ঘ্যর বিবাহ–‌প্রস্তাব। পাঞ্চালী বাবা–‌মাকে সব জানায়। বাবা–‌মার জোরালো আপত্তি, ফাইনাল ইয়ারে বিয়ের ব্যাপারে। পড়াশোনাটা আগে শেষ হোক। কিন্তু এবারও পাঞ্চালীর মনে ধরল না ওসব কথা। দেবার্ঘ্য তখন তার চোখে মনে ঘোর লাগিয়েছে। অমোঘ সেই টান উপেক্ষা করবে কীভাবে পাঞ্চালী?‌ আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বসল সে। ফাইনাল পরীক্ষায় বসল বটে, তবে মন পড়ে রইল দেবার্ঘ্যতে। ততদিনে বাবা–‌মা বিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন। আর রাজি হয়েছেন বলেই না পাঞ্চালী পরীক্ষায় বসতে রাজি হয়েছে!‌
আসলে পাঞ্চালী ভালবাসার কাঙাল ছিল। তার অতিসাধারণ বাবা–‌মা শুধু চেয়েছে সে পড়াশোনা করে সংসারের হাল ধরুক, তাদের ছেলে হয়ে উঠুক। ব্যস!‌ ওইটুকুই। আদরহীন, স্রেফ প্রয়োজনের সম্পর্ক। আর নরম মনের মেয়েটা?‌ সে শুধু চেয়েছে সংসার, স্বামীর ভালবাসা, বাবা–‌মায়ের আদর। সে সব ইচ্ছের মর্যাদা কেউ দেয়নি।
দ্বিতীয় বিয়েটাতেও পাঞ্চালীর ইচ্ছেপূরণ হল কই?‌ স্পষ্ট টের পেল, শ্বশুরবাড়িতে সে খুব একটা গ্রহণীয় হয়নি। অনান্তরিক দায়সারা গোছের অভ্যর্থনা। তার সঙ্গে যে শ্বশুরবাড়ির সকলের রূপ–‌গুণ–‌স্বভাব–‌সংস্কৃতির ফারাক। প্রথম দিন থেকেই তাকে ঘিরে ফিসফিসানি। সাধারণ স্যাঁকরার মেয়ে সরকারি কর্মচারীর বাড়িতে নাকি বেমানান। তাও সব মুখ বুজে সহ্য করছিল পাঞ্চালী। কিন্তু সহ্য হল না সেদিন, যেদিন শাশুড়ি রান্নাঘরে তার পায়ে কেরোসিন ঢেলে দিলেন। আগুনটাও জ্বালাতেন। কিন্তু নববধূ পুড়ে মরলে সরকারি চাকুরে ছেলের চাকরি নিয়ে টানাটানির সম্ভাবনার কথা ভেবেই ক্ষান্ত হলেন। পাঞ্চালীকে ঘর থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে অবশ্য ভুললেন না। পাঞ্চালীও যেন বেঁচে গেল।
পাঞ্চালীর এখন ঠিকানা তার বাপেরবাড়িই। অঙ্গনওয়াড়ির কর্মী সে। ভালবাসাবিহীন একটা জীবনের জোয়াল টেনে চলেছে সে নিরন্তর। স্বপ্নগুলো বাষ্প হয়ে গেছে। চোখের জলও।
এবার তিন্নির কথা। নাট্যকর্মী। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ এক মহিলা নাটকের পর সোজা গ্রিনরুমে গিয়ে আলাপ করলেন তার সঙ্গে। ফোন নম্বর ইত্যাদি নিয়ে নিলেন। আলাপের সূত্রে তিনি বেশ বুঝেছিলেন, তিন্নি পেশাদার অভিনেত্রী নয়। শখের নাটক করা তার। সে জন্যই মহিলার বাসনা, তার বছর তিরিশের ছেলের বধূ হোক বছর উনিশের তিন্নি। সেই ইচ্ছেপূরণের জন্যই বারবার ফোন, কাজে–‌অকাজে নানা অছিলায় দেখা করা। সিনেমা থেকে সিটি সেন্টার, একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো। তিন্নি ক’‌দিনের মধ্যে তার নতুন আন্টির প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠল। জাপানে আন্টির ছেলে পড়তে গেছে। তার সঙ্গে বিয়ের বন্দোবস্ত একরকম পাকা করে ফেললেন আন্টি।
ওদিকে, তিন্নির বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার, মা–‌ও ভাল চাকরি করেন। তাঁরা টেরও পেলেন না তাঁদের কন্যাটি তার নতুন আন্টিকে মনে মনে হবু শাশুড়ির আসনে বসিয়ে ফেলেছে। তাঁরা সবকিছু জানলেন সেদিন, যেদিন তিন্নি আহ্লাদী গলায় তাঁদের জানাল, আন্টির ছেলে জাপান থেকে ফিরেছে এবং সে তাকে বিয়ে করতে চায়। তিন্নির মা আন্টির পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রথম দিন থেকে বুঝতে পেরেছিলেন, আর্থ–‌সামাজিক অবস্থানের নিরিখে দুটো পরিবারের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। শুধু বিত্তবান বলে একটি পরিবারে তাঁদের আদরের মেয়েটিকে তাঁরা তুলে দেবেন, এ কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। বড়লোকি চাল আর দেখনদারিসর্বস্ব পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ার আদৌ কোনও আগ্রহ ছিল না তাঁদের তরফে। কিন্তু তিন্নি তখন উড়ছে। ভাসছে প্রজাপতির মতো স্বপ্নের বাগানে। বাবা–‌মায়ের কথা একটুও ভাল লাগেনি তার।
তিন্নির টনক নড়ল তখন, যখন জাপান–ফেরত পাত্র খেপে খেপে টাকা নিতে শুরু করল তিন্নির বাবার কাছ থেকে কখনও নামী রেস্তোরাঁয় তাকে খাওয়াবে বলে, কখনও বা গাড়িতে তেল ভরার জন্য। এর পরের ধাপে শুরু হল ১০–‌১৫ হাজার টাকার দাবি। পরে মা ফেরত দিয়ে দেবে, এখন তুমি তোমার বাবা–‌মায়ের কাছ থেকে টাকা আনো দেখি, এই ছিল তার নিত্য বক্তব্য। তখনও কিন্তু জাপান–ফেরত যুবকের সঙ্গে প্রেমপর্ব কাটিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেনি। এরই মধ্যে ছেলের মা সরাসরি প্রস্তাব দিলেন। ছেলের তো বিয়ের বয়স হয়ে গেল। তিন্নির আর লেখাপড়া শিখে কাজ কী?‌ বিয়ে করে নিক এবার। ওর তো রান্নার হাত বেশ পাকা। ওদিকে ভাল রঁাধুনি কিছুতেই টিকছে না পাত্রপক্ষের বাড়িতে। সুতরাং.‌.‌.‌।
এমন মোক্ষম যুক্তি শুনে তিন্নির বাবা–‌মা হঁা হয়ে গেলেন। আর তিন্নি?‌ সে তখন ঘোর কাটিয়ে প্রখর। সরাসরি ‘‌না’‌ বলে দিল সে।
কিন্তু তিন্নি তো ব্যতিক্রম। কজন আর পরে তিন্নি হতে?‌ আমাদের দেশে বেশিরভাগ পুত্রসন্তানের জনক–জননীর এখনও ধারণা, পা দিয়ে ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে জড়ো করা যায়। অতএব, নারী নামক দুর্বল প্রাণীটির অবস্থান্তর শত শত নারীদিবস পালন করলেও হবে না, যদি না আমাদের চারপাশের মেয়েরা সব্বাই তিন্নির মতো হয়ে উঠতে পারে, মুখের ওপর ‘‌না’‌ বলার সাহসটুকু অর্জন করতে পারে তারা।‌‌‌‌‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top