দেবাশিস পাঠক: পত্রিকার নাম ‘‌বঙ্গদর্শন’‌। প্রকাশকাল ফাল্গুন ১২৭৯। অর্থাৎ ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি–মার্চ মাস। প্রকাশিত হল ‘‌বাবু’‌। বাংলার নব্যবাবুদের নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ। সেখানেই ছিল লাইন দুটো।
‘‌যিনি রূপে কার্তিকেয়ের কনিষ্ঠ, গুণে নির্গুণ পদার্থ, কর্মে জড়ভরত এবং বাক্যে সরস্বতী তিনিই বাবু। যিনি উৎসবার্থ দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মীপূজা করিবেন, উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পূজা করিবেন এবং পাঁঠার লোভে গঙ্গাপূজা করিবেন, তিনিই বাবু।’‌
লাইন দুটির আলঙ্কারিক অর্থ, সামাজিক ব্যঞ্জনা অনেক। সে সব সরিয়ে রেখে সাদা চোখে দেখলেও কিন্তু দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক, সরস্বতী বাগ্‌দেবী। দুই, তিনি মূলত পূজিতা হতেন পতিতাপল্লীতে। নিষিদ্ধপল্লীতে দেবী সরস্বতী!‌
অবাক করা মনে হলেও এটা সত্যি।
বাৎসায়নের যুগ থেকে বাবু–বিলাসের কলকাত্তাইয়া সংস্কৃতি, সর্বযুগেই বিষয়টা সত্যি।
বাৎসায়ন লিখছেন, কামদেবের পুজো করতে হলে চৌষট্টি কলা শিখতে হবে। আর সেই শিক্ষার শুরু সরস্বতী পুজোর দিন। চৌষট্টি কলার মধ্যে গীত, বাদ্য, নৃত্য, ছন্দোজ্ঞান যেমন আছে, তেমনই রয়েছে ছলিতকযোগ, দ্যূতক্রীড়া, আকর্ষক্রিয়া প্রভৃতিও। এক কথায় নাচ–গান–বাজনা থেকে ছলকলা, জুয়ো খেলা, কবিতা লেখা ও বোঝা, সব কিছুই চৌষট্টি কলার মধ্যে পড়ে। আর এসব কিছুরই অবিসংবাদী দেবী সরস্বতী। দেবীর শাস্ত্রসম্মত গায়ত্রী মন্ত্রেও তাই কামদেবের অনিবার্য উল্লেখ। বাগ্‌দেব্যৈ বিদ্মহে কামরাজায় ধীমহি, তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ॥‌
বাৎসায়ন প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেকার ব্যাপারস্যাপার। প্রায় শ’‌দেড়েক বছর আগেকার কলকাতাতেও সেই অভিন্ন ছবি। সরস্বতী পুজোতে শহরের নিষিদ্ধপল্লীর ঘরে ঘরে আনন্দ–আসরের চিত্র। নেবুতলা থেকে রামবাগান, হাড়কাটাগলি থেকে হালসিবাগান, সর্বত্র একই লহরী। ‘‌সমাজ কুচিত্র নকশা’‌য় সেই আনন্দলহরীরই হদিশ দিয়েছেন হুতোম প্যাঁচা, অর্থাৎ কালীপ্রসন্ন সিঙ্গি।
‌‘‌সরস্বতী পুজোর আর পাঁচদিন আছে। রাত্রি ঘোর অন্ধকার, তথাপি ইয়ার দলের শঙ্কা অথবা বিরামের নাম নাই। .‌.‌.‌ সকল বেশ্যাবাড়ির দরজাতেই প্রায় জুড়ি, তেঘুড়ি, চৌঘুড়ি খাড়া রয়েচে। গৃহমধ্যে লালপানির চক্‌চক্‌, চেনাচুরের ছপ্‌ছপ্‌ ও বোতল গেলাসের ঠন্‌ঠন্‌ শব্দ শুনা যাচ্ছে। .‌.‌.‌ সরস্বতী পুজোর খরচের কল্যাণে অনেকস্থলে গাঁটকাটা, রাহাজানি, সিঁদ, হত্যা, ডাকাতি, জুয়াচুরি ইত্যাদি ঘটনা হচ্ছে। শহর টল্‌টোলে।’‌
অর্থাৎ, শ্রীপঞ্চমী আসার দিন পাঁচেক বাকি থাকতেই নিষিদ্ধ পল্লীতে পল্লীতে সরস্বতী পুজোর আনন্দে নিষিদ্ধ কর্মের বাড়াবাড়ি। প্রতিপদ থেকে বদলাতে থাকত শহরের চালচিত্র। কুমোরটুলির ছবিটাও। সে সবও মিলবে ওই ‘‌সমাজ কুচিত্র নকশা’‌য়, সৌজন্যে অবশ্যই হুতোম।
‘‌কুমোরটুলির নগ্‌দা সরস্বতীরা বেধড়ক বিক্রি হয়ে মুটের মাথায় উঠ্‌চেন, কুমোরেরা শেষকালে আর জোগাতে না পেরে, বাড়তি দোমেটে করা জগদ্ধাত্রী ঠাকুরুনের হাতি ও সিঙ্গি ভেঙে দুখানি হাত কেটে ও ঘাড় বেঁকিয়ে সাদা করে স্থান পূর্ণ কচ্চে। রাজপথ যেন সরস্বতীময় বোধ হচ্চে। ডাকের সাজকর, মিঠাইকর, শোলার পদ্মফুল ও গাঁদাফুলের দোকানে আজ অসঙ্গত খদ্দের।’‌
চারিদিকে ব্যস্ততা অন্তহীন। সরস্বতী পুজোর দিনই তো নিষিদ্ধপল্লীর ঘরে ঘরে নতুন নতুন নৃত্য প্রদর্শন, গীত পরিবেশনের শুরু। সেইসঙ্গে বারঙ্গনা ও তাদের বাবুদের নিজস্ব মনোরঞ্জনের জন্য যাত্রাপালার বন্দোবস্ত। প্রতিবেশে ব্যস্ততার প্রসৃতিতে মিশে থাকত সে সব অনুষঙ্গও। হুতোম জানাচ্ছে, ‘‌ওদিকে তালিম, অমিল ও মওলা দিতেই দুদিন কেটে গ্যালো। রাস্তার ধারে পোড়ো বাড়িতে ঝাঁকড়াচুলো যাত্রাওয়ালাদের মওলার ‘‌হ্যায় হ্যায়’‌ শব্দ থামলো। .‌.‌.‌ ফেরিওয়ালারা আজ বেগুনে বস্ত্র, ময়ূরপুচ্ছ দেওয়া চূড়ো ও চিত্রকরা হাঁড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরচে। আবির, আম্রমুকুল, অভ্র ও যবের শীষেরা তাহাদের হাঁড়ির ভিতর থেকে উঁকি মারচে।’‌ অর্থাৎ, একদিকে যেমন পুজো–উপলক্ষে নাচ–গান–যাত্রার মহড়া চলছে, অন্যদিকে তেমনই চলছে পুজোর উপচার কেনাবেচা।
তৃতীয়ায় বাড়ি বাড়ি প্রতিমা আসার পর ব্যস্ততার ছবিটা বদলায়।
‘‌বাড়ি বাড়ি প্রতিমে সাজানো আরম্ভ হয়েচে। এক বাড়ির বিবির আগে উজ্জুগ হয় নাই, দিন গ্যালো দেখে তিনি তাঁহার বাবুর গলায় অভিমানে গামছা দিয়েছেন। বাবু তাঁহার পিতামহীর সিঁদুক ভেঙে দুছড়া চাঁদি কাটা পৈঁছে ও একটা সিঁদুর চুপড়ি চুরি করে তাড়াতাড়ি মাটির কাজ আরম্ভ করে দিলেন। .‌.‌.‌ মোসাহেব ও উমেদারেরা আজ নিমেষমাত্র বাবুর কাছছাড়া হচ্চে না।’‌
পুজোর আগের রাত। ‘‌আসার সাজানো, দেবীঘট, নারকেলের মুচি ও আম্রশাখা সংগ্রহ কর্ত্তেই দিন শেষ হল। রাত্রিতেও অনেক কাজ গুছিয়ে রাখা হল। অনেকের নিদ্রাই হল না।’‌
কিন্তু বাবুদের সুখী শরীর বিনিদ্র রজনী যাপনে সে শরীরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ‘‌রেজিমেন্টের মতো ফুলবাবুর ঝাঁক গড়া গড়া শুয়ে পড়লেন;‌ কিন্তু শয়ন কর্ত্তে কর্ত্তেই শৃগাল, কাক ও কুক্কুট ডেকে উঠল।’‌ ভোর হতে ‘‌একটি কামিনী হাই তুলে আলস্য ত্যজে দেখলেন, তিনি তাঁহার দোলন নথের বিলিতি মুক্তোর নোলকটি ভক্ষণ করে ফেলেছেন।’‌
নাকের নোলক ঘুমের ঘোরে গিলে ফেলার ঘটনাটা কতদূর সত্য, সেকথা জানার উপায় নেই। তবে একটা কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে সেকালের কলকাতার যাবতীয় ব্যস্ততার কেন্দ্রস্থল আজকের মতো স্কুল–কলেজ নয়। বারঙ্গনাগৃহ। এ নিয়ে ১৮৬৫–র ‘‌সমাজ কুচিত্র দর্পণ’–এর জানুয়ারি সংখ্যায় যথেষ্ট শ্লেষ লক্ষ্য করা যায়। ওই পত্রিকার ‘‌সরস্বতী পূজা’‌ শীর্ষক নক্‌শায় লেখা হল, ‘‌পাঠকগণ মনে করুন, আশ্বিন মাসের শারদীয় পঞ্চমীর মতো এ পঞ্চমীর তত মাহাত্ম্য নাই, তথাপি শহরে আমোদের স্রোত ধরচে না। .‌.‌.‌ বারঙ্গনা পল্লীর কথাই এক স্বতন্ত্র। সেখানে শহরের রকমারি আমোদের ও আমোদপ্রিয় দলের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েচে। হিন্দুধর্ম যেন ইয়ং বেঙ্গলদের ভয়ে, ধুনো, শাঁখ, গঙ্গাজল ও পবিত্রতায় আচ্ছাদিত হয়ে ওই সকল কুঞ্জে লুকিয়ে রয়েচেন।’‌
উপপত্নীর বাড়িতে বাবুদের স্পনসর করা সরস্বতী পুজো। সে পুজো দেখতে সাধারণ দর্শকের ভিড় প্রচুর। থাকতেন বাবুদের ইয়ারদোস্তরাও, নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। ‘‌সমাজ কুচিত্র দর্পণ’‌–এর পাতায় সে দৃশ্যও বর্ণিত।
‘‌দর্শকেরা এইরূপ রাজবেশে দশ বাড়ির ঠাকুর দেখে আমোদ করে বেড়াতে লাগলেন। .‌.‌.‌ আতরদান গোলাবপাশ হস্তে এক এক জন লম্বোদর প্রায় সকল বাড়ির প্রতিমের সমুখে হাজির আছেন। ‌তাঁরা নিমন্ত্রিতদের মুখে, চোখে, বুকে গোলাপবৃষ্টি কচ্চেন, আর আড়ে আড়ে হাসছেন।’‌
শ্রীপঞ্চমীর রাতে এসব ছবি বদলে গিয়ে অন্য দৃশ্যপট। তখন কৌমার্যহরণের অনুষ্ঠান, ‘‌নথভাঙা’‌র আয়োজন। যাবতীয় নান্দনিকতা, সরস্বতীর সঙ্গে সম্পর্কিত যাবৎ সৌকর্য সরিয়ে তখন কামের বহ্ন্যুৎসব। দাউ দাউ আগুন তখন বড্ড স্থূল হয়ে জ্বলত। সেই সঙ্গে মদের নেশায় তাবৎ বেসামাল আকুতি।
‘‌এক বাবু তালে তালে নাচতে নাচতে জড়িত জিহ্বায়’‌ গান জুড়েছেন। কখনও গাইছেন ‘‌দিবানিশি তোরো লাগি, ঝরে আমার দু–‌নয়ান’‌, কখনও আবার ‘‌ক্যান্‌ লো এমন হলি প্রাণপিয়াসী সই।’‌ বাবু গাইছেন আর ঘুরে ঘুরে নাচছেন, ‘‌বিবি তবলা বাজাচ্চেন।’‌ দূরে ফেরিওলার কণ্ঠে ভেসে আসছে, ‘‌বেলফুল, চাই বরোফ।’‌ এমন সময় পাঁচ মাতাল বাবু‌ দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করলেন। তাঁদের গলায় একটাই কথা ‘‌মদন  আগুন জ্বলছে দ্বিগুণ।’‌ এমন গান আর দরজা ধাক্কানোর আওয়াজে ঘরের ভেতরকার বাবুর গান বদলে গেল। তিনি ‘‌কালোয়াতি আওয়াজে’‌ ধরলেন ‘‌কে এলি শঙ্করী এলি উমা এলি মা’‌। বাবু দরজা খুলতে পা বাড়ালেন।  ‘‌আর কর্‌রো কি?‌’‌ বলে পেছন থেকে বাবুর কাপড় ধরে টানাটানি শুরু করলেন বিবি। বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে বিবিকে দেখতে পেলেন। ‘‌‘‌কে মা শুভঙ্করি!‌ পদ্ম থেকে উঠে এলি ক্যান বাপ?‌’‌ বলে বিবিকে নিয়ে প্রতিমের উপর বসাতে চল্লেন।’‌’‌ প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে এসব নাটক চলল। বাইরে তখনও অপেক্ষমাণ পঞ্চ মাতাল। দরজা খুলে দেওয়ামাত্র তাঁদের প্রবেশ। প্রতিমা দেখেই তাঁদের সাষ্টাঙ্গ প্রণাম শুরু। সেই সঙ্গে মুখে বুলি, ‘‌মা আমার বসে রয়েচেন যেন লম্বোদরী দশানন।’‌ বাড়ির কর্তা তখন অতিথিদের স্বাগত জানাতে ব্যস্ত। তিনি বললেন, কাম হিয়ার মাই জলি ফ্রেন্ডস’‌। আর বলার সঙ্গে করমর্দন অব্যাহত। বাড়িওয়ালি তখন বোতল ও গেলাস হাতে ‘‌এই এসো!‌’‌ বলে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। কোনও কোনও বাবু সরস্বতীর পাদপদ্মে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। বিচিত্র বস্তু নিবেদন। যেমন, ‘‌বাবুদের একজন তাঁর লবঙ্গ মাসির রান্নাঘর থেকে একটি ঝাড়ানো লাঙ্গুলবিশিষ্ট সাদা দধিমুখী মেনি বেড়াল চুরি করে এনেছিলেন, সেইটি মা সরস্বতীর শ্রীপাদপদ্মে উপহার দিলেন। একটা হাসির গর্‌রা উঠল।’‌
আর পরদিন?‌
‘‌আমোদের খোয়ারিতে চক্ষু মহাদেবের মতো ঢুলু ঢুলু কচ্চে। .‌.‌.‌ বৈকালে পুলিসের পাসের নিয়মমতো মাকে বিসর্জন করে নিশ্চিন্ত হলেন। তাঁরাও বাঁচলেন সরস্বতীরও এক বৎসরের মতো হাড় জুড়ুলো।’‌
১৮২২ থেকে ১৮২৫–‌এর মধ্যে কলকাতার নিষিদ্ধপল্লী নিয়ে তিন–‌তিনটে বই লিখেছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রন্থত্রয়ের নাম ‘‌নববাবু বিলাস’‌, ‘‌নববিবি বিলাস’‌ এবং ‘‌দূতী বিলাস’‌। তিনটে বইতে আছে সরস্বতীবন্দনা।
‘‌বঙ্গদর্শন’‌–‌এ ‘‌বাবু’‌ প্রকাশিত হওয়ার ছ’‌‌বছর পর, ১২৮৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রকাশিত ‘‌আর্য্যদর্শন’‌ পত্রিকা। সেখানে বাঙালি স্তুতিতে লেখা হয়েছিল, ‘‌সরস্বতী তোমার দুহিতা, কন্যাদায়ে তুমি সদাই বিব্রত, তাহাকে অন্যের ঘাড়ে ফেলিতে পারিলেই তুমি দায় হইতে নিষ্কৃতি পাও, তোমাকে নমস্কার।’‌
সেখানে ‘‌বেশ্যাগৃহ’‌কে বাঙালির ‘‌মঠ’‌ বলা হয়েছে। কেন মঠ?‌ সে ব্যাখ্যাও দিয়েছে ‘‌আর্য্যদর্শন’‌। ‘‌সেখানে থাকিয়া যখন তুমি সন্ন্যাস অবলম্বন কর, তখন সংসার মায়া তোমাকে কিছুতেই অভিভূত করিতে পারে না, স্ত্রী–‌পুত্রের নয়নজল তোমাকে ফিরাইতে পারে না।’‌
সেই মঠের দেবী সরস্বতী।
আবার তিনিই অবিবাহিতা কন্যারূপে কন্যাদায়গ্রস্ত বাঙালি বাবার মেয়ে হিসেবেও উপমিতা। 
এই যে সরস্বতীর যুগপৎ দ্বিবিধ উপস্থাপনা, এটা অবশ্য কোনও নতুন কিছু নয়। এবং এ–‌ব্যাপারে ‘‌আর্য্যদর্শন’‌ কোনওমতেই পথিকৃত নয়। বরং ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল সেই ঋক্‌বেদের কালে, সেকথাটা মনে রাখা দরকার।
ঋক্‌মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন ঋষি গৃৎসমদ। বলেছেন, ‘‌অম্বিতমে নদীতমে দেবিতমে সরস্বতি।’‌ একযোগে সরস্বতীকে মাতৃশ্রেষ্ঠা, শ্রেষ্ঠ নদী এবং শ্রেষ্ঠ দেবীরূপে উপস্থাপন। এখানেই পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে, সরস্বতী কে?‌ বা সরস্বতী আসলে কী?‌
নদী!‌ হ্যাঁ, নদী তো বটেই। ব্যুৎপত্তিগত অর্থেই সরস্বতী নদী। সরস্‌ (‌জল)‌ +‌ মতুপ্‌ +‌ ঙীপ্‌ (‌অর্থাৎ স্ত্রীলিঙ্গবাচক ‘‌ঈ’‌ =‌ সরস্বতী। নদীদের মধ্যে তিনি শুদ্ধা, ‘‌নদীনাং শুচির্যতী’‌, আসমুদ্র তার ধারপথ, ‘‌গিরিভ্য আসমুদ্রাৎ’‌। বেদের যুগের লোকেরা তার উভয় তীরে বাস করেন, ‘‌অধিক্ষিয়ন্তি পূরবঃ’‌। তাঁরা জানেন সরস্বতীর গর্ভে আছে যাবতীয় রত্নসম্ভার, বরেণ্য সম্পদ। তাই তারা সরস্বতীর জলকে মাতৃস্তন্যের মতো পান করতে চেয়েছে। ‘‌যস্তে স্তনঃ.‌.‌.‌ সরস্বতী তমিহ ধাতবে কঃ॥‌’‌ আবার সেই সরস্বতীর বন্যার সময় দুকূল প্লাবিত করে তাদের যাতে উৎখাত না–‌করে, সে প্রার্থনা করতেও সেই মানুষগুলো ইতস্তত করেনি— ‘‌মা অপস্ফরীঃ পয়সামান আধক্‌’‌।
অত কিছু সত্ত্বেও সরস্বতীর ভৌগোলিক অবস্থানটা বের করা সহজ নয়। পর্বত থেকে সাগর পর্যন্ত তার গতিধারা, সেকথা ঋক্‌বেদ জানিয়েছে। ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, প্লক্ষপ্রসবণ তার উৎস। প্লক্ষপ্রসবণ থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে যাওয়ার পথে সরস্বতী অন্তঃসলিলা হয়। যেখানে এই কাণ্ডটা ঘটে, সে জায়গাটাকে বেদ চিনিয়েছে সরস্বতী বিনশন নামে। তাণ্ড্যমহাব্রাহ্মণ মোতাবেক দিনরাত ঘোড়া ছুটিয়ে গেলে বিনশন থেকে প্লক্ষপ্রসবণে পৌঁছোতে সময় লাগত চুয়াল্লিশ দিন। 
এসব বিবরণ, যাত্রার হিসেবনিকেশ, এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এই মরভুবনের ঠিক কোন অংশে এই জায়গাগুলো বিরাজ করছে, সে সম্পর্কে নিঃসংশয় হওয়ার কোনও সূত্র বেদের ঋষিরা রেখে যাননি। বোট, লুভ্‌ডিগ, গ্রাসমান–‌রা বলেন আজকের সিন্ধুই সেদিনের সরস্বতী। ম্যাক্সমুলারের মতে, ব্রহ্মাবর্তের একটা ছোট্ট নদী সরস্বতী, সেটি রাজস্থানের মরু অঞ্চলে চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছে। আবার কারও কারও মতে, সরস্বতী ভারতে নয়, প্রবাহিত হত আফগানিস্তানে। ‌‘‌আবেস্তা’‌–‌তে ‘‌হরকতী’‌‌ নামে একটা নদীর উল্লেখ আছে। ভারতীয় উচ্চারণে একদা আফগানিস্তানে প্রবহমান ‘‌হরকতী’‌–‌ই সরস্বতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বিষয়টা বেশ জটিল, বিতর্কও বটে। 
এই জটিলতা এবং বিতর্কে বেদের ভূমিকাও বড় কম নয়। ‌অথর্ববেদ অনুসারে, তিন–‌তিনটে নদীর নাম সরস্বতী। আর ঋক্‌মন্ত্র অনুসারে, সরস্বতীর সাতটি বোন, ‘‌সপ্তস্বসা’‌। এই সাতটি নদীর মধ্যে সিন্ধু, সরযূও রয়েছে। কিন্তু গঙ্গা নেই।
এসব গলিঘুঁজি থেকে একেবারে সোজাসাপ্টা আমাদের চেনা বিদ্যার দেবীকে টেনে বের করে এনেছেন পূরাণকাররা। ব্রহ্মবৈবর্ত‌পুরাণ বলছে, বাগ্‌দেবী আসলে ব্রহ্মার কন্যা। নারায়ণের পত্নী। পদ্মপূরাণে তিনি দক্ষকন্যা, কাশ্যপ মুনির স্ত্রী। বাণভট্টের ‘‌হর্ষচরিত’‌–‌এ সরস্বতীর ছেলের খোঁজ মেলে। দধীচির ঔরসজাত সেই পুত্রের নাম সারস্বত। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে লেখা হয়েছিল মাইহার লিপি। সেখানেও সরস্বতীর ছেলের খোঁজ মেলে। দেবগুরু বৃহস্পতির অভিশাপে সে মর্ত্যে এসে মাইহার অঞ্চলে এক ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম নেয়, তার নাম হয় দামোদর। অথচ, এমন বহু পুরাণ আছে যাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরস্বতীর কোনও ছেলেপুলে নেই। তাঁর জীবনে প্রেম আছে, প্রজনন নেই। মাতৃত্বের স্বাদ থেকে তিনি বঞ্চিত। 
এমন সব হিজিবিজি পরিচিতির ভুলভুলাইয়া থেকে সরস্বতীর মুক্তি ঘটেছে সারদাতিলক তন্ত্রে। সেখানকার ধ্যানমন্ত্রে তিনি ঠিক আজ তাঁকে যেরূপে দেখি, সেই রূপে অধিষ্ঠিতা। শুভ্রকান্তি, কুচভারে সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে পড়েছেন, মাথায় চন্দ্রকলা, হাতে বই আর কলম। শ্বেতপদ্মের ওপর বসে আছেন তিনি। সারদাতিলক তন্ত্র আরও একটা কথা বলছে। এই বিদ্যাদায়িনী দেবী শিব–‌দুর্গার কন্যা। মোটামুটি পনেরো শতকের শেষের দিকে নবদ্বীপে বাস করতেন স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য। তিনিই সারদাতিলক তন্ত্রের ধ্যানমন্ত্র থেকে সরস্বতীকে তুলে আনলেন বাঙালির কাছে। ধ্যানমন্ত্রের সেই দেবীমূর্তি অনিন্দ্য শুভ্রতা পেল ভারতচন্দ্রের আখরে— ‘‌শ্বেতবর্ণ শ্বেতবাস/‌ শ্বেতবীণা শ্বেতহাঁস/‌শ্বেতসরসিজ নিবাসিনী’‌। 
স্মার্ত রঘুনন্দন কিন্তু সরস্বতীর মূর্তিপুজোর কথা কোথাও বলেননি। বঙ্গে প্রাচীনকালে মূর্তিপুজোর প্রচলনও তাই ছিল না। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি। ১৮৫৯–‌এ জন্ম। বেঁচেছিলেন ১৯৫৬ পর্যন্ত। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘‌আমরা পাঠশালায়.‌.‌. শুক্ল পঞ্চমীতে সরস্বতী পূজা করিতাম। কিন্তু ইস্কুলে সরস্বতী পূজা হইত না। আমরা বাড়িতে শ্লেট দোয়াত কলমে পূজা করিতাম। সে বই বাংলা কিংবা সংস্কৃত, ইংরেজি হইতে পারিত না। (‌কারণ)‌ ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা।’‌
সরস্বতীর অনেক কিছুর মতো মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথির ব্যাপারটাও বেশ গন্ডগোলের। মাঘী শ্রীপঞ্চমী তিথিটা ছিল লক্ষ্মীর। ‘‌মহাভারত’–এর বনপর্বে আছে, এই তিথিতে স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিকের সঙ্গে দেবসেনারূপী লক্ষ্মীর বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়েতে পুরোহিত ছিলেন স্বয়ং দেবগুরু বৃহস্পতি। কিন্তু শ্রী বা লক্ষ্মীর সঙ্গে লেপ্টে থাকা তিথিটাকে সরস্বতীর জন্য হাইজ্যাক করেছেন ওই স্মার্ত রঘুনন্দনই। তিনি বিধান দিলেন, ওদিন লক্ষ্মীকে ধূপ, অন্ন, ফুল জল দেওয়া হোক আর ‘‌মস্যাধারং  লেখনীঞ্চ’কে পুজো করা হোক। দোয়াত কলমের পুজো হবে। অতএব লেখাপড়া ওদিন বন্ধ। আর সেদিনই পালন হবে সারস্বত উৎসব। উৎসব নিয়েই লোকের যত মাতামাতি, পুজো নিয়ে অত কে আর মাথা ঘামায়!‌ লোকচরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যের সৌজন্যে শ্রীপঞ্চমী লক্ষ্মীকে ছেড়ে চলে এল সরস্বতীর ঝুলিতে। পরবর্তিকালে বলা হতে লাগল, সরস্বতীরও আর একটা নাম ‘‌শ্রী’‌। অথচ অমর সিংহেয় সময় অবধি প্রাচীন কোনও কোষে এরকম কোনও ইঙ্গিত নেই। তাতে কী আসে যায়!‌ শ্রীপঞ্চমীর শ্রী যদি সরস্বতী হয় তবে ওদিন সরস্বতী পুজোটা বৈধতা ভালমতোই পেয়ে যায়। অতএব লক্ষ্মীর তিথি সরস্বতীতে পুরোদস্তুর অন্বিত হল।
নদী থেকে তিনি বিদ্যার দেবী হলেন। এই বিবর্তনে একটা যুক্তি আছে। নদীতীরেই বেদপাঠরত মুনিঋষিদের বাস। নদীর জল আর মাছেই তাঁদের পুষ্টি, নদীর জলেই তাঁদের কৃষিজ অন্ন। অতএব নদী বিদ্যাকে পোস্টাই দেওয়ায় সৌজন্যে বিদ্যার মূর্তরূপ হয়ে দাঁড়াল।
একইভাবে সামাজিক মানুষের উৎসবপ্রীতির কল্যাণে লক্ষ্মীপুজোর তিথিতে বিদ্যার দেবী পাকাপাকিভাবে পুজো পেতে লাগলেন। এটাও বিবর্তনের বৈভব।
কিন্তু পুরোনো একটা প্রশ্নের উত্তর এসবে নেই। পুরোনো প্রশ্নের কথা বলতে হলে শুরুর প্রসঙ্গটা আবারও টেনে আনতে হবে। প্রশ্নটা পাওয়া যায় ১৫ মাঘ, ১২৮০ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবারের ‘‌সুলভ সমাচার’‌–‌এর পাতায়।
‘‌হিন্দু পর্বের মধ্যে কার্তিক ও সরস্বতী পূজার প্রতি বেশ্যাদিগের কিছু অধিক অনুরাগ দেখিতে পাওয়া যায়। সন্তান কামনা করিয়া লোকে কার্তিক পূজা করে এবং বিদ্যালাভের জন্য সরস্বতী পূজা করে। বেশ্যাদের পক্ষে এপ্রকার কামনা নিতান্ত অনধিকার চর্চা, তথাপি তাহারা কার্তিক ও সরস্বতী পূজায় খুব ধুমধাম করিয়া থাকে।’‌
সরস্বতী পুজোর সঙ্গে চৌষট্টি কলা আয়ত্তের একটা সম্বন্ধ আছে। সেই সূত্রেই নিষিদ্ধপল্লীতে সরস্বতী বন্দিতা। একথা আমরা আগেই জেনেছি। কার্তিকের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক বারঙ্গনারা খোঁজে না, কার্তিকের মতো সুদর্শনবাবুই তাদের প্রার্থনার বিষয়। সম্ভবত সেই সূত্রেই কার্তিক পুজোয় নিষিদ্ধপল্লীতে ধুমধাম।
কিন্তু এসবের পরেও কার্তিক এবং সরস্বতীর আর একটা মিল থেকেই যায়। এই মিলটা আমরা সচরাচর খেয়াল করি না। সেটা ওই সন্তান–‌সম্পর্কিত। পৌরাণিক মতে সরস্বতী মাতৃত্বের স্বাদ না পেলেও সরস্বতীর সঙ্গে প্রজনন এবং উর্বরতার সম্পর্ক, বন্ধ্যাত্ব মোচনের সম্পর্ক, আদৌ দুর্লক্ষ্য নয়।
প্রথমে মাঘী শ্রীপঞ্চমী তিথি। জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‌শীতকাল হল জড়তার কাল। মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথি থেকেই শীতের জড়তা কেটে যেতে থাকে, ঋতুতে লাগে প্রথম বসন্তের ছোঁয়া। সরস্বতীর আবির্ভাবে সকল জড়তামুক্তি, মনেরও, ঋতুরও।’‌
এসব ভাববাদী কল্পনা যদি সরিয়েও রাখি, তাহলেও মানতে হবে মাঘ মাস মঘা নক্ষত্রের মাস। মঘা নক্ষত্রের আকৃতি লাঙলের মতো। অর্থাৎ কৃষিজ ফসলের প্রতীক লেগে আছে এ মাসের গায়ে। আর খনার বচন জানাচ্ছে, মাঘ মাসের বৃষ্টি সুফলসের ইঙ্গিতবাহী।
সুতরাং ভাবে এবং প্রতীকে, মাঘের অনুষঙ্গে সরস্বতী পুজো উর্বরতা এবং প্রজননের সঙ্গে যুক্ত।
দ্বিতীয়ত পলাশফুল। সরস্বতী পুজোর অন্যতম উপচার। সর্বশুক্লার পুজোয় পলাশ কেন লাগবে?‌ ঋতুমতী নারীই গর্ভধারণে সমর্থ। পলাশ রক্তবর্ণ। ঋতুমতীর রজোদর্শনের রং তাতে। তারই প্রতীক হিসেবে শ্বেতশুভ্রা দেবী হয়ে উঠেছেন ‘‌পলাশপ্রিয়া’‌।
রঙের এই সম্পর্ক যদি কষ্টকল্পনা মনে হয়, তাহলে জানাই, পলাশ পাতা আজও বন্ধ্যাত্ব দূর করতে ব্যবহৃত হয়। বীরভূম–‌বাঁকুড়া জেলায় আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে পুত্রসন্তান লাভের জন্য মেয়েরা পলাশপাতা বেটে খান। শিবকালী ভট্টাচার্য ‘‌চিরঞ্জীব বনৌষধী’‌র তৃতীয় খণ্ডে জানাচ্ছেন, পলাশের রস অস্থির গর্ভকে বা অস্থিত শুক্রকে স্থিত করে। পুত্রসন্তান লাভের জন্য এই পলাশনির্যাস ব্যবহারের কথা বলেছে ‘‌ভাবপ্রকাশ’‌, একটি আয়ুর্বেদ বিষয়ক গ্রন্থ।
তৃতীয়ত, শীতল ষষ্ঠী। ষষ্ঠী সরাসরি প্রজননের সঙ্গে যুক্ত দেবী। আর সরস্বতী পুজোর ঠিক পরদিন ঠান্ডা খাবার খেয়ে তাঁরই অর্চনা করা হয়। এখানেও সরস্বতীর সঙ্গে প্রজনন আর উর্বরতার একটা যোগসূত্র টের পাওয়া যায়।
সুতরাং, সরস্বতী কেবলই বিদ্যার দেবী কি না, এ বিষয়ে সংশয়দীর্ণতার যথেষ্ট কারণ আছে।
তবে সরস্বতী পুজোর হুল্লোড়ে এতকিছু ভাবনাচিন্তার আদৌ কোনও দরকার আছে কি না, সে প্রশ্নটাও কিন্তু উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। সরস্বতী যে–‌ই হোন আর যারই দেবী হোন, শিক্ষার্থীর কাছে তাঁর পুজো মানে স্রেফ পড়াশোনার দেবীর পুজো নয়। সে কথাটা ভালভাবেই বুঝেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাই জয়গোপাল তর্করত্নের বাড়িতে বসে তিনি যে সরস্বতী বিষয়ক শ্লোকটি লেখেন, সেটি এরকম:‌
লুচি কচুরি মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলার মাপ্লুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরস্তরম্‌॥‌
সরস্বতী সম্পর্কে বাংলার ছেলেমেয়েদের বোধহয় 

জনপ্রিয়

Back To Top