ভুলেছি কলকাতার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবির শতবর্ষও। ধ্রুবজ্যোতি নন্দী


কলকাতায় অনেককে একসঙ্গে বসিয়ে প্রথম ছায়াছবির প্রদর্শনী হয়েছিল বাবু সংস্কৃতির পীঠ উত্তর কলকাতার স্টার থিয়েটারে, গিরিশ ঘোষের নাটক ‘পারস্য প্রসূন’ বা ‘পারিসানা’র বিরতিতে। ছায়াছবি তখন ছিল নাটকের মতোই সপ্তাহান্তের বিনোদন। তারপর থেকে কলকাতায় ছায়াছবির জনপ্রিয়তা লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে দেখে ১৯০২ সালে জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডান নামে এক পার্সি ব্যবসায়ীর মনে হল, শুধু শনি–রবি কেন? ছায়াছবি যদি রোজ দেখানো যায়, তবে রোজই কি তার দর্শক জুটবে না? বোম্বাইতে (এখনকার মুম্বই‌) ‌কালাঘোড়ার মেডোজ স্ট্রিটের স্টুডিওতে ক্লিফটন অ্যান্ড কোম্পানি তো সেই ১৮৯৭ সাল থেকে প্রতিদিন ছায়াছবি দেখিয়ে আসছে। কলকাতাতেই বা অসুবিধে কীসের? ধর্মতলা স্ট্রিটে তাঁর নিজেরই তো আছে করিন্থিয়ান থিয়েটার।
তা আছে, কিন্তু সেখানে যায় শুধু পার্সি, সাহেব–হওয়া অন্য সম্প্রদায়ের কিছু ভারতীয় আর কখনওসখনও কোনও ইউরোপিয়ান। চাই এমন জায়গা, যেখানে সহজ সহাবস্থান সম্ভব সাদা এবং রঙিন চামড়ার। কলকাতার ময়দানে সেটা প্রায় নিয়মিতই দেখা যায়। ইউরোপিয়ান এবং ভারতীরা সেখানে একই মাঠে খেলা দেখেন, একই তাঁবুতে দেখেন সার্কাস বা ম্যাজিক। ভারতীয় ও ইউরোপিয়ান সমাজের মধ্যে সদা–জাগ্রত বিভেদ–রেখাটি এই ময়দানেই যেন কিছুটা এলোমেলো, ভঙ্গুর, অস্পষ্ট। সুতরাং, ম্যাডান সিদ্ধান্ত নিলেন, ময়দানেই তাঁবু ফেলে প্রতিদিন ছায়াছবি দেখাবে তাঁর কোম্পানি এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ।
পার্সি ব্যবসায়ীর হিসেবে ভুল হয়নি। ১৯০২ সালে চালু করার পর বেশ তাড়াতাড়ি লাভজনক হয়ে উঠেছিল ময়দানের তাঁবুতে ছায়াছবির দৈনিক প্রদর্শনী। কিন্তু বাঙালি ভদ্রলোকের সংখ্যা সেখানে ঠিক আশানুরূপ হল না। সপরিবারে বায়োস্কোপ দেখতে আসা বাঙালি তো নেইই। তাই কিছুদিনের মধ্যেই দৈনিক ছায়াছবি প্রদর্শনীর আরও একটা তাঁবু ফেললেন তিনি উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে। এখন যেখানে টাউন স্কুল দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সেখানে।
তারপর থেকে চলচ্চিত্র শিল্পে জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডান তাঁর বিনিয়োগ বাড়িয়ে গিয়েছেন বছরের পর বছর। হয়ে উঠেছেন ভারতের প্রথম মুভি মোগল। শুধু কলকাতা নয়, গোটা উপমহাদেশ জুড়ে ছিল তাঁর চলচ্চিত্র সাম্রাজ্যের বিস্তার। আর সেই সুবাদে ভারতীয় চলচ্চিত্র বাণিজ্যের রাজধানী হয়ে উঠেছিল এই কলকাতা। বোম্বাইয়ের উত্থান ম্যাডানের মৃত্যুর কয়েক বছর পর।
ম্যাডানকে তবু আমরা তেমন চিনিটিনি না, যদিও মধ্য কলকাতার পার্সি পাড়া সাকলত প্লেস সংলগ্ন ব্যস্ত রাস্তা ম্যাডান স্ট্রিট এই জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডানের স্মৃতিতেই চিহ্নিত। ম্যাডানকে শুধুই ব্যবসায়ী বললে সবটা যেন বলা হয় না। চরিত্রটা খুব ইন্টারেস্টিং। ধনী পার্সি পরিবারের সন্তান, আশৈশব নাটকে উৎসাহী। ১৮৬৮ সালে, মাত্র ১১ বছর বয়সেই, কর্মী এবং অভিনেতা হিসেবে তিনি ঢুকে পড়েছিলেন বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন ড্রামাটিক ক্লাবে। মাটি ফেলে ফেলে সাতটি দ্বীপ জুড়ে তখন বম্বে শহর স্থাপনের কাজ চলছে পুরোদমে। সে প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য তৈরি বম্বে রিক্ল্যামেশন বাঙ্কে বিপুল অর্থ গচ্ছিত রেখেছিলেন জামশেদজি ম্যাডানের বাবা ফ্র্যামজি। কিন্তু বম্বে রিক্ল্যামেশন ব্যাঙ্ক ব্যাঙ্ক ফেল করল। আমানতকারীদের গচ্ছিত টাকা সব উধাও, ম্যাডান পরিবারে নেমে এল ভাগ্য বিপর্যয়। স্কুলের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই জামশেদকে নিতে হল চাকরি। তবে অভিনয় ছাড়লেন না, চাকরির সঙ্গেই চলতে থাকল নাটক। ১৮৭৫ সালে এলফিনস্টোন ড্রামাটিক ক্লাব রূপান্তরিত হল পেশাদার সংস্থা এলফিনস্টোন নাটকমণ্ডলীতে, উদ্দেশ্য বিভিন্ন শহরে নাটক করে জীবিকা সংস্থান করা। ঘুরে ঘুরে নাটক করতে হবে বলে চাকরি ছাড়তে হল ম্যাডানকে। ভ্রাম্যমাণ নাটকের দলে তাঁর উপার্জনও খনিকটা বাড়ল।
কিন্তু ব্যবসা যে ম্যাডানের ধমনিতে!‌ ৭ বছর ধরে ঘুরে ঘুরে নাটক করার পর তাঁর মনে হল, জীবনটা আমূল পাল্টে ফেলতে হলে এর চেয়ে ঢের বেশি অর্থকরী কোনও কাজ শুরু করা দরকার। ১৮৮২ সালে নাটকমণ্ডলী ছেড়ে করাচি থেকে সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে বিভিন্ন ধরনের মদ ও অন্যান্য জিনিস সরবরাহের ব্যবসা শুরু করলেন ম্যাডান। ১৮৮৫ সালের মধ্যেই তিনি যথেষ্ট সফল, ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ভারত জুড়ে। আর, সেই ব্যবসার সদর দপ্তরটি বোম্বাই থেকে তিনি তুলে নিয়ে এসেছেন দেশের রাজধানী কলকাতায়।
ম্যাডানের প্রথম প্রেম এলফিনস্টোন নাটকমণ্ডলীও তখন কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছে, ধর্মতলা স্ট্রিটের করিন্থিয়ান হলে চলে তাদের নিয়মিত অভিনয়। কলকাতায় পৌঁছনোর কয়েক বছরের মধ্যেই ম্যাডান কিনে নিলেন এলফিনস্টোন নাটকমণ্ডলী এবং করিন্থিয়ান হল সমেত গোটা ৫ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিট। আদতে বম্বের সংস্থা এলফিনস্টোন নাটকমণ্ডলীর সঙ্গেই পার্সি নাট্যজগতের বিশিষ্ট চরিত্র শেঠ কুভারজি নাজিরের কাছ থেকে বম্বের আর এক নাট্যসংস্থা খাটাউ আলফ্রেডও কিনে নিলেন ম্যাডান এবং তাঁর সমস্ত ব্যবসার সদর দপ্তর তুলে নিয়ে এলেন ধর্মতলা স্ট্রিটের ওই বাড়িতেই। সে–বাড়ির একটা অংশে তখন দাঁড়িয়ে করিন্থিয়ান হল, যা তাঁরই হাতে কিছুদিনের মধ্যেই রূপান্তরিত হয়েছিল করিন্থিয়ান থিয়েটারে।
তারপর থেকে দশকের পর দশক ধরে করিন্থিয়ান থিয়েটার কলকাতায় পার্সি, গুজরাতি এবং হিন্দি নাটকের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে থেকেছে। এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করে গেছেন দেশের শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পীরা, গ্রামোফোনের জন্য ভারতে প্রথম রেকর্ডিং শুরু হয়েছে এখান থেকেই। আর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী তো হয়েছেই।
ছায়াছবির শৈশব–লক্ষণ দেখেই ম্যাডান ক্রমশ মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার অঙ্কে। ফরাসি সংস্থা প্যাথে ফ্রেরে তখন ছায়াছবি তৈরি আর প্রদর্শনীর ব্যবসার জাল বিছিয়েছে সারা দুনিয়া জুড়ে। কলকাতার ৫৫ নম্বর বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে ছিল তাদের ভারতীয় ব্যবসার সদর দপ্তর। ক্লাসিক থিয়েটারে অমর দত্তর ‘আলিবাবা’ এবং অন্যান্য নাটকের ছবি তুলে এবং দেখিয়ে তখন বেশ নাম করেছেন হীরালাল সেন। ১৯০৫ সালে টাউন হলে বঙ্গভঙ্গ–বিরোধী ঐতিহাসিক সভা এবং মিছিলের চলমান ছবি ক্যামেরায় ধরার পর সেই সুনাম আরও বেড়েছিল। ১৯০৭ সালে প্যাথে যখন কলকাতায় কাউকে তাদের এজেন্সি দিয়ে ভারতে তাদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি বন্ধ করতে চাইল, তখন হীরালাল সেনই ছিলেন তাদের প্রথম পছন্দ। প্রস্তাবটি যে কতটা লাভজনক তা ভালই বুঝেছিলেন হীরালাল। কিন্তু তার জন্যে যে টাকার দরকার, কিছুতেই তা বার করতে রাজি হলেন না রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানিতে হীরালালের অংশীদার ভাই মোতিলাল। প্যাথে ইন্ডিয়ার এজেন্সি পেল ম্যাডানের এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ। তার সঙ্গে পেল প্যাথের হাতে থাকা যাবতীয় ছায়াছবি। ফলে ময়দানে সিনেমা–তাঁবুর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ল।
ম্যাডান অবশ্য এখানেই থেমে থাকার পাত্র ছিলেন না। তাঁর মাথায় ঘুরছে ছায়াছবিতে অর্থ বিনিয়োগের একটি বিশদ ও সুসংহত পরিকল্পনা। নিজেদের প্রদর্শনীর চাহিদা মেটাতে একদিকে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু কিছু ছায়াছবি নির্মাণের খরচ যোগাচ্ছেন তিনি। এলফিনস্টোন বায়োস্কোপের ব্যানারে তখন তৈরি হয়েছে ‘বেদিং ঘাট হাওড়া’ (১৯০৪), ‘বেঙ্গলি ফিশারম্যান’ (১৯০৪), ‘গ্র্যান্ড মেসোনিক প্রসেশন’ (১৯০৬), ‘রয়্যাল ভিজিট টু ক্যালকাটা’ (১৯০৬), ‘ডান্সিং অফ ইন্ডিয়ান নচ গার্লস’ (১৯০৬), ‘গোট স্যাক্রিফাইস অ্যাট কালীঘাট’ (১৯০৬), বা ‘আমির অফ কাবুল’স প্রসেশন’ (১৯০৭)–এর মতো অতি–স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি। এসব ছবির কোনোটিতেই পরিচালকের নামের হদিশ নেই। তবে ‘ওপেনিং অ্যান্ড ক্লোজিং অফ হাওড়া ব্রিজ’ (১৯০৫)–এর পরিচালক হিসেবে নথিভুক্ত চিত্রশিল্পী জ্যোতিষ সরকারের নাম। এই সব ছবি যে সত্যি সত্যিই ম্যাডানের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল, সে ব্যাপারে অবশ্য নিশ্চিত হওয়া মুশকিল। কারণ, প্যাথে ইন্ডিয়ার এজেন্সি ম্যাডানের হাতে যাওয়ার আগে প্যাথে–র প্রযোজনায় তৈরি বেশ কিছু ভারতীয় ছায়াছবি ভুল করে এলফিনস্টোন বায়োস্কোপের প্রযোজনা হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে গেছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন–বিরোধী সভার হীরালাল সেনের তোলা তথ্যচিত্রটিও নির্বাক যুগের ভারতীয় সিনেমা সম্পর্কিত কিছু কিছু গবেষণাপত্রে, এমনও কি গ্রন্থেও, এলফিনস্টোনের প্রযোজনার স্বীকৃতি পেয়েছে। অথচ ১৯০৭ সালে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে হীরালাল সেনের ছবি বলে ‘প্রফুল্ল’ নাটকের বিরতিতে ক্লাসিক থিয়েটারে দেখানো হত ওই তথ্যচিত্রটি।
প্যাথে ফ্রেরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ম্যাডান কিছুদিনের মধ্যেই হলিউডের ছবির প্রদর্শনী–স্বত্ব কিনে উপমহাদেশের বিভিন্ন শহরে সে–সব ছবি দেখানো শুরু করলেন। হলিউডের বৃহত্তম প্রযোজক–পরিবেশকদের সঙ্গে ম্যাডানের চুক্তির শর্ত ছিল, ভারতের বাজারে তাঁকে ছাড়া আর কাউকেই ছবি দেওয়া চলবে না। ফলে হলিউডের সেরা–সেরা ছবির ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেছিলেন ম্যডান। 
এরই মধ্যে ১৯০৭ সালে কলকাতার চৌরঙ্গি প্লেসে এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস নামে স্থায়ী প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করেছেন ম্যাডান। ঐতিহাসিক এই সিনেমা হলটির পরে নাম হয় মিনার্ভা, আরও পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মালিকানায় চ্যাপলিন নামে কিছুদিন চলার পর এখন বন্ধ হয়ে আছে। এ ছাড়া কলকাতায় প্যালেস অফ ভ্যারাইটিজ (এখন এলিট), ইলেকট্রিক থিয়েটার (এখন রিগ্যাল), কর্নওয়ালিস থিয়েটার (পরে শ্রী), ক্রাউন সিনেমা (পরে উত্তরা)–র মতো বেশ কিছু প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করেছিলেন তিনি, কিনে নিয়েছিলেন অপেরা হাউস (পরে গ্লোব)। শুধু কলকাতাই নয়, উপমহাদেশের শহর থেকে শহরে তখন ছায়াছবি প্রদর্শনীর সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছেন ম্যাডান, হয় সরাসরি প্রেক্ষাগৃহ কিনে, অথবা লিজ নিয়ে। মাদ্রাজের এলফিনস্টোন যেমন। ১৯১৫ সালে মাদ্রাজের মিসকুইথ বিল্ডিং সংস্কার করে সেখানে এলফিনস্টোন নামে একটি বিলাসবহুল সিনেমা হল তৈরি করলেন ম্যাডান। এলফিনস্টোনেই প্রথম ব্যালকনি দেখেছিল মাদ্রাজ। ১৯১৭ সালে মরিস ব্যান্ডম্যান কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধল ম্যাডানের ফার ইস্টার্ন ফিল্মস, তৈরি হল এক্সেলসিয়র সিনেম্যাটোগ্রাফ সিন্ডিকেট। ছায়াছবি আমদানির সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন সংস্থা এক্সেলসিয়র আর এম্পায়ার নামে প্রেক্ষাগৃহের জাল ছড়াল উপমহাদেশ জুড়ে।
তবে ছায়াছবির পরিবেশন ও প্রদর্শনীতে যতটা নিবেদিত ছিলেন ম্যাডান, নির্মাণ ও প্রযোজনায় বোধ হয় ততটা নয়। অন্তত ১৯১৭ পর্যন্ত তো নয়ই। ঐতিহাসিক বা আবেগের বিচারে ভারতীয় কাহিনীর আধারে নির্মিত পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের গুরুত্ব ম্যাডান যেমন বোঝেননি, তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার হদিশ পেতেও অনেক দেরি হয়েছিল তাঁর। যদিও শৈশব থেকে যৌবন— তিনি নিজেই ছিলেন নাটকে নিমজ্জিত। এবং পরিস্থিতিও তাঁর পক্ষে ছিল যথেষ্ট অনুকূল। যন্ত্র এবং প্রযুক্তি, অর্থবল, লোকবল, অভিজ্ঞতা, সবই তাঁর ছিল। ছিল না শুধু ধমনিতে নিরন্তর বয়ে চলা শিল্পসৃষ্টির তাগিদ। ম্যাডানের সে–তাগিদ থাকলে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রথম ভারতীয় হওয়ার শিরোপাটি কিছুতেই পেতেন না ধুন্দিরাজ গোবিন্দ ফালকে। সঙ্গতিই ছিল না তাঁর, ছিল শুধু সৃষ্টি আর নির্মাণের তীব্র আবেগ। তারই তাড়নায় ঘটিবাটি বাঁধা রেখে ফালকে নেমে পড়েছিলেন অসাধ্যসাধনে। তৈরি করেছিলেন প্রথম ভারতীয় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ (১৯১২)।
তার পরেও পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ভারতীয় ছায়াছবির সাফল্যের স্থায়িত্ব বুঝতে যথেষ্ট সময় নিয়েছিলেন সাবধানি ব্যবসায়ী ম্যাডান। ফালকে তাঁর প্রথম ছবি করার বছর দুয়েকের মধ্যেই শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সেই অনিশ্চিত সময়ে ভারতীয় কাহিনী–নির্ভর ছায়াছবির মতো নতুন ক্ষেত্রে লগ্নি সম্পর্কে হয়ত দ্বিধা গভীর ছিল তাঁর। কিন্তু ফালকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সফল গাড়ি–ব্যবসায়ী রঙ্গরাজ নটরাজ মুদালিয়র ততদিনে মাদ্রাজের মিলার’স রোডে স্টুডিও বানিয়ে শুরু করেছেন ‘কীচক বধম্’ (১৯১৭)। কোলাপুর–নৃপতি শাহু মহারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় বাবুরাও পেইন্টার সেখানে চালু করেছেন মহারাষ্ট্র ফিল্ম কোম্পানি। ইতিমধ্যে তিনটি ছবি সম্পূর্ণ করে বম্বেতে ফালকে নিজেও আবার ব্যস্ত ‘লঙ্কাদহন’ (১৯১৭)–এর কাজে।
ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে এরকম একের পর এক লগ্নি দেখে ম্যাডানও আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারলেন না। তাঁর নিজেরই মালিকানার দুই নাট্যসংস্থা এলফিনস্টোন নাটকমণ্ডলী আর অ্যালফ্রেড থিয়েটারের অভিনেতা–অভিনেত্রীদের নিয়ে কলকাতায় শুরু করলেন পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’। নিজের প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রাখতে রাজা হয়েও হরিশ্চন্দ্রের ভয়ানক কৃচ্ছ্রসাধন এবং সব শেষে পরিবার এবং সমস্ত প্রজা সমেত তাঁর অক্ষয় স্বর্গবাসের কাহিনী। রাজা হরিশ্চন্দ্রের ভূমিকায় নির্বাচিত হলেন ‘‌ভারতীয় মঞ্চের আরভিং’‌ হরমুসজি তন্ত্রা এবং রানি হরিমতীর ভূমিকায় অভিনয় করলেন ‘‌আবেগ–উচ্ছল সুন্দরী শ্রেষ্ঠা’‌ সাভারিয়া। ইতালীয় দম্পতি মানেলিদেরও দেখা গেল দুটি ভূমিকায়। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ালেন চিত্রশিল্পী জ্যোতিষ সরকার। ছবি পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন ম্যাডানের জামাই রুস্তমজি ধোতিওয়ালা, সমস্ত ব্যবসায়িক উদ্যোগেই যিনি ছিলেন ম্যাডানের সবচেয়ে আস্থাভাজন।
ময়দানের তাঁবুতেই ১৯১৭ সালের ২৪ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল প্রায় দু–ঘণ্টার ছবি ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’ আর, ব্যবসাও করেছিল ভাল। হিন্দু–পুরাণের কাহিনীকে তাই নির্দ্বিধায় ভারতীয় বক্স–অফিসের প্রথম সাকসেস–ফর্মুলা বলা যায়। কিন্তু ৫ রিলের ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’র আসল গুরুত্ব কলকাতায় তৈরি প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি হিসেবে। চলচ্চিত্র উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যে এমন চুপিচুপি তার শতবর্ষ পেরিয়ে যাবে— না, এতটা অবহেলা বোধহয় প্রত্যাশিত ছিল না!
প্রথম ছবির বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চয়ই ছায়াছবি নির্মাণে লগ্নির ব্যাপারে ম্যাডানের যাবতীয় দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। বিশ্বযুদ্ধ থামার আগেই তিনি চলচ্চিত্র শিল্পে লগ্নির জন্য একটা বাণিজ্য সংগঠন তৈরি করে ফেললেন। এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ আর এক্সেলসিয়র সিনেম্যাটোগ্রাফকে এক ছাতার তলায় এনে ম্যাডান প্রতিষ্ঠা করলেন জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ম্যাডান থিয়েটার্স। টালিগঞ্জে স্থাপিত হল ম্যাডান থিয়েটার্সের স্টুডিও। ১ নভেম্বর ১৯১৯ ম্যাডান সাম্রাজ্যেরই এক প্রেক্ষাগৃহ কর্নওয়ালিস থিয়েটারে মুক্তি পেল ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রথম ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’। ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’‌র মতো ‘বিল্বমঙ্গল’–এরও পরিচালক রুস্তমজি ধোতিওয়ালা, অভিনয় করেছেন ম্যাডানেরই নাট্যসম্প্রদায়ের অভিনেতা–অভিনেত্রীরা। ম্যাডান থিয়েটার্স বিল্বমঙ্গল–এর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল গোটা উপমহাদেশ জুড়ে। তারপর থেকে ছবির পর ছবি প্রযোজনা করে বিপুল দাপটে ম্যাডান থিয়েটার্স রাজত্ব করে গেল নির্বাক যুগের বাকি সময়টা। এমনকী, সবাক যুগে ঢুকেও চিত্র–প্রযোজনায় টিকে থেকেছে ম্যাডান থিয়েটার্স, সেই ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি ছবি তৈরি হয়েছে ম্যাডান  থিয়েটার্সের ব্যানারে, সবাক এবং রঙিন সমেত। ম্যাডান থিয়াটার্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শেঠ সুখলাল কারনানি সেই স্টুডিও কিনেই নাম দিয়েছিলেন ‘‌ইন্দ্রপুরী’‌। তার ১৪ বছর আগে, ১৯২৩ সালে, অবশ্য মারা গিয়েছেন জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডান।
ম্যাডান থিয়েটার্স শুরুর দিকে পরপর তৈরি করেছে ‘মহাভারত’ (১৯২০), ‘মা দুর্গা’ (১৯২১), ‘ধ্রুব চরিত্র’ (১৯২১) বা ‘নল দময়ন্তী’র (১৯২১) মতো পৌরাণিক ছবি। পরিচালক কে? না, জ্যোতিষচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বাংলা চলচ্চিত্রের আদি গবেষক কালীশ মুখোপাধ্যায়ের ভাষ্যে, ম্যাডান থিয়েটার্সের হিসাবরক্ষক। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকের গুরুত্ব বুঝতে খুব একটা সময় নেননি ম্যাডান। কিছুদিনের মধ্যেই ইতালি থেকে চলচ্চিত্র–কুশলী এনে তাঁদের হাতেই চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দায়িত্ব তুলে দেন। ‘ধ্রুব চরিত্র’ এবং ‘নল দময়ন্তী’–তে তাই পরিচালক হিসেবে জ্যোতিষচন্দ্রের সঙ্গেই নাম পাওয়া যাচ্ছে ইউজেনিও দ্য লিগুওরো নামে এক ইতালীয় পরিচালকের। না বললেও চলে, ইতালি থেকে পরিচালক এবং কলাকুশলী ধরে আনাটা নেহাতই ঠাট্টা ছিল না! এ সব ছবিতে জ্যোতিষবাবু বড়জোর ছিলেন এখনকার ভাষায়, অনলাইন প্রোডিউসার। দুটি ছবিই বেশ ব্যয়বহুল, ‘নল দময়ন্তী’–তে স্বর্গের মেরুপর্বতে নারদের ল্যান্ডিং তো রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল। বোম্বাইতে মুক্তির পর ইউরোপ–আমেরিকার ছবির সঙ্গে তুলনা করে প্রশংসা করেছিল টাইমস অফ ইন্ডিয়া (১৯ জানুয়ারি ১৯২১)।
লিগুওরো একাই নন, ম্যাডান থিয়েটার্সের অন্য দুটি ছবি ‘শিবরাত্রি’ (১৯২১) এবং ‘রত্নাবলী’র (১৯২২) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরেক ইতালীয় পরিচালক কামিলে দ্য গ্রান্দ। ইতালির আকর্ষণ এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল তখন ম্যাডানের কাছে যে, ভারত–ইতালি যৌথ উদ্যোগে ছবি তৈরিতেও হাত দিলেন তিনি। রোমের ইউনিয়ন সিনেম্যাটোগ্রাফিয়া ইতালিয়ানা এবং কলকাতার ম্যাডান থিয়েটার্স প্রযোজিত ‘সাবিত্রী সত্যবান’ (১৯২৩) নামে সেই ছবি ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম যৌথ উদ্যোগ। পরিচালক জর্জিও মান্নিনি ‘সাবিত্রী সত্যবান’–এর পুরো শ্যুটিংই করেছিলেন রোমে। অভিনেতা–অভিনেত্রী ও কলাকুশলীরা সবাই ইতালীয়। সেখানেই সম্পাদনা এবং সমস্ত কারিগরি কাজ শেষ করে ছবি প্রথম দেখানো হয়েছে প্রথমে ইউরোপে, পরে ভারতে।
সারা দেশে ছড়ানো পরিবেশন এবং প্রদর্শনীশৃঙ্খলের সৌজন্যে ম্যাডান থিয়েটার্সের শুরুর দিকে ব্যবসা যত ভালই করুক, কলকাতার শিক্ষিত ভদ্রলোক বাঙালিদের কিন্তু মোটেই খুশি করতে পারেনি। কাহিনী পুরাণের হলেও, তাতে ভারতীয়ত্ব যত আছে, বাঙালিত্ব তাঁর কানাকড়িও নেই। অভিনেতা–অভিনেত্রীরা একে পার্সি, তায় নাটকের। ইউরোপীয় আর মার্কিন ছবি দেখে শিক্ষিত বাঙালির যা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তখন, তা একেবারেই মেটাতে পারেনি ম্যাডান থিয়েটার্সের প্রথম দিকের ছবি। সেই প্রত্যাশাকে মর্যাদা দিতেই ম্যাডান থিয়েটার্স ঝুঁকল বাংলা সাহিত্যের দিকে, আর প্রথমেই ধরা হল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ (১৯২২)। পরের বছরেই মৃত্যু হয়েছিল ম্যাডানের। কিন্তু তাঁর আমলেই শুরু করা ধারায় তখন পরপর হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৯২৭), বা ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৯২৯), মাঝখানে গিরিশ ঘোষের ‘প্রফুল্ল’ (১৮২৬)। তারও পরে মিউনিখের এমেলকা স্টুডিওতে হাতেকলমে চলচ্চিত্রের কাজ শিখে এসে শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী মধু বোস ম্যাডানের প্রযোজনায় বানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গিরিবালা’ (১৯২৯) এবং ‘ডালিয়া’ (১৯৩২)।
ম্যাডান জীবিত থাকতেই ছবি পরিচালনা এবং অভিনয় করতে ম্যাডান থিয়েটার্স ডেকেছে কলকাতার তখনকার নাট্যমঞ্চে উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে। ‘মোহিনী’ (১৯২১) নামের সেই ছবির নায়িকা ছিলেন পেশেন্স কুপার। আদতে কলকাতার সুন্দরী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, কিন্তু আই–লেভেল লাইটিংয়ে তাঁর মুখেই হলিউড নায়িকার বিভা খুঁজে পেতেন ভারতীয় দর্শক।
সুরেশচন্দ্র ঘোষ (দানীবাবু), অহীন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (মহর্ষি), প্রভা দেবী, নিভাননী দেবী, কমলমণিরাও সব কাজ করেছেন ম্যাডান থিয়েটার্সের ছবিতে। মাত্র ১০ বছর বয়সে কানন দেবীকে অভিনয়ের প্রথম সুযোগ দিয়েছিল জ্যোতিষচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ম্যাডানের ছবি ‘জয়দেব’ (১৯২৬)। তার পর থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত একটানা মাড্যান থিয়েটার্সে কাজ করেছেন কানন দেবী, হয়ে উঠেছেন বাংলা ছায়াছবির প্রথম তারকা। প্রথম বাংলা সবাক ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’ (১৯৩১)–ও তৈরি করেছে ম্যাডান থিয়েটার্স। আর ‘হিসাবরক্ষক’ জ্যোতিষচন্দ্র? চলচ্চিত্রের ভাষাটি নিশ্চয়ই আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। নইলে ১৯২১ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত মোট ৬৮টি ছবি পরিচালনা করেছেন কী করে!
১৯২৩ সালে ম্যাডানের মৃত্যুর সময় তাঁর সংস্থার হাতে প্যারামাউন্ট, ফক্স, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো হলিউডের বৃহত্তম কোম্পানিগুলির সঙ্গে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া জুড়ে ফিল্ম আমদানি ও প্রদর্শনীর একচ্ছত্র অধিকার। ভারত, বার্মা, সিংহল জুড়ে ছড়ানো শতাধিক প্রেক্ষাগৃহ। সারা দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করে যা আয় হয়, তার অর্ধেক তখন ম্যাডান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। গোটা উপমহাদেশের চলচ্চিত্র বাণিজ্যে এরকম দাপট তখন আর কারও নেই। চলচ্চিত্রে নতুন দিশার জন্যে তখন সবাই কলকাতারই দিকে তাকিয়ে, কলকাতাই তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের রাজধানী।
অথচ, ম্যাডানের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যে অবস্থাটা সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। ততদিনে বিলেত থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বাংলার চলচ্চিত্রগগনে উদিত হয়েছেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার, চালু হয়েছে নিউ থিয়েটার্স। সেই সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করে মধু বোস তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন’–এ লিখছেন, ‘‌৫নং ধর্মতলা স্ট্রিটে ম্যাডানের আপিসের কাচের ঘরে আমার ছিল অবারিত দ্বার। সেদিন ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম রুস্তমজি (ধোতিওয়ালা) খুব উত্তেজিতভাবে গুজরাতি ভাষায় বার্জোরজি, জাহাঙ্গীরজি এবং অন্যদের বলছেন, এইসব গরিব কর্মচারীর আর করিন্থিয়ান থিয়েটারের স্টাফদের মাইনে কমিয়ে দিয়ে কি ম্যাডান কোম্পানিকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? যেভাবে দেনা করা হয়েছে... রুস্তমজির কয়েকটি কথায় যা বুঝলাম, তাতে মনে হল যে তিনি ম্যাডান কোম্পানির শোচনীয় অবস্থার কথা বলছেন। ... আমি আমতা আমতা করে বললাম, আজ আপনাকে বড় চিন্তিত দেখছি। রুস্তমজি ঠিক কী বলেছিলেন, আজ আর তা হুবহু মনে নেই। তবে এইটাই আমায় বুঝিয়ে দিলেন, ম্যাডান কোম্পানি আর বেশি দিন নেই।’‌
সেই আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের মধ্যেই পতন সম্পূর্ণ হয়েছিল মহাপ্রতাপশালী ম্যাডান সাম্রাজ্যের। কিন্তু সেই ট্র্যাজিক বাণিজ্যিক পরিণতির চেয়ে ঢের বেশি ভয়ঙ্কর এই বিস্মরণ। কলকাতায় তৈরি প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শতবর্ষে কেউ ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’–এর নামও করে না। আর তার ভারত বিখ্যাত প্রযোজক জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডান আজকের কলকাতায় বিস্মৃত তো বটেই, প্রায় অচেনা একটি নাম।‌‌‌‌

l ১ পাতার পর 
প্রথম দিকের ছবি। সেই প্রত্যাশাকে মর্যাদা দিতেই ম্যাডান থিয়েটার্স ঝুঁকল বাংলা সাহিত্যের দিকে, আর প্রথমেই ধরা হল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ (১৯২২)। পরের বছরেই মৃত্যু হয়েছিল ম্যাডানের। কিন্তু তাঁর আমলেই শুরু করা ধারায় তখন পরপর হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৯২৭), বা ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৯২৯), মাঝখানে গিরিশ ঘোষের ‘প্রফুল্ল’ (১৮২৬)। তারও পরে মিউনিখের এমেলকা স্টুডিওতে হাতেকলমে চলচ্চিত্রের কাজ শিখে এসে শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী মধু বোস ম্যাডানের প্রযোজনায় বানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘গিরিবালা’ (১৯২৯) এবং ‘ডালিয়া’ (১৯৩২)।
ম্যাডান জীবিত থাকতেই ছবি পরিচালনা এবং অভিনয় করতে ম্যাডান থিয়েটার্স ডেকেছে কলকাতার তখনকার নাট্যমঞ্চে উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব শিশিরকুমার ভাদুড়ীকে। ‘মোহিনী’ (১৯২১) নামের সেই ছবির নায়িকা ছিলেন পেশেন্স কুপার। আদতে কলকাতার সুন্দরী অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, কিন্তু আই–লেভেল লাইটিংয়ে তাঁর মুখেই হলিউড নায়িকার বিভা খুঁজে পেতেন ভারতীয় দর্শক।
সুরেশচন্দ্র ঘোষ (দানীবাবু), অহীন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য (মহর্ষি), প্রভা দেবী, নিভাননী দেবী, কমলমণিরাও সব কাজ করেছেন ম্যাডান থিয়েটার্সের ছবিতে। মাত্র ১০ বছর বয়সে কানন দেবীকে অভিনয়ের প্রথম সুযোগ দিয়েছিল জ্যোতিষচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ম্যাডানের ছবি ‘জয়দেব’ (১৯২৬)। তার পর থেকে ১৯৩২ পর্যন্ত একটানা মাড্যান থিয়েটার্সে কাজ করেছেন কানন দেবী, হয়ে উঠেছেন বাংলা ছায়াছবির প্রথম তারকা। প্রথম বাংলা সবাক ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’ (১৯৩১)–ও তৈরি করেছে ম্যাডান থিয়েটার্স। আর ‘হিসাবরক্ষক’ জ্যোতিষচন্দ্র? চলচ্চিত্রের ভাষাটি নিশ্চয়ই আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। নইলে ১৯২১ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত মোট ৬৮টি ছবি পরিচালনা করেছেন কী করে!
১৯২৩ সালে ম্যাডানের মৃত্যুর সময় তাঁর সংস্থার হাতে প্যারামাউন্ট, ফক্স, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো হলিউডের বৃহত্তম কোম্পানিগুলির সঙ্গে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া জুড়ে ফিল্ম আমদানি ও প্রদর্শনীর একচ্ছত্র অধিকার। ভারত, বার্মা, সিংহল জুড়ে ছড়ানো শতাধিক প্রেক্ষাগৃহ। সারা দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করে যা আয় হয়, তার অর্ধেক তখন ম্যাডান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। গোটা উপমহাদেশের চলচ্চিত্র বাণিজ্যে এরকম দাপট তখন আর কারও নেই। চলচ্চিত্রে নতুন দিশার জন্যে তখন সবাই কলকাতারই দিকে তাকিয়ে, কলকাতাই তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের রাজধানী।
অথচ, ম্যাডানের মৃত্যুর দশ বছরের মধ্যে অবস্থাটা সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। ততদিনে বিলেত থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বাংলার চলচ্চিত্রগগনে উদিত হয়েছেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার, চালু হয়েছে নিউ থিয়েটার্স। সেই সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করে মধু বোস তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন’–এ লিখছেন, ‘‌৫নং ধর্মতলা স্ট্রিটে ম্যাডানের আপিসের কাচের ঘরে আমার ছিল অবারিত দ্বার। সেদিন ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম রুস্তমজি (ধোতিওয়ালা) খুব উত্তেজিতভাবে গুজরাতি ভাষায় বার্জোরজি, জাহাঙ্গীরজি এবং অন্যদের বলছেন, এইসব গরিব কর্মচারীর আর করিন্থিয়ান থিয়েটারের স্টাফদের মাইনে কমিয়ে দিয়ে কি ম্যাডান কোম্পানিকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? যেভাবে দেনা করা হয়েছে... রুস্তমজির কয়েকটি কথায় যা বুঝলাম, তাতে মনে হল যে তিনি ম্যাডান কোম্পানির শোচনীয় অবস্থার কথা বলছেন। ... আমি আমতা আমতা করে বললাম, আজ আপনাকে বড় চিন্তিত দেখছি। রুস্তমজি ঠিক কী বলেছিলেন, আজ আর তা হুবহু মনে নেই। তবে এইটাই আমায় বুঝিয়ে দিলেন, ম্যাডান কোম্পানি আর বেশি দিন নেই।’‌
সেই আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের মধ্যেই পতন সম্পূর্ণ হয়েছিল মহাপ্রতাপশালী ম্যাডান সাম্রাজ্যের। কিন্তু সেই ট্র্যাজিক বাণিজ্যিক পরিণতির চেয়ে ঢের বেশি ভয়ঙ্কর এই বিস্মরণ। কলকাতায় তৈরি প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছায়াছবির শতবর্ষে কেউ ‘সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র’–এর নামও করে না। আর তার ভারত বিখ্যাত প্রযোজক জামশেদজি ফ্র্যামজি ম্যাডান আজকের কলকাতায় বিস্মৃত তো বটেই, প্রায় অচেনা একটি নাম।‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top