প্যারিস থেকে বেজিং, ভেনিস থেকে ব্রাসেলস। ছড়িয়ে রয়েছে ঝলমলে সব বইয়ের বিপণি। সেই দেশ, সেই শহরের গরিমা। পাঠকেরা তো যানই, পর্যটকেরাও দেখতে যান। মুগ্ধ হন, হন বিস্মিত। একসময়ে বিশ্বখ্যাত লেখকেরা এই সব বিপণিতে সময় কাটাতেন। লিখলেন পীতম সেনগুপ্ত। 

প্যারিসে নেমেই বিমানবন্দরে ট্যুরিস্ট গাইডকে চুপিচুপি বলেছিলাম, ‘আমাকে কিলোমিটার জিরোতে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।’
কিলোমিটার জিরো শুনে ভদ্রলোক হাঁ করে আমার দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে রইলেন। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানালেন, জায়গাটি কোথায় তা জানা নেই। খুবই স্বাভাবিক। প্যারিস মানেই তো ল্যুভর, আইফেল টাওয়ার, অপেরা হাউস, বাস্তিল দুর্গ, প্যারিস গেট, এনভারস এ মঁমার্ত, পার্লামেন্ট হাউস, নতারদাম গির্জা, নেপোলিয়ন সমাধিস্থল বা নিদেনপক্ষে পৃথিবী বিখ্যাত লিডো ডান্স দেখতেই সকলে হামলে পড়েন। তা নয়, কোথা থেকে কিলোমিটার জিরোয় যাব বলে অপ্রত্যাশিত দাবি করে বসাটা আমার উচিত হয়নি। যাই হোক গাইড না চিনলেও চলবে, গুগল ম্যাপে দেখে নিলাম নতারদাম গির্জার খুব কাছেই কিলোমিটার জিরো জায়গাটি। সকলে যখন নতারদাম গির্জায় যাবেন ঠিক করলেন, তখন আমি সকলের অজান্তেই মিনিট খানেক হেঁটে পৌঁছে গেলাম আমার অভীষ্ট গন্তব্যে। 
এই কিলোমিটার জিরোটি হল সিন নদীর পাড়ে মহানগর প্যারিসের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে পৌঁছে যেতেই দেখি একটি আটপৌরে দোকান। দোকানের সামনে হলুদ সাইনবোর্ডের ওপর লেখা ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’। মাঝে প্রবাদপ্রতিম শেক্সপিয়রের মুখটি আঁকা। 
এই সেই শতাব্দীপ্রাচীন বইয়ের দোকান, যেখানে কোনও এক টেবিলে বসে আড্ডা মারতেন এজরা পাউন্ড, জেমস জয়েস, হেনরি মিলার, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, সিনক্লেয়ার লুইস প্রমুখরা। সাহিত্যে নোবেলজয়ী বেশ কয়েকজন লেখক এই ভূমিতে বসে কফি খেতে খেতে বইয়ের পাতা উল্টেছেন দিনের পর দিন। কিংবা নিজেদের মধ্যে সমকালীন বিশ্ব সাহিত্য নিয়ে তুমুল তর্ক করেছেন। মন্দিরে-মসজিদে-গির্জায় ঢোকার সময়ে যেমন মাথা নত করতে হয়, কিংবা পাদুকা খুলে ঢুকতে হয় এক অলিখিত নিয়মের নির্দেশে, এখানে কোনও নির্দেশ ছাড়াই মনে হয়েছিল জুতো বাইরে রেখে ঢুকে পড়ি এই সাহিত্যতীর্থে। কোনও বিগ্রহ নেই ঠিকই, তবে এই বইয়ের দোকানের আনাচ–কানাচে যেন ইতিহাস চুপিসারে বহু না-বলা কথা অহরহ বলে যায় কানে কানে। 
এই সুবিখ্যাত বইয়ের দোকানটি চালু হয় মাদার অফ লিটারেচার, সিলভিয়া বিচ হুইটম্যানের ব্যবস্থাপনায়, আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে, ১৯১৯ সালে। সেই চলা শুরু। তারপর কত যে কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে একে কেন্দ্র করে তার কোনও হিসেব নেই। প্রথমে বই বিক্রি উদ্দেশ্য হলেও পরে বই দেখা এবং কেনার সঙ্গে সঙ্গে এক পেয়ালা কফিও জুটে যেত বইপ্রেমীদের। বই-কফি আর অলস অবসর, এই ত্র্যহস্পর্শে প্রথমে ফরাসিরা, পরে ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও বইপ্রেমীরা আসতে শুরু করেন এখানে। আর প্রবীণদের সামনে দেখে তরুণ লেখকরা এখানে এসে তাঁদের স্বপ্ন বুনতে লাগলেন। 
শোনা যায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ে যখন সাহিত্যচর্চা করবেন বলে ইতালি রওনা হয়েছিলেন, তখন এক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে প্যারিসে এসে থেকে গিয়েছিলেন, এবং রোজ চলে আসতেন এই দোকানে। আবার কেরানিগিরি করেও জেমস জয়েস তখন তাবড় গ্রন্থ ইউলিসিস লিখেও প্রকাশক পাচ্ছিলেন না। এই দোকান এবং দোকানের মালকিন, সিলভিয়া বিচ হুইটম্যান সেদিন নিঃশর্তে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। 
এক সময়ে দোকানে লেখা থাকত, ‘আপনার প্রয়োজনীয় বইটি নিন, সামর্থ্য অনুযায়ী মূল্য মেটান’। আজকাল সেই সামর্থ্যের ওপর আর ভরসা রাখতে পারেননি, দুনিয়া বদলে গেছে অনেক। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় বর্তমান মালিকের ‘ভাল-বাসা’টি রয়েছে। তাঁরই ভালবাসায় দীর্ঘ বছর যাবৎ প্রায় ৪০০০০ লেখক বিনামূল্যে রাতে থেকে গেছেন। ভাবা যায় এমন ভালবাসার কথা। 
জার্মানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্যারিস অধিগ্রহণ করলে ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’র ঝাঁপ ভয়ে চারটি বছর বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। মিত্রবাহিনী প্যারিস মুক্ত করলে ঝাঁপ ফের খোলে। দোকানের স্থানও পরিবর্তন হয়, ঠিকানা হয় এই কিলোমিটার জিরোতে। 
এখানে পোয়েটস কর্নার থেকে রাইটার্স ফর্ম দ্য লস্ট জেনারেশন, কিংবা বিট জেনারেশনের লেখকদের বই শয়ে শয়ে সাজানো আছে। আছে অসংখ্য পোস্টার, আলোকচিত্র আর সিঁড়িতে লেখা ‘বাঁচো মনুষ্যত্বের জন্য’। 
প্যারিস থেকে পাড়ি দিয়েছিলাম ব্রাসেলসে। টিনটিনের মাতৃভূমি। চকোলেটের দেশ বেলজিয়ামে ঢুকেও আমার নাক যেন বইয়ের গন্ধ খুঁজে ফিরছিল। গাইড ভদ্রলোক আমাকে ইতস্তত এবং বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে দেখে ভেবেছিলেন আমি বুঝি সেরা চকোলেটের খোঁজ করছি। তাঁকে যখন জানালাম ‘কুক অ্যান্ড বুক’ এই দোকানের হদিশ তাঁর জানা আছে কিনা, স্বভাবতই তাঁর কৌতূহলের আগুন নিভে গিয়েছিল এমন বেরসিকের ঢালা জলে। ‘কুক অ্যান্ড বুক’ দোকানচত্বরে ঢুকে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল। আরে এ তো বইয়ের মল একটা। কী পেল্লাই এর সাইজ। আটটা বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত। ঢুকেই দেখি কমিক সেকশন। হাজার হোক টিনটিনবাবুর দেশ বলে কথা। তাঁর সৌজন্যে সেদিন সারা পৃথিবীর কত যে জানা–অজানা কমিকস বইয়ের সম্ভার চোখের সামনে দেখতে পেয়েছিলাম, এক কথায় অবিশ্বাস্য। কমিকস সেকশন পেরিয়েই একেবারে ভ্রমণের দুনিয়ায় ঢোকা। পৃথিবীর যাবতীয় ভ্রমণের রঙবেরঙের নানা বই। যেন বইয়ের মধ্যে দিয়ে বিশ্বভ্রমণের স্বাদ মিটবে এখানে। ভ্রমণ শেষ হতে না হতেই, হাতছানি দেবে চিত্রকলা বিভাগটি। এখানে বেজে চলেছে ইউরোপের সেই সঙ্গীতের মূর্ছনা, যা কিনা মোৎসার্ট বা বেঠোফেনের সিম্ফনির পরশ এনে দেবে। চারপাশের সাজ এককথায় অনিন্দ্যসুন্দর। কোনও একটি দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে আনা যায় না সহজে। এখানেই গ্রিন হাউসের মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানেই এক সময়ে ব্রাসেলসের পথেঘাটে ব্যবহৃত ল্যাম্পগুলি জ্বলছে, যেন অষ্টাদশ শতকের ব্রাসেলসে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য অনুভূতি। এই কাচের তৈরি গ্রিন হাউসের সিলিংয়ে ৮০০ বইকে এমন করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। দেখে বলতে ইচ্ছে করেছে, ‘বনের গাছে গাছে জেগেছে ভাষা ভাষাহারা নাচে’। এখানেই পাওয়া যায় পৃথিবী বিখ্যাত সুগন্ধি অ্যাকোয়া দ্য পার্মা, বিভিন্ন রকমের কাস্টমাইজড হেলমেট, শ্যাম্পেন, বই রাখার হোল্ডার, পকেট ল্যাম্প, এবং অবশ্যই লোভনীয় এক সে বড়কর এক চকোলেট। চারিদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে অসংখ্য বসার জায়গা। প্রিয় বইটি হাতে নিয়ে পাশে রাখা রেড ওয়াইনের পাত্রে চুমুক দিতে দিতে সন্ধে কাটানো যেন এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। 
পৃথিবীতে এমন প্রাচীন অথচ ঐতিহ্যে ভরা বেশ কিছু বইয়ের দোকান আছে, যা কিনা সেই দেশের বা সেই নগরের একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে প্রতীক হয়ে গেছে। সানতোরিনি গ্রিস দেশের আর পাঁচটি প্রাচীন নগরীর মতোই একটি। সেই সানতোরিনি নগরে একুশ শতকের গোড়ায় ক্রেগ ওয়ালজার এবং অলিভার ওয়াইস, দুই মার্কিন যুবক ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। সানতোরিনির সমুদ্রসৈকতে রৌদ্রস্নান করার ফাঁকে তাঁরা একটা স্বপ্ন রচনা করেছিলেন। গ্রিসে গিয়ে এঁরা একটিও ইংরেজি বই পড়ার সুযোগ পাননি। তন্ন তন্ন করে খোঁজ করে পাননি কোনও বইয়ের দোকানও। এঁরা তখন সেই অভাবের তাড়নায় একটি অভিনব বইয়ের দোকান গড়ার স্বপ্ন রচনা করেন। যেমন কথা তেমন কাজ। অর্থ জোগাড় করে ঝাঁপিয়ে পড়েন একটি অন্য ধরনের বইয়ের দোকান উপহার দিতে। তৈরি হয় সেই স্বপ্নের অভিনব দোকানটি। নাম রাখে তার ‘আতলান্তিস বুকস’। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে ওইয়া, একটি পার্বত্য গ্রাম। সানতোরিনির সাদা পাথরের সেই গ্রামে ওয়াইন, চড়া রোদের সঙ্গে জমে ওঠে নতুন এক নেশা, বই। শুধু তো বই পড়া, বই দেখা, বই কেনা নয়, এখানে এখন সাহিত্যসভা, সাহিত্যমেলা থেকে সাহিত্যসংক্রান্ত নানাবিধ সেমিনার, ওয়ার্কশপ, এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনও চলে সারা বছর। অচিরেই পৃথিবীর সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে ‘আতলান্তিস বুকস’ আদরণীয় হয়ে উঠেছে। 
গ্রিস থেকে ইতালির ভেনিস। ভেনিসে গেছেন অথচ গন্ডোলা দেখেননি, বা চড়েননি এমন মানুষের সংখ্যা হাতেও গোনা যাবে না। কারণ তা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অথচ ভেনিসে গিয়ে ‘লাইব্রেরিয়া অ্যাকোয়া আলটা’ দেখেননি সে সংখ্যা এতই কম যে বলার নয়। আসলে ‘লাইব্রেরিয়া অ্যাকোয়া আলটা’ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বইয়ের দোকানগুলির একটি। দোকানটি একটি ঐতিহাসিক ভেনেটিয়ান গন্ডোলা নৌকোর মধ্যেই তৈরি। ভেনিসের সেই বিখ্যাত ক্যানালের মাঝে ভাসতে ভাসতে বই পড়া বা বই কেনার স্বাদ যে অভিন্ন তা যাঁরা গেছেন তাঁরা কেউই অস্বীকার করেন না।   
পর্তুগিজ ভাষায় ‘ধীরে পড়ো’ কথাটি খুব ব্যবহার হয়। আসলে সত্যিই তো ঝড়ের গতিতে দৌড়নো গেলেও পড়া কখনও ঝড়ের গতিতে হতে পারে না। ‘এই ধীরে পড়ো’কে পর্তুগিজরা বলে থাকেন ‘লে ডেভাগার’। এই নামে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে একটি ঐতিহাসিক বইয়ের দোকান আছে। সমাজের সব বিষয়ের বই এখানে পাওয়া যায়। মেঝে থেকে সিলিং পুরো বইয়ের সারি সারি তাক। থরে থরে সাজানো নানা বিষয়ের অসংখ্য বই। মুদ্রণ জগতের সঙ্গে পানীয়ের মোলাকাত এখানে স্বচ্ছন্দে হতে পারে বলে সুন্দর ক্যাফেটেরিয়া আছে। যে বাড়িটিতে এই দোকানটি গড়ে উঠেছে, সেখানে উনিশ শতকে একটি মস্ত ফেব্রিকের দোকান ছিল। এখানে এখন বিজ্ঞাপন সংস্থা, ডিজাইন ওয়ার্কশপ, আর্ট গ্যালারির সঙ্গে এই দোকানটিও রমরমিয়ে চলছে। দোকানের মধ্যে নতুন বইয়ের গন্ধ সবসময় ম ম করে। তার ঘ্রাণেই সময় কেটে যায়। 
ইংল্যান্ড থেকে স্কটল্যান্ড যাওয়ার পথে দূরের উত্তর ইংল্যান্ডের নর্থাম্বারল্যান্ড প্রদেশের অ্যালনিকে একটি পুরনো ভিক্টোরীয় যুগের রেল স্টেশন দেখা যায়। অনেকেই নেমে পড়েন সেই স্টেশনে। এটি এখন একটি পুরনো বইয়ের দোকান হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। নাম ‘বার্টার বুকস’। দর্শনীয় স্থান যেন। বই তো আছেই, সঙ্গে কফিশপ, অনলাইন ক্যাটালগ। দেয়ালে দেয়ালে অসংখ্য বিখ্যাত লেখকদের ম্যুরাল। এটিকে বলা হয় সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের ব্রিটিশ লাইব্রেরি। প্রায় দশ হাজার স্কোয়্যার ফুটের ওপর এই পুরনো রেল স্টেশনটির ডিজাইন করেছিলেন উইলিয়াম বেল। সেটা ১৮৮৭ সালের কথা। ১৯৬৮ সালে স্টেশনটি বন্ধ হয়ে যায়, ১৯৯১ সালে এখানে অবিকৃত অবস্থাতেই ‘বার্টার বুকস’ চালু হয়। একটা হিসেব বলছে প্রতি বছর এখানে প্রায় দু লাখ মানুষ আসেন। এখানে পুরনো বইয়ের বিনিময়ে নতুন বই কেনা যায়। 
ইউরোপ ছাড়াও দক্ষিণ গোলার্ধেও বেশ কিছু নামজাদা বইয়ের দোকান আছে।  
কথায় বলে ‘যদি কোনও অঞ্চলের আত্মাকে পেতে চাও, তবে সেই অঞ্চলের কোনও বইয়ের দোকানে প্রথমে যাও।’ আমেরিকার আইওয়া শহরটি বিখ্যাত মেধা–অন্বেষণের জন্য। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবীজোড়া খ্যাতি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাগোয়া জমিতেই ‘প্রাইরি লাইটস’ নামে একটি বৃহৎ বইয়ের দোকান আছে। প্রায় চল্লিশ হাজারের ওপর এদের বই সংগ্রহের বিষয় আছে। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলেই একে চেনে অবশ্য রাইটার্স ওয়ার্কশপ হিসেবে। 
ওয়াশিংটন ডিসিতে আছে আরেকটি নামকরা বইয়ের দোকান। সলমন রুশদি থেকে বব উডওয়ার্ড, বা বারবারা কিংসোলভার থেকে ক্যালভিন ট্রিলিন, বহু বিখ্যাত লেখকের আড্ডার স্থল এই দোকানটি। ‘পলিটিক্স অ্যান্ড প্রোজ’। ১৯৮৪ সাল থেকে দোকানটির পথচলা শুরু। আজও রমরমিয়ে চলেছে। এখানে বছরভর লেখক–কবি–সাহিত্যিকদের নিয়ে নানা ইভেন্ট চলে থাকে। জে কে রাউলিং থেকে বিল ক্লিন্টন বা বারাক ওবামা সকলেই এসেছেন নানা কারণে। 
ক্যালিফোর্নিয়ায় আরও একটি বইয়ের দোকান আজ খ্যাতিলাভ করেছে। ‘বার্টস বুকস্টোর’। ১৯৬৪ সালে নিজের সংগৃহীত বইয়ের সম্ভার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রিচার্ড বার্টিন্সডেল এই বইয়ের দোকানটি শুরু করেন। রাস্তার ধারের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত খোলামেলা পরিবেশে বই পড়ার দোকান এটি। দিনরাত খোলা থাকে। দোকানের লাগোয়া প্রাঙ্গণে আপেল গাছ। দোকানিরা না থাকলেও বই কিনে জনহীন কাউন্টারের বাক্সে টাকা রেখে বই কিনে আনা যায়। দোকানে প্রচুর বইয়ের সংগ্রহ আছে বলাবাহুল্য। 
দুনিয়াজুড়ে বিশেষ করে বাচ্চাদের বা কিশোর–কিশোরীদের জন্য একদম নিজস্ব বইয়ের দোকানের খুবই অভাব। কেউই শিশুসাহিত্যের সম্ভার নিয়ে তেমন উৎসাহী নন। তবে ব্যতিক্রম তো আছে। এমন একটি ব্যতিক্রমী বইয়ের দোকান হল, ‘পপুলার কিডস রিপাবলিক পিকচার বুক স্টোর’। হ্যাঁ, চীনের বেজিং শহরে এই দুনিয়া কাঁপানো বইয়ের দোকানটি অবস্থিত। মূলত ছোটদের জন্য ছোটদের কথা ভেবেই এই বিশাল বইয়ের দোকানটি খোলা হয়েছিল। তবে ছোটদের সঙ্গে বড়রাও দিব্যি এখানে এসে বইয়ের নেশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে যান। ছোটদের আবদার মেটাতে মেটাতে নিজেরাও লোভ করে বসেন। বই কিনে বাড়ি ফেরেন। দোকানটি প্রকাণ্ড প্রাসাদের মতো। নানা ধরনের, নানা আকৃতির বুকসেল্ফ আছে। আর তাতে নানা বিষয়ের সব রঙবেরঙের বই সাজানো। যেন এক স্বপ্নরাজ্য। বুকসেল্ফে বসে, সিঁড়িতে বসে, চেয়ার–টেবিলে বসে বই দেখা ও পড়ার দুর্লভ সুযোগ মেলে এখানে। এশিয়া মহাদেশে এমন বইয়ের দোকান বিরলপ্রায়। দোকানটিতে এত সুন্দর করে রং ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে শিশুদের মন জয় করা যায়। রামধনুর রঙে রাঙানো। সঙ্গে নানা রকমের ডিজাইন করে বই পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যেখানে শিশুরা খেলার আনন্দটাও উপভোগ করতে পারে। কমিকস বই তো আছেই, সঙ্গে জাপানি বা চীনা রূপকথার গল্প, ইউরোপ–আমেরিকার রঙিন শিশু সাহিত্যের বিপুল সম্ভার এখানে মজুত।
৩৬ বছরের জাপানি আর্কিটেক্ট, কাইচিরো সাকো এই দোকানটির নকশা করেছিলেন। 
বুয়েনস আয়ার্সকে বলা হয় ‘বুকশপ ক্যাপিটাল অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। কেন বলা হয় এই সহজ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় প্রতি এক লাখ শহরবাসীর জন্য এই শহরে ২৫টি করে বইয়ের দোকান মজুত আছে। এই সমীক্ষা ২০১৫ সালে করা, গার্ডিয়ান পত্রিকার তরফ থেকে করা হয়েছিল। মোট ২ কোটি ৮০ লক্ষ শহরবাসীর জন্য আর্জেন্টিনার এই রাজধানী শহরে কমবেশি ৭৩৪টি বইয়ের দোকান শহরজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্যে প্রাচীন যে দোকানটি আজ সারা বিশ্বের দরবারে খ্যাতি অর্জন করেছে তার নাম, ‘এল অ্যাটেনিও গ্র্যান্ড স্পেলেন্ডিড’। ১৯১৯ সাল। দুই স্থাপত্যবিদ পেরো এবং টোরেস আর্মেঙ্গল একটি মুক্তমঞ্চ গড়েন। ট্যাঙ্গো নাচের আসর বসবে এমনই ছিল সেই মঞ্চ গড়ার পিছনের কারণ। দশ বছর যেতে না যেতেই মঞ্চটিকে সিনেমা হলে রূপান্তরিত করা হল। চলল দীর্ঘদিন। এরপর এল একুশ শতক। সিনেমা হলটির তখন ভগ্নপ্রায় অবস্থা। সিনেমা হলটিকে কিনে নেন গ্রুপো ইলসা, নতুন করে গড়ে তোলা হল বইয়ের দোকানের জন্য। পুরনো মডেলটিকেও রাখা হয়। এখন দোকানটি এতই জনপ্রিয় যে বছরে দশ লক্ষ বইপ্রেমীর পায়ের ধুলো পড়ে এখানে। 
এবারে আসি আমাদের ঘরের বইপাড়ায়। মনে আছে দিল্লিবাসকালে রবিবার–রবিবার দরিয়াগঞ্জের বইয়ের হাটেবাজারে যেতাম। নানা ধরনের দুষ্প্রাপ্য বই থেকে হাল আমলের বই হাতে নিয়ে নাড়াচড়া করা যেত। সে ছিল এক বিপুল সম্ভার। তবে বড় উদাসীনতা দেখেছি দোকানিদের। অথচ কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে যেই না পা পড়ে পথিকের, অমনি শোনা যায়, ‘কী বই লাগবে বলুন। আসুন আমার কাছে। সব বই পেয়ে যাবেন।’ এটা বইয়ের বাজার। একটি সমীক্ষার দাবি এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বইবাজার। হ্যাঁ, পুরনো বইয়ের যে তা বলতে দ্বিধা নেই।  তবে কবে থেকে এই বইয়ের বাজার শুরু তার সঠিক ইতিহাস সম্ভবত জানা যায় না। ইতিহাস বলছে বাংলা বইয়ের বাজার আগে চিৎপুরে ছিল। উনিশ শতকের গোড়া থেকে কলেজ স্ট্রিটে যখন নানা স্কুল–কলেজের পত্তন হয়, যেমন ১৮১৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং হিন্দু স্কুল, ১৮১৮ সালে হেয়ার স্কুল, ১৮২৪ সালে সংস্কৃত কলেজ, ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ওই বছরই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত হয়। সেই সময়ে চিৎপুর থেকে বইয়ের ব্যবসায়ীরা কলেজপাড়ায় এসে ব্যবসা শুরু করেন। সেই থেকেই কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের বাজারের খ্যাতি। তা ছাড়া এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৌলতে শহর ও শহরতলির বিদ্যার্থী ও শিক্ষাব্রতীরা এই অঞ্চলে এসে আড্ডা দিতে শুরু করেন। কফি হাউস, বসন্ত কেবিন বা দিলখুশা কেবিন ছিল সেই সমস্ত শিক্ষাবিদের আড্ডার আঁতুড়ঘর। ফলে বিদ্যাভ্যাসের একটা সর্বজনীন ক্ষেত্র তৈরি হল। বইয়ের ব্যবসাও রমরমিয়ে চলতে শুরু করল। ওয়াজেদ আলির ভাষায়, ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে...।’‌ ■

শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি, প্যারিস।
 

জনপ্রিয়

Back To Top