অভিরূপ সরকার- আমার বাবা অরুণকুমার সরকার খুব বন্ধুবৎসল মানুষ ছিলেন। তাঁর বন্ধুবান্ধবের তালিকাটি বেশ সুপুষ্ট ছিল এবং সেই তালিকাভুক্ত প্রায় সকলেই ছিলেন স্বনামধন্য গুণী ব্যক্তি। যেমন নরেন্দ্রনাথ মিত্র, শিবনারায়ণ রায়, বিমল কর, গৌরকিশোর ঘোষ, অরুণ ভট্টাচার্য— এমন আরও কত বিশিষ্টজন। নীরেনকাকাও ছিলেন বইকি, বিশেষভাবেই ছিলেন। এঁরা প্রায় নিয়মিত একটি রবিবাসরীয় আড্ডাতে সম্মিলিত হতেন। অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বোধহয় ছিল। একটি শৈশবস্মৃতি এই প্রসঙ্গে মনে ভেসে ওঠে। বাবার উৎসাহে উদ্দীপিত হয়ে একবার এঁরা রবীন্দ্রকাননে, রবীন্দ্রমেলায় কাব্য–নাটক মঞ্চস্থ করলেন:‌ আলোক সরকারের ‘‌অশ্বত্থ গাছ’‌, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘‌প্রথম নায়ক’‌ এবং অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের একটি নাটক। এই পরিকল্পনার সূচনা অবশ্য হয়েছিল বিশ্বকবির ‘‌ফাঁকি’‌ কবিতার নাট্যরূপ দিয়ে। নাটকগুলি কেমন হয়েছিল তা যতটা মনে আছে, তার চেয়ে বেশি মনে আছে নিত্যদিন দেখা একটি দৃশ্য। সেদিনের আকর্ষণীয় সুপুরুষ নীরেনকাকা তাঁর বড় বড় পদক্ষেপ ফেলে আমাদের বাড়িতে রিহার্সালের জন্য অফিস–ফেরত সোজা এসে উপস্থিত হচ্ছেন, বাবার ফিরতে আরেকটু দেরি হবে, তিনি মাকে ‘‌স্ট্যান্ডিং ইনস্ট্রাকশন’‌ দিয়েই রেখেছেন নীরেনকাকাকে প্রথমেই কিছু খাইয়ে দেওয়ার। মায়ের খাদ্যতালিকাতে তাঁর জন্য একটি ‘‌ডিমের পোচ’‌ থাকা বাধ্যতামূলক ছিল কারণ তা একই সঙ্গে লঘু ও পুষ্টিকর। নীরেনকাকা বেশ কিছুদিন গ্যাসট্রিক আলসারে ভুগে সদ্য ‘‌ট্রপিক্যাল’‌ থেকে ছাড়া পেয়েছেন। বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে শিল্পী অহিভূষণ মালিক, রাজ্যেশ্বর মিত্র ও আমার বাবার সঙ্গে নীরেনকাকার উজ্জ্বল উপস্থিতির কথাও স্মরণে আসে। আমি তখন ৮–৯ বছরের বালক মাত্র। আমাকে দেখলেই নীরেনকাকা মজার মজার ধাঁধা জিজ্ঞেস করতেন। তারপর যখন তিনি ‘‌আনন্দমেলা’‌র দায়িত্ব নিলেন তখন আমি আরেকভাবে তাঁর ভক্ত হয়ে পড়লাম। এর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত তাঁর ছড়াগুলি আমার ভারী ভাল লাগত। আমরা, ছোটরা তখন ভিখারির মতো ‘‌আনন্দমেলা’‌র জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। সেই সময় বোঝার বয়স ছিল না, এখন বুঝতে পারি ‘‌আনন্দমেলা’‌ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর কত বড় সাংগঠনিক–সাংস্কৃতিক প্রতিভার অবদান ছিল। এর আগে ছোটদের কাগজ হিসেবে ‘‌মৌচাক’ পত্রিকার‌‌ খুব নাম ছিল। কত ভাল ভাল লেখা তার পৃষ্ঠাতে প্রকাশিত হয়েছিল:‌ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‌বুড়ো আংলা’‌, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘‌যখের ধন’‌, ‘‌আবার যখের ধন’‌, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘‌ডাকাতের হাতে’‌, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘‌কুহকের দেশে’‌। শিশু–কিশোর চিত্তস্পর্শী অপূর্ব সব রচনাসম্ভার। এইরকম এক প্রবল প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হতে বুকের পাটা লাগে এবং তাকে জিততে হলে  সাহসের সঙ্গে সঙ্গে কুশলী বুদ্ধিও থাকা দরকার। এ সবই তাঁর পূর্ণমাত্রায় ছিল। সবার আগে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজের একটি শক্তিশালী সহযোদ্ধা বাহিনী। এই দলে যেমন সেকালের নামজাদা সব লেখক ছিলেন, তেমনি সম্ভাবনাময় তরুণদেরও তিনি আকর্ষণ করে নিতেন। ‌এঁদের সবাইকেই তিনি ছোটদের জন্য কলম ধরিয়ে ছেড়েছিলেন। এঁদের কয়েকজনের নাম এই প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে বলতে পারি:‌ মনোজ বসু, বিমল কর, মণিশঙ্কর মুখার্জি (‌শংকর)‌, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন প্রমুখ। শান্তিনিকেতন থেকে প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনিই ‘‌আনন্দমেলা’‌র পৃষ্ঠাতে টেনে এনেছিলেন। তিনি অনুপ্রেরণা না দিলে মতি নন্দীর খেলার জগৎ নিয়ে লেখা বিখ্যাত উপন্যাস তিনটির জন্ম হত না। বাংলা ভাষায় প্রথম ক্রীড়াসাহিত্য এখান থেকেই সূচিত হয়েছিল বলা যায়। জহুরির চোখ থাকায় তিনি খুব সহজেই মানুষের ভিতরের সংগুপ্ত প্রতিভাকে বুঝে নিতে পারতেন এবং তার বিকাশের পরিবেশও যত্ন করে গড়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। অসম্ভব ‘‌প্রফেশনাল’‌ মানুষ ছিলেন। কারও কোনও লেখা অপছন্দ হলে সচরাচর মুখের ওপর কিছু বলতেন না, কিন্তু ভাল লাগলে হাজারবার প্রশংসা করে তার লেখার উৎসাহ বাড়িয়ে দিতেন। তিনি যখন ‘‌আনন্দমেলা’‌তে ছিলেন আমি তখন সেখানে ছড়া লিখে তাঁর কাছ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমার লেখালেখির উন্নতিবিধানে তিনি আমাকে বহু সদুপদেশ দিয়েছেন। অল্প বয়সে, সম্ভবত তারুণ্যের স্পর্ধায়, আমার একবার স্বরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে নানা কায়দাকানুন, পরীক্ষানিরীক্ষা করার দিকে ঝোঁক চেপেছিল। নীরেনকাকা আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘‌মনে রাখিস তুই ছোটদের জন্য লিখছিস। এখানে সবচেয়ে স্বাভাবিক মিলই ভাল। যদি খুব ইচ্ছা হয় তখন বড়দের জন্য লেখা কবিতাতে ওসব একটু–আধটু কারিকুরি করিস।’‌ তাঁর বক্তব্য ছিল যে, ‘‌শিশুরা আগে সহজ ছন্দটাই শিখুক, বড় হয়ে না হয় কঠিন ছন্দ শিখবে, কি ছন্দ ভাঙার কথা ভাববে।’‌ তাঁর আরেকটি ধারণা ছিল যে, শিশুদের কখনও দুঃখ দেওয়া যাবে না। সে জন্য আমার লেখা একটি বাচ্চা ভূতের কবিতার গল্পাংশের করুণ সমাপ্তিটি আমাকে তাঁর নির্দেশে এমনভাবে বদলে ফেলতে হয় যে সেটি আর শেষাবধি ভূতের কবিতাই থাকেনি। লেখাটি  ‌‘‌বর্তমান’ পত্রিকায়‌ ছাপা হয়েছিল। তাঁর মানসজগৎটি বড় ভালবাসায় ভরা ছিল। আর সেজন্যই বড় দায়িত্বশীল ছিল তাঁর শুধু লেখনী নয়, অন্যান্য কাজকর্মও। সারস্বত ক্ষেত্রে সাহায্য চেয়ে তাঁর দ্বারস্থ হলে তিনি কাউকেই শূন্যহাতে ফেরাতেন না, বরং দু’‌হাত ভরে দিতেন আপন স্বেচ্ছাদানে। বানান ও ছন্দের ব্যাপারে শুধু আমার নয় দেশসুদ্ধ লোকেরই তো তিনি শিক্ষক হয়ে বসেছিলেন এবং এক্ষেত্রেও আপন অসাধারণ যোগ্যতারই স্বাক্ষর রেখেছিলেন। আমার পূর্বপ্রকাশিত ছড়ার বই ‘‌ইষ্টিশানের বকুল টগর’‌, সদ্য প্রকাশিত ও প্রকাশমান ‌ডিটেকটিভ উপন্যাস দুটি— নাম যথাক্রমে ‘‌ভুতূড়ে টেলিফোন’‌ ও ‘‌চৌধুরীবাড়ির রহস্যে’‌–র পাণ্ডুলিপি তিনি আদ্যোপ্রান্ত পড়ে দেখে দিয়েছিলেন। ‘‌ফরম্যাটিং’‌ সম্পর্কে তাঁর নির্দেশনা সর্বদাই শিরোধার্য ছিল। কোথায় ‘‌প্যারাগ্রাফ’‌ পড়বে, ‘‌ইনভার্টেড কমা’‌ বসবে, ‘‌স্পেস’‌ রাখতে হবে— প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি ব্যাপারও তিনি খতিয়ে দেখতেন। আমার শেষ বইটির ক্ষেত্রে দু–চারটে বানানও পাল্টে দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে। আসলে চূড়ান্ত রকমের ‘‌পারফেকশনিস্ট’‌ ছিলেন বলে কোনও অগোছালো কাজ তাঁর কাছ থেকে সহজে ছাড়পত্র পেত না।‌ তঁার কর্মনিষ্ঠার কোনও তুলনা ছিল না। আমার শেষ বইটির ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসুস্থ শরীরেও তিনি যেভাবে ছ–‌সাত ঘণ্টা ঠায় বসে থেকে কাজ করেছিলেন তা ভাবলে বিস্ময়–‌শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। এটি ‘‌রিভাইজ’‌ করার ইচ্ছাও তঁার ছিল কিন্তু আমাদের ভাগ্যদোষে তা আর হয়ে উঠল না। তিনি নিজে গোয়েন্দা কাহিনি লিখেছিলেন। আমিও এই বিষয়ে কলম ধরায় বেশ খুশি হয়েছিলেন এবং আমার এই ধরনের লেখা জারি রাখার কথাও বলে গেছেন। কিন্তু আমি আমার অন্তরের গভীরে এক বিপুল ক্ষতির অনুভবে আজ স্তব্ধ হয়ে আছি। আমার লেখার ‘‌ইন্সপিরেশন’‌টাই যেন চিরতরে হারিয়ে গেল!‌
আমার বাবা কবি অরুণকুমার সরকার তঁার মাত্র ৫৮ বছর বয়সে দুরারোগ্য ‘‌ক্যান্সার’‌ রোগে মারা যান। তঁার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‌দূরের আকাশ’‌ ‘‌মিত্রালয়’‌ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু এটি বিখ্যাত ‘‌সিগনেট প্রেস’‌ থেকেও প্রকাশিত হতে পারত এবং তা আরও আগে। কেন হল না সেকথা আজ বলি। ‘‌সিগনেট প্রেসের’‌ কর্ণধার দিলীপ গুপ্ত আমার বাবার কাছ থেকে মুদ্রণের জন্য তঁার কবিতার পাণ্ডুলিপি চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি তার পরিবর্তে তঁার একান্ত প্রিয় বন্ধু আরেকজন কবির রচনার পাণ্ডুলিপি দিলীপ গুপ্তমশাই–এর হাতে তুলে দেন। প্রকাশিত হয় ‘‌নীল নির্জন’‌ , কবির নাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী— সূচনা হয় এক মহান কবির গৌরবময় জয়যাত্রার। এই গল্প আমি কখনও আমার বাবার মুখে শুনিনি, নীরেনকাকার মুখে শুনেছি, তিনি শুধু আমার কাছেই নয় বহু জায়গাতেই এই গল্প বলতেন। সঙ্গে আরও কিছু কথাও যোগ করে দিতেন, অরুণের বক্তব্য ছিল যে, ‘‌তুই আমার থেকে ভাল লিখিস ভেবে তোর এই বই ছাপতে দিলাম একথা স্বপ্নেও ভাবিস না, মোটেই তুই তা লিখিস না। আমি দিলাম একথা ভেবে যে লিখতে লিখতে আমরা তো একদিন লেখা থামিয়ে দেব কিন্তু তুই তো থামবি না, থামতেই পারবি না, কবিতা না লিখলে যে তুই মরেই যাবি।’‌ তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। তঁার এই পদক্ষেপ শুধু গভীর বন্ধুপ্রীতি নয়,‌ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও উঠে এসেছিল এবং তা যে ছিল কত সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতার ব্যাপার— ‌এ বিষয়ে আজ আর কারও কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না।
‌নীরেনকাকার কনিষ্ঠা কন্যা শিউলিকে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে বাবাই তঁার জীবৎকালে মনোনয়ন করে গিয়েছিলেন। উভয় পক্ষের অভিভাবকদের সাগ্রহ সম্মতিক্রমে আমাদের দুজনের বিবাহ সেই চলে যাওয়া মানুষটিরই ইচ্ছার সম্মাননা। বৈবাহিক সম্পর্কসূত্রে আমি নীরেনকাকাকে আমার পিতা হিসেবে পেয়েছিলাম, সাহিত্যিক সংযোগ সূত্রেও তিনি আমার পিতৃতুল্য অভিভাবক ছিলেন। আমি আজ দ্বিতীয়বার পিতৃহারা হলাম। তঁার সঙ্গে আমার প্রণামেরই সম্পর্ক কিন্তু আমি তাঁর পিতৃসত্তার তুলনায় তাঁর সাহিত্যিকসত্তার কাছে অধিকতর নতজানু হই। তঁার মতো মানুষ তো শুধু তঁার সংসারের হন না, আপন মহৎ প্রতিভার যোগে বৃহত্তর সমাজের হয়ে যান। ■

 

(সাক্ষাৎকারভিত্তিক) 

জনপ্রিয়

Back To Top