সত্যজিৎ রায়ের মোট ২১টি ছবির আলোকচিত্রশিল্পী, পরিভাষায় ‘‌সিনেমাটোগ্রাফার’‌ ছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। ‘পথের পাঁচালী’ থেকে পরপর বেশ কয়েকটি ছবিতে সহকারী চিত্রগ্রাহক ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছবি তোলার বহু অভিজ্ঞতা তাঁর। কীভাবে সত্যজিৎ তাঁর কল্পনাকে ক্যামেরায় ধরে রাখতেন, আলো–‌ছায়াকে কীভাবে ব্যবহার করতেন, কীভাবে দৃশ্যের পর দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলতেন বিষাদ, আনন্দ, প্রকৃতি। সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন (২ মে, ১৯২১) উপলক্ষে আলোকচিত্রের জাদুকর সৌম্যেন্দু রায়ের কাছ থেকে জেনেছেন সুদেষ্ণা গোস্বামী।  ছবি সৌম্যেন্দু রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে। আঁকা ছবি দেবব্রত ঘোষের।

খেলনা ব্লকের মতো সারি–‌সারি ঘরবাড়ি, কত মানুষজন, কিছু আকাশচুম্বী বাড়ি, অগণিত গাড়ি, মার্কিনি আগ্রাসন, অষ্টপ্রহর রাজনীতি, আপাত অবহেলিত অভিমানী বাঙালি— সে সবের মধ্যেই চিরজীবিত, চিরভাস্বর, ‘সত্যজিৎ রায়’। 
যখন খুব ছোট, তখন ভাবতাম, ‘সত্যজিৎ রায়’, কলকাতায় বোধহয় অনেকজনের নাম। তাঁদের মধ্যে একজন ফেলুদার গল্প লেখেন, একজন লেখেন প্রোফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চারের ডায়েরি, আরেকজন অসাধারণ ছবি আঁকতে পারেন, আর অন্যজন সিনেমা বানান, পিয়ানো বাজান— আরেকটু বড় হতে বুঝেছিলাম, ‘সত্যজিৎ রায়’ আদপে এক বিশ্বদৃষ্টির নাম। একই সঙ্গে বাঙালির মননের নামও বটে। তাঁর আন্তর্জাতিক দর্শন ও বিস্তীর্ণ সৃজনশীল জীবনের যে বিপুল চরাচর, তা যে কোনও মানুষের পক্ষে একজন্মে বা এক–‌কর্মজীবনে কুলিয়ে ওঠা ক্ষমতার অতীত। একথা অনস্বীকার্য। 
পরবর্তীকালে সৌম্যেন্দু রায়ের কাছ থেকে ক্যামেরা প্রশিক্ষণপর্বে গভীরভাবে জেনেছি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র–‌ভাষা ও শিল্পশৈলী । সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কেটেছে তাঁর দীর্ঘ সময়। তথ্যচিত্র, ছোট ও পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্য মিলে মোট ২১টি ছবির আলোকচিত্রশিল্পী বা পরিভাষায় ‘‌সিনেমাটোগ্রাফার’‌ ছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। তার আগে ‘পথের পাঁচালী’ থেকে পরপর ছবিতে সহকারী চিত্রগ্রাহক ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছবি তোলার বহু অভিজ্ঞতার তাঁর। ছবি তোলবার আলো, ক্যামেরা নিয়ে কীভাবে ভাবতেন?‌ কঠিন দৃশ্যের ছবি তোলা হত কীভাবে?‌ সেসব কথাই কখনও কাজ শেখাতে গিয়ে ধরে ধরে বুঝিয়েছেন আমাকে, কখনও গল্প করেছেন। গত ২৮ এপ্রিল, রবিবার বিকেলে, শোনালেন আরও অনেক ঘটনা। সব মিলিয়ে সত্যজিৎ রায়কে আরও একবার  নতুন করে জানবার চেষ্টা। আলোছায়ার সত্যজিৎ।   

তিন কন্যা 

‘তিন কন্যার’ সময় বাক্স আলো বানিয়ে নিয়েছিলাম। কাঠের একদিক খোলা বাক্সের মধ্যে সারি–‌সারি ২০০ ওয়াটের নতুন বাল্ব লাগিয়ে নিতাম।’‌


সেই সময় এখনকার মতো বিবিধ ও উন্নত স্টুডিও লাইট পাওয়া যেত না। অনেক সীমিত সম্ভারকে কাজে লাগিয়ে ছবি তৈরি হত। তার মধ্যেও সত্যজিৎ রায়ের ছবির ইমেজারি বাকি আর পাঁচটা ছবি থেকে এতটাই আলাদা হত যে, তা নিয়ে আলোচনা হত সর্বত্র। সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌মানিকদা অসাধারণ ভাবে গল্পের বুনন করতে পারতেন এবং তাঁর ছবিতে একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী ফটোগ্রাফি ওঁকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দিয়েছিল। মানিকদা বলতেন, চৌকো জানলা দিয়ে যদি স্টুডিওর গোল আলো আসে, তবে অস্বাভাবিক লাগবে। সেটা অবাস্তব আলো হবে।’ 
এদিকে তখন স্টুডিও–‌লাইট হিসাবে গোলাকৃতি আলোই ব্যবহার করা হত। তাই সুব্রতবাবু (মিত্র) চৌকো বাক্স‌ আলো বানিয়ে নিলেন, আমিও ‘তিন কন্যার’ সময় বাক্স আলো বানিয়ে নিয়েছিলাম। কাঠের একদিক খোলা বাক্সের মধ্যে সারি–‌সারি ২০০ ওয়াটের নতুন বাল্ব লাগিয়ে নিতাম। কোনও বাক্সে ৬টা, কোনও বাক্সে ১২টা, আবার কোনওটায় ১৮টা বাল্বের বাক্স–‌লাইট রাখতাম। প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতাম। যেমন ৬টা বাল্বের বাক্সে ১২০০ ওয়াট আলো পেতাম। শুটিংয়ের টেকনিক্যাল ভাষায় একে বলা যেতে পারে এক কিলো দুশো । এই বাক্স–‌আলোর সামনে টিস্যু ব্যবহার করে ‘‌হার্ড–‌স্যাডোলেস লাইটিং’‌ করেছিলাম। যে আলো কড়া, কিন্ত‌ ছায়া পড়ে না।
এই জানলা প্রসঙ্গে সৌম্যেন্দু রায় আরও বললেন, ‘‌মণিহারা ছবির চিত্রনাট্য লেখার সময়ই মানিকদা নোট রেখেছিলেন মণিমালিকার শোবার ঘরে দুটো বড় জানলা দেখা যাবে। এই ছবির শুটিং বেশিরভাগটাই সেট তৈরি করে হয়েছিল, কাজেই সেক্ষেত্রে জানলা দেখাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আলো করার সময় আমাকে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়েছিল, চিত্রনাট্য অনুযায়ী জানলার ঠিক বাইরে দিয়ে বইবে এক বিস্তীর্ণ নদী। সুতরাং, যে কটা দৃশ্যে জানলা দেখা যাবে সেখানে নদীর জলে রোদের বিপুল প্রতিফলন আমাকে কৃত্রিম আলো দিয়ে সৃষ্টি করতে হবে । মানিকদা ও আর্ট ডিরেক্টর বংশীদার (চন্দ্রগুপ্ত) সঙ্গে পরামর্শ করে জানলার বাইরে বড় সাদা ক্যানভাস টাঙিয়ে তাতে নীল আকাশ ও দূরে নদীর সীমারেখার একটা আভাস এঁকে দেওয়া হয়েছিল। ক্যানভাসের ওপর আলো ফেলে নদীর জলে সূর্য ও আকাশের জোরালো প্রতিফলনকে সঠিকভাবে দেখানো সম্ভব হচ্ছিল না, তাই প্রতিটা শটে জানলার বাইরেটা ওভার–‌এক্সপোজ করে শট নিয়েছিলাম। দেখে মনে হচ্ছিল, নদীর জলের উজ্জ্বলতায় জানলার বাইরেটা আলোয় জ্বলে যাচ্ছে।’‌

রবীন্দ্রনাথ

‘‌মনে আছে, সেদিন ঘোর বর্ষায় শুটিং হচ্ছে পদ্মার তীরে। সকাল থেকেই বৃষ্টি হয়ে চলছে অবিরাম।  আমরা তখন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বের শুটিং করছি।’‌ 

১৯৬১–‌তে গুরুদেবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে ফিল্ম ডিভিশনের অনুরোধে সত্যজিৎ রায় ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সৌম্যেন্দু রায় মনে করেন, সত্যজিৎ রায় অপরিমেয় আবেগের মিশ্রণে ছবিটিতে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন।  বললেন,
‘‌তথ্যচিত্রে বাংলার ছয় ঋতুর কথা বলা হবে এবং তার মধ্যে বর্ষা কালই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয়, ধারাভাষ্যে এমন একটা লাইন রাখা হবে জানতাম। তার সঙ্গে বর্ষার কোনও একটি বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহৃত হবে। মনে আছে, সেদিন ঘোর বর্ষায় শুটিং হচ্ছে পদ্মার তীরে। সকাল থেকেই বৃষ্টি হয়ে চলছে অবিরাম। আমরা তখন রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বের শুটিং করছি। শুটিং চলাকালীন মানিকদা ভরাট কণ্ঠে আমাকে বললেন, ‘‌‌তোমার ক্যামেরাটা দাও তো।’‌‌ ওঁর হাতে ক্যামেরা দেওয়ার এক মুহূর্ত আগেও টের পাইনি যে মানিকদা দামাল নদীতে নেমে যাবেন। প্রথমে তিনি হাঁটু–‌জল অবধি নেমে দাঁড়ালেন। তারপর সোজা বুক‌–‌জলে চলে গেলেন ক্যামেরা নিয়ে। এমন সময় আমাদের ইউনিটের কেউ একজন বলে উঠল, ‘মানিকদা আপনার ঘড়িটা?’ স্পষ্ট মনে আছে, মানিকদা জল ঠেলতে–‌ঠেলতে পিছন না ফিরে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ওয়াটারপ্রুফ’। বৃষ্টি গায়ে ফুটছে তীরের ফলার মতো এসে। মানিকদা তার মধ্যে ওই ভারী, পেল্লাই ক্যামেরায় চোখ রেখে শট নিচ্ছেন। আমিও অতি কষ্টে জলের উল্টো স্রোত ঠেলে মানিকদার পাশে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, মানিকদার বুক–‌জল মানে আমার তো গলা–‌জল । প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম। নদীর জলে বৃষ্টির বড়–‌বড় ফোঁটা এসে পড়ছে। মানিকদা সেই দৃশ্যকে ধরবার চেষ্টা করছিলেন। আকাশে মেঘ ডাকছিল ক্রমাগত।’‌ এই দৃশ্যপট সৌম্যেন্দু রায়ের চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে। একটু থেমে উনি বললেন, ‘‌আমি জানি না, অন্য কোনও পরিচালক এমন রিস্ক নিতে পারতেন কি না। বর্ষার পদ্মা খুব বিপজ্জনক। যে কোনও মুহূর্তে মাটিতে ভাঙন ধরতে পারে। মানিকদা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে এমন‌ই ইনভল্‌বড ছিলেন। সামনে কোনও রকম বাধাকে তোয়াক্কা করতেন না। মানিকদা সেই দিন উত্তাল পদ্মায় শুধুমাত্র ভাল শট পাওয়ার জন্য মৃত্যুভয়কে জয় করতে পেরেছিলেন।’‌ 
অভিযান

‘‌নরসিংয়ের গাড়ি যখন রাস্তা দিয়ে চলবে, তখন হেডলাইটের আলোয় আমি গ্রামের কিছুটা দেখতে চাই।’‌ 

‘অভিযান’–‌এর সিনেমাটোগ্রাফি বিখ্যাত হয়েছিল অসাধারণ মুড লাইটিং ও আলো–‌আঁধারির দুর্দান্ত সন্নিবেশের জন্য। সেখানে পরিচালক তাঁর চিত্রগ্রাহককে ক্রমাগত মদত ও উৎসাহ দিয়ে গিয়েছিলেন। এই দুর্দান্ত বোঝাপড়ায় তৈরি হয়েছিল এমন এক সৃজনশীল কাজ যা দেখে গোটা বিশ্ব মুগ্ধ হয়েছিল। 
সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌অভিযান’–‌এর শুটিংয়ের সময় মানিকদা হঠাৎ সন্ধেবেলা বললেন, নরসিংয়ের গাড়ি যখন রাস্তা দিয়ে চলবে, তখন হেডলাইটের আলোয় আমি গ্রামের কিছুটা দেখাতে চাই। এই কথা শুনে আমি একটু নার্ভাসই হয়ে যাই। কারণ, তখন আমাদের ফিল্মের স্পিড খুবই কম, তাতে এই ধরনের শট ঠিক এক্সপোজ হওয়া খুব মুশকিল। আর হেডলাইটের আলো মাত্র ১২ ভোল্টের। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে মানিকদাকে সেই কথা জানালাম। এমন সময় আমার এক সহকর্মী ইলেক্ট্রিশিয়ান বললেন, তাঁর কাছে এরোপ্লেনের ল্যান্ডিং লাইট আছে, যা ২৪ ভোল্টের ব্যাটারিতে চলে। মানিকদা বললেন, ‘এটা দিয়ে চেষ্টা করে দেখো তো!’ এই পরামর্শ ম্যাজিকের মতো কাজ করল। ঠিক যেমনটি চাইছিলাম। গাড়ির হেডলাইটের সঙ্গে সেই আলোকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হল যে, বোঝা গেল না আলাদা কোনও আলো আছে। ব্যাটারি গাড়ির ডিকিতে রেখে গাড়ি চালিয়ে রাখা হল। আর এমনভাবে ছবি তুললাম, যেন মনে হল, গাড়ির আলোতেই গ্রামটাকে আংশিক দেখা যাচ্ছে। এটা শুট করে আমি নিজেই খানিক বিস্মিত ও আনন্দ পেয়েছিলাম। তবে মানিকদা নিরুত্তাপ থেকে আমাকে বললেন, ‘ওয়েল ডান রায় !’ বোঝো কাণ্ড, মানিকদা এই শটের আইডিয়া ও সাহস না জোগালে আমি শুট করতাম কী করে!’‌ সৌম্যেন্দু রায় হেসে বললেন, ‘‌আরও একটা দৃশ্য— মামা–‌ভাগ্নে পাহাড়ে নীলি ও তার বন্ধু অপেক্ষা করছে। সেখানে নরসিং গাড়ি নিয়ে আসবে এবং নীলিরা পালিয়ে যাবে। এখানে এই তিন চরিত্রের মধ্যে রাগ, অভিমান, সন্দেহের মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। এটা ছিল একেবারে নিঝুম রাতের সিকোয়েন্স। আমাকে আনক্যানি, অস্বস্তিকর অনুভূতিটা ফুটিয়ে তুলতে হত। আমি এই দৃশ্যে শুধুমাত্র পাঁচ ব্যাটারির টর্চ লাইট ও গাড়ির হেডলাইট ব্যবহার  করেছিলাম। এতে যেটুকু আলোকিত হয়েছিল সেটুকুই। আর অতিরিক্ত কোনও আলো আমি ব্যবহার করিনি। পরে মানিকদা প্রোজেকশনে রেজাল্ট দেখে দারুণ খুশি। মানিকদাকে সন্তুষ্ট করতে পেরে নিজেকে সার্থক মনে হত। তৃপ্ত লাগত। ওই সিকোয়েন্সে দারুণ ক্রিয়েটিভ এক্সপ্রেশন হয়েছে সেই সুখ্যাতি পেয়েছিলাম। মানিকদা আমাকে বরাবর এক্সপেরিমেন্ট করার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা করবার সময়ে তাঁকে সঙ্গে পেয়েছি বলেই কাজ উতরে গেছে।’‌

গুপী গাইন
বাঘা বাইন

‘‌ভাল–‌মন্দের ব্যাপারটাকে সেট ডিজাইনিংয়ে যেমন বোঝানো হবে, তেমনই তোমাকে আলো দিয়ে সেই ফারাকটা তৈরি করতে হবে।’‌ 

গুপী গাইন বাঘা বাইনের সত্যজিৎ রায় চিত্রনাট্য পড়ার পর সৌম্যেন্দু রায়কে বলেছিলেন, ‘‌দেখো, এখানে গল্পে দুটো রাজা আছে, দু রকম তাদের চরিত্র— একজন খুব ভাল এবং অন্যজন খারাপ। সেই ভাল–‌মন্দের ব্যাপারটাকে সেট ডিজাইনিংয়ে যেমন বোঝানো হবে, তেমনই তোমাকে আলো দিয়ে সেই ফারাকটা তৈরি করতে হবে।’‌ সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌মানিকদার কথা শুনে আলো নিয়ে আমাকে ভাবনাচিন্তা করতে হয়েছিল। শুণ্ডির রাজার ক্ষেত্রে কিছুটা ‘‌হাই–‌কি–‌ফটোগ্রাফি’‌ করেছিলাম। অর্থাৎ শুভ্র–‌সেটে আলোছায়ার বৈসাদৃশ্য যাতে তুলনামূলক কম থাকে। সচেতনভাবে চেষ্টা করেছিলাম রাজার মনের সরলতা ও কোমলতাকে বজায় রাখতে ‘‌বাউন্স লাইট’এর‌ ব্যবহারে। এই সিকোয়েন্সগুলোতে কখনও সরাসরি আলো ব্যবহার করিনি। আবার হাল্লার রাজার মনের প্যাঁচ বোঝাতে আলোছায়ার আশ্রয় নিতে হয়েছিল। লক্ষ্য রেখেছিলাম সামগ্রিক ভাবে কালোর ঘনত্ব যেন থাকে। সেই মতো ছবি তোলবার আগে আলোগুলো বসানো হল। ছায়া গাঢ় হয়ে রইল। তৈরি করল এক কুটিল আবহ।  আবার একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হয়েছিল, আলো সাজাতে গিয়ে দৃশ্য যেন কৃত্রিম না লাগে।’‌  আরও একটি দৃশ্য মনে পড়ে—বাঁশবাগানে গুপীর সঙ্গে বাঘার প্রথম দেখা হচ্ছে। সেই সময়ে বাঘের আনাগোনার বিষয় ছিল। বাঁশঝাড়ের কাছে ঘাসজমিতে বাঘ এসে ঘুরছে এবং মুখ তুলে শীতল চোখে দেখছে—  এই শটগুলো একবার তোলবার পর, আবার তুলতে  হয়েছিল। সৌম্যেন্দু বললেন, ‘‌আসলে প্রথমবারের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে একটা টেকনিক্যাল সমস্যা হয়। নেগেটিভ ডেভেলপ করবার পর দেখা গেল, নিরাপত্তার কারণে বাঘের গলায় যে চেন ছিল, ছবিতে সেটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাজেই আমাদের দ্বিতীয়বার শুটিং ছাড়া উপায় ছিল না। পরেরবার মানিকদা ও আমি— দুজনেই খুব সতর্ক ছিলাম।’‌
অশনি সংকেত

‘‌আলো এতটাই কম ছিল যে, লাইট–‌মিটারে অ্যাপারচারের কোনও মাপই উঠছিল না। লাইট মিটারের কাঁটা নড়ছিল না।’‌

৪৩–‌এর ভয়াবহ খাদ্যসঙ্কট ছিল এই ছবির বিষয়বস্তু। প্রকৃতির রূপ–‌শ্যামলিমা অক্ষুণ্ণ ছিল দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে। শুধু এক–‌এক করে মানুষগুলো খাদ্যের অভাবে উধাও হয়ে যাচ্ছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ধরতে সত্যজিৎ রায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কোডাক ইস্টম্যান কালারে শুটিং করবেন। প্রথম রঙিন ছবিতে চিত্রগ্রাহক হিসাবে কাজ করতে যাচ্ছেন সৌম্যেন্দু রায়। তঁার দুচিন্তা, ছবিতে রঙ ঠিক উঠবে তো?‌ শুটিংয়ের আগে সত্যজিৎ রায় একদিন সৌম্যেন্দু রায়কে ডেকে বললেন, ‘‌আরে তুমি ভাবছ কেন যে, এটা কালার ছবি! তোমার এক্সপোজার কারেক্ট থাকলে ছবি সাদাকালো হোক বা রঙিন— রঙ সঠিক উঠবেই।’‌ এই সামান্য কথাটাই সৌম্যেন্দু রায়ের ভরসা বেড়ে গেল। 
দুজনে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আগস্ট অর্থাৎ বাংলার শ্রাবণ মাসে শুটিংয়ের তারিখ রাখলেন। মূলত অবসাদ ও দুর্ভিক্ষের বিষাদময় দৃশ্যগুলোর শুটিং করা হত মেঘলা আকাশে বিকেলের দিকে। আর দুর্ভিক্ষের আভাস পাওয়ার আগের দৃশ্যগুলো তোলা হত সকালের দিকে। এইভাবে প্রকৃতির আলোকে গল্পের মুডের সঙ্গে সত্যজিৎ–‌সৌম্যেন্দু দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। 
এক দৃশ্যে একদিকে গঙ্গাচরণ অন্য গ্রামে চালের সন্ধানে গিয়েছিল, আর অন্যদিকে খাদ্যের অভাবে ওর স্ত্রী অনঙ্গ বউ, ছুটকি ও গ্রামের অন্যদের সঙ্গে মেটে আলু তুলতে জঙ্গলে যায়। সেখানে ঝোপঝাড় জংলার আড়ালে শিকারির মতো ওত পেতে কোনও লোক অনঙ্গের ওপর আক্রমণ করে। শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়। অপমান, লজ্জা, ঘৃণায় অনঙ্গ চলার শক্তি হারায়। সেই জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে তাকে ঘরে ধরে নিয়ে আসে ছুটকিরা। অনঙ্গ বউ অনুরোধ করে ঘটনাটা গোপন করতে ও একই সঙ্গে শঙ্কিত হয়ে বলে, ‘‌ছুটকির পেটে কোনও কথা থাকে না।’‌ পাল্টা ছুটকি উত্তর দেয়, ‘‌দেখো বামুন দিদি, তোমায় নিয়ে যখন কথা, জেনো 

সংবেদনশীলতাকে আরও প্রখর করে তোলে। কিন্তু সেই দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় আলো এতটাই কম ছিল যে, লাইট–‌মিটারে অ্যাপারচারের কোনো মাপই উঠছিল না। লাইট মিটারের কাঁটা নড়ছিল না। এই অবস্থায় ছবি তুললে এক্সপোজ না হওয়ারই শঙ্কা ছিল। 
এই ঘটনা জানাতে গিয়ে সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌তখনকার দিনে কোডাকের ১০০ এএসএ স্পিডের স্টক ব্যবহার করা ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না। বিকেলের মরা আলোয় চরিত্রের মুখ এক্সপোজ হবে কিনা সেই নিয়ে ভয় ছিল খানিকটা। তাও মানিকদা আর আমি আলোচনা করে শটটা নিয়ে নিই। উনি বলেছিলেন, ‘নিয়ে নাও। যদি আন্ডার হয় তবে পরে না হয় আবার নিয়ে নেওয়া যাবে।’আমি এফ স্টপ ২ রেখে শুট করলাম। বলা বাহুল্য, শটটি আর রি–‌টেক করতে হয়নি। মাদ্রাজ থেকে কারেকশন হয়ে ছবি ফিরে এলে, মানিকদা রেজাল্ট দেখে দারুণ খুশি। বলেছিলেন, ‘দেখলে রায়, তুমি তো ছবিটা তুলতেই চাইছিলে না!‌ অথচ কী ভালই না হল!‌ সত্যি, পরবর্তীকালেও শটের ‘‌ডেনসিটি অফ শ্যাডো’‌ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বার্লিনে গোল্ডেন বেয়ার (১৯৭৩) পাওয়ার পরে ‘অশনি সংকেত’ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল মনে আছে।’‌ 

অরণ্যের দিনরাত্রি

‘‌সেই সময় জেনারেটর না থাকায় কোনও ‌আর্টিফিসিয়াল লাইটের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।’‌ 

ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শুধুমাত্র ভাটিখানার কিছু অংশ ও কাবেরী বসু–‌শুভেন্দু চ্যাটার্জির ড্রইং রুমের কথোপকথন ছাড়া বাকি সব দৃশ্যই মূলত স্বাভাবিক আলোয় শুট করা। এ সত্যি এক বিস্ময়কর ঘটনা।  সৌম্যেন্দু রায় এই বিস্ময়কে উন্মোচন করলেন— ‘‌মানিকদা অন্যান্য অভিনেতা–‌অভিনেত্রী ও কলাকুশলীদের স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনালেন। আমার মনে আছে, লোকেশন দেখার আগে লেখক বুদ্ধদেব গুহ সাজেস্ট করেছিলেন পালামৌর নাম। সেখানে মানিকদা ছিপাদহর ও কেচকি নামে দুটো জায়গা নির্বাচন করেন। মানিকদার সঙ্গে লোকেশন দেখার পর আমি আলোক সম্পাতের একটা পরিকল্পনা করেছিলাম— কীভাবে সীমিত আলোয় শুটিং করা যায়। পরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেমন আলো পাওয়া গেছে তাতে শুটিং করতে হয়েছে। সেই সময় জেনারেটর না থাকায় কোনও কৃত্রিম (‌আর্টিফিসিয়াল)‌ লাইটের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। বেশ কিছু জায়গায় অবশ্য আলো না থাকায় যথেষ্ট অসুবিধা বোধ করেছিলাম। যেমন, ফরেস্ট বাংলোতে, যেখানে চার বন্ধু থাকত, সেখানে কয়েকদিন আগেই সাদা চুনকাম করা হয়েছিল। সেখানে সাদা দেওয়ালকে বাগে আনতে বেশ ঝঞ্ঝাট হচ্ছিল। তাও বাংলোতে স্বাভাবিক আলোকে আয়না ও রিফ্লেক্টরের মাধ্যমে কাজ লাগিয়ে ব্যবহার করেছিলাম। একে ‘রিলে লাইটিং’ বলা হয়। সূর্যের আলোকে আয়নায় প্রতিফলিত করে তার সেই প্রতিফলনকে রিফ্লেক্টরে ফেলে তার থেকে জোরালো আলো তৈরি করা। আমি সেই বিচ্ছুরিত আলোকে কখনও ‘‌ফিল লাইট বুস্ট–‌আপ’‌ করার জন্য বা কখনও হাই–‌লাইটকে ‘‌এনহ্যান্স’‌ করেই ‘অরণ্যের দিনরাত্রির’ দিনের দৃশ্যগুলোর আলো তৈরি করেছি। এতে জঙ্গলের বুনো চেহারাটা ফুটে উঠেছিল। মাত্র দুটো দৃশ্যে আমি খুব সামান্য ‘‌অতিরিক্ত আলো’‌ ব্যবহার করেছিলাম। সেখানে শর্মিলা ঠাকুর সৌমিত্রকে একটা নোটে টেলিফোন নম্বর লিখে দিচ্ছে আর যেখানে চারবন্ধু টুইস্ট করছে। গাড়ি থেকে শর্মিলা ও কাবেরী দেখছে। এখানে গাড়ির ভিতর ওদের মুখের রিঅ্যাকশন দেখানোর জন্য আলোর প্রয়োজন ছিল। আমি অতি সামান্য আলো দিয়েছিলাম। সেটে মাত্র দুটো দৃশ্য ছাড়া বাদবাকি সবটাই স্বাভাবিক আলোয় তুলেছিলাম। এই ভাবনায় মানিকদার অনুমতি না থাকলে আমি কিছুতেই এইভাবে কাজ করতে পারতাম না।’‌ 

হীরক রাজার দেশে

উমার মুখের কাছে লাইটের রেশিওটা মাপার জন্য মিটারটা ধরতেই বাঘিনীজি হালুম করে উঠলেন। 

ছোটবেলায় ‘হীরক রাজার দেশে’ দেখার অন্যতম টান ছিল, বাঘের মাথা টপকে কী করে গুপী–‌বাঘা চাবির থোকাটা নিতে পারবে। বাঘকে বশ করতে পারা তো আর মুখের কথা নয়!‌ এই দৃশ্যটা দেখার পর একটা ঘোর কাজ করত,  
আমাকে এই দৃশ্যের শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা বিশদে বলেছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। মজার গল্পও বলেছিলেন।
‘‌‌বাঘিনীটার নাম ছিল উমা। এক দক্ষিণ ভারতীয় দম্পতি ওর দেখাশোনা করত। বাঘিনীটা এমনিতে খুবই ভাল ছিল। কিন্তু সে তো আর মানুষ–‌অভিনেতা নয়, কাজেই ফিল্মের ইউনিট সদস্যরা ভয়ে বিশেষ একটা কেউ ওর ধারে–‌কাছে যাচ্ছিল না। এদিকে মানিকদা শট নেওয়ার জন্য প্রায় রেডি। আমিও আলো তৈরি করে, সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখার জন্য লাইট মিটারটা নিয়ে মাপতে গিয়েছি। হঠাৎ কী যেন মনে হল, উমার মুখের কাছে লাইটের রেশিওটা মাপার জন্য মিটারটা ধরতেই বাঘিনীজি হালুম করে উঠলেন। আর আমি ভয়ে ছিটকে পড়েছি।‌ মনে হচ্ছিল, লাইট মিটারশুদ্ধু আমার হাতটাই বাঘিনীর পেটে চলে গেল বুঝি। সেদিন খুব বাঁচা বেঁচেছিলাম!‌’‌ 
গল্পটা বলে সৌম্যেন্দু রায় প্রাণ খুলে হাসছিলেন। 

সদ্‌গতি

‘‌সূর্যকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যামেরায় এক্সপোজার দিয়েছিলাম। ’‌

সদ্য অপমানিত দুখি প্রচণ্ড ক্রোধে ও নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কুঠার চালাচ্ছিল। এই দৃশ্যে ক্যামেরা কীভাবে হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার? 
সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌সরাসরি সূর্যকে গুরুত্ব দিয়ে বা আংশিক বিষয় (‌পারশিয়াল সাবজেক্ট)‌ করে জীবনে প্রথম ছবি তুলেছিলাম ‘সদ্‌গতি’–‌তে। দুখি মারা যাওয়ার খানিক আগে  ব্রাহ্মণ ঘাসিরামের নির্দেশে কাঠ কাটতে গিয়েছিল। সেই দৃশ্যে মানিকদা লো–‌অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ফলে কাঠকাটার সময় দুখি যখনই মাথা নীচু করছে তখনই মাথার পিছনে গনগনে সূর্য লেন্সে এসে ধাক্কা মারছে। আবার দুখি পর মুহূর্তে মাথা তুললে সূর্যটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত এটা চলার ফলে একটা টেনশন তৈরি করেছিল। আমি সূর্যকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যামেরায় এক্সপোজার দিয়েছিলাম। ফলে সূর্যের ঝলসানি থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলাম। মানিকদার ছবিতে এর আগে কখনও কোনও শটে এমন রাগের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি। আসলে, দর্শকের মনে দুখির মতো এক কোণঠাসা মানুষের মারা যাওয়ার ঘটনা একটা অন্য রকম ইমপ্যাক্ট সৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন মানিকদা।’‌
আরেকটি দৃশ্য ছিল অবিস্মরণীয়— যেখানে ভোরের আলোয় দুখি চামারের মৃতদেহের পায়ের পাতায় ব্রাহ্মণ দড়ির ফাঁস লাগাচ্ছে। এই যন্ত্রণা ও ব্যঞ্জনাকে ফুটিয়ে তুলতে সৌম্যেন্দু রায়কে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হয়েছিল। 
বললেন, ‘‌আসলে কি জানো, এই দৃশ্যের একটাই বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল— লাইট কন্টিনিউটি। ভোরের আলোর এফেক্টটা বজায় রাখার জন্য আমাকে খুব সচেতন থাকতে হয়েছিল। কারণ এই দৃশ্যে সকালের আলোর রেশ ফুটে যাওয়া মানে, গল্পের এসেন্সটাই নষ্ট হয়ে যাওয়া। ব্রাহ্মণকে যে ‌করেই হোক আলো ফোটার আগেই তো দুখি চামারের মৃতদেহকে অন্যত্র ফেলে আসতে হবে। আর মানিকদা শট–‌ডিভিশন করেছিলেন অনেকগুলো টুকরো–‌টুকরো শটে। এবং প্রত্যেকটা শটেই আমাকে আকাশের দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছিল। অ্যাপারচারটা আকাশকে নিয়ন্ত্রণ করেই দিয়েছিলাম। ফলে ঘাসিরামের দেহ–‌মুখে ঘন ছায়াটা একদম স্বাভাবিক লাগছিল। তবে ওম পুরীর অসুস্থতার কারণে আমাদের দুটো শট কলকাতায় ফিরে এসে গল্ফ ক্লাবে নিতে হয়েছিল। মানিকদা ‘সদ্‌গতি’র শুটিং সেপ্টেম্বর মাসে করলেও সৌভাগ্যবশত মেঘলা আকাশ পেয়েছিলাম। তাতে আবছা ভোরের আলোয় ওই বেদনাময় দৃশ্য তুলতে বাড়তি সুবিধা পেয়েছি। মানিকদার মতো এত টেকনিক্যালি সাউন্ড পরিচালক মাথার ওপর থাকলে অনায়সেই রিয়াল্যাস্টিক ফটোগ্রাফি করা সম্ভব হয়।’‌
‘‌তাছাড়া ‘পথের পাঁচালী’র মতো ‘সদ্‌গতি’–‌তেও আসল বৃষ্টিতেই বৃষ্টির দৃশ্যটা শুটিং করেছিলাম।’‌ সৌম্যেন্দু রায় বললেন, ‘‌ঘটনাটা বলি, একদিন লাঞ্চ ব্রেকের আগে মানিকদা বললেন, আমি এখন আর কোনও শট নেব না। ট্রলির আয়োজন করো। বিকেলের আলোয় স্মিতার শট নেব একেবারে। এমন সময়ে আকাশ কালো করে বৃষ্টি এল। বৃষ্টি শুরু হতেই মানিকদা আমাকে এসে বললেন, রায় কী করা যায় বলো তো! বৃষ্টিতে কি শুটিং করব? আমি বললাম, অসময়ের বৃষ্টি। যদি মাঝপথে থেমে যায়...?’ মানিকদা বললেন, ‘চলো, চেষ্টা করে দেখি। তাছাড়া স্মিতাকেও তো ছেড়ে দিতে হবে। বোম্বে যাবে।’ কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ৫৫ মিনিট ধরে বৃষ্টি হয়েছিল। আর আমাদের চারটে টেক হয়েছিল। শেষ টেক হয়ে যাওয়ার পর বৃষ্টিটা থেমে গেল। রেন–‌মেশিনের বৃষ্টিতে কস্মিনকালেও কিন্তু এমন জীবন্ত শট পাওয়া সম্ভব হত না। আসলে কী জানো, এগুলোকেই বলে ‘রে–‌টাচ’।’‌ 
সৌম্যেন্দু রায় আজও মনে করেন, তিনি ছিলেন সত্যজিতের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত এক শিক্ষার্থী।
 ‘‌মানিকদার কাছে জীবনভর কত কিছু যে শিখেছি, তার সীমা নেই। আর একটা বিষয় উপলব্ধি করেছি, অনেক সময় অতিরিক্ত টেকনিক্যাল প্রাচুর্য ছবির মুডকে নষ্ট করে দেয়। তাই মানিকদা সীমিত আয়োজন ও উপকরণের মধ্যে কাজ করতেই পছন্দ করতেন।’‌ 
সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে বললেন, ‘‌একটি দিনের কথা আজ বারবার মনে পড়ছে। একবার মানিকদা ওঁর জন্মদিনে আউটডোরে ছিলেন। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’–‌র শুটিংয়ে। মানিকদা কাজ নিয়ে সাঙ্ঘাতিক ব্যস্ত। আমি, সৌমিত্র ও রবি জঙ্গলের মধ্যে হন্যে হয়ে ঘুরছি, মানিকদার জন্মদিন সেলিব্রেট করব বলে, যদি কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু পালামৌয়ের জঙ্গলে আর কিই বা পাব ! বাংলোতে ফিরে এসে দেখি উঠোনে চেয়ার–‌টেবিল পাতা। খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন। মোহন বিশ্বাস নামে একজন, যিনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, তিনি সব আয়োজন করেছেন। সাঁওতাল মেয়েরা এসেছেন, নাচ দেখানোর জন্য। শর্মিলা, সিমি, রবি, আমরা সকলে মিলে সাঁওতালি নাচের বোলে পা মিলিয়ে ছিলাম। মানিকদাকেও জোর করা হয়েছিল একসঙ্গে আনন্দ–‌নাচে পা মেলানোর জন্য।’‌ 
মুগ্ধতায় এখন এসব কথা শুনে মনে হচ্ছে— সত্যি, প্রায় জন্মশতবার্ষিকীর দিকে এগিয়েও সত্যজিৎ আজও কী প্রচণ্ড তরুণ! কী প্রচণ্ড জীবন্ত! আর সৌম্যেন্দু রায় যেন স্মৃতির আশ্রয়ে এক নিষ্ঠাবান শিল্পীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বসে আছেন।‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top