রেবা রক্ষিত

ছেলেবেলা থেকেই আমি একটু ডানপিটে ধরনের। গাছে চড়া, সাঁতার কাটা— আরও যে–সব কাণ্ডকারখানা করে বেড়াতাম, তাকে ঠিক নারীসুলভ বলা যায় না। কুমিল্লা শহরে, তালপুকুর পাড়ে বাড়ি ছিল আমাদের। খুব ছোট বয়সে দেশ ছেড়েছি, অবশ্য। একেবারে ক্লাস ওয়ান–‌টুতে পড়বার সময়। কিন্তু তারই মধ্যে সাঁতার–‌টাতার সব শেখা হয়ে গেছে। পূর্ববাংলার গাছপালা–‌জল–‌জঙ্গলের পরিবেশে একেবারে ছিন্ন–‌বাঁধন হয়ে ঘুরে বেড়াতাম সেই বালিকা বয়সেই। বাড়ির অন্য ভাইবোনেরা যে খেলাধুলোয় খুব উৎসাহী ছিল তা কিন্তু নয়। সে হিসেবে  আমি বরং একটু গোত্রছাড়াই ছিলাম। ছোট বয়স থেকে নানাভাবে খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকেছি শুধু আমি–‌ই। বাবা ইনস্যুরেন্সে কাজ করতেন কুমিল্লায়। তাঁরও যে খুব উৎসাহ ছিল এসব ব্যাপারে সে–‌কথা বলতে পারব না। তবে, আমার মা খুব ভালবাসতেন এই একটু অন্যরকম ভাবে বড় হয়ে উঠতে চাওয়া।
কলকাতায় এসেই প্রথমে যোগ ব্যায়ামের চর্চা শুরু করিনি। তখন যেতাম ‘‌জাতীয় ক্রীড়া ও শক্তি সংঘ’‌। শম্ভু মল্লিক ব্যায়াম–‌চর্চা বলে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। উনিই ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া ও শক্তি সংঘের কর্ণধার। তাঁদের সঙ্গে নানা জায়গায় ক্যাম্পে গেছি, রাইফেল চালানো শিখেছি— খুব ভাল লাগত এ সব কিছুই। তার পর, মায়ের গুরুদেব একেবারে হাত ধরে নিয়ে এলেন বিষ্টু ঘোষের আখড়ায়। তখন আমার বয়স এগার।
বিষ্টুদার আখড়া তখন জমজমাট। তাঁর ছাত্রদের— মনোতোষদা, কমলদা, শান্তিদা— তখনই খুব নাম। সেদিন বোধহয় কোনও অনুষ্ঠানও ছিল। অনেক মেয়েরা এসেছেন। বিষ্টুদার অনেক ছাত্র–ছাত্রীরাও। গুরুদেবের সঙ্গে আমাকে দেখে তিনি, মনে আছে, জিজ্ঞেস করেছিলেন— আসন করবে?‌
আসন?‌ সে কেমন করে করতে হয়?‌ আমি তো কিছুই জানি না।
বিষ্টুদা বললেন, আমি শিখিয়ে দেব। 
তার পর অনেকদিন আর ও–‌মুখো হইনি। দাদু–‌ই একদিন বললেন, আজ বিকেলে আবার নিয়ে যাব। 
বললাম, না বাবা, ইস্কুল থেকে ফিরেই ব্যায়াম। আমার বড্ড ক্ষিদে পায়। দাদু বললেন, চল, কলা আর পাউরুটি খাওয়াব। কলা আর পাউরুটি?‌ তা হলে আমি রাজি!‌
ইস্কুল থেকেই— প্যারীচরণ গার্লস— সোজা গেলাম জিমনাসিয়ামে। বিষ্টুদা বললেন, এতদিন আসনি কেন?‌ 
ব্যায়ামবিদদের যা সব মাসল ফোলানো চেহারা। ভাবছি এখানে এলে এরকম চেহারা হয়ে যাবে হয়তো। 
বিষ্টুদা হেসে বললেন, মেয়েদের চেহারা অমন হয় নাকি। আমি তোমাকে আসন শেখাব। চল।
বিষ্টুদা হঠাৎ একদিন টু–‌টু রাইফেল একটা বের করে বললেন, রাইফেল শুটিং শিখবে?‌ আমি তো আগেই ট্রেনিং নিয়েছিলাম রাইফেলের। সেই যখন প্যারেড–‌ট্যারেড করতাম। তাই এমন একটা প্রস্তাবে এক পায়ে খাড়া হয়ে গেলাম। অশেষ ক্ষমতা ছিল বিষ্টুদার। কাকে দিয়ে কতটুকু করিয়ে নিতে পারবেন, সেটা খুব ভাল বুঝতেন। এই রাইফেল শুটিঙেই আমি সোনা আনলাম কাশিমবাজারের রাইফেল ক্লাবের প্রতিযোগিতা থেকে।
বিষ্টুদার সঙ্গে প্রথম বাইরে গেলাম চন্দননগরে। সেই আমার প্রথম স্টেজে নামা। সালটা হবে ১৯৫১–‌৫২। আসন যতই সোজা হোক, হাততালির কিছু কমতি হল না। এক্কেবারে নেশা ধরে গেল।
কিন্তু গোটা কয়েক ‘‌শো’–‌এর পর মা বেঁকে বসলেন। সপ্তাহে দুটো তিনটে শো করতেন বিষ্টুদা।  মা বললেন, এভাবে চললে লেখাপড়া তো ডকে উঠবে। আর আসন শিখতে হবে না। এবারও গুরুদেব উদ্ধারকর্তা হয়ে এলেন। ‌বললেন, বিকেলে কয়েক ঘণ্টার জন্য যাবে তাতে পড়াশোনার কী ক্ষতি হবে?‌
এভাবেই বিষ্টুদার সঙ্গে রয়ে গেলাম।
তুই বুকে মোটর সাইকেল তুলবি। বিষ্টুদা প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন। আমি বললাম, ওরে বাবা!‌ আমি পারব না। আমি মরে যাব!‌ বিষ্টুদা বললেন, কিচ্ছু মরবি না। ঠিক পারবি। নিজের ইচ্ছাশক্তি চারিয়ে দিতে পরতেন বিষ্টুদা ছাত্রদের মধ্যে। আর এমন মনের জোর ছিল!‌ তাঁর সেই জোরের কাছে শুভাশুভের দায় আমরা নিশ্চিন্তে অর্পণ করতে পারতাম। তাই বিষ্টুদা যখন বললেন, বুকে মোটর–‌সাইকেল তুলবার জন্য এবার আমাকে বেশি বেশি করে প্রাণায়াম করে আসন করে তৈরি হতে হবে,  তখন আমি মনে মনে প্রস্তুত হয়েই গেলাম। 
বছর চোদ্দো–‌পনেরো বয়স তখন। তিন–চার বছর ধরে প্রদর্শনী  করছি। আসনটাসন দেখাচ্ছি। মোটর–‌সাইকেল যেদিন সত্যি সত্যি চলে গেল বুকের ওপর দিয়ে, আমার অনুভূতিবোধ অসাড় হয়ে গিয়ে থাকবে। কিছুই বুঝিনি সেদিন। কিচ্ছু না। ভয়, ভীতি, উদ্‌বেগ, উত্তেজনা— কিছুই মনে ছিল না। বিষ্টুদা বলেছিলেন, অল্প একটু নিঃশ্বাস নিয়ে শ্বাসটা বন্ধ করে রাখবে। আর কিচ্ছু করতে হবে না তোমাকে। দেখো, যেন নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দিয়ো না। পরে তো নিজেই বুঝতাম কতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে রাখব, কতটুকু আটকে রাখব। কিন্তু সেই প্রথম দিনে, অথবা  তারপরেও কিছুদিন, ওঁকেই বলে দিতে হত, ‘‌‘‌সাইকেল চলে গেলে বুঝতেই তো পারবি। তখন নিঃশ্বাস ছেড়ে দিবি।’‌’‌
মোটর সাইকেল তুলতে ভার বহনের ব্যাপারটা বিশেষ থাকে না। এ তো আর হাতি নয় যে হেলেদুলে আসবে, বুকের ওপর একটু দাঁড়াবে। তার পর দুলকি চালে নেমে যাবে।
মোটর সাইকেল স্পিডে এসে জাম্প করে। তাই ওজনের একটা অংশমাত্র শরীরে লাগে। সাংঘাতিক কিছু নয়। আসল হল ঝাঁকুনি— ‌জার্কিং। সেই ঝাঁকুনি সহ্য করবার জন্যই দমবন্ধ রাখতে হয়।
একটা ‌ঘটনা খুব মনে আছে। উষা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে প্রতি বছর ঘটা করে বিশ্বকর্মা পুজো হয়। এক বছর আমরা গেছি ‘‌শো’‌ করতে। বিশাল প্যান্ডেল হয়েছে। পঞ্চাশ হাজার মানুষের বসবাস ব্যবস্থা। আর এই রকম প্যান্ডেলে ‘‌শো’‌ করতে গেলে একটা স্টেজ বানাতেই হবে। সেদিন আবার পি সি সরকারও ‘‌শো’‌ করবেন। প্যান্ডেলের সামনে ছোট্ট একটু জায়গায় মঞ্চ হয়েছে। বিষ্টুদা বললেন, এই জায়গাটুকুর মধ্যে ‘‌শো’‌ করতে হবে। বড্ড অল্প জায়গা। আমার কেমন ভয় করছিল। শেষে কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না তো?‌ বিষ্টুদা বললেন, সে দায়িত্ব তো আমার।
মোটর সাইকেল চালাতেন বিষ্টুদার খুব প্রিয় ছাত্র প্রভাসদা। তাঁর মোটর সাইকেলটা ছিল বুইক গাড়ির মতো ভারি, চওড়া টায়ার। প্রভাসদাকেও বললাম, আজ একটা কিছু হবে। প্রভাসদা বললেন, আমি কিছু জানি না। তুই বিষ্টুদাকে বল। এই সব বলাবলি করছি, বিষ্টুদা বললেন, শুয়ে পড়। সোজা হয়ে শুয়েছি। দেখি, মাথায় একটা ইঁটমত কী লাগছে, আমি মাথাটা কাত করে দিলাম। সমস্ত ‘‌শো’‌টা মুভি–‌তে ধরে রাখা হবে। বিষ্টুদা বললেন, মাথা ঘোরালি কেন?‌ তোর মুখ দেখা যাবে না। ভাবলাম, কাজ নেই বাবা মুখ দেখিয়ে। ওয়েট যখন উঠবে, ঝাঁকুনিতে মাথা যদি তখন ফুটো হয়ে যায়। ভাগ্যিস, ছবি তোলার লোভে মাথা সোজা করি নি!‌ মন বলছিল একটা কিছু হবে। অথবা হতেও পারে, ভয় পেয়েছিলাম। আমি তো শুয়ে সবই দেখতে পাচ্ছি। মোটর সাইকেল এল। প্রথম চাকাটা বেরিয়ে গেল। দ্বিতীয় চাকাটা একেবারে আমার মুখে এসে ধাক্কা দিল। আমি চোখে অন্ধকার দেখলাম। তাড়াতাড়ি আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। আর চিৎকার!‌ প্যান্ডেল বোঝাই মানুষ তখন চিৎকার করছে। ভেবেছে নির্ঘাত মরে গেছি। জনতার দাবিতে কোনোরকমে স্টেজে নিয়ে আসা হল। মুখটা একেবারে কালো হয়ে গেছে। মুখের পাশে টায়ারের ছাপ। একেবারে যেন খোদাই–‌করা। সেই ছোপ উঠতে প্রায় দু–‌মাস লেগেছিল।
আমার বাবা উপেন্দ্রচন্দ্র রক্ষিত একটু রক্ষণশীল ধরনের মানুষ ছিলেন। মেয়েরা লেখাপড়া, কাজকর্ম শিখবে, ভাল ঘর–‌বরে বিয়ে হবে— এ সবই তিনি স্বাভাবিক মনে করতেন। আর মা, সুহাসিনী রক্ষিত, প্রশ্রয় দিতেন সব রকম ডানপিটেমির। মা ছিলেন সর্ব অর্থেই প্রগতিশীল। তাঁর ছেলেমেয়েরাও মুক্ত হাওয়ায় বেড়ে উঠুক, এটা তিনি চাইতেন। এ–‌কালিনী হলে তিনি হতে পারতেন নারী মুক্তি আন্দোলনের এক পুরোধা কর্মী। আর বিষ্টুদা তো বিশ্বাসই করতেন পড়াশুনা এবং ব্যায়ামচর্চা, পরস্পরের পরিপূরক। আমি তাই ব্যায়ামচর্চা, ওই সব প্রদর্শনী চালিয়ে যেতে থাকলাম। পড়াশোনাও ছাড়লাম না। কলেজে অবশ্য কোনওদিন পড়িনি। ব্যায়াম–‌চর্চাতে যে সময় দিতে হত, তাতে কলেজে নিয়মিত পাঠ সম্ভবও ছিল না। কিন্তু বাড়িতে পড়েই ইন্টারমিডিয়েটস এবং বি এ পাশ করেছি। আমি আবার ইতিমধ্যে শারীরশিক্ষার টিউশানিও শুরু করেছি। বিষ্টুদাই জোগাড়‌‌ করে দিতেন।
বিষ্টুদার সঙ্গে, ওঁর দলের সঙ্গে প্রায় সারা ভারত ঘুরেছি। দক্ষিণ–‌ভারতে অবশ্য যাওয়া হয়নি। সবচেয়ে বেশি ঘুরেছি পূর্ব–‌ভারতে।
জীবনের এক অভিনব অধ্যায় শুরু হল সার্কাসে। বুকের উপর দিয়ে মোটর সাইকেল চলে যাওয়া, সে ততদিনে বেশ রপ্ত হয়েছে। বিষ্টুদার এবার মনে হল, পরীক্ষা করে দেখাই যাক না, রেবা হাতি তুলতে পারে কিনা। এ তো আর প্রভাসদার মোটর সাইকেল নয়, যে এত্তেলা দিলেই হাজির হয়ে যাবে। হাতি কি কলকাতা শহরের পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ায় নাকি যে বিষ্টুদা নির্দেশ দিলেই গুটগুটিয়ে বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাবে?‌ আমি বিশেষ গুরুত্বই দিলাম না।
কিন্তু বিষ্টুদার কাণ্ড!‌ ঠিক জোগাড় করে ফেললেন। শহরে সার্কাস এসেছে। তারই মালিকের সঙ্গে কথাটথা বলে, একেবারে ঠিকঠাক করে এলেন, একদিন সকালে— শো টাইমের বাইরে— বিষ্টুদা আমাকে নিয়ে সার্কাসে যাবেন। ওঁদের একটা বাচ্চা হাতি আছে। পঞ্চাশ–‌ষাট মন ওজন। সেটিকে নিয়েই ট্রায়াল হবে। বিষ্টুদা বলেছেন ভয় নেই, সুতরাং আমার ভয় নেই। কিন্তু বাড়িতে মহা সোরগোল পড়ে গেল। বিষ্টুদা আবার দিদিকেও ডেকেছিলেন সঙ্গে যেতে। দিদি বলল, না বাবা না। ওই লাস্ট ডিক্লারেশন শুনবার জন্য আমি যাব না।
আমি জানতাম, আমাকে যেতেই হবে। বিশেষত বিষ্টুদা যখন বলে এসেছেন। তাঁর কথার খেলাপ তো হতে দিতে পারি না। সেই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাও কিছুই বলতে পারব না। নির্ভার, নির্ভয় ছিলাম— এটুকু মনে আছে। বিষ্টুদা জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেমন লাগছিল, যখন হাতিটা চলে গেল?‌ আমি বলেছিলাম কিছুই বুঝিনি।
এই ট্রায়ালের কথা, কেমন করে জানি না, চাউর হয়ে গেল সার্কাস মহলে। ওই সার্কাস কোম্পানি থেকেই হয়তো হয়ে গিয়ে থাকবে। গ্রেট বম্বে, মাদ্রাজের এক সার্কাস কোম্পানির ইমপ্রেসারিও, পরে জেনেছি দূর সম্পর্কে তিনি আমারই মামা, বিষ্টুদার কাছে এসে হাজির!‌ তিনি শুনেছেন, বিষ্টুবাবুর এক ছাত্রী বুকে হাতি তোলার ট্রায়াল দিয়েছে। তা, সেই মেয়েটিকে ওঁর চাই। সার্কাসে হাতি তোলার খেলা দেখাবার জন্য। বিষ্টুদা এক কথায় নাকচ করে দিলেন। রোজ রোজ হাতি নিয়ে খেলা?‌ ওই ডেলিকেট চেহারা, সে তো খুবই ঝুঁকির ব্যাপার। তায় আবার সার্কাসে। মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ঘরের মেয়ে পড়াশোনা করে, বাড়ির লোকই বা রাজি হবেন কেন আর আমিই বা ছাড়ব কেন?‌ যে জায়গায় বিষ্টুদার দুর্বলতা সেখানেই ঘা দিলেন ভদ্রলোক। একেবারে হাত ধরে বললেন, আমার খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি মারা পড়ব। এবার কোনও বিশেষ আকর্ষণ নেই সার্কাসে। প্রধান খেলোয়াড় অনুপস্থিত। আমার টিকিট বিক্রি হবে না, আপনি না বাঁচালে।
বিষ্টুদা বললেন, কিন্তু ওর তো পড়াশোনা আছে। ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে। রেজাল্ট বেরুলে বি এ পড়বে। আচ্ছা, ঠিক আছে। শুধু কলকাতা। যে কদিন তোমরা কলকাতায় সার্কাস দেখাবে, সে কদিনই শুধু রেবা তোমাদের সঙ্গে থাকবে। রাজি?‌
সার্কাসে প্রথম দিনের খেলা শুরু হল।
একটি দুবলা–‌পাতলা বাঙালি মেয়ে বুকে হাতি তুলবে— খুব ঘটা করে এ কথা ঘোষণা করা হয়েছে চতুর্দিকে। প্রথম দিনের ‘‌শো’‌ দেখতে এসেছেন স্পিকার শৈল মুখার্জী। মঞ্চ তৈরি করে দেয়া হল হাতির খেলা দেখাবার জন্য। তাঁবুর ভিতর উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু টু শব্দটি পর্যন্ত নেই। হাতির খেলা দেখার জন্য সবাই বসে আছে। প্রায় রুদ্ধশ্বাসে।
তার পর, যেই ঘোষণা হল, ‘‌এবার হাতির খেলা দেখানো হবে’‌, শৈল মুখার্জী বলেন— বিষ্টু, মেয়েটিকে তুমি ছেড়ে দাও। এ খেলা ওকে দিয়ে দেখিও না।
মঞ্চে টানটান হয়ে শুয়ে আছি। যখন হাতিটা উঠেছে, শৈলবাবু বলছেন শুনলাম, বিষ্টু, বিষ্টু নামিয়ে দাও। নামিয়ে দাও।
একটা ঘোরের মধ্যে সব কিছু যেন ঘটে গেল। আচ্ছন্নের মতো উঠলাম। সবাইকে নমস্কার করলাম। মঞ্চ থেকে হেঁটে বেরিয়ে এলাম বিষ্টুদার সঙ্গে। প্রথম দিন সার্কাসের খেলা এইভাবে শেষ হল।
তার পর একটানা দু’‌মাস, প্রতিদিন বুকের উপর সেই হাতি তোলার খেলা দেখিয়েছি দুপুরে, সন্ধ্যায়। শনি আর রবিবার আবার তিনটে করে শো। নেপালের মহারাজা এসেছিলেন একদিন সেই খেলা দেখতে।
কলকাতা ক্যাম্পের জন্য যাতায়াত বা থাকা–‌খাওয়ার তো কোনও প্রশ্ন নেই, কিন্তু যে টাকা ওঁরা আমাকে দিতেন তখনকার হিসেবে সে ছিল অনেক টাকা। প্রতিদিন একশো পঁচিশ টাকা আর শনি–‌রবিবার দুশো। বিষ্টুদা ওই পুরো খেলাটা কনডাক্ট করতেন। কিন্তু সার্কাস কোম্পানির চুক্তি ছিল শুধু আমারই সঙ্গে।
সার্কাস চলত সারা বছর জুড়ে। আমাদের যেমন একটা ধারণা আছে সার্কাস শুধু শীতেরই খেলা, তা কিন্তু নয়। কলকাতায় যখন অফ সিজন, তখন হয়তো ভাল বাঙ্গালোরে। সার্কাস কোম্পানি সিজন বুঝে বুঝে দেশময় ঘুরে বেড়ায়। সুতরাং আমারও যাযাবর জীবন শুরু হল বিচিত্রভাবে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২— আট বছর ধরে। এক সার্কাস থেকে আর এক সার্কাসে।
চুক্তি মতো গ্রেট বম্বে সার্কাসে দু–‌মাস আমি খেলা দেখিয়েছি কলকাতায়। আমার সেই ইমপ্রেসারিও মামার সঙ্গেও সার্কাসের চুক্তি কলকাতাতেই শেষ। কিন্তু আমি ছাড়তে চাইলেও, কমলি ছাড়বে কেন?‌
কলকাতায় গ্রেট বম্বে সার্কাসে আমার খেলাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রধান আকর্ষণ। বিজ্ঞাপন হয়েছে, মুখে মুখে প্রচার পেয়েছে। বারাসত–‌বসিরহাট–‌বনগাঁ— কলকাতার কাছাকাছি যে সব জায়গায় সার্কাস কোম্পানি এবার যাবে, সেখানে যদি হাতির খেলা না থাকে, তবে লোকে দেখতে আসবে কেন?‌ আবার তাঁরা এসে বিষ্টুদাকে ধরলেন। এবার মালিক নিজে। বিষ্টুদা বললেন, সে হয় না। কলকাতা ছেড়ে ও কোথাও যাবে না। এ অনুরোধ আমি করতে পারব না। আপনি বলে দেখুন, রাজি হয়।
সেই বয়স্ক ভদ্রলোক, মালিক, এসে আমার হাত ধরে অনুনয়–‌বিনয় করতে লাগলেন। সিস্টার, তুমি যদি না যাও, আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই তো কলকাতার আশেপাশেই থাকব আমরা। বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতে পারবে তুমি। সব ব্যবস্থা আমরা করে দেব।
সত্যি, সব ব্যবস্থাই ওঁরা করে দিয়েছিলেন। কাছাকাছি জায়গাগুলোতে— দমদম–‌বারাসাত–‌বনগাঁ–‌রানাঘাট গেছি ট্রেনে। কী খাটুনি!‌ দুপুরের ট্রেনে বনগাঁ যেতাম। ফিরতাম রাত নটার ট্রেন ধরে। স্টেশন মাস্টারকে বলা ছিল। একটা ফার্স্ট ক্লাস কামরা বন্ধ রাখা হত আমার জন্য। রাত দেড়টায় শিয়ালদা পৌঁছে, গাড়ি থাকত স্টেশনে, দীনেন্দ্র স্ট্রীটে আমাদের বাড়িতে ফিরতাম।
এভাবে, দমদম–‌বারাসাত–‌বনগাঁ হল, রানাঘাট হল, সার্কাস দল এবার যাবে শিলিগুড়ি।
আমি বললাম, সে কী কথা। এরকম হলে তো আমার সারা জীবন সার্কাসেই থাকতে হবে। আজ বলবেন শিলিগুড়ি, কাল দিল্লি, পরশু বম্বে। এ ভাবে আমি কি চলতেই থাকব?‌
তার উপর হাতি তুললে বেজায় ঘুম পায়। রক্ত চলাচল বেড়ে যায় তো। তার পর রাত বারটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত এমন নিঃসাড়ে ঘুমোই যে, কেউ টেনে ফেলে দিলেও জানতে পারব না। শো আর ঘুম। পড়াশোনা কখন করব?‌ ইন্টারমিডিয়েট পাশ গেছি। বি এ পরীক্ষা দেব। যদিও প্রাইভেটে, কিন্তু বছরের পর বছর বলে তো যেতে পারি না যে আমি বি এ ক্লাসের ছাত্রী। আর এত নাম, এত হাততালি— তার পর আমার মনই বা কতদিন আর পড়ায় থাকবে?‌
সার্কাস কোম্পানি বলল, আমরা টাকা বাড়িয়ে দিচ্ছি। পাঁচ হাজার টাকা মাসে দেব চল্লিশটা ‘‌শো’‌ করবার জন্য। শনি–‌রবিবার আলাদা। পাঁচ হাজার টাকা কত বেশি ছিল সেদিন, আজ সেটা বুঝতে পারি। তখন কিন্তু ভেবেছিলাম, দরকার নেই আমার টাকার। আমি বাড়িতে থাকতে চাই।
যা হোক, শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হল। তার পর শিলিগুড়ি হল, কাটিহার হল। জোড়াহাট–‌শিলচর গেলাম। এই সব জায়গায় বিষ্টুদা কিন্তু আমার সঙ্গেই আছেন। যতদিন সার্কাসে ছিলাম ততদিন। ওঁর জিমনাসিয়াম দেখার জন্য সুযোগ্য শিষ্যরা অনেকেই ততদিনে তৈরি হয়ে গেছেন। যাঁদের কাউকে কাউকে পরে তিনি সার্কাসেও এনেছিলেন।
সার্কাসে নানারকম জীবজন্তুর খেলা ছিল, আর যা যা সব থাকে, ট্র‌্যাপিজ ইত্যাদি। কিন্তু হাতির খেলাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। হাতির খেলা কোন শো–‌তে কখন দেখাব, সেটা আমিই ঠিক করব, এরকমই চুক্তি ছিল। ম্যাটিনি শো, তিনটের সময় যেটা হত, সেখানে আমি একেবারে শেষে খেলা দেখাতাম। খেয়েদেয়ে, বিশ্রাম করে, আরামসে যেতাম। যেদিন তিনটে শো হত, সেদিন ছটার শো–‌এ খেলা দেখাতাম চার–‌পাঁচটা আইটেমের শেষে আর নাইট ‘‌শো’‌তে আমি আসতাম তিন নম্বর আইটেমে। তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে যাতে ঘুমোতে যেতে পারি।
আসামে আমি দু‌বার ঘুরেছি। একবার এই গ্রেট বম্বের সঙ্গে। আর একবার জেমিনি সার্কাসের সঙ্গে। আট বছরে বেশ কয়েকটা সার্কাসে কাজ করেছি, জেমিনি, কমলা, ইন্টারন্যাশনাল। বম্বে গিয়েছিলাম জেমিনি–‌র সঙ্গে। গ্রেট বম্বে–‌তে ছিলাম প্রায় দেড় বছর। হাতি তোলা ছাড়াও খুশিমত অন্য খেলা একটা দুটো করতাম। ওয়েট লিফটিংও করেছি। তবে সে পরে। ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসের সময়। বাঙালির সার্কাস ছিল ইন্টারন্যাশনাল। ছোট্ট সার্কাস। পঞ্চাশটা চেয়ার দশটা গ্যালারি— এই রকম। বম্বে থেকে ফিরে এসে ইন্টারন্যাশনালে যোগ দিলাম।
হাতির খেলা কিন্তু ছিল খুবই বিপজ্জনক এবং সম্ভবত সে কারণেই এত আকর্ষণীয়। এই যে সার্কাসে সার্কাসে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য গোপন প্রতিযোগিতা, সে তো ছিল এই কারণেই যে বুকে হাতি তুলবার এই খেলা দেখার জন্যই ভিড় উপচে পড়ত তাঁবুতে তাঁবুতে। মনে আছে, বড় জেমিনির সঙ্গে যে তিনমাস বম্বে ছিলাম, আমাকে একটু দেখার জন্য, একটু কথা বলার জন্য কেমন হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। আমিও, বয়স অল্প ছিল তখন, অভিভূত হয়ে যেতাম স্বপ্নের নায়ক–‌নায়িকারা বাস্তবে এসে আমার সঙ্গে করমর্দন করছেন— রাজকাপুর, মালা সিনহা, ডেভিড। মনে আছে কমিউনিস্ট নেতা এস এ ডাঙ্গে এসেছিলেন আমার সার্কাস দেখতে। বম্বের মেয়র, আরও কত মানুষ। কাগজে কাগজে উচ্ছ্বসিত আলোচনা।
কিন্তু একচুল এদিক–‌ওদিক হলেই দুর্ঘটনা, এমনকি মৃত্যু— এমন সম্ভাবনা তো ছিলই। একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। ছোট জেমিনিতে আছি তখন। জামালপুর থেকে পরবর্তী ক্যাম্পে ট্রুপ যাচ্ছে আসানসোল। আমার সঙ্গে চুক্তি ছিল, দুই ক্যাম্পের মাঝে তিনচার দিন ছুটি থাকলে ওরা আমাকে বাড়ি যেতে দেবে। সেইমত বিষ্টুদার সঙ্গে কলকাতায় ফিরছিলাম ট্রেনে। হঠাৎ বিষ্টুদা বললেন, দেখি দেখি। একটু এদিকে তাকা। তোর চোখে রক্ত কেন!‌ আমি কিছু টের পাইনি কিন্তু দেখা গেল চোখের কোণে বেশ রক্ত জমে গেছে। আসলে হাতির পায়ের চাপ প্রথম যখন শরীরে লাগে, সেই হঠাৎ ধাক্কায় শিরাটিরা ছিঁড়ে যেতে পারে। বিষ্টুদার ভয় হচ্ছিল, তেমন কিছু হয়েছে কি না। কলকাতায় তড়িঘড়ি ডাঃ নীহার মুন্সীকে দেখানো হল। উনি বললেন, রক্ত সিরিঞ্জ দিয়ে বের করে দিতে হবে। এখুনি এখুনি হবে না। তাছাড়া, স্পষ্ট করে বলে দিলেন ডাঃ মুন্সী, রেবা আর কোনও দিন হাতি তুলতে পারবে না।
ব্যস। রইল আসানসোল ক্যাম্প। বিষ্টুদাকে বললাম, ওদের জানিয়ে দিন আমি যাচ্ছি না। বিষ্টুদা বললেন, যদি কলকাতা থেকে জানিয়ে দিই ওর হয়তো বিশ্বাস করবে না। ওখানে চল, ওরা দেখুক‌। তার পর মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে চলে আসব।
জেমিনির মালিক বললেন, দর্শকরা তাঁবু জ্বালিয়ে দেবে রেবা রক্ষিতের খেলা না হলে। আমি এখন কী করি!‌
প্রতিটি সার্কাসেই আমি অভাবনীয় খাতির যত্ন পেতাম। বিষ্টুদা বলতেন, তুই ত রাজরানী। সেই সমাদরের বদলে আমারও কিছু দায়িত্ব বা কর্তব্যের ব্যাপার ছিল। তাই বিষ্টুদা ঠিক করলেন, একটা পরীক্ষা করবেন।
বুকের উপর একটা কাঠের লম্বা তক্তা পাতা হত, যার উপর দিয়ে হেঁটে যেত হাতিটা। তক্তার উপর হাতির প্রথম পা–‌টি পড়লেই, বিষ্টুদা লক্ষ করেছেন, সব রক্ত মুখে ছুটে আসত যখন, তখন কপালের কাছে দুটি শিরা ফুলে ওঠে। মাথার একটা ব্যান্ডও বাঁধা থাকত। এবার তিনি ঠিক করলেন ওপেনিং শো–‌তে শিরা দুটো চেপে ধরে বসে থাকবেন। করলেনও ঠিক তাই। মাথার কাছে আসন করে বসে, প্রাণপণে কপালের দু‌পাশে হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরলেন। হাতি চলে গেল। আমি উঠলাম। শিরা ছিঁড়ে যায়নি। বরং চোখের কোণে জমে থাকা রক্তের আর কোনও চিহ্ন নেই। ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসেই আমার সার্কাস জীবন শেষ হল।‌‌‌‌‌‌‌চুক্তি ছিল। ম্যাটিনি শো, তিনটের সময় যেটা হত, সেখানে আমি একেবারে শেষে খেলা দেখাতাম। খেয়েদেয়ে, বিশ্রাম করে, আরামসে যেতাম। যেদিন তিনটে শো হত, সেদিন ছটার শো–‌এ খেলা দেখাতাম চার–‌পাঁচটা আইটেমের শেষে আর নাইট ‘‌শো’‌তে আমি আসতাম তিন নম্বর আইটেমে। তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে যাতে ঘুমোতে যেতে পারি।
আসামে আমি দু‌বার ঘুরেছি। একবার এই গ্রেট বম্বের সঙ্গে। আর একবার জেমিনি সার্কাসের সঙ্গে। আট বছরে বেশ কয়েকটা সার্কাসে কাজ করেছি, জেমিনি, কমলা, ইন্টারন্যাশনাল। বম্বে গিয়েছিলাম জেমিনি–‌র সঙ্গে। গ্রেট বম্বে–‌তে ছিলাম প্রায় দেড় বছর। হাতি তোলা ছাড়াও খুশিমত অন্য খেলা একটা দুটো করতাম। ওয়েট লিফটিংও করেছি। তবে সে পরে। ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসের সময়। বাঙালির সার্কাস ছিল ইন্টারন্যাশনাল। ছোট্ট সার্কাস। পঞ্চাশটা চেয়ার দশটা গ্যালারি— এই রকম। বম্বে থেকে ফিরে এসে ইন্টারন্যাশনালে যোগ দিলাম।
হাতির খেলা কিন্তু ছিল খুবই বিপজ্জনক এবং সম্ভবত সে কারণেই এত আকর্ষণীয়। এই যে সার্কাসে সার্কাসে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য গোপন প্রতিযোগিতা, সে তো ছিল এই কারণেই যে বুকে হাতি তুলবার এই খেলা দেখার জন্যই ভিড় উপচে পড়ত তাঁবুতে তাঁবুতে। মনে আছে, বড় জেমিনির সঙ্গে যে তিনমাস বম্বে ছিলাম, আমাকে একটু দেখার জন্য, একটু কথা বলার জন্য কেমন হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। আমিও, বয়স অল্প ছিল তখন, অভিভূত হয়ে যেতাম স্বপ্নের নায়ক–‌নায়িকারা বাস্তবে এসে আমার সঙ্গে করমর্দন করছেন— রাজকাপুর, মালা সিনহা, ডেভিড। মনে আছে কমিউনিস্ট নেতা এস এ ডাঙ্গে এসেছিলেন আমার সার্কাস দেখতে। বম্বের মেয়র, আরও কত মানুষ। কাগজে কাগজে উচ্ছ্বসিত আলোচনা।
কিন্তু একচুল এদিক–‌ওদিক হলেই দুর্ঘটনা, এমনকি মৃত্যু— এমন সম্ভাবনা তো ছিলই। একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। ছোট জেমিনিতে আছি তখন। জামালপুর থেকে পরবর্তী ক্যাম্পে ট্রুপ যাচ্ছে আসানসোল। আমার সঙ্গে চুক্তি ছিল, দুই ক্যাম্পের মাঝে তিনচার দিন ছুটি থাকলে ওরা আমাকে বাড়ি যেতে দেবে। সেইমত বিষ্টুদার সঙ্গে কলকাতায় ফিরছিলাম ট্রেনে। হঠাৎ বিষ্টুদা বললেন, দেখি দেখি। একটু এদিকে তাকা। তোর চোখে রক্ত কেন!‌ আমি কিছু টের পাইনি কিন্তু দেখা গেল চোখের কোণে বেশ রক্ত জমে গেছে। আসলে হাতির পায়ের চাপ প্রথম যখন শরীরে লাগে, সেই হঠাৎ ধাক্কায় শিরাটিরা ছিঁড়ে যেতে পারে। বিষ্টুদার ভয় হচ্ছিল, তেমন কিছু হয়েছে কি না। কলকাতায় তড়িঘড়ি ডাঃ নীহার মুন্সীকে দেখানো হল। উনি বললেন, রক্ত সিরিঞ্জ দিয়ে বের করে দিতে হবে। এখুনি এখুনি হবে না। তাছাড়া, স্পষ্ট করে বলে দিলেন ডাঃ মুন্সী, রেবা আর কোনও দিন হাতি তুলতে পারবে না।
ব্যস। রইল আসানসোল ক্যাম্প। বিষ্টুদাকে বললাম, ওদের জানিয়ে দিন আমি যাচ্ছি না। বিষ্টুদা বললেন, যদি কলকাতা থেকে জানিয়ে দিই ওর হয়তো বিশ্বাস করবে না। ওখানে চল, ওরা দেখুক‌। তার পর মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে চলে আসব।
জেমিনির মালিক বললেন, দর্শকরা তাঁবু জ্বালিয়ে দেবে রেবা রক্ষিতের খেলা না হলে। আমি এখন কী করি!‌
প্রতিটি সার্কাসেই আমি অভাবনীয় খাতির যত্ন পেতাম। বিষ্টুদা বলতেন, তুই ত রাজরানী। সেই সমাদরের বদলে আমারও কিছু দায়িত্ব বা কর্তব্যের ব্যাপার ছিল। তাই বিষ্টুদা ঠিক করলেন, একটা পরীক্ষা করবেন।
বুকের উপর একটা কাঠের লম্বা তক্তা পাতা হত, যার উপর দিয়ে হেঁটে যেত হাতিটা। তক্তার উপর হাতির প্রথম পা–‌টি পড়লেই, বিষ্টুদা লক্ষ করেছেন, সব রক্ত মুখে ছুটে আসত যখন, তখন কপালের কাছে দুটি শিরা ফুলে ওঠে। মাথার একটা ব্যান্ডও বাঁধা থাকত। এবার তিনি ঠিক করলেন ওপেনিং শো–‌তে শিরা দুটো চেপে ধরে বসে থাকবেন। করলেনও ঠিক তাই। মাথার কাছে আসন করে বসে, প্রাণপণে কপালের দু‌পাশে হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরলেন। হাতি চলে গেল। আমি উঠলাম। শিরা ছিঁড়ে যায়নি। বরং চোখের কোণে জমে থাকা রক্তের আর কোনও চিহ্ন নেই। ইন্টারন্যাশনাল সার্কাসেই আমার সার্কাস জীবন শেষ হল।‌‌‌‌‌‌‌ ■

 ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top